এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 27 জানুয়ারী 2010 16:19

ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করার নেপথ্যে

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ও স্বনামধন্য পরমাণুবিজ্ঞানী ড. মাসুদ আলী মোহাম্মাদি সম্প্রতি তেহরানে এক সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, শত্রুরা যে ইরানের জ্ঞানগত উন্নয়ন যে কোন মূল্যে নস্যাত করতে চায়, তা স্পষ্ট হয়েছে। ইরানের জনগণ ও সরকার ড. আলী মোহাম্মাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খবরটি ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রচারিত হয়েছে। ড.আলী মোহাম্মাদির শাহাদাতের ঘটনা প্রমাণ করেছে, ইরানকে জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতির ক্ষেত্রে থামিয়ে দেয়ার জন্য শত্রুরা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের অপহরণ এমনকি তাদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। আজ আমরা এ সম্পর্কে আলোচনা করবো।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ড. আলী লারিজানি ছিলেন প্রথম শীর্ষস্থানীয় ইরানী কর্মকর্তা যিনি ড. আলী মোহাম্মাদির হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি ঐ ন্যাক্কারজনক ঘটনার নেপথ্য নায়কদের স্বরূপ উন্মোচন করে বক্তব্য দিয়েছেন। উল্লেখ্য ড. মাসুদ আলী মোহাম্মাদি নিহত হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ'র পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা একটি অখ্যাত গোষ্ঠি ঐ হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করেছে। ড. আলী লারিজানি এ সম্পর্কে বলেছেন, ইরানের পরমাণুবিজ্ঞানীর প্রকৃত হত্যাকারীদের আড়াল করার লক্ষ্যে ঐ অখ্যাত গোষ্ঠিটি জোর গলায় দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে। তিনি আরো জানিয়েছেন, ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে খবর ছিলো যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসান ইরানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানী পরমাণুবিজ্ঞানী হত্যায় জড়িত বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, অখ্যাত কোন গোষ্ঠি ঐ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে মূল ঘাতকদের দিক থেকে ইরানের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে পারবে না।

শহীদ ড. মাসুদ আলী মোহাম্মাদি ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন না, তবে ঐ সংস্থার কোন কোন প্রজেক্টে তিনি কাজ করেছেন। তাকে হারানোর ঘটনা ইরানের বিজ্ঞান ও গবেষণা ক্ষেত্রের এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদীবাদী ইসরাইল ইরানী বিজ্ঞানীকে হত্যার দায় থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য তাদের ভাষায় ইরানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে ঐ হত্যাকাণ্ডের কারণ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইরানের শত্রুরা দেশটির স্বার্থের বিরুদ্ধে মারাত্মক আঘাত হেনে সেই ঘটনাটিকে আবার ইরানী জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরানী নেতৃবৃন্দের তাৎক্ষণিক ও সময়োচিত পদক্ষেপ শত্রুদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে।

ইরানী পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আলী মোহাম্মাদির শাহাদাতের ঘটনার অপব্যবহার করার প্রচেষ্টা শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে যায়। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ঐ হত্যাকাণ্ডের পরপরই ড. আলী মোহাম্মাদিকে ইরানের একটি রাজনৈতিক ধারার সমর্থক হিসেবে তুলে ধরে। ঐসব গণমাধ্যম দাবি করে, তার বিরোধী রাজনৈতিক দল তাকে হত্যা করেছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ঐ পরমাণুবিজ্ঞানী সম্পর্কে যারা ন্যূনতম জ্ঞান রাখেন তারা জানেন যে, তিনি কোন রাজনৈতিক তৎপরতার সাথে কখনেই জড়িত ছিলেন না। দেশে বিদেশে তিনি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন। ইরানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মনে করছে, ইহুদীবাদী ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা তার এদেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ড. মাসুদ আলী মোহাম্মাদিকে হত্যা করেছে। কিন্তু ঐ ইসরাইল সরকার এবং পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানী বিজ্ঞানীর হত্যাকাণ্ডকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফসল হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর তারা দেয় নি তা হচ্ছে- ইরানের একটি রাজনৈতিক পক্ষ যদি অপর পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য হত্যাকাণ্ড শুরু করবে, তবে তারা প্রতিপক্ষের প্রথম বা দ্বিতীয় সারির রাজনৈতিক নেতাদের টার্গেট না করে বিজ্ঞানীকে হত্যা করলো কেন?

আসল কথা হচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানকে তার শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচী থেকে বিরত রাখার জন্য নানারকম ফন্দিফিকির অবলম্বন ও হুমকি ধমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদীবাদী ইসরাইল এবং তাদের সহযোগী শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের আগ্রাসী ও আধিপত্যকামী নীতি বাস্তবায়নের পথে ইরানকে প্রধান বাধা বলে মনে করছে। তাই তারা সুযোগ পেলেই ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। এদিকে ইরানের ওপর ইরাকের আট বছরের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গত দুই দশকে ইরান প্রতিরক্ষা ও সামরিক শক্তির দিক দিয়ে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছে গেছে যে, কেউ দেশটির ওপর আঘাত হানার সাহস করছে না। এমনকি ইরানে হামলা চালানোকে আত্মহত্যার শামিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সমরবিদরা।

এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও ইরানকে তার সমুন্নত লক্ষ্য থেকে বিরত রাখা যায় নি। ফলে পশ্চিমারা বুঝতে পেরেছে এ ধরনের পন্থা অবলম্বন করে ইরানের কোন ক্ষতি করা যাবে না। এ কারণে তারা ইরানের চিন্তাবিদ ও গবেষকদের হত্যা করে দেশটিতে মেধাশূণ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে ইরানকে জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি থেকে বিরত রাখা যায়। ইহুদীবাদী ইসরাইল বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাজে যে সিদ্ধহস্ত তা একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরলেই সহজে উপলব্ধি করা যাবে।

মিশরের পরমাণু বিজ্ঞানী ডক্টর ইয়াহিয়া আলমাশাদ ১৯৭০ এর দশকে ইরাকের পরমাণু তৎপরতায় দিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করছিলেন। তাকে ১৯৭০ সালে প্যারিসের একটি হোটেলে হত্যা করা হয়।
মিশরের অপর পরমাণু বিজ্ঞানী ড. সামিরা মুসা ১৯৫২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।
মিশরেরই আরেকজন পরমাণু বিজ্ঞানী সাইদ বাদির ১৯৮৮ সালে তার দেশের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে অবস্থিত নিজ বাসভবনের ব্যালকনি থেকে নীচে পড়ে গিয়ে মারা যান। মিশরের ক্ষেপনাস্ত্র শিল্পের উন্নয়নে ঐ বিজ্ঞানীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো।

ইসরাইলের দৃষ্টিতে ঐ তিন পরমাণু বিজ্ঞানী যদি তাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারতেন, তবে আরব দেশগুলো ইহুদীবাদী সরকারের মোকাবিলায় সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নততর অবস্থায় চলে যেতো। এ কারণে ঐ তিন মিশরীয় বিজ্ঞানী ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হাতে নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মোসাদের এই কুখ্যাতির কথা মাথায় রেখে মনে করছেন, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. মাসুদ আলী মোহাম্মাদিকে হত্যা করেছে। তবে তারা এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করলেও ইরানী জনগণ ও সরকার তাদের এই ষড়যন্ত্রে পা দেবে না। বরং উল্টো ইসলামী বিপ্লবী মূল্যবোধ ও স্বাধীনচেতা মনোভাব সমুন্নত রেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলা অব্যাহত রাখবে।#


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন