এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 07 ফেব্রুয়ারী 2010 19:26

ইসলামী বিপ্লবের সুবাদে ইরানে উন্নয়ন ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি - এক

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর এই বিপ্লবের কল্যাণে দেশটি বিভিন্ন খাত বা সেক্টরে উন্নয়নের অসাধারণ জোয়ার সৃষ্টির পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নানা শাখায় অবিশ্বাস্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ওপর অশেষ গুরুত্ব আরোপ করায় ইরানের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ জ্ঞান-বিজ্ঞানেও বিপ্লব ঘটানোর নীতি গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে ইরানের ইসলামী সরকারগুলো দেশটির নবীন ও প্রবীণ বিজ্ঞানী বা গবেষকদের সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়। শান্তিপূর্ণ পরমাণু গবেষণা থেকে শুরু করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মত বিভিন্ন ধরনের জনকল্যাণমূলক বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিশেষ করে ন্যানো প্রযুক্তি, মৌলিক কোষ বা স্টেম সেল ও ক্লোনিং সংক্রান্ত গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি অত্যন্ত দর্শনীয় বা চোখ-ধাঁধানো। উপগ্রহ ও মহাশুন্যযান বা রকেট উৎক্ষেপণ তথা মহাশুণ্য গবেষণায় ইসলামী ইরানের সাফল্য পাশ্চাত্যকে করেছে স্তম্ভিত এবং মুসলিম বিশ্বকে করেছে গর্বিত। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক নানা খাত ও সামরিক শিল্পেও ইরানের অগ্রগতি বিশ্বে ইরানের অবস্থানকে অত্যন্ত সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এ অবস্থায় ইসলামী ইরান এখন উন্নয়ন বা অগ্রগতির প্রায় সব দিকেই উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ে বা তাদের খুব কাছাকাছি পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উন্নতি ছাড়া বর্তমান যুগে কোনো দেশ বা জাতি পরনির্ভরতা কাটাতে সক্ষম নয়। ইসলামী বিপ্লবের আগে পরাধীন ও নতজানু সরকার-ব্যবস্থার কারণে ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার পথ ছিল রূদ্ধ। বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতা ও নব-উদ্ভাবনের স্বাক্ষর রাখার জন্য কেউ আগ্রহী হলেও সে সময় ইরানে অবস্থানরত মার্কিন বা পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা খুব সাধারণ বা সমান্যতম কারিগরী জ্ঞান অর্জনেরও সুযোগ দিত না ইরানী সহকর্মী বা অধীনস্ত ইরানী কর্মীদের। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের তল্পীবাহক শাহের শাসনামলে ইরানের হেলিকপ্টারগুলোতে খুব সাধারণ কোনো কারিগরী ত্রুটি দেখা দিলেও মার্কিন বা পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ছাড়া ইরানী কোনো প্রকৌশলী বা বিশেষজ্ঞ দিয়ে সেসব ত্রুটি সারানোর ব্যবস্থা ছিল না। নিজস্ব প্রতিভা বা সৃষ্টিশীলতার ব্যাপারে সে যুগের ইরানী ছাত্র বা গবেষকদের মধ্যে গভীর আত্মবিশ্বাস থাকলেও স্বৈরাচারী সরকার-ব্যবস্থা এমন প্রচারণা চালাতো যে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ছাড়া কোনো প্রযুক্তিগত প্রকল্প বা গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর এসব ক্ষেত্রেই সৃষ্টিশীলতা বিকাশের পাশাপাশি কারগরী দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগের দরজাগুলো উন্মোচিত করে দেয় বিপ্লবী সরকার। ফলে ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ঘটেছে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি।

ইসলামী ইরানের বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ জ্ঞান-বিজ্ঞানেও বিপ্লব ঘটানোর জন্য দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হওয়ায় আজ পরমাণু প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন জটিল বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খাতে কয়েকটি পরাশক্তি ও উন্নত দেশের একচেটিয়া কর্তৃত্বের দিন শেষ হয়ে গেছে। ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি গত ত্রিশ বছরে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও স্বনির্ভরতা অর্জনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামী ইরান। পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বসহ তাদের সব ধরনের আধিপত্যকামীতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য টেকসই উন্নয়ন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহনের জন্য ইরানী নেতৃবৃন্দ দৃঢ়-সংকল্প। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ইরানের অগ্রগতির অন্যতম প্রজ্জ্বোল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান অলম্পিয়াডগুলোতে ইরানী ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাপক সাফল্যের কথা উল্লেখ করা যায়। ইরানের ভেতরেও জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত সৃষ্টিশীল বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বা উৎসব নবীন ও তরুণ গবেষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জোরদার করছে।

ইসলামী বিপ্লবের পর কৃষি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ইরান ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে এইডসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইরানী বিশেষজ্ঞদের উদ্ভাবিত ওষুধগুলো ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। চিকিৎসা খাতে গবেষণা ও বিভিন্ন উদ্ভাবনের দিক থেকে ইরান এখন বিশ্বে একুশতম অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ন্যানো প্রযুক্তিতে ওষুধ উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ইরান। বিভিন্ন ধরনের নতুন বীজ, কৃষি-পণ্য ও নতুন প্রজাতির মাছ উৎপাদনেও ইরানী বিজ্ঞানীরা প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। নতজানু সরকার ব্যবস্থার কারণে বিগত দুই শতক ধরে ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে ইসলামী সভ্যতার সোনালী যুগে ইরানের বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ অবদানের জন্য বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়েছিলেন। ইসলামী ইরান সভ্যতার সেই সোনালী যুগ আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকে ইসলামী ইরান এখন বিশ্বের ১৬ টি শীর্ষস্থানীয় দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি শতকরা ছয় ভাগেরও বেশী হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ইরানের অর্থনীতি এখন অনেকাংশেই জ্বালানী তেলের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠেছে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্প উৎপাদন জোরদারের দিক থেকে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বের খ্যাতনামা বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ইরানী গবেষকদের গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংখ্যা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামী বিপ্লবের সুচনার দিকে এ ধরনের প্রবন্ধের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। বর্তমানে এই সংখ্যা ১৩ হাজারেরও বেশী। ইরান এখন বিশ্বের শতকরা ৩০ ভাগ চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা-কর্ম বা বৈজ্ঞানিক উৎপাদনের যোগানদাতা।

ইস্পাত শিল্প, গাড়ী নির্মাণ, আধুনিক বাঁধ তৈরি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, তেল শোধনাগার নির্মাণ, উন্নত মানের ওষুধ তৈরি ও ন্যানো প্রযুক্তি খাতে ইরানের বিশেষজ্ঞ বা প্রকৌশলীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে সেবা প্রদান ও অভিজ্ঞতা হস্তান্তর করতে সক্ষম।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর দিক নিদের্শনা অনুযায়ী ইরান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন ক্ষেত্রের বর্তমান সাফল্যগুলোকে কখনও যথেষ্ট বলে মনে করছে না। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষক ও ছাত্ররা গত কয়েক বছরে বহু গবেষণামূলক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছেন এবং আরো অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নে মশগুল রয়েছেন।

মহাশুণ্য গবেষণায় ইরানী বিজ্ঞানীদের সাফল্যের একটি দর্শনীয় দিক হল, রকেট উৎক্ষেপণের কাজে জমাটবদ্ধ জ্বালানী ব্যবহার। ইসলামী বিপ্লবের আলোকোজ্জ্বল দশ প্রভাত উপলক্ষ্যে গত কয়েক দিনে ইরান মহাশুণ্য গবেষণা সংক্রান্ত ৫ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সফলভাবে চালু করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ এবং উপগ্রহবাহী মোটর সি-মোরগের পরীক্ষা। ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিগুলোর লক্ষ্য সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও জনকল্যানমূলক এবং এসব কর্মসূচী কারো জন্যে হুমকি নয়। তাই ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, ইসলামী ইরানের উন্নয়নমূলক ও বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলো সারা বিশ্বের শান্তিকামী ও ন্যায়বিচারকামী জনগণেরই অগ্রগতি। ইরান পাশ্চাত্যের দেশগুলোর মত উন্নয়ন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সাফল্যকে কেবল নিজের মধ্যে সিমীত রাখতে চায় না বরং দেশটি এসব অগ্রগতি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোসহ শান্তিকামী যে কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত রয়েছে।


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন