এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 18 ফেব্রুয়ারী 2010 04:06

ইরানের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি

সম্প্রতি ইরানে উদযাপিত হয়েছে ইসলাম বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের মত এ বছরও ইরানে আলোকোজ্জ্বল দশ প্রভাত বা ঐতিহাসিক পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ই ফেব্রুয়ারিতে বিপ্লবের প্রতি সর্বস্তরের জনগণের অঙ্গীকার নবায়নের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সামরিক, অর্থনৈতিক, শিল্প ও আরো অনেক ক্ষেত্রে ইসলামী ইরানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কিছু নিদর্শন তুলে ধরা হয়। একই সময়ে চালু করা হয় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প। সাফল্যের দিক থেকে এসব প্রকল্প ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দর্শনীয়।

লেজার প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানী বিশেষজ্ঞদের সাফল্য তুলে ধরার জন্য গত তেসরা ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ ই ফেব্রুয়ারি তেহরানে একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। চিকিৎসা, কৃষি, মহাকাশ, আবহাওয়া ও সামরিক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লেজার প্রযুক্তির রয়েছে ব্যাপক ব্যবহার। এ প্রদর্শনীতে ইরানের লেজার প্রযুক্তি সংক্রান্ত জাতীয় কেন্দ্রের পরিচালক ডক্টর জামশিদ বলেছেন, ইরান বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের লেজার-রশ্মি তৈরিতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম এবং এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে এশিয়ায় প্রথম স্থানটি রয়েছে জাপানের দখলে। লেজার প্রযুক্তি খাতে বিশ্বে ইরানের অবস্থান উল্লেখযোগ্য বলে তিনি জানান।

ইরানের চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের লেজার-রশ্মি। যেমন, লেজার ব্যবহার করে রোগীদের কিডনীর পাথর ভাঙ্গা হচ্ছে। বেশী কার্যকর এই পদ্ধতিতে রোগীরা তুলনামূলকভাবে কম ব্যাথা পান। তেহরানের প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত আরেকটি লেজার-রশ্মির নাম কার্বন ডাই অক্সাইড লেজার । বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগের চিকিৎসায় এই বিশেষ লেজার-রশ্মি ব্যবহার করা হয়। লেজার থেরাপি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন ধরনের ক্ষত বা ঘা, গিট-বাত ও মাইগ্রেন জাতীয় মাথা ব্যাথাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাথা নিরাময়ের পদ্ধতিও দেখানো হয়েছে তেহরানের এ প্রদর্শনীতে। চোখের অস্ত্রপচারসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রপচারেও ব্যবহৃত হচ্ছে লেজার-রশ্মি। ইরানে চোখের অস্ত্রপচারের শতকরা নব্বুই ভাগ ক্ষেত্রে লেজার-রশ্মি ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সম্পর্কিত কিছু যন্ত্রপাতি তেহরানের ঐ প্রদর্শনীতে দেখানো হয়।

তেহরানের লেজার প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল লেজার ডিস্ক। ইরান ছাড়া গুটি কয়েক উন্নত দেশের কাছে এ প্রযুক্তি রয়েছে। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধাতব পদার্থ কাটা ও জোড়া-লাগানো বা ঝালাই করার কাজে ব্যবহৃত হয় এ যন্ত্র। লেজার অপটিক ইরানের লেজার প্রযুক্তি সংক্রান্ত জাতীয় কেন্দ্রের নির্মিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র। ধাতব পদার্থ কাটা ও জোড়া-লাগানো বা ঝালাই করার কাজ ছাড়াও ঘড়ি তৈরি, দামী পাথর কাটা ও রাডার নির্মাণসহ খুব সূক্ষ্ম পরিমাপের কাজে ব্যবহার করা হয় এ প্রযুক্তি।

ইসলামী বিপ্লবের ৩০ তম বিজয়-বার্ষিকীর মত এ বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকীও ছিল ইরানের মহাশুন্য গবেষণার অবিশ্বাস্য সাফল্যের স্মারক। গত বছরের এমন সময়ে বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করে ইরান মহাশুন্যে উৎক্ষেপণ করেছিল আশা বা উমিদ নামের সম্পূর্ণ নিজস্ব-নির্মিত যোগাযোগ উপগ্রহ। ঐ উপগ্রহ উৎক্ষেপণে সাফির বা দূত-দুই নামের ইরানের নির্মিত রকেট ব্যবহৃত হয়েছিল।

চলতি বছর ঐতিহাসিক পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ই ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে উৎক্ষেপণ করা হয় "কাভেশগার-সে" বা অনুসন্ধানী-তিন নামের বিশেষ উপগ্রহ। এতে ছিল কয়েকটি জীবিত প্রাণীবাহী ক্যাপসুল। ফলে ইরান মহাশুন্যে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতির কাজে বেশ এগিয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। "কাভেশগার-সে"ছাড়াও ইসলামী বিপ্লবের ৩০ তম বিজয়-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরান আরো ৩ টি উপগ্রহ এবং উপগ্রহবাহী রকেট "সি-মোরগ" উৎক্ষেপণ করেছে। উপগ্রহবাহী মোটর "সি-মোরগ" "সাফির'' বা "দূত-দুই''র উন্নততর মডেল। এটি ১০০ কেজি ওজনের কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবী থেকে ৫০০ কিলোমিটার উঁচু কক্ষপথে স্থাপন করতে সক্ষম।

বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষ্যে "তুলু"বা উন্মেষ নামের একটি উপগ্রহ উদ্বোধন করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ডঃ মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। পৃথিবীর নানা ছবি তুলে তা পৃথিবীতে পাঠানো ইরানের জাতীয় এ উপগ্রহের কাজ। এসব ছবি দেখে বিভিন্ন ধরনের মানচিত্র তৈরি করা ছাড়াও বোঝা যাবে যে পৃথিবীর সম্পদগুলো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও জানা যাবে জনবসতি, আবহাওয়া, কৃষি ও বনবিদ্যা সম্পর্কিত নানা তথ্য।
ইসলামী বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরান "মেজবাহ-দুই" বা বাতি-দুই নামের আরো একটি নিজস্ব উপগ্রহ প্রদর্শন করেছে। এটি একটি যোগাযোগ উপগ্রহ। এ ছাড়াও একই উপলক্ষ্যে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্ররা "নাভিদ" বা সুসংবাদ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করেছে। এ উপগ্রহ পৃথিবীর খুব নিখুঁত ছবি তুলতে সক্ষম।

এদিকে এসব উপগ্রহ উদ্বোধনের অনুষ্ঠানেই ইরানের প্রেসিডেন্ট ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহৃত তেহরানের একটি পরমাণু চুল্লীতে শতকরা ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরান ঐ চুল্লীর জন্য প্রয়োজনীয় শতকরা ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ শুরু করার কথা এক চিঠির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ-কে জানিয়ে দিয়েছে। তেহরান এই পরমাণু চুল্লীর জ্বালানী বিদেশ থেকে কিনতে আগ্রহী বলে সাত মাস আগেই আই এ ই এ-কে জানিয়ে দিয়েছিল। ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে ভুগছেন এমন প্রায় সাড়ে আট লক্ষ ইরানী নাগরিকের ওষুধ তৈরির উদ্দেশ্যে এই উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এই চুল্লী নির্মিত হয়েছিল ইসলামী বিপ্লবের আগে এবং যুক্তরাষ্ট্রই এ চুল্লীর জন্য জ্বালানী সরবরাহ করতো। এক বছর পর এই জ্বালানী শেষ হয়ে যাবে বিধায় এখানে নতুন জ্বালানীর প্রয়োজন হবে। ইরান এখনও স্বল্প মাত্রার নিজস্ব ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে বিদেশ থেকে শতকরা ২০ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলেও ঘোষণা করেছে। আসলে পশ্চিমা দেশগুলো এ ব্যাপারে নানা তালবাহানা ও অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করায় ইরান নিজেই এই জ্বালানী উৎপাদন শুরু করতে বাধ্য হয়।

বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তাদের দেয়া শর্ত না মেনে ইরান যদি ইউরেনিয়াম বিনিময় না করে তাহলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে তেহরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। কিন্তু ইরানী জাতি স্বাধীনচেতা ও প্রতিরোধকামী মনোভাব নিয়ে আরো একবার এসব হুমকীকে অগ্রাহ্য করলো। ইরান গত নয়ই ফেব্রুয়ারি থেকে আই এ ই এ'র নজরদারীর আওতায় শতকরা ২০ মাত্রায় ইউরেনিয়াম উৎপাদন শুরু করে।

ইসলামী বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরান দুটি নতুন ক্ষেপনাস্ত্রও পরীক্ষা করেছে। এর একটি ছিল "তুফান-৫'' নামের সাঁজোয়াযান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যটি ছিল হেলিকপ্টার বিধ্বংসী "কায়েম" নামের ক্ষেপণাস্ত্র। লেজার-নিয়ন্ত্রিত কায়েম ক্ষেপনাস্ত্র খুব নীচের উচ্চতায় থাকা শত্রুর লক্ষ্যবস্তুগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম। এটি শত্রুর ইলেকট্রনিক বাধাও এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা রাখে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচী দপ্তর এক রিপোর্টে বলেছে, ইরান গত তিন দশকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উন্নয়ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে এবং বিশ্বে এগিয়ে যাবার এই দ্রুত গতির ক্ষেত্রে ইরান তৃতীয় স্থানে রয়েছে। উল্লেখ্য, ইরানের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইরান ঈমান ও ব্যাপক আত্মবিশ্বাসের বলেই এই অবিশ্বাস্য অগ্রগতি অর্জন করলো। #


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন