এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2010 14:25

ফাজ্‌র ভিজ্যুয়াল আর্ট উৎসব

ইরানের ইতিহাসে লক্ষ্য করা যাবে সবসময়ই বা সর্বযুগেই শিল্প এবং আধ্যাত্মিকতার মাঝে খুব নিকট সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। সত্যি বলতে কী, ইরানী শিল্পকলার নেপথ্য চালিকাশক্তির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ছিল ধর্মীয় চিন্তা- চেতনা। তবে এই আধ্যাত্মিক বিষয়টি ইরানী শিল্পের ইতিহাসের কাল-পরিক্রমায় বিভিন্নভাবে এভং বিভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। যাই হোক গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে আজকের আসরে কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাহলভি শাসনের পতন এবং ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মধ্য দিয়ে বহু শিল্পী সামাজিক পরিস্থির প্রভাবে প্রভবিত হয়েছিলেন এবং ইসলামী বিপ্লবকে উপজীব্য করে বহু সৃজনশীল শিল্পকর্ম উপহার দিয়েছিলেন। তবে ইসলামী বিপ্লব বিষয়ক শিল্পকর্মগুলোকে তাঁরা ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক ভিত্তি তথা আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিমূলেই গড়ে তুলেছিলেন। যার ফলে বিপ্লবী শিল্পগুলোকে ইরানের ইতিহাসে শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সোনালী অধ্যায় বলা যেতে পারে। কেননা বিগত তিন দশকের শিল্পীগণ শিল্পক্ষেত্রে নতুন একটি মাত্রার সংযোজন ঘটিয়েছেন। একদিকে ইরানের প্রাচীন শিল্পকলার সমৃদ্ধ অধ্যায় অপরদিকে বিপ্লবের মতো কালজয়ী একটি পরিবর্তন তথা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও ভিত্তিগুলো-এ দু'য়ের সমন্বয় ইরানী বিপ্লব প্রজন্মের শিল্পীরা এতাটা দক্ষতার সাথে করেছেন যে শিল্পের জগতে একটা নতুন যুগেরই সূচনা ঘটে গিয়েছিল। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ইরানের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট এই শিল্পকে ইসলামী বিপ্লবের শিল্প বলে অভিহিত করা যেতে পারে।

ইসলামী বিপ্লবের শিল্পকে বেশ কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যেতে পারে। যেমন ঐতিহাসিক বিবর্তনের দিক থেকে, দর্শনীয় কাঠামোর দিক থেকে, কর্মতৎপরতা বা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াগত দিক থেকে। ইরানের ভিজ্যুয়াল শিল্পগুলোর ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। যার শেকড় বেশ প্রাচীনকালের গভীরে প্রোথিত। প্রাচীন এই শিল্পকলার সমৃদ্ধ ক্যানভাসে প্রকৃতি, মানুষের বিশ্বাস এবং বিশ্বের সাথে মানুষের যে সামগ্রিক বিনিময় সবই বিচিত্র আঙ্গিকে ফুটে উঠেছে। যেমন চিত্রকর্ম, ভাষ্কর্য, মৃৎশিল্প ও সিরামিক শিল্প, চারুলিপীকর্ম বা খ্যালিগ্রাফি এমনকি সর্বাধুনিক শিল্পশাখা যেমন ক্যারিকেচার, ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক্স ইত্যাদি সকল মাধ্যমেই এইসব বিষয়বস্তু ফুটে উঠেছে। ইরানী চিত্রকর্ম অবশ্য আরো কিছু মাধ্যমেও লক্ষ্য করা যাবে। যেমন পাথর কাটা শিল্প, ধাতব শিল্প, গালিচা এবং এ ধরনের আরো বহু হস্তশিল্পে যুগ যুগ ধরে ইরানের লোকজন তাদের শিল্পধারা সংরক্ষণ করেছে। সেইসব শিল্পধারা বিপ্লবের শিল্পীদের কাছে মহামূল্যবান উত্তরাধিকারী সম্পদের মতো ছিলো। সেগুলোর সমন্বয়ে বিপ্লবী আদর্শের সংমিশ্রণে নতুন একটি সৃজনশীল শিল্পরূপ তারা দিয়েছেন।
বিপ্লবের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটি অধিকতর সমৃদ্ধি পেয়েছে তা বোধ হয় চিত্রশিল্প। বিপ্লবী ধারার চিত্রশিল্পীরা বিশেষ করে যারা ফাইন আর্টসের তরুণ শিক্ষার্থী তারা ধর্মীয় শিক্ষা এবং বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লব পূর্ববর্তী বিভিন্ন বিষয়কে তাদের শিল্পকর্মে নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের শিল্পকর্মগুলো ছিল গণজাগরণমুখী। তাদের শিল্পকর্মগুলো সামাজিক এবং বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কে সহজবোধ্যভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরেছিল যার ফলে দর্শকগণ খুব সহজেই সেগুলোর অর্থ বুঝে উঠতে সক্ষম হয়েছিলো।

শহীদদের প্রতিকৃতি আঁকা,সংগ্রামীদের চেহারা আঁকা এবং বিভিন্ন অর্থবহ আধ্যাত্মিকতার আদর্শ চিত্র ফুটিয়ে তোলা ইত্যাদি ছিল বিপ্লব বিজয়ের প্রাথমিক বছরগুলো এবং সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সমকালীন চিত্রশিল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বড়ো বড়ো ক্যানভাসে এবং বিশাল বিশাল দেয়ালে বিপ্লবী জনতার প্রতিরোধ এবং ইরানী দুঃসাহসী যোদ্ধাদের অভিযানের চিত্র অঙ্কণ করা হয়েছিল সে সময়। যুদ্ধের পর অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ইরানের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের দিকে প্রত্যাবর্তন এবং জাতীয় পরিচিতি অর্জনের চেষ্টা ইত্যাদি বিষয়কে মূর্ত শিল্পজগতে চিত্রশিল্পীগণ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। এ সময়কার শিল্পকলা সম্পর্কে ইরানের বিখ্যাত শিল্পী অয়িদিন অগ্‌দশ্‌লু বলেছেনঃ আধুনিকতা এবং ঐতিহ্যের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষ চাই তা বিপ্লব পূর্ববর্তী কালের শিল্পেই হোক অথবা বিপ্লব পরবর্তীকালের শিল্পে সবসময়ই ছিল এবং এখনো আছে। ভিজ্যুয়াল আর্টসের ক্ষেত্রে সকল দেশেই এই বিষয়টি সমানভাবে পরিলক্ষিত হয়। তবে বিশেষ করে বিপ্লবের শিল্পে এ বিষয়টি একেবারেই স্বতন্ত্র। কেননা এই ধারার শিল্প স্থানীয় এবং জাতীয় উভয় পরিচিতিকে তুলে ধরে এবং পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প ধারার প্রতি অনুরাগকে নিরুৎসাহিত করে। সেজন্যে প্রাচীন এবং আধুনিকতার মধ্যকার সংঘর্ষকে যদি তুলেও ধরা হয়ে থাকে তা-ও এই জাতীয়তাবোধ এবং আত্মপরিচিতির স্বাতন্ত্র্যের পরিপ্রেক্ষিতেই, কোনোভাবেই তা পাশ্চাত্যে বিরাজমান সাংঘর্ষিক রূপে নয়।
তিনি বিপ্লবী ধারার শিল্পের সবচে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে শিল্পকে একটা বিশেষ শ্রেণী থেকে জনগণের মাঝে নিয়ে আসাকেই মনে করেন। এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য হলোঃ বিপ্লবের শিল্প চেষ্টা করেছে শিল্পকে গণমানুষের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসতে এবং তারা এক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সফলও হয়েচে। শিল্প যদিও কতিপয় সৃজনশীল ব্যক্তির মাধ্যমে সৃষ্টি হয় তারপরও তার বিষয়বস্তু কিন্তু গণমানুষের দৃষ্টিভঙ্গির খুব কাছাকাছি থাকে। শিল্পের প্রতি নারীসমাজের আগ্রহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা ছিল এবং শিল্পক্ষেত্রে নারীদের এই সংখ্যা বৃদ্ধি রীতিমতো বিস্ময়কর। এ কারণে দৃষ্টিভঙ্গিগত বৈচিত্র্যও লক্ষ্য করা গেছে এবং বিপ্লব পরবর্তীকালের শিল্পমর্যাদা বিপ্লব পূর্ববর্তীকালের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

ফাজ্‌র ভিজ্যুয়াল আর্টস ফেস্টিভাল-২ চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের ১ তারিখে শুরু হয়েছে। হেতরান আর্ট মিউজিয়ামে দেশী-বিদেশী বহু শিল্পী এবং শিল্পানুরাগী অতিথিদের জমজমাট উপস্থিতির মধ্য দিয়ে এই উৎসবটি শুরু হয়। এই উৎসবে আলাদা বিভাগে চিত্রশিল্প, ফটোগ্রাফি, ক্যালিগ্রাফি, ভাষ্কর্য, মৃৎ শিল্প এবং সিরামিক শিল্পের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এবং তেহরানের বিভিন্ন মিউজিয়াম এবং ছবির গ্যালারিতে প্রায় আড়াই হাজার শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। তেহরান ছাড়াও খুররামশাহর, সেমনন, গোরগা'ন এবং ইয়ায্‌দ শহরেও দর্শনার্থীদের জন্যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় দশ হাজার শিল্পকর্ম উৎসবের দফতরে জমা পড়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে ভালো ভালো শিল্পকর্মগুলোই নির্বাচিত হয়েছে।

নয় বছরের শিশুর চিত্রকর্ম থেকে শুরু করে ৮৫ বছরের বৃদ্ধেরও শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে এই উৎসবে। বিশ্বের ৭৯ দেশের শিল্পীরা এতে অংশ নিয়েছেন। উৎসবের দুটি বিভাগ আছে। একটি প্রদর্শনী এবং অপরটি প্রতিযোগিতা। উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিজ্যুয়াল আর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সম্মেলন ও সেমিনার। এগুলোতে বিভিন্ন শিল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আলোচনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ৩ মার্চ পর্যন্ত এই উৎসব চলবে বলে উৎসব ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন