এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 27 মার্চ 2010 22:46

ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও গতিশীলতা

১৯৭৯ সালে ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব ইরানে রাজতান্ত্রিক সরকার-ব্যবস্থার পতন ঘটানোর পাশাপাশি বিশ্ব ও আঞ্চলিক সমীকরণে অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ইসলামী গণ-শাসন ব্যবস্থা ইসলামী বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল। ইরানের জনগণ তাদের নানা আন্দোলনে বহুবার ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবী জানিয়েছিল। ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পরই ১৯৭৯ সালের পয়লা এপ্রিল ইরানের সরকার ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণের জন্য গণভোটের আয়োজন করেন। গণভোটে ইরানের শতকরা ৯৮ দশমিক দুই ভাগ ভোটার ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানান। আর এ জন্যই প্রতি বছরের পয়লা এপ্রিল ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয়।

ইরানের ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দু'টি মূলনীতি এর নাম থেকেই স্পষ্ট। অর্থাৎ গণ-শাসন ও ইসলামী বৈশিষ্ট্য। ইরানে এমন সময় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে যখন বিশ্বের অন্য কোনো দেশে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ওপর ধর্মের কর্তৃত্বের কোনো নজীর ছিল না। বরং ধর্ম থেকে রাজনীতি আলাদা- এ নীতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রগুলো পরিচালিত হচ্ছিল। ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় জনগণের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
ইরানের সংবিধানের ভূমিকায় সরকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ইসলামের দৃষ্টিতে সরকার কোনো বিশেষ শ্রেণী, গ্রুপ বা ব্যক্তির কর্তৃত্ব নয়, বরং তা একই আদর্শ ও ধর্মের অনুসারী একটি জাতির রাজনৈতিক আদর্শের সম্মিলন, যা এই জাতিকে আদর্শিক উন্নয়নের মাধ্যমে মহান আল্লাহর অভিমুখে এগিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে নিজেকে সুসংগঠিত বা সংঘবদ্ধ করার সুযোগ দেয়।

মহান আল্লাহ গোটা সৃষ্টি-জগত ও মানুষের ওপর কর্তৃত্বের অধিকারী। তার পথ-নির্দেশনা বাস্তবতা-ভিত্তিক এবং তিনি সবচেয়ে ভালো পন্থায় মানুষের কল্যাণ সুনিশ্চিত করতে চান। বিশ্বজগতের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব নিজ ভাগ্য নির্ধারণে মানুষের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ, মহান আল্লাহই মানুষকে নিজের ভাগ্য নির্ধারণের স্বাধীনতা দিয়েছেন। ইরানের সংবিধানের ৫৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, "বিশ্ব-জগত ও মানুষের ওপর মহান আল্লাহই চূড়ান্ত কর্তৃত্বের অধিকারী। আর তিনিই মানুষকে নিজের সামাজিক ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার দিয়েছেন। কেউই মানুষের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা রাখে না, কিংবা তাদের এ অধিকারকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে না।"
ইরানের জনগণ গত একত্রিশ বছরে গড়ে প্রায় ৩১ টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজ ভাগ্য-নির্ধারণের অধিকার চর্চা করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইরানে জনগণের স্বাধীনতা রয়েছে। ইরানের ইসলামী সরকার-ব্যবস্থার দর্শনে মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার চর্চা করা হয়।

ইরানের জনগণ ইসলামী মূল্যবোধ এবং বিশ্বাস বজায় রেখে নিজ রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাধীন। ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ধারণা মানবীয় মর্যাদার প্রতি সম্মান-ভিত্তিক। পশ্চিমা লিবারেল বা কথিত উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সাথে ইসলামী গণ-শাসন ব্যবস্থার পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট । ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাধীনতা এমন একটি খোদায়ী নেয়ামত যা কেড়ে নেয়া যায় না। ইরানের সংবিধানে জনগণ ও সংবাদ-মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু একইসাথে নাগরিক-স্বাধীনতা এবং সমাজ ও ব্যক্তির নিরাপত্তায় ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী আচরণের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা টানা হয়েছে। এ কারণেই কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা এবং কারো মনের কথা বা বিশ্বাস জানার চেষ্টা করা নিষিদ্ধ। ইরানের সংবিধানের বিশ নম্বর ধারায় এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে জাতির সব শ্রেণীর নারী ও পুরুষের জন্য আইনী সুরক্ষার সমান ব্যবস্থা রয়েছে এবং রাষ্ট্রের সকল নারী, পুরুষ মানবিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমান অধিকার রাখে।

গণভোট ও নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নেয়া ইরানে জনগণের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত। এ প্রসঙ্গে ইরানের শাসনতন্ত্রের ছয় নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ইসলামী ইরানে রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো জনগণের রায় বা মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। প্রেসিডেন্ট, সংসদ তথা মজলিসে শুরায়ে ইসলামীর সদস্য, প্রাদেশিক, নগর, জেলা ও গ্রাম পরিষদ এবং এ ধরনের অন্যান্য পরিষদের সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধানে বর্ণিত অন্য ধারাগুলোর আলোকে গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো পরিচালনা করতে হবে।
ইরানের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ইরানের সরকার ও মুসলিম জনগণ অমুসলমানদের সাথে সুন্দর এবং ন্যায়-বিচারপূর্ণ আচরণ করাসহ তাদের সকল মানবীয় অধিকার পালন করতে বাধ্য। এ প্রসঙ্গে ১৩ নম্বর ধারায় এসেছে, ইরানে কেবল জরাথ্রুস্ত, ইহুদি এবং খৃষ্টানরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃত। এই সম্প্রদায়গুলো আইনের সীমারেখার মধ্যে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উদযাপনে এবং নিজস্ব ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ধর্ম চর্চায় ও ধর্মীয় শিক্ষাদানে স্বাধীন।
ইরানের জাতীয় সংসদে প্রত্যেক ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আসন রয়েছে। তারা অন্য সাংসদদের মতই রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতামত দেন ও সিদ্ধান্ত নেন।
ইরানের সংবিধানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাসহ সব বিষয়ে স্বাধীনতা বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এ সংবিধানের ভাষায় ইরানে স্বাধীনতা, মুক্তি, সংহতি বা ঐক্য ও ভৌগলিক অখন্ডতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং এসব রক্ষা করা সরকার ও জাতির দায়িত্ব ।
ইরানের গণ-শাসন-ব্যবস্থা ইসলামী হওয়ায় এখানে এমন যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানো হয় যে তিনি ইসলাম সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞানের পাশাপাশি এমন দূরদৃষ্টি ও সময়-সচেতনতা রাখেন যাতে এই পূর্ণাঙ্গ ধর্মের মূল্যবোধগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমস্ত দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামী পরিভাষায় ইনিই ওলিয়ে ফক্বিহ বা প্রধান ধর্মীয় আইন-বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা। ইসলামের মূল দায়িত্বগুলো পালনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা তাঁর দায়িত্ব। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ পরিষদই তাঁকে নির্বাচিত করেন। শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় আইন-বিশেষজ্ঞ চেনা সাধারণ জ্ঞান-সম্পন্ন আম জনতার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় বলেই তাঁকে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়। অন্য কথায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাও জনগণের পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিতন হন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ পরিষদ ওলিয়ে ফক্বিহ'র তৎপরতার ওপর নজর রাখে এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অক্ষমতার জন্য তাঁকে পদচ্যুতও করতে পারে। সংবিধান মতে ওলীয়ে ফক্বিহকে ন্যায়-পরায়ন, খোদাভীরু, যুগ ও এর চাহিদা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানী, সাহসী, বিচক্ষণ ও নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য হতে হবে। এ ছাড়াও সংবিধান মতে রাষ্ট্রের সামগ্রীক নীতি নির্ধারণ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ বা পদচ্যুতি, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং সাংবিধানিক অভিভাবক পরিষদের ইসলামী আইন-বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দান ওলিয়ে ফক্বিহ'র কিছু প্রধান দায়িত্ব। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করতে পারেন এবং এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হল রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী পরিষদ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এইসব ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনিও আইনের দৃষ্টিতে অন্যদের সমকক্ষ। #


মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন