এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 16 জুন 2010 14:02

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন : অনন্য এক বীরত্বগাঁথা

ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর গত তিন দশকেরও বেশী সময়ে এদেশের জনগণ অনেক মধুর ও বেদনাবিধুর ঘটনাপ্রবাহ পেছনে ফেলে এসেছে। এসব ঘটনাপ্রবাহে ইরানী জনগণের সতর্ক অবস্থান ও বিচক্ষণতা প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি তারা এসব ঘটনা থেকে অনেক শিক্ষা অর্জন করেছে। ইসলামী বিপ্লবের পর যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইরানী জনগণের জন্য শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রেখে গেছে, তার মধ্যে গত বছর ১২ই জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাবলী ছিলো অন্যতম। ঐ নির্বাচনে জনগণের উপস্থিতি ছিলো এক কথায় নজীরবিহীন। নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে থেকে ঐ নির্বাচন সম্পর্কে জনমনে উৎফুল্ল ভাব লক্ষ্য করা গেছে। আজ আমরা ইরানের দশম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

নির্বাচনের দিন ইরানের জনগণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করে। ঐদিন ইরানের মোট ভোটারের শতকরা ৮৫ ভাগ অর্থাৎ ৪ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নির্বাচনে জনগণের এই বিপুল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, তারা ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও এর মূল্যবোধের প্রতি অনুগত। ঐ নির্বাচনে জনাব মাহমুদ আহমাদিনেজাদ শতকরা ৬৩ ভাগ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির কারণে এবং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার জন্য ইরানের জনগণ যখন উল্লাস প্রকাশ করছিলো, তখন কিছু ঘটনা নির্বাচনের ঐ সাফল্যকে খানিকটা হলেও ম্লান করে দেয়। ঐ নির্বাচনের কিছু প্রার্থী কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নির্বাচনের পর পরাজিত প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কারচুপির অভিযোগ একটি স্বাভাবিক বিষয়। ঐসব দেশে আইনগত প্রক্রিয়া এবং আলোচনার মাধ্যমে সে অভিযোগ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানও হয়ে যায়। কিন্তু ইরানে গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যে অভিযোগ তোলা হয় তাতে কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। পরাজিত প্রার্থীরা কারচুপির অভিযোগে নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের দাবি জানান। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তারা তাদের অভিযোগের পক্ষে তেমন কোন দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন নি এবং যতটুকু দলিল উপস্থাপন করেছেন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাব দেয়া হয়েছে।

এ সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য সকল পক্ষের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে না। এদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, এখানে কারচুপির কোন সুযোগ নেই। তারপরও কারো যদি সংশয় থাকে এবং তিনি যদি তার অভিযোগের স্বপক্ষে উপযুক্ত দলিল উপস্থাপন করতে পারেন, তবে সে ব্যাপারে তদন্ত করে দেখতে হবে। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী প্রতিবাদী প্রার্থীদের অভিযোগের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি নির্দেশ দেন। এরপর ঐ নির্বাচনে গৃহিত ভোটের শতকরা ১০ ভাগ পুনগণনা করে দেখা যায় যে, অভিযোগকারী প্রার্থীদের অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। কিন্তু এরপরও ঐ নির্বাচনের দুই জন প্রার্থী নির্বাচন বাতিলের দাবিতে অটল থাকেন। তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই রাস্তায় বিক্ষোভ দেখানোর জন্য তাদের সমর্থকদের প্রতি আহবান জানান।
২০০৯ সালের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে যে বিষয়টি জটিল করে তোলে তা হলো ঐ সময় প্রতিবাদী দুই প্রার্থীর প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার ও গণমাধ্যমের প্রত্যক্ষ সমর্থন ঘোষণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সরকারগুলো ইরানে সরকারী সম্পদ বিনষ্টকারী ও নাশকতামূলক তৎপরতায় অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে তাদেরকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে উস্কে দিতে থাকে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলিও বিভিন্নভাবে সন্ত্রাসীদের প্রতি সমর্থন জানায় এবং তাদেরকে এ কাজ চালিয়ে যেতে উস্কানি দেয়। এসব গণমাধ্যমের মধ্যে নিউজ চ্যানেল বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা এবং ইন্টারনেট ওয়েবসাইট ফেইসবুক, টুইটার ও ইউটিউবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এসব গণমাধ্যম এখনো ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে।

পশ্চিমা সরকার ও গণমাধ্যমগুলোর ইরান বিরোধী প্রচারণা থেকে এদেশের সরকার ও জনগণ দ্রুত এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে যে, পশ্চিমারা ইরানে একটি রঙ্গিন বিপ্লব সংঘটিত করতে চায়। এর আগে ইউক্রেন ও জর্জিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে পশ্চিমারা এ ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছে। সাধারণত নির্বাচনকে রঙ্গিন বিপ্লব ঘটানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমারা। কোন দেশের নির্বাচনে পশ্চিমাদের সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী না হলে তারা ঐ নির্বাচনের ফলাফলের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করে। দেশটির প্রতিবাদী প্রার্থী ও তার সমর্থকদের রাস্তায় নেমে নাশকতামূলক তৎপরতা চালাতে উৎসাহিত করে। এক পর্যায়ে তীব্র চাপের মুখে সরকার পশ্চিমা সমর্থিত প্রার্থীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরকম রঙ্গিন বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা পশ্চিমা সরকারগুলোর অধিকাংশই ব্যর্থ হয়েছে এবং কোন কোন সরকারের পতনও ঘটেছে।
পশ্চিমা সরকারগুলোর কাছে ইরানে সেরকম একটি বিপ্লব ঘটানো ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, ইরানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার তাবেদার সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করার মাধ্যমে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিলো এবং এখনো দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। এ কারণে গত বছরের জুন মাসের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে উৎখান অথবা অন্তত দুর্বল করে ফেলার সুবর্ন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু ইরানের ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমাদের আকাঙ্খার বিপরীত দিকে ধাবিত হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সহিংসতাকারীদের উস্কে দিলেও অতি দ্রুত প্রতিবাদকারীরা নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। অনেকে দ্রুত উপলব্ধি করতে পারে যে, তাদের প্রতি পশ্চিমারা যে সমর্থন দিচ্ছে তা ইরানের জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি। এসব মানুষ ধীরে ধীরে সহিংসতাকারীদের পেছন থেকে সরে যায়। ফলে মুষ্টিমেয় যেসব মানুষ সহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো তারাও সমর্থকের অভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে বিরোধী পক্ষের কিছু নেতৃস্থানীয় লোকের বিশ্বাসঘাতক চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। তারা ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেইনি (রহঃ) ও ইসলামী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ করে। গত বছরের শেষদিকে ১০ই মহররম পবিত্র আশুরার দিন সহিংস আন্দোলনকারীরা ইসলাম অবমাননাকর কাজে হাতে দেয়। ঐদিন চূড়ান্তভাবে প্রতিবাদকারীদের বিশ্বাসঘাতক চরিত্র উন্মোচিত হয়ে পড়ে এবং ইরানের জনগণ তাদের প্রতি মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়। তারা গত বছরের ৩০শে ডিসেম্বর তেহরানে বিশাল জনসমাবেশ করে সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে। তেহরানের ঐ জনসমাবেশে কয়েক কোটি জনতা অংশগ্রহণ করে।

সরকারের প্রতি ইরানী জনতার ঐ অভূতপূর্ব সমর্থনের পর পশ্চিমারা সরকার বিরোধীদের প্রতি উস্কানি দেয়ার মাত্রা কমিয়ে দেয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১১ই ফেব্রুয়ারি ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের দিন আরো একবার কোটি কোটি জনতা রাস্তায় নেমে ইসলামী শাসনব্যবস্থার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে। এরপর বিরোধী পক্ষের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের শাসনব্যবস্থা বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির মাধ্যমে পশ্চিমাদের আরেকটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়।# {jcomments on}

এই ক্যাটাগরিতে আরো: « রুমীর গল্প ( ১-২০ )

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন