এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 24 আগস্ট 2010 12:18

ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্য তালিকায় ইরানের আরো দু'টি ঐতিহাসিক স্থাপনা

ইরান ইসলামী সভ্যতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তাই এ দেশটিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও বাজারসহ ইসলামী সভ্যতার অনেক অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন। যুগে যুগে শিল্প-প্রেমিক ও পর্যটকদের বিমুগ্ধ এবং অভিভূত করেছে এইসব নিদর্শন। এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন বিশ্ব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবেও বিবেচিত হয়। বিংশ শতকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষ করে জাতিসংঘের মত বিশ্ব সংস্থার নানা শাখা গঠিত হবার পর বিশ্বের দেশগুলোর প্রাচীন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলো রক্ষা করা এবং সেসবের পরিচয় তুলে ধরার জন্য প্রচেষ্টা জোরদার হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো পর্যবেক্ষণ করে আসছে। সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং এসব নিদর্শনকে গোটা মানবজাতিরই অভিন্ন উত্তরাধিকার হিসেবে তুলে ধরছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এ পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে ৮৯০টি ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শন। এসবের মধ্যে স্থান পেয়েছে ইরানের মোট ১২টি নিদর্শন। এ নিদর্শনগুলো হল যথাক্রমে ফার্স প্রদেশের পার্সেপলিস বা তাখতে জামশিদ ও পাসারগাদ, খুজিস্তানের চোগাজামবিল উপাসনা কমপ্লেক্স, ইস্ফাহানের ইমাম স্কয়ার তথা নাক্বশে জাহান, পশ্চিম আযারবাইজানের তাখতে সোলায়মান, কেরমানের বম নামক দূর্গ, জানযন প্রদেশের সুলতানিয়ে গম্বুজ, কেরমানশাহ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত হাখামানেশীয় রাজবংশের শিলালিপি ও চিত্র খোদাইকৃত পুরাকীর্তি, উত্তর-পশ্চিম ইরানের তিনটি আর্মানীয় গীর্যা এবং শুশতার অঞ্চলের পানি-ব্যবস্থাপনার নিদর্শন।
সম্প্রতি ইউনেস্কো ইরানের তাব্রিজের বাজার এবং আর্দেবিলে অবস্থিত শেখ সাফিউদ্দিন আর্দেবিলির মাজারকেও বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। আমরা আজ ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্য তালিকায় স্থান-পাওয়া ইরানের এ দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনার পরিচয় তুলে ধরব।

তাব্রিজ ইরানের পূর্ব আযারবাইজানের প্রধান শহর। বাজারে তাব্রিজ বা তাব্রিজের বাজারের অবস্থান সিল্ক রোডে এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অক্ষগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্রে। ইরানের ঐতিহ্যবাহী বাজার সংস্কৃতি ও বাণিজ্য-ব্যবস্থাপনার এক আদর্শ দৃষ্টান্ত এই বাজার। পরস্পর সংলগ্ন এই বাজারের ওপরে রয়েছে সুদৃশ্য ছাদ। এটাই বিশ্বে ছাদযুক্ত বৃহত্তম বাজার। স্থাপত্য-শৈলী ও বাহ্যিক সৌন্দর্য্যের দিক থেকেও এটি বিশ্বে অনন্য। অষ্টম হিজরীর বিখ্যাত লেখক ও ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ মুস্তফি তার লেখায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে তাব্রিজ এবং এই শহরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে তাব্রিজ বাজারের কথা উল্লেখ করেছেন। এ বাজার নির্মিত হয়েছিল ইসলামী শাসনামলের প্রথম দিকে। বেশ কয়েকবার এ বাজারের সংস্কার করা হয়। সর্বশেষ সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয় হিজরী দ্বাদশ শতকে। তাব্রিজ বাজারের দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার এবং এর আয়তন দশ লক্ষ বর্গ মিটার। এ বাজারের রয়েছে প্লাস্টারের কারুকাজ করা দর্শনীয় কিছু গম্বুজ ও খিলান। নকশা ও ইটের কারুকাজও অপূর্ব সুন্দর। দোকান-ঘরগুলোর সংখ্যা ও সেগুলোর দরজার সাজ-সজ্জা বা কারুকাজও দর্শকদের অভিভূত করে।

তাব্রিজ শহরের প্রধান চারটি প্রবেশ-পথ রয়েছে তাব্রিজ বাজারের সাথেই। সিল্ক-রোডের ব্যবসায়ীরাসহ অন্য যাত্রী ও জনতা এইসব প্রবেশ-পথ দিয়েই তাব্রিজে প্রবেশ করত। বিভিন্ন আবাসস্থল, সরকারী ভবন, স্থাপনাও গড়ে উঠেছে এই বাজারের আশ-পাশেই। এই বাজারের পাশে গড়ে উঠেছে ২৩টি সরাইখানা, ২৮টি মসজিদ, ৮টি স্কুল, ৫টি গণ-গোসলখানা এবং একটি ব্যায়ামাগার।
তাব্রিজ বাজারের প্রধান গম্বুজের নাম তিইমচেহ মুজাফফরিয়ে। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৮৭ সাল বা ১৩০৫ হিজরীতে। এই বাজারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বা কেনা-বেচার প্রাণকেন্দ্র এটি। তাব্রিজের কার্পেট প্রাকৃতিক উপাদান ও অকৃত্রিম নকশার জন্য বিশ্ব-বিখ্যাত। এসব বিশ্বমানের কার্পেট পাওয়া যায় তিইমচেহ মুজাফফরিয়ে গম্বুজ এলাকায়। এই বাজার এখনও তার অতীত ঐতিহ্য অনেকাংশে ধরে রেখেছে। তাব্রিজ বাজারে গোটা তাব্রিজ প্রদেশের প্রায় তিনভাগের দুই ভাগ বাণিজ্য লেনদেন সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন পেশার লোকজন এই বাজারে সক্রিয় এবং এখানকার বেশীর ভাগ দোকানই তিন তলা বিশিষ্ট। নীচের তলায় থাকে পণ্যের গুদাম, দ্বিতীয় তলায় থাকে মূল দোকান এবং তৃতীয় তলায় রয়েছে ব্যবসায়ীদের বিশ্রামের কক্ষ। বর্তমানে তাব্রিজ বাজারে রয়েছে ৫ হাজার ৫০০ টি দোকান ও ৪০টি পেশাজীবী গ্রুপ।

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আর্দেবিল শহরে রয়েছে শেখ সাফি উদ্দিন আর্দেবিলির মাজার। ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্য তালিকায় ১২ নম্বরে স্থান পেয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। শেখ সাফি উদ্দিন ছিলেন ইরানে সাফাভী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্রাট প্রথম শাহ ইসমাইলের দাদা। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন ৬৫০ হিজরী তথা ১২৫২ সালে এবং বেঁচেছিলেন ৮৫ বছর। সততা ও ধার্মিকতার জন্য তার ব্যাপক সুনাম ছিল। মৃত্যুর পর নিজ বাসস্থান ও খানক্বার পাশেই তাকে দাফন করা হয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ শ্রদ্ধাভরে এ মাজার জিয়ারত করছেন। শেখ সাফি উদ্দিন আর্দেবিলির মাজার কমপ্লেক্সে রয়েছে তার মাজার, জান্নাত সারা নামের একটি মসজিদ, বেশ কয়েকটি হল-ঘর, খানক্বা, শহীদগাহ নামক গোরস্থান এবং বাগান। শেখ সাফি উদ্দিনের পুত্রই এসবের নির্মাতা। এখানকার স্থাপনাগুলো টাইলস, প্লাস্টার ও সুলেখন শিল্পের কারুকাজে সুসজ্জিত। কাঠ ও সোনা-রূপার কারুকাজের ফলে গোটা কমপ্লেক্সটি হয়ে উঠেছে চোখ-ধাঁধানো সৌন্দর্য্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। আশপাশে বৃক্ষ-শোভিত মূল প্রবেশ পথটি কাঠের। প্রবেশ পথের দুই দিকে রয়েছে পাথরের তৈরি দুটি মনোরম হৌজ বা জলাধার। ইটের তৈরি দেয়ালে রয়েছে খিলান-আকৃতির সুদৃশ্য কুঠুরি।

শেখ সাফি উদ্দিন আর্দেবিলির মাজার কমপ্লেক্সের সবচেয়ে পুরনো অংশটি ক্বোরবানির স্থান। বর্গাকৃতির এ উঠানের চারদিকে রয়েছে বেশ কিছু কক্ষ। অতীতে এগুলো ছিল দুই তলা। এখানেই অনুষ্ঠিত হত সুফীদের মূল অনুষ্ঠানগুলো। ভেতরের দিকের উঠান পাথরে বাধাঁনো। এখানে রয়েছে কাঠের বারান্দা এবং শেষ মাথায় রয়েছে "আল্লাহ আল্লাহ" নামক গম্বুজ। এ গম্বুজের নীচেই রয়েছে শেখ সাফি উদ্দিন আর্দেবিলির কবর। এ অংশটিই কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থল। সমতল থেকে ১৮ মিটার উচুঁতে ইটের তৈরি গম্বুজটি নির্মিত হয়েছে কয়েকটি স্তম্ভের ওপর। আশপাশের প্রাঙ্গন ২২ মিটার প্রশস্ত। গম্বুজের ভিত্তি-প্রস্তরটি আট কোনা আকৃতির। এ গম্বুজের দেয়ালে রয়েছে ডিম্বাকৃতির ফিরোজা রংয়ের টাইলস। টাইলসের ওপর বার বার আল্লাহ শব্দটি খোদিত হওয়ায় একে "'আল্লাহ আল্লাহ" গম্বুজ' বলা হয়। টাইলসের ওপর কোরআনের আয়াতও উৎকীর্ণ রয়েছে। বিভিন্ন দূর্লভ নিদর্শনে ভরা একটি যাদুঘর ও ৮ কোনাকৃতির প্রদর্শন হল বা ভবন এ কমপ্লেক্সের বাড়তি আকর্ষণ। চীনা মাটির পাত্রের প্রাচীন নিদর্শনে সজ্জিত ভবনটির সমস্ত কক্ষ ও হল হলুদ আর সবুজ রংয়ের অপূর্ব কারুকাজে শোভিত। # {jcomments on}

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন