এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 25 সেপ্টেম্বর 2010 15:15

প্রতিরক্ষা শিল্পে ইরানের প্রশংসনীয় অগ্রগতি

ইরান সম্প্রতি বহুল আলোচিত বুশেহর পরমাণু স্থাপনাটি চালু করেছে। এর পাশাপাশি ইরান প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন নতুন উদ্ভাবনীর মধ্য দিয়ে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছে। সামরিক বা প্রতিরক্ষা খাতে ইরানের এই অগ্রগতিতে হতবাক হয়ে পড়েছে তাদের শত্রুরা। তো প্রতিরক্ষা খাতে সম্প্রতি ইরান কী ধরনের অগ্রগতি লাভ করলো চলুন সে বিষয়ে আজ খানিকটা আলোচনা করবো।

চলতি বছরের ৯ জুনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের চাপের মুখে ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৯২৯ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হবার পর ইরান এবং বিশ্বের বিশেষজ্ঞ মহল দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল যে, এ ধরনের চাপের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের আরো বেশি উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্র তৈরি হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে যেই দৃঢ় বাস্তবতা কাজ করেছিলো তা হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠালগ্ন অর্থাৎ ১৯৭৯ সাল থেকেই অর্থনৈতিক, রাজণৈতিক, সামরিক এবং প্রচারণাগত বিচিত্র চাপের মুখে ছিল, কিন্তু ইরানের জনগণ ও কর্মকর্তাগণ ঐসব চাপ বা হুমকি-ধমকিকে বরং দেশের উন্নয়ন ও বিকাশের জন্যে উপযুক্ত সুযোগে পরিণত করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ইরান গত ২১ আগস্টে বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ জ্বালানী সরবরাহ করার মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অন্যায় এবং ভিত্তিহীন প্রস্তাবের দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন নতুন উদ্ভাবনীর যেরকম প্রদর্শনী হলো তাতে বুদ্ধিজীবীগণ এ ব্যাপারে আরো বেশি আস্থাশীল হয়েছেন যে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না। ইরানে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প দিবস হিসেবে অভিহিত ২২ আগস্ট তারিখে প্রেসিডেন্ট আহমাদি নেজাদ পাইলটবিহীন জেট বিমান-যা ড্রোন হিসেবেও পরিচিত-কাররারে'র উদ্ভোধন করেছেন। বোমা পরিবাহী এই বিমানের সফল পরীক্ষাও চালানো হয়েছে। পাইলট বিহীন জেট বিমান কাররার প্রযুক্তিগত দিক থেকে খুবই শক্তিশালী,খুবই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এটি বানাতে। ইরান ছাড়া বিশ্বের মাত্র দুটি দেশ আমেরিকা এবং ফ্রান্স এ পর্যন্ত পাইলট বিহীন জেট বিমান তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। ইহুদিবাদী ইসরাইলও মার্কিন সহযোগিতায় এ ধরনের জঙ্গি বিমানের কিছু নমুনা তৈরি করেছে। ইরান অবশ্য ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময়ই পাইলটবিহীন জঙ্গিবিমান তৈরির কাজে হাত দিয়েছিল। এ পর্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন বহু মডেলের পাইলটবিহীন জেট বিমান বানিয়েছে ইরান।

ইরানের তৈরি কাররার পাইলটবিহীন জেট বিমানটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একেবারেই ব্যতিক্রমধর্মী। এটি অনেক উপর দিয়ে ঘণ্টায় এক হাজার কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। কাররার লম্বায় চার মিটার। এটি বিভিন্ন ধরনের বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এই জেটের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। বোমাগুলোও শত্রুর অবস্থানে কঠিন আঘাত হানতে সক্ষম। আহমাদি নেজাদ কাররার উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন,এর মূল বার্তা হচ্ছে শান্তি ও বন্ধুত্ব এবং সবরকমের দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার বা বন্ধ করা। তিনি আরো বলেন-ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান অন্যায় এবং জুলুমের মোকাবেলায় চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। সেজন্যেই অগ্রগতি ও উন্নয়নের সবোর্চ্চ সোপানে পা রেখে শত্রুদেরকে হতাশ করে দিতে হবে। ইরানের প্রেসিডেন্ট এজন্যেই কাররারকে প্রতিরক্ষামূলক বলে উল্লেখ করে বলেছেন-কাররার হচ্ছে যুদ্ধবাজ শত্রুদেরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার অস্ত্র।

কাররার উদ্বোধনের দু'দিন আগে ইরান 'কেয়াম' নামে আরেকটি উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য নবীন এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৈচিত্রে নতুন সংযোজন। ইরানের বিমান ও মহাশূন্য শিল্প সংস্থার প্রধান সর্দার মাহদি ফারহি কেয়ামের গতি এবং আঘাত হানার ক্ষমতাকে অনন্য ভৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে বিমান ও মহাশূণ্য ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা কেয়ামের ক্ষেত্রে লাগানো হয়েছে। কেয়ামের সাথে তৃতীয় প্রজন্মের ১১০ ফাতেহ ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করা হয়েছৈ। ২০০২ সালে ইরান প্রথমবারের মতো এই ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাত্রের উৎপাদন শুরু করেছিল।

গত কয়েকদিন আগে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী নতুন ধরনের দুটি গানবোটও তৈরি করেছে। এগুলোর একটির নাম জুলফিকার এবং অপরটির নাম সেরাজ। সেরাজ খুবই দ্রুতগতি সম্পন্ন গানবোট। এর কাজ হলো শত্রুপক্ষের আক্রমণের দ্রুত জবাব দেওয়া। ক'মাস আগে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পারস্য উপসাগরে যে মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, তাতে এই গানবোটটি গতি এবং রকেট নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অসামান্য ক্ষমতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। সেরাজ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে উত্তাল সমুদ্রেও এই গানবোটটি যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে। জুলফিকার হচ্ছে টহলবোট। শত্রুদের বোটে অসম্ভব দ্রুততার সাথে হামলা চালাতে সক্ষম এই গানবোটটি। বিপুল পরিমাণ গানবোট তৈরি করার ফলে ইরানের নৌবাহিনীর শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার ক্ষমতা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানেরন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ-বিভাগের কমান্ডার সর্দার আলী ফাদাভি জুলফিকার এবং সিরাজ গানবোটের উৎপাদন ও উদ্ভোধন প্রসঙ্গে বলেছেন, দ্রুতগতি সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী গানবোটের ক্ষেত্রে বিশ্বে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এ ধরনের শক্তি অর্জন করতে পারে নি। তুলনামূলক বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ইরানের মধ্যম গতি সম্পন্ন গানবোটগুলোও মার্কিন রণতরিগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ গতিসম্পন্ন।
ইরান কেবল গানবোটের ক্ষেত্রেই নয় বরং সাবমেরিন তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন চারটি গাদির সাবমেরিন ইরানের নৌবাহিনীর হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সাবমেরিনগুলো শত্রুর রাডার ফাকিঁ দিয়ে দ্রুত গতিতে শত্রুদের ধাওয়া করতে সক্ষম। অগভীর জলেও গাদির সাবমেরিন ভালোভাবে কাজ করে। ইরান এইসব অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করেছে শুধু প্রতিরক্ষার লক্ষ্যে। শত্রুদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষাই এর উদ্দেশ্য। গেল কয়েক শতাব্দিতে ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা যুদ্ধকামী নয় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ব্যাপারে ইরান সবসময়ই সদিচ্ছা পোষণ করে। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা বিস্তারের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সহযোগিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগস্ট মাসের শুরুর দিকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওমান সফরে গিয়ে দেশটির সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। সামরিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিনিধি প্রেরণ এবং যৌথ মহড়া করার কথা রয়েছে ঐ চুক্তিতে।

এর আগে কাতারের সাথেও অনুরূপ একটি চুক্তি হয়েছে। গেল মে'তে তাজিকিস্তানের সাথেও স্বাক্ষরিত একই ধরনের চুক্তিতে প্রতিরক্ষা,কারিগরী ও প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সামরিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইরানের নতুন নতুন এইসব উদ্ভাবনী একেবারেই নিজস্ব। বিচিত্র অবরোধ সত্ত্বেও ইরান যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে এইসব নতুন নতুন প্রযুক্তি সম্পন্ন সমরাস্ত্র তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে সেখানেই মূলত ইরানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা। # {jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন