এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 29 সেপ্টেম্বর 2010 14:35

ইরানের ওপর সাদ্দামের আগ্রাসন : আধিপত্যবাদী চিন্তা ও তার ব্যর্থতা

প্রথম পর্ব
পাঠক! ইরানের ওপর ইরাকের সাবেক সাদ্দাম সরকারের আগ্রাসনের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে আপনাদের। ত্রিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে সাদ্দামের ওই আগ্রাসী হামলার খবর তৎকালীন বিশ্ব গণমাধ্যমগুলোর শীর্ষ খবরে পরিণত হয়েছিল। সাদ্দামের আদেশে প্রথম প্রথম তার বাথ পার্টির সেনারাই ইরানের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশি সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকের সেনাবাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালাতে শুরু করে দেয়। সর্বাত্মক ওই হামলার নেপথ্যে সাদ্দামের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো এবং কোনো কোনো আরব দেশের সরকারগুলোর আর্থিক, সামরিক, প্রচারণাগত এক কথায় সার্বিক সহযোগিতার বিষয়টি চিন্তা করে তখনকার রাজনীতি ও সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল পর্যন্ত ভেবেছিলঃ ইরানের নয়া ইসলামী সরকার ব্যবস্থার পতন অতি শীঘ্রই ঘটবে এবং ইরান ভূখণ্ডের একটা বিস্তীর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাদ্দাম দখল করে নেবে। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী জনতা আর সংগ্রামী যোদ্ধাদের অভূতপূর্ব দৃঢ়তা ও অবিচল সংগ্রামের ফলে পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্নরকম হয়েছে যেই ফলাফল আগ্রাসী শক্তিকে বিফল মনোরথ ও অনুতপ্ত করে তুলেছে।

ইরাকের যুদ্ধকামী স্বৈরাচার সাদ্দাম ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার অনেক আগে থেকেই যুদ্ধের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলো। তার উদ্দেশ্য ছিলো ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তেল সমৃদ্ধ প্রদেশ খুজিস্তানকে ইরান ভূখণ্ড থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইরানের ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং তারি পথ ধরে পুরো ইরান দখল করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। সাদ্দাম ভেবেছিলো সে ওই যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে সমগ্র আরব বিশ্বের নেতা এবং বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে। সাদ্দাম আরো চেয়েছিলো ইরানের তেলের খনিগুলোর ওপর নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে তেল রপ্তানীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হতে। ইরানের অভ্যন্তরীণ শত্রুদের ষড়যন্ত্র এবং ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে বহিঃশত্রুদের ষড়যন্ত্রের কারণে সাদ্দাম এরকম চিন্তা করেছিলো যে ইরান দখল করাটা খুবই সহজ একটি কাজ। সাদ্দাম নিজেই বলেছিল এমনকি মাত্র তিন দিনে ইরান বিজয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলো।

যেমনটি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ১৯৮০ সালে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়েই ইরানের ওপর ইরাকের বাথ সরকারের সর্বাত্মক হামলা শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকে ইরানের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ইরাকী সেনারা হামলা শুরু করেছিল, পরে ধীরে ধীরে এই আক্রমণের মাত্রা বেড়ে যেতে থাকে। এদিকে সাদ্দাম তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলে এবং ইরানের ওপর সবার্ত্মক হামলার জন্যে কোনো কোনো আরব দেশসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থন লাভ করে। আগ্রাসী হামলায় সমর্থন দেওয়ার পেছনে এইসব দেশের অভিন্ন যে স্বার্থ ছিল তাহলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরোধিতা-যেই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ওই আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের মিত্র শক্তিগুলোর স্বার্থ বিঘ্নিত করেছিল। ইরাকী হামলা শুরুর তিন দিন আগে স্বৈরাচারী সাদ্দাম টেলিভিশনের পর্দায় আলেজেরিয়া চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে। ১৯৭৫ সালে ইরাক এবং ইরানের মধ্যকার সীমান্ত নির্ধারণের জন্যে ওই চুক্তিটি তৎকালীন ইরান সরকারের সাথে স্বয়ং সাদ্দামই স্বাক্ষর করেছিলেন। এভাবে ইরানের বিরুদ্ধে মারাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

সাদ্দাম এবং তার পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলো ভেবেছিল এই যুদ্ধ বেশিদিন চলবে না, অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। ইরানের ওপর ইরাকী আগ্রসন শুরু হবার কয়েক মাস আগে মার্কির থৈনিক হেরাল্ড ট্রিবিউন লিখেছিলঃ মার্কিন বিশ্লেষকদের বিশ্বাস এই মুহূর্তে ইরানী সেনাবাহিনী তাদের দেশের সীমান্ত রক্ষা করতে সক্ষম নয় এবং এমনকি কয়েকদিন কিংবা বড়জোর এক দুই সপ্তার বেশি যুদ্ধ তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না। অথচ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া সেই যুদ্ধ আট বছর ধরে চলেছিল এবং ইরানীরা সেদিন ইসলাম-বিদ্বেষী শক্তিকে ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, আগ্রাসী শক্তি এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরকে মোকাবেলা করার দৃঢ় মনোবল ও শক্তি তাদের রয়েছে। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি সাদ্দাম বাহিনীর অনুকূলেই ছিল। আড়াই লক্ষ ইরাকী সেনা ট্যাংক, কামানসহ বিভিন্ন সাঁজোয়া যান নিয়ে ইরানের সীমান্ত এলাকাগুলোর শহর ও গ্রামগুলোকে দখল করে নিয়েছিল। একই সময়ে ইরাকের শতাধিক জঙ্গি বিমান যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ঊনিশটি শহরের ওপর বোমা বর্ষণ করে ইরানের জঙ্গি বিমানগুলোকে তাদের ঘাঁটিতেই ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তারা তাদের ওই অভিযানে ব্যর্থ হয়।
অবশ্য নৌ বাহিনীর যুদ্ধে পরিস্থিতি ছিল ভিন্নরকম। কেননা ইরানের শক্তিশালী নৌবাহিনী যুদ্ধের প্রাথমিক দিন বা মাসগুলোতেই ইরাকের নৌবাহিনীকে পরাস্ত করে পরস্য উপসাগরে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিল। ইরাকী সেনারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ যে শহরটি দখল করেছিল তা হলো ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর নগরী খুররাম শাহর। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মুখে মাস খানেকের মধ্যেই ইরাকী সেনারা ওই এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। অথচ ইরানের বিপ্লবী সেনাদের হাতে ইরাকী সেনাদের তুলনায় যেসব অস্ত্রশস্ত্র ছিল তা খুবই নগণ্য ছিল। খুররাম শাহর ছাড়া অন্যান্য এলাকাতেও ইরাকী সেনারা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধা এবং সেনাবাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। এর পাশাপাশি ইরানী জঙ্গি বিমানগুলো ইরাকের সংবেদনশীল বিভিন্ন স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছিল। এভাবে সাদ্দাম এবং তার পৃষ্ঠপোষকরা আস্তে আস্তে বুঝতে পেরেছে যে, ইরান দখল করা সম্ভব নয় এবং ইরানের ইসলামী সরকার ব্যবস্থার প্রতি সেদেশের অকুণ্ঠ জনসমর্থন রয়েছে।

এ কারণে সাদ্দাম যে কিনা দখলকৃত ইরানী ভূখণ্ড রক্ষা করতে চেয়েছিল, সে আন্তর্জাতিক সীমারেখা থেকে পিছু না হটেই যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানিয়েছিল। ইরান তার জবাবে তখন কিছু শর্ত দিয়েছিল যেমন, আন্তর্জাতিক সীমারেখা থেকে সাদ্দাম বাহিনীকে পিছু হটতে হবে, যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনের কারণে ইরাক সরকারের বিচার ও শাস্তি দিতে হবে।

দ্বিতীয় পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের এক পর্যায়ে সাদ্দামের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিরতির আবেদন এবং ইরানের বেঁধে দেওয়া শর্তগুলোর কথা বলে আলোচনার পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম। সাদ্দাম ভেবেছিল অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানকে কাবু করে ফেলবে, কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতির আবেদন জানাতে বাধ্য হয়। যাই হোক, তার পরবর্তী ঘটনাবলী ও ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করবো আজকের আসরে।

ইরানের ওপর সাদ্দাম বাহিনীর প্রথম পর্যায়ের আগ্রাসনের পর ইরানের সেনাবাহিনী খুব দ্রুততার সাথে নিজেদেরকে পুনরায় ভালোভাবে প্রস্তুত করে নেয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিপ্লব বিরোধী পক্ষগুলো শত্রুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ধীরে ধীরে কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল আর ইরান জুড়ে নেমে এসেছিল শান্তি ও স্বস্তি। ইতোমধ্যে জনগণের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে ওঠে। এই বাহিনী বিশাল আকার ধারণ করেছিল। এই বাহিনী নিজেদের দেশ ও ইসলামী বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্যে জীবনবাজি রেখেছিল অর্থাৎ প্রাণ দিয়ে স্বদেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। যুদ্ধের দ্বিতীয় বছর থেকে যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ পর্যায়ে ইরানী বীরসেনারা তাদের দেশের অধিকৃত ভূখণ্ড ফিরে পাবার জন্যে জোর সংগ্রাম শুরু করে। ইরানে ইরাকী হামলার প্রথম বার্ষিকীতে ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার হযরত ইমাম খোমেনী (রহ) এর নির্দেশে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আবাদান অবরোধমুক্ত হয় এবং ইরাকী সেনারা তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মে তারিখে খুররাম শাহরকে শত্রুদের দখলমুক্ত করার ঘটনাটা ছিল ইরানী মুক্তিসেনাদের মহান বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই শহরটি দুই পক্ষের জন্যেই কৌশলগত দিক থেকে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাদ্দাম সেজন্যেই এই শহরটি দখল করার জন্যে চড়া মূল্য দিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল যে, যদি ইরানীরা ওই শহরটিকে পুনরায় নিজেদের দখলে নিতে পারে, তাহলে ইরাকের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর বসরার চাবি তাদেরকে দেওয়া হবে। ইরানের জনগণের দৃষ্টিতেও খুররাম শাহর ছিল সাদ্দাম বাহিনী কর্তৃক দখলকৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর। তাই খুররাম শাহরকে ঘিরে দু'পক্ষই তাদের সবোর্চ্চ শক্তি প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু বিজয় ঘটেছিল ইমান, বিশ্বাস ও বীরত্বপূর্ণ ইরানী সেনাদেরই। গুরুত্বপূর্ণ এই অভিযানে সাদ্দাম বাহিনীর হাজার হাজার সেনা মৃত্যুবরণ ও কারাবরণ করে এবং ৬০ টি জঙ্গি বিমান, শত শত ট্যাংক ও কামান ধ্বংস হয়। খুররাম শাহর স্বাধীন করার পর ইরানী সেনারা দখলদার ইরাকী সেনাদেরকে ইরানের অন্যঅন্য অঞ্চল থেকে বের করে দেওয়ার লক্ষে দ্বিগুণ উৎসাহ ও উদ্যমে অভিযান শুরু করে।
১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরাকের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ফাও দ্বীপ জয়ের অভিযান সামরিক বিশেষজ্ঞদেরকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ওই অভিযানটি ছিল ইরানী যোদ্ধাদের অসাধারণ এক সাফল্য। ওই সাফল্যের কারণেই সাদ্দাম তার বাহিনীকে পাশ্চাত্যের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে তুলেছিল। ফাও দ্বীপ হস্তগত করার বিষয়টি ছিল ইরানের সাহসী সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগী এবং জটিল যুদ্ধ কৌশলের ফল। এই অভিযান ইরানের সকল ভূখণ্ড থেকে ইরাকী বাহিনীর পিছু হটার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধু তাই নয় আগ্রাসী হামলা শুরু করার জন্যে সাদ্দামের বিচার করা এবং ইরানের ওপর হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খেসারত দেওয়ার জন্যে সাদ্দাম ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছিল। বসরার পূর্বাঞ্চলে কারবালা-৫ নামের বিশাল অভিযানও এ লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল। এই হামলাটি এমন এক এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল, যে এলাকায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল সাদ্দাম বাহিনীর জন্যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

১৯৮৭ সালের শুরুর দিকে পরিচালিত জটিল ওই অভিযানে সাদ্দাম বাহিনীর ৮০টি জঙ্গি বিমান, ৭০০টি ট্যাংকসহ বিচিত্র অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত সাঁজোয়া বহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ঐ অভিযানের পর মার্কিন সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজ উইক লিখেছিলঃ ‘বসরার নিকটবর্তী অঞ্চলে ইরানীদের আগ্রাসন বিগত কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি সম্ভাবনাকে সবার সামনে ফুটিয়ে তুলেছে, আর তাহলো একটি পক্ষ সত্যিই অপর পক্ষের ওপর বিজয় লাভ করবে।' এ কারণে সাদ্দামের প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন আরো স্পষ্টভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছিল। তারা সাহায্য-সহায়তা দিয়ে সাদ্দামকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিল। অবশেষে ১৯৮৮ সালের ২০ আগস্টে ইরান ৫৯৮ নম্বর ইশতেহার মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই পাশ্চাত্য এবং কোনো কোনো আরব সরকারের সহায়তায় সাদ্দাম নিশ্চিত পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সাদ্দামের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ আগ্রাসন এবং ইরানী মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি দিক হলো এই যুদ্ধে বহু সংখ্যক পশ্চিমা দেশ এবং আরব দেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল। নবীজীর সময়কার আহযাব যুদ্ধের সাথে এই যুদ্ধকে তুলনা করা যেতে পারে। কেননা আহযাবের যুদ্ধে রাসূলে খোদার সকল বিরোধী পক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারপরও শত্রুরা নবীজীর হুকুমাতের কেন্দ্র মদীনায় হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে আট বছরের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেও আরব এবং পশ্চিমা বহু সরকার সাদ্দামকে পরিপূর্ণভাবে সাহায্য ও সমর্থন করেছে। এই সরকারগুলো একইভাবে চেষ্টা করেছে ইরানের ওপর রাজনৈতিক,সামরিক এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ইরাকের স্বৈরাচারী শাসকের বিজয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্র তৈরি করতে। ইরাকে অস্ত্র রপ্তানীকারকদের মাঝে শীর্ষ পর্যায়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধের সময় ইরাককে ৫৩ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পর সাদ্দামের কাছে অস্ত্র বিক্রির দ্বিতীয় প্রধান দেশ ছিলো ফ্রান্স। ১৯৮০'র দশকে সাদ্দাম আড়াই হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র কিনেছিল। অবশ্য এইসব অস্ত্রের বেশিরভাগ ব্যয়ভার বহন করেছিল সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কিছু কিছু আরব দেশ। যুদ্ধের পর পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকণ্ঠের ছয়টি দেশ আট হাজার কোটি ডলার সম পরিমাণ অর্থ ইরাকের কাছে প্রাপ্য ছিল।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর সাদ্দাম সেইসব আরব দেশের ওপর তাদের অর্থে কেনা অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেছে। এমনকি ১৯৯০ সালে কুয়েত দখল করার জন্যে সাদ্দাম দেশটির ওপর আক্রমণ করেছিল এবং সৌদি আরবকেও দখলের হুমকি দিয়েছিল। অপরদিকে মিশর এবং জর্দান সেনা পাঠিয়ে, বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে, পাইলট পাঠিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া ওই যুদ্ধে সাদ্দামকে সাহায্য করেছিল। কিন্তু সাদ্দাম পরিপূর্ণ স্বৈরাচারী মনোভাব দেখিয়ে তার প্রতি ওই আরব দেশগুলোর সহায়তাকে তাদের দায়িত্ব বলে গণ্য করেছিল। যাতে সে ঐসব সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে আরবগুলোর তথাকথিত ইরানভীতি মোকাবেলা করতে পারে। ইরানের ওপর সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া ওই যুদ্ধ আট বছর ধরে চলেছিল। যার বহু দিক উল্লেখ করার মতো। পরবর্তী পর্বে আবারো কথা হবে এ নিয়ে।

তৃতীয় পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম এবং তার মিত্রদের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর যুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে বহু আরব দেশসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারের পক্ষ থেকে সাদ্দামের প্রতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক তথা সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিও খানিকটা ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের আসরেও খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

সাদ্দামের পৃষ্ঠপোষকদের মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভূমিকাটা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদিও ইরাককে খুব বেশি অস্ত্র দেয় নি, তবে ইরানের ওপর সাদ্দামের আগ্রাসী হামলায় সার্বিক সমর্থন দিয়েছে এবং সাদ্দামের স্বার্থে কাজ করেছে। সাদ্দামের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করার ফলে ওয়াশিংটন আগের তুলনায় সাদ্দামের আরো বেশি কাছে এসেছিল এবং সাদ্দামকে সহায়তা-সমর্থন করেছিল। আমেরিকা সাদ্দামকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল এবং ১৯৮৪ সালের শেষের দিকে ইরাক এবং আমেরিকা দু'দেশের মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। যুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এবং তাদের এওয়াক্স জঙ্গি বিমানের মাধ্যমে সাদ্দাম বাহিনীর সেনা কর্মকর্তাদেরকে ইরানের সেনাবাহিনীর অবস্থানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। মার্কিন এই এওয়াক্স জঙ্গি বিমান এবং তাদের গোয়েন্দা স্যাটেলাইট-এগুলো মোতায়েন ছিল সৌদি আরবে। শুধু তাই নয়, হোয়াইট হাউজ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চালিয়েছিল।

যুদ্ধের শেষদিকে আমেরিকা নির্লজ্জের মতো সাদ্দামের পক্ষ নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা করেছিল। মার্কিন জঙ্গি বিমান এবং নৌবহর থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এমনকি পারস্য উপসাগরের আকাশে ইরানী যাত্রীবাহী বিমানে মার্কিন ন্যক্কারজনক হামলা ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের আগ্রাসনে মার্কিন সহযোগিতা বা পক্ষপাতিত্বের বিষয়টিকে আরো বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রচারণার ক্ষেত্রেও আরব এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সুস্পষ্টভাবেই সাদ্দামের পক্ষ নিয়েছিলো। এই গণমাধ্যমগুলোর লক্ষ্য ছিলো ইরানকে একটি হুমকি হিসেবে তুলে ধরা এবং সাদ্দামের যুদ্ধকামিতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে ঢেকে রাখার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেওয়া। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো পারতপক্ষে যুদ্ধে সাদ্দাম বাহিনীর ব্যর্থতা বা পরাজয়ের দৃশ্য কিংবা খবরাখবর প্রচার করতো না,পক্ষান্তরে যুদ্ধে ইরানের অবস্থানকে সবসময় দুর্বল এবং নড়বড়ে করে দেখানোর চেষ্টা করতো। অথচ মজার বিষয়টি হলো, ইরানের ওপর ইরাকের যুদ্ধের পর সাদ্দাম যখন কুয়েতের ওপর হামলা চালালো তখন ওই পশ্চিমা এবং আরব গণমাধ্যমগুলোই সাদ্দামের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। সে সময় এ্ই গণমাধ্যমগুলো স্বীকার করেছিল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাদ্দামকে সমর্থন করাটা ছিল ভুল।

বৃটেনের একটি টেলিভিশন গবেষণামূলক এক প্রতিবেদনে বলেছেঃ ‘আমেরিকা ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার জন্যে দায়ী বলে মনে করতো। কিন্তু পরে প্রমাণিত হলো যে, সাদ্দাম সরকারের নীতিই মূলত এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার মূল কারণ। আর পশ্চিমা সরকারগুলো সাদ্দামকে সমর্থন করে ওই অস্থিতিশীলতাকে বৈধতা দিয়েছে। আমেরিকা বিগত প্রায় দশ বছরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্যে তাদের নীতিতে বড়ো ধরনের ভুল করেছে, তাই এখন তাদেরকে সেই ভুলের কড়া মাশুল দিতে হবে।'

দুঃখজনকভাবে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের যুদ্ধ চলাকালে স্বৈরাচারী সাদ্দামের স্বার্থেই কাজ করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্ত যথার্থ ভূমিকা পালনে অগ্রসর হতে পারেনি। যেহেতু ইরাক হামলা করেছে ইরানের ওপর, সেখানে জাতিসংঘের উচিত ছিল ইরানকে সমর্থন করা এবং ইরাকের সেনাবাহিনীকে ইরান ভূখণ্ড থেকে পিছু হটতে আহ্বান জানানো, কিন্তু দুঃখজনকভাবে জাতিসংঘ তা না করে শুধুমাত্র যুদ্ধ বিরতি আহ্বান জানিয়েছিল। ইরানের বিভিন্ন শহরে সাদ্দাম বাহিনীর ন্যাক্কারজনক হামলা এবং রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করার মতো অপরাধ সম্পর্কে জাতিসংঘ যেসব ইশতেহার বা প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল সেগুলো ছিলো খুবই দুর্বল এবং প্রভাবহীন। নিরাপত্তা পরিষদ এমন সময় ৫৯৮ নম্বর প্রস্তাব পাশ করে যখন সাদ্দাম বাহিনী ইরানের সেনাবাহিনীর পরিপূর্ণ চাপের মুখে কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল। এরকম পরিস্থিতিতে গৃহীত ওই প্রস্তাবে ইরানের দাবীগুলো বিশেষ করে অপরাধী আগ্রাসনকারীকে সনাক্ত করা, ক্ষতিপূরণ প্রদান করা, আন্তর্জাতিক সীমান্তে ইরাকের পিছু হটা এবং বন্দি বিনিময়ের মতো বিষয়গুলো স্থান পেয়েছিল। এর বাইরে অপরাপর আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, বিশ্ব রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংস্থাগুলো পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের ন্যক্কারজনক অপরাধের ব্যাপারে দায়িত্বশীলতা বা বাস্তবদর্শিতার পরিচয় দেয়নি।
ইরাকের স্বৈরাচারী সাদ্দাম ছিল এমন এক ব্যক্তি যে কিনা নিজস্ব ইচ্ছাগুলো পূরণের জন্যে নিজের সর্বপ্রকার হাতিয়ার ব্যবহার করতো। ইরানের ওপর তার আট বছরের আগ্রাসনে বহুবার সুস্পষ্টভাবেই আন্তর্জাতিক সকল রীতিনীতিকে পদদলিত করেছে এবং পাশবিক অপরাধ করেছে। সাদ্দামের সেনারা যখনই যুদ্ধের কোনো অভিযানে পরাজয়ের আশংকা করতো তখনই তারা বিভিন্ন শহরের নিরীহ মানুষের ওপর বিমান হামলা এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতো নির্বিচারে। সাদ্দাম সরকার ইরানী বন্দীদের সাথেও রূঢ় এবং অসংলগ্ন আচরণ করতো। তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতো, এমন নির্যাতন চালিয়েছিল যে ইরাকের কারাগারেই তাদের অনেকে শাহাদাত বরণ করেছিল। কেবল তাই নয়, সাদ্দাম সরকার ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠি-যারা ইরানের শত শত কর্মকর্তা ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে-তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা বা সমর্থন দিয়েছে এবং সাদ্দাম তার অবৈধ উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়নের কাজে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠিকে ব্যবহার করেছে।

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইরাকের যুদ্ধ চলাকালে সাদ্দাম সবচেয়ে ঘৃণ্য এবং পাশবিক যে অপরাধটি করেছে তাহলো ইরানের সেনাবাহিনী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অবৈধ অস্ত্র রাসায়নিক বোমার ব্যবহার। কেবল সেনাবাহিনী কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরই নয় বরং সাধারণ মানুষের ওপরও সাদ্দাম রাসায়নিক বোমা হামলা করেছে। সে যে কেবল ইরানের ওপরই এই রাসায়নিক বোমা হামলা চালিয়েছে তাই নয় বরং সাদ্দাম নিজের দেশের নিরীহ মানুষের ওপর ওই রাসায়নিক বোমা হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে।

শেষ পর্ব

পাঠক! গত আসরে আমরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম এবং তার মিত্রদের চাপিয়ে দেওয়া কঠোর যুদ্ধে সাদ্দামের ন্যক্কারজনক কিছু অপরাধের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলাম। বলেছিলাম সাদ্দাম কেবল সেনাবাহিনী কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপরই নয় বরং সাধারণ মানুষের ওপরও রাসায়নিক বোমা হামলা করেছে। সে যে কেবল ইরানের ওপরই এই রাসায়নিক বোমা হামলা চালিয়েছে তাই নয় বরং নিজের দেশের নিরীহ মানুষের ওপরও ওই রাসায়নিক বোমা হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের আসরেও কথা বলার চেষ্টা করবো।

সাদ্দামের সেনারা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ধীরে ধীরে রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্রগুলো ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু যুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংগ্রামী ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধারা যখন বিজয় লাভ করছিল তখন সাদ্দামের সেনারা বিস্তৃত পরিসরে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপক বাড়িয়ে দেয়। ১৯৮৭ সালের জুনে সাদ্দাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারদাশ্‌তের ওপর রাসায়নিক বোমা হামলার আদেশ দিয়েছিল। ওই বোমা হামলায় ১১০ জন নিরীহ ইরানী শহীদ হন এবং পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়। ১৯৮৮ সালের মার্চে ইরাকের কুর্দিস্তানে অবস্থিত হালাবযা শহরেও ইরাকী বিমানগুলো রাসায়নিক বোমা হামলা চালিয়েছিল। বিপর্যয়কর এই হামলার ঘটনায় পাঁচ হাজার নিরীহ ইরাকী মারা যায় এবং সাত হাজারের মতো ইরাকী মারাত্মকভাবে আহত হয়। ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ সমাপ্তির ২২ বছর কেটে যাবার পর আজও সামরিক-বেসামরিক নির্বিশেষে প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার ইরানী রাসায়নিক বোমার সুদূরপ্রসারী বিক্রিয়ায় শারীরিকভাবে আহত, পঙ্গুত্ব বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত তথা বিচিত্র ক্ষয়ক্ষতিগ্রস্ত জীবন যাপন করছেন। তাদের অনেকেরই অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক।

সাদ্দাম এই রাসায়নিক অস্ত্রগুলো লাভ করেছিল পশ্চিমা সরকারগুলোর ব্যাপক সহযোগিতায়। তারা সতেরো হাজার টনেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থ বাগদাদকে সরবরাহ করেছিল বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র, কামানের গোলা ইত্যাদিতে ব্যবহার করার জন্যে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী মার্কিন, জার্মান এবং ফরাশি কোম্পানীগুলো ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র লাভের ক্ষেত্রে অন্য সবার চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল। অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্পেন, আর্জেন্টিনা এবং হল্যান্ডের মতো দেশগুলোও সাদ্দামকে রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন উপাদান-উপকরণ দিয়ে সাহায্য করেছিল। অপরদিকে সাদ্দামের সেনারা যে ব্যাপকভাবে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, পশ্চিমা সরকারগুলো সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিশ্বসমাজের প্রতিবাদ জানানোর পথে বাধার সৃষ্টি করেছিল। ১৯৮৬ সালের মার্চে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সাদ্দাম সরকারের নিন্দা জানানোর জন্যে যে খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দিয়েছিল। এইরকম পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাহায্য সহযোগিতার শক্তিবলেই ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সাদ্দামের বিচারের জন্যে যখন আদালত গঠন করা হয়েছিল,সেখানে সাদ্দাম বলেছিলঃ‘আমি গর্বের সাথে ইরানে রাসায়নিক এবং প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে সর্বপ্রকার হামলা চালানোর দায়-দায়িত্ব স্বীকার করছি।'

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের উন্নত এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রগুলো সাদ্দামকে দেওয়া হয়েছিল। সেইসাথে কোনো কোনো আরব দেশ এবং পশ্চিমা দেশগুলো সাদ্দামকে সার্বিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। এইসব পৃষ্ঠপোষকতা দেখে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলো, এই আগ্রাসনে ইরাকই বিজয়ী হবে। এইসব বিশেষজ্ঞ প্রতিরক্ষা যুদ্ধে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিটিকে খুব একটা উপলব্ধি করেনি কিংবা গুরুত্ব দেয়নি। প্রভাবশালী এই চালিকাশক্তিগুলোর একটি ছিলো ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) এর দূরদর্শী নেতৃত্ব। ইরানের মুসলমান জনগোষ্ঠি তাঁদের এই মহান নেতার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ও আস্থা রাখতেন এবং ইমামও সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতেন। সাদ্দামের সেনাদের আগ্রাসনের মোকাবেলায় স্বদেশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে সেই কৌশলই ব্যবহার করেছিলেন, যেই কৌশল তিনি স্বৈরাচারী শাহ বিরোধী আন্দোলনের সময় কাজে লাগিয়ে সফল হয়েছিলেন। তাঁর সেই কৌশলটি ছিল জনগণকে সুসংগঠিত করা এবং তাদের মাঝে লুকায়িত বৃহৎ শক্তিকে কাজে লাগানো। এ কারণেই ইরানের জনগণ দীর্ঘ অট বছরের স্বদেশ প্রতিরক্ষার যুদ্ধে সবসময় ইমামের সহযোগী হিসেবে কাছে কাছে ছিলেন এবং রনাঙ্গনে কিংবা রনাঙ্গনের নেপথ্যে সর্বত্রই সচেতনভাবে উপস্থিত ছিলেন।

আট বছরের ওই যুদ্ধে ইরানী সেনাবাহিণী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ সাদ্দাম বাহিনীর বিরুদ্ধে ইরানের বিজয় লাভের প্রধান শক্তি বা উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল। ইরানী সেনাদের ধর্মীয় বিশ্বাসই তাদেরকে আত্মত্যাগ উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাদের সামনে ছিল কোরআনের ওই আয়াতটি যেখানে বলা হয়েছেঃ যাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদেরকে জেহাদের অনুমতি দেওয়া হলো। কেননা তারা অত্যাচারিত,আর আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম। (সূরা হাজ্বঃ আয়াত-৩৯) এই বিশ্বাসই ইরানী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে সাফল্য এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কেননা তারা মৃত্যুকে ভয় করেনি। ঈমান এবং এখলাসপূর্ণ মনে নির্ভীকচিত্তে অস্ত্রেশস্ত্রে সুসজ্জিত সাদ্দাম বাহিনীকে মোকাবেলা করেছে। কেননা তাদের মহান লক্ষ্যই ছিল শাহাদাত লাভ করা।

নিঃসন্দেহে যে কোনো যুদ্ধে যথাযথ পরিচালনা বা সুযোগ সুবিধা ছাড়া বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। ইরানী জনগণও সে বিষয়টি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। সেজন্যেই তারা ইমাম খোমেনী (রহ) এর মতো নেতার নির্দেশে ইরানের জনগণ তাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্যে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাধ্যমতো সার্বিক সহযোগিতা করেছে। এমনকি এরকম বহু পরিবার রয়েছে যারা গর্বের সাথে স্বদেশ রক্ষা এবং ধর্মরক্ষার ওই পথে নিজেদের বহু শহীদকে উৎসর্গ করেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে নারী সমাজের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁরা তাঁদের যুবক সন্তানদেরকে স্বদেশ রক্ষার ওই পবিত্র যুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন। এ ভাবেই ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিপ্লবী জনতা, পাশ্চাত্যপন্থী স্বৈরাচারী শাহকে যেভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল, তেমনিভাবে স্বৈরাচারী সাদ্দাম বাহিনীকেও একইরকম আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী শক্তিবলে ইরানের মাটি থেকে বিতাড়িত করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল-যে বিজয় ছিল অবিশ্বাস্য।

ইরানের বৃহৎ জনগোষ্ঠি সাদ্দাম বাহিনীর আগ্রাসনের মোকাবেলায় এমন সময় সংগঠিত হয়েছিল যখন ইরান ছিল পশ্চিমা সরকারগুলোর অবরোধের মুখে আবদ্ধ। পশ্চিমা ওই সরকারগুলো ইরানকে যে  কোন ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। অথচ পক্ষান্তরে সাদ্দামকে তারা সর্বপ্রকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছিল। এরকম এক পরস্থিতিতে ইরানের বিশেষজ্ঞগণ আত্মবিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রথমবারের মতো অস্ত্র তৈরির কাজে হাত দিয়েছিল। সেইসাথে নেতৃবৃন্দও জনগণকে শিখিয়েছেন-কীভাবে স্বল্প সামর্থ নিয়েও সার্বিক প্রতিরক্ষা যুদ্ধকে সফল করে তোলা যায়। যুদ্ধ সমাপ্তি সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণকালে ইমাম খোমেনী (রহ) জনগণের উদ্দেশ্যে সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া ঐ যুদ্ধের স্বরূপ সম্পর্কে বলেছিলেনঃ ‘আমাদের যুদ্ধ ছিল সত্য এবং মিথ্যা বা হক ও বাতিলের যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ শেষ হবার নয়।' {jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন