এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 20 মার্চ 2011 12:09

ইরানের নতুন সাফল্য, আবিস্কার ও উদ্ভাবন (১-২১)

সম্প্রতি ইসলামী বিপ্লবের ৩২ তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরানে উদযাপিত হয়েছে দেশটির সাফল্য, আবিস্কার ও উদ্ভাবন বিষয়ক প্রদর্শনী। গত ৩২ বছরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর নানা বাধা ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সৃষ্টিশীলতার মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত ইরানী জাতি এবং বিশেষ করে এর যুবপ্রজন্ম বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে অসাধারণ অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানের মুসলিম জাতির সেসব সাফল্যের কিছু কথা জানানোর জন্যই আমাদের  এ আয়োজন।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি ১.

চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি। ইরানী বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অত্যন্ত জরুরি এ ক্ষেত্রে দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। বিভিন্ন ধরনের দূরারোগ্য ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় উপাদন সমৃদ্ধ কিছু ওষুধ উৎপাদন শুরু হয়েছে ইরানে। ইসলামী বিপ্লবের ৩২তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরানী কর্মকর্তারা এইসব ওষুধ উৎপাদনের কথা জানিয়েছেন। যেমন, যকৃত বা কলিজার ক্যান্সার প্রতিরোধের ওষুধ ক্রোমিয়াম ফসফেট পি-৩২, ব্রেন টিউমার চিকিৎসার ওষুধ থেরাপি আয়োডিন-১২৫, প্রোস্টেট, ফুসফুস ও স্তনের টিউমার চিকিৎসার ওষুধ ব্রোম্বজিন গ্যালিয়ুম -৬৮ এবং জেনারেটর স্ট্রানসিউম ৯০/ইট্রিয়াম -৯০ ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, বর্তমান বিশ্বে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির মাত্র ১০ থেকে ১৫ ভাগ ব্যবহৃত হয় জ্বালানী উৎপাদনের কাজে। বাদবাকী অংশ ব্যবহৃত হয়, চিকিৎসা, খাদ্য-সুরক্ষা, শিল্প ও কৃষিকাজে। এইসব ক্ষেত্রে রেডিও আইসোটোপের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসাসহ রোগ নির্ণয়ে তেজস্ক্রিয় বা পারমাণবিক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইরানের সাফল্য বেশ দর্শনীয়। পরমাণু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এখন বিশ্বে ইরানের অবস্থান তৃতীয়। ইরান তার প্রয়োজনীয় পারমানবিক ওষুধের শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ নিজেই উৎপাদন করছে।

ইরান বিজ্ঞান গবেষণার জন্য খুবই জরুরি হিসেবে বিবেচিত পারমাণবিক গলনযন্ত্র বা "আইআর- আইইসিএফ"ও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এ ধরনের যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম বিশ্বের ৬টি দেশের ক্লাবে শরীক হল ইরান। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। অন্য যে ৫টি দেশের এ প্রযুক্তি রয়েছে সেদেশগুলোর নাম যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স।

পারমাণবিক গলনযন্ত্র বা "আইআর- আইইসিএফ" প্রোটন, নিউট্রন ও রঞ্জন রশ্মিযুক্ত বিশেষ যৌগিক পদার্থ এবং ক্যান্সার সনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত আইসোটোপ ও রেডিও আইসোটোপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও ট্রিটিয়াম ও হিলিয়াম-থ্রিসহ আরো কিছু পারমাণবিক পদার্থ বা পণ্য নির্মাণে ব্যবহৃত হয়।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আলোকোজ্জ্বল দশ প্রভাতের সপ্তম দিনে অর্থাৎ গত ৭ ফেব্রুয়ারি নিজস্ব প্রযুক্তির চারটি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উদ্বোধন করেছে ইরান। ইসলামী বিপ্লবের বিজয় বার্ষিকী উপলক্ষে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ফাজর, রাসাদ, আমিরকাবির ও জাফার নামে চারটি স্যাটেলাইটের উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও এ দিনে তার উপস্থিতিতে উপগ্রহবাহী একটি রকেট ও অনুসন্ধানী-চার নামের একটি বায়ো ক্যাপসুলও উদ্বোধন করা হয়।

মহাশুন্য প্রকল্পগুলো ছাড়াও বিপুল সংখ্যক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ইরানের সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। ইরানী বিশেষজ্ঞরা এখন ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার রাডার নির্মাণ করছেন এবং আরো দূরপাল্লার রাডার নির্মাণের গবেষণা সম্পন্ন করেছে। আগামী বছরের মধ্যে ইরান এক হাজার ১০০ কিলোমিটার ও তার চেয়েও বেশী পাল্লার রাডার নির্মাণ করবে।
ইরানী বিশেষজ্ঞরা ছোট নৌযানে ব্যবহার উপযোগী বিশেষ সামুদ্রিক রাডার নির্মাণের গবেষণা শেষ করেছে। এই রাডারের পাল্লা হবে ৬০ কিলোমিটার। ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার উপকূলীয় রাডার নির্মাণের গবেষণাও শেষ করেছেন ইরানী বিজ্ঞানীরা।

সম্প্রতি ইরান কয়েকটি পেট্রোকেমিক্যাল ও শোধনালয় উন্নয়ন প্রকল্পও সম্পন্ন করেছে। ইরানে সম্প্রতি উৎপাদিত হয়েছে ১৫০ কোটি লিটার উন্নত মানের অক্টেন। ইরান নিকট অতীতেও তার চাহিদা মেটানোর জন্য পরিশোধিত পেট্রোল বা বেঞ্জিনের এক তৃতীয়াংশই আমদানী করতো বিদেশ থেকে। বর্তমানে দেশটি এইসব জ্বালানী নিজেই উৎপাদন করছে এবং বিদেশেও একশ কোটি লিটার বেঞ্জিন রপ্তানীর জন্য বাজার খুঁজছে। অর্থাৎ এই জ্বালানী খাতে ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা দেশটির জন্য আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে এবং ইরান এখন এ খাতে স্বনির্ভর হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সেক্টরের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরিণতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরান আন্তর্জাতিক মানের দুই কোটি লিটার বেঞ্জিন বিদেশে রপ্তানীর জন্য উৎপাদন করবে।

৩২ বছর আগে ইরান তার তেল ও জ্বালানী শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট খুচরা যন্ত্রাংশও মেরামত করতে পারত না। এ শিল্পে মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়ারও অনুমতিও দিত না পশ্চিমা শোষক দেশগুলো বা তাদের তল্পীবাহক স্থানীয় সরকার। বর্তমানে ইরানী বিশেষজ্ঞরা তেল ও গ্যাস শিল্পের মেরামত বা সংস্কার প্রকল্পগুলো নিজেরাই চালাচ্ছেন।
ইসলামী বিপ্লবের ৩২তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে ইরানের গ্যাসভিত্তিক দ্বিতীয় পাওয়ার হাউজে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৬০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে ইরানের অবস্থান ১৬ তম।

ইসলামী ইরান ডিম, দুধ, গোশত, মোরগ ও গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশটি এখন বিদেশে ৪৯ টি কৃষি পণ্য রপ্তানী করছে। অথচ ইসলামী বিপ্লবের আগে দেশটি বেশির ভাগ খ্যাদ্য-সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানী করত।
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর প্রথম দিকে ইরানে উৎপাদিত হত দুই কোটি ৪০ লক্ষ টন কৃষি সামগ্রী বা ফসল। বর্তমানে উৎপাদন করছে দশ কোটি ৭০ লাখ টন। দেশটির তেল বহির্ভূত রপ্তানীর শতকরা ১৪ আসে কৃষি পণ্য থেকে। ইরান বিদেশে দুগ্ধজাত সামগ্রীও রপ্তানী করছে।
এটা স্পষ্ট, পাশ্চাত্যের শত বাধা ও নিষেধাজ্ঞা ইরানের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারছে না। বরং ইরানী জাতির উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বাধভাঙ্গা জোয়ারের মতই সকল ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে।

২.
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক উন্নয়নের দিক থেকে বিশ্বের দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ সম্পর্কে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরান প্রতিশ্রুত সময়ের আগেই স্বাস্থ্য বিষয়ক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বা ইউ এন এফ পি এ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘হু' স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ইরানের ঐ অগ্রগতির কথা স্বীকার করেছে। সংস্থাগুলো বলেছে, ইরান সন্তান জন্মদানকালীন মাতৃ মৃত্যুর হার ব্যাপকহারে কমাতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে জন্মদানকালীন এক লক্ষ মায়ের মাঝে যেখানে ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে ২০০৮ সালে প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে মৃত্যর সংখ্যা কমে দাড়িয়েঁছে ত্রিশে। তার মানে দাঁড়ালো ইরান সন্তান জন্মদানকালীন মাতৃমৃত্যুর হার চার ভাগের তিন ভাগ কমাতে সক্ষম হয়েছে।

ক্লিনিক্যাল গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ইরানে মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজি দ্রুততার সাথে এগুচ্ছে। ইরানের অবস্থান বর্তমানে এশিয়ায় জাপান, কোরিয়া এবং চীনের পরেই। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদিত ইরানের ঔষধ এখন পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক, পোল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সিরিয়ায় রপ্তানী করা হচ্ছে। ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডঃ মিসেস মার্যিয়া ওয়াহিদ দাস্ত্‌জার্দি গত ডিসেম্বরে তেহরানে অনুষ্ঠিত সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাকশন শীর্ষক বৈঠকে ঔষধ শিল্পে ইরানের অগ্রগতির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেনঃ এইসব অগ্রগতির বেশিরভাগই অর্জিত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে বিগত ত্রিশ বছর ধরে আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে। তিনি বলেনঃ ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দশকে ইরানের তৈরি দূরারোগ্য বহু রোগের ঔষধ বাজারে এসেছে এবং ইরান দূরারোগ্য রোগগুলোর জন্যে তৈরি উচ্চমূল্যের ঔষধগুলো বিশেষ করে ক্যান্সারের মতো রোগের ঔষধ বাজারে ব্যাপকহারে সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে ব্যবহারকারীদের জন্যে এইসব ঔষধ সস্তা এবং সহজলভ্য হয়।'

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইরানের অপর একটি সাফল্য হলো ব্লাড প্লাজমা উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা এবং তা থেকে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদন। চলতি খ্রিস্টীয় বছরের শুরুতে ইরানের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের তালিকায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ডঃ ওয়াহিদ দাস্ত্‌জার্দি আরো জানিয়েছেন, ইরানী বিশষজ্ঞগণ শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ ব্লাড প্লাজমা তৈরির উপকরণ তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন খুব শীঘ্রই এসেবের মাধ্যমে নতুন ধারার ঔষধ উৎপন্ন করা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে প্লাজমা পরিশোধনকেন্দ্র নির্মাণ এবং এখানকার উৎপন্ন ঔষধ মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে এই নতুন ধারার ঔষধ রপ্তানী করা। ইরানে প্লাজমা উৎপাদনের পরিমাণ আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দেড় লক্ষ লিটারে পৌঁছে যাবে। ইতোপূর্বে এই ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবোলিন বা আইভিআইজি আমদানী করার জন্যে ইরানকে চার থেকে পাঁচ কোটি ডলার খরচ করতে হতো।

গত ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপে ঔষধ তৈরির জন্যে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ লিটার ইরানী প্লাজমা ইউরোপে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে দেশের প্রয়োজনীয় ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবোলিনের চাহিদা ইরানী প্লাজমা থেকেই উৎপাদিত হচ্ছে।দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুরক্ষাসহ আরো অনেক দুরারোগ্য সমস্যার ক্ষেত্রে এই আই ভি আই জি ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে দুই কোটি সত্তুর লক্ষ লিটার প্লাজমা উৎপাদিত হয়। এর মধ্য থেকে আশি থেকে নব্বুই লক্ষ লিটার ব্যবহৃত হয় ঔষধের কাজে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্লাজমা থেকে উৎপন্ন ঔষধের বাজারের শতকরা প্রায় চল্লিশ ভাগই উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে, শতকরা বত্রিশ ভাগ ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে আর শতকরা দুই ভাগ মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গত এক দশকে চিকিৎসা সেবা ও ঔষধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইরানের সাফল্য বেশ উজ্জ্বল। নিঃসন্দেহে এসব কিছুই প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামর্থ বৃদ্ধি এবং সৃজনশীল মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগানোর ফসল। এই উন্নয়ন ও অগ্রগতির কারণে ইরানের স্বাস্থ্য সেবার অগ্রগতি লাভে সক্ষম হয়েছে, সক্ষম হয়েছে পর্যটকদের স্বাস্থ্য সেবাও নিশ্চিত করতে।
২০১০ সালের মে মাসে তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে মেডিক্যাল ট্যুরিজম সম্মেলন। মেডিক্যাল সেক্টরে ইরানের সাফল্য ও সক্ষমতার সাথে মুসলিম দেশগুলোকে পরিচয় করানোই ছিল এই সম্মেলন আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এর কয়েক মাস পর নভেম্বর মাসে ইরান ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় সুস্থতা বিষয়ক আরেকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইরান এখন মেডিক্যাল ট্যুরিজম শিল্পে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাতারে রয়েছে। এখন সারা বছর জুড়েই সমগ্র বিশ্ব দেশেই বহু মানুষ চিকিৎসার জন্যে ইরানে আসছেন। বেশিরভাগ রোগী হলেন বৃটেন, সুইডেনসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর।

ইরান এখন ভর্তুকি হ্রাসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে, তবে গণস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মান আরো বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য নীতিতে চিকিৎসা ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।এ কারণে ইরানে যে-কোনো অপারেশনের ব্যয় তুরস্ক, বৃটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক চতুর্থাংশের মতো। তবে চিকিৎসার গুণগত অবস্থা বিশ্বমানের। সেজন্যেই বিদেশী রোগীরা ইরানের চিকিৎসার মানের ব্যাপারে সন্তুষ্ট। এছাড়া ইরানী অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক এবং সাধারণ চিকিৎসকগণ বেশ দক্ষ। বিদেশী সহযোগীরা সবসময়ই তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

এশিয়ার দেশগুলোর মাঝে মেডিক্যাল ট্যুরিজম ক্ষেত্রে কঠোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রতিযোগিতায় ইরানের অবস্থান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশটি দেশের মধ্যে রয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মেডিক্যাল ট্যুরিজম ক্ষেত্রে এশীয় দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরও করেছে।বর্তমানে বছরে প্রায় সত্তুর হাজার রোগী সুস্থ পর্যটনের লক্ষ্যে ইরান সফরে আসে এবং ইরানের উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে উপকৃত হচ্ছে। ইরানের অন্তত ষাটটি হার্ট অপারেশোন কেন্দ্রে ওপেন হার্ট সার্জারি হচ্ছে। ইরানের এই চিকিৎসা সেবা বিশ্বের চিকিৎসকগণকে আকৃষ্ট করছে। কেবল ওপেন হার্ট সার্জারিই নয় আরো বহু জটিল ও মারাত্মক রোগের চিকিৎসা এখন বেশ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা

৩.
২০১০ সালে বিশ্বে যত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বা বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচিত বা প্রকাশিত হয়েছে তার শতকরা দশভাগই ছিল ইরানের। উন্নয়নশীল কোনো দেশের জন্য এ হার খুবই উঁচু। ২০০৫ সালে এক্ষেত্রে ইরানের অবদান ছিল দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১০ সাল নাগাদ বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনায় দেশটির অগ্রগতি হয়েছে দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ সাল নাগাদ ইরান এক্ষেত্রে তার প্রবৃদ্ধিকে দ্বিগুণ করতে চায়। অর্থাৎ ওই সময়ে বিশ্বের শতকরা ২ ভাগ বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ইরান।

ইরানে ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২৩ ভাগ। এ খাতে ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল নাগাদ ইরানের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৩২ ভাগে উন্নীত হয়। এরই আলোকে বিশ সালা পরিকল্পনার আওতায় ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বের শতকরা ২ ভাগ বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ইরানকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে এ খাতে।

বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনায় ইরানের প্রবৃদ্ধি এ খাতে বিশ্বের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ১৩ গুণ বেশি। ইন্টারন্যাশনাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট বা আই এস আই'র হিসেব অনুযায়ী ইরান ২০০৯ সালে বিশ হাজার ২২৮ টি বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনা করে এ খাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫৫ টি দেশের মধ্যে ২২ তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। ২০০৮ সালে এক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান ছিল আরো দুই ধাপ নিচে। এ খাতে দেশটির কেবল পরিমাণগত নয়, গুনগত প্রবৃদ্ধিও ঘটছে। ইরানে ২০১০ সালেও এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ইসলামী এই দেশটিতে বিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রবন্ধ রচনায় অগ্রগতি এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটি অচিরেই মধ্যপ্রাচ্যে এ খাতে শীর্ষ স্থান দখল করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

চিকিৎসা গবেষণা ও ওষুধ উদ্ভাবন বা উৎপাদনে ইরানের সাফল্য আরো চমক-জাগানো। বিগত কয়েক বছরে তেহরান নিজস্ব বা দেশীয় লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় ৫০ টি ওষুধের উপজাত বা উপাদান তৈরি করেছে। এসবের মধ্যে এম এস নামক এন্টিবায়োটিক ওষুধ অন্যতম। কয়েক বছর আগেও এ ওষুধটি ছিল বিশ্বের অল্প কয়েকটি উন্নত দেশের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে।

ইরান বর্তমানে গামা ইন্টারফেরনের মত বায়ো-প্রযুক্তিগত ওষুধও তৈরি করছে। নানা ঘা বা পচনের কারণে যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ-ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিয়েছে তাদের চিকিৎসার জন্য এ ধরনের উন্নত মানের ওষুধ দরকার হয়। ইরানের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী ডক্টর ওয়াহিদ মার্জিয়ে দাস্তজেরদি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইরান ওষুধ শিল্পে স্বনির্ভর হতে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। বর্তমানে ইরান তার চাহিদার শতকরা ৯৬ ভাগ ওষুধ নিজেই তৈরি করছে। বাকী শতকরা চার ভাগ ওষুধও ইরানে উৎপাদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। ওষুধ উৎপাদন শিল্পের নানা দিকে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে তেহরান। কিউবা ও তুরস্কের মত দেশ এবং বিশ্বের কয়েকটি নির্ভরযোগ্য ওষুধ কোম্পানীর সহায়তায় বা যৌথ উদ্যোগে ওষুধ তৈরির পরিকল্পনাও নিয়েছে ইরান।
নতুন প্রযুক্তি খাতে ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের অন্যায্য ও তীব্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি গত বছর নরম জিলেটিনিক ক্যাপসুল তৈরির কারখানা চালু করেছে। এ ছাড়াও গত দুই বছরে তেহরান পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় নানা ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে ২০ ধরনের পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় ওষুধ তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইরান। এ লক্ষ্যে কাজ করছে ১২০ টি পারমাণবিক চিকিৎসা কেন্দ্র।

ন্যানো প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ইরান ১৯ ৯০'র দশকেই জেনারেটর মলিবডিন জাতীয় ওষুধ উৎপাদনের তৎপরতা শুরু করে এবং বর্তমানে তেহরান এ জাতীয় সাত ধরনের ওষুধ তৈরি করছে।
অন্য অনেক ওষুধ তৈরিতেও অনেক অগ্রসর হয়েছে ইসলামী ইরান। বর্তমানে ইরান ডিফেরাসাইরক্স বা ডিফেরাসিরক্স নামক ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হবার গৌরব অর্জন করেছে। এ ওষুধটির বাণিজ্যিক নাম ওসভিরাল। থ্যালাসামিয়া রোগ নিরাময়ের জন্য এই ট্যাবলেট ব্যবহৃত হয়। ট্রাইপটোরলিন নামক রাসায়নিক ওষুধও এখন ইরানে বিপুল পরিমাণে তৈরি হচ্ছে। এক বছর আগেও ইরানকে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত এ ওষুধ।

বায়োটেকনোলজিক্যাল ওষুধ উৎপাদনে ইরান এখন ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বি। এই খাতে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ছাড়াও ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের একচেটিয়া কর্তৃত্ব বিলুপ্ত করেছে।
রক্তরস বা সিরাম ও ভ্যাকসিন বা টিকা উৎপাদনেও এগিয়ে যাচ্ছে ইরান। দেশটির আলরাজি সিরাম সংস্থায় তৈরি হচ্ছে ৬০ ধরনের বায়োলজিক্যাল উপজাত। ৮০ বছরের পুরনো এ প্রতিষ্ঠান ওষুধ ও টিকা তৈরিতে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। পোলিও, হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া, হাম ও টিটেনাসের টিকাসহ প্রতি বছর সাড়ে তিনশ কোটি ডোজ ওষুধ তৈরি করছে এ সংস্থা। ইরান এখন ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা উৎপাদনের চেষ্টা করছে এবং পরীক্ষাগারে এর প্রাথমিক পরীক্ষা সফল হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরান এই টিকা তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইরান ওষুধ ও চিকিৎসাখাতসহ নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে বাণিজ্য ও সম্পদ গড়ার কাজেও ব্যবহার করতে চায় এবং হতে চায় বিশ্বে বিজ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র। পরমাণু, ন্যানো, ক্লোনিং ও মৌলিক কোষ বা স্টেমসেল প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করে এরি মধ্যে তেহরান তার এই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে গেছে অনেক দূর।
বিগত কয়েক বছরে ইরান ক্লোনিং পদ্ধতিতে একই ধরনের ছাগলের বাচ্চা উৎপাদন করে এ খাতে বিশ্বে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। ক্লোনিংয়ের পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বৃটেন ও চীনের পরেই ইরান সাফল্য অর্জন করে। ইরান এ পদ্ধতিতে বাছুরও জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানই একমাত্র দেশ যে ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে গরু, ছাগল ও ভেড়া জন্ম দিতে সক্ষম হল।

পরমাণু, মহাশুন্য, ক্লোনিং ও চিকিৎসা খাতে ইরানের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে বার্তা সংস্থা এসোশিয়েটেড প্রেস লিখেছে, "ইরান এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে প্রথম স্থান অর্জনের লক্ষ্য পূরণ করতে চায়।"

৪.

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ধর্মীয় চেতনার আলোকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতি অর্জনের প্রচেষ্টা জোরদার হয়। বিজ্ঞান ও শিল্প-খাতে পশ্চাদপদ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা ছিল এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনের পথ ধরে ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বেশ দর্শনীয় বা অসাধারণ সাফল্যের নাগাল পেয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৬ সালে পবিত্র মাশহাদ শহরে ঘোষণা করেন যে, তার দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পরমাণু জ্বালানী চক্র সংক্রান্ত প্রযুক্তি পুরোপুরি আয়ত্ত্ব করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানে এ দিনটিকে "পরমাণু প্রযুক্তির জাতীয় দিবস" হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের কয়েক দশকের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আর বাধা সত্ত্বেও তেহরান স্থানীয় লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি অর্জনে সক্ষম হয়। আর এ জন্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ইরানের বিরুদ্ধে প্রচারণা-যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক চাপ তীব্রতর করে। এসব চাপের ফলে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচী স্থগিত করবে বলে তারা আশা করছিল।
যে কোনো দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। এ জন্যই আজকাল বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন কর্মসূচীতে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার বা অর্জন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ'র সদস্য হয়েছিল ১৯৫৮ সালে এবং ১৯৬৮ সালে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এন পি টি-তে সই করে। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা গঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ইরান পরমাণু ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন এবং এ প্রযুক্তির স্থানীয়করণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়।
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা,শিল্প ও কৃষিকাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য গবেষণামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এসব খাতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে।

তেহরান ১৯৮২ সালে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি অর্জন এবং এ সংক্রান্ত গবেষণায় স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সারা দেশে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার কয়েকটি বিভাগ ও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৮ সালে ইরানে গঠিত হয় উন্নত বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত পরিষদ। এই পরিষদ বুশেহের ছাড়াও ইরানের অন্যান্য স্থানে পরমাণু চুল্লী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইরানের ভেতরেই এসব পরমাণু চুল্লীর জন্য ব্যবহৃত পরমাণু জ্বালানীর অংশ বিশেষ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়।

ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাত করার প্রাথমিক পর্যায় তথা ইউসিএফ প্রকল্প গড়ে তোলা ছাড়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্থাপনা প্রতিষ্ঠা যে অর্থহীন সেটা এ সময়ই ইরানী কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ফলে ২০০০ সালে ইরানে ইউ সি এফ প্রকল্প চালু করা হয়। চীনা বিশেষজ্ঞদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও ইরানের তরুণ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা মাত্র চার বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে চীনা বিশেষজ্ঞদের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এ প্রকল্প চালু করতে তেহরানকে দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষা করতে হত।

ইরানের নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প চালু হয় ২০০৬ সালের বসন্তকালে। একই সময়ে ইরান ইয়েলো কেক উৎপাদনেও সক্ষম হয়। এ ছাড়াও গত চার বছরে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীরা নাতাঞ্জ, ইস্ফাহান ও আরাকের পরমাণু স্থাপনাগুলোয় নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যুব প্রজন্মের। পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানী বিজ্ঞানীদের একের পর এক নতুন সাফল্যে দিশাহারা পাশ্চাত্য দেশটির বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণা জোরদার করে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রভাব খাটিয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে চার চারটি প্রস্তাব পাশ করে। এসব প্রস্তাবে ইরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু এতসব চাপ সত্ত্বেও ইরান পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ'র সদস্য হিসেবে এবং এন পি টি বা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের বিশ সালা পরিকল্পনায় ২০ টির বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্ততঃ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। আসলে পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানের প্রতি পাশ্চাত্যের অসহযোগীতার ফলে ইরান এক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়।

ইরান এখন বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু দেশের মধ্যে অন্যতম যেসব দেশ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসার কাজে নানা পারমাণবিক ওষুধ, রেডিও আইসোটোপ ও রোগ নির্ণায়ক পরমাণু যন্ত্র ব্যবহার করছে।
পরমাণু রশ্মি বা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন বা বীজের সংস্কার এবং এভাবে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধি ; খাদ্য সামগ্রীর স্টেরিয়ালাইজেশান বা জীবানুমুক্ত করা ও খাদ্য সামগ্রীকে স্বাস্থ্যসম্মত করা; পশুর জন্য টিকা তৈরি, তেলের পাইপ লাইনের সংস্কার,সংকোচনযোগ্য পলিমারের পাইপ নির্মাণ; বিভিন্ন ধরনের লেজার রশ্মি ব্যবহার এবং হাত-পায়ের ছাপ নির্ণয়ের মত বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর কিছু অংশ।

এ ছাড়াও আলোক-রশ্মি বা তেজস্ক্রিয় রশ্মির মত বিভিন্ন রশ্মির মাধ্যমে চিকিৎসার কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী, দেশকে বাইরের সীমান্ত থেকে আসা পারমাণবিক রশ্মির নিঃস্বরণ বা হামলা থেকে রক্ষা, দূষিত খাদ্য ও স্বাস্থ্য-সামগ্রীর অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান রোধ করা প্রভৃতি ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে ইরান এরিমধ্যে অনেক দর্শনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

৫.

শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ধর্মীয় চেতনার আলোকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগতি অর্জনের প্রচেষ্টা জোরদার হয়। বিজ্ঞান ও শিল্প-খাতে পশ্চাদপদ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা ছিল এ প্রচেষ্টার লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনের পথ ধরে ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিসহ বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বেশ দর্শনীয় বা অসাধারণ সাফল্যের নাগাল পেয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ২০০৬ সালে পবিত্র মাশহাদ শহরে ঘোষণা করেন যে, তার দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে পরমাণু জ্বালানী চক্র সংক্রান্ত প্রযুক্তি পুরোপুরি আয়ত্ত্ব করতে সক্ষম হয়েছে। ইরানে এ দিনটিকে "পরমাণু প্রযুক্তির জাতীয় দিবস" হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের কয়েক দশকের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আর বাধা সত্ত্বেও তেহরান স্থানীয় লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি অর্জনে সক্ষম হয়। আর এ জন্যই ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলো আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ইরানের বিরুদ্ধে প্রচারণা-যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক চাপ তীব্রতর করে। এসব চাপের ফলে ইরান তার পরমাণু কর্মসূচী স্থগিত করবে বলে তারা আশা করছিল।
যে কোনো দেশের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। এ জন্যই আজকাল বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন কর্মসূচীতে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার বা অর্জন অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ'র সদস্য হয়েছিল ১৯৫৮ সালে এবং ১৯৬৮ সালে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এন পি টি-তে সই করে। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা গঠিত হয় ১৯৭৪ সালে। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর ইরান পরমাণু ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন এবং এ প্রযুক্তির স্থানীয়করণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়।
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা,শিল্প ও কৃষিকাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য গবেষণামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এসব খাতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে।

তেহরান ১৯৮২ সালে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি অর্জন এবং এ সংক্রান্ত গবেষণায় স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সারা দেশে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার কয়েকটি বিভাগ ও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৮ সালে ইরানে গঠিত হয় উন্নত বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংক্রান্ত পরিষদ। এই পরিষদ বুশেহর ছাড়াও ইরানের অন্যান্য স্থানে পরমাণু চুল্লী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইরানের ভেতরেই এসব পরমাণু চুল্লীর জন্য ব্যবহৃত পরমাণু জ্বালানীর অংশ বিশেষ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়।
ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাত করার প্রাথমিক পর্যায় তথা ইউসিএফ প্রকল্প গড়ে তোলা ছাড়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্থাপনা প্রতিষ্ঠা যে অর্থহীন সেটা এ সময়ই ইরানী কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। ফলে ২০০০ সালে ইরানে ইউ সি এফ প্রকল্প চালু করা হয়। চীনা বিশেষজ্ঞদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও ইরানের তরুণ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা মাত্র চার বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে চীনা বিশেষজ্ঞদের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে এ প্রকল্প চালু করতে তেহরানকে দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষা করতে হত।

ইরানের নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প চালু হয় ২০০৬ সালের বসন্তকালে। একই সময়ে ইরান ইয়েলো কেক উৎপাদনেও সক্ষম হয়। এ ছাড়াও গত চার বছরে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীরা নাতাঞ্জ, ইস্ফাহান ও আরাকের পরমাণু স্থাপনাগুলোয় নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যুব প্রজন্মের। পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানী বিজ্ঞানীদের একের পর এক নতুন সাফল্যে দিশাহারা পাশ্চাত্য দেশটির বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণা জোরদার করে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রভাব খাটিয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে চার চারটি প্রস্তাব পাশ করে। এসব প্রস্তাবে ইরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু এতসব চাপ সত্ত্বেও ইরান পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ'র সদস্য হিসেবে এবং এন পি টি বা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের বিশ সালা পরিকল্পনায় ২০ টির বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্ততঃ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। আসলে পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানের প্রতি পাশ্চাত্যের অসহযোগীতার ফলে ইরান এক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়।

ইরান এখন বিশ্বের মুষ্টিমেয় কিছু দেশের মধ্যে অন্যতম যেসব দেশ বিভিন্ন জটিল চিকিৎসার কাজে নানা পারমাণবিক ওষুধ, রেডিও আইসোটোপ ও রোগ নির্ণায়ক পরমাণু যন্ত্র ব্যবহার করছে।
পরমাণু রশ্মি বা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন বা বীজের সংস্কার এবং এভাবে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধি ; খাদ্য সামগ্রীর স্টেরিয়ালাইজেশান বা জীবানুমুক্ত করা ও খাদ্য সামগ্রীকে স্বাস্থ্যসম্মত করা; পশুর জন্য টিকা তৈরি,
তেলের পাইপ লাইনের সংস্কার, সংকোচনযোগ্য পলিমারের পাইপ নির্মাণ; বিভিন্ন ধরনের লেজার রশ্মি ব্যবহার এবং হাত-পায়ের ছাপ নির্ণয়ের মত বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর কিছু অংশ।

এ ছাড়াও আলোক-রশ্মি বা তেজস্ক্রিয় রশ্মির মত বিভিন্ন রশ্মির মাধ্যমে চিকিৎসার কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী, দেশকে বাইরের সীমান্ত থেকে আসা পারমাণবিক রশ্মির নিঃস্বরণ বা হামলা থেকে রক্ষা, দূষিত খাদ্য ও স্বাস্থ্য-সামগ্রীর অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান রোধ করা প্রভৃতি ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে ইরান এরিমধ্যে অনেক দর্শনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

৬ .

ইরান পরমাণু তৎপরতা প্রথমবারের মত শুরু করেছিল ১৯৫৬ সালে ইসলামী বিপ্লবের অনেক বছর আগে। সে বছর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ গবেষণাকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্যে ইরান ও আমেরিকা সে বছরই একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে ১১ বছর পর ১৯৬৭ সালে এ পরমাণু কেন্দ্রে ৫ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন একটি পরমাণু চু্ল্লী চালু করার মাধ্যমে ইরানের বাস্তব পরমাণু তৎপরতা শুরু হয়। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পরমাণু চুল্লী বসাতে সহায়তা করেছিল মার্কিন সরকার। যদিও শিক্ষা ও গবেষণাই ছিল এ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এ চুল্লিটি নির্মাণের সময় ইরানের প্রকৌশলীদের উপস্থিতি বা তাদের সহযোগীতার ব্যাপারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, ইরানের বিজ্ঞানীরা যাতে এ প্রযুক্তির ব্যাপারে ধারণা অর্জন করতে না পারে সেজন্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চুল্লির যন্ত্রপাতি সংযোজন ও চুল্লির কাজ শুরু করার সময় কোনো ইরানী বিজ্ঞানীকে উপস্থিত থাকতে দেয়া হয় নি।

১৯৭১ সালে ইরানের শাহ সরকার পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশের সাথে পরমাণু বিষয়ে বেশ কটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তিগুলোর মধ্যে ইরানের বুশেহরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্যে জার্মানীর সাথে করা চুক্তিসহ দারখুইনে অন্য একটি পরমাণু চুল্লি নির্মাণের জন্যে ফ্রান্সের সাথে চুক্তি, পারমাণবিক চুল্লিগুলোর জন্যে জ্বালানী সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি এবং ফরাসী ইউরোডিফ কোম্পানীর শতকরা ১০ ভাগ শেয়ার ক্রয়ের ঘটনা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৪ সালে তেইশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরমাণু গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বুশেহরে পরমাণু স্থাপনা নির্মাণের প্রকল্প শুরু করে ইরান। জার্মান কোম্পানী জিমেন্স ও ইরানের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি অনুযায়ী জিমেন্সের আওতাধীন ক্রাফ্টওয়ের্ক নেটওয়ার্ক নামক কোম্পানী বুশেহরে ১২০০ মেগাওয়াট শক্তি-সম্পন্ন দু'টি লাইট ওয়াটার চুল্লী নির্মাণের কাজ শুরু করে। জার্মান ও ইরানী বিশেষজ্ঞরা এ নির্মাণ কাজে শরীক হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরমাণু জ্বালানী উৎপাদন চক্র গড়ার ব্যাপারে দশ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান। চুক্তিটি ছিল নবায়নযোগ্য। এরপর ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালেও জার্মানী ও ফ্রান্সের সাথে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরান।

আইন অনুয়ায়ী ইরান এখনও ফরাসী কোম্পানী ইউরোডিফের শতকরা ১০ ভাগ শেয়ারের মালিক। ইরানের দারখুইনে ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম পরমাণু চুল্লী নির্মাণের জন্য ফরাসীরা ১৯৭৭ সালে তেহরানের সাথে চুক্তি করেছিল।
এসব চুক্তি থেকে বোঝা যায় সে সময় পশ্চিমা দেশগুলো ইরানে পরমাণু প্রযুক্তির বাজার পেতে পরস্পর প্রতিযোগীতা করছিল। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হবার পর পশ্চিমা সরকার ও পশ্চিমা কোম্পানীগুলো পরমাণু বিষয়ে ইরানের সাথে সহযোগীতা অব্যাহত রাখতে রাজী হয় নি। কারণ, বিপ্লবী সরকার পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপকামী শাসন ও শোষণের নীতি মেনে চলছিল না। ফলে বুশেহর পরমাণু প্রকল্প প্রায় অর্ধ সমাপ্ত থেকে যায়। স্থগিত হয়ে যায় অন্য প্রকল্পগুলো।
এ অবস্থায় ইরান পরমাণু জ্বালানী চক্রের প্রযুক্তি অর্জন ওপারমাণবিক চুল্লিগুলোর নির্মাণ সম্পূর্ণ করার জন্যে অন্যান্য দেশের শরণাপন্ন হয়। অধিকাংশ দেশ পাশ্চাত্য ও আমেরিকার চাপের মুখে পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানের সাথে সহযোগীতা মাঝপথে বন্ধ করে দেয় অথবা খুবই সিমীত পর্যায়ে অব্যাহত রাখে।

পাশ্চাত্যের অসহযোগীতা সত্ত্বেও ইসলামী ইরান নিজস্ব মেধা ও সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে তার পরমাণু কর্মসূচী এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ইসলামী ইরান ইউরেনিয়ামের খনি আবিষ্কার ও তা উত্তোলন করে ইউরেনিয়ামকে ইয়েলো কেইকে পরিণত করার প্রযুক্তি আয়ত্ত করে। এমনকি ইরান ইস্পাহানে ইয়েলো কেইককে হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসে রুপান্তর করার স্থাপনা বা ইউরেনিয়াম কনভারশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে এবং নাতাঞ্জ এলাকায় সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রের সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতেও সক্ষম হয়।
এ ছাড়াও ইরানের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা হেভী ওয়াটার চুল্লি ও হেভী ওয়াটার সামগ্রী নির্মাণে সফল হয়েছে। এ স্থাপনার কার্যক্রমও পুরোদমে চালু হয়েছে।
আরো বড় সাফল্যের ব্যাপার হলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সেন্ট্রিফিউজ ছাড়াই বিকল্প পদ্ধতিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার উপায় বের করার জন্যে গবেষণা শুরু করে এবং এক্ষেত্রে লেজার পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষাগারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সফল হয়েছে।

রাশিয়ার সহযোগীতায় পরিপূর্ণ হওয়া বুশেহরে পরমাণু স্থাপনা এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এ স্থাপনার কম্পিউটারগুলোকে স্টুক্সনেট ভাইরাসের মাধ্যমে অচল করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদী ইসরাইল। বুশেহরে পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক নানা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এ পরমাণু স্থাপনায় পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক বা অনিয়ন্ত্রিত কিছু খুঁজে পায়নি। বুশেহরে পরমাণু স্থাপনার পরিবেশগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিরাপদ হওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ অনুরূপ পরমাণু স্থাপনা নির্মাণের আশা করছে।

ইরান ২০০৯ সালে বিশ্বের শান্তিপূর্ণ পরমাণু স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে হুমকি বা হামলা নিষিদ্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় একটি প্রস্তাব তোলে। এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। বিশ্বে ৪০০'রও বেশি পরমাণু বিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে এবং রয়েছে ৩০০'রও বেশি গবেষণামূলক নানা পরমাণু স্থাপনা। এসব স্থাপনায় বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকায় কোনো সামরিক হামলা ভয়াবাহ পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই শান্তিকামী প্রতিটি দেশ শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিরাপদ করার জন্য পরমাণু স্থাপনাগুলোর সুরক্ষার বা নিরাপদ রাখার নিশ্চয়তা চায়।

ইরান বুশেহরে, নাতাঞ্জ ও আরাকের পরমাণু স্থাপনা ছাড়াও আরো কয়েকটি নতুন পরমাণু স্থাপনা এবং বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য কয়েকটি নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এরিমধ্যে অনেক স্থাপনার স্থান বাছাই করা শেষ হয়েছে। আগামী বছরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার নতুন স্থাপনাগুলোর মধ্যে তৃতীয়টির নির্মাণ কাজ শুরু করবে ইরান। ইরানের বিশ সালা পরিকল্পনায় ২০ টিরও বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্ততঃ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে।

৭.

জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি ও ফসিল জ্বালানী ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের বহু দেশ পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী জ্বালানী হিসেবে পরমাণূ জ্বালানী ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বর্তমান বিশ্বে বিপুল সংখ্যক পারমাণবিক চুল্লীর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের বিদ্যুতের চাহিদা এসব চুল্লীর মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বর্তমানে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৫০০। আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়া, জার্মানী, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, বৃটেন ও সুইডেন পারমাণবিক বিদ্যুৎ ঊৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানী তেল ব্যবহার করা হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছর পর এই হারে জ্বালানী তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। বিশ্বের গ্যাসের মজুদ বড় জোর আগামী ৭০ বছর এবং পাথুরে কয়লার মজুদ প্রায় ২৩০ বছর পর্যন্ত মানুষের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। ১৮৫০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বে জ্বালানী ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে দশ গুণ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ এই ব্যবহার কমপক্ষে আরো দশ গুণ বাড়বে।

আর এইসব কারণেই প্রত্যেক স্বাধীনচেতা দেশই পরমাণু জ্বালানী ও পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে বা তা অর্জনের স্বপ্ন দেখছে। ইরানও আজ এক্ষেত্রে একটি সফল জাতি। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে পরমাণু জ্বালানীর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো চক্র ইরানী বিজ্ঞানীরা আয়ত্ত্ব করতে পেরেছেন। গত কয়েক বছরে ইউ সি এফ কারখানা ও ভারী পানির চুল্লী নির্মাণ, ফুয়েল ট্যাবলেট বা সমৃদ্ধ ঘনীভূত ইউরেনিয়াম উৎপাদন, পারমাণবিক প্লেট ও রড নির্মাণে ইরানের সাফল্য ছিল নজিরবিহীন ।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান পারমাণবিক গলন যন্ত্র নির্মাণেও সফল হয়। এর আগে বিশ্বের মাত্র ৪ টি দেশের কাছে এ প্রযুক্তি ছিল। এ চারটি দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স। পরমাণু বিভাজনের উল্টো পদ্ধতিতে জ্বালানী উৎপাদন করা হয় এ যন্ত্রে। হাল্কা পরমাণুগুলোকে একসাথে উত্তপ্ত করে ভারী পরমাণুতে পরিণত করে জ্বালানী উৎপাদন করা হয় এ পদ্ধতিতে। ইরানের প্লাজমা ফিজিক্স গবেষণা কেন্দ্র ওই পরীক্ষামূলক যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম হয়েছে। আগামী দশ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পারমাণবিক জগতে পরমাণু বিভাজনের পদ্ধতি বাতিল হয়ে এ নতুন পদ্ধতি চালু হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের প্লাজমা ফিজিক্স গবেষণা কেন্দ্র ন্যানো প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও একটি সফল প্রতিষ্ঠান । চিকিৎসা ক্ষেত্রে লেজার রশ্মি প্রয়োগের প্রশিক্ষণেও এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম রয়েছে। এ ব্যাপারে রাশিয়ার সাথে ইরানের সহযোগীতা রয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে ইরানের সাফল্যের উল্লেখযোগ্য দিক হল যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের নানা নিষেধাজ্ঞা এবং বাধা সত্ত্বেও ইসলামী এই দেশটি এইসব অভাবনীয় সাফল্যের মুকুট খচিত করতে সক্ষম হল তার গর্বোন্নত শিরে। ইরান এখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক গলন যন্ত্র পরিচালনায় এতটা দক্ষতা অর্জন করেছে যে দেশটি অন্য দেশের সাথেও এ সব ক্ষেত্রে যৌথ প্রকল্প পরিচালনা করতে সক্ষম।
পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতি দেশটির নেতৃবৃন্দের দূরদর্শী চিন্তার প্রজ্জ্বোল দৃষ্টান্ত। শিল্পোন্নত দেশগুলো যখন তাদের পরমাণু চুল্লীগুলোর আধুনিকায়ন বা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং পরমাণু জ্বালানী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ও গলন পদ্ধতিতে পরমাণু জ্বালানী উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে তখন এসব খাতে ইরানের অভাবনীয় অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও পরমাণু প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ইরান এখন তার চাহিদার শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ পারমাণবিক ওষুধ নিজেই উৎপাদন করছে। পারমাণবিক ওষুধ জ্বরসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। মুলিবডোন-৯৯ ও টেকনিসিয়াম এম-৯৯ এ ধরনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ওষুধের নাম। ইরানে এ দুটি ওষুধ এখন ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদন করা হচ্ছে। ইরান ছাড়া মাত্র অল্প যে কয়েকটি দেশ এইসব ওষুধ উৎপাদন করছে, সেগুলো হল, বেলজিয়াম, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, হল্যান্ড, বৃটেন, চীন ও ভারত।

ইরানী বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ক্রমিক ফসফেট পি-৩২ নামের রেডিও ড্রাগ বা পারমাণবিক ওষুধ তৈরিতে সফল হয়েছে। এই ওষুধ যকৃত ক্যান্সার নিরাময়ে ব্যবহৃতহয়। এ ছাড়াও ইরানী বিজ্ঞানীরা ক্যান্সার রোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরো কিছু ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বুম্বজিন-গ্যালিয়ুম-৬৮ নামক পারমাণবিক ওষুধও এখন ইরানে উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ওষুধ প্রেস্টেট, ফুসফুস, স্তন ও কোলনের টিউমারের ছবি তোলার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের অল্প কয়েকটি উন্নত দেশ এ ওষুধ তৈরি করছে।
ইরানী বিজ্ঞানীরা কিছু হাইব্রীড বা সংস্কারকৃত উদ্ভিদের বীজ আবিষ্কার করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে লবনাক্ততা প্রতিরোধে সক্ষম গমের বীজ, ঠান্ডা বা শীত প্রতিরোধে সক্ষম যবের বীজ, ছত্রাক মোকাবেলায় সক্ষম তুলার বীজ এবং তাড়াতাড়ি পাকতে সক্ষম কিছু ফল।

এ ছাড়াও ইরানী গবেষকরা খাদ্য ও কৃষি পণ্য সংরক্ষণ এবং সেগুলোর মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। পারমাণবিক বিকিরণ বা তেজস্ক্রিয়তা থেকে পরিবেশে রক্ষার ব্যাপারেও ইরানে অগ্রগতি ঘটেছে। ইরানের কাস্পিয়ান সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় উপকূলসহ উত্তর এবং দক্ষিণ ইরানে এসব সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় উপাদান পরিমাপক যন্ত্র বসানো হয়েছে। ইরানী বিজ্ঞানীরা তেলের পাইপ লাইনে ফাটল বা তেল নিঃস্বরণ সনাক্ত করার স্বয়ংক্রিয় বা চৌকষ যন্ত্র নির্মাণেও সফল হয়েছেন।
ইরানের মুসলিম জাতি সরকার শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর এক্ষেত্রে বিজাতীয়দের কোনো বাধাই যে পরমাণু প্রযুক্তিসহ নানা খাতে ইরানের দূর্বার অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করতে সক্ষম হবে না, গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

৮ .

আকাশ ও মহাশুন্য গবেষণায় ইরানের অগ্রগতি

বর্তমান যুগে বিমান ও মহাশুন্য খাতে অগ্রগতি যে কোনো দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের অগ্রগতি ভুগোল, মানচিত্র, খনি, মৃত্তিকা, সমুদ্র ও পরিবেশ বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞান আর উন্নয়নের অন্য অনেক শাখাকে সমৃদ্ধ করে। তাই মহাকাশ বা মহাশুন্য গবেষণা এবং এ সংক্রান্ত শিল্প ও প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরী ও কল্যাণকর প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা ও নানা বাধা সত্ত্বেও ইসলামী ইরান বিমান ও মহাশুন্য খাতেও একের পর এক অভাবনীয় এবং অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানী বিজ্ঞানীরা এখন মহাকাশে রকেটে বা মহাকাশযানের সাথে জীবন্ত প্রাণী বা বায়োলজিক্যাল ক্যাপসুল পাঠাচ্ছেন। ইরানের অনুসন্ধানী বা কাভেশগার রকেটগুলো পৃথিবীর ওপর বিভিন্ন ক্ষতিকর রশ্মি ও গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।

১৯৫৯ সালে ইরান পৃথিবীর আবহমন্ডলের বাইরে মানুষের ব্যবহার শীর্ষক কর্মসূচী বা প্রকল্পের সদস্য হয়েছিল। এ ব্যাপারে দূর থেকে পরিমাপ, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন এবং উপগ্রহ উৎক্ষেপণ ছিল এই কর্মসূচীর কিছু দিক। ইসলামী বিপ্লবের পর পাশ্চাত্যের দেশগুলোর অবরোধ সত্ত্বেও বর্তমানে ইরান কৃত্রিম উপগ্রহ উৎপাদন ও তা উৎক্ষেপণের প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করেছে। পরিবেশ, আবহাওয়া, গবেষণা এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবহারের জন্য বেশ কয়েকটি উপগ্রহ পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করেছে ইরান । ইরান "সিনা-এক" নামের একটি উপগ্রহ প্রথমবারের মত নির্মাণ করে রাশিয়ার সহযোগিতায়। পৃথিবীর কক্ষপথে ঐ কৃত্রিম উপগ্রহ নিক্ষিপ্ত এবং স্থাপিত হয় ২০০৫ সালে । দূর থেকে পরিমাপ এবং তথ্য আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ সিনা'র দুটি বড় মিশন। এ ছাড়াও পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ সম্পদ নিয়ে জরীপ, চাষযোগ্য অঞ্চলসহ উদ্ভিদ বা গাছ-পালা-বহুল অঞ্চল সনাক্ত করা ও প্রাকৃতিক বা নানা আকস্মিক দূর্যোগের প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক ডাক-সেবা প্রদান কৃত্রিম উপগ্রহ সিনার আরো কিছু কাজ । এরপর ইরান ২০০৬ সালে "কাভেশ" নামের রকেট পাঠায় মহাশুন্যে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য ইরান জোহরেহ বা শুকতারা ও মেসবাহ এবং মেসবাহ-দুই নামের আরো কয়েকটি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয়। তবে মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির পরবর্তী বড় সাফল্যটি ছিল "উমিদ" নামের কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ। উমিদ বা আশা নামের এ উপগ্রহ পুরোপুরি ইরানের নির্মিত প্রথম উপগ্রহ এবং এটি উৎক্ষিপ্ত হয়েছে ইরানের নির্মিত স্টেশন থেকে। ইরানের জাতীয় উপগ্রহ হিসেবে খ্যাত ওই কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণসহ এর যন্ত্রাংশ পরিকল্পিত ও নির্মিত হয়েছে ইরানী বিশেষজ্ঞদের হাতে। এটি ইরানের দ্বিতীয় উপগ্রহ যা পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত হয়। সাফির দুই বা দূত-দুই নামের একটি ইরানী উপগ্রহের মাধ্যমে উমিদকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। মূল উপগ্রহ "উমিদ" বা "আশা" ও এই উপগ্রহ বহনকারী রকেট ছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে স্থাপিত উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং এই স্টেশন বা কেন্দ্রের সমস্ত যন্ত্রপাতিও ইরানে নির্মিত হয়েছে। "উমিদ" ইরানে অবস্থিত তথ্য-গ্রাহক কেন্দ্রগুলোতে তথ্য পাঠায়।

টেলিযোগাযোগ, অনুসন্ধান ও গবেষণা-উপগ্রহ উমিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালের প্রথম দিকে। এরপর ২ বছরের মধ্যেই ওই উপগ্রহ ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ফলে ইরান বিশ্বে উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম গুটিকয়েক দেশের তালিকায় উঠে আসে। এর আগে বিশ্বের মাত্র ৮ টি দেশের কাছে ছিল এ প্রযুক্তি।
২০০৮ সালের গ্রীষ্মকালে "সাফিরে উমিদ-এক" বা "আশার-আলো-এক" নামের উপগ্রহের পরিকল্পনা ও নির্মাণ-কাজ শেষ হয় এবং তা উৎক্ষেপণ করা হয়। এর কিছুকাল পর উৎক্ষেপণ করা হয় "অনুসন্ধানী-দুই" বা "কাওয়েশগার-টু" ও ২০১০ সালে ছোঁড়া হয় "অনুসন্ধানী-তিন" বা "কাওয়েশগার-তিন" নামক রকেট। উড্ডয়ন-পথ সম্পর্কে ডাটা বা তথ্য-ব্যাংক পূর্ণ করা ছিল এইসব রকেট উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্য। "অনুসন্ধানী-দুই" বা "কাওয়েশগার-টু" নামক রকেটটি আকাশ ও পৃথিবীর আবহমন্ডলের ছবি, তাপমাত্রার পরিমাণ, চাপ ও অন্য অনেক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এইসব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার পর "সাফিরে উমিদ-দুই" বা "আশার-দূত-দুই" নামের উপগ্রহ বাহককে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে ইরান।
"মেসবাহ" ও "কাওয়েশগার-তিন" ব্যবহার করে ইরানী বিজ্ঞানীরা নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বায়োলজিক্যাল ক্যাপসুলের মাধ্যমে মহাশুন্যে জীবন্ত প্রাণী পাঠাতে সক্ষম হয়েছেন।
ইসলামী বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে "কাভেশগার-সে" ছাড়াও ইরান আরো ৩ টি উপগ্রহ এবং উপগ্রহবাহী রকেট "সি-মোরগ" উৎক্ষেপণ করে। উপগ্রহবাহী মোটর "সি-মোরগ" "সাফির'' বা "দূত-দুই''র উন্নততর মডেল। এটি ১০০ কেজি ওজনের কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবী থেকে ৫০০ কিলোমিটার উঁচু কক্ষপথে স্থাপন করতে সক্ষম।
বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষ্যে "তুলু"বা উন্মেষ নামের একটি উপগ্রহ উদ্বোধন করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ডঃ মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। পৃথিবী ও আকাশের নানা ছবি তুলে তা পৃথিবীতে পাঠানো ইরানের জাতীয় এ উপগ্রহের কাজ। এসব ছবি দেখে বিভিন্ন ধরনের মানচিত্র তৈরি করা ছাড়াও বোঝা যাবে যে পৃথিবীর সম্পদগুলো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়াও জানা যাবে জনবসতি, আবহাওয়া, কৃষি ও বনবিদ্যা সম্পর্কিত নানা তথ্য।

ইসলামী বিপ্লবের ৩১ তম বিজয়-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরান "মেজবাহ-দুই" বা বাতি-দুই নামের আরো একটি নিজস্ব উপগ্রহ প্রদর্শন করে। এটি একটি যোগাযোগ উপগ্রহ। এ ছাড়াও একই উপলক্ষ্যে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্ররা "নাভিদ" বা সুসংবাদ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করেছে। এ উপগ্রহ পৃথিবীর খুব নিখুঁত ছবি তুলতে সক্ষম।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ৩২ তম বিজয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে গত ৭ ই ফেব্রুয়ারি নিজস্ব প্রযুক্তির চারটি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট উদ্বোধন করেছে ইরান। ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ফাজর, রাসাদ, আমিরকাবির-এক ও জাফার নামের ওই চারটি স্যাটেলাইটের উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও এ দিনে তার উপস্থিতিতে উপগ্রহবাহী একটি রকেট ও অনুসন্ধানী-চার নামের একটি বায়ো ক্যাপসুলও উদ্বোধন করা হয়। এ ছাড়াও ইরানের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি একটি স্থল মহাশুণ্য স্টেশন চালু করেন তিনি। মহাশুন্য থেকে পাওয়া নানা তথ্য ও ছবির সংরক্ষণাগার রয়েছে এ স্টেশন।

ইরান আগামী দশ বছরে মহাকাশে নভোচারী পাঠাতে সক্ষম হবে বলে আশা করছে। ইরান বেশারত নামের মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন উপগ্রহ নির্মাণেও মুসলিম দেশগুলাকে সহযোগিতা করবে বলে ঘোষণা করেছে। এ ছাড়াও এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভিন্ন উপগ্রহ "এস এম এম" নির্মাণে এবং এর পরিকল্পনায় অংশ নেবেন ইরানের বিজ্ঞানীরা।
আকাশ ও মহাশুন্য গবেষণায় ইরানীরা ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করা সত্ত্বেও তারা একে এখনও প্রাথমিক অগ্রগতি বলে উল্লেখ করছে। কারণ, তারা জানে পাশ্চাত্যের চেয়ে তারা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে এসব ক্ষেত্রে। পাশ্চাত্যের কর্তৃত্ব মোকাবেলার জন্য জ্ঞান বিজ্ঞানে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনী মনে করেন। গোটা ইরানী জাতি তার এ নির্দেশনা অনুযায়ী জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনন্ত পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ।

৯.
ইস্পাত শিল্পের অগ্রগতি
ইস্পাত শিল্প আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মূলতঃ ইস্পাতের ব্যবহার ও উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে দেশগুলোর শিল্পখাতের অগ্রগতির অবস্থা নির্ধারণ করা হয়।
ইরানের ইস্পাত শিল্পের বয়স প্রায় ৫০ বছর। ১৯৭০ সালে ইরানের ইস্ফাহান প্রদেশে নির্মিত হয়েছিল প্রথম স্টিল মিল বা ইস্পাত কারখানা। দেশের ইস্পাতের চাহিদা মেটানো ছিল এ কারখানার লক্ষ্য। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বা জাতীয় কোম্পানী হিসেবে এ কারখানা ইরানের ইস্পাত শিল্পের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে ইরানের ইস্পাত শিল্পের অগ্রগতি দর্শনীয় বা অসাধারণ হয়ে ওঠে ইসলামী বিপ্লবের পর। ইরানের ইস্পাত কোম্পানীগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যে সর্ববৃহৎ ইস্পাত নির্মাতা। কয়েক বছর আগেও ইস্পাত উৎপাদক দেশগুলোর তালিকায় বিশ্বে ইরানের অবস্থান ছিল ২৬তম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ইরান এক্ষেত্রে ১৬ তম অবস্থানে রয়েছে।

ইস্পাত উৎপাদনের জন্য গ্যাস বা বিদ্যুতের যোগানসহ প্রয়োজনীয় নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। ইরানের ইসলামী সরকার এক্ষেত্রেও সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের রয়েছে ২০০ কোটি টন আকরিক লোহার খনি। রয়েছে বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ শ্রম শক্তি এবং বাজারজাত করার জন্য সমুদ্রপথের ব্যবস্থা। ফলে ইরান তার দেশীয় চাহিদা মেটানোর পর বিপুল পরিমাণ ইস্পাত বিদেশেও রপ্তানি করতে পারছে। দু-হাজার দশ সালে ইরানে ইস্পাত উৎপাদিত হয়েছে এক কোটি ৮০ লক্ষ টন। " বিজনেস মনিটর" সাময়িকীর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ইস্পাত উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সবচেয়ে বড় কোম্পানী হল, মোবারেকেহ ইস্পাত কোম্পানী। এরপর অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খুজেস্তান স্টিল মিল। ইরানের শতকরা ৩৪ ভাগ ইস্পাত উৎপাদন করছে এ কোম্পানী। ইস্ফাহান স্টিল মিল ও ইরানের ন্যাশনাল স্টিল কোম্পানী রয়েছে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে। ইরানের শতকরা ২০ ও ১০ ভাগ ইস্পাত উৎপাদন করছে এইসব কোম্পানী। ইরান বিদেশে যেসব ইস্পাত রপ্তানি করছে সেসবের বেশির ভাগই বড় আকৃতির ইস্পাত।

ইরানে গত বছর উৎপাদিত হয়েছে ৪৬ লক্ষ ২১ টন ইস্পাতের কড়ি বর্গা ও রড। আগের বছরের চেয়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে শতকরা ২০ ভাগ। ইস্ফাহানের ইস্পাত কারখানাগুলোয় উৎপাদন শতকরা দশ ভাগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ চলতি বছর এসব কারখানায় ২৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ইস্পাত উৎপাদিত হবে। মোবারেকেহ স্টিল মিলের উৎপাদন বাড়বে শতকরা ৮ ভাগ। অর্থাৎ এ কারখানা উৎপাদন করবে ৫৩ লক্ষ টন ইস্পাত। ২০১৪ সাল নাগাদ মোবারেকেহ স্টিল মিলের উৎপাদন ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

ইরানে নতুন নতুন ইস্পাত কারখানাও গড়ে উঠছে। হরমুজগান স্টিল মিল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে এবং শিগগিরই সেখানে ইস্পাত উৎপাদন শুরু হবে। এ কারখানায় প্রতি বছর এক কোটি টন ইস্পাত ও ৫ লাখ টন এলুমিনিয়াম উৎপাদিত হবে। ফলে এ অঞ্চলই হবে ইরানের ইস্পাত উৎপাদক প্রধান অঞ্চল। ইরানে আরও ৮ টি বড় ইস্পাত কারখানা বা ইস্পাত উৎপাদন প্রকল্পের নির্মাণের কাজ চলছে। ফলে দেশটিতে ইস্পাতের উৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়বে।

ইরানের ইস্পাত শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে এ খাতে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অভিজ্ঞতা, পুঁজি বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা ও মান ক্রমেই বাড়ছে। পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান নিজস্ব মেধা, দক্ষতা, পরিকল্পনা, কৌশল ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এইসব সাফল্য বা অগ্রগতি অর্জন করেছে। সরাসরি সঞ্চারণ বা উত্তোলন ও বড় চুল্লি ব্যবহারের দুই পন্থায় ইরানে ইস্পাত উৎপাদন করা হয়। ইরানে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল মজুদ থাকায় ইস্পাত উৎপাদনে পরিবেশও অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় দূষিত হয়। সরাসরি সঞ্চারণ বা উত্তোলন পদ্ধতিতে ইস্পাত উৎপাদনের জন্য দেশীয় বা লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ইরান। এ পদ্ধতিতে বিপুল তাপ সৃষ্টিকারী জ্বালানী দরকার হয়। ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পদ্ধতিতে ইস্পাত উৎপাদনের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ চলছে।
ইরানের পঞ্চম উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশটির ইস্পাতের চাহিদা অব্যাহত থাকবে। ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর এ খাতে চাহিদা তিন কোটি ৬০ লাখ টন বাড়বে বলে ধরা হয়েছে। ২০২১ সালে এ খাতে চাহিদা আরো বেড়ে চার কোটি দশ লাখ টনে উন্নীত হবে। আর তাই ইরান দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও ইস্পাত রপ্তানির জন্য ৫ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

খনিজ ও শিল্পখাতে বর্তমান বিশ্বে ইরান ২৯তম অবস্থানে রয়েছে। ইস্পাত শিল্প ইরানের এ খাতের অন্যতম প্রধান সম্পদ। ইরানই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র দেশ যে ইস্পাত উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে লোহার আকরিক আমদানির ওপর নির্ভরশীল নয়। ইরানে ৫৪০ কোটি টল লোহার আকরিক বা খনিজ লোহার মজুদ রয়েছে। এ ছাড়াও ইরানে পাথুরে কয়লারও বিপুল মজুদ রয়েছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে যৌথ পুঁজিবিনিয়োগের মাধ্যমে ইস্পাত উৎপাদনের বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইরান। এসব প্রকল্পের অর্ধেকই ইরানের মালিকানাধীন।
ইরান ২০ সালা পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথম অবস্থানে পৌঁছার পরিকল্পনা নিয়েছে। দেশটি ইস্পাত উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শীর্ষস্থানে উঠে আসার চেষ্টা করছে। ইরান তার এইসব লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন।

১০.
সামরিক খাতে ইরানের অগ্রগতি

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্য-নির্ভর। ইসলামী বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পর পাশ্চাত্যের ইশারায় ইরাকের সাদ্দাম সরকার ইরানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধ। দীর্ঘ ৮ বছরের ওই যুদ্ধের সময বিকশিত হয় ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প। দেশটি এখন প্রচলিত সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্র-শস্ত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর, এমনকি অপ্রচলিত বা অত্যাধুনিক অনেকে সমর-সম্ভারেও প্রায় স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ৮ বছরের ওই যুদ্ধ পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ যুদ্ধে ইরানের জনগণসহ সশস্ত্র বাহিনীগুলো যুদ্ধ-কৌশলে ব্যাপক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও অর্জন করেছে। ব্যাপক আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ইরান সমর শিল্পে দিনকে দিন পরিপূর্ণতা ও পরিপক্কতার শীর্ষপানে এগিয়ে যাচ্ছে।

গত তিন দশকে যুদ্ধের মান ও কৌশলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অতি-আধুনিক সমর বিদ্যায় "অপ্রচলিত যুদ্ধ" ও "বায়ো-ট্যারোরিজম" জাতীয় কিছু পরিভাষা দেখা যায়। আর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে সমর শিল্পের উন্নয়নে অগ্রসর হয়েছে ইসলামী ইরান। তাই দেশটি নন-ক্লাসিক বা অপ্রচলিত ও সর্বাত্মক যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করার এবং এক্ষেত্রে নতুন নতুন আবিস্কার বা উদ্ভাবন ও গবেষণার মনোযোগী হয়েছে।
ইলেকট্রনিক যুদ্ধসহ অপ্রচলিত যুদ্ধের রণ-কৌশলগুলো রপ্ত করার ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে ইরান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জল, স্থল ও আকাশে ইলেকট্রনিক সাজ-সরঞ্জামে সুসজ্জিত ইরানের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর বেশ কিছু সামরিক মহড়াই এর অন্যতম প্রমাণ। এইসব মহড়ায় প্রদর্শিত হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপক নৌযান ও রাডারসহ আরো অনেক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। ইলেকট্রনিক সাজ-সরঞ্জাম প্রতিরক্ষার সফট প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ইরানে ই সি সি এম ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেশটির প্রতিরক্ষার সফট প্রযুক্তি খাতে সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন।

ইরান বিমান প্রতিরক্ষা তথা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও রাডার সিস্টেম খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ ধরনের নানা সিস্টেম ইরান নিজেই এখন উৎপাদন করছে। ইরান এক্ষেত্রে রাশিয়ার এস-থ্রি হান্ড্রেড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমমানের বা তার চেয়েও উন্নত সিস্টেম উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
প্রতিরক্ষা শিল্পের বিভিন্ন দিকে ব্যাপক অগ্রগতির কারণেই ইরান মার্কিন হুমকিগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অনেক পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম স্বীকার করেছে। প্রায় এক বছর আগে বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যে কোন সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হলে দেশটি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালাবে।

গত কয়েক বছরে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন নতুন আবিস্কারের অনেক ঘটনা দেখে বাইরের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না। ইরান পাইলটবিহীন ও বোমা পরিবাহী জেট বিমান কাররারে'র সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ড্রোন বা পাইলট বিহীন জেট বিমান কাররার প্রযুক্তিগত দিক থেকে খুবই শক্তিশালী। এটি বানাতে খুবই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরান ছাড়া বিশ্বের মাত্র দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এ পর্যন্ত পাইলটবিহীন জেট বিমান তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। ইরান অবশ্য ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময়ই পাইলটবিহীন জঙ্গিবিমান তৈরির কাজে হাত দিয়েছিল। এ পর্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন বহু মডেলের পাইলটবিহীন জেট বিমান বানিয়েছে ইরান।

ইরানের তৈরি কাররার পাইলটবিহীন জেট বিমান অনেক উপর দিয়ে ঘণ্টায় এক হাজার কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। কাররার লম্বায় চার মিটার। এটি বিভিন্ন ধরনের বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এই জেটের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। বোমাগুলোও শত্রুর অবস্থানে কঠিন আঘাত হানতে সক্ষম।
পাইলটবিহীন বিমান কাররার পরীক্ষার আগে ইরান 'ক্বিয়াম' নামে একটি উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য এ ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বৈচিত্রে নতুন সংযোজন। ক্বিয়ামের গতি এবং আঘাত হানার ক্ষমতা খুবই অনন্য। ক্বিয়ামের পর তৃতীয় প্রজন্মের ১১০ ফাতেহ ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করে তেহরান। ২০০২ সালে ইরান প্রথমবারের মতো এই ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাত্রের উৎপাদন শুরু করে।

'জুলফিকার" ও "সেরাজ" ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী দু'টি অত্যাধুনিক গানবোটের নাম। সেরাজ খুবই দ্রুতগতি সম্পন্ন গানবোট। শত্রুপক্ষের আক্রমণের দ্রুত জবাব দিতে সক্ষম এই গানবোটটি গতি এবং রকেট নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অনন্য। সেরাজ উত্তাল সমুদ্রেও কাজ করতে পারে। টহলবোট জুলফিকার শত্রুদের বোটে অসম্ভব দ্রুততার সাথে হামলা চালাতে সক্ষম।
বিপুল সংখ্যক গানবোট তৈরির ফলে ইরানের নৌবাহিনীর আক্রমণ ক্ষমতা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রুতগতি সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী গানবোটের ক্ষেত্রে বিশ্বে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ ইরানের মত শক্তি অর্জন করতে পারে নি। ইরানের মধ্যম গতি সম্পন্ন গানবোটগুলো মার্কিন রণতরিগুলোর চেয়েও দ্বিগুণ গতিসম্পন্ন।

ইরান গানবোটের পাশাপাশি সাবমেরিন তৈরির ক্ষেত্রেও অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন চারটি গ্বাদির সাবমেরিন ইরানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। এই সাবমেরিনগুলো শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে দ্রুত গতিতে শত্রুদের ধাওয়া করতে সক্ষম। অগভীর জলেও ইরানের গ্বাদির সাবমেরিন ভালোভাবে কাজ করে।

১১.

প্রতিরক্ষা খাতে ইরানের অসাধারণ বা অভাবনীয় অগ্রগতি পশ্চিমা শক্তিগুলোকে ক্রমেই উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এটা লক্ষ্যনীয় যে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি এইসব অগ্রগতি অর্জন করেছে। পাশ্চাত্য ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কাছে খুব ছোটখাট বা সাধারণ সামরিক যন্ত্রাংশও সরবরাহ করছে না। ফলে ইরান নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক শিল্পের যন্ত্রাংশ তৈরি করছে এবং সমর শিল্পের প্রায় সব বিভাগে প্রায় স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয় ইরান এখন বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে অস্ত্র রপ্তানিও করছে। তাই আসলে নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের জন্য হয়ে উঠেছে শাপে বর। তেহরান সমর শিল্পে পাশ্চাত্যের একচেটিয়া কর্তৃত্ব অনেকাংশেই খর্ব করেছে। আর এ জন্যই পাশ্চাত্য ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ক্রমেই বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।

ইরান তৈরি করছে "পেহপদ"। এটি ইরানের তৈরি আরেকটি পাইলট বিহীন গোয়েন্দা বিমানের নাম। ২০০৮ সালে এই জঙ্গি বিমানের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ইরানের বিমান বাহিনী । এই বিমান শত্রুর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সরাসরি ভিডিও চিত্র পাঠাতে সক্ষম।
ইরান ২০১০ সালে উলম্বভাবে উপরে উঠতে সক্ষম বিশেষ ধরনের গোয়েন্দা বিমান নির্মাণ করেছে প্রথমবারের মত। এই বিমান আরোহী ও মালামালও বহন করতে পারে। ম্যাপ তৈরি, জঙ্গল ও কৃষিক্ষেত্র বিভিন্ন কাজের জন্যও উপযোগী এই বিমান। এই বিমানের তলা এমনভাবে নির্মিত যে পানির স্পর্শ সত্ত্বেও পানি তাতে খুব পরিমাণেই লেগে থাকে। তাই এ বিমান পানির ওপর বা জলাশয়েও অবতরণ করতে পারে এবং তা সরাসরি জলাশয় থেকেও উড্ডয়ন করতে সক্ষম। ইরানের এই বিশেষ বিমানটি অন্য দেশের এ জাতীয় বিমানের চেয়ে দ্বিগুণ মালামাল ও আরোহী বহন করতে পারে।

ইরানের আক্রমণাত্মক একটি জঙ্গি বিমানের নাম অযারাখশ। এটি শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে চলে। ইরান নানা ধরনের যাত্রীবাহী সামরিক বিমানও তৈরি করছে। ইরান-১৪০ এসবের মধ্যে অন্যতম। প্রশিক্ষণ জঙ্গি বিমান ও হেলিক্প্টারও তৈরি করছে ইসলামী এই দেশ। ইরান মিগ-টুয়েন্টি নাইন জাতীয় বিমানকে আরো উন্নত বিমানে রূপান্তরিত করছে এবং ইরানি বিশেষজ্ঞরা নানা ধরনের বোমারু বিমান মেরামত করছেন।
গত বছরের আগষ্ট মাসে ইরান ফ'তেহ-১১০ এবং ক্বিয়াম-এক নামের যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছিল তাতে ঘনীভূত জ্বালানী ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এইসব ক্ষেপণাস্ত্র হয়েছে আরো নিখুঁত, দ্রুত গতি-সম্পন্ন এবং উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন।

ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও ইরান উৎপাদন করছে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা-সজ্জিত বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নতমানের রাডার। বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের গোলাও বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করছে ইরান।
নানা ধরনের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছেন ইরানি বিশেষজ্ঞরা। ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য অত্যন্ত নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি আয়ত্ত্ব করেছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের কাছে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি রয়েছে। মহাশুন্য ও রাডার প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় ইরানের এ শিল্প অগ্রগতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, ইরান রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম স্টিলথ জঙ্গি বিমানও নির্মাণ করছে।

ইরান সাবমেরিনসহ নানা ধরনের যুদ্ধ-জাহাজও তৈরি করছে। নৌ-প্রতিরক্ষা শিল্পে ইরানের অসাধারণ অগ্রগতির বড় প্রমাণ হল, গ্বাদির সাবমেরিন ও "ব্লিড রানার- ৫১" নামক দ্রুত গতি সম্পন্ন বোট নির্মাণ। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দুই মোটরযুক্ত এই নৌযান ঘন্টায় ১২০ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি দ্রুত গতিতে চলে। ইরানের "ববার" বা "বিশ্বাস" নামের রণতরী প্রতি ঘন্টায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম।

"গ্বাদির" সাবমেরিন একই সময়ে পানির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র ও টর্পেডো নিক্ষেপ করতে সক্ষম। "ক্বায়েম" ইরানের নির্মিত আরেকটি উন্নত মানের সাবমেরিন।
ইরানের নৌবাহিনীর নিজস্ব কারখানায় তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক নৌ-সামগ্রী। মাত্র এক বছরের মধ্যে গ্বাদির নামের দুটি সাবমেরিনও এই কারখানাতেই নির্মাণ করা হয়েছে। ইরানের নৌবাহিনীর নিজস্ব কারখানায় তৈরি হচ্ছে হ্যাঙ্গার ও যন্ত্রপাতি সংযোজনকারী যন্ত্র প্রভৃতি।
ইরানের নির্মিত প্রথম ডেস্ট্রয়ারটির নাম জামারান। এটি গত বছরের প্রথম দিকে নির্মিত হয়েছিল। জলের নিচে ও উপরিভাগে এবং স্থল ও আকাশ যুদ্ধের নানা সামগ্রীতে সজ্জিত এই রণতরী। এই যুদ্ধ জাহাজ বহন করতে পারে সামরিক হেলিকপ্টার। আর তাই হেলিকপ্টারের জ্বালানী সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে এ যুদ্ধ জাহাজে। এ রণতরীর রয়েছে এমন কিছু অতি উন্নত যন্ত্রপাতি যা বিশ্বের গুটি কয়েক দেশ নির্মাণ করতে সক্ষম। তাই এটা স্পষ্ট, ইরান নৌ-প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রযুক্তিতেও গুটি কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির উদ্দেশ্য কারো ওপর আক্রমণ নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠাসহ শত্রুর হামলা বা আগ্রাসন মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকাই তার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির মূল উদ্দেশ্য। বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব বিস্তারের নীতিতে বিশ্বাসী ইরান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তার অগ্রগতিকে প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশগুলোর কল্যাণেও ব্যবহার করতে চায়। তাই কিছু কাল আগে তেহরান লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে উন্নত অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। লেবাননের কর্মকর্তারা তেহরানের ওই প্রস্তাবকে স্বাগতঃ জানিয়েছেন। ইরানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সামরিক কর্মকর্তাদের সফর ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের সেনা কর্মকর্তাদের পাল্টা সফর ইরানের ওই শান্তিকামী নীতিরই প্রতিফলন। একই লক্ষ্যে বহু প্রতিবেশি মুসলিম এবং আরব দেশের সাথে ইরানের রয়েছে সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক।

১২.
মোটর গাড়ি শিল্পে ইরানের অগ্রগতি

মোটর গাড়ি শিল্প আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় মাধ্যম। এই শিল্প বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পখাতের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ এ শিল্পকে শিল্প-উন্নয়নের রেল ইঞ্জিন বলে অভিহিত করে থাকেন। তাই এ শিল্পে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। মোটরগাড়ি শিল্প সচল হয়ে উঠলে অন্য অনেক শিল্পও রমরমা হয়ে উঠে। কারণ, অটোমোবাইল বা মোটরগাড়ি শিল্পের ওপর অন্ততঃ ৮০টি শিল্প নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত। যেমন, ইস্পাত, ইলেকট্রনিক, পেট্রোক্যামিক্যাল, গাড়ির চাকা, তেল শোধনাগারে উৎপাদিত নানা উপজাত, কাঁচ, কাপড়, আয়না, চামড়া, ও অন্য আরো অনেক শিল্প।
২০১০ সালে বিশ্বে সাত কোটি ৭০ লক্ষ গাড়ি নির্মিত হয়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ৬০ কোটি গাড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্ব বাণিজ্যের শতকরা ২৫ ভাগই হবে গাড়ি শিল্পকেন্দ্রিক।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আগে গাড়ি শিল্প বলতে কেবল বিদেশ থেকে আনা গাড়ির যন্ত্রাংশ সংযোজন করাকে বোঝান হত। আর ওই সংযোজন শিল্পও ছিল খুবই ক্ষুদ্র বা সিমীত পর্যায়ের। ১৯৯২ সালে ইরান জাতীয় মোটরগাড়ি নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় এবং সংযোজন শিল্পের গন্ডী থেকে বের হয়ে গাড়ির মূল ইঞ্জিন ও সব ধরণের যন্ত্রাংশ নির্মাণ শুরু করে। এখন ইরানে নির্মিত গাড়ী ইউরোপ ও এশিয়ার নানা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে। আর এ পর্যায়ে উঠে আসতে ইসলামী ইরানকে অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে এগুতে হয়েছে। যেমন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও প্রযুক্তির দেশীয়করণ বা লাগসইকরণ ছিল এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ দিয়ে নির্মিত " সামান্দ" ইরানের জাতীয় মোটরগাড়ি শিল্পের প্রথম মডেলের গাড়ির নাম।

সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইরান মোটর গাড়ি নির্মাণ করতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও এ শিল্পে বৈচিত্র আনার জন্য দেশটি বিভিন্ন বিদেশী গাড়ি কোম্পানির সহযোগিতায় আকর্ষণীয় নানা মডেলের গাড়ি নির্মাণ করছে। ওইসব বিদেশী গাড়ি কোম্পানির মধ্যে রয়েছে পেজো, সাইপা, মাজদা, প্রোটেন, নিসান প্রভৃতি। এইসব যৌথ প্রকল্পে প্রায় ৫ লক্ষ ইরানি কর্মী চাকরি করছেন।
ইরান ২০১০ সালে একটি মোটরগাড়ি নির্মাণ কারখানা উদ্বোধন করে। এ কারখানায় নির্মিত " তিবা" নামক গাড়িগুলো ইরানের নির্মিত দ্বিতীয় জাতীয় মোটর গাড়ি।
ইরানের দুটি বড় অটোমোবাইল কোম্পানির মধ্যে "ইরান খোদরু" অন্যতম। এই কোম্পানি সিরিয়ার সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ বা মালিকানায় সেদেশে " সামান্দ" গাড়ি নির্মাণ করছে। ইরান ও সিরিয়ার গাড়ি শিল্প আগামী বছর যৌথ উদ্যোগে "রানা" নামক গাড়ি উৎপাদন করবে।

২০০৯ সালে ইসলামিক ডেভেলপম্যান্ট ব্যাংক বা আইডিবি'র অর্থ বিষয়ক সচিব ইরানের সাইপা গ্রুপের মোটর গাড়ি শিল্প-কারখানা পরিদর্শনের পর ইরানি গাড়ি শিল্পকে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ও আই সি এবং ইসলামিক ডেভেলপম্যান্ট ব্যাংকের জন্য গর্ব বলে মন্তব্য করেছেন। আইডিবি'র প্রাইভেটাইজেশন ডেভেলপম্যান্ট বিভাগের প্রধান " খালেদ আল আবুদি" আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে এবং উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে ইরানের সাইপা গ্রুপের কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন।

সম্প্রতি ফ্রান্সের পেজো গাড়ি কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক জ্যাঁ মার্ক গ্যালেস বিশ্ব বাজারে এই গাড়ির শতকরা বিশ ভাগ শেয়ার ইরানের মালিকানায় থাকার কথা উল্লেখ করেছেন এবং অন্যান্য দেশেও ইরানের সহযোগিতায় গাড়ি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন। ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই কোম্পানি তেহরানের সাথে সহযোগিতা জোরদারে অনড় থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। গ্যালেস গাড়ির যন্ত্রাংশ নির্মাণে ইরানিদের দক্ষতার প্রশংসা করেছেন এবং বিশ্বে গাড়ির বাজারে আরো বেশি স্থান করে নিতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।

ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে নির্মিত মোটরগাড়ির ইঞ্জিনগুলো বেশ আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। বিশ্ব বাজারে এসব ইঞ্জিন রপ্তানির বেশ ভাল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের লাগসই প্রযুক্তিতে নির্মিত মোটরগাড়ির ইঞ্জিনগুলো জ্বালানী সাশ্রয়ী। দিনকে দিন এসব ইঞ্জিনকে আরো বেশি উন্নত করার চেষ্টা করছেন ইরানি বিশেষজ্ঞরা।

ইরান ২০২৫ সালের মধ্যে মোটরগাড়ি শিল্পে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম ও বিশ্বে ১১ তম স্থান অর্জনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০১০ সালে ইরান প্রায় ১৬ লক্ষ মোটরগাড়ি নির্মাণ করেছে এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে ১৩ তম, মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম এবং এশিয়ায় ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ইরানের ওপর পাশ্চাত্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি এ খাতে ব্যাপক সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

সম্প্রতি বৃটেনের দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইরানের মোটরগাড়ি শিল্পের নানা সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। ইরানের নতুন গাড়ি কারখানায় উৎপাদিত "সামান্দ সুরেন" ও "তুন্দার-৯০" গাড়ি উত্তর আফ্রিকা, রাশিয়া, চিন, ইরাক এবং আফগানিস্তানের বাজারে প্রবেশ করেছে। এই গাড়ির দাম ছয় হাজার পাউন্ড। ইরান চিনেও গাড়ির কারখানা নির্মাণ করেছে এবং সেখানে সামান্দ সুরেন গাড়ি উৎপাদনের কথা ভাবছে।
ইরান ভবিষ্যতে, ভেনিজুয়েলা, বেলারাশিয়া ও সিরিয়ায় একই ধরনের কারখানা প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা করছে। বর্তমানে বিশ্বের বিশটি দেশে ইরানের গাড়ি রপ্তানি হচ্ছে।

১৩.

ইরানের বাঁধ শিল্প ও এর নানা দিকের অগ্রগতি

বিশ্বে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান তৃতীয় এবং বাঁধের পরিকল্পনা বা ডিজাইন তৈরি করার ক্ষেত্রে দেশটি রয়েছে প্রথম বা শীর্ষ অবস্থানে। ইরান "কারুন-চার" নামের বাঁধ নির্মাণ করে এ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গৌরবও দেশটির নামের সাথে যুক্ত করেছে। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নানা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এ খাতে এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হল।
পানি সঞ্চয় ও কৃষিকাজসহ নানা কাজে পানি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ইরানিরা কয়েক হাজার বছর আগেই বাঁধ নির্মাণের অনেক জটিল কলা-কৌশল রপ্ত করেছিল। ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে নির্মিত কিছু বাঁধ আবিস্কৃত হয়েছে। ইরান ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে এত বৃহৎ, প্রাচীন ও উন্নত পদ্ধতির বাঁধের নিদর্শন দেখা যায় না। ইরানের কলাকুশলীরা এখনও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে বিশ্বে বাঁধ নির্মাণ শিল্পে শীর্ষস্থান বজায় রেখেছেন।
জার্মান বিশেষজ্ঞ হেলমুট উগট ইরানি বাঁধ নির্মাণকারীদের যোগ্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন,

"বিশ্বের বাঁধ নির্মাণের ইতিহাস আবিস্কৃত হওয়ায় আগে কেউ এটা কল্পনাও করতে পারেননি যে কম পানিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করা সত্ত্বেও ইরানিরা প্রাচীন যুগে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।" তিনি এই বৃহত্তম বাঁধ বলতে ইরানের তাবাস অঞ্চলে খৃষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত "ক্রিত" বাঁধ নির্মাণের কথা বলতে চেয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ইরানের এ বাঁধ নির্মাণ সম্পর্কে তিনি আরো বলেছেন, "আরো একটি বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এই বাঁধ বেশ কয়েকবার ভূমিকম্পের মত নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও এখনও টিকে আছে এবং কয়েক শত বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ হওয়ার রেকর্ড অক্ষুন্ন রেখেছে। আর ইরানিরা এখনও বাঁধ নির্মাণ শিল্পে শীর্ষ স্থানীয় অবস্থান বজায় রেখেছে।"

ইরানের ক্রিত বাঁধ এমন সময় নির্মিত হয়েছে যখন ইউরোপ মধ্যযুগে অবস্থান করছিল। বিংশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত এ বাঁধ ছিল বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ। ১৯৭৮ সালে তাবাসে সাত দশমিক আট মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। কিন্তু ওই ভূমিকম্পেও এই বাঁধের কোনো ক্ষতি হয়নি। এই বিশাল বাঁধের নির্মাণ-শৈলী ও কৌশল বিশ্বব্যাপী এখনও বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলীদের জন্য বাঁধ নির্মাণ শিল্পের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

"গ্রান্ড ডিক্সেন্স" নামক সুইজারল্যান্ডের বাঁধ এবং ভেনিজুয়েলার "গুরি" নামক বাঁধ নির্মিত হয়েছে ইরানের ক্রিত বাঁধের অনুকরণে। আর এ থেকেই বাঁধ নির্মাণ শিল্পে বিশ্বে ইরানিদের শ্রেষ্ঠত্ব ও শীর্ষস্থানীয় অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অবশ্য ইরানে ইসলামী বিপ্লবের আগে নির্মিত কয়েকটি বড় বাঁধ নির্মিত হয়েছে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের মাধ্যমে। ওইসব বাঁধের মডেল বা পরিকল্পনাও প্রণীত হয়েছে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে। যেমন, দৃষ্টান্ত হিসেবে কারাজ বাঁধ, সাদে সেফিদ রুদ বা শ্বেত নদীর বাঁধ ও "কারুন-এক" বাঁধের কথা উল্লেখ করা যায়।

ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান বাঁধ নির্মাণ খাতে স্বনির্ভর হবার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা শুরু করে। ইরানের উন্নয়ন কর্মসূচীতে এ লক্ষ্য অর্জনকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে ইসলামী এই দেশ গত তিন দশকের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ শিল্পের সব দিকেই স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। এমনকি ইরানি প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা এখন দেশের বাইরেও একুশটি দেশে বাঁধ ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ করছেন। পানির রিজার্ভার বা জলাধারযুক্ত বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও ইরানে তৈরি হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে দেশটি ডিজাইন-প্রযুক্তিও রপ্তানি করছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। শ্রীলংকা, তাজিকিস্তান ও কেনিয়াসহ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে বাঁধ নির্মাণ করছেন ইরানি বিশেষজ্ঞরা।
ইরান ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে "কারুন-চার" নামের বাঁধ নির্মাণ করেছে। এ বাঁধ ইরানের ইতিহাসে সিমেন্টের তৈরি বৃহত্তম বাঁধ। পশ্চিম ইরানের চাহার মহল বাখতিয়ারি প্রদেশে এই বাঁধটি চালু করা হয়েছে। "কারুন-চার" বাঁধটি ২৩০ মিটার উঁচু এবং ৪৪০ মিটার প্রশস্ত। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে অবস্থিত কারুন নদীর ওপর এ নিয়ে চারটি বাঁধ নির্মিত হয়েছে। পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য "কারুন-চার" বাঁধে চারটি বিদ্যুৎ উৎপাদক স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। এইসব বিদ্যুৎ স্থাপনা ইরানের বিদ্যুৎ গ্রীডে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।
"হাইড্রোপাওয়ার এন্ড ড্যামস" শীর্ষক সাময়িকীর বাঁধ বিশেষজ্ঞ শ্যান ম্যাক ব্রাইট বলেছেন, কারুন-চার বাঁধটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বাঁধ ও বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র। এটি মধ্যপ্রাচ্যে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি দুই খিলান বা ধনুক-আকৃতির সবচেয়ে বড় বাঁধ।
গত এক দশকে বাঁধ নির্মাণ খাতে ইরানের লক্ষ্যনীয় অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। শ্যান ম্যাক ব্রাইট বলেছেন, "বিস্ময়ের ব্যাপার হল, ইরান বিশাল বিশাল বাঁধগুলোর পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজের সকল পর্যায়ে নিজস্ব প্রযুক্তি এবং বিশেষজ্ঞ ব্যবহার করেছে।" এইসব বাঁধের কোনো কোনোটি বিশ্বে অদ্বিতীয় বা অনন্য বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
বাঁধ নির্মাণ খাতে ইরানের আরেকটি গৌরবময় সাফল্যের নিদর্শন হল পশ্চিম ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাঁধ নির্মাণ। এই প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে "বাখতিয়ারি" নামের এই বাঁধটি ৩১৫ মিটার উঁচু ও সিমেন্ট দিয়ে নির্মিত হয়েছে।
দক্ষিণ পশ্চিম ইরানের আলিগুদার্জ অঞ্চলে "রূদবার" নামক একটি বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি ইউনিট বসানো হবে এবং ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে ওই দুটি ইউনিটে।

ইরানে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৫০ মিলিমিটার, যা বিশ্বের গড়পড়তা বৃষ্টিপাতের এক তৃতীয়াংশ মাত্র। তাই শুস্ক ও আধা-মরুময় দেশ ইরানে ভূভাগের উপরে থাকা পানি ধরে রাখার জন্য গত তিন দশকে নির্মিত হয়েছে ২০০'রও বেশি উঁচু বাঁধ। ইরানে বর্তমানে আরো ১৫০ টি বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে এবং ইরানে ভবিষ্যতে আরো ১৬০ টি বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা বা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
আগেও বলেছি, বিশ্বে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান তৃতীয় এবং এ গৌরব অর্জনের জন্য ইরানকে অনেক কাঠ-খড়ি পোড়াতে হয়েছে। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নানা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এ খাতে এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। আত্মবিশ্বাসী একটি জাতি যে শত বাধা সত্ত্বেও অগ্রগতির শীর্ষে উঠতে সক্ষম ইরানের বাঁধ শিল্পের সাফল্যই এর আরেকটি বড় প্রমাণ।

১৪.
ইরানের জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্প খাতের নানা সাফল্য

ইরানে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল, আর গ্যাস রয়েছে ৩ হাজার তিন শত কোটি ঘন মিটার। জ্বালানি তেল রিজার্ভের দিক থেকে বিশ্বে ইরানের স্থান চতুর্থ ও গ্যাস রিজার্ভের দিক থেকে দ্বিতীয়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গ্যাস সম্পদের মজুদ রয়েছে রাশিয়ায়। ইরান বিশ্বের গ্যাস সম্পদের মোট মজুদের শতকরা ১৮ ভাগের অধিকারী।
ইরানে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয় বিংশ শতকের প্রথম দিকে। সে সময় দক্ষিণ ইরানে ওই গ্যাস উত্তোলন করত বৃটেন। তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে বৃটেনের একচেটিয়া কর্তৃত্ব থাকায় ইরানের এই প্রাকৃতিক সম্পদের বেশিরভাগটাই চলে যেত বৃটিশদের পকেটে। এই লুণ্ঠন বন্ধের জন্য ১৯৫৩ সালে ইরানের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করা হয়। ফলে দেশটির তেল সম্পদ বাহ্যিকভাবে বৃটিশদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৯৭৯ সালের আগ পর্যন্ত ইরানের তেল শিল্প বিজাতীয় শক্তিগুলোর ওপর ও বিশেষ করে মার্কিন সরকারের ওপর নির্ভরশীল থেকে যায়।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ী হবার অল্প কিছু কাল পরই পাশ্চাত্যের উস্কানি ও সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে সাদ্দামের বাথিস্ট বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ইরানের তেল শিল্প ও তেল শোধনাগারগুলো এ সময় ইরাকের সাদ্দাম বাহিনীর ব্যাপক হামলার শিকার হয়। ইরানের তেল শিল্পের অবকাঠামো ও উপরিকাঠামো এইসব হামলায় মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তেহরান শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করেনি। বরং রণাঙ্গনে শত্রুদের সমুচিত শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তেল শিল্প পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। এই পুনর্গঠনের কাজ ইরানের জন্য ছিল খুবই কঠিন। কারণ, ইরানকে তেল শিল্পের ছোটখাট যন্ত্রাংশ থেকেও বঞ্চিত করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্য এবং বিশেষ করে মার্কিন সরকার তেহরানের ওপর আরোপ করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দেয় এবং তেহরান তেল ও গ্যাস শিল্পে স্বনির্ভর হয়ে উঠে। ইসলামি বিপ্লবের ৩২ বছর পর দেশটির তেল ও গ্যাস শিল্প এখন বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর একচেটিয়া কর্তৃত্বকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে। তেল ও গ্যাস কূপ খনন, উত্তোলন, পাইপ বসানো, সুইচ লাগানো এবং স্থাপনাগুলোর সংস্কার ও শোধনাগার নির্মাণসহ তেল-গ্যাস শিল্পের বহু কাজ এখন ইরানি বিশেষজ্ঞরাই সম্পন্ন করছেন।

ইরানি বিশেষজ্ঞরা তেল-গ্যাস শিল্পের টারবাইন নির্মাণ করছেন ও পুরনো টারবাইন মেরামত করছেন। তারা গত এপ্রিল মাসে তেহরানে অনুষ্ঠিত গ্যাস, তেল, শোধনাগার ও পেট্রো কেমিক্যাল শিল্পের ১৬ তম আন্তর্জাতিক মেলায় ইরানি টারবাইন প্রদর্শন করেছেন। ইরানের নিজস্ব ও লাগসই প্রযুক্তিতে নির্মিত হয়েছে এই টারবাইন। এইসব টারবাইন নির্মাণের খরচও বেশ সাশ্রয়ী। এ ধরনের টারবাইন বিদেশে নির্মাণ করতে যেখানে খরচ হত অন্ততঃ ৬ মিলিয়ন বা ষাট লাখ ডলার সেখানে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তির টারবাইন নির্মাণে খরচ পড়ছে মাত্র চার মিলিয়ন বা চল্লিশ লাখ ডলার।

ইরানের খনন কোম্পানিগুলো গত দশ বছরে বেশ কিছু ছোট কূপ খননের পর এখন বড় ধরনের কয়েকটি কূপ খননের জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এইসব প্রকল্পের মধ্যে দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্রের কয়েকটি কূপ এবং কিশ গ্যাস ক্ষেত্রের ১৩ টি কূপ খনন ও "অযার- এক" প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ পার্স তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে রয়েছে ২৯ টি প্রকল্প এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক গড়পরতা বাজার দর অনুযায়ী এখানে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ডলার এবং প্রতি বছর তিনশ ত্রিশ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থের তেল ও গ্যাস ওঠানো হয়।

ইরানি বিশেষজ্ঞরা বিদেশী কোম্পানিগুলোর চেয়েও এক তৃতীয়াংশ কম সময়ে ও কম খরচে গ্যাস-তেল প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা অর্জন করেছেন। দক্ষিণ পার্স গ্যাস ও তেলক্ষেত্রের কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শোধনাগার নির্মাণের কয়েকটি পর্যায় সম্পন্ন করা ইরানি বিশেষজ্ঞদের এই সাফল্যের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইরানি বিশেষজ্ঞরা দেশ-বিদেশের তেল কূপের আগুন নিভানোর কাজেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। সাদ্দামের বাহিনীর হামলায় প্রজ্জ্বলিত কুয়েতের কয়েকটি তেলক্ষেত্রের আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে ইরানিদের এই দক্ষতা প্রমাণিত হয়েছে।

ইরানি কোম্পানি ও বিশেষজ্ঞরা এখন দেশের বাইরেও তেল ও গ্যাস-কূপ খননের কাজ করছে। কাজাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইরানি কোম্পানি ও বিশেষজ্ঞ। ইরানি বিশেষজ্ঞরা সমুদ্রের ওপরে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের প্লাটফর্ম এবং সমুদ্রের নিচে বা গভীর পানির নিচে তেল ও গ্যাস পাইপ-লাইন বসানোর দক্ষতাও অর্জন করেছেন। তারা পারস্য উপসাগরের নীচে ৭০ থেকে ৮০ মিটার গভীর তেল উত্তোলন স্থাপনার যন্ত্রপাতি বসাতে সক্ষম হয়েছেন এবং চার হাজার মিটারেরও বেশি এলাকা খনন করেছেন। ইরানিদের উৎপাদিত তেল এখন সবচেয়ে বেশি উন্নত বা ভাল মানের।

ইরান এইসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করায় অতীতে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো দেশটির সাথে তেল ও গ্যাস চুক্তি করার সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অযুহাতে তেহরানের ওপর যে ধরনের অনেক কঠিন শর্ত আরোপ করত এখন আর তারা সে ধরনের কোনো শর্ত আরোপের সুযোগ পাচ্ছে না। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতার ও ইরানের যৌথ গ্যাস-ক্ষেত্রসহ আরো কয়েকটি দেশের সাথে ইরানের যৌথ গ্যাস-ক্ষেত্র রয়েছে। কাতারের সাথে গ্যাস বণ্টণ খাতে ইরানের সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে। তেহরান এ অঞ্চলে আরো কয়েকটি দেশের সাথেও এ বছরের মধ্যেই অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষর করবে।
খার্গ দ্বীপসহ এ অঞ্চল ও আশপাশের বেশ কয়েকটি তেল ক্ষেত্রের তেল-শিল্পকে পরিবেশগত স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে স্থানীয়করণ বা লাগসই প্রযুক্তিতে সুসজ্জিত করছে ইরান। এসব তেলক্ষেত্রের মধ্যে আসালুইয়েহ, সালমান, বেশারাত, হানগাম প্রভৃতি তেল ক্ষেত্রের নাম উল্লেখযোগ্য।

ইরান এখন বিভিন্ন মানের বা ঘনত্বের জ্বালানি তেল উৎপাদন ও রপ্তানি করছে। অতীতে দেশটি কেবল ভারী তেল উৎপাদন করতে পারত। হানগাম তেল ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য ইরান চল্লিশ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ক্বেশম দ্বীপ থেকে সমুদ্রের নিচ দিয়ে বন্দর আব্বাসে তেল আনার জন্য পাইপ লাইন নির্মাণ এবং এই তেলের কিছু অংশকে বন্দর আব্বাস তেল শোধনাগারে এনে অন্য রাসায়নিক পণ্যে রূপান্তর এই উন্নয়ন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ক্বেশম দ্বীপের আশপাশে নতুন কিছু তেল ক্ষেত্রের উন্নয়ন সম্পন্ন হলে ইরান পারস্য উপসাগরীয় এই অঞ্চল থেকে প্রতি দিন এক হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল উৎপাদন করতে পারবে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নতুন তেলক্ষেত্রগুলো সেখানকার তেলের রিজার্ভকে ৯ হাজার ৪০০ কোটি ব্যারেলে উন্নীত করেছে।
গ্যাস ও তেল খাতে ইরানের এইসব সাফল্য এবং প্রায় ৯০ শতাংশ স্বনির্ভরতা প্রমাণ করেছে যে, দেশটি তার নিজস্ব মেধা ও প্রযুক্তি দিয়ে পাশ্চাত্যের তেল এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোকে বানচাল ও সেগুলোকে পাশ্চাত্যের জন্যই বুমেরাং করতে সক্ষম।

১৫.
ইরানের জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্প খাতের সাফল্য (২)

বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশ্বের পুরনো অর্থনৈতিক শক্তিগুলো ও এশিয়ার শিল্পোন্নত নতুন দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগীতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানির চাহিদা দিনকে দিন বাড়ছে। একইসাথে জ্বালানির নিরাপত্তার গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে জ্বালানি গ্যাস ও তেলের ভূমিকা শীর্ষস্থানীয়।
ইরানের রয়েছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ তেল ও গ্যাস-মজুদ। অন্যদিকে দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও বেশ সুবিধাজনক ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তেল ও গ্যাস লেনদেনসহ অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোর কাছ থেকে সমীহ আদায় করতে পারছেন ইরানি নেতৃবৃন্দ। এক্ষেত্রে ইরান সরকারের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতাও লক্ষ্যনীয়।
সম্প্রতি তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের আন্তর্জাতিক মেলা। ওই মেলা কেবল ইরানের নিজস্ব বিশেষায়িত শিল্পেরই বৃহত্তম মেলা নয় একইসাথে তা ওপেকভুক্ত দেশগুলো ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতেরও সবচেয়ে বড় মেলা। বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মেলার পর এটাই দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক জ্বালানি মেলা।

তেহরানে তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ১৬ তম আন্তর্জাতিক মেলা দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়টি কোম্পানিও অংশ নিয়েছে ওই মেলায়। ওইসব মার্কিন কোম্পানি এমন সময় ইরানের এ মেলায় অংশ নিল যখন তেহরানের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজের নিষেধাজ্ঞা আরো বিস্তৃত হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনের সহযোগী কোনো কোনো দেশ ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনঠাসা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এটা স্পষ্ট জ্বালানির দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি ইরানকে বাদ দিয়ে বিশ্বের অর্থনীতির যথাযথ উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বর্তমানে বিশ্বের জ্বালানি চাহিদা শতকরা ২৪ ভাগ মেটানো হয় গ্যাস দিয়ে এবং শতকরা ৩৫ ভাগ মেটানো হয় জ্বালানি তেল দিয়ে। বিশ্বে গ্যাসের মজুদের দিক থেকে ইরানের অবস্থান দ্বিতীয়। ইরানে গ্যাসের আরো নতুন খনি রয়েছে এবং ওইসব খনি চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

ইরানে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। জ্বালানি তেলের মজুদের দিক থেকে বিশ্বে ইরানের অবস্থান চতুর্থ। দেশটির ৫-সালা পরিকল্পনার আওতায় তেল ও গ্যাস উত্তোলন খাতে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং তেল ও গ্যাস শিল্পের উপজাত তৈরি খাতে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ৫ হাজার কোটি ডলার। পাঁচ-সালা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আওতায় ইরান তেল শিল্পের গবেষণা ও প্রযুক্তিখাতে শতকরা ৯০ ভাগ স্বনির্ভরতা অর্জন এবং এমনকি এ শিল্পের নিজস্ব প্রযুক্তি রপ্তানীরও আশা করছে। স্বৈরাচারি শাহের শাসনামলে ইরানকে তেল-শিল্পের খুব সাধারণ যন্ত্রাংশও মেরামত করতে দেয়া হত না। অথচ বর্তমানে ইরান প্রতিদিনই এ শিল্পের প্রযুক্তি খাতে স্বনির্ভরতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের তেল শোধনাগারগুলোর শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি অংশ নির্মাণ করেছেন ইরানি বিশেষজ্ঞরা। ইমাম খোমেনী (রহ.) তেল শোধনাগার এসব শোধনাগারের মধ্যে অন্যতম। এই শোধনাগারের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের উৎপাদন কার্যক্রম গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে ইসলামি বিপ্লবের ৩৩ তম বিজয় বার্ষিকীর প্রাক্কালে চালু হয়েছে। এই শোধনাগারে উৎপাদিত পরিশোধিত গ্যাস ও গ্যাসোলিন বিশ্বমানের। মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের নানা নিষেধাজ্ঞা বা বাধা সত্ত্বেও ইরান ওইসব অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
গ্যাস শিল্পে ইরানের অগ্রগতির অত্যুজ্জ্বল স্বাক্ষ্য বহন করছে দক্ষিণ পার্স গ্যাস ক্ষেত্র। এই বিশাল গ্যাস-ফিল্ডের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন ইরানি ঠিকাদাররা। আর এ থেকে ইরানের প্রযুক্তিগত ও পরিচালনা ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এই গ্যাস ফিল্ডের ২৯ টি সেক্টর রয়েছে এবং এখানে ২৩ টি বিশাল পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে ইরান। ইরানি বিশেষজ্ঞরা এরিমধ্যে সেখানে ১১ টি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণ করেছেন । দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডের সবগুলো সেক্টরে উৎপাদনের কাজ শুরু হলে ৫-সালা উন্নয়ন পরিকল্পনার শেষ বছরের মধ্যে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা ৯৫ মিলিয়ন বা সাড়ে নয় কোটি টনে উন্নীত হবে।

গত ফার্সি বছরে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮৬০ কোটি ডলার সমমূল্যের। এ খাতে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি। ইরান বিশ্বের প্রায় ৬৫ টি দেশে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি করছে। উন্নত মান ও ন্যায্য মূল্যের কারণে ইরানের এইসব পণ্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হচ্ছে। ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য সামগ্রীর শতকরা ৩৭ ভাগ রপ্তানি হয় দূরপ্রাচ্য ও চিনে, ২৫ % রপ্তানি হয় মধ্যপ্রাচ্যে, ১১ ভাগ ইউরোপে, শতকরা ১৮ ভাগ ভারত উপমহাদেশে, সাত ভাগ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং শতকরা এক দশমিক দুই ভাগ রপ্তানি হয় আফ্রিকা মহাদেশে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী গত ১১ ই মার্চ আসালুইয়ে অঞ্চলে অবস্থিত দক্ষিণ পার্স গ্যাস, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের সময় বলেছেন, আগ্রাসী উপনিবেশবাদীরা কয়েক শত বছর আগেই বিশ্বের এ অঞ্চলের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল এবং তারা পারস্য উপসাগরীয় এ অঞ্চলের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব বা দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।

ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর ইরানী জাতি অত্যন্ত দৃঢ়তা নিয়ে বিশ্বের আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। আর এ জন্যই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রে বিপ্লবী ইরান দর্শনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
দক্ষিণ পার্স অঞ্চলে "বারজুইয়েহ" নামের যে পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা নির্মাণাধীন রয়েছে তা হবে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা। এ অঞ্চলে ইরানের নির্মিত বড় বড় অনেক পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা ওই খাতে দেশটির সাফল্যের কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এইসব কারখানায় ইরান খুবই বিশুদ্ধ ও উচ্চ মানের গ্যাসোলিন উৎপাদন করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ কেবল এ অঞ্চলেই ইরান সাড়ে ৫ কোটি টন পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপদান করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বাধা সত্ত্বেও গত ৩২ বছর ধরে ইরানের সংগ্রামী জাতি ও সরকার সব ক্ষেত্রেই দর্শনীয় উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা জোরদারে সক্ষম হয়েছে। ইরান একদিকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন এবং উৎপদান অব্যাহত রেখেছে, আর অন্যদিকে পাইপলাইনসহ সব ধরনের প্রচলিত ও বিচিত্র মাধ্যমে বিশ্বে জালানী রপ্তানি জোরদার করতে সক্ষম হয়েছে।

১৬.
ইরানের জ্বালানি তেল ও গ্যাস শিল্প খাতের সাফল্য (৩)

আমরা আগেই জেনেছি ইরান বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশ। দেশটিতে এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মজুদ সনাক্ত করা হয়েছে। ইরানে এ পর্যন্ত সনাক্তকৃত গ্যাসের মজুদ ৩ হাজার ৩০০ কোটি ঘনমিটার। তবে কোনো দেশে গ্যাস ও তেলের মত ফসিল জ্বালানির খনি বা মজুদ থাকলেই তা দেশটির সমৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে না। এ জন্য ওইসব সম্পদের ভারসাম্যপূর্ণ উত্তোলন, যথাযথ ব্যবহার ও রপ্তানির ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও পরিকল্পনাও জরুরি।

ফসিল জ্বালানি সরবরাহকারী প্রধান দেশগুলো মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্য, কাস্পিয়ান সাগর উপকূল ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে এদিক থেকে এ অঞ্চলের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বড় বড় কোম্পানী এ অঞ্চলের গ্যাস এবং তেল-খনিগুলোতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। গ্যাস ও তেল খনির উন্নয়ন এবং জ্বালানির নতুন খনি খুঁজে বের করার জন্য এ ধরনের বিনিয়োগ জরুরি। এর পাশাপাশি নিশ্চিততম, সহজতম, সংক্ষিপ্ততম ও সবচেয়ে সাশ্রয়ী বা কম ব্যয়বহুল পথে এসব জ্বালানি সরবরাহ করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বাজার ও উৎসের মধ্যে ব্যাপক দূরত্ব এবং পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। তাই তেল ও গ্যাস সম্পদের মতই সেগুলো সরবরাহের ব্যবস্থা বা মাধ্যমও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইরানের চমৎকার ভৌগলিক অবস্থান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য খুবই উপযোগী ও মোক্ষম অবস্থান। মধ্য-এশিয়া, ককেশাস ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল সংলগ্ন হওয়ায় ইরান এশিয়া ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত হয়। ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের দৈর্ঘ তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। ইরানের উত্তর সীমান্তে কাস্পিয়ান সাগর এবং দক্ষিণে ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগর থাকায় বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে নৌ-যোগাযোগের সুবাদে বিশ্বের বাজারগুলো রয়েছে ইরানের নিরাপদ নাগালের মধ্যে। ফলে এ অঞ্চলসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর জন্য ইরান নিশ্চিততম বা নিরাপদতম, সহজতম, সংক্ষিপ্ততম ও সবচেয়ে সাশ্রয়ী বা কম ব্যয়বহুল ট্রানজিট-রুট। ইরানের রেল, সড়ক, নৌপথ বা বন্দর ও বিমান পরিবহন কাঠামোও তেল, গ্যাস এবং পেট্রোকেমিকেল পণ্যসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহনের জন্য বেশ সুবিধাজনক বা উপযোগী। অন্যদিকে ইরানি বিশেষজ্ঞরা তেল ও গ্যাসের পাইপ লাইন, তেল-ট্যাংকার ও শোধনাগার নির্মাণ শিল্পেও বেশ দক্ষতা অর্জন করেছেন।

কাস্পিয়ান সাগর-সংলগ্ন দেশগুলো ইরানের জ্বালানি পরিবহনের ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে বা ব্যবহার করতে ক্রমেই গভীর আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ অঞ্চল থেকে ইউরোপে জ্বালানি রপ্তানির পরিকল্পনাগুলো বেশ সমস্যার সম্মুখীন। বাকু-তিবলিস-জিহান তেল পাইপ-লাইন, কাজাকিস্তানের তিনগিজ থেকে রাশিয়ার নুভসিস্ক পাইপ-লাইন এবং বাকু -আরজারুম-কনসারসিউম পাইপ লাইনের পরিকল্পনাগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিনিয়োগ সত্ত্বেও অনেক সমস্যার সম্মুখীন। বিশেষ করে চেচনিয়া, দাগেস্তান ও আভেস্তিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ওই প্রকল্পগুলো নিরাপত্তাগত হুমকির সম্মুখীন। কাস্পিয়ান সাগরের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে পাইপ লাইন বসানোর "ট্রান্স-কাস্পিয়ান" পরিকল্পনাও পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, এই সাগরের নিচের ভূমি পুরোপুরি ভূমিকম্প-প্রবন হওয়ায় সেখানে জ্বালানির পাইপ-লাইন বসানোকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০০৯ সালে নাব্বুকো গ্যাস পাইপ-লাইন নামে যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তুরস্কের সাথে ইউরোপীয় চারটি দেশের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা ইরানের অন্তর্ভুক্তি ছাড়া সাশ্রয়ী ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরনের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত হচ্ছে না। প্রথমদিকে এ পরিকল্পনায় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পরে ২০০৬ সালের জুন মাসে তুরস্ক ও ইউরোপীয় জোটের পক্ষ থেকে এ পরিকল্পনাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার ওই প্রকল্প থেকে ইরানকে বাদ দেয়ার দাবি জানায়। কিন্তু ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে কেবল রাশিয়ার গ্যাস ওই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। তাই শেল, এনি ও টোটালের মত বড় বড় ইউরোপীয় কোম্পানীগুলো মার্কিন সরকারের চাপিয়ে দেয়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জ্বালানি খাতে ইরানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের জন্য এখনও জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এসব কোম্পানী মার্কিন সরকারের প্রস্তাবিত ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর প্রতি আস্থাশীল নয়।

তুর্কমেনিস্তান থেকে তুরস্কে গ্যাস আমদানির জন্য তুর্কি সরকার ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়াও তুরস্ক সরকার ইরানকে নাব্বুকো চুক্তির সদস্য করার দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান পার্স পাইপ-লাইনযোগে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির জন্য ভিন্ন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে দক্ষিণ ইরান থেকে পাইপ লাইনযোগে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানী করা হবে।
ইরান পাইপলাইনযোগে পাকিস্তানে গ্যাস সরবরাহের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইসলামাবাদের সাথে। ভারত ও চিন এই পাইপলাইন ব্যবহার করতে আগ্রহী হওয়ায় লাইনটি দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ইরান তার পশ্চিমের প্রতিবেশীদের সাথেও কয়েকটি অভিন্ন গ্যাস ফিল্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে এবং ইরাকের সাথে আলাদাভাবে জ্বালানি খাতে সহযোগিতার চিন্তাভাবনা করছে।

এটা স্পষ্ট, ইউরোপ তার ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটানোর জন্য ইরানের বিপুল গ্যাস মজুদ ব্যবহারের মুখাপেক্ষী। তাই এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য সম্ভব হবে না। একদিকে গ্যাস ও তেলের বিপুল মজুদ এবং অন্যদিকে অত্যন্ত সুবিধাজনক ও কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ইরানকে উপেক্ষা করা জ্বালানি সংকট-পীড়িত দেশগুলোর জন্য সম্ভব হবে না। এরই আলোকে কাতার, রাশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরাক, তুর্কমেনিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি খাতে ইরানের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার পথও সুগম হয়েছে।

১৭.
পণ্য ট্রানজিট খাতে ইরানের সাফল্য

মধ্য-এশিয়া, ককেশাস ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল সংলগ্ন হওয়ায় ইরান এশিয়া ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের দৈর্ঘ তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। ইরানের উত্তর সীমান্তে কাস্পিয়ান সাগর এবং দক্ষিণে ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগর থাকায় বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে নৌ-যোগাযোগের সুবাদে বিশ্বের বাজারগুলো রয়েছে ইরানের নিরাপদ নাগালের মধ্যে।
ইরান একদিকে রাশিয়া, কাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও আযারবাইজানের প্রতিবেশী। অন্যদিকে দেশটি ইরাক, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের প্রতিবেশী। বিশ্বের ১৫টি দেশের জল ও স্থল-সীমান্ত পথের সাথে ইরানের সংযোগ রয়েছে।
ফলে এ অঞ্চলসহ আশপাশের অঞ্চলগুলোর জন্য ইরান সবচেয়ে নিশ্চিত, নিরাপদ, সহজ, সংক্ষিপ্ত ও সবচেয়ে সাশ্রয়ী বা কম ব্যয়বহুল ট্রানজিট-রুট। ইরানের রেল, সড়ক, নৌপথ বা বন্দর ও বিমান পরিবহন কাঠামোও তেল, গ্যাস এবং পেট্রোকেমিকেল পণ্যসহ সব ধরনের পণ্য পরিবহনের জন্য বেশ সুবিধাজনক বা উপযোগী।

"উত্তর-দক্ষিণ করিডোর" নামে এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রকল্প গঠন এবং ইকো ও সাংহাই অর্থনৈতিক জোটে ইরানের উপস্থিতির ফলে ইরানের সংযোগকারী অবস্থানের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। তেহরান এখন এশিয়ার তিন অর্থনৈতিক জোট ইকো, সার্ক ও সাংহাই জোটের মধ্যে সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে পণ্য-পরিবহন ও ট্রানজিট খাতে সংযোগ সেতু হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ইরান।
ইরানের সবচেয়ে দক্ষিণে পারস্য উপসাগর উপকূলে অবস্থিত বন্দর আব্বাস এবং সবচেয়ে উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর উপকূলে অবস্থিত বন্দর আঞ্জালি ও আমিরাবাদ এই বিশাল দেশটির উত্তর ও দক্ষিণের প্রধান সংযোগ-সড়ক। এই মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণের পারস্য উপসাগর উপকূলীয় চাবাহার, লাঙ্গেহ, বুশেহর ও ইমাম খোমেনি বন্দর এবং ওমান সাগর। ফলে ইরানের উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগ সড়কগুলো দেশটির পণ্য-পরিবহন ও ট্রানজিট ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।

অন্যদিকে ইরানের পূর্ব থেকে পশ্চিমের প্রধান সংযোগ সড়ক পূর্বাঞ্চলে শুরু হয়েছে তুর্কমেনিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন সারাখস শহরে এবং শেষ হয়েছে তুরস্ক ও আযারবাইযান সংলগ্ন বাজারগান ও জোলফা শহরে। এই মহাসড়ককে প্রাচীন সিল্ক রোড বা রেশম-সড়কের উপযুক্ত বিকল্প বলে মনে করা হয়। প্রাচীন সিল্ক রোড ছিল দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম। ভৌগলিক দিক থেকে এইসব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ইরানের পণ্য-পরিবহন ও ট্রানজিট ক্ষমতা ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত উপমহাদেশের সাথে ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের সংযোগের জন্য ট্রানজিট হিসেবেও ইরানের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ওমান সাগর উপকূলে ইরানের চাবাহার বন্দর আফগানিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।

২০১০ সালে তুর্কমেনিস্তানের এশক্বাবাদ শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫ টি দেশের পণ্য পরিবহন ও ট্রানজিট সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে ইরান, ওমান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও কাতার। এই দেশগুলো জল, সড়ক ও রেল পথে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ইরান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাকিস্তানও অভিন্ন রেল পথ নির্মাণের জন্য এশক্বাবাদে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ওই চুক্তি বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ে এ তিনটি দেশের পণ্য পরিবহন এক কোটি টনে উন্নীত হয়েছে এবং বছরে তা দেড় কোটি টনে উন্নীত হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এই ক্ষমতা উন্নীত হবে দুই কোটি টনে ।

বর্তমানে তুর্কমেনিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ইরানের রেল ও সড়ক যোগাযোগের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। মধ্য এশিয়ার চারটি দেশের সাথে রয়েছে ইরানের অভিন্ন সীমান্ত এবং এ অঞ্চলের দুটি দেশের সাথে রয়েছে রেল যোগাযোগ ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্য দিয়ে নৌ-পথের সংযোগ। এ ছাড়াও ইরানের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহনের জন্য আরো অনেক সুযোগ রয়েছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য। উদ্যোগের অভাবে এসব সুযোগ এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

গত বছর ইরানের ভেতর দিয়ে ১১১টি দেশের ৯৫ লাখ টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। ২০০৯ সালের তুলনায় এক্ষেত্রে শতকরা ৩৪ ভাগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ওই বছর ইরানের ভেতর দিয়ে প্রায় ৭০ লাখ টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। চলতি বছরে ইরানের মধ্য দিয়ে এক কোটি বিশ লাখ টন পণ্য পরিবাহিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ইরানের অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে দেশটি এই খাতের উন্নয়নকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইরানে রেলপথের দৈর্ঘ্য চার হাজার কিলোমিটার বৃদ্ধি এবং বড় বড় বা প্রধান সড়কগুলোকে মহাসড়কে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপ ও এ ধরনের সড়কের দৈর্ঘ ১৩ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

ইরানকে বহির্বিশ্বে একঘরে করার মার্কিন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ট্রানজিট ও পণ্য পরিবহন খাতে বিভিন্ন দেশের সাথে ইরানের যৌথ ও বহুপক্ষীয় প্রকল্পগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামি ইরান বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন খাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও এ অঞ্চলের দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বিশেষ করে এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও ঐক্য জোরদার করা সম্ভব বলে মনে করে। ইরানের কর্মকর্তারা এরই আলোকে প্রতিবেশি দেশগুলোসহ পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পি জি সি সি-ভুক্ত দেশগুলোর মত উৎপাদক নানা দেশ এবং চিন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মত ভোক্তা দেশগুলোর সাথে পণ্য-পরিবহন ও বাণিজ্য খাতে সহযোগিতা জোরদারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইসলামি ইরান এশিয়ার দেশগুলোর পণ্য-পরিবহন ও বাণিজ্য খাতগুলোকে আরো উন্নত করা এবং এসব খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য " এশিয়ান ইউনিয়ন " গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

১৮.
মৎস্য শিল্পে ইরানের নানা সাফল্য

ইরানে আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ ও কৃত্রিম উপায়ে মাছের বংশ বিস্তারের প্রকল্প প্রথমবারের মত শুরু হয়েছিল ১৯২২ সালে। স্যামন জাতীয় ট্রাউট বা গেজেল আলা মাছ চাষের মধ্য দিয়ে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বর্তমানে ইরান সংলগ্ন কাস্পিয়ান সাগর ও পারস্য উপসাগরে এবং দেশটির ভেতরে অবস্থিত নানা জলাশয়ে মাছ চাষ হচ্ছে ব্যাপক মাত্রায়।
ইরানের উত্তরে অবস্থিত কাস্পিয়ান সাগরটি আসলে বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদ বা স্থলবেস্টিত সাগর। এই সাগর চারলক্ষ ৪০ হাজার বর্গ কিলোমিটার চওড়া এবং ইরান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাকিস্তান, রাশিয়া ও আযারবাইযান প্রজাতন্ত্রের স্থলভাগ ঘেঁষে এই সাগরের রয়েছে ছয় হাজার ৪০০ কিলোমিটার সমুদ্র সীমা। এর মধ্যে ৯২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল রয়েছে ইরানের সীমানায়। কাস্পিয়ান সাগরের পানি নোনা। এ সাগরে রয়েছে ১১৩ প্রজাতির মাছ। এসবের মধ্যে ৯৮ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে। জীবতাত্ত্বিক দিক থেকে এসব মাছকে ক্যাভিয়ার ও কাঁটাযুক্ত মাছ- এ দু'ভাগে ভাগ করা যায়।

ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের আয়তন দুই লাখ ৪০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এ সাগরের পানি বিশ্বের সাগরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মিষ্টি ও উষ্ণ। এ দুই সাগরে রয়েছে ৪০০'রও কিছু বেশি প্রজাতির মাছ। এসব মাছের মধ্যে ২০ প্রজাতির মাছের চামড়া বেশ শক্ত এবং এখানে নরম শরীরের দশ ধরনের মাছ রয়েছে। বর্তমানে ইরান-ঘেঁষে ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের ১৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলে ছয় ধরনের শক্ত চামড়ার মাছ ও ৫ ধরনের নরম শরীরের মাছসহ ১০০'রও বেশি প্রজাতির মাছ শিকার করা হয়। ইরানের ভেতরে অবস্থিত নদ-নদী, খাল ও পুকুরসহ নানা প্রাকৃতিক ও আধা-প্রাকৃতিক জলাশয়ে ১৩৩ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
ইরানের ১২ টি অঞ্চলে এখন কৃত্রিম পদ্ধতিতে ক্যাভিয়ার জাতীয় মাছ চাষ করা হচ্ছে। এসব খামারে বছরে দশ টনেরও বেশি ক্যাভিয়ার উৎপাদিত হয়। ইরানের প্রাইভেট খামারগুলোতেও ত্রিশ থেকে ৪০ হাজার ক্যাভিয়ার মাছ প্রতিপালিত হচ্ছে। গত বছর ইরানে উৎপাদিত কাঁটাবিহীন ক্যাভিয়ারের পরিমাণ ছিল ৬০ টন। চলতি বছর প্রাইভেট ফার্মগুলোর ক্যাভিয়ারও বাজারজাত করা হবে।

ইরানের বিভিন্ন ধরনের ক্যাভিয়ার মাছের জাত বা প্রজাতির বীজ সংরক্ষণের জন্য দেশটির উত্তরাঞ্চলে সেফিদরুদ নামক নদীতে এসব মাছ প্রতিপালন করা হচ্ছে। বিলুপ্ত হওয়ার সম্মুখীন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের জন্যও উদ্যোগ নিয়েছে ইরানের মৎস্য গবেষণা সংস্থা। ইরানের ও বিশেষ করে সেফিদরুদ নদীর বিশেষ কয়েকটি ক্যাভিয়ারের প্রজাতি রক্ষার জন্য কাজ করছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা। বিলুপ্তপ্রায় মাছগুলোর ডি এন এ ও স্পার্মের ব্যংক গঠন করা হয়েছে "কাস্পিয়ান সাগর পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচী"র সহায়তায়। ২০০৯ সালের শরৎকাল থেকে ওইসব কর্মসূচীর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য সাত লক্ষ ৫০ হাজার ডলার খরচ করা হবে। ইরানের মৎস্য গবেষণা সংস্থা, ক্যাভিয়ারের প্রজাতি রক্ষার আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এবং "কাস্পিয়ান সাগর পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচী"র তত্ত্বাবধানে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে ক্যাভিয়ার মাছের স্পার্ম।

ইরান "কাস্পিয়ান সাগর পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মসূচী" বাস্তবায়নে জাতিসংঘের কয়েকটি সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে সহযোগিতা করছে। গত দুই দশকে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন সাগর থেকে নয় থেকে দশ কোটি টন মাছ ধরা হয়েছে। অন্যদিকে দেশগুলোর ভেতরের জলাশয় থেকে উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টন মাছ ও জলজ প্রাণী। অথচ দেশগুলোর ভেতরের জলাশয় বিশ্বের মোট জলাশয়ের মাত্র ২ শতাংশ। ১৯৮০ সালে বিশ্বে উৎপাদিত হয়েছে ৫০ লাখ টন জলজ প্রাণী। বর্তমানে এই খাতে উৎপাদন ৫ কোটি ২০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।

২০০০ থেকে ২০১০ সালে ইরানে মাছ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ৮ দশমিক ৮ ভাগ। প্রতি বছরে গড়ে প্রবৃদ্ধির এ হার ছিল শূন্য চার দশমিক এক। ইরান আগামী দশ বছরের মধ্যে মৎস্য উৎপাদন খাতে আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধির সম পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০১৪ সালের মধ্যে ইরানের মৎস্য উৎপাদন দশ লাখ টনে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দেশটির ৫ সালা পরিকল্পনায় কর্মসূচী রাখা হয়েছে। বর্তমানে ইরানে জিয়ানো পদ্ধতিতে ক্যাভিয়ারসহ অন্য প্রজাতির মাছ উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ থেকে ৯ লাখ টন।

কৃত্রিম উপায়ে চিংড়ি চাষের যে উপযুক্ত বা উর্বর ক্ষেত্র ইরানে রয়েছে তাতে বছরে দুই বার চিংড়ি আহরণ করা সম্ভব এবং প্রতি হেক্টরে দশ টন চিংড়ি উৎপাদন করা যাবে। ২০০৯ সালে ইরান ৬ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন ও আহরণ করেছে, শীতল পানির মাছ উৎপাদন করেছে ৭০ হাজার টন এবং উষ্ণ পানির মাছ উৎপাদন করেছে প্রায় এক লাখ টন। চলতি বছর ইরানের চিংড়ি মাছ রপ্তানির পরিমাণ ২ হাজার টনেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইরানের চিংড়ি স্পেন, ইতালি, আরব আমিরাত, মিশর, লেবানন

পরিবেশ এবং মাছ ও জলজ প্রাণী-সম্পদের কোনো ক্ষতি না করেই এই সম্পদের পরিমাণ দায়িত্বশীল মাত্রায় বৃদ্ধি করার জন্য ৫ সালা পরিকল্পনায় কর্মসূচী নিয়েছে ইরান। জলজ সম্পদের ক্ষতি কমানো ও জলজ-প্রাণী সম্পদের পূনর্গঠনও এ কর্মসূচীতে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
ইরানের মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাছের বিভিন্ন রোগ, বিশেষ করে ছত্রাক ও শ্বেত রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে। এ প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে অনেকাংশে সফল হয়েছে। ইরানের বিশেষজ্ঞরা এ টিকা তৈরিতে পারমাণবিক ও অপারমাণবিক পন্থা ব্যবহার করেছেন।

১৯.
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ইরানের সাফল্য

বিশ্বে নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যের চাহিদাও ব্যাপক মাত্রায় বাড়ছে। এ অবস্থায় খাদ্যের নিরাপত্তা দেশগুলোর রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলছে প্রত্যক্ষভাবে। তাই খাদ্যের নিরাপত্তা প্রত্যেক দেশের জন্য জরুরি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং কৃষিজাত খাদ্য-শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্য শিল্পের প্রসার বর্তমান যুগের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত।
ইসলামি বিপ্লবের আগে কৃষি ও খাদ্য শিল্পে ইরান ছিল প্রায় পুরোপুরি পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর কৃষি সম্প্রসারণের ব্যাপক উদ্যোগ নেয় বিপ্লবী সরকার। এরই আলোকে কৃষিকাজের জন্য জরুরি সামগ্রী ও গমের মত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য-শস্য উৎপাদনে ইরানকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন শুরু হয়। কৃষিকাজের জন্য জরুরি প্রায় সব কিছু এখন ইরান নিজেই তৈরি করছে। গমসহ অন্য অনেক কৃষি-পণ্য উৎপাদনেও ইসলামি এই দেশটি স্বনির্ভর হয়েছে। ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া ৮ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ ও পাশ্চাত্যের নানা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান এসব সাফল্য অর্জন করেছে।

মোটামুটি শুস্ক মরুময় দেশ ইরানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু তা সত্ত্বেও কৃষিকাজের জন্য পানি সরবরাহের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক বাঁধ। ফলে মরুময় ও আধা-মরুময় অনেক প্রান্তর পরিণত হয়েছে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে বছরে কয়েকবার ফসল তোলা হয়। ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ইরান খাদ্য আমদানির ওপর সবচেয়ে কম নির্ভরশীল দেশ। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এ অঞ্চলের পরিবারগুলোর শতকরা ৬ ভাগ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় এবং ইরানের গড় খাদ্য আমদানির পরিমাণ ইউরোপ ও মধ্য-এশিয়ার দেশগুলোর চেয়েও কম।

২০১০ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা ফাও-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই বছর ইরানে খাদ্য উৎপাদন ১৯ দশমিক এক মিলিয়ন বা এক কোটি ৯০ লাখ টন বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টন। একই বছরে অর্থাৎ গত বছরে বিদেশ থেকে ইরানে শস্য আমদানির পরিমাণ একুশ লাখ টন হ্রাস পেয়েছে। ওই বছর ইরান শস্য আমদানি করেছে ৬৬ লাখ টন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালে ইরান খাদ্য আমদানি করেছিল ৮৭ লাখ টন। অন্যদিকে ২০১০ সালে ইরান বিদেশে শস্য রপ্তানি করেছে দশ লাখ টন। ফাও জানিয়েছে, ইরানে গম উৎপাদন ১৫ লাখ টন বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১০ সালে দেশটির গম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল এক কোটি ৪৫ লাখ টন। ওই বছর বিশ্বে গম উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে আর্জেন্টিনায় এবং দ্বিতীয় স্থানে ছিল ইরান। ২০১০ সালে গম উৎপাদনে আর্জেন্টিনার প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ১১ দশমিক ৫ ভাগ। অথচ ওই বছর বিশ্বে গম উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে শতকরা ৫ দশমিক এক ভাগ হ্রাস পেয়েছিল।

"ফাও"-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে ইরান বিদেশে দশ লাখ টন গম রপ্তানি করেছে এবং তার নিজস্ব গমের মজুদে দুই লাখ টন গম যুক্ত করেছে। ২০০৯ সালেও ইরান বিদেশে দশ লাখ টন গম রপ্তানি করেছিল। চলতি বছরেও ইরানে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০১০ সালে ইরানে চাল উৎপাদনও বেড়েছে শতকরা ১৪ ভাগ। ওই বছর ইরানে চাল উৎপাদিত হয়েছে ১৬ লাখ টন এবং আগের বছর উৎপাদিত হয়েছিল ১৪ লাখ টন। "ফাও"-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে বিশ্বে শস্য উৎপাদনের পরিমাণ শতকরা ২ ভাগ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও ইরানে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের পঞ্চ বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি বছর দেশটির কৃষি পণ্য রপ্তানি ৪০০ কোটি ডলারেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছর ইরান ২৭০ কোটি ডলার মূল্যের কৃষি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে। এ ছাড়াও গত বছর বিশ্বের বাজারগুলোতে ৭০ কোটি ডলারেরও বেশি ইরানি খাদ্য সামগ্রী রপ্তানি হয়েছে।
বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যাপক ক্ষরার প্রেক্ষাপটে ইরান ২০০৬ সালে "কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে বিশেষ জাতীয় নীতি বা কৌশল"-শীর্ষক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্য খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনএবং খাদ্য খাতে শতকরা ১০০ ভাগ নিরাপত্তা বিধান এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। এ ছাড়াও কৃষি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, পানি ও মাটি সম্পদ রক্ষা, উৎপাদন ইউনিটগুলোর আধুনিকায়ন বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদন এবং কৃষকদের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি ওই বিশেষ পরিকল্পনার আরো কয়েকটি লক্ষ্য। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইরানের জাতীয় পঞ্চ বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার দ্বিতীয় বছর চলছে।

বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলো খাদ্য সামগ্রীর নানা উপজাত উৎপাদন এবং নানা ধরনের কৃষিজাত কাঁচা বা অপ্রক্রিয়াজাত সামগ্রীকে প্রক্রিয়াজাত করে সেগুলোকে বাজারজাত করছে। এ খাতে ব্যাপক পুঁজি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। ইরানের পঞ্চ বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশটি দুই কোটি ৫০ লাখ টন কাঁচা কৃষি পণ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করবে। এ কর্মসূচীর আওতায় ইরান প্রতি বছর ফল, শাক-সবজি ও উদ্ভিদজাত সামগ্রীর মত কাঁচা কৃষি পণ্য ৫০ থেকে ৫৪ লাখ টন পর্যন্ত প্রক্রিয়াজাত করবে এবং এর ফলে ইরানের কৃষি পণ্যের মজুদ দুই কোটি টন বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে ইরান কৃষি খাতে আধুনিক ও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে দর্শনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং ইরান এক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতাগুলো অন্য দেশগুলোর কাছে হস্তান্তর করতে ও অন্যদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে আগ্রহী।

২০.
হালাল খাদ্য শিল্পে ইরানের সাফল্য

বিশ্বের জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ মুসলমান এবং মুসলিম জনসংখ্যা বেশ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। অমুসলিম দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক মুসলমান বসবাস করায় ওইসব দেশে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে হালাল খাদ্য ও হালাল পণ্য সামগ্রী পাওয়া বা চিহ্নিত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। তাই প্যাকেটের গায়ে "হালাল" শব্দ লিখে ওইসব দেশে হালাল খাদ্য ও হালাল পণ্য-সামগ্রী সরবরাহ করার প্রথা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্য ও আফ্রিকা মহাদেশে এবং এমনকি চিনের মত অমুসলিম দেশেও হালাল খাদ্য ও হালাল ব্যবহারিক সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রকমারি হালাল খাদ্য ও হালাল পণ্য শিল্প গড়ে উঠেছে। তবে মূলতঃ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই গড়ে উঠেছে হালাল খাদ্য-শিল্প। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের অমুসলিম দেশগুলোতেও হালাল খাদ্য সামগ্রীর রপ্তানি ক্রমেই বাড়ছে। ইউরোপে দেড় কোটিরও বেশি মুসলমান বাস করছেন এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

বর্তমান বিশ্বে খাদ্য-বাণিজ্যের শতকরা প্রায় দশ ভাগ খাদ্য সামগ্রীর উৎস হালাল। ২০০৪ সালে বিশ্ব খাদ্য-বাণিজ্যে মুসলিম দেশগুলোর অবদান ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। আর ২০০৯ সালে তা ১৮ হাজার ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। গত এক দশকের তুলনায় বিশ্বে হালাল খাদ্য-সামগ্রী রপ্তানি ৫ গুণ বেড়েছে।
ব্যাপক পুঁজি বিনিয়োগের সুবাদে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানেও হালাল খাদ্য-শিল্প খাত বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। ইরান ২০১০ সালে মুসলিম ও অমুসলিম দেশগুলোতে হালাল মার্কের খাদ্য রপ্তানি করেছে প্রায় চারশ কোটি ডলার মূল্যের। ২০২৫ সাল নাগাদ এ খাত থেকে ইরানের রপ্তানি আয় চারগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ইরান অনেক খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়েছে। দেশটির রয়েছে ৪৫ হাজারেরও বেশি কৃষি বিশেষজ্ঞ। কাস্পিয়ান সাগর ও পারস্য উপসাগরের বিশাল উপকূল-বেষ্টিত ইরানে বিচিত্রময় আবহাওয়া থাকায় হালাল খাদ্য উৎপাদনের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে এ দেশটিতে।

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা ফাও জানিয়েছে, কৃষি ক্ষেত্রে সুষম বণ্টনের অভাব খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম বড় বা প্রধান কারণ। অনেক মুসলিম দেশও এ সংকটের সম্মুখীন। ফাও'র হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৯২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে এবং এসব মানুষ মৃত্যুর হুমকির সম্মুখীন। এ অবস্থায় কৃষি উৎপাদানে উন্নত ও অগ্রসর দেশগুলো আঞ্চলিক এবং বিশ্ব পর্যায়ে খাদ্য-নিরাপত্তা বিধানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ফাও'র রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন দশকে ইরানে জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশটি কৃষি খাতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

কৃষি খাতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইরান বিভিন্ন খাদ্যের উপজাত সামগ্রী বিশ্বের ৫০টি দেশে রপ্তানি করছে। এসব খাদ্যের মানও অত্যন্ত উন্নত। এ ছাড়াও ইরান কৃষি ও খাদ্য শিল্পে বিভিন্ন যৌথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তুত। ইরান এ লক্ষ্যে ২০১০ সালে নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় অনুষ্ঠিত উন্নয়নশীল কয়েকটি মুসলিম দেশের জোট "ডি-এইট"-র সম্মেলনে কৃষিখাতে মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক পুঁজিবিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। " ডি-এইট " -ভুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যা ইউরোপীয় জোটের জনসংখ্যার দ্বিগুণ। দক্ষ জনশক্তি, অসাধারণ ভৌগলিক অবস্থান ও রাজনৈতিক ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে "ডি-এইট" কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও বিজ্ঞান খাতে ইউরোপীয় জোটের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম। গত মে মাসে তেহরানে "ডি-এইট" -ভুক্ত দেশগুলোর কৃষিমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সম্মেলনে কৃষি বিষয়ক লাগসই প্রযুক্তি বিনিময় এবং কৃষি খাত ও হালাল খাদ্য শিল্পের উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে তেহরান। ইরান কৃষি খাত ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে তার অভিজ্ঞতা "ডি-এইট" -ভুক্ত দেশগুলোর কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
ইরান ২০০৮ সালে গম ক্ষেতের পোকা নিয়ন্ত্রণের মত কয়েকটি খাতে সহযোগিতার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাথে একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ইরান একই ধরনের চুক্তি ইরাক, সুদান ও আফগানিস্তানের মত দেশগুলোর সাথেও স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান মূলতঃ আধা-মরুময় দেশ হওয়া সত্ত্বেও গত তিন দশকে কৃষি উৎপাদনে চমৎকার ও দর্শনীয় নানা সাফল্য অর্জন করেছে। এ সময়ে ইরানের কৃষি উৎপাদন ২ কোটি ৫০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দশ কোটি ৭০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। চলতি বছরে ইরানে কৃষি উৎপাদন ১১ কোটি ৮০ লাখ টনে পৌঁছুবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পিত প্রচেষ্টার সুফল হিসেবে বর্তমানে ইরানে কৃষি উৎপাদন খাতে স্বনির্ভরতা ও খাদ্য নিরাপত্তা শতকরা ৪৭ ভাগ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৯২ ভাগে উন্নীত হয়েছে।

২১.
পাশ্চাত্যের নানা নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় ইরানের সাফল্যের কিছু দিক

গত তিন দশকে ইরানের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের নানা ধরনের অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দর্শনীয় অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইরানের চোখ ধাঁধানো অনেক সাফল্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবেলায় দেশটির শক্তিমত্তার নিদর্শন বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকরাই স্বীকার করেছেন। গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল সমৃদ্ধ এবং দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্রমেই বাড়ছে। " ভর্তুকীর সুষম বা ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার" শীর্ষক কর্মসূচীও সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করছে ইরানের ইসলামী সরকার। গত বছর ওই কর্মসূচী বাস্তবায়ন শুরু হয়।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা শুরু হয়। এসব ক্ষেত্রে ইরান খুব অল্প দিনের মধ্যেই দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করায় মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ ইরানের বিপ্লবী মুসলিম জাতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নানা প্রচেষ্টা শুরু করে। ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরই মার্কিন সরকার ইরানের ওপর একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই থেকে প্রতি বছরই এ নিষেধাজ্ঞা নবায়ন করে আসছে মার্কিন সরকার। তবে গত চার বছরে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন প্রচেষ্টা ছিল লক্ষনীয়। মার্কিন সরকার ও তার মিত্র দেশগুলোসহ ইহুদিবাদী মহলের চাপের মুখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গত কয়েক বছরে ইরানের ওপর চারটি নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব পাস করেছে। ইরানকে একঘরে ও অচলাবস্থার সম্মুখীন করার লক্ষ্যে ওইসব প্রস্তাব পাস করা হলেও সব ক্ষেত্রেই ওই নিষেধাজ্ঞাগুলো ব্যর্থ বা অকার্যকর হয়েছে এবং এ অবস্থায় মার্কিন সরকারই হতাশ হয়ে পড়েছে। বহু দেশই এসব নিষেধাজ্ঞা মান্য করছে না। অন্যদিকে ইরানের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সুস্পষ্ট করেছে ওইসব নিষেধাজ্ঞার ব্যর্থতা ।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সাময়িকী "মিড"জানিয়েছে, গত বছরে বাস্তবায়নের কাজ চলছে এমন প্রকল্পের সংখ্যার দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান ছিল চতুর্থ। এসব প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ২০০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে ইরানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা ৭ ভাগ।
বিশ্ব ব্যাংকের আওতাধীন বিশ্ব উন্নয়ন বা ওয়ার্ল্ড ডেভেলপম্যান্ট রিপোর্ট অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক খাতের ১৫ টি সূচকের মধ্যে ১৩ টি সূচকই ছিল ইতিবাচক। আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য নানা রিপোর্ট থেকে এটা স্পষ্ট ইরানের ইসলামী বিপ্লব পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিশ্ব বাজারে এর অবস্থানের সাথে বর্তমান অবস্থার কোনো তুলনাই হয় না।
স্বৈর ও রাজতান্ত্রিক শাহ সরকারের শাসনামলে ইরানের অর্থনীতি ছিল কেবলই তেল-নির্ভর। বর্তমানে ইরান তেলের আয়ের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশেই কমিয়ে এনেছে। গত বছর ইরানের তেল-বহির্ভূত রপ্তানিতে শতকরা ২৫ ভাগ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বিষয়টি দেশটির জন্য বড় ধরনের সাফল্য।

ইরানের শেয়ার বাজারের সূচকেও শতকরা ৭০ ভাগ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। আর এ থেকেও দেশটির অর্থনীতির শক্তিশালী, সতেজ ও প্রাণবন্ত অবস্থা ফুটে উঠছে। ইরানি শেয়ার বাজারের শেয়ারগুলো গত বছর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোৎকৃষ্ট শেয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিশ্ব স্টক একচেঞ্জ ফেডারেশন জানিয়েছে, গত বছর তেহরানের শেয়ার বাজারে প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা ৮০ ভাগ। গত বছর দেশের বাইরে ইরানের প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশল সেবা রপ্তানিতেও শতকরা ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১০ সালে এ খাতে ইরান আয় করেছে ৩০৮ কোটি ত্রিশ লাখ ডলার
ফ্যাক্ট বুক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯ সালে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে চিন ও ভারতের পরই ছিল ইরানের স্থান। এই সংস্থার রিপোর্টে এটাও বলা হয়েছে যে, শিল্প পণ্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বিশ্বে ২৯তম অবস্থানে রয়েছে ইরান।


মার্কিন সরকার সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে গ্যাসোলিন রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। ইরানের সরকার ও জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানি বিশেষজ্ঞরা গ্যাসোলিনসহ জ্বালানী তেলের বিভিন্ন উপজাত উৎপাদনে তাদের দেশকে স্বনির্ভর করতে সক্ষম হয়েছেন। ইরান এখন দেশের চাহিদা পুরোপুরি মিটিয়ে বিদেশেও গ্যাসোলিন রপ্তানি করছে।
মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররাই ইরানের বিরুদ্ধে অন্যায় বা অন্যায্য নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বের বহু দেশকে শরিক করতে চায়। কিন্তু মার্কিন চাপ সত্ত্বেও এশিয়া ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ জ্বালানীসহ বিভিন্ন খাতে ইরানের সাথে সহযোগিতা জোরদার করতে আগ্রহী। বিশেষ করে মার্কিন সরকারের কোনো কোনো মিত্র দেশের কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের একপেশে নীতি অনুসরণ তাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের মার্কিন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ২০১০ সালে ইরান ও ইউরোপীয় জোটের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর ইরানের তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য বেড়েছে শতকরা ৪০ ভাগ। বর্তমানে বিশ্বের ১৯০ টি দেশের সাথে ইরানের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণও প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বা ১০হাজার কোটি ডলার। ইরানের ইতিহাসে এটি একটি নতুন রেকর্ড।
ইরানের ইসলামী সরকার বর্তমানে "ভর্তুকীর সুষম বা ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার" শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আই এম এফ'র রিপোর্ট অনুযায়ী এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় প্রতি বছর ইরানের ৬ হাজার কোটি ডলারের ভর্তুকী সাশ্রয় হবে, যা দেশটির গড় জাতীয় উৎপাদনের পনের শতাংশ। এ প্রকল্পের আওতায় ইরানি পরিবারগুলো কিছু নগদ অর্থ পাচ্ছে এবং এর ফলে কম আয়ের অধিকারী পরিবারগুলো মুদ্রাস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই কাটাতে সক্ষম হয়েছে। ইরানি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যও অনেকাংশে দূর করছে এ প্রকল্প।

আই এম এফ'র পূর্বাভাস অনুযায়ী "ভর্তুকীর সুষম বা ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার" শীর্ষক অর্থনৈতিক সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশটির অর্থনীতির ব্যাপক অগ্রগতি ঘটবে। পশ্চিমা শক্তিগুলো পরমাণু শক্তির মত অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখার জন্য নিষেধাজ্ঞার অন্যায্য ও উপনিবেশবাদী নীতি ব্যবহার করছে। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী যেমনটি বার বার বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং তেহরানের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউজের বিদ্বেষী নীতির ফলে প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান সবক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আদর্শে পরিণত হয়েছে। #

 

(সমাপ্ত)

{jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন