এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 19 মে 2011 12:15

পশ্চিমাদের প্রচারণা ও ইরানের প্রকৃত স্বরূপ

দৈনিক ফ্রাওদা পত্রিকার সম্পাদক 'ভিক্টোরিয়া ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' বলেছিলেনঃ 'ইরান এমন একটি দেশ যে দেশ একবার ভ্রমণ করে স্বচক্ষে সেখানকার সবকিছু দেখা অন্যের মুখে শতবার শোনার চেয়ে উত্তম।' তিনি ইরান ভ্রমণ করে ইরানের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উন্নয়নের যে পরিস্থিতি দেখেছেন তা তিনি একেবারে নিরাবেগ সাবলীলতায় তাঁর লেখায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ইরানের যে স্বরূপ ফুটে উঠেছে তা নিয়ে আমরা আলোচনার প্রয়াস পাবো।

ইরান সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে 'ভিক্টোরিয়া ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' বলেছেনঃ 'ইরান নামে নতুন একটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন'। তাঁর এই লেখা ইরান সম্পর্কে একেবারে বাস্তব ও নিরপেক্ষ একটি মূল্যায়ন। বিশ্ববাসীকে এই মহিলা সাংবাদিক ইরান সম্পর্কে যথার্থ একটি ধারণা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য বিশ্ববাসীকে এই সুস্পষ্ট ধারণা দেয় যে, বর্তমান যুগের ইরান সকল প্রকার চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নিজেদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ফলে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইরানের প্রকৃত চেহারাকে বিকৃতরূপে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা লাগাতারভাবে চালিয়ে এসেছে তা কোনো কাজে আসেনি। 'ইয়াস্নোপোলেস্কায়া'র লেখায় আরো এসেছেঃ 'সবকিছুর আগে বলা উচিত ইরান সম্পর্কে যেরকম ধারণা করা হয়ঃ এই দেশটা আপাদমস্তক রাজনীতিতে ঢাকা এবং এদেশের জনগণ কেবল সহিংসতাপূর্ণ বিক্ষোভের কাজেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে-এই ধারণা একেবারেই ভুল। প্রকৃত সত্য হলো বিক্ষোভের ওপর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যেসব প্রতিবেদন প্রচার করে বা তৈরি করে সেগুলো একবোরেই বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ বাস্তবতা বিবর্জিত চিত্র'।

রুশ এই মহিলা সাংবাদিক আরো লিখেছেনঃ 'প্রকৃতপক্ষে তেহরানের দেড় কোটি মানুষ সুখ-শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগে ইরানের শাসনব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্যপন্থী। সে সময় মেলায় বেড়াতে যাওয়া, অ্যালকোহলিক পানীয় তথা মদ পান করা কিংবা সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা বৈধ ছিল, কিন্তু এখন গণ কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে ইরানের নারীরা মাথায় স্কার্ফ এবং চাদর পরে ইসলামী হিজাব করে অংশ নেয় বা যাওয়া-আসা করে। ইরানের বাসগুলোতে নারী-পুরুষের জন্যে আলাদাভাবে আসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও ইরানের আইন কানুনগুলো অধিকাংশ আরব দেশের মতো কঠোর নয়। ইরানের নারীরা তাদের চেহারা নেকাব দিয়ে ঢেকে ফেলে না এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তারা বেশ তৎপর'।

ফ্রাওদা পত্রিকার সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক মিস 'ভিক্টোরিয়া ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' আরো লিখেছেনঃ 'সত্যি বলতে কি! ইরানীদের সাথে আরব জাতিগুলোর সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইরানের একটি ফাইভ স্টার হোটেলের রেস্টুরেন্টে মজার একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সৌদি এক শায়খ তিনজন মহিলাকে নিয়ে ঐ রেস্টেুরেন্টে প্রবেশ করলো, মহিলাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত কালো পোশাকে আবৃত ছিল,কেবল দুটি চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। সৌদিআরবের শায়খ তাঁর পছন্দের খাবারগুলোর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন এবং তারপর একটি টেবিলে গিয়ে বসলেন। নারীরা পালাক্রমে ঐ ভদ্রলোকের মনোনীত খাবারগুলো স্বামীর জন্যে নিয়ে এলেন। আরব শায়খ তাঁর খাবার শেষ করে একেক করে রমনীদের কাছে গেলেন, রমনীরা তখন খাবার খাচ্ছিলো। কিন্তু ইরানী সমাজে নারীদের সাথে এ ধরনের আচরণ কল্পনাতীত ব্যাপার। ইরানে নারীদের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে।

ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' আরো বলেছেনঃ 'ইরানী নারীদেরকে স্কার্ফ পরতে হয়-এটা অনস্বীকার্য-কিন্তু ইরানের নারীরা কখনোই আরব নারীদের মতো গৃহপরিচারিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না। ইরানী নারীরা মানুষ হিসেবে মর্যাদার আসনে আসীন, তারা তাদের হিজাবকে সামাজিক সুস্থতা ও নিরাপত্তার উপায় বলে মনে করে'। রুশ এই সাংবাদিক মহিলা আরো স্বীকার করেছেনঃ 'ইরানে নারীদের হিজাব তথা ইসলাম পোশাক পরিধানের ফলে সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের তৎপরতা হ্রাস পায়নি, এমনকি তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপরও কোনোরকম সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয়নি, উল্টো বরং ইরানী সমাজে নারীদের সামাজিক কর্মকাণ্ডমূলক তৎপরতা প্রতিদিনই বাড়ছে। এক্ষেত্রে এটুকু বলাই বোধ হয় যথেষ্ট যে, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরতদের সত্তুর ভাগই হলো ছাত্রী'।

মিস 'ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' তাঁর লেখায় আরো বলেছেনঃ আসলে আমাদের প্রতিনিধি দল ইরানে পৌঁছার পরপরই বুঝতে পেরেছে যে, ইরান সম্পর্কে আমাদের ইতোপূর্বেকার সকল ধারণাই ভুল ছিল। ইরানের উদ্দেশ্যে আমরা যখন উড়োজাহাজে উঠলাম আকাশপথেই আমার একটি ভুল ভেঙ্গেছিল। আমাদেরকে আগে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হতো যে, ইরানী বিমানগুলোতে নারী-পুরুষের জন্যে আসন ব্যবস্থা পৃথক পৃথক এবং বিমানে প্রবেশ করার সময় যাত্রীরা ইরানী আইন কানুন মেনে চলতে বাধ্য। এ কারণে আমি প্রয়োজনীয় স্কার্ফ এবং লম্বা বোরকাও প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। কিন্তু বিমানে ওঠার সময় বুঝলাম আমার উৎকণ্ঠাগুলো একেবারেই অবান্তর এবং নারী-পুরুষ পাশাপাশি যে যার আসনে বসেছে। তাছাড়া বিমান ক্রু মহিলারা ব্যতীত নারীদের পোশাক আশাক ছিল স্বাভাবিক'।

ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' আরো লিখেছেনঃ 'আমার ধারণা ছিল ইরানের সামাজিক পরিবেশটা উন্মুক্ত নয় বরং আবদ্ধ, ইরানে প্রবেশ করার পর তেহরানের রাস্তায় বিশাল বিশাল বিলবোর্ডে জাপান. চীন, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডের বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখে আমার সেই ধারণা পাল্টে যায়। উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি আমার দৃষ্টিতে পড়েছে সেটা হলো, কম্পিউটার প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইরানের বিস্ময়কর অগ্রগতি। তেহরান শহরটা যেন কফিনেটের শহর, যুবকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কফিনেটে কাটায়। ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোটামুটি কোনোরকম সীমাবদ্ধতা নেই, তবে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানকারী কোনো কোনো কোম্পানী অশিষ্ট কিছু কিছু সাইটের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। তবে কিছু কিছু প্রোগ্রামের সাহায্যে সেইসব সীমাবদ্ধতাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব'।

ফ্রাওদা পত্রিকার এই মহিলা সম্পাদক ইরানের চলচ্চিত্র শিল্পেও আমূল পরিবর্তনের কথা বললেন। বিপ্লব বিজয়ের পরপর পরিচালকগণ ইসলামী নীতিমালার কাঠামোর ভেতর থেকে যেভাবে কাজ করতেন, এখন আর সেই কঠোর পরিস্থিতি নেই। এখন চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ছাড়াও চলচ্চিত্র নির্মাণ শিল্পে ইরানী নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। নতুন প্রজন্মের এই নির্মাতাগণ নতুন এক শিল্পদৃষ্টি ও জীবনদৃষ্টি দিয়ে আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। ইরানী জনগণের স্বাধীনচেতা মনোভাব বিস্ময়কর। তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কোনোরকম হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই মেনে নেয় না। এমনকি ইরানের ভেতরে যদি কোনো বিক্ষোভও হয় তাও তাদের নিজেদেরই লোক। পশ্চিমারা কেবল ইরানের প্রকৃত অবস্থাকে বিকৃত করে তুলে ধরতে পারে-এই যা।

ফ্রাওদা পত্রিকার সম্পাদক মিস ইয়াস্নোপোলেস্কায়া' বলেছেনঃ 'ইরানে বিপ্লব পরবর্তী তেত্রিশ বছর ধরে ধর্মভিত্তিক জনগণের অনন্য যে শাসনব্যবস্থা চলছে তা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে,এর সাফল্য এবং এই রাষ্ট্রব্যবস্থার মডেল সম্পর্কে মূল্যায়ন করার সময় এখনো হয়নি। ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সাথে বিশ্বের অপরাপর ধর্মহীন লিবারেল সরকার ব্যবস্থার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে ঠিকই,তবে বিগত ১০/১৫ বছরে ইরানে আধুনিক এবং উন্নত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঐ গণতন্ত্রে ইসলামের সংমিশ্রণ থাকলেও ইরানের বর্তমান জনজীবন ব্যবস্থার সাথে তার চমৎকার সামঞ্জস্য রয়েছে। অবশ্য একটিমাত্র লেখায় আমার ইরান সফরের বিস্তারিত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়'। #
=

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন