এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 14 জানুয়ারী 2012 16:30

ইরানের সাম্প্রতিক নৌমহড়া : শক্তিমত্তা ও যুদ্ধ-ক্ষমতার প্রদর্শনী

সম্প্রতি কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীসহ পারস্য উপসাগর আর ওমান সাগরের বিশ লাখ বর্গ-কিলোমিটার এলাকার বিশাল নীলাভ জলরাশিতে প্রদর্শিত হয়েছে ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা ইরানি নৌ-বাহিনীর প্রবল শক্তিমত্তা। এ মহড়ায় ইরানের বিভিন্ন ধরনের সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, নৌ-বাহিনীর বিশেষ জঙ্গি বিমান, হেলিকপ্টার, পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন, রাডার ফাঁকি দেয়া ক্রুজ ও দূর পাল্লার স্টিলথ ক্ষেপণাস্ত্র প্রভৃতির আক্রমণাত্মক আর প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতার সফল পরীক্ষা বা মহড়া ছিল দর্শনীয়। গত ২৪ শে ডিসেম্বর শুরু হয় এ মহড়া এবং তা শেষ হয় তেসরা জানুয়ারি। এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশও ছিল এ মহড়া-অঞ্চলের আওতাধীন।

ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধ-জাহাজ, রসদবাহী রণতরী, গোয়েন্দা যুদ্ধ-জাহাজ ও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও ছিল এ মহড়ার উল্লেখযোগ্য কিছু সাফল্য। ইরানের উপকূলীয় তেল স্থাপনা, সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা ও শত্রুর জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার লক্ষ্যে মাইন বিছানোর অভিযান ছিল এ মহড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। টহল অভিযান ও শত্রুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও চিহ্নিত করার অনুশীলনও ছিল লক্ষণীয়।

চার পর্বের এ নৌ- মহড়ায় সাগরের ওপরে, সাগরের নিচে ও সাগরের ওপরের আকাশ-যুদ্ধের নানা কৌশল অনুশীলন করেছেন ইরানি নৌ-সেনারা। ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হলে খুব কম সময়ের মধ্যে কিভাবে খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া যায় তার অনুশীলনও ছিল এ মহড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পর্ব। বিশ্বের মোট জ্বালানী তেলের বিশ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার কৌশলগত অভিযানে অংশ নিয়েছে ইরানের নৌ-বাহিনীর সাবমেরিনসহ বিভিন্ন ডুবো-ইউনিট, ভাসমান ইউনিট বা বিভিন্ন ধরণের যুদ্ধ জাহাজ, ও বিমান ইউনিটের সেনারা। ইরানের নৌ-বাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরাল সাইয়ারি এ মহড়া শেষে বলেছেন, ইরানের এ সফল নৌ-মহড়া বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছে যে ইরানি বিশেষজ্ঞরা প্রতিরক্ষা ক্ষমতার লাগসইকরণ ও স্থানীয়করণের ব্যাপক ক্ষমতা রাখেন এবং এমনকি নিষেধাজ্ঞার সময়ও তারা প্রতিরক্ষা-সামগ্রী ব্যবহার করতে সক্ষম।

পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলো "বেলায়েত-৯০" নামের এই নৌ-মহড়াকে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে ইরানের শক্তি প্রদর্শনের মহড়া বলে উল্লেখ করেছে। মহড়ার এক পর্যায়ে ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আতাউল্লাহ সালেহি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, পারস্য উপসাগর থেকে যে মার্কিন রণতরী বেরিয়ে গেছে তা যেন আর ফিরে না আসে, কারণ এরপর ইরানের জবাব শুধু সতর্ক করে দেয়ার মধ্যে সীমিত থাকবে না ।

গত ৩০ ডিসেম্বর পারস্য উপসাগরে ইরানি নৌ মহড়া চলাকালে ইরানের নৌবাহিনীর পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন থেকে মহড়া এলাকায় প্রবেশ করা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর ভিডিও ফুটেজ ধারণ করা হয়। অবশ্য ওই দিনই মার্কিন বিমানবাহী রণতরী "ইউএসএস জন সি স্টেনিস" পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগরের দিকে চলে যায়। ইরানের রেভ্যুলুশনারী গার্ড বাহিনীর প্রধান জেনারেল জাফরিও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরান তার প্রতিরক্ষা কৌশল প্রয়োগের জন্য কোনো দেশের কাছ থেকে অনুমতি নেবে না। তিনি আরো বলেছেন, সাগর আইন সংক্রান্ত ১৯৫৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাগর-উপকূলীয় দেশ ক্ষতিকর চলাচলে বাধা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার রাখে।

তেহরান ইচ্ছে করলেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে সক্ষম বলে অতীতেও বার বার ঘোষণা দিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জেনারেল ফিরুজাবাদি খুব শিগগিরই রেভ্যুলুশনারী গার্ড বাহিনীর নৌ-শাখার মহড়া শুরু হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "সামরিক প্রযুক্তি ও কৌশলের দিক থেকে ইরান প্রতি মাসেই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অর্জন করছে এবং প্রতিটি নতুন মহড়ায় ইরানি প্রতিরক্ষা কৌশলের সাথে মানানসই শক্তিশালী একটি অস্ত্রের কার্যকারিতা তুলে ধরছে। পাশ্চাত্যকে লক্ষ্য করে জেনারেল ফিরুজাবাদি আরো বলেছেন, ইরানকে হুমকি দেয়া অর্থহীন। যাদের মাথায় এ হুমকির চিন্তা রয়েছে, তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে।"
ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের সাথে ইরানের সবচেয়ে বেশি উপকূল থাকার কথা উল্লেখ করে ইরানের সেনা কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা বলে আসছেন যে, তেহরান উপকূলীয় কোনো দেশের জন্যই হুমকি নয় বরং এই জলপথের নিরাপত্তা বিধান করছে। ইরানের সামরিক ক্ষমতাগুলো প্রতিরক্ষামূলক। তবে পাশ্চাত্য যদি নানা ধরণের হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের নিরাপত্তাকে বিপদাপন্ন করে সেক্ষেত্রে ইরানও পাল্টা হুমকি সৃষ্টি করবে বলে ঘোষণা করেছে। হুমকির জবাবে হুমকি দেয়ার অধিকার প্রত্যেক দেশেরই রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন সরকার ও তার ইউরোপিয় এবং আরব মিত্র সরকারগুলো মার্কিন আধিপত্যকামী নীতির সহকারী হিসেবে ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি জোরদারের নতুন মনস্তাত্ত্বিক অভিযান শুরু করেছে। তারা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচী সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে এবং ইরান-ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে তেহরানকে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এন পি টি'র মত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে স্পষ্টভাবে বিধৃত অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়। ইরান পরমাণু বোমা তৈরির চেষ্টা করছে- এটা আসলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচী সম্পর্কে মিথ্যাচার মাত্র। এ বিষয়টিকে অজুহাতে করে পাশ্চাত্য ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসক বিরোধী চলমান গণজাগরণের বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের কাছে তাদের পরাজয়গুলো ঠেকানোর চেষ্টা করছে। গত এক বছরে মার্কিন সরকার ও ইহুদিবাদী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক তাদের কয়েক জন ঘনিষ্ঠ ক্রীড়নককে হারিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো কোনো স্বৈরশাসক ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হুমকি ও চাপ প্রয়োগের মনস্তাত্ত্বিক অভিযানে শরিক হয়েছে। এ অভিযান আসলে পাশ্চাত্যের ক্রীড়নক ও স্বৈর-শাসকদের টিকিয়ে রাখারই প্রচেষ্টা। তারা মনে করছে ইরানের ওপর তেল-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পাশ্চাত্যের আধিপত্যকামী লক্ষ্যগুলো পূরণ করা যাবে।

বাস্তবতা হল, ইরান গত তেত্রিশ বছর ধরেই নানা ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকি মোকাবেলা করে আসছে। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের মুসলিম জাতির অবিচল প্রতিরোধে কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি এবং ইরানি জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতসহ অর্থনৈতিক ও সামরিক নানা খাতে চমক-জাগানো নানা সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষ করে উন্নত সমরাস্ত্র ও পরমাণু প্রযুক্তির মত কোনো কোনো খাতে অতীতে অল্প কয়েকটি দেশ বা গুটি কয়েকটি দেশের একক কর্তৃত্ব থাকলেও ইরান তা ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখে এবং একের পর এক সামরিক মহড়ায় উন্নত মানের অস্ত্র প্রদর্শন করে ইরান বিশ্ববাসীর কাছে এটা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পরাশক্তিগুলোর কাছে নতিস্বীকার না করেও বা তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও স্বাধীনচেতা কোনো জাতি সার্বিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম। #  {jcomments on}

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন