এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 02 ফেব্রুয়ারী 2016 16:23

ইরানি সাহিত্য-রত্ন ও সফল ভাষাবিদ ডক্টর নাজাফি আর নেই

ইরানি সাহিত্য-রত্ন ও সফল ভাষাবিদ ডক্টর নাজাফি আর নেই

সম্প্রতি ইরানের শিল্প ও সাহিত্য অঙ্গনে  ঘটে গেছে একটি শোকাবহ ঘটনা। গত ২২ জানুয়ারি শুক্রবার বিশিষ্ট ইরানি ভাষাবিদ, সম্পাদক, গবেষক ও অনুবাদক ডক্টর আবুল হাসান নাজাফি চিরবিদায় জানিয়েছেন নশ্বর এই পৃথিবীকে। নিউমোনিয়া রোগে ভুগে তিনি তেহরানের মেহের হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না... রাজিউন) খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক ও ভাষাবিদের নানা অবদানসহ তার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরে আজ আমরা তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করব।

 

ডক্টর আবুল হাসান নাজাফির বয়স হয়েছিল ৮৬। অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য একাডেমীর সিনিয়র সদস্য। ডক্টর আবুল হাসান নাজাফির জন্ম হয়েছিল ইরাকের নাজাফ শহরে।


তিনি ছিলেন কয়েক ডজন বিদেশী বইয়ের জনপ্রিয় অনুবাদক। এইসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টনি দ্য সেইন্ট এক্সুপারি’র ‘দ্যা লিটল প্রিন্স’, জ্যাঁ পল সাত্রের ‘ দ্যা ডেভিল এন্ড দ্য গুড লর্ড’, আঁদ্রে ম্যালরউক্সের ‘অ্যান্টিমেমরিস’ এবং রজার মার্টিন দো গার্দ-এর ‘দ্যা থিবাল্টস’। ফার্সি সাহিত্য ও ছন্দ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নাজাফি ফার্সি কবিতার বিচিত্রময় ছন্দের যথাযথ শ্রেণী-বিন্যাসের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এক্ষেত্রে তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিকে বলা হয় ‘নাজাফি ছন্দ-বৃত্ত’। তার এ পদ্ধতিতে ফার্সি কবিতার ছন্দের সংখ্যা ৪০০ ।

ডক্টর নাজাফি সাহিত্য-প্রেমিক ও সাহিত্যমোদীদের নিয়ে বহু বছর ধরে সাপ্তাহিক বৈঠক পরিচালনা করতেন। প্রতি শুক্রবারে বসতো সাহিত্যের এই মজলিস বা আসর।


সাহিত্য অঙ্গনে সৃষ্টিশীলতা বা নব-উদ্ভাবন ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি সমসাময়িক ধারাসহ বিভিন্ন যুগের নানা ধারার ধ্যান-ধারণার সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর পরিচয়।

 

ডক্টর নাজাফি কেবল বিদেশী নাটক ও উপন্যাসের সফল অনুবাদকই ছিলেন না একইসঙ্গে তিনি ছিলেন একজন সফল ভাষাবিদ। ইরানের অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিক ও ভাষাবিদকে তিনি প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইরানের ভাষা, শিক্ষা ও সাহিত্য অঙ্গনের জন্য তার লিখিত অবদান ও গবেষণা-কর্মের মধ্যে বেশ কয়েকটি বইয়ের কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন, ‘ভাষাতত্ত্বের মূলনীতি ও ফার্সি ভাষায় এর প্রয়োগ’, ‘ভুল লিখব না: ফার্সি ভাষার কঠিন শব্দের অভিধান’ এবং ‘ ফার্সি কথ্য শব্দের অভিধান ’।
অনুবাদের ক্ষেত্রে ডক্টর নাজাফির দক্ষতা প্রসঙ্গে বলতে হয়, তিনি ফ্রান্সের সবচেয়ে অগ্রগামী লেখকদের বই অনুবাদ করেছেন। এইসব লেখকের মধ্যে রয়েছেন ইউগেনি ইউনেস্কো, আর্থার অ্যাডামফ, নাতালি স্যারোত এবং অ্যালেন রোব গ্রি।


অনুবাদের ক্ষেত্রেও নাজাফির ফার্সি ভাষা অলঙ্কার-সমৃদ্ধ। তা সত্ত্বেও তার অনুবাদ সহজ-সরল। তার বিভিন্ন অনুবাদ-কর্মই এর বড় প্রমাণ।

 

ডক্টর নাজাফি জীবনের একটা বড় অংশই কাটিয়েছেন সম্পদানা করে। তার সম্পাদনার মান ছিল খুব উঁচু ও শৈল্পিক। ইরানে ফার্সি ভাষায় শৈল্পিক ও আধুনিক সম্পাদনার পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।

 

ফার্সি ভাষা শুদ্ধভাবে লেখার ওপর খুবই জোর দিতেন ডক্টর নাজাফি। গণমাধ্যমের কোথাও ফার্সি ভাষায় কোনো ভুল বা অশুদ্ধ প্রয়োগ দেখলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। এক্ষেত্রে তরুণ ও নবীন লেখকদের সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে ডক্টর নাজাফি লিখেছেন ‘অশুদ্ধ বা ভুল লিখব না’ শীর্ষক বিখ্যাত বই। জনপ্রিয় এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। সেই থেকে বেশ কয়েকবার ছাপা হয়েছে বইটি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করার সময় বইটি লিখেছিলেন তিনি। এ বইয়ে বিদেশী ভাষা থেকে ফার্সি ভাষায় আসা শব্দের ভুল ব্যবহারসহ শব্দ ও বাক্যের ক্ষেত্রে প্রচলিত নানা ভুলের তালিকা দেয়া হয়েছে। তবে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে কেবল তার এ বই (প্রথম সংস্করণ) ফার্সি ভাষায় প্রচলিত নানা ভুল শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এ বইয়ে তিনি ভুল শব্দের তালিকাই ব্যাপক মাত্রায় তুলে ধরেছেন। বাক্য ও ভাষারীতির ভুলের ওপর যথেষ্ট মাত্রায় আলোচনা করা হয়নি এতে।

 

‘অশুদ্ধ বা ভুল লিখব না’ শীর্ষক বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের জন্য অনেক বিষয় যুক্ত করতে চেয়েছিলেন ডক্টর নাজাফি। সেইসব আলোচনা যুক্ত হলে বইটির কলেবর তিন গুণ বেড়ে যেত। কিন্তু তার অকাল মৃত্যুর ফলে এই সংস্করণটি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।


ডক্টর আবুল হাসান নাজাফির আরেকটি বড় অবদান হল ‘ফার্সি কথ্য ভাষার অভিধান’। বইটি তিনি রচনা করেছেন বিশ বছরের নিরলস সাধনার মাধ্যমে। এ বইয়ে তিনি তেহরানের অধিবাসীদের কথ্য ভাষা ছাড়াও ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য বাক-রীতি, প্রবাদবাক্য এবং আঞ্চলিক ভাষার শব্দ তালিকাও উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মুহাম্মাদ আলী জামালাজাদেহ’র বইটিও ব্যবহার করেছেন। আলী জামালাজাদেহ’র বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৯৪ বছর আগে ফার্সি ১৩০০ সনে। নাজাফির ‘ফার্সি কথ্য ভাষার অভিধান’ বইটি ২০০২ সালের উল্লেখযোগ্য বই হিসেবে পুরস্কার পেয়েছিল।

 

ডক্টর নাজাফি পড়াশুনা করেছেন ফ্রান্সে। ভাষাতত্ত্ব ছিল তার পড়াশুনার বিষয়। এ বিষয়েই তিনি শিক্ষকতা করেছেন। ‘ভাষাতত্ত্বের মূলনীতি ও ফার্সি ভাষায় এর প্রয়োগ’ শীর্ষক বই ডক্টর নাজাফির আরেকটি বড় অবদান। এ বইয়ে তিনি সহজ ভাষায় ভাষাতত্ত্বের অনেক জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করেছেন। নাজাফির মতে ফার্সি কোনো বন্ধ্যা ভাষা নয় বরং গতিশীল ভাষা। ফার্সি ভাষার দুর্বল, জোরালো ও সম্ভাবনাময় নানা দিক সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এ ভাষার নানা দিকের যথাযথ ব্যবহার হয়নি বলে নাজাফি মনে করতেন।

 

ইংরেজির মত শক্তিশালী ভাষাও এক সময় দুর্বল ছিল বলে ডক্টর নাজাফি উল্লেখ করেছেন। ফার্সি ভাষা প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো। এই ১২০০ বছরের নানা যুগে লেখা ফার্সি এখনও সবাই পড়তে ও বুঝতে পারে। কিন্তু চার শতক আগের ইংরেজি ভাষা এখন এই ভাষাভাষী লোকদের কাছেই বিজাতীয় বা দুর্বোধ্য ভাষা বলে মনে হয়। এই পুরনো ইংরেজি বুঝতে হলে তা নতুন ভাষা শেখার মতই পরিশ্রম করে শিখতে হবে। আর এখানেই ফুটে ওঠে ফার্সি ভাষায় শ্রেষ্ঠত্ব।


ডক্টর নাজাফি আর নেই। কিন্তু ফার্সি ভাষার জন্য তার দরদ ও অবদান তাকে অমর করে রাখবে। # 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন