এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 20:37

পরলোকে হাসনাইন হাইকাল: এক অনন্য নক্ষত্রের বিদায়

ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনীর (র) পাশে হাইকাল ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনীর (র) পাশে হাইকাল

বিশ্ব-বিশ্রুত মিশরীয় সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক মুহাম্মাদ হাসনাইন হাইকাল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ... রাজিউন) এই বিশিষ্ট কলম-সৈনিক ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর তাগিদে তাঁর বর্ণিল এবং সংগ্রামী জীবনের নানা দিক তুলে ধরব আজকের এই বিশেষ প্রবন্ধে। 

 

কিংবদন্তীতুল্য সাংবাদিক ও লেখক হাইকালের মৃত্যুতে মিশরের প্রেসিডেন্ট সিসিসহ বিশ্বের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। হাইকালকে তার ওসিয়ত অনুযায়ী কায়রোর ঐতিহাসিক ইমাম হুসাইন (আ) মসজিদের পাশে দাফন করা হয়েছে। 

 

কায়রোয় ইরানের স্বার্থ বিষয়ক দপ্তরের প্রধান মুহাম্মাদ মাহমুদিয়ান মরহুম হাসনাইনকে মুসলিম উম্মাহর গর্ব বলে মন্তব্য করেছেন।
সংগ্রামী আরব সাংবাদিকতার প্রতীক হাইকালের মৃত্যুতে লেবাননের জনপ্রিয় ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর এক বিশেষ প্রতিনিধিদল কায়রো সফর করে এ মহান সাংবাদিকের পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে।


ইহুদিবাদী জবরদখল ও আধিপত্যকামীতা বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের ঘোর সমর্থক এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রতিনিধি ও কর্মকর্তা শেইখ হাসান ইজ্জাদ্দিন বলেছেন, হাইকালের মৃত্যুতে আরব বিশ্ব কেবল তার একজন বড় সাংবাদিককেই হারায়নি একইসঙ্গে হারিয়েছে এমন এক ব্যক্তিত্বকে যিনি আরব বিশ্বের নানা স্বার্থের পক্ষে সংগ্রাম করেছেন এবং এসবের মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ ও প্রতিরোধ।


হাইকালের জন্ম হয়েছিল ১৯২৩ সালে কায়রোর ‘হুসাইন’ অঞ্চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষানবিশ সম্পাদক। ‘ইজিপশিয়ান গেজেট’ নামক পত্রিকার হয়ে তিনি ‘আলামায়ান’ বা ‘দুই পতাকার যুদ্ধ’ সম্পর্কে রিপোর্ট করতেন। 


বহুমুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হাইকালের বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। বেশ কয়েকটি নামকরা দৈনিকে বিশ্বের বহু দেশের ঘটনা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল তার। এ অভিজ্ঞতা ছাড়াও তিনি ১৭ বছর ধরে মিশরের বিখ্যাত দৈনিক ‘আলআহরাম’-এর সম্পাদক ছিলেন। হাইকাল ছিলেন মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী। নাসেরের মৃত্যুর সময় তিনি তার শয্যার পাশে উপস্থিত ছিলেন।


হাইকাল ১৯৭১ সনে মিশরের সংস্কৃতি মন্ত্রী হন। মতবিরোধের কারণে ১৯৮১ সনে তাকে কারাগারে পাঠান ইসরাইলের সঙ্গে আপোষ-চুক্তি স্বাক্ষরকারী মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। হাইকালসহ একদল লেখক কারাবাসী হওয়ার কয়েক দিন পরই নিহত হন সাদাত।

 

হাইকাল মিশরের আলআহরাম পত্রিকায় একটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে আলআহরামে বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা চিন্তাবিদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেকে জেনারেলের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ফলে এ দৈনিকটি বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা দশটি পেশাদার পত্রিকার তালিকায় স্থান করে নেয়।


হাইকাল ছিলেন একজন সত্য-সন্ধানী গবেষক, রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক। ফলে তিনি নানা ঘটনার মূল কারণগুলো উদঘাটন করতে পারতেন। তিনি লিখে গেছেন ৭০ বছর ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের সমসাময়িক ইতিহাস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো সম্পর্কে তিনি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরেছে তার দশটি তথ্য-সমৃদ্ধ বইয়ে।


হাইকাল বহুবার ইরানে এসেছেন ও বহু দিন ধরে ইরানে থেকেছেন। ইরানের তেল-শিল্পের জাতীয়করণ সংক্রান্ত তার প্রতিবেদনগুলো গোটা মিশরকে নাড়া দিয়েছিল। বলা হয় ইরানের ওই ঘটনায় উৎসাহিত হয়েই মিশরের নেতা নাসের সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করার নির্দেশ দেন।

 

বহু বইয়ের লেখক ছিলেন হাসনাইন হাইকাল। ‘ইতিহাসের সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ’ তার অন্যতম সাড়া-জাগানো বই। এ বইয়ে তিনি বিশ্বের বিখ্যাত সাত জন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এ সাত ব্যক্তিত্ব হলেন, জুয়ান কার্লোস, আলবার্ট আইনস্টাইন, জওহরলাল নেহেরু, ইউরি আন্দ্রোপভ, ইরানের মুহাম্মাদ রেজা পাহলাভি, জেনারেল মন্টিগোমারি ও রকফেলার। 

 

বহু বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়ার অভিজ্ঞতার অধিকারী হাইকালকে সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিশ্বের নামকরা অনেক সংবাদপত্র। হাইকাল সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ক্রুশ্চেভ, টিটো, ক্যাস্ত্রো ও চার্লস দ্যা গলের। আরব বিশ্বের হাফিজ আল আসাদ, ইয়াসির আরাফাত, বেনবেল্লা, বুমেদিন ও গাদ্দাফিরও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। ইরানের আয়াতুল্লাহ কাশানি, ডক্টর মুসাদ্দেক, শাহ, ইমাম খোমেনী (র) ও রাফসানজানীসহ আরও অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের দুর্লভ সাক্ষাৎকার নেয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তার। ‘আগ্নেয়গিরির ওপর ইরান’ শীর্ষক হাইকালের বইয়ে স্বৈরাচারী শাহের শাসনামলের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তিনি একবার প্যারিসে ও একবার তেহরানে ইমাম খোমেনীর সাক্ষাৎকার নেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর এ বিপ্লব সম্পর্কে হাইকালের লেখা বই ‘ আয়াতুল্লাহর কামানগুলো’ বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। 


হাইকাল লেবাননের কামাল জুম্বালাত, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হুসাইন ফাজলুল্লাহ ও রফিক হারিরিসহ অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বেরও সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। আর হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ’র সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেছেন বেশ কয়েকবার। তাদের দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর ঘনিষ্ঠতা। হাইকাল ছিলেন হিজবুল্লাহর ঘোর সমর্থক। সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর চলমান ভূমিকাকেও তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন। সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর ভূমিকাকে আত্মরক্ষার কৌশলী পদক্ষেপ বলে যুক্তি দেখিয়েছেন হাইকাল।
হিজবুল্লাহ প্রশ্নে শিয়া-সুন্নি বিতর্ক তোলাকে অর্থহীন বলে উল্লেখ করে মুহাম্মাদ হাসনাইন হাইকাল বলেছিলেন, আমি সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে সমর্থন করি, কারণ, তিনি একজন আরব প্রতিরোধ-সংগ্রামী।

 

বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক হাইকাল ছিলেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের গুণমুগ্ধ শুভাকাঙ্ক্ষী ও আরব রাজা-বাদশাহদের সেবাদাস চরিত্রের কঠোর সমালোচক। 

 

ইসলামী ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সম্প্রসারণকামীতার বিরুদ্ধে অনন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। হাইকাল মার্কিন সরকারের ইরাক ও সিরিয়া নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ইরাক ও সিরিয়ায় সংকট সৃষ্টি মার্কিন নীতির বড় ধরনের ভুল হিসেবে রেকর্ড হয়ে থাকবে।


হাইকাল তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাস ও ইসলামের নামে যে কোনো ধরনের চরমপন্থারও বিরোধিতা করে গেছেন।


হাইকাল নিজ দেশের নেতাদের সমালোচনা করতে কখনও পিছপা হননি। তিনি ২০০৭ সালে ব্রিটেনের ইন্ডিপেন্ডেন্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মুবারক মিশরকে নেতৃত্ব দেয়ার বা শাসন করার যোগ্যতা রাখেন না। তিনি বলেন, এই ব্যক্তি কখনও রাজনীতির সঙ্গে খাপ খাননি। এর চার বছর পর পতন ঘটে মুবারকের।


‘মিশর ইতিহাস থেকে বের হয়ে যাচ্ছে’ বলে হাইকাল সিসিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি মিশরের চলমান সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সংলাপের আয়োজন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন সিসিকে। 


আরব বিশ্বের সাম্প্রতিক সংকটগুলোর জন্য বিশ্বনন্দিত সাংবাদিক হাইকাল ইহুদিবাদী ইসরাইলের লোভ ও আধিপত্যকামীতাকে দায়ী করেছেন। ইরান আরব বিশ্বের জন্য হুমকি নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।


সিরিয়ার জনগণের ওপর বিশেষ কোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া উচিত নয় বলে হাইকাল মনে করতেন। বাশার আসাদের সঙ্গে আপোষ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, আমরা ইসরাইলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারলে আসাদের সঙ্গে কেনো তা করছি না? আসাদের চেয়ে ভালো কোনো নেতা থাকলে সিরিয়ায় আসাদের পতন ঘটত বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।


দায়েশ বা আইএসআইএলকে আরবদের কোন্দলের ফসল বলে অভিহিত করে হাইকাল বলেছিলেন, ইসরাইল আরবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধই চেয়েছে।


হাইকালের মৃত্যু জ্ঞান ও সাংবাদিকতার জগতের একটি নক্ষত্রের বিদায়। এমন নক্ষত্র আর কখনও দেখা যাবে না।#

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/২৪

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন