পারস্যের পল্লী-৪১
পাঠক! পারস্যের পল্লী'র আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ফুরুমাদ নামের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। আশা করি ভালোই লেগেছে আপনাদের। আজকের আসরে যাবো তেহরানের পাশেই কাজভিন প্রদেশের একটি গ্রামে। আকাশ-ছোঁয়া আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত চমৎকার এ গ্রামটির নাম আভন। গ্রামটির দক্ষিণে রয়েছে চোখ-জুড়ানো আভন হ্রদ। এ হ্রদ গ্রামটির খ্যাতি ও আকর্ষণের একটি বড় উৎস। তাহলে ঘুরে দেখা যাক ঐতিহাসিক এই গ্রামটি।
আভন গ্রামটি কাজভিন শহর থেকে আশি কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত। গ্রীষ্মকালে এই এলাকার আবহাওয়া বেশ উপভোগ্য বা নাতিশীতোষ্ণ থাকে। শীতকালে থাকে ঠাণ্ডা। বলা হয়ে থাকে যে, আভন শব্দের অর্থ হলো প্রবহমান জলের উৎস। আর এ অঞ্চলে পানির উৎস থাকায় গ্রামটির নামকরণ সার্থক হয়েছে বলেই মনে করা হয়। আভন একটি পার্বত্য গুচ্ছগ্রাম। এর উত্তর দিকে রয়েছে পাহাড়, পশ্চিমে একটি বড়ো উপত্যকা, দক্ষিণে রয়েছে কৃষিক্ষেত এবং পূর্বে রয়েছে এ এলাকারই আরেকটি গ্রাম। এ গ্রামের লোকেরা শিয়া মুসলমান। স্থানীয় ঢঙে তবে ফার্সি ভাষাতেই এরা কথা বলে। গ্রামের প্রাচীন ঘরগুলো তৈরির ক্ষেত্রে যেসব নির্মাণ-সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ইট, কাদা, কাঠ এবং পাথর। তবে নতুন স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে পোড়া ইট এবং লোহার রডের ব্যবহার হয়ে থাকে। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে পরিবারের জীবনযাপন পদ্ধতির সাথে মিল রেখেই ঘরগুলোর ডিজাইন করা হয়েছে। যেমন এ গ্রামের বাড়িগুলোতে সাধারণত বড়োসড়ো উঠোনের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে থাকার রুম, অতিথি অভ্যর্থনার আলাদা রুম, খোলামেলা রান্নাঘর, বারান্দা, কৃষিপণ্য রাখার গুদাম, বাগিচা এবং পশু প্রতিপালনের আলাদা ঘর।
আভন গ্রামের অধিকাংশ লোকজনের আয়ের উৎস হচ্ছে কৃষিকাজ এবং পশুপালন। কৃষিকাজের মৌলিক দুটি উৎস-উপকরণ হচ্ছে ভূমি এবং পানি। এ দুই-ই ব্যাপক পরিমাণে রয়েছে এই গ্রামে। আভন নদী এখানকার পানির প্রধান উৎস। নদীটি খাশচল পাহাড় থেকে নেমে এসে বয়ে গেছে গ্রামের বুক চিরে। এই নদীর পানি ও আভন হ্রদ গ্রামের কৃষিকাজের পানির যোগান দেয়। আভন গ্রামের কৃষিজমিগুলো গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তবে এসব জমি দক্ষিণাঞ্চলেই বেশি। গম, যব, চেরি, আপেল, বরবটি, আখরোট, আঙুর এবং পশুখাদ্য এখানকার কিছু উল্লেখযোগ্য কৃষি-পণ্য ।
পশুপালন আভন গ্রামের একটি পুরনো ঐতিহ্য। পশু-পালনের খামারগুলো গ্রামের আবাসিক এলাকার বাইরে ও বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। এ গ্রামে কেউ কেউ অবসর সময়ে কার্পেট বা গালিচা বুনে থাকেন।
আভন গ্রাম জীব-জন্তু ও গাছ-পালা উভয় দিক থেকেই সমৃদ্ধ। এখানে অনেক বুনো ও পাহাড়ী গাছ এবং লতা-গুল্ম জন্মে। ফল গাছসহ নানা দামী কাঠ ও ভেষজ উদ্ভিদেরও অনেক গাছ জন্মে এখানে। এইসব গাছের মধ্যে প্লেন ট্রি বা সরল-বৃক্ষ জাতীয় গাছ চেনার, বিদ বা উইলো জাতীয় গাছ, নাশপাতি, শিরিন বায়ান বা যষ্ঠিমধু জাতীয় গাছ ও বিভিন্ন বাদাম গাছ উল্লেখযোগ্য।
বন্য জন্তু ও পাখীর মধ্যে রয়েছে বাদামী ভল্লুক, নেকড়ে বাঘ, শেয়াল, বিভিন্ন ধরনের ঈগল, পেচা, তিতির, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, চড়ুই, পাতি হাস, সারস ও কাক জাতীয় পাখী। এখানকার জলাশয়ে পাওয়া যায় স্যামন ও সিলভার-কাপ জাতীয় মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
আমরা আগেই বলেছিলাম আভন হ্রদ আভন গ্রামের খ্যাতি ও আকর্ষণের একটি বড় উৎস। কাজভিন অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর ও বড় হ্রদ এটি। জারাবাদ ও জাওয়ারদাশতসহ মোট চারটি গ্রামের মধ্যে এ হ্রদের অবস্থান। ৭০ হাজার বর্গ মিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত আভন হ্রদ সমুদ্র সমতল থেকে ১৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এ হ্রদের পানি মিষ্টি । হ্রদটি দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ৩২৫ মিটার ও প্রস্থে ২৭৫ মিটার। আভন হ্রদের গভীরতা কোথাও এক মিটার আবার কোথাও বিশ মিটার। হ্রদের নীচে থাকা ঝর্ণা ও বৃষ্টির পানি এ হ্রদের পানির উৎস। মাটির নীচের ঝর্ণা থেকে অবিরাম ধারায় পানি আসে বলে আভন হ্রদের পানি সব সময়ই স্বচ্ছ ও পরিস্কার থাকে। এ হ্রদের পানি প্রবাহ থেকে একটি ছোট খাল বা নদী সৃষ্টি হয়েছে। এ খালের সুবাদে কৃষিকাজ ও সেচকাজে পানি ব্যবহার করা সহজ হয়েছে। গ্রীষ্মকালে এ হ্রদে মেলা বসে সৌখিন মৎস শিকারীদের। এ ছাড়াও সাঁতার ও নৌকা-ভ্রমণও এ সময় জমজমাট হয়ে ওঠে।
শরৎকালে আভন হ্রদ পরিণত হয় অতিথি পাখীদের আবাসে। শীতকালে এ হ্রদের পানি পুরোপুরি জমে গিয়ে বরফে পরিণত হয়। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও আশপাশে নানা রকম লতা-গুল্ম ও গাছ-পালা হ্রদটির আরো কিছু আকর্ষণীয় দিক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের সমারোহ বা প্রাচুর্য্যে ভরা এ হ্রদে যে কোনো সময় ও বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের ভীড় লেগেই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আর তাই এখানে পর্যটকদের সেবার জন্য গড়ে উঠেছে নানা ব্যবস্থা। অনেকে তাদের বাসা-বাড়ী পর্যটকদের কাছে ভাড়া দিয়ে থাকেন।
আভন হ্রদ ছাড়াও আভন গ্রামের শিহরণ জাগানো আরেকটি বড় আকর্ষণ হল আলামুত দূর্গ। এক সময় এ দূর্গ ছিল হাসান সাব্বাহর আন্দোলন ও ঈসামাইলী শিয়াদের প্রধান কেন্দ্র। তাই এ দূর্গ দর্শনার্থীদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের কথা।
এ এলাকার আরেকটি বড় আকর্ষণ খাশচল পর্বত-শৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা চার হাজার একশ ৫০ মিটার। কাজভিনের সবচেয়ে বড় পর্বত-শৃঙ্গ এটি। এর অবিকৃত ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, চমৎকার ভৌগলিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ধরনের গাছপালা ও লতাগুল্মের সমারোহসহ স্বপ্নিল সৌন্দর্য্যের হাতছানি পর্যটকদের পক্ষে উপেক্ষা করা অসম্ভব। পর্বত-আরোহীদের জন্যেও খাশচল পর্বত-শৃঙ্গ একটি আদর্শ স্থান।
পারস্যের পল্লী-৪২
গত আসরে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি আভন নামের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি গ্রামে। আশা করি আপনারা সবাই-ই আনন্দ পেয়েছেন। আজ আমরা যাবো তেহরানের পাশেই কোম প্রদেশের দু'টি গ্রামে। এ দু'টি গ্রামের নাম "বেশনুহ" ও "ক'হ'ন"। প্রথমেই আমরা ঘুরে বেড়াব "বেশনুহ" গ্রামে।
"বেশনুহ" গ্রামটির অবস্থান কোম থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পূর্ব কোনে। এ গ্রামের উত্তরে রয়েছে কেল্লা দেয্ঝ (قلعه دژ) নামক পাহাড় এবং উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে বোখারেহ নামক পাহাড় । কোম প্রদেশের পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত "বেশনুহ" গ্রামটির আবহাওয়া বসন্তকালে ও গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ বা আরামদায়ক। তবে শীতকালে শীত কিছুটা বেশী। এ গ্রামের কিছু লোক শীতকালে কোমে থাকেন এবং গ্রীষ্মকালে আবার "বেশনুহ" গ্রামে ফিরে যান। এ গ্রামের লোকেরা ফার্সীভাষী এবং শিয়া মুসলিম মাজহাবের অনুসারী। কৃষিকাজ ও পশুপালনই এ গ্রামের বেশীর ভাগ লোকের পেশা। কেউ কেউ হস্ত শিল্পের পেশা ও সেবামূলক পেশায় জড়িত। উর্বর মাটি ও পানির ব্যবস্থা থাকায় এখানে চাষ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এখানে উৎপন্ন ফলের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বাদাম ও আলু বোখারা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে, এখানকার হেজেল নাট জাতীয় বাদাম বিশ্ব-সেরা। আশপাশে সবুজ ঘাস ও জঙ্গল থাকায় এখানে পশুপালনও সহজ হয়েছে। তাই এখানে দুধ, দই, মাখন ও পনিরসহ দুগ্ধজাত পণ্য বেশ সহজ-লভ্য। এখানকার মহিলারা অবসর সময়ে বিভিন্ন ধরনের কার্পেট ও গালিচা বুনে থাকেন। এগুলোর ডিজাইন ও রং আকর্ষণীয় এবং বৈচিত্রময়।
"বেশনুহ" নামক সুন্দর পাহাড়ী গ্রামের ঘর-বাড়ীগুলো পাহাড়ী ঢালের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর দৃশ্যপট সৃষ্টি করেছে। এক একটি বাড়ীর ছাদ উপরে অবস্থিত বাড়ীর জন্য উঠানে পরিণত হয়েছে। বেশীর ভাগ বাড়ীই এক তলা। পুরনো মডেলের এসব বাড়ী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠ, পাথর, পাকা ইট, কাঁচা ইট, কাদা ও চক বা চুন। আর আধুনিক বা নতুন বাড়ী-ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট ও রড। পশুপালনে জড়িত লোকদের বাড়ীতে থাকে আস্তাবল ও গুদাম। গ্রামের সরু ও পেঁচানো অলি-গলিতে রয়েছে ছোট ছোট খাল। "বেশনুহ" গ্রামে কয়েকটি বড় বাড়ী বা ভিলাও দেখা যায়। ভৌগলিক বৈচিত্রে ভরা এ গ্রামের দৃশ্যপট বসন্ত ও শরৎসহ গ্রীষ্মকালে প্রকৃতির অপরূপ শোভা আর সবুজের সমারোহে হয়ে উঠে বেশ স্বপ্নিল ও মায়াবী।
আলভান্দ পর্বত "বেশনুহ" গ্রামের একটি বাড়তি আকর্ষণ। গ্রামটি থেকে দশ কিলোমিটার দূরের এ পাহাড়ের চূড়া শীতকালে বরফে ঢাকা থাকে। প্রকৃতি-প্রেমিক ও পর্বতারোহীদের জন্য এটা বেড়ানোর আদর্শ স্থান। ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আর্দেহাল পাহাড়ের গুহাগুলোও এ গ্রামের বেশ চমৎকার প্রাকৃতিক নিদর্শন। এ পাহাড়ের চারটি গুহার একটিতে রয়েছে পানির উৎস। কখনও ফোয়ারা ও কখনও ঝর্ণার মত পাহাড়ী ফাটল থেকে বেরিয়ে এসেছে এই পানির ধারা। এ গ্রামের আশপাশের প্রান্তরে রয়েছে অনেক পুরনো বাদাম গাছ। শীতকালে এসব প্রান্তর বরফে ঢাকা থাকে, আর বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে হয়ে ওঠে সবুজ-শ্যামল। সবুজের অফুরন্ত উচ্ছ্বাসে ভরা এসব প্রান্তর চিরে বয়ে গেছে কয়েকটি ঝর্ণা ও ছোট নদী। এসবের আশপাশে জন্মে অনেক ভেষজ উদ্ভিদ। নেকড়ে বাঘ ও শেয়ালসহ অনেক বন্য জন্তু ও পাখ-পাখালীর প্রাচুর্যও রয়েছে "বেশনুহ" নামের এ গ্রামে।
"বেশনুহ" গ্রামের আকর্ষণ এখানেই শেষ নয়। "বেশনুহ" গ্রামের এক কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ সাঃ'র পবিত্র আহলে বাইতের একজন বংশধরের মাজার। ইমামজাদে হাদী (আঃ) মাজারটি নির্মিত হয়েছিল সাফাভী যুগে। গ্রামের লোকজন এখানেই তাদের বেশীরভাগ ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উৎসবের আয়োজন করে থাকেন। কোম ও কুহাক শহর থেকে এ গ্রামে যাবার চওড়া ও পাকা পথ রয়েছে।
এবারে আমরা ঘুরে বেড়াব ক্ব'হ'ন নামক পাহাড়ী গ্রামে। ক্ব'হ'ন গ্রামটি কোম থেকে ৮১ কিলোমিটার দূরে প্রদেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। সমুদ্র সমতল থেকে এ গ্রামের উচ্চতা ১৫৩০ মিটার। এ গ্রামের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ দিক পাহাড়ে ঢাকা। এ গ্রামের আবহাওয়া বসন্ত ও শরৎকালে নমনীয়। কিন্তু গ্রীষ্মকাল বেশ গরম ও শীতকালে বেশ ঠান্ডা। এ গ্রামের লোকেরাও ফার্সীভাষী ও শিয়া মুসলমান। কৃষিকাজ, কার্পেট পুনন, পশুপালন, হাঁস-মুরগী পালন ও মৌ-চাষ এখানকার প্রধান পেশা। গম, যব ও পশু-খাদ্য ছাড়াও এখানে নানা রকম ফল উৎপন্ন হয়। ফলের মধ্যে আঙ্গুর, আপেল, ডালিম, নাশপাতি, শসা ও নানা জাতীয় বাদাম উল্লেখযোগ্য। তরকারীর সবজি ছাড়াও এখানে অনেক ভেষজ উদ্ভিদ জন্মে।
ক্ব'হ'ন নামক পাহাড়ী গ্রামের বেশীর ভাগ বাড়ী-ঘর একতলা, বারান্দাযুক্ত ও দক্ষিণ-মুখি। এসব ঘর-বাড়ীর দরজা-জানালাগুলো কাঠের তৈরি। নির্মাণ-সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হয় কাঠ, পাথর, পাকা ইট, কাঁচা ইট, কাদা ও খড়-কুটো। আর নতুন বাড়ী-ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট ও রড। এ গ্রামের অলি-গলি ও পথগুলো প্রশস্ত। ক্ব'হ'ন গ্রামটিও পাহাড় আর সবুজের সমারোহে বেশ প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়। নওক্বহন নামের জলপ্রপাত এ গ্রামের বাড়তি আকর্ষণ। বিশেষ করে পাহাড়ী শিলাখন্ড বা পাথরের ওপর ছন্দময় গতিতে ও প্রাণবন্ত শব্দে এ জলপ্রপাতের স্বচ্ছ পানি গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য খুবই চমৎকার। ক্ব'হ'ন গ্রামের পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে তুস নামক পাহাড়। এ পাহাড় শীতকালে বরফে ঢাকা থাকে, আর গ্রীষ্মকালে হয়ে পড়ে সবুজ। ভেজভা নামের একটি নদী ক্ব'হ'ন গ্রামের প্রাকৃতিক আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়াও এ গ্রামে রয়েছে কিছু ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ। এগুলো বেশ প্রাচীন ও ঐতিহাসিক। তাই সব ধরনের পর্যটকদের জন্যই ক্ব'হ'ন একটি আদর্শ গ্রাম। দর্শনার্থী বা পর্যটকরা এখান থেকে সাধারণতঃ বাদাম ও শুকনো ফল নিয়ে ঘরে ফিরতে পছন্দ করেন। কোম থেকে এ গ্রামে যাবার পথটিও পাকা ও চওড়া।
পারস্যের পল্লী-৪৩
পাঠক! পারস্যের পল্লী'র আজকের আসর থেকে আপনাদের সবাইকে জানাচ্ছি সালাম ও শুভেচ্ছা। গত আসরে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি "বেশনুহ" ও "ক'হ'ন" নামের ভারী সুন্দর দুটি গ্রামে। আশা করি আপনাদেরও ভালো লেগেছে। আজ আমরা প্রথমে বেড়াতে যাবো ইরানের ফার্স প্রদেশের "সারে মাশহাদ" নামক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনে ভরপুর একটি গ্রামে। তাহলে শুরু করা যাক আজকের ভ্রমণ।
"সারে মাশহাদ" গ্রামে যাবার জন্য আপানাকে ইরানের ফার্স প্রদেশের রাজধানী শিরাজ শহর থেকেও ২২০ কিলোমিটার দূরে যেতে হবে। কাযেরুন নামক শহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এগুলোও দেখা পেয়ে যাবেন এ গ্রামের । সমুদ্র সমতল থেকে এ গ্রাম ৮৩০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এখানকার আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশী গরম। "সারে মাশহাদ" গ্রামের লোকেরা শিয়া মুসলমান। তারা কথা বলেন ফার্সী ও আঞ্চলিক তুর্কী ভাষায়। একটি বিশেষ উপজাতি হিসেবে তারা উপজাতীয় পোশাক-পরিচ্ছদই পরেন। এখানকার মহিলাদের পোশাকের রং বেশ বিচিত্রময়। ইসলাম-পূর্ব যুগেও এ গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। হাখামানেশীয় ও সাসানীয় রাজবংশের কাছে এ গ্রামের বেশ কদর ছিল। শুষ থেকে রাজ-পরিবারের লোকজন সাঁতার, গোসল ও বিনোদনের জন্য "সারে মাশহাদ" গ্রামের ওপর দিয়েই যেতেন। তাদের কিছু ঐতিহাসিক চিহ্ন এখনও এ গ্রামে অবশিষ্ট রয়েছে।
"সারে মাশহাদ" গ্রামের লোকজনের মূল পেশা হল কৃষি , পশুপালন ও হস্তশিল্প। যবসহ গ্রীষ্মকালীন ফসল এখানে ভালো জন্মে। ভেড়ার লোম, গোশত, মাখন, ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্যও এখানে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এখানকার মহিলারা অবসর সময়ে উন্নত কার্পেট বুনে থাকেন।
"সারে মাশহাদ" গ্রামের জনবসতি গড়ে উঠেছে কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে। এখানকার পথ-ঘাঁটগুলো বেশ সুশৃঙ্খল। বাড়ী-ঘরগুলো মাটি, কাঁচা ইট, পাথর ও কাঠের মত স্থানীয় নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে নির্মিত হয়েছে। অবশ্য কোনো বাড়ী রড, সিমেন্ট, ইট ও চকের তৈরি। প্রতিটি বাড়ীতেই রয়েছে সুন্দর ও পরিপাটি সবুজ বাগান।
"সারে মাশহাদ" গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হল এর কিছু অমূল্য প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন। অগাজেরী পাহাড়ের দেয়ালের ওপর সম্রাট দ্বিতীয় বাহরামের খোদাই করা ছবি এসব নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম। মাটি থেকে ২০ মিটার উঁচুতে খোদিত এ ছবিতে দেখা যায় সাসানীয় যুগের পঞ্চম সম্রাট দ্বিতীয় বাহরাম শিকারে এসে দুটি সিংহকে হত্যা করছেন এবং তার পেছনে রয়েছে আরো তিন ব্যক্তি। দুই মিটার পুরু এবং ৫ মিটার লম্বা ও চার মিটার চওড়া পাথরের শিলার ওপর এ ছবি খোদাই করা হয়েছে। সাসানীয় যুগের বৃহত্তম শিলালিপিটিও রয়েছে "সারে মাশহাদ" গ্রামে। মাটি থেকে ২৫ মিটার উঁচুতে খোদিত এ শিলালিপির সাইজ ২ মিটার বাই ১৭ ও ৫ মিটার বাই ২০। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রাচীন অগ্নিকুণ্ড, খাল, খন্দক, সরাইখানা প্রভৃতি। এসব নিদর্শনই ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে।
"সারে মাশহাদ" গ্রামের ৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে আবিষ্কৃত হয়েছে ভূ-গর্ভস্থ একটি শহর। স্থানীয় লোকেরা এ শহরকে বলেন খান্দয'ন। এখানে মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে এসেছে সাসানীয় যুগ থেকে শুরু করে ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিভিন্ন সময়ের মৃৎপাত্র। সাসানীয় যুগে এ এলাকা ছিল একটি সমৃদ্ধ জনপদ। পরবর্তীতে হিজরী দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে এর সমৃদ্ধি কমে যায় বলে মনে করা হয়। হিজরী সপ্তম ও অষ্টম শতকে এ এলাকাটি জনবসতিহীন হয়ে পড়ে। লুই এন্ডেনবার্গ নামের একজন খ্যাতনামা ড্যানিশ প্রত্নতাত্তিক ১৯৬০'র দশকে এই অঞ্চল সফর করে এই প্রাচীন শহর সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। "সারে মাশহাদ" সংলগ্ন এ এলাকায় এখনও প্রত্নতাত্তিক খনন-কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এবার আমরা বেড়াতে যাব জাগ্রোস পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত "মাহ'র লু" নামের একটি চমৎকার গ্রামে। এ গ্রামে আসতে হলে শিরাজ শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিক ধরে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে আপনাকে। এ গ্রামের উত্তর-পশ্চিম দিকে শিরাজ শহর, উত্তরে "মাহ'র লু" হ্রদ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে সুউচ্চ পাহাড়ী উপত্যকা। গ্রামটির আবহাওয়া বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ বা আরামদায়ক। তবে এখানে শীতকালে শীত কিছুটা বেশী অনুভুত হয়। "মাহ'র লু" গ্রামের লোকজন শিয়া মুসলমান ও ফার্সী ভাষী। সাফাভী যুগে বা সম্রাট শাহ আব্বাসের যুগেও এ গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। কৃষিকাজ, পশুপালন ও হস্তশিল্পের কাজই এ গ্রামের বেশীর ভাগ লোকের পেশা। গম, যব, টমেটো, বাঙ্গি জাতীয় মিষ্টি ফল, শশা, ডালিম, ডুমুর ও বাদাম এখানকার উল্লেখযোগ্য কৃষি-পণ্য। ভেড়ার লোম, গোশত, মাখন, ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্যও এখানে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদিত হয়। হস্তশিল্পের মধ্যে কার্পেট উল্লেখযোগ্য।
"মাহ'র লু" গ্রামটিকে অতীতে দাশতে গোলও বলা হত। এর অর্থ ফুলের উপত্যকা। এখানকার বসত-বাড়ীগুলো বেশ ঘন। বাড়ী-ঘরগুলোর নির্মাণ-রীতির ওপর স্থানীয় লোকদের জীবন ও জীবিকার প্রভাব রয়েছে। পুরনো বাড়ীগুলোতে রয়েছে বড় আকৃতির খিলান ও খিলান-আকৃতির জানালা। এসব বাড়ী পাথর, কাঁচা ইট ও কখনওবা চুন, বালি, মাটি ও কাঠের তৈরি। নতুন বাড়ীগুলো রড, সিমেন্ট, ইট ও চকের তৈরি। শিরাজ থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরের "মাহ'র লু" হ্রদ এ গ্রামটিকে দিয়েছে স্বপ্নিল সৌন্দর্য্যের অপরূপ আভরণ। কৃষি-ক্ষেত ও ফলের বাগানের সবুজের সমারোহ গ্রামটিকে করেছে আরো মোহনীয়। তাই প্রকৃতি-প্রেমিক পর্যটকরা এখানে আসতে ভুল করেন না। "মাহ'র লু" হ্রদের পানি নোনা হওয়ায় সেখান থেকে খাবার লবন যোগাড় করা হয়। এ হ্রদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অতি মনোরম ও প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। পাহাড়ের কোলে থাকা এ হ্রদের আশপাশে রয়েছে অতিথি পাখীসহ বিচিত্রময় পাখ-পাখালী ও বুনো জন্তুর প্রাকৃতিক আবাস। "মাহ'র লু" হ্রদের পানি পান করতে না পারলেও আপনি এখানে স্বচ্ছ পানির একটি ঝর্ণাকে এ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এ ঝর্ণার আশপাশে বসন্ত ও গ্রীষ্ম ঋতুতে বেশ কিছু সুগন্ধি উদ্ভিদ জন্ম নেয়।
তোলে শাহরোখী, চেনার পর্বত, আব্বাসী সরাইখানা, বিবি শরীফার মাজার ও খাদিজা বানুর জিয়ারতগাহ নামক কয়েকটি ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক স্থাপনা "মাহ'র লু" গ্রামের আরো কিছু বাড়তি আকর্ষণ। দূরের যাত্রীরা এখান থেকে সাধারণতঃ কার্পেট, ডালিম, বাদাম ও ডুমুর নিয়ে যেতে পছন্দ করেন। শিরাজ থেকে এ গ্রামে যাবার পাকা সড়ক-পথ রয়েছে।
পারস্যের পল্লী-৪৪
পাঠক! গত আসরে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি "সারে মাশহাদ" ও "মাহ'র লু" নামের দুটি চমৎকার গ্রামে। আশা করি আপনারাও এ ভ্রমণে আনন্দ পেয়েছেন। আজ আমরা বেড়াতে যাবো "মরগুন" ও "ক্বল'ত" নামের দুটি গ্রামে। আজও আমাদের এ ভ্রমণ স্বার্থক ও আনন্দঘন হবে সেই কথা দিচ্ছি।
সুউচ্চ জাগ্রোস পর্বতমালার ঢালের মধ্যে অবস্থিত মরগুন গ্রামটি ফার্স প্রদেশের সেপিদান শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সমুদ্র সমতল থেকে এ গ্রামের উচ্চতা দুই হাজার মিটার। পাহাড়ী আবহাওয়ার কারণে গ্রামটির আবহাওয়া বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ বা আরামদায়ক, কিন্তু শীতকালে শীত কিছুটা বেশী অনুভুত হয়। মরগুন গ্রামের লোকজন শিয়া মুসলমান ও লোর ভাষায় কথা বলে।
মরগুন গ্রামটি ছিল অতীতে এ অঞ্চলের উপজাতীয় গোত্রগুলোর গ্রীস্মকালীন বাসস্থান। পরবর্তিকালে ধীরে ধীরে এটি স্থায়ী জন-বসতিতে পরিণত হয়। কৃষিকাজ, পশুপালন, সেবা কার্যক্রম ও হস্তশিল্পের কাজ এ গ্রামের বেশীর ভাগ লোকের পেশা। গম, যব, আখরোট, আপেল এবং বুনো নাশপাতিসহ কিছু বুনো ফল এখানকার উল্লেখযোগ্য কৃষি-পণ্য। মাখন, ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্যও এখানে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদিত হয়। হস্তশিল্পের মধ্যে কার্পেট ও বিছানার চাদর বা জাজিম উল্লেখযোগ্য। ভল্লুক, শিয়াল, তিতির ও শিকারী ঈগলসহ অনেক বন্য জন্তু ও পাখীও এখানে চোখে পড়ে।
মরগুন নামক সুন্দর পাহাড়ী গ্রামের ঘর-বাড়ীগুলো পাহাড়ী ঢালের মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর দৃশ্যপট সৃষ্টি করেছে। ঘন ও সন্নিবিষ্ট এক একটি বাড়ীর ছাদ উপরে অবস্থিত অন্য বাড়ীর উঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ছাদগুলো সমতল। পুরনো দিনের বাড়ী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠ, পাথর, পাকা ইট, কাঁচা ইট, কাদা ও চক বা চুন। আর নতুন বাড়ী-ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট ও রড। মাটির অল্প নীচেই পানি থাকার সুবাদে মরগুনে গড়ে উঠেছে সবুজের সমারোহ। এর পাশাপাশি একটি জলপ্রপাত ও আশপাশের কয়েকটি সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গ এ গ্রামের দৃশ্যপটকে করেছে বেশ স্বপ্নিল ও প্রাণবন্ত। এ ছাড়াও স্কি খেলার একটি কেন্দ্র ও কয়েকটি বিনোদোন কেন্দ্র পর্যটকদের দারুনভাবে আকর্ষণ করে। মরগুনের মনমুগ্ধকর জলপ্রপাতটি এসবের মধ্যে প্রধান। ৭০ মিটার উঁচু স্থান থেকে ১০০ মিটার জায়গা জুড়ে গড়িয়ে পড়ছে এ জলপ্রপাত। আশপাশের বৃক্ষ-শোভিত আকাশ-ছোঁয়া পর্বতসহ এখানকার প্রকৃতির অপরূপ শোভার অজানা আবেশ বিমুগ্ধ দর্শককে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ভুলিয়ে দেয় বাদ-বাকী বিশ্ব বা অন্য সব সুখ-দুঃখের কথা। ৯০'র দশকের প্রথম দিকে মরগুনের মনমুগ্ধকর জলপ্রপাতটিকে ইরানের জাতীয় প্রাকৃতিক নিদর্শনের তালিকাভুক্ত করা হয়। এমন একটি দর্শনীয় স্থানে স্বাভাবিকভাবেই সারা বছর পর্যটকদের ভীড় লেগে থাকে ।
মরগুন গ্রামের আকর্ষণ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এ গ্রামের দক্ষিণে রয়েছে তিন হাজার ৬০০ মিটার উঁচু রাঞ্জ নামক পর্বত শৃঙ্গ। প্রতি বছর হাজার হাজার প্রকৃতি প্রেমিক, গবেষক ও পর্বতারোহী ছুটে আসেন স্থানীয় এ হিমালয়ে। এ এলাকায় শুকরাক নামক স্কি-রিসোর্ট ছাড়াও আশপাশে রয়েছে ২৬০ টি প্রাকৃতিক সুইমিং-পুল। বসন্তকাল এসব জলাশয় দেখতে আসার সবচেয়ে ভালো সময়। স্থানীয় পোশাক পরা উপজাতীয় লোকদের সাক্ষাতও মরগুন গ্রামের উপভোগ্য বিষয়। পর্যটকরা এখান থেকে ফেরার সময় আখরোট, মধু ও রঙ্গীন মাছ নিয়ে যান প্রিয়জনদের জন্য। সেপিদান ও ইয়াসুজ থেকে মরগুনে যাবার পাকা সড়ক রয়েছে।
এবার আমরা সফর করব ঐতিহাসিক "ক্বল'ত" গ্রামে। শিরাজ শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে এই পাহাড়ী গ্রাম। সমুদ্র সমতল থেকে এর উচ্চতা ২০৬৫ মিটার। পাহাড়ী এ গ্রামটির আবহাওয়া বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ বা আরামদায়ক, শীতকালে শীত কিছুটা বেশী অনুভুত হয়। "ক্বল'ত" গ্রামে লোকজন আঞ্চলিক ফার্সী ভাষায় কথা বলে। এ গ্রামে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন বা স্থাপনা। ফলের চাষ, পশুপালন ও হস্তশিল্পের কাজই এ এলাকার বেশীর ভাগ লোকের পেশা। আখরোট, বাদাম, আঙ্গুর, আঙ্গুরের ঘন রস, ডালিম, ডালিমের পেস্ট, ডুমুর ও আলু বোখারা জাতীয় ফল এখানকার উল্লেখযোগ্য কৃষি-পণ্য। মাখন, ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্যও এখানে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদিত হয়। "ক্বল'ত" গ্রামের হস্তশিল্পের মধ্যে কাপড়ের জুতো, হাতে তৈরি ঝুড়ি, প্লেট, কাঠের জিনিষ-পত্র এবং পানি ও দুগদ্ধজাত পণ্য রাখার জন্য চামড়ার তৈরি বিশেষ পাত্র বা মাশক্ব উল্লেখযোগ্য।
ক্বল'ত" গ্রামের ঘর-বাড়ীগুলো ঘন ও সন্নিবিষ্ট। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সিড়ির মত নির্মিত হয়েছে এসব ঘর-বাড়ী। পুরনো দিনের বাড়ী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠ, পাথর, কাঁচা ইট, কাদা ও চক বা চুন। কোনো কোনো বাড়ী এক তলা ও কোনো কোনোটি দুই তলা বিশিষ্ট। পর্যটনের আকর্ষণীয় কেন্দ্র হবার সুবাদে গত কয়েক বছরে "ক্বল'ত" গ্রামে গড়ে উঠেছে অনেক আধুনিক ঘর-বাড়ী। এসব নতুন বাড়ী-ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে পাথর, পাকা ইট, সিমেন্ট ও লোহার রড। গ্রামের সরু ও পেঁচানো অলি-গলিতে রয়েছে স্বচ্ছ পানিতে ভরা ছোট ছোট খাল। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে আশপাশের ফলের সবুজ বাগানে সবুজের অফুরন্ত উচ্ছ্বাস "ক্বল'ত" গ্রামের সার্বিক দৃশ্যকে করে অপরূপ, মোহনীয় এবং স্বপ্নিল। এ ছাড়াও এখানকার তিনটি অপরূপ জলপ্রপাত এ গ্রামটির সৌন্দর্য্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চেশমে আনজিরি ও শাবে শতুরি নামের দুটি ছোট নদী এ গ্রামের আরো দুটি বড় আকর্ষণ। এ দুটি নদীর আশপাশে রয়েছে সবুজ উদ্ভিদ, বন্য ফুল ও লতাপাতার সমাহার।
"ক্বল'ত" গ্রামে রয়েছে ২৭০ বছরের পুরনো একটি সুদৃশ্য মসজিদ, কাঁচা ইটের তৈরি একটি প্রাচীন গীর্যা, পানি-চালিত কয়েকটি যাঁতাকল, পুরনো বাজার, পাথর-নির্মিত কার্পেট, গ্বেজেল আরসালান নামক দূর্গ ও পাথরে খোদিত সাসানীয় যুগের চিত্র। এতসব ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ গ্রামের লোকজন বেশ অতিথিপরায়ন। তাই বিদেশী পর্যটকরা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকরাও এখানে আসতে ভুল করেন না।
পারস্যের পল্লী-৪৫পাঠক! গত আসরে আমরা ঘুরে দেখেছি "মরগুন" ও "ক্বল'ত" নামের দুটি চমৎকার গ্রাম। ঐ সফর নিশ্চয়ই আপনারাও উপভোগ করেছেন। আজ আমরা বেড়াতে যাবো তেহরানেরই আশপাশের কয়েকটি গ্রামে। তেহরানের আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থানগুলোর তালিকায় এসব গ্রামের অবস্থান বেশ উল্লেখযোগ্য। আমাদের আজকের ভ্রমণও সবার কাছে উপভোগ্য হবে।
রুদবার ক্বাসরান তেহরানের ত্রিশ থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি মনোরম অঞ্চল। এখানকার আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। এটি মূলতঃ তেহরানের শেমিরান শহরতলীর অংশ। চারশ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পাহাড়ী অঞ্চলে রয়েছে বিশটিরও বেশী চোখ-জুড়ানো গ্রাম। এ গ্রামগুলো সৌন্দর্য্যের দিক থেকে যেন আলবোর্জ পর্বতমালার কণ্ঠহার। উশান, ফাশাম ও মেইগুন এ ধরনেরই কয়েকটি গ্রাম। এ তিনটি গ্রামই একই বিস্তৃত পাহাড়ী উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এসব গ্রামে রয়েছে বেশ কিছু জনবসতি। সরকারী তালিকায় উশান, ফাশাম ও মেইগুনকে শহর বলা হলেও বাস্তবে এগুলোকে বড় জোর মফস্বল শহর বলা যেতে পারে। শেমশাক, আম্মামেহ ও অহারও এ অঞ্চলের কয়েকটি নামকরা গ্রাম বা মফস্বল শহর। গোটা রুদবার অঞ্চলে রয়েছে আটটি ছোট নদী ও শত শত ঝর্ণা বা খাল। এসব নদী ও খালে সারা বছরই স্বচ্ছ পানির প্রবাহ দেখা যায়। ছোট ছোট এইসব নদীর সম্মিলিত রূপ হচ্ছে জাজরুদ নামের একটি বড় নদী। এই নদী-পথের ওপরই নির্মিত হয়েছে লাতিয়ান নামক বাঁধ। তেহরানে সুপেয় পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই বাঁধ।
রুদবার ক্বাসরান অঞ্চলটি সমুদ্র-সমতল থেকে প্রায় ১৫০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এ অঞ্চলের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত শেমশাকের মত গ্রামগুলোর উচ্চতা সমুদ্র-সমতল থেকে প্রায় ২৮০০ মিটার। আকাশ-ছোঁয়া আলবোর্জ পর্বতমালা সংলগ্ন এ অঞ্চলের তাপমাত্রা শীতকালে মাইনাস ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এবং গ্রীষ্মকালে বড় জোর + ২২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে পৌঁছে। এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের রাতও বেশ ঠান্ডা থাকে। পাহাড়ী ঢালু অঞ্চল হওয়ায় রুদবার ক্বাসরানে কৃষি জমির পরিমাণ খুব কম। ফল গাছের চাষ, পশুপালন, ও সেবা কার্যক্রম এ গ্রামের বেশীর ভাগ লোকের পেশা। পর্যটক ও যাত্রীদের সেবায় এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক রেস্তোঁরা। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এসব হোটেলের ব্যবসা বেশ রমরমা হয়ে ওঠে।
রুদবার ক্বাসরান অঞ্চলের শেমশাক গ্রামটি আন্তর্জাতিক স্কি প্রতিযোগীতার জন্য বিখ্যাত। তেহরান থেকে ৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে গেলেই দেখতে পাবেন এ গ্রামটি। সোরক্ চল ও কেলিওন বাস্তাক পাহাড় এবং দিজিন অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে শেমশাক এলাকা। গ্রীষ্মকালে এ গ্রামের আবহাওয়া বেশ আরামদায়ক। তবে শীতকালে এলাকাটিতে অসহনীয় ঠান্ডা পড়ে। শেমশাকের উঁচু এলাকাগুলো গ্রীষ্মকালেও বরফে ঢাকা থাকে। এ গ্রামটি বেশ পুরনো। বিশেষ করে কাজার শাসনামলেও রাজধানী তেহরানের শাসক শ্রেণীর লোকজনসহ সাধারণ মানুষ গ্রীষ্মকালীন আবাস হিসেবে এ এলাকায় থাকতেন। শেমশাকের লোকজন ফার্সীভাষী এবং শিয়া মুসলমান।
ফল গাছের চাষ, পশুপালন ও বিভিন্ন শ্রমমূলক কার্যক্রম শেমশাক গ্রামের বেশীর ভাগ লোকের পেশা। এ গ্রামের কেউ কেউ কয়লা খনিতে কাজ করে। কেউ কেউ স্কি-পিচের নানা কাজে জড়িত। শীতকালে খুব কম লোকই শেমশাকে থাকেন। নদীর পানি ও বরফের প্রাচুর্য এখানে কৃষিকাজের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। গম, যব, নানা রকম সবজি ও ফল এখানকার প্রধান কৃষি-পণ্য। ফলের মধ্যে আখরোট, আপেল, চেরী ও নাশপাতি উল্লেখযোগ্য।
শেমশাক গ্রামটি আকাশ-ছোঁয়া আলবোর্জ পর্বতমালার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এ পর্বতমালার উঁচু ও নীচু উভয় অংশই রয়েছে এ গ্রামে। অর্থাৎ গ্রামটির রয়েছে উঁচু ও নীচু এলাকা। এখানকার বাড়ী-ঘরগুলো বিশেষ এলাকায় কেন্দ্রীভূত। পুরনো বাড়ী-ঘরগুলোর জায়গায় গড়ে উঠেছে বহুতল এপার্টম্যান্টসহ নতুন বা আধুনিক মডেলের ঘর-বাড়ী। পুরনো দিনের বাড়ী নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে কাঠ, পাথর, কাঁচা ইট, কাদা ও বিপুল পরিমাণ চক বা চুন। আর নতুন বাড়ী-ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সিমেন্ট, রড, পাকা ইট প্রভৃতি। নতুন মডেলের ঘর-বাড়ীর কারণে শেমশাক পরিণত হয়েছে পর্যটনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাযুক্ত উপশহরে। বরফ-ঢাকা উঁচু পাহাড়ের চূড়াগুলো শেমশাকের দৃশ্যপটকে করেছে খুবই মনোহর ও আকর্ষণীয়। নদীর আশপাশের সবুজ গাছপালাও দর্শকদের চোখে বুলিয়ে দেয় প্রশান্তির পরশ। স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা, নদী, সবুজের সমারোহ, বরফ ঢাকা পাহাড় আর স্কী খেলার বিশাল পিচ-- এইসবই একই স্থানে যে বিচিত্র ও বর্ণিল সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তার আকর্ষণ রোধ করা পর্যটকদের জন্য দুঃসাধ্য।
তেহরান থেকে ৫৭ কিলোমিটার দূরে রয়েছে শেমশাক স্কি-রিসোর্ট। এটি চালু হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। সমুদ্র সমতল থেকে এর সর্বোচ্চ চূড়া তিন হাজার ৫০ মিটার। আর সর্বনিম্ন পয়েন্ট দুই হাজার ৫৫০ মিটার। নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এখানে স্কি খেলা যায়। ১৯৯৬ সালে এই রিসোর্টকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখানে রয়েছে দুটি বড় আবাসিক হোটেল ও চারটি রেস্তোঁরা। তেহরানের খুব কাছে হওয়ায় এ স্কি রিসোর্টে বহু দেশী-বিদেশী পর্যটক ছুটে আসেন। শীতকালে রাতের বেলায়ও এখানে শক্তিশালী অনেক বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো থাকে যাতে খেলোয়াড়রা মধ্যরাত পর্যন্ত স্কি খেলতে পারেন। বর্তমানে ইরানের স্কি-ফেডারেশন এই রিসোর্ট পরিচালনা করছে।
শেমাশাকের রাস্তাঘাট পাকা। পর্যটকরা এখান থেকে ফেরার সময় বিভিন্ন ধরনের ফল ও গৃহপালিত পশু-জাত পণ্য নিয়ে যান
পারস্যের পল্লী-৪৬পাঠক! গত আসরে আমরা তেহরানের পাশ্ববর্তী দুটি গ্রামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। আজকের আসরেও তেহরানের পাশ্ববর্তী লাভাসন এলাকার দুটি গ্রামের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো। গ্রাম দুটি হলো বার্গে জাহন এবং আফজেহ গ্রাম। আপনারা আমাদের সাথেই আছেন-যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।
আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশীয় শামিরনত উপশহরে অবস্থিত বৃহত্তর লাভাসনের উত্তর-পশ্চিম অংশে বার্গে জাহান গ্রামটি অবস্থিত। বার্গে জাহান গ্রামটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ছেচল্লিশ মিটার। গ্রামের আবহাওয়া গ্রীষ্ম এবং বসন্তে থাকে নাতিশীতোষ্ণ আর শরৎ এবং শীতে থাকে ঠাণ্ডা। বার্গে জাহান লাভাসনত এলাকার প্রাচীন গ্রামগুলোর একটি। পার্বত্য এই গ্রামে যেসব প্রাচীন মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে, তা থেকে এই গ্রামের প্রাচীনত্বের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। বার্গে জাহান গ্রামের মানুষেরা ফার্সি ভাষায় কথা বলে। এখানকার জনগণ জাফরি শিয়া মাযহাবের অনুসারী মুসলমান।
বার্গে জাহান গ্রামের লোকজনের পেশা হলো কৃসিকাজ,বাগানের কাজ, পশুপালন এবং সেবামূলক বিভিন্ন কাজ। এখানকার কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, যব। আর বাগানে উৎপন্ন ফলফলাদির মধ্যে রয়েছে আখরোট, আপেল, যার্দালু, চেরি, অলবলু বা ছোটো প্রজাতির চেরির মতো ফল, হুলু বা লোমশ চামড়া বিশিষ্ট আপেলের মতো এক ধরনের ইরানী ফল যার ভেতরে গেছো বাদামের মতো বড়ো একটি বিচি থাকে, ইংরেজিতে একে পিচ ফল বলা হয়। দুগ্ধজাত বিভিন্ন পণ্যও এখানে উৎপন্ন হয় যেমন দুধ, দধি, মাখন ইত্যাদি। এই গ্রামে মধুও প্রচুর উৎপন্ন হয়ে থাকে।
বার্গে জাহান গ্রামটি পর্বত ঘেরা একটি এলাকায় অবস্থিত। এখানকার বাড়িঘরগুলো বেশ ঘন ঘন। অবশ্য বর্তমানে এই গ্রামটির প্রাচীন সেই রূপটি আর নেই। ধ্বংস হয়ে যাবার ফলে এবং নতুন করে ভবনাদি নির্মাণের কারণে গ্রামটির প্রাচীন সেই রূপ বদলে গেছে। প্রাচীনকালের ঘরগুলো থৈরি করা হতো পাথর, ইট, কাদা আর কাঠ দিয়ে। আর দেওয়ালগুলো তৈরি করা হতো বেশ পুরো করে। প্রাচীনকালের ঘরগুলো প্রায়ই ছিল এক তলা। তবে নতুন করে নির্মিত ঘরগুলো দুই বা ততোধিক তলা
বিশিষ্ট। সবুজ শ্যামল বাগ-বাগিচা আর ফুল বাগানে পরিপূর্ণ নতুন ঘরগুলো এখন এমনি চমৎকার এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যে দেখতেই অন্যরকম লাগে।
পার্বত্য আঞ্চলিক গ্রাম বার্গে জাহানের চারপাশের সৌন্দর্য খুবই আকর্ষণীয়। উঁচু উঁচু পার্বত্য বন, সবুজ শ্যামল বাগ-বাগিচা, বার্গে জাহান নদীর তীরবর্তী সবুজ প্রান্তর, গ্রামের বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা সরু পথ সব মিলিয়ে এই গ্রামটি তেহরানের সুন্দরতম গ্রামগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থান করে নিয়েচে। বসন্ত এবং গ্রীষ্মে এই গ্রামের দৃশ্যই অন্যরকম আষর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এ কারণে প্রায় সারা বছর জুড়েই এখানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বার্গে জাহান গ্রামটির আশেপাশের উচ্চতা থেকে জলের একটি ধারা সৃষ্টি হয়ে বার্গে জাহান নদীর উৎপত্তি ঘটিয়েছে। এই নদীটির দৈর্ঘ্য দশ কিলোমিটার। এই নদীর অস্তিত্ব থাকায় গ্রামের আশেপাশের পরিবেশ সবুজ শ্যামল হয়ে উঠেছে। বার্গে জাহান নদীর উত্তরে গ্রামের পশ্চিম অংশে বিশাল একটি প্রস্তর খণ্ড রয়েছে। ভূমি থেকে ঐ শিলাখণ্ডটির উচ্চতা পঁয়তাল্লিশ মিটার। শিলাখণ্ডটির চারপাশে বাগবাগিচায় পূর্ণ। মনে হয় এই টিলাটি প্রাচীনকালে কেল্লা ছিলো। গ্রামের লোকজন বিপদ আপদে বা শত্রুদের আক্রমণ
থেকে বাঁচার জন্যে এই কেল্লায় এসে আশ্রয় নিতো। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হয়েছে।
বার্গে জাহান গ্রামের দর্শনীয় স্থাপনার অভাব নেই। গ্রামটির তিন কিলোমিটার উত্তরে দুই হাজার সাত শ' বিশ মিটার উচ্চতায় একটি কেল্লার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই কেল্লাটি ‘দোখতার কেল্লা' নামে পরিচিত। বার্গে জাহান গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে একটি গূহা রয়েছে। বেশ উঁচুতে অবস্থিত ঐ গূহাটি ‘লার গৃহ কারাগার' হিসেবে প্রসিদ্ধ। গূহাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ত্রিশ মিটার। ইমামযাদা ইসমাইলের মাযার শরিফও রয়েছে এখানে। ইমামযাদা ইসমাইল হলেন ইমাম মূসা কাযেম (আ) এর বংশধর। গ্রামের ঠিক পশ্চিম পাশে মাযারটি অবস্থিত। গ্রীষ্ম এবং বসন্তকালে যিয়ারতকারীগণ এই মাযার যিয়ারত করতে আসেন। মাযারটির চারপাশে চমৎকার বাগান বিরাজ করার ফলে এখানে আধ্যাত্মিক পরিবেশ যেমন মনোরম তেমনি বেড়ানোর জন্যেও আষর্ষণীয় একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মাযার এলাকাটি। এই স্থাপনাটিও ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংস্থায় ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক একটি নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
আফজা গ্রামও তেহরানের লাভাসনত এলাকায় অবস্থিত। এই গ্রামে যেতে হলে তেহরান থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। আফজা গ্রামটির উত্তর-পূর্বে রয়েছে লার অঞ্চল। আফজা গ্রামের লোকজনের সাধারণ পেশা হলো বাগানের কাজ এবং কৃষিকাজ। তবে বছরের কোনো কোনো ঋতুতে লার এলাকার উপজাতীয়রা এই এলাকায় এসে পশুপালন করে থাকে। তবে গ্রামের কোথাও কোথাও দুম্বা চারণভূমিও লক্ষ্য করা যায়। এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম করা যেতে পারে। যেমনঃ এখানে রয়েছে সাফাভি শাসনামলের একটি হাম্মামখানা। এই হাম্মামখানাটি এখনো ব্যবহার উপযোগী। বিখ্যাত সাকা পর্বত শৃঙ্গে আরোহন করতে হয় এই আফজা গ্রাম থেকেই। সাকা পর্বতচূড়াটির উচ্চতা তিন হাজার দুই শ' মিটার। শৃঙ্গ আরোহনের জন্যে এখানে তাই পর্বতারোহীদের আনাগোণা থাকে প্রতিবছরই।
এই গ্রামের আরেকটি দর্শনীয় স্থান হলো দাশতে হাভিয। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা হলো দুই হাজার চার শ' মিটার। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী অতীতে প্রান্তরটির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গাঁজরের চাষ করা হতো। গাঁজরকে ফার্সিতে বলা হয় হাভিয। সম্ভবত এ কারণেই প্রান্তরটির নামকরণ করা হয়েছে হাভিয প্রান্তর। যদিও এখন আর সেই ঐতিহ্যের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে চেরি বাগান লক্ষ্য করা যায় এই গ্রামে। অবশ্য হাভিয প্রান্তরটি পর্বত চূড়া আরোহনের জন্যেই বেশি উপযোগী। এখান থেকে রিযান চূড়ায় ওঠা যায়। এর উচ্চতা হলো তিন হাজার ছয় শ' পঞ্চাশ মিটার। পারসুন চূড়ার উচ্চতা হচ্ছে তিন হাজার এক শ' মিটার। অতাশকূহ চূড়ার উচ্চতা হচ্ছে তিন হাজার আট শ' পঞ্চাশ মিটার। মেহেরচল চূড়ার উচ্চতা হচ্ছে তিন হাজার ছয় শ' বিশ মিটার। হাভিজ প্রান্তর গ্রীষ্মের শুরুতে সবুজ ঘাসের চাদরে ঢেকে যায় আর শীতে নিরব-নিশ্চল বরফের সমুদ্র হয়ে অনুরাগীদের আমন্ত্রণ জানায়।
পারস্যের পল্লী-৪৭পাঠক ! আজকের র্পবে আমরা আরো দুটি নতুন গ্রামের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো। একটি হলো জালিয্জান্দ এবং অপরটির নাম রুদে আফশান গ্রাম। এই গ্রামগুলোতে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন ছাড়াও রয়েছে প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় নিদর্শন। সেজন্যে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এই গ্রামগুলোতে বেড়াতে আসে। চলুন তাহলে গ্রামগুলোর সাথে আরেকটু ভালোভাবে পরিচিত হই।
জালিয্জান্দ গ্রামটি ফিরোযকূহ শহরের উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত। ফিরোযকূহ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার এক শ' সাতাত্তুর মিটার উচ্চতায় গ্রামটি পড়েছে। জালিয্জান্দ গ্রামের লোকজন মুসলমান এবং জাফরি শিয়া মাযহাবের অনুসারী। সবাই ফার্সি ভাষায় কথা বলে তবে তাদের ফার্সি বলার ঢং অনেকটা মযান্দারনি স্টাইলের। জালিয্জান্দ গ্রামের আবহাওয়া গ্রীষ্ম এবং বসন্তে থাকে নাতিশীতোষ্ণ এবং বেশ উপভোগ্য। তবে শীতে এখানকার আবহাওয়া বেশ ঠাণ্ডা। জালিয্জান্দ গ্রামের সাথে লাগোয়া অনেক উঁচু উঁচু স্থান এবং নদীর উপস্থিতির কারণে অনিন্দ্য সুন্দর এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে, যেদিকে তাকালে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। জালিয্জান্দ গ্রামের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ভশি প্রণালী, তিন ইমামযাদার মাযার ইত্যাদি।
এসবই প্রমাণ করে যে গ্রামটি বেশ প্রাচীন। বিশেষজ্ঞদের মতে এই গ্রামের আশেপাশে জনবসতির ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক পর্যন্ত পৌছেঁ। জালিয্জান্দ গ্রামের লোকজন বিভিন্ন রকম পেশায় নিয়োজিত। এইসব পেশার মধ্যে রয়েছে পশুপালন, বাগিচার কাজ এবং কৃষিকাজ। অবশ্য এই গ্রামে প্রচুর পর্যটকের আসা-যাওয়া থাকার কারণে অনেকেই আবার সেবামূলক পেশাতেও জড়িত।
ভশি নদী এবং তার আশেপাশের ঝর্ণাধারাগুলো বাগ-বাগিচা আর ক্ষেত খামারের জন্যে উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই গ্রামের কৃষিপণ্যের মধ্যে এবং বাগানে উৎপন্ন ফলফলাদির মধ্যে রয়েছে গম, যব, পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত এক ধরনের ঘাস বা উদ্ভিদ, আলু, আখরোট, যার্দালু ইত্যাদি। পশুপালনের কারণে এখানে মাংস, পশম, দুগ্ধজাত পণ্য সামগ্রী ইত্যাদি খুবই সুলভ। পার্বত্য গ্রাম জালিয্জান্দ আবহাওয়াগত কারণে ঘনবসতিপূর্ণ,বিশেষ করে ঘরগুলো ঘন ঘন গুচ্ছ গুচ্ছ। এই গ্রামের ঘরগুলোর নির্মাণশৈলী জনগণের জীবন পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফ্ল্যাটগুলো সূর্যের দিকে মুখ করা। আলো আর উষ্ণতাকে কাজে লাগানোর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। জালিয্জান্দ গ্রামের ঘরগুলো তৈরি করার ক্ষেত্রে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে প্রাচীনগুলোর উপাদান আর নতুন করে গড়ে ওঠা ঘরগুলো তৈরির উপাদানের মধ্যে পার্থক্য
রয়েছে। প্রাচীন ঘরগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে পাথর, কাদা, ইট, কাঠ ইত্যাদি। তবে নবনির্মিত ঘরগুলোতে শহুরে আধুনিক উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে,যেমন রড-সিমেন্ট-চুনা ইত্যঅদি।
জালিয্জান্দ গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশ আকর্ষণীয়। এ কারণে এখানে ভ্রমণরসিক বা পর্যটকদের আনাগোণা থাকে সবসময়। দূষণমুক্ত পার্বত্য আবহাওয়া এবং এখানকার অনন্য সাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য বিশেষ করে বসন্ত এবং গ্রীষ্মে জালিয্জান্দ গ্রামের মনোরম সুন্দর পরিবেশ পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে। পার্শ্ববর্তী তাঙ্গে ভশি নদী আর বিখ্যাত ঝর্ণা, সেইসাথে সবুজ-শ্যামল বিচিত্র ফলের বাগান প্রাকৃতিক পরিবেশে অবকাশ যাপনের একটা উপযুক্ত আবহ সৃষ্টি করেছে। তবে এ গ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আকর্ষণ হলো এখানকার একটি পাথর খোদাই শিল্প। এই শিল্পটি কাজারি শাসনামলের বলে ঐতিহাসিকগণের অভিমত। খোদাইকর্মটি চার কোণ বিশিষ্ট একটি ফ্রেমের মাঝে করা হয়েছে। মাটি থেকে দুই মিটার উপরে ভশি প্রণালীর দিকে যাবার পথে এটি পড়েছে। পুরো শিল্পটির কাজ করা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে। তাঙ্গে ভশি খোদাইকর্মটি ফতেহ আলি শাহ কাজারির সময়কার। শিকার, শিকারী জন্তু এবং সেনাপতিদের ছবি এতে অঙ্কিত হয়েছে।
১৯৭৪ সালে তাঙ্গে ভশি খোদ্ইকর্মটি ইরানের জাতীয় নিদর্শনের তালিকাভুক্ত হয়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে বসন্ত এবং গ্রীষ্ম ঋতুতে কৌতূহলী এবং অনুরাগী দর্শকেরা নদী পেরিয়ে এই তাঙ্গে ভশি খোদাইকর্মটি দেখতে আসে। এখানে যেহেতু দর্শকদের থাকা-খাওয়া এবং অবকাশ যাপনের জন্যে চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে সেজন্যে পর্যটকগণ খুবই স্বস্তি বোধ করেন। ফিরোযকূহ শহর হয়ে স্পালতেহ মহাসড়ক দিয়ে সোজা চলে যাওয়া যায় জালিয্জান্দ গ্রামে। যেভাবেই যাওয়া হোক না কেন, ফেরার সময় সেখানকার স্থানীয় বিশেষ উপহার মধু এবং আখরোট আনতে ভুলবেন না।
শ্রোতাবন্ধুরা! আসরের এ পর্যায়ে আমরা রুদ আফশান গ্রাম নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। রুদ আফশন গ্রামটি দামাভান্দ উপশহরেরই একটি গ্রাম। কেন্দ্রীয় আলবোর্য পার্বত্য অঞ্চলে পড়েছে গ্রামটি। প্রচুর বাগ বাগিচা আর ঝর্ণাধারা থাকার কারণে দর্শক নন্দিত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে গ্রামটি। দামাভান্দ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে এবং তেহরান থেকে এক শ' কিলোমিটার দূরে রুদ আফশান গ্রামটির অবস্থান। দেলিচয়ি নদীর দিকে যাবার পথে রুদ আফশান গ্রামটি পড়বে। প্রচুর পানি থাকার কারণে এই গ্রামের কৃষিকাজ আর বাগানের কাজের ওপর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখানকার বাগানে উৎপন্ন ফলের মধ্যে
আপেল, আখরোট, বেহ ফল, আঙ্গুর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ঠাণ্ডা জলের প্রবহমান ঝর্ণাধারার দ্ই তীর ঘিরে বেড়ে উঠেছে বিচিত্র বুনো বৃক্ষ।
এছাড়াও বিভিন্ন রকমের ঔষধি উদ্ভিদ যেমন কয়েক প্রজাতির পুদিঁনা, সালাদ হিসেবে ভোজ্য উদ্ভিদ চিকরী ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে লক্ষণীয়। রুদ আফশান গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যতোই আকর্ষণীয় হোক না কেন, অন্যঅন্য প্রাকৃতিক নিদর্শনও এখানে বেশ দর্শনীয়। যেমন এখানে রয়েছে গ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত রুদ আফশান গূহা। এই গূহাটির জন্যেও গ্রামটির বেশ খ্যাতি রয়েছে। গূহা এবং পর্বতারোহীদের বিভিন্ন দল বছরের বিভিন্ন ঋতুতে এখানে আসে। গ্রাম থেকে আধা ঘণ্টা হেঁটে গেলেই গূহা মুখে পৌছেঁ যাওয়া যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮০০ মিটার উচ্চতায় রুদআফশান গূহাটি অবস্থিত। গূহাটির বেশ বড়োসড়ো একটি মুখ রয়েছে। প্রস্থে যা চল্লিশ মিটার এবং উচ্চতায় বারো মিটার। গূহার ভেতরে চমৎকার অডিটোরিয়ামও রয়েছ। বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই বিশ্বাস হাজার হাজার বছর আগে গূহামুখের সমতলে দেলিচয়ি নদীর পানিসীমা ছিল এবং সে কারণেই নদীর পানি গূহার ভেতরে প্রবেশ করে, যার ফলে গূহার পরিধি বেড়ে যায়। অতীতে এই গূহার ভেতের মনুষ্য বসবাসেরও প্রমাণ মিলেছে। গূহার ভেতরটা
ঘুরে বেড়াতে অন্তত তিন ঘণ্টা সময় লাগে। আগ্রহী শ্রোতাবন্ধুরা সুযোগ পেলে বেড়িয়ে আসতে ভুলবেন না এ প্রত্যাশায় আজ এ পর্যন্তই।
১৯ জুন (রেডিও তেহরান) : বাংলাদেশের পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক বলেছে, তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্বেও …
পাশ্চাত্যের মোকাবিলায় বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে আবারো ঐক্যের ডাক …
১৮ জুন (রেডিও তেহরান): ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে তলব …
১৮ জুন (রেডিও তেহরান): ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ উত্তর আয়ারল্যান্ডে …

