রবিবার, 04 মে 2008 20:17

ইরান ঐতিহ্য ( ১২১-১৬০ )

( ১২১ তম পর্ব )

পাঠক ! আমরা মযান্দারন প্রদেশের বেশ কিছু এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি৷ আজো আমরা এই প্রদেশেই ঘুরবো ৷ প্রদেশটিতো বেশ বড়োসড়ো৷ সে কারণে দেখা হয় যতো , বাকী থাকে আরো ততো৷ আজ আমরা যে এলাকায় যাবো , সেটি একটি উপদ্বীপ৷ নাম হলো মিয়নকলেহ৷ অসম্ভব সুন্দর এই দ্বীপটি৷ পরিবেশগত স্বচ্ছতার দিক থেকে এই অঞ্চলটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের আঠারোটি পুকুর৷ কাস্পিয়ানের কোল জুড়ে আটষট্টি হাজার আট শ' হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত মিয়নকলেহ৷ শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বছরের তিনটি ঋতুতেই অতিথি পাখি বিশেষ করে সাইবেরীয় পাখিদের সমারোহে ভরে উঠে এই উপদ্বীপ৷ ফলে এর বাহ্যিক দৃশ্যটি কেমন সুন্দর দেখায়-একবার ভাবুন৷

ভূপর্যটকদের মধ্যে যাঁরাই এই উপদ্বীপ ভ্রমণ করেছেন , তাঁদের প্রায় সবাই স্বীকার করেছেন যে এই দ্বীপটি অসম্ভব সুন্দর৷ এখানকার সমুদ্রতীরবর্তী সবুজের উপকণ্ঠে অবস্থিত মরু বা অর্ধমরুভূমি অঞ্চলের সৌন্দর্য সবাইকেই মুগ্ধ এমনকি বিস্মতও করবে বৈ কি৷ দ্বীপটি পশু এবং পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে৷ অতিথি পাখিদের কথা তো বলেছি৷ সাইবেরীয় ঐসব পাখি ছাড়াও এখানে রয়েছে রাজহাঁস , বুনো পাতিহাঁস , আবাবিল জাতীয় ছোট ছোট সামুদ্রিক পাখি , পাতিহাঁস , পিলিকন , ফ্ল্যামিঙ্গো , রঙ্গীন পাখি , সারস পাখি ইত্যাদি৷ আর পশু বা জীব-জানোয়ারের মধ্যে রয়েছে জংলী শুকর , সজারু , নেকড়ে , খরগোশ , শৃগাল , হরিণ ইত্যাদি বিভিন্ন জাতের প্রাণী৷ এই পশুপাখিময় দ্বীপের ভেতর কিন্তু মানুষও বাস করে৷ এখানে যারা বসবাস করে , তাদের জীবন্তজীবিকার উত্‍স হলো পশুপালন এবং কৃষিকাজ ৷ এছাড়া ইরানে উত্‍পাদিত সুস্বাদু মাছের ডিম ক্যাভিয়ারের প্রায় অর্ধেকই এখানে উত্‍পন্ন হয় ৷

মযান্দারনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুবই উপভোগ্য৷ এই প্রদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটক আকর্ষণকারী একটি এলাকা হল 'হাজার জারীব' অঞ্চল৷ এটি বেহশাহরের দক্ষিণে অবস্থিত ৷ সমুদ্র থেকে দূরে অঞ্চলটি অবস্থিত৷ মযান্দারনের পূর্ব উপকূলবর্তী অনেকটা পার্বত্য এলাকা পরিবেষ্টিত উঁচু স্থান এটি৷ হাজার জারীব অঞ্চলের আবহাওয়া শীতকালে ভীষণ ঠাণ্ডা৷ শীতকালে এখানে প্রচুর বরফ জমে ৷ তবে গ্রীষ্মের সময় এখানকার আবহাওয়া থাকে খুবই উপভোগ্য৷ সবুজ সুন্দর চিত্তাকর্ষক গ্রামীণ মনোরম পরিবেশের স্নিগ্ধতা বিরাজ করে বলে এখানে অবকাশ যাপনের জন্যে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে৷
হাজার জারীব পার্বত্য এলাকার সৌন্দর্যের সাথে মরুভূমি অঞ্চলের সৌন্দর্যের মিল নেই৷ এখানকার সৌন্দর্যই অন্যরকম৷ পার্বত্য উপত্যকার যে অংশটি সূর্যের আলো পায় , সে অঞ্চলে গাছ-গাছালি খুব একটা নেই৷ তবে যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে না , অর্থাত্‍ উত্তরমুখি অংশে বৃষ্টিপাত বেশি হয় ৷ ফলে এই অংশটি বিচিত্র উদ্ভিদে পরিপূর্ণ জঙ্গল হয়ে উঠেছে ৷

জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্য অঞ্চলের আবহাওয়াই অন্যরকম ৷ তদুপরি সূর্যের আলোর উজ্জ্বলতা , ভেড়া বা অন্যান্য গবাদি পশু চরানোর চারণভূমি , সবুজ ঘাস বা তৃণময় উদ্যান প্রভৃতি অভিনব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই ব্যতিক্রমধর্মী ৷ এই জঙ্গলের ভেতর মানুষ গড়ে তুলেছে আবাস৷ ছোট্ট ছোট্ট গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ীগুলো দেখতে বেশ সুন্দর৷ কাঠের তৈরী দেওয়াল , আর উপরে মাটির তৈরী শ্লেট বা টালির ছাদ-সব মিলিয়ে ঘরগুলোকে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়৷ বিশেষ করে পার্বত্য জঙ্গলের ভেতর নিঃসঙ্গতার মাঝে মানব বসতি সেইসাথে সবুজের মাঝে ভিন্ন রঙের সমারোহ যেন ছবির মতো মনে হয় ৷ যে-কোন দর্শনার্থীরই মন এই দৃশ্য দেখে আনন্দিত হয়ে উঠবে ৷
এসবের বাইরেও এখানে রয়েছে বিচিত্র ফল-ফলাদির গাছ৷ ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গাছ থেকে টাটকা ফল পেড়ে খেতে কেমন লাগবে বলুন ! কিন্তু , মালিককে না বলে খেলে সমস্যায় পড়বেন ৷ তবে হ্যাঁ , ইরানীরা যথেষ্ট অতিথি পরায়ন ৷ আপনি আপনার ইচ্ছা ইঙ্গিতেও যদি ব্যক্ত করেন , সাথে সাথেই তারা বলবে বেফারময়ীদ অথাৎ প্লিজ ৷ আশা করি বুঝতে পেরেছেন ৷
নূর মযান্দারনের আরেকটি প্রাচীন শহর ৷ নূর শহরের উত্তরে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর , পূর্বে অমোল শহর , দক্ষিণে রয়েছে আলবোর্য পর্বতমালা এবং লারিজান , আর পশ্চিমে নৌশাহ্র অবস্থিত৷ এই শহরটির প্রাচীন নাম ছিল 'সাভালদেহ'৷ পশ্চিম মযান্দারনের সর্বপ্রাচীন শহর ছিল এটি৷ এই শহরটি যে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল এককালে , তার প্রমাণ মেলে এখানকার প্রাচীন স্থাপনাগুলো থেকে ৷ এখানে রয়েছে অসংখ্য সেনাদূর্গ বা কেল্লা৷ নূর এলাকার লোকজনের ভাষা হলো মযান্দারনী ৷ এটি পাহলভি ভাষারই একটি শাখা৷ এখানে কেল্লা ছাড়াও রয়েছে তামিশান প্রাসাদ , আছে সমুদ্র উপকূল এবং বন্তবনানী আর পার্ক৷ এখানকার জঙ্গলে বিরল প্রজাতির কিছু গাছ-গাছালী আছে যেগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত৷ নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াময় এই এলাকায় তাই ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালোই লাগবে৷ কারণ এখানে রয়েছে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা৷ সেইসাথে স্বাস্থ্যসেবাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যসামগ্রী এখানে সহজেই মেলে৷ এখানে মসজিদ যেমন আছে , তেমনি অবকাশ যাপনের জন্যেও রয়েছে সুন্দর ও মার্জিত আয়োজন , রয়েছে বিভিন্ন ছাউনি ও নিকুঞ্জ ৷ খেলাধুলা বা বিনোদনমূলক সকল ব্যবস্থাও আছে এখানে ৷ এই শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ ভালো৷ এই বনে বেড়াতে গেলে ব্যতিক্রমধর্মী গাছ-গাছালি ছাড়াও বিচিত্র জীবজন্তুর চলাফেরাও দেখতে পাবেন৷

নূরের এই জঙ্গলাকীর্ণ ট্যুরিস্ট স্পটে বিরল প্রজাতির গাছ-গাছালি বেড়ে ওঠার পেছনে একটা কারণ অবশ্য আছে৷ সেটা হলো , এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়৷ সে কারণে এখানে বিরল শ্রেণীর গাছ বা উদ্ভিদগুলোকে সংরক্ষণ করা সহজ৷ ঔষধি বৃক্ষ বা লতাগুল্মও এখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ৷ আর এই বৃক্ষ বা উদ্ভিদ সংরক্ষণের ফলে এই বনের বৈজ্ঞানিক মূল্য যেমন বেড়েছে তেমনি বেড়ে গেছে এর অর্থনৈতিক মূল্যও ৷ ছুটির সময়ে তাই অবকাশ যাপনে আসা লোকজন আর উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ভিড়ে চারদিক উত্‍সব মুখর হয়ে ওঠে৷
এই অঞ্চলের লোকজনের জীবন্তজীবিকা বা অর্থনীতির প্রধান উত্‍স হলো কৃষিকাজ এবং পশুপালন৷ ফলে বলার অপেক্ষা রাখে না যে নূরের অধিবাসীদের প্রধান পেশা হলো পশুপালন এবং কৃষিকাজ৷ এখানে যেসব কৃষিপণ্য বা ফলমূল উত্‍পাদিত হয় , সেগুলোর মধ্যে রয়েছে , কমলা জাতীয় ফল-ফলাদি ,ধান , গম , যব এবং আলু ৷ এখানে উত্তম বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ চারণভূমিও রয়েছে ৷ যারফলে এই এলাকাটি পশুপালনকারী রাখালদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ৷
আপনাদের মধ্যে যাঁরা প্রকৃতিপ্রেমী রয়েছেন , কিংবা যাঁরা ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন , সবুজের মায়ায় যাঁদের অন্তর সবসময় আবেগাপ্লুত থাকে , তাঁদের জন্যে সময় কাটানোর মতো উত্তম একটি স্থান হলো মযান্দারনের এই নূর বনানী ৷ বনের ভেতরকার তৃণময় সবুজ আচ্ছাদন , ওপরে বিচিত্র পত্রপুট , আর বাইরে উন্মুক্ত চারণভূমি , উপরের দিকে পার্বত্য প্রকৃতি আর উত্তরে সমুদ্রের অপার রহস্যময় স্থবিরতা-নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াময় এই সুন্দর জায়গায় অবকাশ যাপনের মজাই আলাদা ৷ বর্ণনায় যতোটা বোঝা যায় , বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক অনেক গুণ সুন্দর ৷ এ যেন রোমান্টিক কবিদের ধ্যানমগ্ন হবার নিশ্চিন্ত ভূবন৷ যাঁরা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ৷ আগামী আসরে আবারো কথা হবে৷ সেদিন আমরা নূর ছেড়ে যাবো অন্য কোথাও , অন্য কোনোখানে ৷

যেখানে যেতে চাইবে কৌতূহলী এ মন ,
দেখতে চাইবে সবকিছু মেলে দু'নয়ন।

( ১২২ তম পর্ব )

পাঠক ! আমরা আজ মযান্দারনের নৌশাহ্‌র অঞ্চলের দিকে যাবো। নৌশাহর উত্তরাঞ্চলীয় ইরানের সুন্দর শহরগুলোর একটি। এই শহরটিও শুমাল মানে উত্তর ইরানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্থাৎ সবুজ। শহরটির উত্তরদিকে কাস্পিয়ান সাগর , দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আলবোর্য পর্বতমালা , পূর্বদিকে রয়েছে নূর শহর আর পশ্চিমে রয়েছে ‘চালুস' শহর। এখানকার আবহাওয়া দু'ধরনের। পার্বত্য অঞ্চলের শীতার্ত এবং শুষ্ক আবহাওয়া আর আশপাশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। তো চলুন , বন্দরনগরী নৌশাহ্‌রের সাথে আরো বেশী পরিচিত হওয়া যাক।

মযান্দারান প্রদেশের পর্যটক আকর্ষণকারী একটা সুন্দর স্পট হলো এই নৌশাহ্‌র। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া , বন্তজঙ্গল , কম লবণযুক্ত পানি , অনুকূল আবহাওয়া , অগভীর উপকূল , সাঁতার কাটার জন্যে উপযুক্ত সৈকত , ইত্যাদি সুবিধাদি থাকার কারণে প্রায় সকল ঋতুতেই ভ্রমণরসিকগণ এখানে ঘুরাফেরা করা বা অবকাশ যাপনের জন্যে আসেন। চমৎকার এই অঞ্চলে রয়েছে দুটি পার্ক। একটি হলো ভারকাভিজ অপরটি সি সাঙ্গন । এই পার্ক দুটি নৌশাহ্‌রের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

জঙ্গলাকীর্ণ পার্ক ‘সি সাঙ্গন' নৌশাহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিচিত্র গাছ-গাছালি বিশেষ করে বক্স ট্রি'র মতো ব্যতিক্রমধর্মী বৃক্ষে পূর্ণ এই পার্কটি সমুদ্রের কাছে অবস্থানের কারণে এর সৌন্দর্যই যেন অন্যরকম। আর সেজন্যেই এই পার্ক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানে তাই দেশি-বিদেশী হাজার হাজার ভ্রমণকারীর ভিড় লেগেই থাকে। বলা হয়ে থাকে যে , সি সাঙ্গন পার্কে বিভিন্ন শিল্পে কার্যকরী বিচিত্র গাছ-গাছালি থাকার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।
নৌশাহরের প্রাচীন নাম ছিল ‘খচাক' গ্রাম। তারপর এর নাম হয় হাবীবাবাদ। ফার্সি ১৩১১ সালে অর্থাৎ ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে এখানে বেশ কটি জেটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় এবং তা ১৯৩৯ সালে শেষ হয়। নতুন করে এই উন্নয়ন কাজ শেষ হবার পর এই শহরটি নৌশাহর অর্থাৎ নতুন শহর নামে পরিচিতি পায়।

নৌশাহরে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান এবং কমলা জাতীয় ফলফলাদি। আর হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে গালিচা , জাজিম এবং বিভিন্ন জাতের মাদুর। বনজ পণ্যের মধ্যে রয়েছে কাঠ , জ্বালানী ইত্যাদি। নৌশাহর বন্দরটি একটা ট্রানজিট পয়েন্টও বটে। এই বন্দরের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় পথে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ইরানের যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে এই বন্দরের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌশাহর বন্দর হয়ে ইরান থেকে ক্যাভিয়ার , মাংস , মাছ , জুতা , শুকনো ফল , হস্তশিল্প সামগ্রীসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে রপ্তানী হয়। আবার বিভিন্ন দেশের পণ্যসামগ্রীও এই বন্দরের মধ্য দিয়েই আমদানী করা হয়।

পাঠক ! ইরান এতো বিশাল এবং বিস্তৃত যে , যতোই খুঁজতে যাবো বা অনুসন্ধান চালাবো , ততোই নতুন নতুন এবং অজানা-অচেনা সুন্দর সুন্দর স্থানের সাথে পরিচিত হবো। এরকমই নব আবিষকৃত একটি গ্রাম হলো কান্দালুস গ্রাম। মযান্দারনের আকাশচুম্বি বৃক্ষাদিপূর্ণ সবুজ অরণ্যের পাশেই কান্দালুস গ্রামটির অবস্থান। আলবোর্যের পাদদেশে অবস্থিত সুন্দর সুন্দর হাজারো গ্রামের মাঝে কান্দালুস একটি। এই গ্রামটি মযান্দারানের কাজুর অঞ্চলে অবস্থিত। এই গ্রাম থেকে চালুস শহরের দূরত্ব হলো ৬৪ কিলোমিটার।

এই অঞ্চলের স্থানীয় ও মৌলিক সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে কান্দালুসে গড়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ইঞ্জিনিয়ার আলী আসগর জাহাঙ্গিরীর প্রচেষ্টায় এবং গ্রামের অধিবাসীদের সহযোগিতায় এটি নির্মিত হয়েছিল। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে এই কেন্দ্রটির কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮৯ সালে সংস্কৃতি কেন্দ্রটির কাজ শেষ হয়। এই সংস্কৃতি কেন্দ্রটি কান্দালুসের অন্যতম আকর্ষণ এখন। তাই গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্যবিলাসী দেশী-বিদেশী হাজার হাজার ভ্রামণিক এই গ্রামে আসেন এবং এখানে এলেই সংস্কৃতি কেন্দ্রটি পরিদর্শন করতে ভোলেন না।

কান্দালুস ইরানের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। এই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে ঐতিহ্য ও সভ্যতার যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে , সেগুলোকে খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগের বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। এখানে যরাথ্রুস্ট এবং মনাভি ধর্মানুসারীদের কবরস্থান , সেইসাথে এ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে পাওয়া প্রাচীন জিনিসপত্র থেকে বোঝা যায় যে , কান্দালুসের সংস্কৃতি ও সভ্যতা বহু প্রাচীন।
কান্দালুসের শাব্দিক অর্থ হলো স্তরবহুল মাটি। এই স্তরবহুল মাটিতে রয়েছে নাসের উদ্দীন শাহ কাজারের স্মৃতি। এখানে তিনি এসেছিলেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ইরানের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী কামালুল মুল্‌ক ও এই গ্রামে এসেছিলেন। তিনি এখানে এসে কান্দালুস গ্রামের চমৎকার একটি ছবি এঁকেছিলেন। ঐ ছবিটি এখনো সাহেবকারানিয়া মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।

এখানকার জনগণ যথেষ্ট সহানুভূতিশীল এবং অতিথি পরায়ন। ফলে যাঁরা এখানে বেড়াতে যান , তাঁদেরকে কোনোরকম দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হয় না। বিশেষ করে এখানে বেড়াতে গেলে অবশ্যই সংস্কৃতি কেন্দ্রে যেতে ভুলবেন না। কেননা এখানে গেলে আপনি পুরো গ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যাবেন। এখানে অনেকটা যাদুঘরের মতোই প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সুরক্ষিত আছে। এগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলে কান্দালুস গ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা আপনার হয়ে যাবে।

( ১২৩ তম পর্ব )

পাঠক! মযান্দারনের বেশ কিছু স্থানে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। ভালোই লেগেছে , তাই না ! আজ আমরা আরেকটি মজার জায়গায় যাবো। এই এলাকাটির নাম হলো ‘চলুস'। চলুস এক নামেই বিখ্যাত। বিশেষ করে ইরানীদের মাঝে এই অঞ্চলটির আলাদা একটা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। গরমের সময় এখানে ইরানীরা ব্যাপকহারে বেড়াতে আসে। এখানকার আবহাওয়া খুবই ভালো। আর বন্তবনানীপূর্ণ হওয়ায় গাছের ছায়ায় লতায়-পাতায় উদাসী বনের শীতল বায়ুতে বেড়াতে ভালো লাগে বলেই সবাই আসে। এ কারণে চলুস বিনোদনকেন্দ্র তো বটেই , গ্রীষ্মকালের জন্যে এটি অবকাশ যাপনের সু-উপযুক্ত একটি স্থানে পরিণত হয়েছে। তো বর্ণনায় না গিয়ে চলুন ধীরে ধীরে যাওয়াই যাক চলুসের দিকে।

চলুস শহরটি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। যেমন এই শহরটিকে শালুস এবং সালুস নামেও ডাকা হতো। বর্তমানে অবশ্য চলুস নামেই শহরটি বিখ্যাত। এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ এবং আর্দ্র। এখানে উৎপন্ন প্রধান প্রধান পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ধান , দুগ্ধজাতীয় বিচিত্র পণ্য এবং কমলা জাতীয় ফলফলাদি। ত্বলেগন এবং কান্দাভন থেকে যেই ঝর্ণাধারাটি নেমে এসেছে , সেটি চলুস শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। শুধু চলুসের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটির দৈর্ঘ প্রায় আশি কিলোমিটার। চলুস নদী নামেই এটি পরিচিত। নদীটি শেষ পর্যন্ত কাস্পিয়ান সাগরে গিয়ে মিলেছে। এই নদীটির অনেকগুলো শাখা-প্রশাখা রয়েছে।

ঐতিহাসিকদের অনেকেই মনে করেন যে চলুস শহরটি সাসানী শাসনামলের প্রথম আর্দেশীরের যুগে নির্মিত হয়েছে। চলুসে পারস্যের প্রাচীন গভর্নরদের প্রাসাদ ছিল। তখন তাঁরা নিরাপত্তার খাতিরে এই শহরের চারদিকে নিরাপত্তা প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন। হিজরী ২৮৭ সালে এই নিরাপত্তা প্রাচীর ধ্বংস হয়ে যায়। চলুসের ইতিহাস সমৃদ্ধ বা প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে এখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর নাম সেভাবে সূত্রগুলোতে উল্লেখিত হয় নি। তবে এখানকার উন্নত প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে প্রতি বছরই হাজার হাজার মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। তাছাড়া তেহরান থেকে চলুসের দিকে যাবার সময় মরু-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও যাত্রীদের মুগ্ধ করবে বৈ কি ! উঁচু-নীচু পার্বত্য পথে কখনো টানেল কখনো নদী আবার কখনো ঝর্ণাধারা , সেইসাথে বিচিত্র বন্তবনানী আর মরুর অপার সৌন্দর্য প্রভৃতি চলুসের অভিযাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছার আগেই মুগ্ধ করবে।

চলুস শহরে পৌঁছার পর সেখানকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ , সমুদ্রের স্বচ্ছ জল-তরঙ্গ আর বিশেষ করে এই শহরের অতিথি পরায়ন মানুষগুলোর আন্তরিকতা , সুগন্ধি চা , সুবাসিত চালের ভাত , বিচিত্র মাছের কাবাব , কুলুচে প্রভৃতি ভ্রমণকারীদের ক্লান্তি-শ্রান্তি ভুলিয়ে দেবে। অনাবিল এক আনন্দে ভরে উঠবে মন। বলা হয়ে থাকে যে , চলুসে রয়েছে ফাইভ স্টার হোটেলসহ অসংখ্য আবাসিক হোটেল , আছে জঙ্গলাকীর্ণ পার্ক , পর্যটন কেন্দ্র , সুন্দর সুন্দর ভিলা বাড়ি , দু'পাশে সারিবদ্ধ বৃক্ষময় সুন্দর সুন্দর রাস্তাঘাট ইত্যাদি। আর চলুস শহর এবং তার আশপাশজুড়ে এইসব বিচিত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকার কারণেই প্রতিবছর বিশেষ করে বসন্ত এবং গ্রীষ্ম ঋতুতে ইরানী এবং অ-ইরানী ট্যুরিস্টদের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে এ শহর।

‘নামাক অবরুদ' নামে একটি পর্যটন কেন্দ্র চলুস শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে থাকার সুব্যবস্থা। রয়েছে টেলিকেবিন। টেলিকেবিনে চড়ে দেশি-বিদেশী অতিথিরা এখানকার পার্বত্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। আবার শহরের পশ্চিম প্রান্তের পার্বত্য উচ্চতা থেকে উপভোগ করতে পারেন সমুদ্রের সৌন্দর্য। সবচে উপভোগ্য যে বিষয়টি তাহলো এখানকার নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। সমুদ্রের তীরে পাহাড়,পাহাড় জুড়ে সবুজ গাছ-গাছালি , তার পরে সূর্যের আলো দেয় ছায়ার বিস্তার , দূর থেকে সামুদ্রিক বাতাস এসে যখন আপনাকে দোলা দিয়ে যাবে , মনে হবে সমস্ত জড়তা আর কালিমা বুঝি উড়ে গেল , আর আপনি নির্মল স্বচ্ছতায় পরিপূর্ণ মনের অধিকারী এক নন্দিত অতিথি। হ্যাঁ , অতিথিই বটে , নৈলে এতো আদর-সোহাগ আর প্রাকৃতিক মমতা আপনাকে কে বিলাবে বলুন !
‘তাখতে সোলায়মান' এবং ‘এল্‌ম কূহ' নামের দুটি পর্বতশৃঙ্গও এখানকার দর্শনীয় আরো দুটি নিদর্শন। তাখতে সোলায়মানের উচ্চতা চার হাজার আট শ' পঞ্চাশ মিটার আর এল্‌ম কূহের উচ্চতা হলো চার হাজার তিন শ' পঁয়ত্রিশ মিটার। এই দুটি শৃঙ্গ মোটামুটি সবসময়ই বরফাচ্ছাদিত থাকে। চলুসের ষাট কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত প্রাকৃতিক হিমাগারও এখানকার একটি উল্লেখযোগ্য সুন্দর নিদর্শন। পর্বতারোহী এবং প্রকৃতিপ্রেমীরা প্রতিবছরই গ্রীষ্মের সময় এখানে বেড়াতে আসে।
কাস্পিয়ান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নয় শ' পঞ্চাশ মিটার উঁচুতে ‘তাখতে সোলায়মান' এবং ‘এল্‌ম কূহ' পর্বতশৃঙ্গ দুটির উত্তর পাদদেশে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক স্পট রয়েছে। মযান্দারন প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে এবং চলুস থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে এই প্রাকৃতিক লীলাভূমিটি অবস্থিত। এর নাম হলো ‘কালরদাশ্‌ত' । প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এই কালরদাশ্‌ত হারানো বেহেশ্‌ত নামে পরিচিত। এই অঞ্চলটি এতো সুন্দর হবার কারণ হলো এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক হিমাগার , রয়েছে চিত্তাকর্ষক সবুজ দৃশ্যাবলী আর চমৎকার হ্রদ। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের কারণে এই হারানো বেহেশত সবাইকে তার বুকে টানে। আর প্রকৃতির আহ্বানে কোন রসিক মন সাড়া না দেয় বলুন !

কালরদাশত গ্রামীণ অঞ্চলটির এক প্রান্ত কাস্পিয়ানমুখি , অপর প্রান্ত গিয়ে মিলেছে এলম কূহ'র পাথুরে উপত্যকায়। বন্তজঙ্গল , নদী , ঝর্ণাধারার সমারোহের দিক থেকে এই অঞ্চলটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। বলা হয়ে থাকে যে, এই অঞ্চলটির ঐতিহাসিক মূল্যও রয়েছে যথেষ্ট। এখানে প্রাচীন যেসব নিদর্শন আবিষকৃত হয়েছে , সেগুলো অন্তত তা-ই প্রমাণ করে। এখানে দু'হাজার বছর আগেকার মৃৎপাত্র , সোনালী তৈজসপত্র প্রভৃতি পাওয়া গেছে। ১৯৩৯ সালে এখানে একটি গুপ্ত ধনভাণ্ডার পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে ছিল তিনটি সোনালী পাত্র এবং একটি সোনার ছুরি। এগুলো কালরদাশ্‌ত গোল্ডেন কালেকশান নামে তেহরানে প্রাচীন ইরানী মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।
শ্রোতাবন্ধুরা ! কেমন লাগলো চলুস সফর। ভালো লেগেছে নিশ্চয়ই। আসলে যে-কোনো নতুন অভিনতুনই আনন্দের এবং সেইসাথে কৌতূহলের। সেজন্যেই নতুনের খোঁজে হারিয়ে যেতে চায় মন। আপনাদেরও নিশ্চয়ই কৌতূহলী মন যেতে চায় নতুন কোনো স্থানে অজানা সৌন্দর্যের টানে।

( ১২৪ তম পর্ব )

পাঠক ! গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা সবুজের সমারোহপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় ইরানের মযান্দারনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ইতোমধ্যে এই প্রদেশের বেশকিছু দর্শনীয় স্থানের সাথেও আমরা পরিচিত হয়েছি। আজ আমরা এই প্রদেশ ভ্রমণ শেষ করবো। জানি অনেক কিছুই দেখার বাকি থেকে যাবে। কিন্তু কী করবো ! ইরান যে অনেক বড়ো দেশ এবং দর্শনীয় স্থানবহুল দেশ। ফলে সকল প্রদেশেই তো একবার যেতে হবে। তাই আমরা আগামী আসর থেকেই বেড়াতে যাবো অন্য কোথাও। আজ মযান্দারনে আমাদের সর্বশেষ ভ্রমণ হবে ‘তোনেকাবন' শহরসহ আরো কয়েকটি দর্শনীয় এলাকায়। চলুন একসাথেই যাওয়া যাক।

তোনেকাবন শহরটির উত্তরে রয়েছে কাস্পিয়ান সাগর , পূর্বে চলুস শহর , দক্ষিণে রয়েছে আলবোর্য পর্বতমালা আর পশ্চিমে রমসার শহর। এই সবকটি শহরেই আমরা বেড়িয়েছি , তাই এগুলোর সাথে আপনারা পরিচিত। আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত। একটি উপকূলীয় সমতলভূমির নাতিশীতোষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়াময় উত্তরাঞ্চল। আর দক্ষিণ উপকণ্ঠ হলো শীতল আবহাওয়াময় পার্বত্য এলাকা। তোনেকাবনের সমতল ভূমি অঞ্চলে বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপন্ন হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে ধান , কমলা জাতীয় ফলমূল , চা ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে গুণগত দিক থেকে এই অঞ্চলের কমলা জাতীয় ফল-ফলাদি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় যথেষ্ট উন্নতমানের। আর সবুজ তৃণময় পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তৃত চারণভূমি পশুপালনের জন্যে উপযুক্ত বলে এখানে পশুপালনের প্রচলন রয়েছে।

তোনেকাবনের ইতিহাস বেশ পুরোণো। এখানকার অগ্নিমণ্ডপগুলো এবং তোনেকাবনের ‘দো-হেযর' ও ‘সেহ-হেযার' অঞ্চলের যুরথ্রুস্টীয় সমাধিগুলো তোনেকাবনের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে। এই অঞ্চলটিও এতো সুন্দর যে যে-কোনো দর্শনার্থীই এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হবেন। সমুদ্র সৈকত এবং এখানকার বন্তজঙ্গলাকীর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে প্রতি বছরই হাজার হাজার মানুষ তোনেকাবনে বেড়াতে আসে। এই শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত তাখতে সোলায়মান পর্বতশৃঙ্গটিও বেশ আকর্ষণীয় একটি স্পট। তাখতে সোলায়মান সর্বোচ্চ এবং সর্ববৃহৎ প্রাচীরগুলোর একটি , যেখানে পর্বতারোহীরা শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশ্যে এসে থাকেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে মযান্দারনের মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি স্থান এটি। বিশেষ করে পর্বতারোহনের জন্যে এটি বেশ উপযুক্ত স্থান।

আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই বিগত আসরে আমরা এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক লীলাবৈচিত্র্যময় কালরদাশ্‌ত অঞ্চলের কথা বলেছিলাম। হ্যাঁ লীলাবৈচিত্র্যই বটে , কেননা , এখানে রয়েছে বহু নদী , বন্তজঙ্গল , তৃণাচ্ছাদিত সবুজ লন , প্রাকৃতিক হিমাগার , উঁচু উঁচু শৃঙ্গ আর বিশাল বিশাল শিলা-প্রস্তর।
এই তোনেকাবন থেকে সাতচল্লিশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কালরদাশ্‌ত থেকে চব্বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে ইরানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘এল্‌ম কূহ' শৃঙ্গটি অবস্থিত। এল্‌ম কূহ'তেও তিনটি স্থায়ী হিমাগার রয়েছে। এটা অন্তত মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমাংশের জন্যে বিরল একটি ঘটনা। এর পাশেই রয়েছে কেল্লাবাসী অঞ্চল ‘আলমুত'। এখানেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ বেড়াতে আসে। তো একদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় কালরদাশত , অপরদিকে ক্রীড়াপ্রেমীদের ফেভরিট এলমকূহ , আর তারপাশেই ঐতিহাসিক নিদর্শনবহুল আলমূতের পাশাপাশি অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি যেন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

দূর্গবাসীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস সমৃদ্ধ অঞ্চল আলমুত একটু বিস্তৃত। আলমুতকে দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি হলো রুদ্‌বর আলমুত এবং অপরটি রুদবর উপশহর। ইসমাঈলী শাসনামলের তেরটি কেল্লা বা দূর্গের ধ্বংসাবশেষ এখনো এখানে অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো শিরকূহ , শাহরাক , লাম্ব্‌সার , মেইমুন দেজ্বসহ আরো কয়েকটি দূর্গ। ইসমাঈলী শাসনামলের ইতিহাস এবং সমগ্র ইরানের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারা আজো বিশ্বের এক প্রান্তে অবস্থিত এই অঞ্চলটিতে এসে তাঁদের প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছেন।

এই এলাকার সবচে ঘটনাবহুল সময়টি ছিল হিজরী পঞ্চম শতাব্দী। কেননা এই সময়েই ইসমাঈলী আদর্শানুসারী হাসান সাবাহর কর্মতৎপরতা শুরু হয়েছিল। হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে মোগল হামলা তথা হালাকু খানের আক্রমণ পর্যন্ত ইসমাঈলী আদর্শানুসারীদের কর্মতৎপরতা অব্যাহত ছিল। আলমুত দূর্গটি পাথর খণ্ডের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। এর দেওয়ালগুলো বানানো হয়েছে বেশ উঁচু উঁচু করে যাতে সহজেই কেউ এর ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। দূর্গটির দৈর্ঘ এক শ' বিশ মিটার আর প্রসে' এটি বিভিন্ন মাপের অর্থাৎ দশ থেকে পঁয়ত্রিশ মিটার। দূর্গের একমাত্র প্রবেশপথটি হলো পাহাড় কেটে নির্মিত একটি টানেল। এই টানেল বা দূর্গের প্রবেশদ্বারের দৈর্ঘ ছয় মিটার আর উচ্চতা এবং প্রস্থ হলো দুই মিটার। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ হামদুল্লাহ মোস্তাওফির মতে হিজরী ২৪৬ সালে মযান্দারনের আলাভীদেরই একজন হাসান বিন যায়েদ আল-বাকেরী আলমুত দূর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসের ভাষ্য অনুযায়ী হাসান সাবাহ ৪৮৩ হিজরীতে গোপনে এই দূর্গে প্রবেশ করে সেখানেই বসবাস করতে থাকেন এবং ইবাদাতে মশগুল হয়ে পড়েন। এরপর হাসান সাবাহ আলাভীদের কাছ থেকে দূর্গটি কিনে নেন এবং নিজস্ব কর্মতৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত করেন দূর্গটিকে।

খাজা রশিদুদ্দীন ফজলুল্লাহ হামেদানীর ইতিহাস সংকলন থেকে জানা যায় , মালেক শাহ্‌র পুত্র সুলতান মোহাম্মাদ যখন ইসমাঈলীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন , তখন তারা এগারো বছর পর্যন্ত লাম্ব্‌সার এবং আলমুত দূর্গ দুটি অবরোধ করে রেখেছিলেন। তারপরও কেল্লাবাসীরা আত্মসমর্পণ করে নি। অবশেষে হালাকু খান ইসমাঈলীদের শক্তি ও ক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে যখন কেল্লা দুটিকে অবরোধ করেন তখন বেশ কয়েকমাস দূর্গবাসীরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম করেন। কিন্তু দূর্গে কলেরা রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণে কেল্লার অধিবাসীরা নিরূপায় হয়ে আত্মসমর্পন করেন। সেই স্মৃতিময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে আজো আলমুত কেল্লা কৌতূহলী দর্শক কিংবা ইতিহাস গবেষকদের চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে।

( ১২৫ তম পর্ব )

পাঠক! মযান্দারন ঘুরে এসেছি আমরা , সফরটা বেশ আনন্দময় ছিল বৈ কি ! পাহাড়-নদী-সাগর আর বন্তবনানীর সবুজে ঘেরা প্রদেশ মযান্দারনের স্মৃতি বুকে ধারণ করে এবার চলুন অন্য কোথাও যাওয়া যাক৷ আসলে ইরান বিশ্বের মাঝে বিরল একটা দেশ৷ এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়া এবং তাপমাত্রাগত বৈচিত্র্য রয়েছে৷ ইরান চার ঋতুর দেশ৷ আর এখানকার বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে চার ঋতুর বৈশিষ্ট্য অনুভব করা যায়৷ যেমন উত্তরাঞ্চলীয় ইরানে যখন ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করে , ঠিক তখনই দক্ষিণাঞ্চলীয় ইরানে প্রচণ্ড গরম৷ যাই হোক , নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াময় মযান্দারন থেকে এবার আমরা যাবো শুষ্ক আবহাওয়াময় মরু আঞ্চলিক একটি ঐতিহাসিক প্রদেশে৷ এই প্রদেশের নাম 'কোম'৷ বোধ করি নামটির সাথে অনেকেই পরিচিত৷ কেননা ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর সারাবিশ্বেই বিপ্লবের সূতিকাগার খ্যাত ধর্মীয় এই নগরীটির নাম ছড়িয়ে পড়ে৷ তো এই ঐতিহাসিক শহরটি নিয়েই চলুন আজকের আসরে কথা বলা যাক৷

কোম প্রদেশটি একটি মরু অঞ্চল ৷ এখানকার লোকজন বহু শতাব্দী ধরে শুষ্ক মরু প্রান্তরে এবং লবণ মরুভূমির পাশে নদী-নালা-খাল ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিকাজ করে আসছে৷ কোম প্রদেশটির আয়তন প্রায় চৌদ্দ হাজার ছয় শ' বর্গকিলোমিটার৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই প্রদেশটির উচ্চতা নয় শ' ত্রিশ মিটার৷ কোম প্রদেশটির উত্তরে রয়েছে তেহরান , দক্ষিণে রয়েছে মাহাল্লত ও দেলীজন , পূর্বে কাশান এবং লবণ মরুভূমি আর পশ্চিমে রয়েছে অশতিয়ন ও তাফরেশ৷ লবণ মরুভূমি এবং লুত মরুভূমির পাশে অবস্থানের কারণে এখানকার আবহাওয়া অর্ধ-মরুআঞ্চলিক৷ গ্রীষ্মের সময় বেশ গরম এবং শীতকালে তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে৷ ফার্সি মোরদাদ মাস অর্থাৎ আগস্টের সবচে গরম দিনগুলো থেকে ফার্সি দেই মাস অর্থাৎ জানুয়ারীর সবচে ঠাণ্ডা দিনগুলোর মধ্যে তাপমাত্রার তারতম্য কখনো কখনো পঁচাত্তর ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত পৌঁছে যায়৷ এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এক শ' চল্লিশ মিলিমিটারের মতো৷ শীতকালেই এই বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে৷

কোম নদী যা 'কোমরুদ' কিংবা 'রুদে আনরবর' নামেও পরিচিত , তা কোম শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে৷ নদীটির দৈর্ঘ ২৮৮ কিলোমিটার৷ যার্দকূহে বাখতিয়রী থেকে এই নদীটির উত্‍পত্তি হয়েছে৷ গুলপয়গন এবং মাহাল্লত হয়ে এই প্রদেশের পূর্ব প্রান্তীয় কোম হ্রদ পর্যন্ত নদীটি সমপ্রসারিত৷ কোম হ্রদটি অবশ্য হৌজে সুলতান হ্রদ নামেও পরিচিত৷ তেহরান্তকোম মহাসড়কের পূর্বপাশে এটি অবস্থিত৷ এই হ্রদটির আয়তন প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার৷ কোম হ্রদের পশ্চিমাংশে সবসময় পানিপূর্ণ থাকতে দেখা যায় , আর পূর্ব অংশকে গ্রাস করেছে লবণহ্রদ৷ বৃষ্টি-বাদলের সময় হ্রদটিতে জল দেখা যায় , তবে শুষ্ক মৌসুমে এটি জলাভূমি বা ডোবায় পরিণত হয়৷ এই প্রদেশেও বিভিন্ন উচ্চতার অনেকগুলো পাহাড় আছে৷ এগুলো প্রাকৃতিক একটা চমত্‍কার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে৷ এখানকার সর্বোচ্চ পাহাড়টি হচ্ছে 'তাখতে সারেহৌজ'৷ এর উচ্চতা হলো তিন হাজার এক শ' তিরানব্বই মিটার৷ কেন্দ্রিয় প্রাদেশিক শহর কোম থেকে সাতচল্লিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এই পাহাড়টি অবস্থিত৷ তাখতে সারেহৌজ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য আরেকটি পাহাড় আছে কোম শহরের পশ্চিমে৷ এই পাহাড়টির নাম ইয়াযদন৷ ইয়াযদন পাহাড়ে জরথ্রুস্ট ধর্মের বহু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়৷

কোম শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক বহু স্থাপনা ও ধ্বংসাবশেষ এই শহরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই প্রমাণ বহন করে৷ খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক হাজার বছর আগে পিশদাদীয়ান রাজবংশের শাসনামলে কোম শহরটির গোড়াপত্তন ঘটে৷ ইরানের মহাকবি ফেরদৌসীর শাহনামাতেও কোম শহরের উল্লেখ বেশ কয়েকবার এসেছে৷ দেইলামীয়ানের হামলা প্রতিহত করার লক্ষ্যে কোমে প্রাচীনতম যে কেল্লা এবং প্রাচীর নির্মিত হয়েছিল , কালের পরিক্রমায় এখন আর তার ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট নেই৷ কোমরুদ মরুতে পুরাতত্ত্ববিদগণ যে অনুসন্ধান চালিয়েছিল , ঐ অনুসন্ধান থেকে ইসলামী এবং ঐতিহাসিক বহু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে৷ এসব নিদর্শনের কোনো কোনোটির সর্বোচ্চ প্রাচীনত্ব বারো হাজার বছর বলেও বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন৷ যাই হোক কোমে রয়েছে প্রাচীন বহু টিলা , ব্রিজ , বাঁধ , দূর্গ , সরাইখানা এবং রাসূলের বংশধরের মাযার৷ বিশেষ করে কোমরুদ টিলা এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দর্শনীয় অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে৷

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে , মুসলমানরা তেইশ হিজরীতে কোম জয় করেছিল৷ এই শহরের জনগণের অন্তরে ইসলাম এতো গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে , আহলে বাইতের অনুসারীরা আব্বাসীয় এবং উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে তাদের জুলুম-নির্যাতন থেকে বাঁচার লক্ষ্যে কোমে আসতে লাগলেন৷ আর এভাবেই ধীরে ধীরে কোম শহরটি রাসূলের বংশধরদের প্রতি অনুরাগীদের সমাবেশ বা মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়৷ বনী আব্বাস এবং বনী উমাইয়াদের খেলাফতকালে কোমসহ অন্যান্য শহর তাদের অত্যাচারের শিকারে পরিণত হয়েছিল৷ ১৮৯ হিজরীতে হারুনুর রশীদের খেলাফতকালে কোম ইস্পাহান থেকে আলাদা হয়ে যায়৷ তারপর থেকে একটা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শহর হিসেবে কোমের নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়৷ কারণ এই সময় থেকে আহলে বাইতের আদর্শানুসারীগণ স্বাধীনভাবে তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ পান৷

অন্য যে বিষয়টি কোমকে খ্যাতির শীর্ষে প্রতিস্থাপন করেছে তাহলো , এখানে রয়েছে নবী করীম ( সা ) এর পবিত্র বংশধর হযরত মাসুমা ( সা ) এর মাযার শরীফ৷ ইতিহাসের ভাষ্য অনুযায়ী ফাতেমা মাসুমা ( সা ) এর মৃত্যু এবং দাফনের পরই মূলত এই শহরটি আবাদ অর্থাৎ ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে৷ বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইয়াকুবি লিখেছেন , তৃতীয় শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোম মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়েছিল৷ আলে-বুইয়ে'র শাসনামলে রোকনুদ্দৌলার বিখ্যাত মন্ত্রী সাহেব বিন এবাদের সুদৃষ্টির কারণে কোম শহরটির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে৷ কিন্তু সালজুকিদের সময়ে কোম শহরটি তাদের নির্দয় নির্মমতার শিকারে পরিণত হয়৷ পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধে পুনরায় কোম শহরটি উন্নতির মুখ দেখতে শুরু করে এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে এই উন্নতি আরো ব্যাপকতা লাভ করে৷ উন্নতির অব্যাহত এই ধারায় কোম শহরটি সপ্তম শতাব্দীতে মোগলদের বর্বরোচিত হামলার মুখে পড়ে৷ আবার তৈমুরীয় আমলে কোম তার ঐশ্বর্য ফিরে পায় এমনকি একটা সময়ে কোম শাসনকার্য পরিচালনার কেন্দ্রেও পরিণত হয়৷ মির্যা সুলতান মুহাম্মাদ আট শ' ছেচল্লিশ হিজরীতে যখন শাহরুখের পক্ষ থেকে গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন তখন কোমকে তিনি তাঁর শাসনকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন৷ এছাড়াও শাহজাদাদের অনেকেই শীতকালীন অবকাশ যাপনের জন্যে কোমে আসতেন৷

এরপর সাফাভি রাজবংশের সময় কোম শহরটির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়৷ বিশেষ করে শিয়া ধর্মকে ইরানের জাতীয় ধর্ম হিসেবে নির্বাচন করার পর কোম ইরানের পবিত্র নগরীগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি শহরের মর্যাদা লাভ করে৷
যদিও ইরানে আফগানিদের আক্রমণের ফলে কোম শহরটি আবারো আক্রান্ত হয় এবং বিরান ভূমিতে পরিণত হয় , এমনকি এই হামলায় কোমের জনগণ গণহত্যার শিকার হয় , তারপরও কোম শহরটি তার অস্তিত্ব অদ্যাবধি টিকিয়ে রেখেছে ৷ ‍

( ১২৬ তম পর্ব)

পাঠক! আমরা এখন ধর্মীয় নগরী কোমে বেড়াচ্ছি ৷ কোম এই প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর৷ এরিমধ্যে আমরা এই প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সংক্ষিপ্ত ইতিহাস জেনেছি৷ গত আসরেই আমরা বলেছি যে কোম শহরটি বিখ্যাত হলো রাসূলের বংশধর হযরত মাসুমা ( সা ) এর পবিত্র মাযারের কারণে৷ মাসুমা ( সা ) এর মাযার শরীফকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা , মসজিদ , ইসলামী গবেষণাকেন্দ্রসহ অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ৷ ফলে কোম ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে৷ এ কারণে ইসলাম নিয়ে ইরান তথা বিশ্বব্যাপী যাঁরা গবেষণা করেন , কোম যেন তাঁদের মিলন মেলা৷ তো এই কোম নগরী কীভাবে জ্ঞান্তবিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হলো তার প্রতি সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি দেওয়া যাক৷

প্রাচীন আমল থেকেই কোম শহরটি আলেম-ওলামা এবং মুহাদ্দিসগণের জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র ছিল৷ ইসলামী জ্ঞান অর্জনের প্রতি মানুষের অপার আগ্রহের কারণেই কোম নগরীটি ধর্মতত্ত্ব চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে৷ মুসলিম বিশ্বের মহান চিন্তাবিদ ও দার্শনিক মরহুম মোল্লা সাদ্র এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস ফয়েজ কাশানীর মতো ব্যক্তিত্ববর্গ কোমে এসে গবেষণা করেছেন এবং জ্ঞান পিপাসুদের জ্ঞান বিলিয়েছেন ৷ হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ মিযার্য়ী কোমীর প্রচেষ্টায় কোম ধর্মতত্ত্ব চর্চার একটা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে৷ হিজরী ১৩৪০ সালে হযরত আয়াতুল্লাহ শায়খ আব্দুল করীম হায়েরী ইয়াযদি ( রহঃ ) কোমে আগমণ করার পর কোম ধর্মতত্ত্ব চর্চার কেন্দ্র হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করার পাশাপাশি একটা সুশৃঙ্খল গতি পায়৷ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার পর আয়াতুল্লাহ হায়েরী যে বিষয়টির প্রতি মনোযোগ দেন তাহলো ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়ন ও পুনর্গঠন৷ এমনকি তিনি শিক্ষাদান পদ্ধতির ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন আনেন৷
ইমাম খোমেনী ( রহঃ ) ছিলেন আয়াতুল্লাহ হায়েরী ( রহঃ ) এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন ছাত্র৷ তিনি আয়াতুল্লাহ হায়েরীর মযার্দা সম্পর্কে বলেছেন : "রেজা শাহ যখন এই হৌযে বা শিক্ষাঙ্গনকে নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা করেছিল , সেই কঠিন পরিস্থিতিতে আয়াতুল্লাহ হায়েরী ধর্মীয় এই শিক্ষাঙ্গন তথা সমগ্র আলেম সমাজকে যত্নের সাথে সুরক্ষা করেছিলেন৷ এই আমানত তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন যাতে আমরা অন্যদের হাতে প্রত্যর্পন করতে পারি৷"
হিজরী ১৩৪০ সালে এই ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রটি সুশৃঙ্খল একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে৷ যার পরিপ্রেক্ষিতে কোম শহর তথা ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রটি পুনরায় ইসলামী জ্ঞান্তবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি ও উন্নতি অর্জন করে৷ ফলে ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মতাত্তি্বক , ফকীহ এবং ইসলামী চিন্তাবিদগণ কোমে এসে সমবেত হতে থাকেন৷ এঁদের মধ্য থেকে হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা বুরুজার্দির নাম স্মরণ করা যেতে পারে৷ তাঁর নেতৃত্বে কোমের ধর্মতত্ত্ব চর্চার কেন্দ্রটি শ্রেষ্ঠ একটি পীঠস্থান হিসেবে বিশেষ খ্যাতি পায়৷ হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা বুরুজার্দির মৃত্যুর পর ইসলামী বিপ্লবের রূপকার আয়াতুল্লাহিল উজমা ইমাম খোমেনী ( রহ ) এই পবিত্র শিক্ষাঙ্গন পরিচালনার মহান দায়িত্বভার গ্রহণ করেন৷ ইমাম খোমেনী (রহ ) নেতৃত্বভার গ্রহণ করার পর দীর্ঘদিন ধরে বিস্মৃত ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয়াবলী , ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিধি-বিধান ইত্যাদিকে পুনরুজ্জীবিত করেন৷

রাজনীতি থেকে ধর্ম আলাদা-এই নীতিকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন৷ তিনি বিশ্বাস করতেন যে সকল যুগের এবং সকল প্রজন্মের জন্যেই ধর্ম যথোপযুক্ত একটি বিষয়৷ অর্থাৎ ধর্ম সর্বযুগেই মানব সমাজের সকল সমস্যা সমাধানের উপযোগী৷ ফলে বর্তমান যুগেও মানব সমস্যা সমাধানে ধর্ম তথা ইসলাম যথার্থভাবেই সক্ষম ও কার্যকরী৷ আর এই চিন্তা থেকেই ইমাম খোমেনী ( রহ ) ইরানী জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন শুরু করেন এবং অবশেষে ইরানী জাতি একটি বৃহত্‍ ও মহান বিপ্লবী আদর্শের অনুসারী হয়৷ এই বিপ্লব বা আন্দোলন পরিচালিত হয় ধর্মীয় নগরী কোম থেকে৷ তাই কোম প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে ইসলামী আন্দোলন ও বিপ্লবী তত্‍পরতার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়৷ বিগত কয়েক দশকে লক্ষ্য করা গেছে যে কোমের ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমশ চোখে পড়ার মতো উন্নতি অর্জন করেছে৷

বর্তমানে ইসলামী চিন্তাদর্শের প্রচার ও প্রসারের বৃহত্তম কেন্দ্র হিসেবে কোমের এই ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে৷ ধর্মতত্ত্ব , দর্শন , আইন , অর্থনীতি , তাফসীর , এলমে কালাম , অধ্যাত্মবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়সহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তামূলক বিভিন্ন বিষয়ে ইরানী ও অ-ইরানী হাজার হাজার ছাত্র ও গবেষক এখানে এখন পড়ালেখা ও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে৷
এখানে আরেকটি ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে৷ এই প্রতিষ্ঠানটির নাম হলো 'ফয়েজিয়া মাদ্রাসা'৷ হযরত মাসুমা ( সা ) 'র পবিত্র মাযারের পাশেই এই মাদ্রাসাটি অবস্থিত৷ সাফাভি আমলে অথার্ত্‍ হিজরী ৯৩৪ সালে এই মাদ্র্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ইরানের বিখ্যাত আলেম-ওলামাদের অধিকাংশই তাঁদের জীবত্‍কালে এই ফয়েজিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেছেন অথবা জ্ঞান দান করেছেন৷ দীর্ঘকাল ধরে পাহলভি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তথা ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই ফয়েজিয়া মাদ্রাসাটি ছিল ঐ আন্দোলনের মূল কেন্দ্র৷ এই কারণেই শাহের বাহিনী খ্রিষ্টিয় ১৯৬৩ এবং ১৯৭৫ সালে এই মাদ্রাসায় হামলা চালায়৷ শাহের আক্রমণে এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বহু ছাত্র শাহাদাতবরণ করেন ৷ বেশ কয়েকবার ফয়েজিয়া মাদ্রাসাটি মেরামত করা হয়েছে৷ তবে এই মাদ্রাসাটির বর্তমানে যে কাঠামোটি দেখতে পাওয়া যায় , তার মূল ভিত্তিটি হিজরী ১২১৩-১২১৪ সালের ৷

অবশ্য ফয়েজিয়া মাদ্রাসা ছাড়াও কোমে আরো অনেক মাদ্রাসা রয়েছে৷ এসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত কটি হলো দারুশ-শেফা , হুজ্জাতিয়া , মাসুমিয়া , জামে আয-যাহরা ইত্যাদি৷ ফলে কোম যে শিক্ষা-দীক্ষা আর গবেষণার জন্যে অন্যতম একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে , তা বোধ হয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তবে এইসব মাদ্রাসার বাইরেও এখানে উচ্চ শিক্ষার জন্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়৷ দেশী-বিদেশী গবেষকগণ এখানে তাঁদের গবেষণার কাজ নির্বিঘ্নেই চালাতে পারেন , কেননা এখানে রয়েছে গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ৷

( ১২৭ তম পর্ব )

সুপ্রিয় পাঠক! আমরা এখন পবিত্র নগরী কোমে আছি ৷ এখানকার ধমীর্য় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ মনের ভেতর কেমন যেন নির্মল একটা ভাবাবেগ সৃষ্টি করছে , তাই না ! ইরানে তো অনেকগুলো শহরেই আমরা ঘুরলাম ৷ কিন্তু এই কোম শহরের মতো এতোটা পবিত্রতার আবেশ বোধ হয় এক মাশহাদ ছাড়া অন্য কোনো শহরে অনুভূত হয় নি৷ মাশহাদে ছিল নবীবংশের শ্রদ্ধেয় ইমাম হযরত রেযা ( আ ) এর মাযার , আর এখানে রয়েছে নবীজীর প্রিয় বংশধর হযরত মাসুমা ( সা ) এর মাযার ৷ বলাবাহুল্য, কোমে যাঁরা ভ্রমণে যান , সাধারণত তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে মাসুমা ( সা ) এর মাযার যিয়ারতের মাধ্যমে নিজস্ব কল্যাণ হাসিল করা ৷ তো মাযারের প্রসঙ্গ যেহেতু উঠলোই সেহেতু হযরত মাসুমা ( সা ) র পরিচয় এবং এই মাযার শরীফ নিয়েই না হয় আজকের আসরে কথা বলা যাক ৷

রাসূল ( সা ) এর আহলে বাইতের সম্মানিত ইমাম হযরত মুসা ইবনে জাফর ( আ ) এর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা মাসুমা ( সা ) হিজরী ১৭৩ সালে মদীনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷ তিনি ছিলেন যথেষ্ট বাকপটু বক্তা এবং খুবই ভালো শিক্ষক৷ পরহেজগারীতে তিনি ছিলেন আদর্শ স্থানীয়া ৷ হিজরী ২০১ সালে অর্থাত্‍ ৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর ভাই ইমাম রেযা ( আ ) এর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে ইরান অভিমুখে যাত্রা করে খোরাসানের দিকে যান৷ কিন্তু পথিমধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে ইরানের কোমে এসে যাত্রাবিরতি করেন৷ অবশেষে ১৭ দিন অসুস্থ অবস্থায় কাটানোর পর তিনি ইহলীলা ত্যাগ করেন৷ অনেকের মতে শত্রুরা তাঁকে বিষ খাইয়েছিল বলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ৷ মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল আটাশ বছর৷ বর্তমানে কোমের যে স্থানটায় তাঁর মাযার অবস্থিত , ঐখানেই সে সময় তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল৷

হযরত মাসুমা ( সা ) এর মৃত্যুর পর রাসুলে খোদার আহলে বাইতের অনুরাগী এবং অনুসারীগণ তাঁর কবরটিকে প্রথমে একটি সাধারণ কাঠামো দেন৷ হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত তাঁর কবরের ঐ সাধারণ কাঠামোটি অপরিবর্তিত ছিল৷ পরবতীকালে হিজরী ২৫৬ সালে অর্থাত্‍ খ্রিষ্টিয় ৮৭১ সালে বিখ্যাত একজন মনীষী কোমে আসেন এবং হযরত মাসুমা ( সা ) এর কবরের ওপর একটি সাধারণ গম্বুজ নির্মাণ করেন৷ ঐ সাধারণ গম্বুজটি দীর্ঘদিন যাবত্‍ ছিল৷ তবে ৯২৫ হিজরীতে অর্থাত্‍ খ্রিষ্টিয় ১৫২৪ সালে ইসমাঈল সাফাভির স্ত্রী মহিয়সী নারী শাহ বেগম আগের ছোট্ট এবং সাধারণ ঐ গম্বুজটির ওপর বড়ো আরেকটি গম্বুজ নির্মাণ করেন৷ মনে করা হয় যে , ঐ গম্বুজটির ভেতরের দিকটায় স্বর্ণ এবং উজ্জ্বল নীল বর্ণের কারুকাজ করা হয়েছিল আর বাইরের দিকটা টাইলস দিয়ে সাজানো হয়েছিল৷ কিন্তু ঐসব কারুকাজের কোনো চিহ্ন আজ আর অবশিষ্ট নেই৷ সাফাভি আমল পর্যন্ত হারামের ভেতরে কোনো যারীহ ছিল না , এমনকি তার আশেপাশেও কোনোরকম বারান্দা কিংবা মাদ্রাসার খোলা আঙ্গিনার উপস্থিতি ছিল না৷ মূল কবরের চারপাশে নকশা করা সিন্দুকের মতো ছোট্ট ছাদ দেওয়া যে দেয়াল করা হয় তাকেই বলে যারীহ৷ ঐ যারীহ'র দেওয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে মূল কবর দেখা যায়৷ সাফাভি আমলেই মাসুমা ( সা ) এর পবিত্র মাযার স্থাপনা ও ভবনের ব্যাপক সংস্কার করা হয়৷ ঐ সময়কার সংস্কারকৃত রূপটিই বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি৷

মাসুমা সালামুল্লাহে আলাইহার পুরো মাযার কমপ্লেক্সটি শহরের মূলকেন্দ্রে কোমরুদ নামক নদীর পূর্বপাশে গড়ে উঠেছে৷ মাযার কমপ্লেঙ্টি বেশ বড়ো ৷ হারাম শরীফ , মসজিদ , মিউজিয়াম , আঙ্গিনা , বারান্দা এবং অন্যান্য ভবনসহ পুরো কমপ্লেক্স আয়তন ১৩৫২৭ বর্গমিটার৷ এর মধ্যে গম্বুজ বা মাযার এলাকা এবং তার উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্বের আঙ্গিনা ২০০০ বর্গমিটার ভূমির ওপর রয়েছে৷ মাযার যিয়ারত করতে আসা দর্শনাথীর্দেরকে যে বিষয়টি প্রথমেই আকৃষ্ট করে তাহলো মাযার শরীফের সোনালী গম্বুজ৷ গম্বুজটির উচ্চতা ষোল মিটার৷ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সানালী রঙ্গের ইট দিয়ে এই গম্বুজটি সজ্জিত করা হয়েছিল৷ আর স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়ার কাজটি সমাপ্ত করেছিলেন কোমের বিখ্যাত মুসলমান শিল্পী ওস্তাদ মাহমুদ মে'মর কোমী৷ স্বর্ণালীঐ গম্বুজের নিচেই রয়েছে মাসুমা ( সা ) এর পবিত্র কবর৷ মাযার কমপ্লেক্স ঢুকলেই অপূর্ব এক নির্মলতায় পবিত্র হয়ে ওঠে মন , হৃদয় ভরে যায় আধ্যাত্মিক এক সুষমায়৷

হযরত মাসুমা ( সা ) এর কবরের ওপর চিত্তাকর্ষক একটা যারীহ বা চার দেওয়ালি সিন্দুকের মতো ছোট্ট ঘর তৈরী করা হয়েছে৷ এটি তৈরী করেছে ইস্ফাহানের নামকরা হস্তশিল্পীরা৷ রূপা দিয়ে পুরো যারীহটা বানানো হয়েছে৷ ফলে মাযারের ভেতরের সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে গেছে৷ হারামের আঙ্গিনার আশেপাশে অনেকগুলো ঝুলবারান্দা রয়েছে৷ এই বারান্দাগুলোতেও ইরানী শিল্পের বিচিত্র কারুকাজ করা হয়েছে৷ এসব কারুকাজের মধ্যে রয়েছে ক্যালিগ্রাফি শিল্প , টাইলস , নিকেল শিল্প , আয়না শিল্প , নকশী প্লাস্টারিং ইত্যাদি৷

হারামের ভেতরকার এই ঝুলবারান্দাগুলো ছাড়া মূল প্রবেশদ্বারেও কিছু বারান্দা তৈরী করা হয়েছে৷ এগুলোর মধ্যে স্বর্ণবারান্দা এবং আয়না বারান্দা খুবই বিখ্যাত৷ উত্তরদিক থেকে হারামে ঢোকার প্রবেশদ্বারে স্বর্ণবারান্দাটি পড়বে৷ আট কোণা বিশিষ্ট ফিরোযা রঙের ছোট ছোট টাইলস দিয়ে এই বারান্দাটিতে অলঙ্করণ করা হয়েছে৷ এর উপরের দিকে উজ্জ্বল নীল রঙের পাথরের ওপর চমত্‍কার লিপিকর্ম করা হয়েছে৷ পূর্বদিক দিয়ে হারামে ঢোকার পথেও স্বর্ণবারান্দার সমান উঁচু আরেকটি বারান্দা রয়েছে৷ এই বারান্দায় আয়নার কারুকাজ করার কারণে এটিকে আয়না বারান্দা বলা হয়৷ এখানকার এই শিল্পকর্মটি ওস্তাদ হাসান মে'মর কোমীর করা৷ হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত এই শিল্পীর করা আয়নার কারুকাজে যথেষ্ট নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রয়েছে৷

সব মিলিয়ে হযরত মাসুমা ( সা ) এর পবিত্র মাযার কমপ্লেক্স পরিবেশটাই এমন যে , এখানে গেলেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও পবিত্র অনুভূতি মনকে প্রশান্ত করে তোলে৷ মুসলমান শিল্পীরা তাদের বিশ্বাসী মন নিয়ে , আবেগ এবং ভালোবাসা দিয়ে , অন্তরের অনুরাগ দিয়ে এই কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছেন৷ এখানে তাই প্রবেশ করলেই আধ্যাত্মিক এক আমেজ অনুভব করা যায় সহজেই৷

( ১২৮ তম পর্ব )

গত আসরে আমরা নবীবংশের সুযোগ্য উত্তরাধিকার হযরত মাসুমা ( সা ) এর পবিত্র মাযার শরীফে আপনাদের নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বেশ ভালোই কেটেছে আশা করি , অন্তত পূত-পবিত্রতায় যে মনটা ভরে গেছে তাতে বোধ হয় সন্দেহ নেই। হযরত মাসুমা ( সা ) এর মাযার শরীফ ছাড়াও কোম শহরে বা শহরের আশেপাশে অনেক ইমামযাদা এবং বুযুর্গানে দ্বীনের কবর রয়েছে। এসব মাযারেও প্রায় সবসময়ই যিয়ারতকারীদের ভিড় লেগে থাকে। এরকম প্রায় তিন শ' মাযার রয়েছে কোমে। প্রতিটি মাযারেই রয়েছে গম্বুজ , রয়েছে বিভিন্ন সময়ের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। উপর থেকে যদি একবার এগুলোকে এক নজরে দেখা যায় , তাহলে মনে হতেই পারে যে কোম হলো ধর্মীয় মহান ব্যক্তিত্বগণের মিলনকেন্দ্র। হ্যাঁ , এ কারণেই কোমকে বলা হয় ধর্মীয় নগরী। চলুন আমরা না হয় আজ এখানকার পবিত্র স্থাপনাগুলোর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই।

কোমের এই বরকতপূর্ণ অসংখ্য মাযার বা স্থাপনার মধ্যে বিখ্যাত কটি স্থাপনা হলো জামকারন মসজিদ , ইমাম হাসান আসকারী ( আ ) মসজিদ , ইমামযাদা আলী ইবনে জাফর ( আ ) , ইমামযাদা আহমদ ইবনে কাসেম ( আ ) এবং কোম জামে মসজিদ। জামকারন মসজিদটি কোম শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কোমের সবচে বরকতপূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠতম মসজিদ হলো জামকারন মসজিদ। প্রতি সপ্তায়ই দূরের ও কাছের হাজার হাজার মানুষ আধ্যাত্মিক সুষমামণ্ডিত ও ফযীলতপূর্ণ এই মসজিদে আসেন। এখানে এসে তাঁরা তাঁদের মনের সকল চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে দোয়া-দরুদ ও নামায পড়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। স্বচ্ছ নির্মল মন নিয়ে শত-সহস্র মানুষ যখন দোয়া দরুদ আর নামায কালামে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন যেই পরিবেশটা তৈরী হয় তা মনে হয় আপনারা মনে মনেও একটি চিত্র কল্পনা করতে পারেন। তবে বাস্তবতা যে কল্পনার চেয়ে অনেক বেশী প্রাণময় , তা বোধ হয় বলারই অপেক্ষা রাখে না।

জামকারন মসজিদটি ১০০২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়। শায়খ আফীফ সালেহ হাসান ইবনে মাসালেহ জামকারনীর প্রচেষ্টায় এটি নির্মিত হয়। তবে সমপ্রতি এই মসজিদটির পুরোপুরি সংস্কার করার ফলে অর্থাৎ এর পুনর্নির্মাণ করার ফলে মসজিদটির ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। বিশাল এলাকা জুড়ে মসজিদটির বিস্তার। বিশাল বিশাল মিনার বহুদূর থেকে জনগণকে তার দিকে টানে। মহাসড়কের পাশে খোলামেলা জায়গায় মসজিদটির অবস্থান। রাতের বেলা মিনারগুলোতে যখন রঙীন বাতি জ্বলে , আর মূল মসজিদটির গম্বুজ এবং মসজিদ সংলগ্ন মিনারগুলোর যখন বাতি জ্বলে , তখন ঐ বাতির আলো বহুদূর থেকে সকলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। মসজিদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রয়োজনীয় সকল অফিস আদালত আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

কোম শহরের প্রাচীনতম এবং গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বৃহৎ মসজিদ হলো এখানকার জামে মসজিদ। ইরানের স্থাপত্যকলার ইতিহাসের কয়েক পর্বের নিদর্শনবহুল এই স্থাপনাটি হিজরী পঞ্চম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে কালের পরিক্রমায় এতে অবশ্য অনেক পরিবর্তন এসেছে। কোমের জামে মসজিদে তিনটি শাবেস্তান রয়েছে। শাবেস্তান মানে হলো ছাদ বিশিষ্ট খোলা আঙ্গিনা। রয়েছে বিশাল উঠোন , বারান্দা , বেইজমেন্ট এবং ঐতিহাসিক গম্বুজ। বারান্দার প্লাস্টারিং এর বিচিত্র কারুকাজ , টাইলসের অসাধারণ নক্সা সবমিলিয়ে এই মসজিদে স্থাপত্যকলার যে অপূর্ব সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায় , তা সবাইকেই মুগ্ধ করে বৈ কি !

রাসূল ( সা ) এর বংশধর ইমামযাদা আহমাদ ইবনে কাসেম ( আ ) এর মাযারটিও কোমের উল্লেখযোগ্য পবিত্র স্থাপনাগুলোর একটি। এই ইমামযাদার মাযারটি মৌলিক ও প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শনে পূর্ণ। বিশেষ করে প্লাস্টারিং এর যে বিচিত্র কারুকাজ এতে করা হয়েছিল , তা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। ইমামযাদা ইবনে কাসেম ( আ ) এর মাযারটি হিজরী সপ্তম শতাব্দীর নিদর্শন। ষোলোটি দিক বা কোণ বিশিষ্ট একটি স্তম্ভের ওপর মাযারের গম্বুজটি অবস্থিত। প্রতিটি দিকই মেহরাবের আকৃতির। প্রত্যেকটি মেহরাব আকৃতির ভেতরে রয়েছে সিমেন্ট দিয়ে লেখা ক্যালিগ্রাফি বা লিখনশিল্প। চমৎকার চমৎকার এইসব লিখনশিল্প দর্শকদেরকে সহজেই বিমোহিত করে।

শুরুতেই যেমনটি বলেছিলাম যে , কোম শহরে রাসূলের পবিত্র বংশধরগণের অনেকেরই মাযার রয়েছে। কিন্তু স্বল্পপরিসর এই আসরে তাঁদের সবার ব্যাপারে কথা বলা তো সম্ভব নয়। পবিত্র কোম শহরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক অসংখ্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটা নমুনা আমরা তুলে ধরলাম। বর্তমানে কোমে ধর্মতত্ত্ব তথা ইসলামী জ্ঞান্তবিজ্ঞান চর্চার অনেকগুলো কেন্দ্র রয়েছে , রয়েছে শত শত মাদ্রাসা ও গবেষণা কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান অনেক গ্রন্থাগার। এইসব প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে কোম শহরটির মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সমৃদ্ধতম গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গ্রন্থাগার কোমে অবস্থিত। এর নাম হলো আয়াতুল্লাহ মারআশী নাজাফী ( রহ ) গ্রন্থাগার। চলুন গ্রন্থাগারটির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক।

প্রথমেই যাঁর নামে এই গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত তাঁর সম্পর্কে খানিকটা কথা বলা যাক। হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা মারআশি নাজাফী ( রহ ) ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র নাজাফের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর জীবনে জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞান প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে তিনি ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকদের শতাধিক মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া এক শ' বিশটিরও বেশী সাহিত্য সংকলন ও গবেষণামূলক বিভিন্ন প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সৃজনকর্মের অন্যতম উদাহরণ। তিনি ইরানের ভেতর এবং বাইরে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মসজিদ , হোসাইনিয়া , গ্রন্থাগার , দাতব্য চিকিৎসালয় ইত্যাদি। অবশেষে এই মহান ইসলামী ব্যক্তিত্ব ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।

আয়াতুল্লাহ নাজাফির শখ বা অভ্যাস ছিল বই পড়া এবং প্রাচীন ও দুর্লভ বইগুলো সংগ্রহ করা। এগুলো অবশ্য তিনি খামোখাই করতেন না , তাঁর ইচ্ছে ছিল একটা বড়োসড়ো ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। জ্ঞানের এই উৎসগুলোকে তিনি যত্ন করে সংরক্ষণ করতেন যাতে এইসব গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন লুঠতরাজের হাত থেকে রক্ষা পায় , সেইসাথে বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র বিশেষ করে বড়ো বড়ো গ্রন্থাগারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সেগুলোর বিস্তারও ঘটাতে চেয়েছিলেন তিনি। এই লক্ষ্যই তাঁকে ধীরে ধীরে একটা বড়ো গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। বর্তমানে এখানে আকর্ষণীয় হস্তাক্ষরে লেখা ছাব্বিশ হাজার পাণ্ডুলিপী আছে , বিভিন্ন দেশের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপীর তিন হাজার মাইক্রোফিল্মও এই লাইব্রেরীতে শোভা পাচ্ছে। এর বাইরেও রয়েছে ইসলামী জ্ঞান্তবিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর বিভিন্ন ভাষার চার লক্ষাধিক মুদ্রিত বই। এই গ্রন্থাগার এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি হাতে লেখা পাণ্ডুলিপীর একটা সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। তাই দেশী-বিদেশী গবেষকগণ অন্যান্য গ্রন্থাগারের তুলনায় এই গ্রন্থাগারটিকেই তাঁদের গবেষণা কাজের জন্যে বেশী উপযোগী মনে করেন। গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। পরে ১৯৭৪ সালে এর উন্নয়ন ও সংস্কার করা হয়। গ্রন্থাগারটিতে এখন পত্র-পত্রিকা , ম্যাগাজিনসহ নতুন নতুন বইগুলো নিয়মিত রাখা হয়। এসব পড়ার জন্যে এখানে যেমন চমৎকার পাঠকক্ষ রয়েছে , তেমনি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রকাশনার সমৃদ্ধ আর্কাইভ।

হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা নাজাফি মারআশি তাঁর ওসিয়্যতনামার এক জায়গায় বলেছেন , আমাকে সার্বজনীন এই গ্রন্থাগারে আহলে বাইতের ওপর গবেষণাকারীদের পায়ের নীচে দাফন করো। তাঁর সেই ওসিয়্যত অনুযায়ী তাঁকে গ্রন্থাগারের প্রবেশপথে দাফন করা হয়েছে।

( ১২৯ তম পর্ব )

গত কিছুদিন ধরে আমরা মধ্য ইরানের কোম প্রদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি ৷ এরিমধ্যে প্রাদেশিক শহর কোমের কয়েকটি নিদর্শনের সাথে পরিচিত হয়েছি৷ আজকের আসরে আমরা এই প্রদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে কোম প্রদেশ থেকে বিদায় নেবো৷

কোম প্রদেশটি ইরানের শিল্পসমৃদ্ধ তিনটি প্রদেশ যথাক্রমে তেহরান , কেন্দ্রীয় এবং ইস্ফাহানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের কারণে শিল্পখাতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই প্রদেশটির বিশেষ একটা গুরুত্ব রয়েছে৷ বর্তমানে এই প্রদেশে শিল্পের যেসব ক্ষেত্রে তত্‍পরতা দেখতে পাওয়া যায় , সেগুলো হলো-বয়ন বা বুনন শিল্প ,প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল শিল্প, খনিজ শিল্প , খাদ্য শিল্প , ভারী শিল্প এবং হস্তশিল্প৷ সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী কোম প্রদেশে ছোট-বড়ো সব মিলিয়ে প্রায় নয় শ' শিল্প-কারখানা রয়েছে৷ এগুলোর মধ্যে শতকরা ৪৬ ভাগই হলো অ-ধাতব এবং খনিজ , ১৫ ভাগ কেমিক্যাল , শতকরা ১৪ ভাগ বয়ন শিল্প , ৮ ভাগ খাদ্য শিল্প , ৭ ভাগ স্টিল শিল্প এবং ৯ ভাগ হলো চামড়া , সেলুলয়েড , ইলেক্ট্রনিক এবং বৈদ্যুতিক শিল্প৷

ভৌগোলিক দিক থেকে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কারণে এবং ইরানের দক্ষিণ , কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় বহু প্রদেশের সাথে তেহরানের যোগাযোগের পথে পড়ার কারণে কোমের বাণিজ্যিক ও ব্যবসায়িক গুরুত্বও অপরিসীম৷ তেহরানসহ অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে এই প্রদেশের শিল্প-সামগ্রী মধ্য-এশিয়ার সদ্য স্বাধীনতা লাভকারী দেশগুলো , ইউরোপ , আরব দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করা হয়৷ এই প্রদেশের রপ্তানীযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কাপড় , তাঁতসামগ্রী , গৃহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র , পাথর , পোকামাকড় ধ্বংসকারী বিভিন্ন সামগ্রী , বিভিন্ন শিল্প যন্ত্রাংশ , স্ক্রু ,নাট-বল্টু , বিস্কুট , জুতা ইত্যাদি৷

হস্তশিল্পও কোম প্রদেশের একটি উল্লেখযোগ্য সামগ্রী৷ অবসর সময়ে এই হস্তশিল্পের কাজ করার ফলে এই প্রদেশের বেকার সমস্যা দূরীভূত করতে সহযোগিতা করেছে ৷ শহর এবং গ্রামে এইসব সামগ্রীর যথেষ্ট চাহিদা বা গুরুত্বও রয়েছে৷ এই প্রদেশের প্রধান প্রধান হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে গালিচা বোণা , সিরামিক ও টাইলস তৈরী , ফার্নিচার প্রভৃতি৷ তবে গালিচা বুনন শিল্পের মর্যাদাই আলাদা৷ বহু শতাব্দী আগে থেকেই গ্রামবাসীদের মাঝে এই আকর্ষণীয় শিল্পটির চর্চা হয়ে আসছে৷ বর্তমানে কোমে হাজার হাজার মানুষ এই শিল্পের সাথে জড়িত৷ সুন্দর সুন্দর নকশা এবং ডিজাইনের যেসব সিল্কের কার্পেট এখানে বোণা হয় , বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে সেগুলোর যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে৷ কোমে সুহান নামে একধরনের মিষ্টিও তৈরী হয় , যা কোমের উপহার নামে বিখ্যাত৷ এই সুহান মিষ্টি তৈরীর ইতিহাস বেশ পুরোণো৷ বলা হয়ে থাকে যে , তার প্রাচীনত্ব নাসীরুদ্দীন শাহের শাসনামল পর্যন্ত পৌঁছে৷ পারস্য উপসাগরীয় শেখ বা আমীর শাসিত এলাকাগুলোতে এবং ইরানের কিছু কিছু শহরে এইসব হস্তশিল্প সামগ্রীর একটা অংশ রপ্তানী হয়৷

কোম প্রদেশে বিভিন্ন ধরনের খনিজ সম্পদ থাকায় খনিজ শিল্পের উন্নয়নে নিঃসন্দেহে এই প্রদেশের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে৷ এখানকার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে মেঙ্গানিজ , চুন , চক , লবণ , সোডিয়াম সালফেট ইত্যাদি৷ অবশ্য কোমের অধিকাংশ খনিজ পদার্থই অধাতব৷ বছরে ইরানের শতকরা এক পঞ্চমাংশ ক্যালসিয়াম কার্বোনেট পাউডার কোমে উত্‍পাদিত চুন থেকে নিশ্চিত করা হয়৷ এখানে ম্যাঙ্গানিজের যে খনি রয়েছে তাতে ছয় মিলিয়ন টনের মতো ম্যাঙ্গনিজ মজুদ আছে৷ পরিমাণগত দিক থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে এটি সবচে বড়ো খনি৷ ইরানের স্টিল শিল্পের জন্যে প্রয়োজনীয় ম্যাঙ্গানিজের চাহিদা এখান থেকেই পূরণ করা হয়৷ এছাড়া এখানে রয়েছে লবণ হ্রদ৷ এই হ্রদের পাণি থেকে প্রচুর পরিমাণ ম্যাগনেশিয়াম উত্‍পন্ন হয়৷ প্রতি লিটার পানি থেকে উত্‍পন্ন হয় বিশ গ্রাম ম্যাগনেশিয়াম৷

কৃষিকাজ এবং পশুপালনও এই প্রদেশের জনগণের সাধারণ একটি পেশা৷ তবে এখানকার কৃষিজীবীরাই আবার পশুপালন করে থাকে৷ মরু অঞ্চল হবার কারণে অবশ্য এখানে কৃষিকাজের ক্ষেত্র বেশ সীমিত৷ তবে যারা কৃষিকাজ করেন , তারা যথেষ্ট পরিশ্রমী এবং কর্মতত্‍পর৷ সমতল ভূমিতেই কৃষিকাজ হয়৷ পার্বত্য এলাকায় হয় বাগ-বাগিচা৷ পার্বত্য এলাকায় তো আর সেচ কাজের ব্যবস্থা বা সুবিধা কোনটাই নেই তাই এখানে বৃষ্টির পানিই একমাত্র সম্বল৷ পার্বত্য এলাকার শতকরা ৯০ভাগ মাটিতে বৃষ্টির পানি দিয়েই বাগ-বাগিচা করা হয় , তবে ঢালুর দিকে শতকরা ১০ ভাগ মাটিতে সেচের সাহায্যে চাষাবাদ করা হয়৷
কোমে ১২০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে , এর মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়৷ এখানকার কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে গম , যব , তুলা , সূর্যমুখি , আঙ্গুরসহ শসা , টমেটো , খরবুজা , তরমুজ জাতীয় বিভিন্ন শস্য৷ আর এখানকার বাগ-বাগিচায় উত্‍পন্ন ফসলাদির মধ্যে রয়েছে আখরোট , পেস্তা , বাদাম , ফান্দুক নামের এক জাতীয় বাদাম , আপেল , চেরি , খুবানি , আনার এবং ডুমুর৷

এ পর্যায়ে কোমের নিকটবর্তী অঞ্চল সালাফচুকনের সাথে খানিকটা পরিচিত হওয়া যাক৷ অর্থনৈতিক বিচারে এই এলাকাটি বেশ সমৃদ্ধ৷ কোম শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এই শহরটি অবস্থিত৷ কোম-সভে-আরাক-দেলিজন এবং ইস্ফাহান সড়কের ক্রসিং-এ এই এলাকাটি পড়েছে৷ ইরানের উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলে যাবার পথেও এই এলাকাটি পড়ে৷ এখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গুদাম বা স্টোরেজ৷ রয়েছে শিল্প এলাকা , বাণিজ্যিক অফিস আদালত , আবাসিক এলাকা ইত্যাদি৷ ফলে মালামাল রাখার জন্যে এখানে যেমন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে , তেমনি রয়েছে পানি-বিদ্যুত-গ্যাসসহ সেবামূলক প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা৷ মালামাল আনা-নেওয়ার জন্যেও রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সার্ভিস৷ দিবারাত্রি সবসময় এই সার্ভিস রয়েছে৷ এসবের বাইরেও রয়েছে ব্যাংক-বীমার ব্যবস্থা৷ রেল-যোগাযোগেরও ব্যবস্থা রয়েছে এখানে৷ সবমিলিয়ে সালাফচুকন এলাকটি অর্থনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা হিসেবে বিবেচিত৷

(১৩০ তম পর্ব)

পাঠক! কিছুদিন আগেই আমরা কোম প্রদেশ দেখে বেড়িয়েছি। আশা করি আপনাদের ভালো লেগেছে। লাগবে না-ই বা কেন , এখানে যে রয়েছে মহান ব্যক্তিত্বদের পবিত্র সব মাযার। এসব জায়গায় গেলে তো মন এমনিতেই নির্মল হয়ে যায়। সুযোগ পেলে যিয়ারতে যেতে ভুলবেন না কিন্তু ! যাই হোক আমরা আজো যাবো ইরানের কেন্দ্রীয় প্রদেশে। এই প্রদেশকে ফার্সিতে বলে ‘মারকাযী'। আর ফার্সি এই শব্দটির অর্থ হলো কেন্দ্রীয়। তো যেহেতু এটি একটি শহরের নাম , সেহেতু আমরা প্রদেশটিকে তার মূল নাম অর্থাৎ মারকাযী নামেই অভিহিত করবো। তো চলুন যাওয়া যাক তাহলে।

এই প্রদেশটি যেন প্রকৃতির একটা বিশেষ দান। তাছাড়া ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এই প্রদেশটি বেশ সমৃদ্ধ। উত্তর ইরানের সাথে দক্ষিণ ও পশ্চিম ইরানের যোগাযোগের পথে অবস্থানের কারণে পর্যটকদের জন্যে এটি একটি আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয় , ইরান বা বিদেশ ভ্রমণের জন্যে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রও সৃষ্টি হয়েছে। মারকাযী প্রদেশের আয়তন প্রায় ২৯ হাজার ৫৩০ বর্গকিলোমিটার। ইরানের কেন্দ্রস'লে এই প্রদেশটি অবস্থিত। এর উত্তরে রয়েছে তেহরান এবং যানজন , পশ্চিমে রয়েছে হামেদান , দক্ষিণে রয়েছে ইস্ফাহান এবং লোরেস্তান আর পূর্বে রয়েছে তেহরান এবং ইস্ফাহান প্রদেশের অংশবিশেষ। মারকাযী প্রদেশটি আটটি শহর-উপশহর সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হলো আরক , তাফাররোশ , অশতিয়ন , খোমেইন , দেলিজন , সভে ,সারবান্দ এবং মাহাল্লত। আলবোর্য এবং যাগরোস পর্বতমালা দুটির অসমতল বাঁকে বা কোণে পড়েছে প্রদেশটি। এই দুটি পর্বতমালা যেন তাদের কিছু কিছু অংশ ছেড়ে দিয়ে প্রদেশটির জন্ম দিয়েছে। এখানে রয়েছে পর্বতশৃঙ্গ। সভের দক্ষিণে একটা প্রান্তর আছে। ঐ প্রান্তরের সর্বোচ্চ জায়গাটিতে রয়েছে ৩৩৮৮ মিটার উঁচু পর্বতশৃঙ্গ। এর নাম হলো শাহ্‌বজ। এটা অবশ্য ‘রসভান্দ শযান্দ' পর্বতমালার মধ্যে পড়েছে। এই প্রদেশের বিখ্যাত নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শারয়ে কারেহ চয়ী' এবং ‘কামরুদ'।

বিশেষজ্ঞদের মতে মারকাযী প্রদেশের বর্তমান যে ভৌগোলিক অঞ্চলটি রয়েছে , প্রাকৃতিক ইতিহাস এবং মানব সভ্যতার ইতিহাসের দিক থেকে সমগ্র ইরানের মধ্যেই তার আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। এই ভূখণ্ডটি অবশ্য আগে বৃহত্তম মাদ্দ্‌ এর অংশ ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে মাদ্দ্‌ বংশ ইরানের মালভূমি অঞ্চলের উপকণ্ঠেই গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক এই অঞ্চলে পুরোণো বহু নিদর্শন রয়েছে। এইসব নিদর্শন বিভিন্ন যুগের বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন , প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শুরু করে কাজারী রাজবংশ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নিদর্শন এখানে রয়েছে। মারকাযী প্রদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের উদ্যোগে এখানকার কয়েকটি স্থানকে প্রাচীনতম স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এগুলোর মধ্যে মাহাল্লত উপশহরের উপাসনালয়ও রয়েছে। এটি সেলুকি যুগের নিদর্শন। আর কাজারী যুগের নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আরক বাজারটি। মারকাযী প্রদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বেশীরভাগই সেলজুকি , সাফাভি , যান্দিয়া এবং কাজারী শাসনামলের।
সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে , এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষাভঙ্গীতে পার্থক্য রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এখানকার জনগণের মাঝে সাংস্কৃতিক এবং আচার-আচরণগত বেশ মিল রয়েছে। এমনকি কোনো কোনো এলাকা ছাড়া এই প্রদেশের কৃষ্টি-কালচার প্রায় অভিন্ন। বেশিরভাগ জনগণই ফার্সি ভাষায় কথা বলে। তবে প্রদেশের আশেপাশে এবং কোনো কোনো শহরে বিভিন্ন ভাষা বিশেষ করে তুর্কি ভাষায় কথা বলার প্রচলন দেখা যায়। সকল পরিবারেই ইসলামী রীতিনীতি এবং সংস্কৃতি পালন করতে দেখা যায় অর্থাৎ মারকাযী প্রদেশের সকল পরিবারেই ইসলামী আদর্শ অনুসরণ করা হয়।
বলা হয়ে থাকে যে , বিগত দুই দশকে মারকাযী প্রদেশটি শিল্পগত দিক থেকেও একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই প্রদেশটি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্যে বিখ্যাত। যেমন এখানে রয়েছে তেল শোধনাগার এবং এখানে গড়ে উঠেছে পেট্রো-কেমিক্যালের বৃহৎ বৃহৎ স্থাপনা। অবশ্য এই প্রদেশের শিল্পগত উন্নয়নের পেছনে বেশকিছু বিষয় কাজ করেছে। যেমন প্রথমত এই প্রদেশটির ভৌগোলিক অবস্থান যোগাযোগের জন্যে সুবিধাজনক। এখান থেকে অতি দ্রুত বিভিন্ন প্রদেশে মালামাল পাঠানো যায়। এছাড়া প্রদেশটিতে এখনো উন্নয়নমুখি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। যেমন এখানে বর্তমানে রেল-লাইন তৈরীর কাজ চলছে , চলছে ক্রুড-অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের পাইপ লাইনের কাজ। একইভাবে এখানে বিদ্যুৎ এবং গ্যাস পাইপ লাইনের উন্নয়নের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসবই মারকাযী প্রদেশের শিল্পগত উন্নয়নের দিকটাই প্রমাণ করে।
এসবের বাইরেও এখানে রয়েছে বিচিত্র কল-কারখানা। যেমন এ্যালুমিনিয়ম কারখানা , গাড়ী তৈরীর কারখানা , তেল-শোধনাগার এবং পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা , মালগাড়ীর বগি ইত্যাদি।

আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার আটলান্টিক ও এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হর্ষ বর্মা ইরান ভ্রমণ করার পর তিনি এই দেশ সম্পর্কে বলেছেন , ইরানের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। ইরান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পেলে পর্যটন শিল্পে বিশ্বের বুকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

 

(১৩১ তম পর্ব)


পাঠক! আমরা মারকাযী প্রদেশে আছি এখন। আপনারা ইতোমধ্যে এই প্রদেশের ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপারে জেনেছেন। সেইসাথে এই প্রদেশের বিভিন্ন শহর-উপশহরের কথাও শুনেছেন। ধীরে ধীরে আমরা এইসব শহর-উপশহরের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো। আজ বরং আমরা ‘সভে' শহরের দিকেই যাই। এই শহরটি মারকাযী প্রদেশের উত্তরে অবস্থিত।
সভে শহরটির আয়তন দশ হাজার দুই শ' উনাশি বর্গ কিলোমিটার। এখানকার আবহাওয়া অর্ধ মরু আঞ্চলিক। তেহরান থেকে এক শ' চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯৯৫ মিটারের মতো। সভে শহরের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, সাত হাজার বছর আগে থেকে এখানে মানব বসতি ছিল। তবে বিশ্বমানবতার ধর্ম ইসলামের আবির্ভাবের পর এই শহরের অধিবাসীদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে কোরআনের শিক্ষার আলো পড়ে। কোরআনের ঐ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি তাই এখানকার অধিবাসীদের মাঝে প্রচলিত হতে দেখা যায়। এই শহরে বিদ্যমান ঐতিহাসিক নিদর্শন , কেল্লা , টাওয়ার এবং প্রাচীন টিলা থেকেই প্রমাণিত হয় যে , শহরটি কতোটা প্রাচীন। পুরাতত্ত্ববিদদের খনন বা অনুসন্ধান থেকে খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগের বহু নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে। সভী নামের একটি শহরের অস্তিত্ব থাকার ব্যাপারে সর্বপ্রাচীন যে নিদর্শনটি পাওয়া গেছে ,তাহলো ‘নেউতিন গেরায়া' শিলালিপী। এই শিলালিপীতে গ্রিক উচ্চারণে সভে শহরটির নাম ‘সভে'তেহ' লেখা হয়েছে। শিলালিপীটি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর অর্থাৎ এখন থেকে ২৩০০ বছর আগের। অস্ট্রিয়ার বিখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক ভেলহেলম তুমশাক এই শিলালিপীটি আবিষ্কার করেন। বর্তমানে এটি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে , সভে শহর মাদ এবং পারত্‌দের যুগে অর্থাৎ ২৬০০ বছর আগে বেশ ভালো একটি শহর হিসেবে বিখ্যাত ছিল। রেই থেকে হামদানের দিকে যাবার পথে শহরটি পড়তো। পার্‌ত্‌দের সময় মুসাফিরদের যাত্রাবিরতির সুবিধার্থে পথিমধ্যে থাকা বা অবস্থানের জন্যে আবাসনের ব্যবস্থা ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব সাত শ' বছর আগেও এই শহরটি মাদ্‌দের একটি দূর্গ হিসেবে পরিগণিত ছিল। বিখ্যাত পর্যটক মার্কুপুলু ৭০০ বছর আগে তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে সভে শহরের অগ্নিপুজকদের মন্দির এবং কেল্লার কথা উল্লেখ করেছেন। সভে যে প্রাচীন সভ্যতার লালনভূমি ছিল , এই নিদর্শনগুলো তা-ই প্রমাণ করে।
কালের পরিক্রমায় ক্ষয় এবং ধ্বংস সত্ত্বেও এখনো এখানকার প্রাচীন নিদর্শনগুলোর কোন কোনটির অস্তিত্ব টিকে আছে। উদাহরণস্বরূপ ‘দোখতার কেল্লা'র নাম করা যেতে পারে। সভে শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে সভে হ্রদের নিকটবর্তী উঁচু পাহাড়ের ওপর এই কেল্লাটি অবস্থিত। এই কেল্লাটি ইসলাম-পূর্ব কালের নিদর্শন।
কালের প্রবাহে সভে শহরটিও ইরানের অন্যান্য শহরের মতো বহু চড়াই-উৎরাই দেখেছে। হিজরী ৬১৭ সালে সভে শহরটি মোগলদের হামলার শিকার হয়। মোগলরা তখন সভে শহরটিকে পুড়িয়ে এবং গুঁড়িয়ে একেবারে বিরান করে দিয়েছিল। আর এখানকার অধিকাংশ অধিবাসীকেই মেরে ফেলেছিল। ইতিহাসবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী মোগলদের হামলার সময় পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাগার এই সভে শহরে ছিল। এই গ্রন্থাগারে এ্যাস্ট্রোলেইব বা গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ণায়ক যন্ত্র , গ্লোব বা গোলকসহ তৎকালীন আরো বহু সরঞ্জাম ছিল। এসবই জ্যোতিবিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত। মোগলদের হামলার আগুনে সেসবই ধ্বংস হয়ে যায়। সপ্তম শতাব্দীর ইতিহাস লেখক যাকারিয়া কাজভিনী মোগল-আক্রমণপূর্ব সভে শহর সম্পর্কে এক বর্ণনায় লিখেছেন্তবৃক্ষরাজি আর বিচিত্র ফল-ফলাদিপূর্ণ সুন্দর একটি শহর হলো সভে। সভের লোকজন মিউজিক সচেতন। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান সভে শহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন সভে শহরের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে। সাফাভি আমলে এই শহরটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল।
ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ শহর প্রাচীন নিদর্শনবহুল হবে-এটাই স্বাভাবিক। এখানে তাই প্রাচীন বহু স্থাপনা ও মূল্যবান নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরাইখানা ,বাজার , পবিত্র স্থান সমূহ , বাণিজ্যিক পথ , প্রাচীন টিলাসহ ২২৮টি মূল্যবান নিদর্শন এখানে রয়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে ৫৩টি নিদর্শনকে ইরানের জাতীয় শিল্প নিদর্শনের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এখানকার ঐতিহাসিক ও মূল্যবান নিদর্শনগুলোর মধ্যে জামে মসজিদ এবং এই মসজিদের মিনার , আশমুঈল নবীর সমাধি , সারখাদে পুল ,দোখতার কেল্লা ,ইমামযাদা সাইয়্যেদ ইসহাকের মাযার , বাগে শায়খ সরাইখানা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
সভে জামে মসজিদটি ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি নিদর্শন। স্থাপত্যশিল্প , ডিজাইন , টাইলসের কাজ , প্লাস্টারিং ডিজাইন প্রভৃতির দিক থেকে এই মসজিদটির আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। ২৫০০ বর্গমিটার জায়গার ওপর এর ফাউন্ডেশান বা ভিত স্থাপিত। মসজিদটির রয়েছে ২০ টি শাবেস্থান , পাঁচটা মেহরাব , ১২টি বারান্দা। সবমিলিয়ে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটির আয়তন হলো পাঁচ হেক্টর। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মসজিদটি ইসলামী যুগের স্থাপত্য শিল্পের উল্লেখযোগ্য একটি নিদর্শন। সুন্দর এই মসজিদটি সালজুকি , সাফাভি এবং কাজারী যুগে সংস্কার বা মেরামত করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে এবং চার দেয়ালের বাইরে ইটের তৈরী বেশ উঁচু একটি মিনার রয়েছে। এই মিনারটি সালজুকি আমলে তৈরী করা হয়েছিল। মিনারটির নিচের অংশ অনাড়ম্বর , আর উপরের অংশে ইট দিয়ে বিচিত্র কারুকাজ করা হয়েছে। এসব কারুকাজের মধ্যে কুফি অক্ষরের লিপিকর্মও রয়েছে।
সভে শহরের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে ইমামযাদা অর্থাৎ নবী করীম ( সা ) এর বংশধর সুলতান সাইয়্যেদ ইসহাকের মাযার। মাযার স্থাপনাটি অনেকটা টাওয়ার আকৃতির। সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে সালজুকিদের সময় মাযারের ডিজাইনটি ছিল ঘরের মতো। পরে সাফাভি আমলে মাযারের গম্বুযে বেশ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। স্থাপত্যটির গুরুত্ব এইজন্যে যে , এর ওপরে ইট এবং ফিরোযা রঙের টাইলসের কারুকাজ। এক খণ্ড টাইলসের ওপর তারিখ লেখা রয়েছে ৬৭৬ হিজরী। এই স্থাপনাটিতে প্লাস্টারিং ডিজাইন এবং টাইলস দিয়ে সাজানো একটি মেহরাবও রয়েছে। সমাধিটির মাঝখানে ঘুলঘুলি বা জালির মতো কাঠের তৈরী একটা যারীহ রয়েছে। যারীহ হলো কবরের ওপরে সিন্দুকের মতো ছোট্ট ঘর। ঐ ঘরের ভেতরেই রয়েছে ইমামযাদার মূল কবর।
ঐতিহাসিক এইসব নিদর্শন ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচিত্র লীলা। যেমন রয়েছে ঝর্ণাধারা , নদীমালা , গুহা , প্রাকৃতিক হিমাগার ইত্যাদি। এগুলো আপনাদের মুগ্ধ করবে নিশ্চয়ই। যাই হোক , সভে অঞ্চলের লোকজন ফার্সি ভাষায় তবে স্থানীয় ভঙ্গিতে কথা বলে। এখানে আনার এবং শুষ্ক ডুমুর প্রচুর পাওয়া যায়। সভে'র আনার বিভিন্ন স্থানে রপ্তানী করা হয়। এখানকার হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে গালিচা , গেলিম বা পশমি কার্পেট , জাজিম ইত্যাদি।


( ১৩২ তম পর্ব )


পাঠক! আমরা এরিমধ্যে মারকাযী প্রদেশের বেশ কিছু এলাকায় বেড়ালাম৷ এলাকাটি ভালোই লেগেছে আশা করি ৷ আজ আমরা এই প্রদেশের আরাক শহরের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব৷ আরাক শহরটিও বেশ সুন্দর এবং উন্নত৷ এই শহরের ছোট্ট একটা ইতিহাস আছে৷ প্রথমেই চলুন , ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷
আরাক শহরটির আয়তন প্রায় ৬১৪৭ বর্গ কিলোমিটার৷ শহরটির উত্তরে রয়েছে হামেদান এবং সভে ,দক্ষিণে সারবান্দ , পূর্বে অশতিয়ান , মাহাল্লত এবং খোমেইন ,আর পশ্চিমে রয়েছে হামেদান ও মোলায়ের৷ কেন্দ্রিয় আরাক শহরটি মারকাযী প্রদেশেরও মূল কেন্দ্র৷সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শহরটির উচ্চতা ১৮০০ মিটার৷ কেন্দ্রীয় এলাকা হবার কারণে এবং এর আশেপাশের এলাকা বেশ উর্বর হবার কারণে এখানে ১২২৭ হিজরীতে ফতেহ আলী শাহ কাজারের সময় ইরানের সেনানিবাস গড়ে তোলা হয়েছিল৷ তখন এই এলাকার নাম ছিল 'সুলতানাবাদ'৷ ১২৭২ হিজরীতে শহরটির বেশ উন্নয়ন ঘটে৷ বিভিন্ন ব্যবসায়ী , পেশাজীবীগণ তখন এই শহর কেন্দ্রিক হয়ে ওঠেন৷ এভাবেই চতুর্দশ হিজরীর শুরুর দিকে 'আরাক' ইরানের একটি সমৃদ্ধ শহরে পরিণত হয়৷ দেশী-বিদেশী বহু বাণিজ্যিক সংস্থা বা কোম্পানী তখন এই শহর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে৷ অবশেষে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এই শহরটির নাম পরিবর্তন করে 'আরাক' রাখা হয়৷
এখানকার আবহাওয়া মোটামুটি মধ্য ইরানের আবহাওয়ার মতোই ৷ শীতকালটা দীর্ঘ এবং আর্দ্র আর গ্রীষ্মকালটা শুষ্ক এবং সংক্ষিপ্ত ৷ বলা হয়ে থাকে যে , পর্বত , মরুভূমি , হ্রদ প্রভৃতি আরাকের আশেপাশে থাকার কারণে এখানকার আবহাওয়ায় তাদের প্রভাব পড়েছে , তাই এই অঞ্চলের আবহাওয়া স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে৷ আরাক অবশ্য শুষ্ক এবং এখানে স্বল্পমাত্রার বৃষ্টিপাত হয়৷ এই বৃষ্টি বরফ আকারে বর্ষিত হয় মাটিতে৷ তবে উঁচুতে যে বরফ জমে ,তা বসন্ত এবং গ্রীষ্মের সময় গলে গলে ঝর্ণাধারায় পরিণত হয় ৷ বহু ঝর্ণাধারা তৈরী হয় তখন৷ এইসব ঝর্ণাধারার ফলে আরাকের আশেপাশে অসংখ্য নদীর সৃষ্টি হয়েছে৷ আরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পশ্চিম দিকে অবস্থিত নদীগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো তাভনদাশ্ত রুদ , কুহরুদ এবং সরুক ৷
আরাকের পূর্বাঞ্চলে 'হাফথদ কেল্লে' বা সত্তুর চূড়া নামের অঞ্চলটি অবস্থিত৷ এটি মারকাযী প্রদেশের সংরক্ষিত এলাকাগুলোর একটি৷ এর আয়তন হলো ৮৩ হাজার ১৩৫ হেক্টর৷ হাফথদ কোল্লে অঞ্চলে জঙ্গল থাকায় এখানে বাস করে বিচিত্র প্রজাতির জীবজন্তু৷ তাই শিকারের জন্যে ইরানের উপযুক্ত স্থানগুলোর অন্যতম একটি স্থানে পরিণত হয়েছে এটি৷ কাজার শাসনামলে 'চেশমে চাকবে'র পাশে যে শিলালিপী স্থাপন করা হয়েছে , তা থেকে বোঝা যায় যে ,অনেক প্রাচীনকাল থেকেই গাছ-গাছালীপূর্ণ এই এলাকাটি ছিল যথেষ্ট সুন্দর এবং এটি ছিল শিকারের জন্যে নির্ধারিত একটি স্থান৷ হাফথদ কোল্লে এলাকায় অন্তত দুই শ' প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে৷ আরো রয়েছে দেশী-বিদেশী বহু জাতের পাখি৷ তিতির , বিচিত্র জাতের কবুতর , শকুন ছাড়াও অতিথি পাখির বসবাস রয়েছে এখানে৷ এছাড়াও রয়েছে বুনো মেষ ,বুনো ছাগল এবং বিচিত্র প্রজাতির হরিণ৷
আরাক শহরে রয়েছে বিচিত্র ধরনের প্রচুর শিল্প-কল-কারখানা৷ স্টিল বা ধাতব শিল্প , রাসায়নিক শিল্প , তাঁত শিল্প , স্থাপত্য ও নির্মাণ শিল্প , খাদ্য শিল্প প্রভৃতির উপস্থিতির কারণে আরাক শহরটি ভৌগোলিক দিক থেকে এমনিতেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ , তদুপরি যোগাযোগের চমত্কাতর ব্যবস্থা থাকার কারণে আরাক শহরটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে৷ বিগত তিন দশকে এই শহরটির উন্নতি বেশ চোখে পড়ার মতো৷ আরাক শহরটি গড়ে ওঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এতোটা গুরুত্ব পাবার আরো কারণ হলো এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও শিল্পনিদর্শনগুলো৷ যেমন এখানে রয়েছে আরাক বাজার কমপ্লেক্স , হযরত ইমাম মাদ্রাসা , চহর ফাস্ল্ হাম্মাম , ইমামযাদা হোসাইনের মাযার , পীর মুরাদাবাদের সমাধি ইত্যাদি৷
কাজাকস্তান টেলিভিশনের এক নম্বর চ্যানেল থেকে একটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রচার করা হয়েছিল ৷ ত্রিশ মিনিট দীর্ঘ ঐ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি ছিল ইরানের দর্শনীয় স্থানগুলোর ওপর ৷ ঐ ফিল্মটির নির্মাতা বলেছেন , ইরান হলো একটা ক্ষুদ্র বিশ্ব , যেখানে পৃথিবীর সবকিছুই দেখতে পাওয়া যায় ৷ ঐ টিভি চ্যানেলটি থেকে আরো বলা হয়েছে যে , ইরান প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি দেশ ৷ এখানে দর্শনীয় প্রাকৃতিক বহু নিদর্শন রয়েছে৷ ইরানের জনগণও যথেষ্ট অতিথি পরায়ন ও বন্ধুবত্স ল৷ চ্যানেলটি তাদের দর্শকদের জন্যে ইরানের বেশ কিছু দর্শনীয় স্থানের ওপর সচিত্র প্রতিবেদনও প্রচার করেছে৷ কাস্পিয়ানের উপকূল , তেহরান , মাশহাদ , ইস্ফাহান ,কোমসহ ইরানের বড়ো বড়ো কয়েকটি শহরের চিত্রও তুলে ধরেছে ৷ ইস্ফাহান এবং শিরাযের ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনা ও ভবনের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে ৷


( ১৩৩ তম পর্ব )


পাঠক! মধ্য ইরানের মারকাযী প্রদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা। এরিমধ্যে আপনারা এই প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান , ঐকিহাসিক বহু স্থাপনার সাথে পরিচিত হয়েছেন। বিশেষ করে আরাক শহরের বিভিন্ন নিদর্শনও দেখেছেন আপনারা। তারি ধারাবাহিকতায় আজ আমরা দেখবো ঐতিহাসিক আরাক বাজার কমপ্লেক্স , চহর ফাস্‌ল্‌ হাম্মাম , ঐতিহাসিক সেপাহদর মাদ্রাসা , পীর মুরাদাবাদের মাযার প্রভৃতি। তারমানে অনেক জায়গায় যেতে হবে আজ। তাই চলুন , কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে যাওয়া যাক স্পটগুলোতে। প্রথমেই দেখা যাক ঐতিহাসিক আরাক বাজার কমপ্লেক্স।
ঐতিহাসিক আরাক বাজার কমপ্লেক্সটি হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিককার স্থাপত্য শিল্পের একটি নিদর্শন। বাজারটি বেশ সুশৃঙ্খল। বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভাগ , আবাসিক বিভাগ আলাদা আলাদাভাবে স্থাপিত। এছাড়া এখানে জনকল্যাণমূলক বা নাগরিক সেবামূলক ব্যবস্থাও বেশ উন্নত। যেমন এখানে রয়েছে মসজিদ , রয়েছে হাম্মাম , জলাধার এবং মাদ্রাসা। আরাক বাজারটির ডিজাইন ক্রস বা যোগ চিহ্ণের মতো , অর্থাৎ বাজারের দুটি সারি একটি অপরটিকে অতিক্রম করে গেছে। তো মূল যে ক্রসিং পয়েন্ট অর্থাৎ একটি সারি আরেকটি সারির সাথে যে কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে মিলেছে ,তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চহর-সূ' বা চতুর্মুখী। বাজারের সারিগুলো একেকটা লম্বায় ৮৮০ মিটার এবং প্রসে' ৫ মিটার। চহর সূ বা দুটি সারির মিলনকেন্দ্রটি বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চমৎকার একটা পরিবেশ তৈরী হয়েছে সেখানে।
এই বাজার নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থাপত্যকলার একটা মৌলিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ঐ পদ্ধতি বা কৌশলের কারণে বাজারের ভেতর আলো-বাতাসের অবাধ ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। ইট-কাঠের ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারের আভ্যন্তরীণ কাঠামোয় যেরকম সুন্দর সজ্জা করা হয়েছে , তা ও দেখার মতো। প্রাচীনকাল থেকেই আরাক বাজারটি ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত। আজো তার এই খ্যাতি অক্ষুন্ন রয়েছে। বাণিজ্যিক লেন্তদেনের কারণে এই বাজারটি যে শহরের অর্থনীতিতে ব্যঅপক ভূমিকা বা প্রভাব ফেলবে-এতে আর সন্দেহ কী ! ইরানের অন্যান্য বাজারের মতো আরাক বাজারটিরও একেকটি বিভাগে একেক রকম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বাণিজ্যিক তৎপরতা চলছে। কার্পেটের ব্যবসা এবং কার্পেটের মূল উপাদানগুলোর ব্যবসাকে এই বাজারের একটা প্রধান ব্যবসা হিসেবে মনে করা হয়।
আরাকের আরেকটি দর্শনীয় স্থাপত্য নিদর্শন হলো চহর ফাস্‌ল্‌ হাম্মাম। এই হাম্মামটি ইরানের ঐতিহাসিক ও জাতীয় নিদর্শনের তালিকাভুক্ত। চহর ফাস্‌ল নামকরণের একটা কারণ আছে। কারণটা অবশ্য হাম্মামের নকশার সাথে সম্পর্কিত। হাম্মামের চার কোণায় চার ঋতুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চারটি নকশা করা হয়েছে। ফার্সি ভাষায় ঋতুকে বলা হয় ফাস্‌ল। চার ঋতুর নকশা হবার কারণে চহর ফাস্‌ল নামকরণ করা হয়েছে। ইরানের প্রাচীন হাম্মামগুলোর স্থাপত্য কাঠামো বেশ সুন্দর। হাম্মামে প্রবেশ করার দরোজা পেরুলেই চমৎকার একটি পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। এখানে জামা-কাপড় বা অন্যান্য জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয়। এই অঞ্চলটি সাধারণত সুন্দর সুন্দর টাইলস দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে। চহর ফাস্‌ল হাম্মামটির ভেতরেও জামা-কাপড় রাখার এই স্থানটি সাত রঙের টাইলস দিয়ে সাজানো হয়েছে। হাম্মামের মূল যে গম্বুজটি আটটি পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়েছে ,তাও ফুলের ডিজাইনযুক্ত টাইলস দিয়ে সাজানো হয়েছে।
সেপাহদর মাদ্রাসাটিও কাজারী শাসনামলের ঐতিহাসিক আরেকটি নিদর্শন। আরাক বাজার নির্মাণের সময়েই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মাদ্রাসাটি আরাক শহরের ধর্মীয় শিক্ষার সর্বপ্রথম কেন্দ্র। অসংখ্য ছাত্র দ্বীনী শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যয়ন করছে। বিভিন্ন বিষয়ে এখানে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে এলমে ফেকাহ অর্থাৎ ইসলামী আইন বা নীতিশাস্ত্র অন্যতম। এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চার সুযোগ এখানে রয়েছে। মাদ্রাসা ভবনটির যে ডিজাইন , তা সাফাভি আমলের বিভিন্ন মাদ্রাসা বা মসজিদ থেকে অনুসৃত। এখানে রয়েছে মসজিদ , রয়েছে জলাধার এবং জনসেবামূলক সকল ব্যবস্থা। মাদ্রাসার দুটি গেইট। একটি গেইট বাজারের দিকে। এই গেইটের সামনে খোলামেলা একটা আঙিনা আছে। ঐ আঙিনার মাঝখানে রয়েছে পাথর দিয়ে বাঁধাই করা একটা হাউজ।
পীরমুরাদাবাদ ঐতিহাসিক স্থাপনাটিও বেশ উল্লেখযোগ্য। এটি একটি মাযার কমপ্লেক্স। এই স্থাপনাটি সালজুক শাসনামলের। আরাক শহরের চৌদ্দ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত মুরাদাবাদ গ্রামে পড়েছে এটি। সালজুকি শাসনামলের অন্যান্য স্থাপনার মতো এই স্থাপনাটিও কয়েকমুখি। মূল কবরের উপরে গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। গম্বুজ এবং স্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের যে ডিজাইন করা হয়েছে , তাতে ইটের ব্যবহার লক্ষণীয়।
আরাকের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সাথে মোটামুটি পরিচিত হলাম আমরা। এবার চলুন মারকাযী প্রদেশের হস্তশিল্প সম্পর্কে খানিকটা কথা বলা যাক। এখানকার হস্তশিল্প সামগ্রীর মধ্যে কার্পেট খুবই নামকরা। গালিচা বা কার্পেট বোণার দিক থেকে ইরানের শ্রেষ্ঠ চারটি কেন্দ্রের মধ্যে আরাক একটি। যদিও একানকার গালিচা বোণার ইতিহাস এক শতাব্দীকালের বেশী নয় , তারপরও আরাক এই অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক খ্যাতি কুড়িয়েছে। কাজারী শাসনামলেই আরাকে কার্পেট বোণার কাজ শুরু হয়ে উন্নয়নের মুখ দেখতে থাকে। ইরানের অন্যান্য শহরের তুলনায় আরাক বেশ দ্রুততার সাথে অগ্রগতি লাভ করে। আরাকে তিন শ্রেণীর কার্পেট উৎপাদিত হয়। এগুলো হলো মেশকাবাদ কার্পেট , মাহল কার্পেট এবং সরুক কার্পেট। এগুলোর মধ্যে সরুক কার্পেটই সবচে উন্নত ও আকর্ষণীয়। সরুক একটি গ্রামের নাম। গ্রামটি আরাক থেকে ৩৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। গ্রামের নাম অনুসারেই কার্পেটটি পরিচিতি পেয়েছে। হামদুল্লাহ মোস্তওফি এবং ইয়াকুত হামাভি'র মতো পর্যটকগণ ১২ এবং ১৩ শতাব্দীতে এই সরুকের কথা তাঁদের ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন। বর্তমানে কার্পেটের কারণে এই গ্রামটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত।


( ১৩৪ তম পর্ব )


ইরানের মধ্য অঞ্চলে মারকাযি প্রদেশটি অবস্থিত। বিগত কয়েকটি আসরে আমরা এখানকার বেশ কিছু এলাকার সাথে পরিচিত হয়েছি। আজো আমরা এখানকার একটি এলাকায় বেড়াবো। এই এলাকাটির নাম হলো তাফরেশ। তাফরেশের বিস্তারিত পরিচয় আমরা ধীরে ধীরে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো।
ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর এবং পর্বতগুচ্ছের মাঝে মারকাযি প্রদেশের তাফরেশ নামক এলাকাটি অবস্থিত। এর আয়তন তিন হাজার সাত শ' বর্গকিলোমিটার। আর শহরটির উচ্চতা হলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উনিশ শ' মিটার। ‘অবকামার' নদীবাহিত এলাকায় পড়েছে তাফরেশ শহরটি। কৃষিকাজের জন্যে এলাকাটি বেশ সমৃদ্ধ। এখানকার আবহাওয়া পার্বত্য নাতিশীতোষ্ণ। শীত ঋতুতে বেশ ঠাণ্ডা এবং বরফ পড়ে আর গ্রীষ্মের সময় আবহাওয়া থাকে কোমল ও উপভোগ্য। এখানকার সর্বোচ্চ চূড়াটির নাম হলো ‘বান্দার'। বান্দার চূড়ার উচ্চতা তিন হাজার এক শ' বাইশ মিটার।
আগেই বলেছি যে, উঁচু উঁচু পর্বত ঘেরা শহর তাফরেশ। এটি বেশ প্রাচীন একটি অঞ্চল। মাদ্দ্‌ গোত্রের বসবাসের প্রাথমিক এলাকাগুলোর একটি হলো তাফরেশ। মাদ্দ্‌ রাজবংশের ধারা যখন সমগ্র ইরানে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন তাদের একটি অংশ এই তাফরেশকেই বসবাসের জন্যে বেছে নিয়েছিল। প্রাচীন ইতিহাসবিদগণ এই এলাকার আশেপাশে আরো অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা এমনও বলেছেন যে এই এলাকার নিকটবর্তী ‘তারখুরান' অঞ্চলে ইরানের সবচে দ্রুতগামী ঘোড়া লালন্তপালন করা হতো। কোবা'দিয়নী রাজবংশের প্রসিদ্ধ বাদশা কেইখসরু তাঁর সিপাহীদের জন্যে এই এলাকার ঘোড়াই নির্বাচন করেছিলেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে এই বিশেষত্ব ছাড়াও এই এলাকাটি আরো একটি কারণে বিখ্যাত। তা হলো প্রাচীনকাল থেকেই এই এলাকাটি ছিল জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের লালনকেন্দ্র। আলেম-ওলামা ,শিল্পীসহ বহু মহান ব্যক্তিত্ব এখান থেকেই তৈরী হয়েছে। ফতেহ আলী শাহ'র সময়কার বিখ্যাত সাহিত্যিক কায়েম মাকম ফারাহানী , ইরানের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মির্যা তকী খান , বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক হাকিম নিজামী , বিখ্যাত ফকীহ ও মুজতাহিদ সাইয়্যেদ আলী আকবর তাফরেশী , ইরানে মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার স্থপতি আবুল কাসেম সাহব , বিখ্যাত পদার্থবিদ ও গবেষক ডঃ মাহমুদ হেসাবির মতো আরো বহু মনীষীর সৃষ্টি এখানেই হয়েছে।
ডঃ মাহমুদ হেসাবির কথা এইমাত্র বললাম আমরা। তাঁর মাযারটি তাফরেশেই অবস্থিত। মাযারটি এই অঞ্চলের মধ্যে দর্শনীয় একটি স্থাপনা। তাই চলুন ইরানী এই মহান ব্যক্তিত্বের সাথে সংক্ষেপে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। ডঃ মাহমুদ হেসাবি ১২৮১ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি তাঁর মায়ের কাছে কোরআন শেখেন। এরপর তিনি কবিতা বা সাহিত্য ভালবাসতে শুরু করেন। ফেরদৌসী ,হাফেজ এবং সাদীর মতো বিখ্যাত কবিদের কবিতা মুখস' করেন। সতেরো বছর বয়সে তিনি বৈরুতে আমেরিকার একটি ভার্সিটির ফ্যাকাল্টি থেকে সাহিত্যে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এর পরের বছর তিনি জীববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর রোড এ্যান্ড বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি ফ্রান্সের সুরবাঁ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। তিনি একই সময়ে চিকিৎসাবিদ্যা , গণিত , জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদিতেও পড়ালেখা করেন। এমনকি ইরানী এবং পশ্চিমা মিউজিকের সাথেও তিনি পরিচিতি লাভ করেন। মিউজিকের সাথে পরিচয় লাভ করা নিঃসন্দেহে তাঁর রসিক মনের পরিচয় বহন করে।
প্রফেসর হেসাবি তাঁর কর্মবহুল জীবনে জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করেছিলেন। তাঁর লেখা গবেষণামূলক প্রবন্ধ নিয়ে পঁচিশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পদক ‘দুলা লেজিউন দুনুর' লাভ করেন। প্রফেসর হেসাবি একমাত্র ইরানী ব্যক্তিত্ব যিনি প্রফেসর আইনস্টাইনের ছাত্র ছিলেন। খ্রিষ্টিয় ১৯৯০ সালে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সমপ্রদায়ের পক্ষ থেকে তাঁকে বছরের শ্রেষ্ঠ গুণীন হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮৭ সালে ইরানে তাঁকে পদার্থ বিজ্ঞানের জনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর শেষ উপদেশ বা ওসিয়্যত অনুযায়ী তাফরেশে তাঁর পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
ইরানের বিখ্যাত মনীষী ডঃ হেসাবি সম্পর্কে খানিকটা জানা হলো। এবার চলুন তাফরেশের ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশ থব মসজিদ , ইমামযাদা মুহাম্মাদের মাযার , আবুল আলীর সমাধি , গেরাব খনিজ জলের ধারাসহ আরো বহু স্থাপনা। এই শহরের আশেপাশেও অনেকগুলো অবকাশযাপন কেন্দ্র আছে। এইসব কেন্দ্রে রয়েছে সবুজ গাছ-গাছালি আর সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান। এছাড়া তাফরেশ থেকে কারিয়ান নদীর দিকে যাবার পথে বেশ কিছু গুহা আপনাকে আকৃষ্ট করবে। সেইসাথে আরো রয়েছে সবুজ প্রকৃতিময় বিসতৃত অঞ্চল। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের কারণেই এখানে ভ্রমণ রসিকদের ভিড় সবসময় লেগে থাকে।


( ১৩৫ তম পর্ব )


পাঠক! গত কয়েকটি আসরে আমরা ইরানের মারকাযি প্রদেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় বেড়ালাম। আজ আমরা যাবো এই প্রদেশেরই মাহাল্লত শহরে। এই শহরটি ইরানের ‘গুলখানা' নামে বিখ্যাত। গুল মানে ফুল আর খানা মানে ঘর। তারমানে যেখানে নানান রকমের এবং বেশি বেশি ফুল পাওয়া যায় , সেখানটাকেই এই নামে অভিহিত করা যায়। নামকরণ থেকেই বোঝা যায় যে,মাহাল্লত একটি ফুলের শহর , ফুলেল শহর। চলুন এই বাগানে সরাসরি চলে যাওয়া যাক।
মাহাল্লত অঞ্চলটির আয়তন ২১৩৩ বর্গকিলোমিটার। এটি মারকাযি প্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। মাহাল্লতের উত্তরে রয়েছে কোম , অশ্‌তিয়ন এবং দেলিযন। দক্ষিণে রয়েছে খোমেইন এবং গুলপয়গন। পূর্বে রয়েছে দেলিযন এবং পশ্চিমে রয়েছে আরাক ও খোমেইন। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম এবং শীতে বেশ ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। এখানকার সবচে উঁচু পর্বত চূড়াটির নাম ‘হাফ্‌থদ গোল্লে'। এই চূড়াটির উচ্চতা হলো দুই হাজার সাত শ' বত্রিশ মিটার। মাহাল্লতের কেন্দ্রিয় শহরটি মাহাল্লত শহর নামেই পরিচিত। মূল শহরটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আঠারো শ' মিটার।

যে দিকটির কারণে এখানে শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে , তাহলো এখানে আছে পানি আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক ঝর্ণা। শহরের উত্তরাংশে এই সৌন্দর্য পরিলক্ষিত হবে কারণ সেখানেই এগুলোর উৎসস্থল। উৎসস্থলে পানির প্রাচুর্য এমন যে দেখতে অনেকটা ছোট্ট একটি নদীর মতো। মাহাল্লতের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এই ঝর্ণার পানি অনবরত পড়তে থাকে ,দেখতে কেমন লাগবে একবার একটু ভেবে দেখুন। ঝর্ণা নির্গত জলের ধারা শহরের নীচু এলাকা দিয়ে , প্রাচীন চুনার বৃক্ষদের গোড়া ভিজিয়ে দিয়ে এবং মাহাল্লতের নিজস্ব বিশেষ স্থাপত্যের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে একটা চমৎকার আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।
আবহাওয়াগত আনুকূল্যের কারণে এখানে ফুল চাষ হয় প্রচুর। বিচিত্র রং ও জাতের ফুলে এখানকার চেহারাটাই মোহনীয় হয়ে ওঠে। ফুল কার না ভালো লাগে বলুন। আর সেসব ফুল যদি হয় সুগন্ধিপূর্ণ ,তাহলে তো কথাই নেই। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ফুটন্ত ফুলের ঘ্রাণ যদি বাতাসের দোলায় দুলতে দুলতে সমগ্র এলাকাবাসীর নাকে গিয়ে পৌঁছায় তাহলে কেমন লাগবে। মৌ মৌ করবে না চারদিক ! হ্যাঁ , মাহাল্লতের অবস্থা সত্যিই তাই। সেজন্যেই মাহাল্লতকে বলা হয় ইরানের ফুল লালন কেন্দ্র। ফুলের লালন ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে এখানে আট শ' হেক্টর এলাকা জুড়ে একটি গ্রাম তৈরী করা হয়েছে। ফুলের জন্যে ইরানের প্রথম গ্রাম এটি। এখানে ফুলের ওপর লেখাপড়া করা , গবেষণা করার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যেমন রয়েছে , তেমনি রয়েছে ফুল সংরক্ষণের জন্যে হিমাগার এবং ফুল রপ্তানীর জন্যে প্যাকিং করার সকল সরঞ্জাম। বর্তমানে মাহাল্লতের শতকরা চল্লিশ ভাগ জনগণ ফুল উৎপাদন ও লালনকার্যে নিয়োজিত। ফুল চাষের পেশায় নিয়োজিতদের বেশিরভাগই যুবক শ্রেণীর।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখানকার নয় শ' হেক্টর জায়গাজুড়ে কাঁচ নির্মিত বা প্লাস্টিক নির্মিত ফুলঘরে বছরে কমপক্ষে ২০৮ রকমের ফুলের চাষ হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাসায় বা অফিস্তআদালতে রাখার মতো ফুল , লতানো ফুল এবং স্টিক বা শাখাজাতীয় ফুল। এখানকার ফুলের বেশিরভাগই পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলীয় দেশগুলো এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে রপ্তানী হয়। ফুলের সাথে সাথে ফুলদানীও যে রপ্তানী হবে তাতো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না। বছরে কয়েক লাখ ফুলদানী এবং কয়েক মিলিয়ন ফুলের শাখা মাহাল্লত থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয়।
মাহাল্লত যে কেবল ফুলের জন্যেই বিখ্যাত তা কিন্তু নয় , বরং এখানে ফুল ছাড়াও রয়েছে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন। এসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে খুরহে'র প্রাচীন উপাসনালয়,মাহাল্লত জামে মসজিদ ,ইমামযাদা ফায্‌ল্‌ ও ইমামযাদা ইয়াহিয়ার মাযার , গরম পানির ঝর্ণা এবং অসংখ্য গুহা। এইসব নিদর্শন মাহাল্লতকে আলাদা একটা বিশেষত্ব দান করেছে। আজকের আসরের বাকি অংশে আমরা এখানকার নিদর্শনগুলোর কয়েকটির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো। প্রথমেই আসা যাক খুরহে গ্রাম প্রসঙ্গে।
মাহাল্লত শহর থেকে ৩৬ কিলোমিটার এবং আরাক শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার উত্তরে খুরহে গ্রামটি অবস্থিত। এই গ্রামটিকে আলাদা বিশেষত্ব দান করেছে যে বিষয়টি তাহলো এখানকার সোলুকি উপাসনালয়। এখনো ঐতিহাসিক এই উপাসনালয়টির পিলারগুলো অবশিষ্ট আছে। ইতিহাসের ভাষ্য অনুযায়ী এই উপাসনালয়টি সোলুকি এবং আশকানী যুগের বিরল নিদর্শনগুলোর একটি। ‘পার্ত ও সাসানী যুগে ইরানী শিল্প' শীর্ষক গ্রন্থে পশ্চিমা গবেষক রুমান গিয়ার্সম্যান লিখেছেন,খুরহে উপাসনালয়ের স্মৃতিবহ যে পিলারগুলো এখনো দেখতে পাওয়া যায় , সেগুলো অনেকটা গ্রিক স্থাপত্যকলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সেই প্রাচীনকালে ইরানী শিল্প যে কতোটা উন্নত ছিল ,এই স্থাপত্য নিদর্শনটি তার প্রমাণ বহন করে।
খুরহে প্রার্থনালয়ের পূর্বভাগে রাসূলে খোদার বংশধর ইমামযাদা ফায্‌ল এবং ইমামযাদা ইয়াহিয়ার মাযার অবস্থিত। এই দুটো মাযার মাহাল্লত শহরের অন্যতম আকর্ষণ এবং পবিত্র ও মূল্যবান ঐতিহাসিক স্থান। এই মাযারের বিশাল আঙ্গিনা রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য ঝুলবারান্দা এবং মোগল আমলের শিল্পশৈলীতে নির্মিত প্লাস্টারিং কাজের মূল্যবান ও নয়নাভিরাম মেহরাব। মাযারের ভেতরে কোরআনের আয়াতের সুসজ্জিত লতানো ফুলেল বিন্যাস সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
খনিজ জলের অসংখ্য ঝর্ণা এবং প্রাকৃতিক গরম জল মাহাল্লত শহরের আরেকটি প্রধান আকর্ষণ। মাহাল্লত থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে গেলে আপনার নজরে পড়বে পাথর , মাটির অবস্থা এবং রঙের ভিন্ন রূপ। এখানে বেশ উঁচুতে লক্ষ্য করা যাবে গরম জলের ঝর্ণা। গরম পানির এই প্রাকৃতিক ঝর্ণা দেখার জন্যে এবং তা উপভোগ করার জন্যে হাজার হাজার বছর ধরে এখানে পর্যটকদের আনাগোণা অব্যাহত আছে। অবশ্য পর্যটকদের আগমনের একটা অন্যতম কারণ হলো গরম জলের উপকারী কিছু দিক। এই জলের বেশ কিছু গুণবৈশিষ্ট্য রয়েছে। স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী এই দিকগুলোর জন্যেই এখানকার হাম্মামগুলোতে ভিড় লেগে থাকে। সাধারণত উর্দিবেহেশ্‌ত মাসে অর্থাৎ এপ্রিল-মে'র দিকেই পর্যটকদের আনাগোণা বেড়ে যায় এখানে।


( ১৩৬ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরানের কেন্দ্রে অবস্থিত মারকাযি প্রদেশ সফরে আছি আমরা। এরিমধ্যে বেশ কয়েকটি শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। আশা করি আপনাদের ভালোই লেগেছে। আজো আমরা এখানকার নতুন দুটি অঞ্চলের দিকে যাবো। এই শহরাঞ্চল দুটির নাম হলো ‘খোমেইন' এবং ‘দেলিজন'। খোমেইন শহরটির নাম বোধ হয় সচেতন ব্যক্তিমাত্রই শুনে থাকবেন। কারণ ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান স্থপতির নামের সাথে জড়িয়ে আছে মহান এই শহরটিও। ইমাম খোমেনীর কথা কে না শুনেছে বলুন। এই সেই ঐতিহাসিক শহর ,যার নামের শেষে ‘ই' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে মরহুম ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ ( রহ ) কে দিয়েছে ‘খোমেনী' পরিচিতি। বিশ্বব্যাপী তিনি আজ ইমাম খোমেনী হিসেবেই পরিচিত। তাঁর আসল নাম খোমেনীর মতো ততোটা সুপরিচিত নয় অনেকের কাছেই। যাই হোক ঐতিহাসিক এই শহর এবং দেলিজন নিয়ে আমরা আজ কথা বলবো।
প্রথমেই আমরা খোমেইন অঞ্চলের দিকে যাবো। হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত শহর এই খোমেইন। এখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বলেই খোমেইন শহরটি আজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের পদচারণায় মুখর। একবুক আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে মানুষ দেখতে আসে- কোন্ সেই পবিত্র ও রত্মগর্ভা সতেজ ভূমি-যার কোলে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছেন একালের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
খোমেইন অঞ্চলটির আয়তন দুই হাজার পঁচিশ বর্গ কিলোমিটার। খোমেইনের উত্তরে রয়েছে মাহাল্লত এবং আরাক , পূর্বে রয়েছে মাহাল্লতের একটি অংশ এবং গুলপয়গন আর দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে লোরেস্তান। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ঋতুভেদে পরিবর্তমান। শীত ঋতুতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা থাকে এখানে , আর গ্রীষ্মের সময় আবহাওয়া থাকে মোটামুটি নাতিশীতোষ্ণ। এখানকার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে খোদসাঙ্গ পাহাড় , দেজ পাহাড় , শেনী পাহাড় এবং হাফ্ত সাভা'রন পাহাড় । খোমেইনের অর্থনীতির প্রধান দুটি ভিত্তি হলো পশুপালন এবং কৃষিকাজ। এখানকার উল্লেখযোগ্য কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে আলু , পেঁয়াজ , লুবিয়া , গম এবং যব। খোমেইনবাসীদের ভাষাভঙ্গি ফার্সি এবং লারির মিশ্রিত রূপ। এখানকার উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর জন্মস্থান ও তাঁর বাড়িটির নাম করা যায়। এছাড়াও এখানে রয়েছে ইমামযাদা ইসমাঈল এবং ইমামযাদা আবুল হোসাইন আব্দুল্লাহর মাযার , রয়েছে দূর্গ এবং মুহতাশেমির ঘর ইত্যাদি।
খোমেইন অঞ্চলের মূল শহরটি খোমেইন নামেই পরিচিত। খোমেইন শহরের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮১৫ মিটার। প্রাদেশিক শহর থেকে খোমেইন শহরের দূরত্ব হলো ৬৫ কিলোমিটার। এই শহরের প্রাচীন মহল্লায় অবস্থিত ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর বাবার বাড়িটি এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। এই বাড়িটি কাজারী যুগের। তার মানে এই বাড়িটি প্রায় দুই শ' বছরের পুরোনো। প্রাচ্যের ইসলামী স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী নির্মিত বাড়িটির মূল নির্মাণ-উপকরণ হলো ইট-কাঠ এবং কাদা। এটির স্থাপত্য কাঠামোতে সরু করিডোর , বহু জটিল ভাঁজ, দক্ষিণ এবং উত্তরাংশের দুটি টাওয়ার সেই সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বিশেষ করে সেইযুগের অস্থিরতা ও যুদ্ধ বিগ্রহের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর দাদা হিজরী ১২৫৫ সাল অর্থাৎ খ্রিষ্টিয় ১৮৩৫ সালে এই বাড়িটি খরিদ করেন। ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর ভাই আয়াতুল্লাহ পাসান্দিদে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন , খোমেইনের ওপর বিদ্রোহীরা যখন হামলা চালিয়েছিল , সেই বৈরী সময়ে এই বাড়িটি ছিল নিরাশ্রিতদের আশ্রয়স্থল। আশ্রয়হীনরা এখানে এসে জড়ো হতো। নারী ও শিশুরা এই বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে তাদের আবাস সাজিয়েছিল , আর পুরুষরা টাওয়ারের ওপর থেকে দূর্গ পাহারা দিতো এবং শত্রুদের প্রতিহত করতো। ইমামের পিতা এবং দাদা উভয়েই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে জনগণের কাছে অসম্ভব শ্রদ্ধেয় ছিলেন। এই বাড়িটি এখন ইরানের প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। সারা বছর জুড়েই এখানে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে।
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মহান নেতা ইমাম খোমেনী ( রহ ) যে ঘরটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই ঘরটির পরিবেশ অত্যন্ত সাদামাটা ও অনাড়ম্বর। তাঁর শৈশব এবং কৈশোর এই সাধারণ পরিবেশের মধ্যেই কাটে। অথচ এর মধ্য থেকেই তিনি অর্জন করেছিলেন বৃহৎ এক আদর্শ , যেই আদর্শ বিশ্বের মুসলমানকে পুনরায় উজ্জীবিত করে তুলেছিল। মানবেতিহাসে যে ক'জন মহান ব্যক্তিত্ব তাদের আদর্শকে ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে বাইরেও বিস্তারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন , ইমাম খোমেনী ছিলেন তাঁদেরই একজন। ইসলামের সুস্পষ্ট শিক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতে তিনি যে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তা সমগ্র বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল।
পাঠক ! খোমেইন শহর এবং এই শহরের কালজয়ী ব্যক্তিত্ব ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর স্মৃতি বিজড়িত গৃহের সাথে আপনারা পরিচিত হলেন । আসরের এ পর্যায়ে আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো দেলিজা'নে। এই অঞ্চলটির আয়তন ১৫১৮ বর্গকিলোমিটার। দেলিজা'নের উত্তরে রয়েছে কোম , দক্ষিণে রয়েছে শাহিন শহর , পূর্বে রয়েছে কাশান এবং পশ্চিমে রয়েছে মাহাল্লত এলাকা। এই এলাকার নাম দেলিজা'ন হবার পেছনে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে যেটি বেশি গ্রহণযোগ্য তাহলো দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এই শহর অতিক্রম করেছে। আর বাণিজ্য কাফেলাসহ প্রায় সকল যাত্রীই বিশ্রাম নেওয়া বা যাত্রাবিরতির জন্যে এই শহরে থামতে। তৎকালে দুই চাকা বা চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহৃত হতো। ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দেওয়া বা ঘোড়ার গাড়ি মেরামত করার জন্যেও কাফেলা এখানে যাত্রাবিরতি করতো। সেকালে দুই চাকা বা চার চাকার ঘোড়ার গাড়িকে ‘দেলিজা'ন' নামেও অভিহিত করা হতো। সেকারণেই শহরটির নামকরণ করা ‘দেলিজা'ন'।
যেহেতু যাত্রাবিরতির জন্যে একটি উপযুক্ত স্থান ছিল এটি , সেহেতু এখানে যে থাকা-খাওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকবে কিংবা থাকবে প্রয়োজনীয় সরাইখানা , তাতো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না। এখানকার আবহাওয়া মোটামুটি শুষ্ক। খোমেইনের মতো এখানকার অর্থনীতিরও মূল ভিত্তি হলো কৃষিকাজ এবং পশুপালন। দেলিজা'নের প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে গম , যব , বিভিন্ন প্রকার দানাদার শস্য এবং বিচিত্র ফল-ফলাদি। দেলিজা'নের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে আব্বাসী সরাইখানা , নারগ বাজার , ইমামযাদা ইয়াহিয়া ও সুলাইমানের মাযার ইত্যাদি। এছাড়াও এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুহা। এগুলোর দেলিজা'নের দর্শনীয় প্রাকৃতিক নিদর্শন।


( ১৩৭ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান প্রাচীন সভ্যতার দেশ। বিশাল বিস্তৃত এই ইরান-ভূমির আশেপাশে বসবাস করতো বিভিন্ন বংশ ও গোত্র। এখানকার অধিবাসীদের সৃজনশীলতা পরিলক্ষিত হয় প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শনের মধ্যে। মানব সমাজের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হিসেবে ইরানের গুরুত্ব বিশ্ব পটভূমিতে অপরিসীম। আর সেমনান প্রদেশও এই গৌরবের অন্যতম উত্তরাধিকার। কারণ এখানেও রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার বহু নিদর্শন। পুরাতাত্ত্বিকদের গবেষণার ফলে ‘দমাগন' এবং ‘শাহরুদ' টিলাসহ এখানকার অন্যান্য ঐতিহাসিক অঞ্চল থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পাওয়া গেছে , সেসব থেকে অনুমিত হয় যে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ সহস্রাব্দে এখানে বিভিন্ন গোত্র ও বংশের লোকজন বসবাস করতো। এদিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে যে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শুরু করে কাজারী যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন যুগের বিচিত্র নিদর্শন এই সেমনানে দেখতে পাওয়া যাবে। চলুন ইরানের এই প্রাচীন প্রদেশের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক। প্রথমেই যাওয়া যাক সেমনান শহরের দিকে। আপনারা প্রস্তুত তো !
সেমনান শহরের অভ্যন্তরে রয়েছে ঐতিহাসিক বহু মূল্যবান নিদর্শন এবং এই শহরের আশেপাশে রয়েছে বেশকিছু কেল্লা। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে নিজস্ব ভূখন্ড রক্ষার তাগিদে এই শহরের লোকজন এইসব দূর্গ নির্মাণ করেছিল। এইসব কেল্লার নাম স্থানীয় নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়েছিল। তবে দুঃখজনক বিষয়টি হলো কালের পরিক্রমায় এখানকার অধিকাংশ কেল্লাই ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল সর্বপ্রথম যেই দূর্গটি নির্মিত হয়েছিল ঐ দূর্গটিই তার অস্তিত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আমরা এখানকার ‘সার্ভ' নামে পরিচিত এলাকার কেল্লাগুলোর সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
নর দশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ‘সার্ভ' নামের পার্বত্য অঞ্চলে দুটি দূর্গ আছে বেশ মজবুত ও শক্ত-সামর্থ। দূর্গ ভবনের নির্মাণকৌশল এবং এই দূর্গ নির্মাণের জন্যে ঠিক এই এলাকাটিকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। সার্ভ কৃষ্টিক্ষেত্রের দুইপাশের বেশ সুন্দর জায়গায় কেল্লাগুলো অবস্থিত। উত্তরপাশের কেল্লাটির নাম ‘ছোট সার্ভেই' , আর দক্ষিণ দিকের কেল্লাটির নাম ‘বড়ো সার্ভেই'। ছোট সার্ভেই দূর্গটির কিছু অংশ সময়ের ব্যবধানে এবং প্রাকৃতিক বৈরিতায় নষ্ট হয়ে গেছে। দক্ষিণ প্রান্তীয় বড়ো সার্ভেই দূর্গই নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় চূড়ার ওপরে। এই দূর্গটি এ্যাতো মজবুত করে বানানো হয়েছে যে,গবেষকদের দৃষ্টিতে এই বড়ো সার্ভেই পূর্ব ইরানের প্রতিরক্ষা দূর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই দূর্গ থেকে উপরের দিকে যাবার পথ বেশ দুর্গম ও ভয়াবহ। বাহ্যত কেল্লাটিকে তিনতলা বিশিষ্ট বলে মনে করা হয়। আর যেসব প্রমাণপঞ্জী পাওয়া গেছে ,তা থেকে অনুমিত হয় যে , তৃতীয় তলায় বসবাস করতো প্রতিরক্ষাকারী সেনা এবং কেল্লার উর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গরা। এই দূর্গের আকর্ষণীয় দিকটি হলো ঝর্ণার জল কেল্লার ওপরে স্থানান্তর বা সরবরাহের ব্যবস্থা। ঝর্ণাটির জল কেল্লা থেকে প্রায় এক শ' মিটার নীচুতে প্রবহমান। স্থানীয় পদ্ধতিতে এই জলকে কেল্লার ওপরে নিয়ে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দূর্গের চার কোণেও আকর্ষণীয় সুন্দর টাওয়ার বানানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্যে এগুলো বেশ আনন্দময় ও উপভোগ্য।
সার্ভ কেল্লাগুলো তৈরির ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এগুলো পিশদাদীয়ান এবং কিয়ানী রাজবংশের সময় নির্মিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে, এই কেল্লাগুলো যুগের পর যুগ ধরে বিভিন্ন গোত্রের লোকজন ব্যবহার করেছে। তাবারিস্তানের এস্ফাহবেদান এবং আশকানিয়ান আধিপত্যবাদীদের সময় এই কেল্লাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিগণিত ছিল। এমনকি ইসলামী যুগের পরেও ইসমাঈলী ফের্কার অনুসারীদের জন্যে সার্ভ কেল্লাগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তারা প্রায় দুই শতাব্দীকাল তাদের কেন্দ্র হিসেবে এই কেল্লাগুলোকে ব্যবহার করেছে।
পাঠক ! সেমনানের ঐতিহাসিক ও মূল্যবান নিদর্শনগুলোর মধ্যে আরেকটি নিদর্শন হলো এখানকার ‘জামে মসজিদ।' এই জামে মসজিদটিও সেমনানের প্রাচীনত্ব ও ঐতিহাসিকতার প্রমাণ বহন করে। সেমনানের সর্বপ্রাচীন ইসলামী নিদর্শন হিসেবে এই মসজিদটিকে ধরা হয়। সম্প্রতি এখানে যে খননকার্জ ও গবেষণা চালানো হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা হয়ে থাকে যে,হিজরী প্রথম শতাব্দীতে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। কালের পরিক্রমায় এই মসজিদে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে। তবে মসজিদের বর্তমান কাঠামোতে তৈমুর এবং মোগল আমলের একটা নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। এই মসজিদটি যে পুরোণো তার প্রমাণ মেলে এর মিনারটিতে। মিনারটি বত্রিশ মিটার উঁচু। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে এই মিনারটি অবস্থিত। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। মিনারের গায়ে কুফি অক্ষরে লেখা লিপিকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া ইটের কারুকাজও বেশ দর্শনীয়। সেমনান জামে মসজিদের এই মিনারটি সালজুকি মিনার নামেও প্রসিদ্ধ। সালজুকি শাসনামলে নির্মিত ঐতিহাসিক মিনারগুলোর অন্যতম এবং ইরানের জাতীয় নিদর্শনের তালিকাভুক্ত।
ইমাম মসজিদ বা সুলতানী মসজিদও সেমনান শহরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি স্থাপনা। গুরুত্ব ও ঐতিহাসিকতার কথা বিবেচনা করে ইরানের জাতীয় নিদর্শনের তালিকায় মসজিদটির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই মসজিদটির চারটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। উত্তর এবং উত্তর-পূর্ব দিকের প্রধান প্রবেশদ্বারটি বেশ সুন্দর। এতে প্লাস্টারিং এর কারুকাজ এবং টাইলসের কারুকাজ করা হয়েছে বেশ সুন্দর করে। তাছাড়া ইমাম মসজিদের সুবিশাল আঙ্গিনা এবং এর সবুজ বাগিচা মসজিদটির সৌন্দর্য আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সবমিলিয়ে এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী এবং এর ভেতর-বাইরের কারুকাজ ইরানী নির্মাণ শিল্পীদের মেধা ও পারঙ্গমতারই স্বাক্ষর বহন করে।


( ১৩৮ তম পর্ব )


ভ্রমণ পিপাসু আর ঐতিহ্য ও সভ্যতা-সচেতন পাঠক ! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আপনাদেরই ভালো লাগার অনুষ্ঠান ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে স্বাগত জানাচ্ছি। আশা করি ভালোই আছেন আপনারা। গত সপ্তায় আমরা সেমনান প্রদেশে এসেছি। সেমনান শহর ও তার আশপাশের কিছু নিদর্শনের ঐতিহাসিকতা নিয়ে আমরা কথা বলেছি। সেইসাথে এখানকার দুটি কেল্লাও ঘুরে দেখেছি আমরা। ভালোই লেগেছে ,তাই না ! আজও আমরা এই প্রদেশেই বেড়াবো। অবশ্য আপনাদের সাথে নিয়েই।
সেমনানের ঐতিহাসিক ও মূল্যবান আরেকটি নিদর্শন হলো ‘আর্গ গেইট' অর্থাৎ কেল্লার দ্বার। কাজারী রাজবংশের বিশেষ করে নাসিরুদ্দীন শাহের আমলের শিল্পকলার একটি নিদর্শন হলো এই গেইটটি। গেইটটির দুটি বহির্দৃশ্য রয়েছে। অর্থাৎ এই গেইটটি উত্তর এবং দক্ষিণ দু'দিক থেকেই দেখা যায়। দক্ষিণ দিকটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ছোট দুটি করিডোরের সাথে সংযুক্ত। এর দুইপাশে দুটি ঝুলবারান্দাও রয়েছে। এই করিডোর এবং বারান্দায় যেসব নকশা করা হয়েছে,তাতে ছোট ছোট টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। টাইলসগুলো বিভিন্ন রঙের যেমন হলুদ , কালো , ফিরোযা ইত্যাদি। এগুলোর আকারও বিভিন্ন ধরনের। যেমন ত্রিকোণাকার , বর্গাকার এবং লজেন্সের আকার ইত্যাদি বিভিন্ন আকৃতির টাইলস এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। গেইটটির যে ফাউন্ডেশন তা ইট দিয়ে বেশ উঁচু করে করা হয়েছে। এর উচ্চতা পাঁচ মিটার। আর সদর দরোজা এবং করিডোরগুলো করা হয়েছে সুন্দর সুন্দর টাইলস দিয়ে।
দরোজার উত্তরের দিকটা অর্থাৎ বাইরের দিকের দেয়ালটা হলো এই গেইটটির প্রধান সৌন্দর্য,অপূর্ব সুন্দর টাইলস দিয়ে মনোরম করে সাজানো হয়েছে গেইটের এই পাশটি। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির সবচে আকর্ষণীয় দিকটি হলো এর দেয়ালে ঐতিহাসিক একটি চিত্র আঁকা হয়েছে। চিত্রটি ইরানের প্রাচীন রূপকথা সাদা দৈত্য ও রুস্তমের যুদ্ধ অবলম্বনে করা হয়েছে। সাত রঙের টাইলসের ওপর ঐতিহাসিক এই রূপকথাটি চিত্রায়িত করা হয়েছে। পৌনে এক মিটার উঁচু ইটের ওপর এর ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। মূল প্রবেশদ্বারের দুইপাশে টাইলসের কারুকার্যময় দুটি পিলার বানানো হয়েছে। সৌন্দর্যের জন্যেই এগুলো বানানো হয়েছে। এক একটি পিলারের উচ্চতা সাড়ে এগারো মিটার। দরোজাগুলো বেশ মজবুত করে বানানো হয়েছে। প্রাচীনকালের অনুসরণে এই গেইট রাতের বেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
স্থাপত্যটির টাইলসের কারুকাজের ওপর কাজারী শাসনামলের লিপিকর্মের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। এই লিপিকর্মগুলো যিনি করেছেন , তাঁর নাম হলো সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ বাকের তাবাতাবাঈ সেমনানী।
সেমনানের এই ঐতিহাসিক দূর্গদ্বারটি সেমনান শহরের প্রাচীনত্বের একটি নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। সেমনান শহরের সবচে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এটি অবস্থিত। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর প্রাদেশিক সংস্কৃতি বিভাগের পক্ষ থেকে এই স্থাপনাটির মেরামত কাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।
পাঠক ! আপনারা জানেন নিশ্চয়ই যে,ইরানের বিভিন্ন শহরে স্থানীয় যে বাজারগুলো গড়ে উঠেছে ,সেগুলো পর্যটকদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। কারণ এগুলোর নির্মাণ কৌশল আধুনিক স্থাপত্যকলার শৈলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাচীন এই স্থাপত্যরীতি গবেষকদের কৌতূহলের বিষয়। প্রতিটি শহরেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো সেখানকার বাজারগুলো। ইরানে শহর হলো রাজনীতি ও ব্যবসাসহ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চর্চার মূল কেন্দ্র। কেননা এগুলো চর্চার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং যথার্থ স্থান হলো শহর। আর মূলত ইসলামী শহরের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকে সেসবের প্রতিফলন ঘটেছে ইরানের শহরগুলোতে। ইরানী বাজার বলতে আলাদা আলাদা দোকান ,আলাদা বিভাগ অর্থাৎ এক বিভাগে এক ধরনের জিনিসের দোকান , সরাইখানা , ময়দান , ধর্মীয় স্থাপনা , গোসলখানাসহ জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমষ্টিকেই বোঝায়। তো আমরা সেমনানের বাজারের সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
মরু আঞ্চলিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে সেমনান বাজারের কাঠামোটি তৈরী করা হয়েছে। বিশেষ করে বাজারের ছাদটি করা হয়েছে ইট বা রোদে পোড়া ইট দিয়ে। এ কারণে গরমকালে ঠাণ্ডা এবং শীতকালে তুলনামূলকভাবে গরম অনুভূত হয়। সেমনান বাজারটি প্রায় দুই শত বছরের পুরোনো। অর্থাৎ কাজারী রাজবংশের প্রথম দিকে এই বাজারটি নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের পরিসর বৃদ্ধি করার কারণে এবং সড়ক নির্মাণ করার কারণে বাজারটিকে দুই ভাগে ভাগ করে নির্মাণ করা হয়েছে। বাজারের উত্তরাংশ প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা। এই বাজারটির প্রাচীন নাম ‘রস্তে বাজার'। এই বাজারটির ছাদ স্থাপত্যকলার দিক থেকে বেশ সুন্দর। এটি অনেকটা গম্বুজ আকৃতির। এতে কাঁচের জানালা স্থাপন করা হয়েছে। এরফলে বাজারের ভেতরে প্রয়োজনীয় আলো সরবরাহ হয়। বাজারের ভেতরে দুই শ'র মতো দোকান রয়েছে,রয়েছে তিনটি গোসলখানা , পাঁচটি মসজিদ ,চারটি সরাইখানা এবং ন'সর নামে একটি বিশাল তাকিয়া। এই তাকিয়ায় রয়েছে বড়ো একটি হলরুম। মুহররম মাসে শোকানুষ্ঠান করার জন্যে এই হলরুমটি ব্যবহার করা হয়। কয়েকটি দোকানও রয়েছে এখানে। তাকিয়ার মূল প্রবেশদ্বারে চমৎকার নকশা করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে , সেমনানের সবচে বড়ো জলাশয়টি এই তাকিয়ার ভেতরে রয়েছে। এছাড়াও এখানে আছে ছোট্ট একটি মসজিদ।
দক্ষিণ বাজারটিতেও রয়েছে পঞ্চাশটি দোকান। এখানেও রয়েছে ‘পাহনে' নামের একটি তাকিয়া। এই তাকিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো এর কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক কিছু মূল্যবান নিদর্শন। যেমন এর দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে ইমাম খোমেনী মসজিদ,আর উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে সেমনান জামে মসজিদ এবং পাহনে গোসলখানা। আমরা ইতোপূর্বে ইমাম মসজিদ এবং জামে মসজিদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। আজ বরং ‘পাহনে' হাম্মামের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।
পাহনে হাম্মামও সেমনানের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর অন্যতম একটি নিদর্শন। এই নিদর্শনটিও ইরানের জাতীয় নিদর্শনের তালিকায় অন্তর্র্ভুক্ত হয়েছে। খ্রিষ্টিয় ১৯৯৪ সালে এই হাম্মামটিকে নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। হিজরী ৮৫৬ সালে অর্থাৎ তৈমুরী বাদশাহ আবুল কাসেম বাবর খানের শাসনামলে এই হাম্মামটি তৈরী করা হয়। পাহনে হাম্মামের দর্শনীয় একটি বিষয় হলো এর সদর দরোজায় টাইলসের চমৎকার কারুকাজ। দরোজার ওপরাংশে টাইলসের ওপরে নাস্তালিক ফন্টে কবিতাংশ লেখা হয়েছে। আর দুইপাশে দুটি ছবি আর্ট করা হয়েছে। একটি হলো কাজারী একজন কমান্ডারের আরেকটি কাজারী অফিসারের। দুইজনের হাতে তরবারী শোভা পাচ্ছে। হাম্মামটির আয়তন এক হাজার বর্গমিটার। এর ভেতরে নারী-পুরুষদের জন্যে আলাদা আলাদা দরোজা ছাড়াও রয়েছে ছোট ছোট হাউজ , আগুন জ্বালাবার ছোট ঘর ইত্যাদি। ঠাণ্ডার সময় গরম পানির প্রয়োজনে এখানে আগুন জ্বালানো হয়। হাম্মামের ভেতরের সৌন্দর্যের কারণেই এটিকে যাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। এই যাদুঘরের বিদ্যমান জিনিসপত্রগুলোকে দুটি পৃথক পৃথক বিভাগে রাখা হয়েছে। একটি পুরাতত্ত্ব বিভাগ,অপরটি নৃতত্ত্ব বিভাগ। প্রাচীন নিদর্শনগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের আর নৃতাত্ত্বিক জিনিসপত্রগুলো ইসলামী যুগের। মৃৎশিল্পের নিদর্শনগুলোও খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের। এসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে হস্তশিল্পের সরঞ্জামাদি , নারীদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র , পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রভৃতি। এছাড়াও এই মিউজিয়ামে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলীলপত্র সংরক্ষিত আছে।


( ১৩৯ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা গত সপ্তায় ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেমনান প্রদেশে বেড়িয়েছি। ইতোমধ্যে সেমনান শহর এবং সেখানকার মূল্যবান কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাথে আমরা পরিচিতও হয়েছিলাম। আজ আমরা এই প্রদেশের আরেকটি শহরের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো। এই শহরটির নাম হলো দ'মাগন।
দমাগন শহরটির আয়তন ১২১১০ বর্গ কিলোমিটার। উত্তরদিকে এটি আলবোর্য পর্বতমালার সাথে গিয়ে মিলেছে। এর পূর্বদিকে আছে শাহরুদ শহর।দক্ষিণে আছে ইরানের কেন্দ্রীয় মরুভূমি এবং পশ্চিমে রয়েছে সেমনান শহর। দমাগন হলো কেন্দ্রীয় শহর। দমাগন শহরটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১৭০ মিটার উঁচু। তেহরান থেকে শহরটির দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। ইরানের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস সম্পর্কে যিনি সামান্যতম জ্ঞানও রাখেন , তাঁর কাছে নিশ্চয়ই এই শহরটির নাম অপরিচিত নয়। ইরানের ইতিহাস সম্পর্কে লেখা অধিকাংশ গ্র্রন্থেই এই শহরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মোকাদ্দেসি , এসতাখারি , ইবনে হোক্বাল এবং ইয়াকুত হামাভির মতো পর্যটকগণ তাঁদের নিজ নিজ ভ্রমণকাহিনীতে এই শহরের প্রাচীনত্বের কথা বলতে ভোলেন নি। তাঁরা এখানকার প্রাচীন স্থাপনাগুলোর কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই শহরটি গড়ে ওঠা এবং এর নামকরণ সম্পর্কে সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞমহলে একটা ধারণা বিদ্যমান রয়েছে। তারা মনে করে খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে মাগনের একদল লোক ‘চেশমে আলী' নদীর আশেপাশে বসবাস করতো। তাদের বসবাসের কারণে এই অঞ্চলটিকে ‘দেহ মাগন' বা মাগন পল্লী নামে অভিহিত করা হয়। কালক্রমে এই দেহ মাগনই ‘দমাগন' নামে পরিবর্তিত হয়। দমাগন শহর খ্রিষ্টপূর্ব চার শ' বছর আগে এতোবেশি নামকরা ছিল যে,তৃতীয় আশ্ক এবং তিরদাদ আশকানী খ্রিষ্টপূর্ব ২৪৯ সালে এই শহরটিকে তাদের রাজধানী বানিয়েছিলেন। খ্রিষ্টিয় প্রথম শতাব্দিতে দমাগন শহর বিখ্যাত কুমাস প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর ছিল। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের মাথায় অবস্থিত হবার কারণে এই শহরটির সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই ভালো। গ্রিকরা দমাগন শহরকে ‘হোকাতাম পোলিস' বা শত দরোজার শহর বলে অভিহিত করেছেন। এখানকার টিলাগুলোতে খনন কাজ চালিয়ে যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে ,সেগুলোই প্রমাণ করে যে এই শহরটি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অর্থাৎ প্রাচীন খোরাসানের পথে অবস্থিত হবার কারণে দমাগন শহর বিভিন্ন ধরনের উত্থান-পতনের মুখে পড়েছে। মোগল শাসক আরগুন খানের পক্ষ থেকে শারফুদ্দীন খাওয়ারেযমি খোরাসানের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিল। এই শারফুদ্দীন ৬২৪ হিজরীতে রেই শহর থেকে খোরাসানের দিকে তার যাত্রাপথে দমাগনের বহু মানুষ হত্যা করেছিল। অনেককেই বন্দী করেছিল। দমাগন শহর এবং তার আশপাশের গ্রামগুলোর অধিকাংশ বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে দিয়েছিল। তৈমুরলংও তাতারদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় তাতারদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে দমাগনের অধিবাসীদেরকে হত্যা করেছিল।
পাঠক ! সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক এই দমাগন শহরে রয়েছে মূল্যবান বহু নিদর্শন। কেল্লাগার্দ পাহাড় , দমাগন হাসসার টিলা ,জামে মসজিদ , ইমামযাদা জাফরের মাযার , তোঘরোল টাওয়ার ,তারিখানা মসজিদ, চেশমে আলী কমপ্লেক্স , শাহ আব্বাসী এবং সেপাহসালার সরাইখানাসহ আরো বহু মূল্যবান মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে দমাগনে। এগুলোর প্রত্যেকটিই প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব চারশ বছরের প্রাচীন। দমাগনের হাসসার বা প্রাচীর টিলা তো পৃথিবীব্যাপী খ্যাতিমান। আজ বরং এই টিলাটির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েই আসরের যবনিকা টানবো।
দমাগন শহর থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে গেলে হাসসার নামে একটি টিলা চোখে পড়বে। ইরানী সভ্যতার বিভিন্ন যুগের সাথে পরিচিত হবার জন্যে এই টিলাটি বিজ্ঞানী , গবেষক এবং বিশ্বের পুরাতত্ত্ববিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে ডক্টর এরিখ স্মিথ এই টিলাটির ওপর প্রথমবারের মতো গবেষণা চালিয়েছেন। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো গবেষণা চালায় পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেরিত পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ। ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ১৯৯৫ সালে তৃতীয়বারের মতো ইরানী পুরাতত্ত্ববিদগণ গবেষণা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে এই টিলায় খননকাজ করে। গবেষকগণ এখানে কয়েক পর্বে খনন কাজ চালিয়ে সভ্যতার কয়েকটি ধাপ এবং সেইসাথে জনজীবন যাপনের বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন। ঐসব নিদর্শন বিশ্লেষণ করে গবেষকগণ বলছেন যে,এখানকার মানব বসতির বয়স সাড়ে ছয় হাজার বছর থেকে চার হাজার ছয় শ' বছর।
এখানকার সভ্যতার সবচে উজ্জ্বল যুগের ইতিহাসটি বলা যায় চার হাজার তিন শ' বছর আগের। মৃত্তিকার বুক চিরে সভ্যতার এইসব নিদর্শন খুঁজে বের করেছে গবেষকগণ। এ সময়কার স্থাপত্যগুলো বেশ সুন্দর এবং ব্যতিক্রমধর্মী। বিশেষ করে ঘরগুলো ছিল ছোটো ছোটো রুমবিশিষ্ট। একটি রুমের সাথে আরেকটি রুমের সংযোগ স্থাপিত হতো সিঁড়ির মাধ্যমে। মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি ছিল খুবই সাদামাটা। তাদের অর্থনীতি ছিল তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এ্যাক , ব্যবসা-বাণিজ্য। দুই, পশুপাখি পালন এবং তিন, কৃষিকাজ। গরিবের বাড়িতে চোর সাধারণত ঢোকে না,ঢোকে ধনীর বাড়িতে। কারণ ধনীর ঘরেই ধন-সম্পদ আছে। এদিক থেকে ধনই চোর-ডাকাতদের হামলার একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দমাগনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখানকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে এখানে বারবার হামলা হয়েছে। হামলায় দমাগন হারিয়েছে তার শ্রী ,হারিয়েছে ঐশ্বর্য। তারপরও পুনপুনঃ সে মাথা উঁচু করে নিজস্ব অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়েছে। এই শহর নিয়ে আরো আরো গবেষণা হলে আরো অনেক সমৃদ্ধ তথ্য হয়তো বেরিয়ে আসবে।


( ১৪০তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই গত আসরে আমরা ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সেমনান প্রদেশে বেড়াচিছলাম৷ ইতোমধ্যে এই প্রদেশেরই ঐতিহাসিক শহর দমাগনের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম৷ বলেছিলাম যে,দমাগন খ্রিষ্টপূর্ব চার শ' বছরের প্রাচীন একটি শহর৷ খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে আশকানীয়ান এক বাদশাহর আমলে দমাগন ছিল রাজধানী৷ সে সময়কার বহু মূল্যবান নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে৷ দমাগনে অবস্থিত সাড়ে ছয় হাজার বছরের প্রাচীন হাসসার টিলার সাথে এরিমধ্যে আপনারা পরিচিত হয়েছেন৷ আজ আমরা এখানকার অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কথা বলবো৷ আপনারা আমাদের সাথেই থাকছেন-এ প্রত্যাশা রইলো৷
বলা হয়ে থাকে যে,সেমনান প্রদেশে প্রায় এক শ' মাযার এবং পবিত্র স্থাপনা রয়েছে৷ এর মধ্যে দমাগন শহর এবং তার আশেপাশেই অনেকগুলো অবস্থিত৷ আমরা এগুলোর সাথে ধীরে ধীরে পরিচিত হবো৷ তবে শুরু করবো ‘তারিখানা' বা ঐতিহাসিক মসজিদ দিয়ে৷ এই মসজিদটি ইসলামী যুগের সর্বপ্রাচীন এবং ব্যতিক্রমী একটি মসজিদ৷ সাসানী যুগের স্থাপত্যরীতির আদলে নির্মিত এই মসজিদটির বহিরাঙ্গন হিজরী তৃতীয় এবং চতুর্থ শতকে ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক বিচিত্র প্রতিকূলতায় নষ্ট হয়ে গেছে৷ তবে ভেতরের সৌন্দর্যটা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তাগিদে সংরক্ষণ করা হয়েছে৷ তারিখানা মসজিদটিকে খানায়ে খোদা বা আল্লাহর ঘর এবং চেহেল সুতুন বা চল্লিশ স্তম্ভ মসজিদ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে৷ এখানকার প্রামাণ্য লিপীকর্ম বা দলীল পত্রাদি থেকে যদিও এই মসজিদের স্থাপত্যকাল নিশ্চিত করা যায় না, তারপরও স্থাপত্যশৈলী থেকে অনুমান করা যায় যে ইসলামী যুগের প্রাথমিক দিককার স্থাপনা এটি৷
সাসানী যুগের স্থাপত্যশৈলী এবং ইসলামী আরবের স্থাপত্যপদ্ধতির সংমিশ্রিত কাঠামো অনুযায়ী এই মসজিদটি তৈরি করা হয়েছে৷ এ কারণেই মসজিদটি এতো গুরুত্বপূর্ণ৷ মূল ভবনের ভেতর একটা বড়ো আঙ্গিনা আছে৷ আঙ্গিনাটি চৌকোণাকৃতির৷ লম্বায় এটি ২৭ মিটার আর প্রস্থে ২৬ মিটার৷ পুরো ভবনটিই কাঠ এবং ইট দিয়ে বানানো৷ দেয়াল এবং তাকগুলোতে ইটের ব্যবহার বেশ সুন্দর৷ এখনো এই মসজিদটির আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে৷
দমাগন জামে মসজিদটিও এই শহরের আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা ৷ মসজিদটি বর্তমানে শহরের ঠিক মাঝখানে পড়েছে ৷ মসজিদটির বহু অংশ বিভিন্ন যুগে নষ্ট হয়েছে আবার মেরামতও হয়েছে ৷ এই মসজিদের সর্বপ্রাচীন অংশটি হলো বারান্দা , শাবেস্তান এবং মিনার৷ এগুলোর নির্মাণশৈলী থেকে বোঝা যায় যে,হিজরী পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এই শতকের শেষ দিককার স্থাপনা এটি ৷ বিখ্যাত পর্যটক মোকাদ্দাসী তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে দমাগন জামে মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন ৷ তিনি নিজেই এই স্থাপনাটির স্থাপত্যকালের ব্যাপারে একটা প্রমাণ৷ দমাগন জামে মসজিদের মিনারটির উচচতা ৩২ মিটার ৷ মিনারের ওপর ইট দিয়ে কুফি অক্ষরের দুটি লিপীকর্ম করা হয়েছে ৷ মসজিদের পাশেই ইমামযাদা যাফরের মাযার,ইমামযাদা মুহাম্মাদের মাযার,শাহরুখের সমাধি এবং চল্লিশ কন্যা স্থাপত্যটি অবস্থিত৷ সালজুকি আমলে নির্মিত হয়েছে এই কমপ্লেঙটি৷ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে এটি তালিকাভুক্ত হয়েছে৷ ইমামযাদা যাফরের মাযারের দেয়ালে এবং চল্লিশ কন্যার সমাধি টাওয়ারে কোরআনের আয়াতের লিপীকর্ম করা হয়েছে ৷ এই লিপীকর্ম পুরো কমপ্লেঙকে আলাদা একটা চমৎকারিত্ব দিয়েছে ৷
পাঠক ! আগেই বলেছি দমাগনে মূল্যবান বহু নিদর্শন রয়েছে৷ এতোসব নিদর্শনের সাথে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিচিত হওয়া সম্ভব নয়৷ আমরা কেবল গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিদর্শনের নাম উল্লেখ করছি৷ বেশ কয়েকটি টাওয়ার আছে এখানে৷ এগুলোর মধ্যে তোঘরোল টাওয়ার,পীর এল্‌মদর টাওয়ার,চেহেল দোখতারন বা চল্লিশ কন্যা টাওয়ারের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ সবগুলো টাওয়ারই বৃত্তাকার ৷
প্রাচীন মাদ্রাসা অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই শহরের দর্শনীয় নিদর্শন৷ প্রচুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখানে সৃষ্টি হয়েছে অনেক বড়ো বড়ো ব্যক্তিত্ব৷ সমকালে এই শহরটি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র৷ বিখ্যাত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি৷ একটি হলো হাজ্ব ফাতেহ আলী বেইক মাদ্রাসা৷ এটি অবশ্য ‘প'মানর' নামেও পরিচিত৷ আর অপরটি হলো মোত্তালেব খান মাদ্রাসা৷ বর্তমানে অবশ্য মাদ্রাসা দুটিতে ইসলামী শিক্ষা দেওয়া হয় ৷
মরু অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এখানকার আবহাওয়া বেশ ভালো৷ দমাগন থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ‘চেশমে আলী' বাগানই প্রমাণ করে এই অঞ্চলের আবহাওয়া কতোটা ভালো ৷ চেশমে আলী নামক একটি ঝর্ণার পাশে গড়ে উঠেছে এই বাগানটি৷ আগেই বলেছিলাম যে কুমাস প্রদেশের কেন্দ্র হিসেবে কাজারী বাদশাহদের নজর পড়েছিল এই দমাগনের ওপর ৷ সেজন্যেই আগা মুহাম্মাদ খান এবং ফাতেহ আলী খান শাহ কাজার দমাগনের চেশমে আলীতে সুন্দর সুন্দর কিছু ভবন তৈরী করেছেন৷ দমাগন শহরের অধিবাসীগণ এবং এই শহরের আশেপাশের লোকজনও এখন এইসব ভবনে আসেন অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে৷ এখানকার একটি ভবন চেশমে আলী হ্রদের মধ্যে,অপরটি শুষ্কস্থানে পড়েছে৷ অনেকটা মুখোমুখি অবস্থান তাদের ৷#

 

( ১৪১ তম পর্ব )


পাঠক ! সালাম ও শুভেচছা নিন ৷ ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা ভালোই আছেন ৷ ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ সেমনানে আমরা ঘুরে বেড়াচিছ৷ এরিমধ্যে কয়েকটি শহরের সাথে আমরা পরিচিতও হয়েছি৷ আজ আমরা নতুন একটি শহর দেখতে যাবো৷ এই শহরটির নাম শাহরুদ৷ শাহরুদ শহরটি সেমনানের সবচে পূর্বে অবস্থিত৷ চলুন শহরটির সাথে ভালোভাবে পরিচিত হওয়া যাক৷
শাহরুদ শহরটির আয়তন পঞ্চাশ হাজার নয় শ' বর্গকিলোমিটার৷ এই শহরের উত্তর দিকে রয়েছে আলবোর্য পর্বতমালা এবং গোম্বাদে কাবুস ও গোরগান শহর৷ পূর্বদিকে রয়েছে সাবজেভর শহর৷ দক্ষিণে রয়েছে কাভীর মরুভূমি এবং ইস্ফাহান প্রদেশ আর পশ্চিমে রয়েছে দমাগন শহর৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শাহরুদ শহরের উচচতা ১৩৮০ মিটার৷ শাহরুদ শহরটি সেমনান প্রদেশের মধ্যে সবচে জনবহুল৷ আবেস্তা গ্রন্থে শাহরুদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে৷ এখানে শাহরুদ নামে যেই নদীটি রয়েছে,ঐ নদীটির নামেই শহরটির নামকরণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন৷
ঐতিহাসিক যেসব মূল্যবান নিদর্শন এই শহরে পাওয়া গেছে,সেগুলোর মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগেকার চাখমগ পাথুরে টিলা, সাত হাজার বছর আগের খুরিয়ান টিলা, তিন হাজার বছর আগের বুলাভর টিলা ইত্যাদি৷ প্রাচীন এইসব নিদর্শন এই শহরের সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রাচীনত্বকেই প্রমাণ করে৷ ভৌগোলিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার কারণে এবং আলবোর্য পর্বতমালা আর মরুঅঞ্চলের মাঝে অবস্থিত হবার কারণে বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোর জন্যে এলাকাটি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ হিসেবেই পরিগণিত হয়ে আসছে৷ কাজারি আমলে শাহরুদ অঞ্চলটি ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল৷ হিজরী ১২৩৮ সালে ব্রিটিশ বণিক ও পর্যটক জেমস বেইলি ফ্রিযার শাহরুদকে একটি বসতিপূর্ণ শহর হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন,‘শাহরুদ বাজার নাগরিক জীবনের সকল প্রয়োজনীয়তা মেটায়৷ সবধরনের জিনিসপত্র এই বাজারে পাওয়া যায়৷ এখানে ফলফলাদিপূর্ণ বাগবাগিচা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বিচিত্র শস্যখামার এবং খুরমাবাগান৷ এই শহরের আশেপাশে রয়েছে জনবহুল গ্রাম আর গ্রাম৷'
হোতাম শিন্দলারও তাঁর খোরাসান ভ্রমণকাহিনীতে এই বাজারের ক্রমবিকাশ ও এখানকার বাণিজ্যের কথা উল্লেখ করেছেন৷ তিনি শাহরুদ সম্পর্কে লিখেছেন-‘বহু ব্যবসায়ীর আগমন ঘটে এই শহরে৷ তাদের ব্যবসায়িক দ্রব্যাদির মধ্যে রয়েছে তুলা , রেশম , রেশমগুটি , তামা , গন্ধক ইত্যাদি৷ এইসব মালামাল তারা খোরাসান থেকে কিনে এই বাজারে বিক্রি করে আর এখান থেকে লোহা, কান্দ্‌ বা জমাট চিনির টুকরো , চা , কাপড় ইত্যাদি কিনে নিয়ে যায়৷ বেল্টের মতো সবুজ বাগান পুরো শহরটাকে ঘিরে রেখেছে৷ যেদিকেই দৃষ্টি দিয়েছি সেদিকেই নজরে পড়েছে পরিষ্কার-পরিচছন্ন সবুজ বাগান৷'
এই সৌন্দর্য ও পারিপাট্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকগণ এখানে বেড়াতে আসেন ৷ কৃষিজ পণ্যের জন্যেও শাহরুদের আলাদা একটা পরিচিতি রয়েছে৷ এখানকার শস্যখামার এবং বাগ-বাগিচায় বিভিন্ন প্রকার ও জাতের ফলফলাদি আর শাকসব্জি পাওয়া যায়৷ শাহরুদ রত্নগর্ভা একটি ভূমির নাম৷ এই অঞ্চল ছিল বড়ো বড়ো বহু আলেম, আরেফসহ আরো অনেক জ্ঞানী-গুণী মনীষীর মিলনমেলা৷ এঁদের মধ্যে ক'জনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ যেমন মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা হাজ্ব মোল্লা আলী,মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা হাজ্ব সাইয়্যেদ মাহমুদ শাহরুদি,বিশিষ্ট আরেফ শায়খ আবুল হাসান খারকনী ,বায়েযিদ বোস্তামি প্রমুখ৷ এছাড়াও এখানে রয়েছে মাযার-মসজিদ , হোসাইনিয়া , মিনার , কেল্লা , জলাশয় , সরাইখানা এবং হাম্মামসহ প্রাচীন আরো অনেক নিদর্শন৷
প্রাচীন এই নিদর্শনগুলোর একটি হলো শাহরুদ জামে মসজিদ৷ মসজিদটি ইরানের জাতীয় নিদর্শনাবলীর তালিকাভুক্ত হয়েছে৷ মসজিদটির দুটি মেহরাব আছে৷ জামে মসজিদটি এই শহরের ঐতিহাসিক ও সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবেও পরিচিত৷ মসজিদটি ইয়েলখানের যুগের৷ এর তিনটি শাবেস্তান বা বিশ্রামের বারান্দা আছে৷ একটি মূল বারান্দা আর বাকি দুটো তার প্রশাখা৷
শুরুতেই বলেছি যে শাহরুদে রয়েছে অনেকগুলো টিলা৷ এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘সাঙ্গে চাখমক' টিলা৷ শাহরুদ শহর থেকে আট কিলোমিটার উত্তরে এটি অবস্থিত৷ ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাপানী পুরাতত্ত্ববিদ মাসুরার নেতৃত্বে একদল গবেষক এই টিলায় খননকার্য চালায়৷ খননকাজ চালাবার ফলে এই শহরের প্রাচীনত্বের অনেক নিদর্শন পাওয়া গেছে৷ পাওয়া গেছে লোহার বিভিন্ন সরঞ্জাম ,শিকারের বহু যন্ত্র৷ এগুলো বর্তমানে শাহরুদের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে৷ কৌতূহলী পর্যটক বা গবেষকগণ ইচেছ করলে দেখতে পারেন৷
শাহরুদ থেকে দশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে খুরিয়ান টিলার অবস্থান৷ শাহরুদের এই টিলা-অঞ্চলটিরও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম৷ এখানে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দের মানব সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া গেছে৷ এইসব নিদর্শনের একটা অংশ শাহরুদ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে৷ সর্বোপরি সাঙ্গে চাখমক টিলা,খুরিয়ান টিলা এবং উঁচু এই শাহরুদ শহর এলাকায় যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে , তা শাহরুদের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে৷


( ১৪২ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা ভালোই আছেন৷ গত আসরে আমরা শাহরুদ শহর নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে আপনাদের কথা দিয়েছিলাম যে, আজ প্রথমেই আপনাদেরকে নিয়ে যাবো শাহরুদ মিউজিয়ামে৷ আমরা আপনাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি প্রথমেই পূরণ করবো এবং তারপর এই শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো৷
শাহরুদ শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত শাহরুদ মিউজিয়াম ভবনটি বেশ পুরোণো৷ এই ভবনটির স্থাপত্যরীতি থেকে বোঝা যায় যে এটি কাজারি শাসনামলের শেষ দিককার স্থাপনা৷ মজবুত ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত দ্বিতল ভবন এটি৷ ১৩৬৭ সালে মৌলিক সংস্কারকাজ চালাবার পর ভবনটি এখন মিউজিয়ামে পরিণত হয়েছে৷ মিউজিয়ামের প্রথম তলাটিকে পুরাতাত্ত্বিক বিভাগে পরিণত করা হয়েছে৷ আর দ্বিতীয় তলাটিতে করা হয়েছে নৃ-তত্ত্ব বিভাগ৷ পুরাতত্ত্ব বিভাগটিতে আঞ্চলিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রাখা হয়েছে৷ অর্থাৎ এখানে রয়েছে চাখমক পাথুরে টিলা , দমাগন হাস্‌সার টিলা,খুরিয়ান টিলা এবং বুলভারে শাহরুদ টিলায় পরিচালিত খনন কার্য থেকে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শন৷ এসবের মধ্যে মৃৎশিল্প,ব্রোঞ্জ এবং আয়না শিল্পই বেশি৷
নৃবিজ্ঞান বিভাগে যেসব নিদর্শন রয়েছে,সেগুলো নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠির জীবনকালের সাথে সম্পৃক্ত নয়৷ বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির সাথে সম্পৃক্ত এগুলো৷ ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে এগুলো সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যেতে পারে৷ এই কমপ্লেক্সের রুমগুলোতে রয়েছে কৃষিকাজ , পশুপালন সংক্রান্ত বিভিন্ন নিদর্শন৷ আরো রয়েছে পোশাক-পরিচছদ ও বিভিন্ন দলীলপত্র৷ তাজিয়া খানিরও বহু নিদর্শন এখানে দেখতে পাওয়া যায়৷ এগুলোর মাধ্যমে তৎকালীন জনগণের বিশ্বাস সম্পর্কেও ধারণা করা যায়৷
শাহরুদের আশেপাশে অনেকগুলো সমাধি এবং মাযার রয়েছে৷ এই সমাধিগুলো সাংস্কৃতিক স্থাপত্যলার অংশ হিসেবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ এগুলো বড়ো বড়ো আলেম-আরেফের মাযার৷ এ মুহূর্তে দুজন বুযুর্গের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ একজন হলেন শায়েখ হাসান জুরি এবং অপরজন হলেন শায়েখ আবুল হাসান খারাগনী৷ শাহরুদ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে শায়েখ হাসান জুরির মাযারটি অবস্থিত৷ ১২ মিটারের একটি রুমের ওপর গোলাকৃতি গম্বুজ বিশিষ্ট তাঁর মাযার ভবনটি৷ রোদে পোড়া ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভবনটি৷ মাযারটি জুর শহরের একেবারে উত্তরাংশে অবস্থিত৷
শায়েখ হাসান জুরি ছিলেন একজন সংগ্রামী নেতা৷ শায়েখ খলীফার ছাত্র ছিলেন তিনি৷ হিজরী সপ্তম শতাব্দীর ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতাদের অন্যতম নেতা ছিলেন শায়েখ হাসান জুরি৷ ৭৪৫ হিজরীতে মোগলদের সাথে সংগ্রামে তিনি শাহাদাত বরণ করেন৷ তাঁর শাহাদাত এ অঞ্চলের জনগণের বীরত্বের কথা যেমন স্মরণ করিয়ে দেবে তেমনি এই শহরের প্রাচীনত্বের বিষয়টিও প্রমাণ করবে৷
স্বনামধন্য আরেফ শায়েখ আবুল হাসান খারাগনীর মাযারটিও শাহরুদ থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ খারাগন নামক জনপদে এটি অবস্থিত৷ হিজরী পঞ্চম শতাব্দীর একজন বিখ্যাত আরেফ ছিলেন তিনি৷ ৪২৫ হিজরীতে জনাব আবুল হাসান খারাগনী মৃত্যুবরণ করেন৷ শায়েখের কবরের ওপরে পাথর খণ্ডে একটি কবিতা দেখতে পাওয়া যায়৷ বহু লেখকের মতে মাযারের সাথে একটা মসজিদও ছিল কারুকার্যময় গম্বুজযুক্ত৷ যদিও এখন আর সেসবের অস্তিত্ব নেই৷ তবে মসজিদের মেহরাবটি এখনো অবশিষ্ট রয়েছে৷ তাতে প্লাস্টারিং এর যে নকশা করা হয়েছে , তাতে যথেষ্ট নৈপুণ্য ও দক্ষতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়৷ অবশ্য সম্প্রতি ঐ মেহরাবের পাশে একটি মসজিদ তৈরী করা হয়েছে৷ যার ফলে শায়েখ আবুল হাসান খারাগনীর মাযার যিয়ারতকারীগণ এখানে এসে নামায আদায় করাসহ বিশ্রামেরও সুযোগ পান৷
পাঠক ! শাহরুদ শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে বোস্তম শহরটি অবস্থিত৷ বোস্তম শহরটি আগেকার দিনে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ কেননা এটা ছিল প্রাচীন কুমাস প্রদেশের অংশ এবং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সংযোগ বা যোগাযোগের সড়কটি বোস্তম শহরের ওপর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে৷ শাহরুদ শহর গড়ে ওঠার কারণে আজকাল আর বোস্তম শহরের সেই প্রাচীন গুরুত্বটা নেই৷ এখন বোস্তম শহরটা শাহরুদেরই একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত৷ বোস্তম শহরটি সাসানী বাদশাহ খসরু পারভেজের সময়ে গড়ে উঠেছে৷ ষষ্ঠ হিজরীর ঘটনা এটি৷ মহাকবি ফেরদৌসীও তাঁর শাহনামা গ্রন্থে এই শহরটির নাম উল্লেখ করেছেন৷
বিখ্যাত ভূবন পর্যটক ইবনে হোকাল , মোকাদ্দাসী , আবুদেলফ , নাসের খসরু , ইয়াকুত হামাভি, ইবনে বতুতা এবং কালাভিখুও তাঁদের নিজ নিজ ভ্রমণ কাহিনীতে বাস্তমের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন৷ বিখ্যাত মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হোকাল হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে বোস্তম সম্পর্কে লিখেছেন : ‘বোস্তমের গ্রামগুলো ছিলো কুমাসের তরতাজা গ্রামগুলোর অন্যতম৷ এখানকার বাগানগুলোতে প্রচুর ফল-ফলাদি জন্মায় ৷
মোকাদ্দেসী বোস্তম মসজিদ প্রসঙ্গে লেখেন-‘এটা একটা পবিত্র মসজিদ৷ অনেকটা কেল্লার মতো৷ বাজারের মাঝখানে এটির অবস্থান৷' ৪৩৮ হিজরীতে নাসের খসরু বোস্তম পরিদর্শন করেন৷ তিনি বায়েযিদ বোস্তমির কবরের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন৷ ইয়াকুত হামাভিও বোস্তমের বাজারগুলোর কথা এবং এখানকার বিচিত্র খাদ্যদ্রব্যের কথা উল্লেখ করেছেন৷ ইবনে বতুতাও হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে বোস্তম শহর সফরে যান৷ তিনিও ইয়াকুত হামাভির বক্তব্যকে যথার্থ বলে অনুমোদন করেন৷
এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন ,তাহলো ‘বোস্তম' শব্দটি ইরানে ‘বাস্তম'রূপে উচচারিত হয়৷
এখানে আরো কিছু দর্শনীয় ধর্মীয় স্থান রয়েছে৷ যেমন ইমামযাদা মুহাম্মাদের মাযার, সুন্দর মিনার বিশিষ্ট বায়েযিদ মসজিদ, আলজাইতু বারান্দা,গম্বুজ, গাজান খান বারান্দা ইত্যাদি৷ এগুলোর মধ্যে বায়েজিদ বোস্তামি মসজিদটি বেশ সুন্দর৷ দেখার মতো একটি স্থাপনা এটি৷ মসজিদের ভেতর বাইরে চমৎকার সব কারুকাজ দৃষ্টি কেড়ে নেয় ৷ এই কমপ্লেক্সের মধ্যেই রয়েছে বায়েজিদ বোস্তামীর মাযার ৷ হিজরী পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীর বিশিষ্ট একজন আরেফ ছিলেন তিনি ৷


( ১৪৩ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আজো আপনাদেরকে আমাদের সাথে পেয়ে আমরা আনন্দিত৷ গত সপ্তায় আমরা ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শাহরুদ সফরে গিয়েছিলাম৷ এই শহরের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বিশেষত্ব এবং এখানকার বেশকিছু মূল্যবান নিদর্শনের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম৷ শাহরুদ শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক বোস্তাম শহর এবং সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনার সাথেও আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম৷ আজ আমরা এই বোস্তাম শহরের আরো কিছু নিদর্শনের সাথে পরিচিত হবো৷ আপনারা প্রস্তুতি নিন৷
বোস্তাম শহরের দক্ষিণে অবস্থিত ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা হলো বোস্তাম জামে মসজিদ৷ হিজরী ৭০৬ সালে এই মসজিদটি বানানো হয়েছে৷ মসজিদ কমপ্লেঙটি বর্গাকৃতির এবং বেশ খোলামেলা৷ মসজিদের মেহরাবটিতে বেশ সুন্দর করে কারুকাজ করা হয়েছে৷ প্লাস্টারিং এর সাহায্যে পবিত্র কোরআনের আয়াত চমৎকারভাবে অত্যন্ত শৈল্পিকরূপে অঙ্কণ করা হয়েছে৷ ইরানের অপরাপর অসংখ্য মসজিদের মতো এই মসজিদেও লিপীকর্ম করা হয়েছে যেখানে এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রতিষ্ঠাকালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ এখানে যেসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে বলা হয়ে থাকে যে,মসজিদটি ১২৪২ হিজরীতে ফতেহ আলী শাহ কাজারের আমলে মেরামত করা হয়েছে৷
এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বেশ উঁচু এবং সুন্দর একটি টাওয়ার আছে৷ এই টাওয়ারটির নাম হলো কশনেহ বোস্তাম টাওয়ার৷ কশনেহ টাওয়ারটির উচচতা হলো বিশ মিটার৷ বাইরের দিকটি অসংখ্য কোণ বা বাহুর সমন্বয়ে ছন্দময়রূপে নির্মিত৷ খুবই সুন্দর লাগে এর বাইরের কাঠামোটা৷ টাওয়ারের উধর্বাংশে দুটি খালি প্রান্ত আছে ইটের তৈরি৷ সেখানে কিছু কথা লেখা আছে৷ টাওয়ারটির সঠিক নির্মাণ তারিখ সম্পর্কে প্রামাণ্য কোনো কাগজপত্র নেই৷ তবে গবেষকদের অনেকেই বিশ্বাস করেন,এটি গাযান খানের সময়কার একটি নিদর্শন৷ বিল্ডিং এর ডিজাইন এবং এখানকার অন্যান্য যেসব নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায় , তা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে এটি একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল৷ যাই হোক না কেন,টাওয়ারটি এই এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিখ্যাত ৷
এছাড়াও বোস্তাম শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য একটি হলো এখানকার বিখ্যাত হাম্মাম৷ সাত শ' বছর আগের এই হাম্মামটি এখনো ব্যবহার উপযোগী৷ ইয়েলখানীয়ানের আমলে এই হাম্মামটি বানানো হয়েছে৷ হাম্মামের সুন্দর একটি প্রবেশপথ রয়েছে,রয়েছে জামা-কাপড় পরিবর্তন করা এবং সংরক্ষণ করার আলাদা রুম, হল রুম এবং শাওয়ার৷ হাম্মামের ছাদ ইয়েলখানী নির্মাণশৈলী অনুযায়ী গম্বুজ আকৃতির৷ অন্তত এক মিটার মাটির নীচ থেকে ফাউন্ডেশন নেওয়া এই ভবন তৈরিতে যেসব উপাদান-উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে রয়েছে ইট এবং চূনাপাথর৷ আনুমানিক বছর পিঁচেশেক আগে এই হাম্মামটি পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছে৷
পাঠক ! ইতোপূর্বে আমরা বলেছিলাম যে,শাহরুদ ভৌগোলিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার কারণে এবং আলবোর্য পর্বতমালা আর মরুঅঞ্চলের মধ্যবর্তীস্থানে অবস্থানের কারণে অতীতে এটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র৷ বিশেষ করে খোরাসান, তেহরান , মযান্দারন এবং ইরানের কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে যাতায়াত করার ক্ষেত্রে এই শাহরুদ শহরটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র ছিল৷ এখানে প্রাচীন যেসব সরাইখানা আছে , সেগুলোই তার প্রমাণবাহী৷ এছাড়া মাশহাদে যারা ইমাম রেযা ( আ ) এর মাযার যিয়ারত করতে যায়,তাদের যাতায়াতের পথে শাহরুদ শহরটি পড়ে বলে আজো এই শহরের গুরুত্ব তেমন একটা কমে নি৷
সরাইখানাগুলো ইরানের স্থাপত্যকলার মূল্যবান স্মৃতিবাহী৷ বিভিন্ন যুগে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে এগুলো গড়ে উঠেছিল৷ আমরা আসরের এ পর্যায়ে না হয় এই সরাইখানাগুলো নিয়েই কথা বলি৷ বিভিন্ন কারণে ইরানে সরাইখানা এ্যাতো ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছে৷ কারণটা একদিকে অর্থনৈতিক অপরদিকে সামরিকও,আবার ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণেও এখানে সরাইখানা বিস্তৃতি পেয়েছে৷ ভৌগোলিক অবস্থান এবং স্থাপত্যকলার কারণে তো এগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছেই, এছাড়া সরাইখানাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রয়েছে৷ তাহলো,এখানে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে আসতো, তাদেরকে এখানে দু'চারদিন থাকতে হতো৷ কারণ তারা মালামাল খালাস করতো আবার কিনতো৷ তাদের এই থাকা এবং বিশ্রামের জন্যে এইসব সরাইখানা ছিল বেশ উপযোগী৷ সরাইখানাগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিশেষ করে ইসলামী যুগের সরাইখানাগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে,তা থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইরানে সরাইখানাগুলোর ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে৷ দুটি সরাইখানা একইরকম ডিজাইনের মেলা ভার৷
সামাজিক দিক থেকেও ইরানের সরাইখানাগুলোর একটা গুরুত্ব রয়েছে৷ কেননা এই সরাইখানাগুলোতে যেসব মুসাফির বিভিন্ন স্থান থেকে আসতো, তাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সংস্কৃতি ছিল , আচার-অনুষ্ঠান ছিল, বোধ ও বিশ্বাস ছিল৷ আর অর্থনৈতিক দিক থেকে যে এর একটা গুরুত্ব রয়েছে, তাতো বলারই অপেক্ষা রাখে না৷ সেমনান প্রদেশে এবং শাহরুদ শহরে তিন প্রকারের অসংখ্য সরাইখানা রয়েছে৷ শাহরুদের ‘শাহ আববাসী' সরাইখানাটি বেশ বিখ্যাত৷ তিনটি সরাইখানাকে একত্রিত করে এটি গঠন করা হয়েছে৷ এই তিনটি সরাইখানার একটি শাহ আব্বাস সাফাভির আমলে নির্মিত৷ অপর দুটি কাজারি আমলের৷ বিশ্বের বহু পর্যটক এখানকার সরাইখানাগুলো সম্পর্কে তাদের চমৎকার অনুভূতির বর্ণনা দিয়েছেন৷ এদের মধ্যে জ্যাকসন এবং দেনোভানও রয়েছেন৷
এ পর্যন্ত আমরা যেসব নিদর্শনের কথা বললাম, এগুলো ছাড়াও শাহরুদ শহর এবং তার আশেপাশে আরো বহু দর্শনীয় নিদর্শন রয়েছে৷ বিশেষ করে সালজুকি আমল এবং কাজারী শাসনামলের বহু দূর্গ বা কেল্লা এখনো এখানে অবশিষ্ট রয়েছে৷ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো রয়েছেই৷ শাহরুদের এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র,ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বিশ্বের পর্যটকদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে৷ সেজন্যেই প্রায় বছর জুড়েই এখানে পর্যটকদের আনাগোণা লক্ষ্য করা যায় ৷


( ১৪৪ তম পর্ব )


পাঠক ! গত সপ্তায় আমরা যে সবাই মিলে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শাহরুদ সফরে গিয়েছিলাম-নিশ্চয়ই ভালো লেগেছে৷ আজ আমরা যাবো ‘গার্ম্‌সর' শহরের দিকে৷ সেমনান প্রদেশের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত এই শহরটি৷ শহরটির আয়তন প্রায় দশ হাজার ছয় শ' সাতাশি বর্গ কিলোমিটার৷ ঐতিহাসিক এই শহরটির সাথে চলুন ভালোভাবে পরিচিত হবার চেষ্টা করি ৷
গার্মসর শহরটির উত্তরে রয়েছে দামা'ভান্দ , পশ্চিমে ভারা'মিন, পূর্বে সেমনান শহর এবং দক্ষিণে ইস্ফাহানের নাঈন শহরের সাথে প্রান্তসীমাযুক্ত কেন্দ্রীয় মরুভূমি৷ গার্ম্‌সর উষ্ণ আবহাওয়াময় একটি এলাকা৷ এ কারণে সেমনান প্রদেশের উপজাতীয় গোষ্ঠিগুলো গার্ম্‌সর অঞ্চলকে তাদের গরমকালীন এলাকা হিসেবে এবং ফিরোযকুহের একটি এলাকাকে শীতকালীন অঞ্চল হিসেবে নির্বাচন করে থাকে৷ এই দুটি অঞ্চলেই তারা শীত ও গরমকালে তাদের আবাস পরিবর্তন করে বসবাস করে৷ গার্ম্‌সরে বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়৷ বিশেষ করে এ অঞ্চলের গম , যব, তুলা , খরবুযা এবং ডুমুর খুবই বিখ্যাত৷ গার্ম্‌সর শহরটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮২৫ মিটার ৷
গার্ম্‌সরকে আগেকার দিনে ‘খর' নামে ডাকা হতো ৷ খ্রিষ্টীয় ১৯৩৭ সালে সমগ্র ইরানে রেললাইন স্থাপনের সময় এর নাম পরিবর্তিত হয়ে গার্ম্‌সর ধারণ করে৷ আশকানীয়ানদের শাসনামলে গার্ম্‌সর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকা ছিল৷ ইসলাম-পরবর্তী যুগে খর ‘রেই' শহরের একটি উত্তম এলাকা হিসেবে পরিগণিত ছিল৷ ইতিহাসের পাতায় এসেছে-সামানীয়ানদের আমলে খর তাদের অধিকৃত একটি অঞ্চল ছিল৷ একইভাবে আলে যিয়ার,আলাভিয়ান এবং দিয়ালামা আলে বুইয়ে ও গাযনাভিয়ানদের অধীনেও ছিল কিছুকাল ৷
‘মো'জামুল বালাদান' অর্থাৎ নগরাভিধান নামক গ্রন্থে খর কে রেই শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত ঐকটি ঐতিহাসিক শহর বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ ইবনে হোক্বালও চতুর্থ শতাব্দীতে এই এলাকা সম্পর্কে বলেছেন-খর ছোট্ট অথচ পরিচছন্ন একটি শহর৷ সুবিন্যস্ত একটি এলাকা৷ এখানকার জল দামা'ভান্দ পর্বত-নিঃসৃত৷ রুশ মনীষী ও পর্যটক বার্টোল্ডও তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে খর শহরের প্রাচীনত্বের কথা উল্লেখ করেছেন৷ সর্বোপরি ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যপঞ্জী থেকে প্রমাণিত হয় যে,গার্ম্‌সর অতীতে ইরানের একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা ছিল৷ তবে যুগে যুগে বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখে পড়ে ধবংস হয়েছে বারবার৷ বিশেষ করে মোগলদের সর্বগ্রাসী হামলায় এই অঞ্চলও ইরানের অন্যান্য এলাকার মতো বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছিল৷
পাঠক ! এতোক্ষণ আপনারা গার্ম্‌সরের অতীত ইতিহাসের সাথে খানিকটা পরিচিত হলেন ৷ এবার চলুন এখানকার কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাথে পরিচিত হওয়া যাক ৷ বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেমনানের অন্যান্য শহরের মতো গার্ম্‌সরেও রয়েছে বিভিন্ন মূল্যবান নিদর্শন৷ যেমন এখানে রয়েছে বহু ইমামযাদার পবিত্র মাযার, অন্যান্য পবিত্র সমাধি, সরাইখানা,দূর্গ এবং ঐতিহাসিক বহু টিলা,জলাশয়,প্রাচীন অনেক স্থাপনা ইত্যাদি৷ আজকের আসরে তো আর সবগুলোর সাথে পরিচিত হবার সুযোগ নেই,যেহেতু সময় কম ৷ তাই এগুলোর দু'একটির সাথে সংক্ষেপে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো ৷
গার্ম্‌সরের দক্ষিণে অবস্থিত মরুভূমিতে পঞ্চাশ কিলোমিটার যাবার পর উঁচু একটি টিলা পড়বে৷ ঐ টিলার নাম হলো ‘সিয়হ্‌ কূহ'৷ সিয়হ কূহের উত্তর উপত্যকায় প্রাচীন একটি স্থাপনা পরিলক্ষিত হয়৷ স্থানীয় অধিবাসীরা তাকে ‘কাস্‌র' বলে অভিহিত করে থাকে৷ কাস্‌র মানে হলো প্রাসাদ৷ সিয়হ কূহের প্রাসাদগুলো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ এখনো এখানকার কোনো কোনো প্রাসাদ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে ঘোষণা করছে ইরানের প্রাচীন সৌকর্যের কথা,তার প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা এবং সেই প্রাচীন যুগেও ইরান যে স্থাপত্যশিল্পে কতোটা পারঙ্গম ছিল সেই গৌরবের কথা৷
এখানকার সবচে বড়ো প্রাসাদটি হলো শাহ আব্বাস প্রাসাদ ৷ এই প্রাসাদটি ‘কাসরে বাহরাম' নামেও পরিচিত৷ এক হাজার বিশ মিটার উচচতায় অবস্থিত এটি ৷ খোরাসান, গার্মসর, কাশান, ইস্ফাহানের মরু-কাফেলার চলাচলের পথে প্রাসাদটি স্থাপিত৷ প্রাসাদের বহিরাঙ্গিকটি চতুর্কোণ বিশিষ্ট ৷ কয়েকটি টাওয়ারও আছে এর মধ্যে৷ টাওয়ারগুলো দুই দরোজা বিশিষ্ট৷ দরোজাগুলো দক্ষিণ এবং উত্তরমুখি৷ প্রাসাদের দেওয়ালের বাইরের দিকটায় সাদা রঙের বড়ো বড়ো চুনাপাথর লাগানো হয়েছে৷ এই চুনাপাথরগুলো পার্শ্ববর্তী পাহাড়গুলো থেকে আনা হয়েছে৷ প্রাসাদের ভেতরে খোলামেলা জায়গার চারদিকে ছোটো ছোটো রুম৷ বড়ো একটি অডিটোরিয়ামও আছে৷ এর বাইরে আছে চতুষপদীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে কয়েকটি ঘর৷ সাত কিলোমিটার দূর থেকে এখানে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে পাইপ লাইনের মাধ্যমে৷ তবে এখানে মৃৎশিল্পের যেসব নমুনা পাওয়া গেছে সেগুলোকে তৈমুরী যুগের বলে মনে করা হয়৷ অবশ্য সাফাভি আমলে এই স্থাপনাটি পুরোপুরি পুনর্নিমাণ করা হয়৷ এ কারণেই শাহ আব্বাসী নামেও এই প্রাসাদের পরিচিতি রয়েছে৷
পাঠক ! সেই প্রাচীনকালে অর্থাৎ যখন পানি সরবরাহের জন্যে পাইপ লাইনের ব্যবস্থা ছিল না,তখন সমগ্র ইরানেই বিভিন্ন জলাশয় ছিল৷ এসব জলাশয় থেকে আশপাশের লোকজন তাদের পানির চাহিদা মেটাতেন ৷ সেমনান প্রদেশে বিশেষ করে গার্মসরে এরকম অসংখ্য জলাশয় এখনো দেখতে পাওয়া যায়৷ গার্মসর শহরের জলাশয়টি এই এলাকার সবচে বড়ো জলাশয়৷ এটি এখন ইরানের জাতীয় সাংস্কৃতিক বিভাগের প্রাদেশিক শাখার অধীনে রয়েছে৷ বহু মানুষ দেখতে আসে এই প্রাচীন জলাশয়টি ৷


( ১৪৫ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আপনাদেরকে সাথে পেয়ে আমরা আনন্দিত৷ ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ সেমনানের বিভিন্ন শহরের সাথে পরিচিত হয়েছি আমরা৷ আমরা লক্ষ্য করেছি এই প্রদেশটি ইসলামী সভ্যতার একটি প্রাচীনতম কেন্দ্র ছিল৷ এখানে প্রাকৃতিক লীলাবৈচিত্র্যের সৌন্দর্য যেমন রয়েছে,তেমনি রয়েছে বেড়ানোর মতো বহু পার্ক এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন৷ এখানকার জনগণ বেশ অতিথিপরায়ন৷ এগুলো ইরানের প্রাচীন ও সনমৃদ্ধ এই অঞ্চলের মূল্যবান বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিগণিত৷ বলা হয়ে থাকে , সেমনান প্রদেশ অবস্থানগত কারণে এবং উপযুক্ত প্রাকৃতিক সুবিধা ও আয়তনগত বিশালত্বের কারণে বিচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদের সাথে সাথে বিরল প্রজাতির পশুপাখিরও বসবাসের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে৷ আজকের আসরে বরং সেমনানের এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাথেই পরিচিত হওয়া যাক৷
সেমনান প্রদেশ আলবোর্য পর্বতমালার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত৷ কাভির মরুভূমির সাথেও তার প্রান্তসীমা রয়েছে৷ এখানে বৃষ্টিপাতও হয় প্রচুর৷ ফলে সেমনানের উত্তরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে বন-জঙ্গল৷ তবে প্রদেশের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি বেশ পরিচছন্ন,যদিও এখানে উত্তরাঞ্চলের তুলনায় বৃষ্টিপাতও হয় কম কিংবা গাছ-গাছালির সংখ্যাও কম৷ সেমনানের দক্ষিণাংশে লবণ মরুভূমিটি পড়েছে৷ এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম৷ বিশেষ এক ধরনের উদ্ভিদে ছেয়ে আছে এই অঞ্চল৷ আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার একেক অঞ্চলে একেক রকমের বুনো প্রাণী এবং পাখ-পাখালির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়৷
এইসব পশুপাখির কারণে সেমনানের প্রায় তেইশ শতাংশ ভূমি অর্থাৎ একুশ লক্ষ ছাপ্পান্নো হাজার পাঁচ শ' নববুই হেক্টর জমির মতো বিশাল এলাকা পশুপাখিদের জন্যে সংরক্ষিত হয়েছে৷ সমগ্র ইরানে মোট আশি লক্ষ হেক্টর জমি চারটি বিশেষ এলাকার জন্যে ইরানের পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষিত আছে৷ এই চারটির মধ্যে পশুপাখির আশ্রয়কেন্দ্র , জাতীয় প্রাকৃতিক নিদর্শন, ন্যাশনাল পার্ক এবং অন্যান্য সংরক্ষিত এলাকা অন্তর্ভুক্ত৷ এরমধ্যে কেবল সেমনানেই রয়েছে প্রায় পঁচিশ শতাংশ৷ যেমন সেমনানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ‘পারভার' নামক সংরক্ষিত এলাকা৷ শাহরুদের দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে ‘তূরন' নামক পশুপাখির আশ্রয়কেন্দ্র৷ শাহরুদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ‘খোশ এইলক' নামের পশুপাখির আশ্রয়কেন্দ্র৷
এগুলোর বাইরেও এখানে রয়েছে শিকার নিষিদ্ধ দুটি এলাকা৷ একটি হলো ‘তেপল ৷ শাহরুদ শহরের উত্তর-পশ্চিম উপকন্ঠে এটি অবস্থিত৷ অপরটির নাম ‘খানর'৷ এটি অবস্থিত সেমনান শহরের উত্তর-পশ্চিম দিকে৷ এখানে শিকার নিষিদ্ধ করার কারণ অনেকগুলো৷ একে তো ভয়ঙ্কর এলাকা৷ হিংস্র জন্তুগুলো ক্ষুধার্ত হয়ে গেলে যে-কোনোরকম বিপদ ঘটতে পারে৷ অপরদিকে যারা পশুপাখি নিয়ে গবেষণা করে,তারা এখানকার বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোকে যেন কাজে লাগাতে পারে সেজন্যেও এখানে শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ সংরক্ষিত এই বিশেষ অঞ্চলগুলোর সাথে আরো বেশি পরিচিত হওয়া যাক৷
শাহরুদের ‘তুরান' সংরক্ষিত এলাকাটির আয়তন আঠারো লক্ষ বাহাত্তর হাজার সাত শ' পঞ্চাশ হেক্টর৷ সংরক্ষিত এলাকার আয়তনগত দিক থেকে তুরান ইরানের মধ্যে সবচে বড়ো বলে ধরা হয়৷ ইউনেস্কোর সহযোগী সংস্থা দ্য ম্যান এ্যান্ড দ্য বায়োস্পেয়ার প্রোগ্রাম বা এম.এ.বি. ১৯৭৬ সালে এই এলাকাটিকে তাদের তালিকাভুক্ত করেছে৷ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বায়োস্পেয়ার সংরক্ষিত অঞ্চলগুলো এমন যে এখানে লোকজনের স্বাভাবিক কাজকর্মের যেমন সুবিধা রয়েছে তেমনি রয়েছে গবেষণা করার ব্যবস্থা৷ দেখা , বৈজ্ঞানিক গবেষণা , পরিবেশ বিজ্ঞান চর্চা , প্রাণীবিদ্যা কিংবা জীববিজ্ঞান চর্চা প্রভৃতির সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে৷ রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীও৷ যেমন হরিণ , বুনো মেষ , বুনো ছাগল , চিতাবাঘ , বুনো গাধা , নেকড়ে বাঘ ,তিতির পাখিসহ বিভিন্ন জাতের পাখি এখানে অহরহ নজরে পড়ে৷ বিশেষ করে ‘তুরান' এলাকাটি এশিয়ার মধ্যে বুনো গাধার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেই কেবল নয় বরং এই এলাকাটি বুনো গাধার প্রজাতি এবং তার সংখ্যাগত দিক থেকেও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি অবস্থানে ছিল৷ জীববিজ্ঞানীদের কাছে তাই তুরানের গুরুত্ব ভিন্নরকম৷
এছাড়া এ এলাকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ৷ যেমন এখানে রয়েছে সারি সারি ঝাউগাছ, রয়েছে বিরল প্রজাতির তার্পিন গাছ , বুনো বাদামগাছও এখানে প্রচুর দেখা যায়৷ এগুলো ছাড়াও আরো বিভিন্ন রকমের গাছ-গাছালিতে পূর্ণ ‘তুরান' অঞ্চল৷ প্রসিদ্ধি আছে যে, তুরান এলাকাটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পড়ালেখার জন্যে সমগ্র ইরানেই বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী৷ সেজন্যেই সারাবছর জুড়ে এখানে গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত রয়েছে৷ এইসব গবেষক যে কেবল ইরানেরই তা কিন্তু নয় , বরং বিদেশী গবেষকরাও এখানে তাদের গবেষণাকর্মের প্রয়োজনে আসা-যাওয়া করেন৷
পশুপাখিদের আশ্রয়স্থল ‘খোশ এইলক'ও সেমনান প্রদেশের আরেকটি নামকরা সংরক্ষিত এলাকা৷ এর আয়তন এক লক্ষ ছাপ্পানো হাজার হেক্টর৷ শাহরুদ শহরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত খোশ এইলক৷ তুরানের মতো এখানেও রয়েছে বিচিত্র প্রজাতির পশুপাখি এবং বিভিন্ন জাতের গাছগাছালি৷
সেমনান শহরের উত্তর-পূর্বদিকে রয়েছে আরেকটি সংরক্ষিত এলাকা৷ এই এলাকাটির নাম ‘ফারভার'৷ ফারভারের আয়তন ৫৩ হাজার ৮৪০ হেক্টর৷ পশুপাখি এবং উদ্ভিদগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ফারভারও খোশ এইলক এবং তুরানের মতোই৷
এই তিনটি বিশেষ এলাকা ছাড়াও সেমনানে আরো বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে৷ আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের কারণে বিভিন্ন স্থানে এগুলো গড়ে উঠেছে৷ শিকার করা যাদের শখ ,কিংবা যারা ইরান ভ্রমণে আগ্রহী তারা এ এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে আনন্দিত হবেন-এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে ৷


( ১৪৬ তম পর্ব )


পাঠক ! আজ আমরা যাবো ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ লোরেস্তানে৷ লোরেস্তানের আয়তন ২৮ হাজার ৫৫৯ বর্গকিলোমিটার৷ লোরেস্তানের উত্তরে রয়েছে হামেদান ও কেন্দ্রীয় প্রদেশ,দক্ষিণে রয়েছে খুযিস্তান প্রদেশ,পূর্বদিকে রয়েছে ইস্ফাহান প্রদেশ এবং পশ্চিমে রয়েছে বখতারন এবং এইলম প্রদেশ৷ লোরেস্তান প্রদেশটি কেন্দ্রীয় যাগরোসে একটি অংশে পড়েছে৷ বিস্তৃত পার্বত্য এলাকা, উঁচু উঁচু বহু শৃঙ্গ , বিক্ষিপ্ত উপত্যকা ও মরু অঞ্চল ইত্যাদির সমন্বয় ঘটার কারণে লোরেস্তানের আবহাওয়ায় ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়৷ আবহাওয়াগত দিক থেকে বিভক্ত করলে লোরেস্তানকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ পার্বত্য শীতল এলাকা, নাতিশীতোষ্ণ এলাকা এবং অর্ধমরু উষ্ণ এলাকা৷ পাঠক ! চলুন লোরেস্তানের এই বৈচিত্র্যের সাথে আরো নিবীড়ভাবে পরিচিত হওয়া যাক৷
লোরেস্তান প্রদেশের পূর্ব , উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম দিক অন্তত দুই হাজার মিটার উঁচু হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া শীতকালে ঠাণ্ডা এবং গ্রীষ্মকালে নাতিশীতোষ্ণ থাকে৷ তবে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খুযিস্তানের সমতল ভূমি ও এইলামের উষ্ণ অঞ্চলের সাথে যুক্ত থাকার কারণে শীতকালেও এখানকার আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ আর গ্রীষ্মকালে থাকে গরম৷ অনুকূল আবহাওয়ার কারণে লোরেস্তান এবং তার আশেপাশের প্রদেশগুলোর উপজাতীরা তাদের শীতকালীন আবাসনের জন্যে এই এলাকাটিকে বেছে নেয়৷
পাঠক ! প্রদেশটির প্রাকৃতিক বর্ণনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, লোরেস্তানের প্রায় ৮৫ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে পাহাড়-পর্বত৷ এখানকার পাহাড়গুলোর গড় উচচতা হচেছ সতেরো শ' মিটারের উপরে৷ সবচে উঁচু চূড়াটির নাম হলো ‘ওশ্‌ত্রাঙ্কুহ' ৷ প্রদেশের পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বে চূড়াটির অবস্থান৷ ওশ্‌ত্রাঙ্কুহ চূড়াটির উচচতা চার হাজার পঞ্চাশ মিটার৷ এ অঞ্চলের সর্বোচচ এই চূড়াটি ছাড়াও অপরাপর যতোগুলো পাহাড় এখানে রয়েছে, সবগুলোর চূড়াই মোটামুটি সারাবছর জুড়েই বরফাচছাদিত থাকে৷ এই বরফ লোরেস্তানের পানির প্রধান উৎস৷ গোহার হ্রদটি এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম৷ ওশ্‌ত্রাঙ্কুহ'র পাশেই এটি অবস্থিত৷ তো এই সুন্দর হ্রদটির সাথে আমরা আগামী কোনো আসরে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো৷ আজ বরং অন্য বিষয়েই আমরা আমাদের বক্তব্য সীমিত রাখি৷
কেন্দ্রীয় যাগরোসের উচচতায় লোরেস্তান প্রদেশের অবস্থানের কারণে এবং স্বাস্থ্যকর বা অনুকূল আবহাওয়া আর তুলনামূলকভাবে আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে এর বাহ্যিক সৌন্দর্যটা দর্শনীয় হয়ে উঠেছে৷ এখানে গড়ে উঠেছে সবুজ বন জঙ্গল৷ বলা হয়ে থাকে যে, সমগ্র লোরেস্তান প্রদেশের শতকরা তেইশ ভাগ এলাকা জুড়ে রয়েছে বন-বনানী৷ এখানকার বনানীগুলোকে ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ওক বনেরই একটা অংশ হিসেবে ধরা হয় , যার আয়তন হলো ৭৫ হাজার হেক্টর৷ যদিও লোরেস্তানের জঙ্গলে ওক গাছ ছাড়াও আরো বহু প্রজাতির গাছ-গাছালি রয়েছে৷ যেমন ডালিম গাছ, চুনার গাছ, বুনো নাশপাতি, বুনো পেস্তা এবং আখরোট গাছ ইত্যাদি৷ লোরেস্তান প্রদেশে উদ্ভিদের ব্যাপক সমৃদ্ধির ফলে এই এলাকাটি পশুপালন করার জন্যে খুবই উপযোগী৷ এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এখানে যাযাবররা নিয়মিতভাবেই বসবাস করে আসছে৷ লোরেস্তানে এখনো যেমন যাযাবরদের বসবাসের ধারা অব্যাহত রয়েছে তেমনি পশুপালনের রেওয়াজও লক্ষ্য করা যায় এখনো৷ এখানকার সমতল ভূমি এবং উর্বর মৃত্তিকায় কৃষিকাজ করা হচেছ , আবার বাগ-বাগিচাও গড়ে উঠেছে অল্প স্বল্প৷ অবশ্য বাগ-বাগিচা তেমন একটা বিস্তৃতি পায় নি লোরেস্তানে৷ লোরেস্তান মূলত পশুপালনের উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবেই স্বীকৃত৷
লোরেস্তান হলো ইরানী লোর গোত্রীয়দের মূল ভূখণ্ড৷ লোরদেরকে মনে করা হয় প্রাচীন আর্যদের বংশোদ্ভুত৷ ইরানের প্রাচীন ইতিহাসে এদেরকে কসিহা' বা কসিয়াত্‌হা' নামে উল্লেখ করা হয়েছে৷ এরা দুটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতো৷ একটি হলো লোরী অপরটি লাকি ৷ এই উপভাষাগুলোর ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন,তারপরও আজ পর্যন্ত ভাষাগুলো তেমনিই অপরিবর্তিত রয়েছে৷ লোরী ভাষার একটা সহজ এবং প্রচলিত ঢং রয়েছে যার অধিকাংশ শব্দ , পরিভাষা এবং বলার ভঙ্গী ফার্সি ভাষার কাছাকাছি৷ লোরেস্তানের বেশিরভাগ মানুষই এই ভাষায় কথা বলে৷
লাকি উপভাষাটি অনেকটা কেরমানশাহী কুর্দি ভাষার মতো৷ লোরেস্তানের বৃহত্তর উপজাতিরা বিশেষ করে যারা উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিম উপকূলে বাস করে , তাদের বেশিরভাগই এই লাকি ভাষায় কথা বলে৷ সর্বোপরি বলা যায় যে, লোরেস্তানের ভাষা বেশ প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক৷
লোরেস্তানের অধিবাসীরা মোটামুটি সবাই পবিত্র দ্বীন ইসলামের অনুসারী৷ ইসলামী বিধি-বিধানের ব্যাপারে তারা খুবই আন্তরিক এবং সচেতন৷ লোরেস্তানীরা সদ্বংশীয় , অভিজাত এবং দেশপ্রেমিক৷ মহত্ব এবং বীরত্ব তাদের বৈশিষ্ট্য৷ এখানকার মানুষ সৎ এবং নিষ্কলুষ সত্যবাদী স্বভাবের৷ সামাজিকতা , আচার-ব্যবহার এবং বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এরা অগ্রগামী এবং বন্ধুত্ব রক্ষার জন্যেও তারা আন্তরিকতার সাথে এক পায়ে দাঁড়ানো৷ কাউকে কোনো কথা দিলে তা রক্ষা করার ব্যাপারে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ৷ অতিথি পরায়ণতার ব্যাপারেও তাদের ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে৷
এতোক্ষণ তো লোরেস্তানের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলা হলো৷ এই প্রদেশের সাথে আমরা আরো বেশি পরিচিত হবার চেষ্টা করবো পরবর্তী আসরে৷ তো আমরা আজকের এ আসর শেষ করবো অস্ট্রিয়ার একজন বিখ্যাত পর্যটকের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে৷ তাঁর নাম হলো মাপেরু সমিনিভার৷ তিনি একজন পুরাতত্ত্ববিদ৷ ইরানের বিভিন্ন শহরের প্রাচীন নিদর্শনের ওপর পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদন তৈরীর প্রয়োজনে তিনি একবার ইরান সফরে এসেছিলেন৷ ইরান এসে তিনি বিভিন্ন শহর ঘুরে ফিরে দেখেন৷ সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ভিয়েনার নৃতত্ত্ব যাদুঘরের এই গেবেষক বলেন ভ্রমণ ,পুরাতত্ত্ব গবেষণা ইত্যাদির জন্যে ইরান হলো সবচে নিরাপদ একটি দেশ৷ তিনি আরো বলেন ইরানে পর্যটকদের ভ্রমণ করতে আসার গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো দর্শনীয় স্থানগুলোর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের আন্তরিক সহযোগিতা৷ বিশেষ করে তথ্য সরবরাহের ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা খুবই আন্তরিক৷ তিনি ইরানে অবস্থিত বিশ্বের সবচে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ পানির ধারাটিও পরিদর্শন করেন৷ বলা হয়ে থাকে যে, পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন ‘ভূগর্ভস্থ পানির ধারাটি' ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খোরাসানে অবস্থিত৷ আড়াই হাজার বছরের পুরোণো এই ধারাটি তেত্রিশ কিলোমিটার লম্বা৷ ৩৬০ মিটার এর গভীরতা৷ প্রতি সেকেন্ডে ১৮০ লিটার পানি এখান থেকে পাওয়া যায় ৷


( ১৪৭ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশে ঘুরে বেড়াচিছ৷ ইতোমধ্যে আমরা এই প্রদেশের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিত হয়েছি৷ আজকের আসরের প্রথমার্ধে আমরা লোরেস্তোনের অতীত ইতিহাসের সাথে পরিচিত হবো৷ তারপর আমরা লোরেস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর র্খু‌রামাবাদের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো৷ তো আপনারা আমাদের সাথেই আছেন এই প্রত্যাশা রইলো৷
প্রাচীনকাল থেকেই লোরেস্তান প্রদেশ ছিল আবাসিক এলাকা ৷ তাই এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন৷ প্রায় আশি বছর আগে থেকে পুরাতত্ত্ববিদ এবং গবেষকরা এখানে খননকাজ চালিয়ে ব্রোঞ্জের বহু সরঞ্জাম আবিষ্কার করেন৷ তারপর থেকে লোরেস্তান ইরানে তো বটেই সমগ্র বিশ্বেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে৷ এই প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে যে খননকাজ চালানো হয়েছে, ঐ খননকাজ থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনাবলী থেকে অনুমান করা হয়ে থাকে যে হাজার হাজার বছর আগে এখানে মানব অস্তিত্ব ছিল৷ মুসলিম আমলে লোরেস্তান প্রদেশের বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম৷ লোরেস্তান থেকে উত্তর এবং দক্ষিণ দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে,ঐ রাস্তাটি ছিল বহু গোত্র ও গোষ্ঠির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ ৷ যেহেতু কাসিয়ান,বাবেলিয়ান, এইলামিয়ান,সাসানীয়ানরা লোরেস্তান শাসন করেছে বহুকাল,সেহেতু তাদের নিজ নিজ সভ্যতার বহু নিদর্শন এখানে তারা রেখে গেছে ৷
হিজরী ১৬ এবং ২১ সালে লোরেস্তানের নাহাবান্দ যুদ্ধ মুসলমানদের মনোযোগ কেড়েছিল৷ এ সময় থেকেই বিভিন্ন রাজবংশ এখানে হুকুমাত করতে থাকে৷ কিন্তু মোগল আমলে ইরানের অন্যান্য এলাকার মতো লোরেস্তানও তাদের আক্রমণের শিকার হয়৷ তবে কাজারী রাজবংশ এবং পাহলাভি রাজবংশের আমলে লোরেস্তান ভূখণ্ডটি বিভক্ত হয়ে যায়৷ তবে চার দশক আগে লোরেস্তান একটি প্রদেশের মর্যাদা পায়৷ বর্তমানে লোরেস্তানে ৯টি শহর রয়েছে৷ শহরগুলো হলো-খুররামাবাদ, বুরুর্জা‌দ্‌, আলিগুদার্য্‌, দেলফন, দরুদ, কুহদাশ্‌ত, আয্‌না, সেলসেলেহ এবং পোলদোখতার৷
খুররামাবাদ হলো লোরেস্তানের কেন্দ্রীয় শহর৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহরটির উচচতা ১১৭১ মিটার৷ উঁচু উঁচু পাহাড় ঘেরা সরু একটি উপত্যকায় ‘খা'ইদলু' শহরের ধবংসাবশেষের উপর সাসানী আমলে এই শহরটি গড়ে উঠেছে৷ খুররামাবাদ ইরানের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি৷ অতীতকাল থেকেই খুররামাবাদ ছিল সভ্যতার লালনভূমি৷ এখানকার পাহাড়গুলোতে প্রচুর পানি এবং অসংখ্য ঝর্ণা থাকায়,সেইসাথে বন-বনানী আর প্রাকৃতিক চারণভূমি থাকায় প্রাচীনকাল থেকেই এখানকার অনুকূল পরিবেশ ও আবহাওয়ায় বিভিন্ন গোষ্ঠি-গোত্রের লোকজন বসতি গড়ে তুলেছিল৷ প্রাগৈতিহাসিক কালের যেসব নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে,সেগুলোর প্রাচীনত্ব কয়েক হাজার বছর৷
বহু বস্তু ও নিদর্শন এবং প্রাথমিক যুগের মানুষের হাড্ডি খুররামাবাদ শহরের আশেপাশের গুহাগুলোতে পাওয়া গেছে৷ এইসব গুহার মধ্যে কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ যেমন কামারী গুহা, ইয়ফতেহ গুহা, পসাঙ্গার গুহা, কুঞ্জি গুহা ইত্যাদি৷ পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ ব্যাপক গবেষণা চালিয়ে এইসব গুহায় যেসব নিদর্শন পেয়েছেন, সেসব নিদর্শন থেকে প্রমাণিত হয় যে, এখানে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানব বসতি ছিল৷ এইসব নিদর্শন খুররামাবাদ শহরকে এই প্রদেশের অন্যান্য শহর থেকে স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছে৷ প্রাদেশিক শহর হিসেবে এখানে ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলী একটু বেশিই দেখতে পাওয়া যায়৷ কয়েকটির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ যেমন শা'পুরখস্ত্‌ শহর, শা'পুরি ব্রিজ, গের্দব সাঙ্গি , ফালাকুল আফলক কেল্লা, মিনার এবং শিলালিপী৷ আসরের এ পর্যায়ে আমরা এইসব নিদর্শনের মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির সাথে সংক্ষেপে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো৷
শা'পুরখস্ত শহর খুররামাবাদের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি৷ শা'পুরখস্ত সাসানী আমলের শহর৷ প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম শা'পুরের নির্দেশে এই শহরটি নির্মিত হয়েছে৷ খুররামাবাদ শহরের দক্ষিণ উপকন্ঠে এই শহরের স্মৃতিচিহ্ন এখনো দেখতে পাওয়া যায়৷ এখানকার উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে শিলালিপী এবং শা'পুরি ব্রিজের নাম করা যেতে পারে৷ শহরের আশেপাশে এগুলোর ধবংসাবশেষ এখনো তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়৷ এখনো আরো একটি প্রাচীন নিদর্শন আছে৷ সেটা হলো বেশ উঁচু এবং লম্বা লম্বা দেয়াল৷ সাসানী যুগের স্থাপত্যকলার রীতি অনুযায়ী এটি নির্মিত৷
ফালাকুল আফলাক দূর্গ খুররামাবাদ শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নিদর্শন ৷ এটিও প্রথম শা'পুরের আমলে নির্মিত হয়েছে৷ খুররামাবাদ শহরের কেন্দ্রে নদীর তীরে বড়ো একটি পাথরের টিলার উপরে এই দূর্গটি অবস্থিত৷ অবস্থানগত দিক থেকে এবং জটিল নির্মাণ শৈলীর কারণে এই দূর্গটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ছিল ৷ বর্তমানে অবশ্য এটি লাইব্রেরী এবং নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘরে পরিণত হয়েছে ৷
ফালাকুল আফলাক দূর্গের আয়তন প্রায় ২৩০ মিটার ৷ টিলা থেকে ২৩ মিটার উপরে এটি অবস্থিত৷ কেল্লার প্রবেশদ্বারটি উত্তর দিকে মুখ করা ৷ দ্বারটি উচচতায় তিন মিটার , আর প্রস্থে দুই মিটার ৷ কেল্লার ভেতরে দুটি বড়ো বড়ো উঠোন আছে ৷ উঠোনের চারপাশ ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো কক্ষ ৷ কক্ষের জানালাগুলোর কপাট বাইরের দিকে খোলার পদ্ধতিতে বানানো হয়েছে ৷ কেল্লাটির নীচ দিয়ে একটি ঝর্ণা প্রবাহিত ৷ ঐ ঝর্ণার পানি বিশুদ্ধ এবং পানীয় জল হিসেবে ব্যবহারের উপযুক্ত ৷ ঝর্ণাটি ‘গোলেস্তান' নামে প্রসিদ্ধ ৷ কেল্লার পূর্বেও প্রবহমান রয়েছে একটি নদী ৷ সেইসাথে সুন্দর সুন্দর বাগ-বাগিচা পুরো পরিবেশটাকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে ৷


( ১৪৮ তম পর্ব )


পাঠক ! আমরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশে ঘুরে বেড়াচিছ৷ ইতোমধ্যে আমরা এই প্রদেশের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিত হয়েছি৷ পরিচিত হয়েছি কেন্দ্রীয় শহর খুররামাবাদসহ আরো কয়েকটি শহরের সাথেও ৷ আজকের আসরে আমরা পরিচিত হবো লোরেস্তানের বুরুজার্দ শহরের সাথে৷
লোরেস্তান প্রদেশের সুন্দর এবং বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি শহর হলো বুরুজার্দ৷ লোরেস্তানের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত এটি৷ বুরুজার্দ শহরের উত্তর দিকে রয়েছে মোলায়ের শহর, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে খুররামাবাদ শহর, উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে নাহা'ভান্দ শহর আর পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বে রয়েছে আরাক শহর৷ এটি একটি পার্বত্য এলাকা৷ তাই এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহরটির উচচতা হলো ১৫৪০ মিটার৷ এখান থেকে যতোই দক্ষিণ দিকে যাওয়া যাবে,এর উচচতা কমতে থাকবে৷ যুগে যুগে এই বুরুজার্দ শহরটির ওপর ধবংসযজ্ঞ চলেছে বহুবার৷ এই শহরটি গড়ে ওঠার ইতিহাস সম্পর্কে ইতিহাসবিদগণ বিচিত্র মত ব্যক্ত করেছেন৷ তবে এখানকার সবুজ-শ্যামলিমা আর আনন্দঘন পরিবেশ যে জনগণকে এখানে এসে সমবেত হতে উদ্বুদ্ধ করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ তবে ফিরোয সাসানীর আমলেই এই শহরটি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়৷
ইসলামের আবির্ভাবের পর এবং হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর পর আবু ইসহাক ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মাদ এসতাখ্‌রী তাঁর ‘মাসালেক ও মামালেক' নামক গ্রন্থে বুরুজার্দ শহর ও তার ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পর্কে লিখেছেন৷ এই গ্রন্থে তিনি বুরুজার্দ শহরকে একটা বড়ো শহর বলে উল্লেখ করেছেন এবং এখানকার সহিষ্ণু কোমল আবহাওয়ার কথাও বলেছেন৷ বুরুজার্দকে একটি নিয়ামতপূর্ণ শহর বলে মন্তব্য করেছেন৷ তিনি লিখেছেন এখানকার ফলফলাদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়৷ খেজুর আর জাফরান এই শহরে ব্যাপক উৎপাদিত হয়৷ বুরুজার্দ পার্বত্য অঞ্চল হবার কারণে এখানকার উঁচু উঁচু পর্বতচূড়াগুলোতে বরফ জমে থাকে সারাবছর৷ জমাট বরফ গলে গলে তাই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য ঝর্ণা৷ এই ঝর্ণা থেকে উৎপত্তি হয়েছে বহু নদ-নদীর৷ এইসব নদ-নদী আর ঝর্ণাধারার পাশাপাশি মাটির উর্বরতার ফলে এখানে প্রাকৃতিক এক চমৎকার পরিবেশ তৈরী হয়েছে৷ বুরুজার্দ শহরের ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে আছে চমৎকার জলাশয়৷ এই জলাশয় কেবল দৃষ্টিনন্দনই নয় বরং এটি জলজ প্রাণী আর অতিথি পাখিদের এক নিরাপদ বাসস্থান৷
তো, বুরুজার্দ শহরের ভৌগোলিক এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিত হওয়া গেল এতোক্ষণ৷ এবার এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সাথে খানিকটা পরিচিত হওয়া যাক৷ বুরুজার্দ শহরের একটি ঐতিহাসিক ও সুন্দর স্থাপনা হলো এই শহরের জামে মসজিদ৷ বুরুজার্দ শহরের পূর্বাংশে এটি অবস্থিত৷ তৃতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে৷ এই মসজিদটির মেহরাবের উপরাংশে কুফি অক্ষরের লিপীকর্ম করা হয়েছে৷ মসজিদের মূল গেইটেও পাথরের একটি ফলক লাগানো হয়েছে৷ এই ফলকে শাহ আব্বাস সাফাভির একটি বক্তব্য লেখা আছে যাতে লেখার তারিখ লেখা হয়েছে ১০২২ সাল৷ এইসব তথ্য-প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, কাজারী এবং সাফাভি শাসনামলে এই মসজিদের মেরামত কাজ করা হয়েছে৷
এই শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হলো ইমাম মসজিদ৷ প্রাচীন মসজিদের ধবংসাবশেষের ওপর কাজারী আমলে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে৷ মসজিদের উঠোনের মাঝখানে বড়ো একটা পানির হাউজ আছে৷ কাজারী আমলের প্লাস্টারিং এবং টাইলসের কারুকাজের সাথে সোল্‌স অক্ষরে লেখা কোরআনের আয়াতের শিল্পকর্ম মসজিদটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে৷ বুরুজার্দ ইমাম মসজিদে অনেকগুলো কক্ষ আছে৷ এগুলো পড়ালেখা করার জন্যে এবং দ্বীনী শিক্ষার্থীদের বসবাসের জন্যে৷ বলা হয়ে থাকে যে,বুরুজার্দে এবং তার আশেপাশে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন রয়েছে৷ এগুলোর সাথে পরিচিত হবার মতো সময় আজ আমাদের হাতে নেই৷
লোরেস্তানের শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র ধারা রয়েছে৷ রয়েছে স্বতন্ত্র ধারার মিউজিকও৷ আসরের এ পর্যায়ে চলুন আমরা লোরেস্তানের স্থানীয় মিউজিকের সাথে খানিকটা পরিচিত হই৷ প্রায় সকল উন্নত সংস্কৃতিতেই ন্যাশনাশ এবং ট্র্যাডিশনাল মিউজিকের পাশাপাশি স্থানীয় মিউজিক নামে আরেকটি মিউজিকের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়৷ বিশাল ভূখণ্ডের দেশ ইরানে এই স্থানীয় মিউজিকের এতো প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র্য রয়েছে যে,বলা যায় স্থানীয় মিউজিকের বৈচিত্র্যের দিক থেকে ইরান আদর্শস্থানীয় দেশগুলোর একটি৷ ইরানের উত্তর থেকে দক্ষিণে কিংবা পূর্ব থেকে পশ্চিমে যদি যাওয়া যায়, তাহলে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের সাথে সাথে শিল্প-সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যাবে৷
লোরেস্তানের মিউজিকও তেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও স্বতন্ত্র৷ এখানকার মিউজিকগুলোর বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্যও রয়েছে৷ যেমন যুদ্ধ-বিগ্রহের মিউজিক,বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মিউজিক, আনন্দের মিউজিক ইত্যাদি৷
মিউজিক হলো মানুষের মনের আবেগ-অনুভূতিগুলোর ছন্দময় ও সুরেলা প্রকাশ৷ ফলে লোরেস্তানের এই মিউজিকগুলোর মধ্যে তাদের মানসিক অনুভূতিগুলো সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাবে৷ নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, লোরেস্তানের মিউজিক এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, শত্রুদের সাথে এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা জীবন চেতনা থেকেই উজ্জীবিত ৷
লোরেস্তানের কবিতা এবং মিউজিক কিংবা কবি ও বাদকদের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে৷ এমনকি বলা যায় যিনি কবি তিনিই বাদক, কিংবা যিনিই বাদক তিনি আবার কবিও৷ তার মানে লোরেস্তানে যারা কবিতা লেখেন তারাই মিউজিক চর্চা করেন৷ লোরেস্তানের বাদ্যযন্ত্রগুলো বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে যেমন ব্যবহার করা হয় তেমনি শোকানুষ্ঠানেও ব্যবহার করা হয়৷ বড়ো তবলা এবং বাদ্যযন্ত্র সহকারে যে শোকানুষ্ঠান করা হয় তাকে চামারি বলে৷ সাধারণত মুহররম মাসে রাস্তাঘাটে কিংবা স্কোয়ারে শোকানুষ্ঠানকারীরা জড়ো হয়ে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে এই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করে থাকে৷ শুধু শোকানুষ্ঠান কেন বিয়ে-শাদির মতো আনন্দঘন অনুষ্ঠানাদিতেও লোরেস্তান এবং তার আশপাশের এলাকাগুলোতে এই বড়ো তবলা যাকে স্থানীয় ভাষায় দাহোল বলা হয়,তার সাথে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ এইসব অনুষ্ঠান একটানা দু'তিন রাত ধরেও চলে।


( ১৪৯ তম পর্ব )


পাঠক ! আজকের আসরের মধ্য দিয়ে পূর্ণ হলো ইরান ঐতিহ্যের ১৫০ তম পর্ব৷ তাই আপনাদের সবার প্রতি রইলো অকৃত্রিম শুভেচছা ও অভিনন্দন৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে ঘুরে বেড়াচিছ৷ এরিমধ্যে আমরা এখানকার বেশ কটি শহর ঘুরেও দেখেছি৷ ভৌগোলিক এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে লোরেস্তানের আবহাওয়াগত পার্থক্য যেমন রয়েছে, তেমনি এখানে রয়েছে প্রাকৃতিক বিচিত্র সুন্দর দৃশ্যাবলীও৷ সেইসাথে আছে বুনো প্রাণীদের বসবাসের জন্যে নিরাপদ অরণ্যও৷ আজকের আসরের শুরুতেই আমরা এই বুনো প্রকৃতির সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো৷ আপনারা যথারীতি আমাদের সাথেই থাকছেন-এ প্রত্যাশা রইলো৷
লোরেস্তানের সংরক্ষিত একটি এলাকার নাম হলো ‘এশ্‌ত্রাঙ্কূহ'৷ এর আয়তন হলো চুয়ান্ন হাজার চার শ' চল্লিশ হেক্টর৷ দরুদ,আলীগুর্দা‌জ এবং আয্‌না-এই তিনটি এলাকার মাঝখানে পড়েছে এশত্রাঙ্কূহ৷ এশত্রাঙ্কূহ অঞ্চলটি আল্লাহর দেওয়া নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা৷ কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কেবল ফুলের বাগান৷ বিচিত্র সুগন্ধি ফুলের ঘ্রাণে অপূর্ব এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এখানে৷ বাখতিয়রি উপজাতী অধ্যুষিত এলাকা এটি৷ এশত্রাঙ্কূহ সমগ্র লোরেস্তানের মধ্যে সবচে উঁচু পাহাড়৷ পর্বতারোহীরা তাই এই পাহাড়টিতে আরোহণ করতে পছন্দ করে৷ তবে এই অঞ্চলের এতো খ্যাতি কিন্তু অন্য একটি কারণেই বেশি৷ সেটা হলো এখানে আছে অসম্ভব সুন্দর একটি হ্রদ৷ হ্রদটির নাম গাহার৷
গাহার হ্রদটি দুটি ছোটো বড়ো হ্রদের সমষ্টি৷ একটির নাম ছোটো গাহার অপরটির নাম বড়ো গাহার৷ বড়ো গাহার হ্রদটি সমগ্র ইরানের মধ্যেই দর্শনীয় সুন্দর একটি পার্বত্য হ্রদ৷ এই হ্রদটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৪০০ মিটার৷ হ্রদটির গভীরতা প্রায় ত্রিশ মিটার৷ দৈর্ঘে এটি আড়াই হাজার মিটার এবং প্রস্থে ৬০০ মিটার৷ হ্রদের চারপাশে উইলো গাছসহ বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালির প্রাচুর্যের কারণে পার্কের মতো একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে৷ এই সৌন্দর্যের কারণে এখানে সারা বছর জুড়েই অতিথিদের আগমণ ঘটে থাকে৷ ছোটো গাহার হ্রদটি বড়ো গাহার হ্রদ থেকে সতেরো শ' মিটার দূরত্বে অবস্থিত৷ এই হ্রদটির আয়তন প্রায় সাত হেক্টর৷ হ্রদটির গভীরতা চার মিটার৷ এই হ্রদটি ‘গেযেল অ..ল..' নামের লাল আঁশ বিশিষ্ট সুস্বাদু মাছ চাষের জন্যে খুবই উপযোগী৷
বড়ো গাহার হ্রদ জুড়ে সাদাপানি নামের একটা নদী বয়ে গেছে৷ নদীটি কয়েক কিলোমিটার গিয়ে প্রায় পাঁচ শ' মিটার প্রস্থের শিলাময় একটি উপত্যকার ভেতরে গিয়ে ঢুকেছে৷ সরু এই প্রণালীটির তলদেশ দিয়ে বয়ে গেছে সাদাপানি নদী৷ প্রণালী এই জন্যে বলা হচেছ যে এর দুই পাশে বেশ উঁচু উঁচু পাথুরে দেওয়াল৷ প্রাকৃতিক এই পাথরের দেওয়ালগুলো পর্বতারোহীদের খুবই আকৃষ্ট করে৷ নদীর দুই প্রান্ত জুড়ে রয়েছে ফল-ফুলের গাছ৷ ফল গাছের মধ্যে রয়েছে আখরোট, ডুমুর, আপেল, বাদাম এবং তুত৷
প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য ছাড়াও এশত্রাঙ্কূহতে রয়েছে সরীসৃপ এবং পাখ-পাখালির মতো বিচিত্র প্রাণীর বাস৷ পাখিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটির নাম করা যেতে পারে৷ যেমন, তিতির জাতীয় পাখি, কাক পাখি, চড়-ই পাখি, সোনালী ঈগল, বাজপাখি , শ্বেত সারস , সবুজ মাথার পাতিহাঁস, কয়েক প্রজাতির সাপ এবং আরো অনেক প্রাণী৷
লোরেস্তানে শিকারের জন্যে উপযুক্ত কয়েকটি স্থান আছে৷ সরকার অনুমোদিত ঋতুগুলোতে সেখানে শিকার করার অবাধ ব্যবস্থা রয়েছে৷ এইরকম শিকারী অঞ্চলগুলোর মধ্যে দাশ্‌তে মিশননে র নাম করা যেতে পারে৷ কূহদাশ্‌ত শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এটি অবস্থিত৷ দাশতে মিশনন গাছগাছালিপূর্ণ একটি এলাকা৷ এখানে রয়েছে প্রচুর ঝর্ণা এবং জলপূর্ণ ছোটো ছোটো অনেক ডোবা৷ তাই হরিণ, দুম্বা এবং ভেড়ার মতো পশুগুলোর বসবাসের জন্যে এটি একটি একটি এলাকা৷
আকাশচুম্বি চূড়াময় গুরিন পাহাড়টিও পশুদের জন্যে একটি নিরাপদ বাসস্থান৷ এখানে ছাগল , চিতাবাঘ , দুম্বা এবং মেষসহ আরো বহু প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে৷ গাছ-গাছালির মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্য৷ যেমন মেরনি রঙের ছোট্ট ফলের গাছ যেরেশ্‌ক, ওক গাছ, বুনো কুল গাছ, বুনো নাশপাতি গাছ, কালো রঙের চেরি গাছ, চেরি গাছ, বুনো ডুমুর গাছ, আখরোট গাছ, চুনার গাছ ইত্যাদি৷ লোরেস্তানে বছরের বিভিন্ন ঋতুতে মোটামুটি ভালোই বৃষ্টিপাত হয়৷ যার ফলে এখানে কিছু পুকুরও দেখতে পাওয়া যায়৷ পরিবেশগত দিক থেকে এগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে৷ পুকুরগুলোতে একদিকে মাছের চাষ হয়৷ অপরদিকে এখানে অতিথি পাখির আনাগোনা থাকায় পরিবেশটাও বেশ সুন্দর৷ ১৯৮৯ সালে লোরেস্তানের পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগ এই এলাকাটিকে সর্বসাধারণের জন্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়৷ এখানকার বুনো প্রাণীদের নমুনা লোরেস্তানের খুররামাবাদে অবস্থিত প্রাকৃতিক ইতিহাস যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে৷
লোরেস্তান প্রদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে আরেকটি দর্শনীয় এবং উপভোগ্য জিনিস হলো এখানকার অসংখ্য ঝর্ণা৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ চেকন ঝর্ণা এবং শুয়ি ঝর্ণার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ শুয়ি ঝর্ণাটি হলো সালেন পাহাড়ে ৷ পাহাড়টির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৬ শ' ৪৯ মিটার৷ লোরেস্তানের সর্বদক্ষিণে এটি অবস্থিত৷ শুয়ি ঝর্ণাটি বেশ সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক৷ একটা গুহার ভেতর থেকে এই ঝর্ণাটির পানি বেরিয়ে আসছে এবং অনেক নীচে তা পতিত হচেছ৷ বসন্ত ঋতুতে প্রায় সমগ্র ইরান থেকেই লোকজন অবকাশ যাপনের জন্যে , ঝর্ণার পাশে দাঁড়ানোর জন্যে মনোদৈহিক প্রশান্তির জন্যে এখানে ছুটে আসে৷
চেকন ঝর্ণাটিও এরকমই দেখতে৷ আল্লাহর সৃষ্টি এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে যে-কেউই যে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠবে , খুশিতে বাগবাগ হয়ে উঠবে-তাতে আর সন্দেহ কী ! চেকন ঝর্ণার পানি দিয়ে গ্রীষ্মকালে কৃষিক্ষেত্রের পানির প্রয়োজনীয়তা মেটানো হয়৷ এই পানির ব্যবহার চেকনকে সবুজের সমারোহে পরিপূর্ণ করে তোলে৷ আমরা লোরেস্তানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কথা বললাম এতোক্ষণ৷ আসরের শেষ পর্যায়ে এসে আমরা এ এলাকার হস্তশিল্পের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো ৷ লোরেস্তানের হস্তশিল্পের ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন৷ এখানকার অর্থনীতির বিরাট একটি যোগান আসে এই হস্তশিল্প থেকে৷ বিশেষ করে এখানে হাতে বোণা গালিচার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে ৷ এই প্রদেশের যেসব অঞ্চলে গালিচা বোণার প্রচলন বেশি,সেগুলোর মধ্যে রয়েছে খুররামাবাদ,আলীগুদার্য্‌,দুরুদ এবং তার আশপাশের কিছু গ্রাম ৷ পশমি কার্পেটও এখানকার আরেকটি উল্লেখযোগ্য হস্তশিল্প ৷ লোরেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় উপজাতীদের বসবাস রয়েছে৷ তাদের কল্যাণেই এই পশমি কার্পেটগুলো তৈরী হয় ৷ সাধারণত উপজাতী মহিলারাই এগুলো বোণে৷ খুররামাবাদ,কূহদাশ্‌তসহ তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে পশমি কার্পেট বোণার প্রচলন বেশি ৷


( ১৪৯ তম পর্ব )


পাঠক ! আমরা গত ক'সপ্তাহ ধরে পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে ঘুরে বেড়িয়েছি ৷ আজ আমরা এই প্রদেশ ছেড়ে যাবো কুর্দিস্তানের দিকে ৷ কুর্দিস্তান বন-জঙ্গলাকীর্ণ শ্যামল এলাকা ৷ আকাশচুম্বি পর্বতঘেরা এই এলাকাটি যে বেড়ানোর জন্যে খুবই ভালো তাতো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না ৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে রয়েছে দেখার মতো ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন ৷ আমরা ধীরে ধীরে এইসব স্পটে যাবো ৷ অবশ্য আপনাদের সাথে নিয়েই ৷
কুর্দিস্তান প্রদেশটির আয়তন প্রায় ২৮ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার৷ ইরানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রদেশটি৷ কুর্দিস্তানের উত্তরে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান এবং যানজানের অংশবিশেষ, দক্ষিণে রয়েছে কেরমানশাহ প্রদেশ, পূর্বে রয়েছে হামেদান প্রদেশ এবং পশ্চিমে রয়েছে ইরাকের সাথে ইরানের সীমান্ত৷ অসমতল ও উঁচু এলাকা হবার কারণে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে কুর্দিস্তান ইরানের একটি শীতল এলাকা হিসেবে পরিচিত৷ তবে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়৷ এই প্রদেশে অনেক নদনদী আছে৷ এইসব নদনদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করার পর অবশিষ্ট পানি 'সেইরাভন' নদী এবং 'যব্কুচাক' নদী হয়ে ইরাক ভূখণ্ডে চলে যায় কিংবা গেযেল উযন নদী বা যাররিনে নদী হয়ে কুর্দিস্তান ছেড়ে কাস্পিয়ান সাগর অথবা উরুমিয়ে হ্রদে গিয়ে পড়ে ৷
কুর্দিস্তান প্রদেশে আটটি শহর রয়েছে৷ শহরগুলো হচ্ছে সানান্দাজ, ব'নে, দিভনদার্রে, সাক্গেয, ক্বোরবে, মারিভন, কমিয়রন এবং বিজর৷ সানান্দাজ শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৮০ মিটার উচ্চে অবস্থিত৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর এই সানান্দাজ৷ কুর্দিস্তানের জনগণ মুসলমান এবং তাদের ভাষা হলো কুর্দি ভাষা৷ তবে কুর্দিস্তানের সকল এলাকারই ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভঙ্গি রয়েছে , যাকে বলা হয় আঞ্চলিক ভাষা৷ কুর্দি ভাষা ইরানী মূল ভাষাগুলোর অন্যতম একটি শাখা৷ এই ভাষাতে ইরানের অন্যান্য ভাষার তুলনায় বিদেশী ভাষার প্রভাব পড়েছে সবচে কম৷ কুর্দি ভাষাটিকে অবশ্য তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ যেমন সুরানি কুর্দি, কেরমানজি কুর্দি এবং হুরামি বা উরামি কুর্দি ভাষা৷
পুরাতত্ত্ব গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে কুর্দিরা ছিল মাদ্ গোত্রের অংশ৷ বলা হয়ে থাকে যে,মাদ্রাজা হোভাখশাতারা খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে অশুরদের রাজধানী নেইনাভাতে হামলা চালায়৷ ঐ হামলায় অশুরিয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে৷ অশুরীদের পতনের পর মাদ্রা এখানে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে৷ এই ঐতিহাসিক বিজয়েরই উত্তরাধিকার হলো কুর্দিস্তানের মাদ জাতি৷ গ্রিক ইতিহাসবিদ গাযানফুন বলেছেন, খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে কুর্দিদের বাসস্থান বর্তমান কুর্দিস্তান থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিসতৃত ছিল৷ কুর্দ্-কে তখন 'কোরদুখ' নামেও অভিহিত করা হতো৷
কুর্দিরা ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজ,পশুপালন,হস্তশিল্পসহ জীবনযাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র তৈরীতে বেশ নিপুণ৷ তাদের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য তারা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করেছে৷ এখানে রয়েছে পার্বত্য চারণভূমি,রয়েছে ঔষধ তৈরীর জন্যে প্রয়োজনীয় বিচিত্র উদ্ভিদ এবং রয়েছে বহু বন-বনানী৷ এগুলোর অস্তিত্ব থাকার কারণে পশুপালন এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে৷ এই পশুপালন যে কেবল অর্থনৈতিক চাহিদারই জোগান দেয় তা নয়,বরং জনগণের প্রোটিন চাহিদা বা দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির চাহিদাও মিটিয়ে থাকে৷ এখানকার দুগ্ধজাত দ্রব্য অন্যান্য প্রদেশেও সরবরাহ করা হয় ৷
পাঠক ! আসরের এ পর্যায়ে চলুন কুর্দিস্তানের প্রাদেশিক শহর সানান্দাজের সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷ তেহরান থেকে ৫১২ কিলোমিটার দূরত্বে সানান্দাজ শহরটি অবস্থিত৷ শাহ সাফির আমলে সানান্দাজ কেন্দ্রীয় শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল৷ কেননা তত্কাালে এই শহরটি ছিল অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র এবং হস্তশিল্প সামগ্রী উত্পা্দনের প্রধান কেন্দ্র৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে মালামাল আদান-প্রদান ও লেন-দেন হতো৷ তাছাড়া এখানে মসজিদ-মাদ্রাসা আর বাজারঘাটসহ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল সহজলভ্য৷
হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে কুর্দিস্তানের একটা প্রাচীন ঐতিহ্য এবং মৌলিকত্ব রয়েছে৷ বাজারে কুর্দিদের হস্তশিল্পসামগ্রীর চাহিদা এবং গুরুত্ব যথেষ্ট৷ ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর কুর্দিরা ইরান সরকারের আনুকূল্য পাবার ফলে তাদের মাঝে এই শিল্প চর্চা আগের তুলনায় আরো বেশি সচল হয়েছে৷ সরকারী সহযোগিতায় কুর্দিস্তানের শহরগুলো এবং তাদের আশেপাশে ছোটোবড়ো বহু শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে৷ গত কয়েক বছরে এখানকার খনিজ ও শিল্পক্ষেত্রে দর্শনীয় উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে৷
সানান্দাজ জামে মসজিদটিও কুর্দিস্তানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থাপনা ৷ পাথরের পিলারের ওপর নির্মিত এই মসজিদটি শ্বেত মর্মর পাথর , রঙীন টাইলস এবং গম্বুজযুক্ত ছাদ বিশিষ্ট৷ সানান্দাজ জামে মসজিদটির বড়ো একটি শাবেস্তান রয়েছে৷ শাবেস্তান হলো মসজিদের ছাদবিশিষ্ট উঠোনের মতো ৷ এই শাবেস্তানের একটি গম্বুজ আছে৷ পাথরের তৈরী ২৪টি পিলারের ওপর ঐ গম্বুজটি স্থাপিত ৷ শাবেস্তানের উপরাংশে চারদিক ঘিরে লিপিকর্মও করা হয়েছে৷ কোরআনের আয়াতের এইসব লিপিকর্ম যথেষ্ট সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন৷ বলা হয়ে থাকে যে,এই মসজিদে যতো পাথর ব্যবহার করা হয়েছে সবগুলোই মর্মর পাথর ৷

 

( ১৫১ তম পর্ব )


পাঠক! আপনাদের সবার প্রতি রইলো অকৃত্রিম শুভেচছা ও অভিনন্দন৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা গত ক'সপ্তাহ ধরে পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরানের লোরেস্তান প্রদেশে ঘুরে বেড়িয়েছি৷ আজ আমরা এই প্রদেশ ছেড়ে যাবো কুর্দিস্তানের দিকে৷ কুর্দিস্তান বন-জঙ্গলাকীর্ণ শ্যামল এলাকা৷ আকাশচুম্বি পর্বতঘেরা এই এলাকাটি যে বেড়ানোর জন্যে খুবই ভালো তাতো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে রয়েছে দেখার মতো ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন৷ আমরা ধীরে ধীরে এইসব স্পটে যাবো৷ অবশ্য আপনাদের সাথে নিয়েই৷
কুর্দিস্তান প্রদেশটির আয়তন প্রায় ২৮ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার৷ ইরানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রদেশটি৷ কুর্দিস্তানের উত্তরে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান এবং যানজানের অংশবিশেষ, দক্ষিণে রয়েছে কেরমানশাহ প্রদেশ, পূর্বে রয়েছে হামেদান প্রদেশ এবং পশ্চিমে রয়েছে ইরাকের সাথে ইরানের সীমান্ত৷ অসমতল ও উঁচু এলাকা হবার কারণে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে কুর্দিস্তান ইরানের একটি শীতল এলাকা হিসেবে পরিচিত৷ তবে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়৷ এই প্রদেশে অনেক নদনদী আছে৷ এইসব নদনদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করার পর অবশিষ্ট পানি ‘সেইরাভন' নদী এবং ‘যব্‌কুচাক' নদী হয়ে ইরাক ভূখণ্ডে চলে যায় কিংবা গেযেল উযন নদী বা যাররিনে নদী হয়ে কুর্দিস্তান ছেড়ে কাস্পিয়ান সাগর অথবা উরুমিয়ে হ্রদে গিয়ে পড়ে৷
কুর্দিস্তান প্রদেশে আটটি শহর রয়েছে৷ শহরগুলো হচেছ সানান্দাজ, ব'নে, দিভনর্দা‌রে, সাক্‌গেয, ক্বোরবে, মারিভন, কমিয়রন এবং বিজর৷ সানান্দাজ শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৮০ মিটার উচেচ অবস্থিত৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর এই সানান্দাজ৷ কুর্দিস্তানের জনগণ মুসলমান এবং তাদের ভাষা হলো কুর্দি ভাষা৷ তবে কুর্দিস্তানের সকল এলাকারই ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভঙ্গি রয়েছে , যাকে বলা হয় আঞ্চলিক ভাষা৷ কুর্দি ভাষা ইরানী মূল ভাষাগুলোর অন্যতম একটি শাখা৷ এই ভাষাতে ইরানের অন্যান্য ভাষার তুলনায় বিদেশী ভাষার প্রভাব পড়েছে সবচে কম৷ কুর্দি ভাষাটিকে অবশ্য তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ যেমন সুরানি কুর্দি, কেরমানজি কুর্দি এবং হুরামি বা উরামি কুর্দি ভাষা৷
পুরাতত্ত্ব গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে কুর্দিরা ছিল মাদ্‌ গোত্রের অংশ৷ বলা হয়ে থাকে যে,মাদ্‌রাজা হোভাখশাতারা খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে অশুরদের রাজধানী নেইনাভাতে হামলা চালায়৷ ঐ হামলায় অশুরিয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে৷ অশুরীদের পতনের পর মাদ্‌রা এখানে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে৷ এই ঐতিহাসিক বিজয়েরই উত্তরাধিকার হলো কুর্দিস্তানের মাদ জাতি৷ গ্রিক ইতিহাসবিদ গাযানফুন বলেছেন, খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে কুর্দিদের বাসস্থান বর্তমান কুর্দিস্তান থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ কুর্দ্‌-কে তখন ‘কোরদুখ' নামেও অভিহিত করা হতো৷
কুর্দিরা ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজ,পশুপালন,হস্তশিল্পসহ জীবনযাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র তৈরীতে বেশ নিপুণ৷ তাদের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য তারা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করেছে৷ এখানে রয়েছে পার্বত্য চারণভূমি,রয়েছে ঔষধ তৈরীর জন্যে প্রয়োজনীয় বিচিত্র উদ্ভিদ এবং রয়েছে বহু বন-বনানী৷ এগুলোর অস্তিত্ব থাকার কারণে পশুপালন এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে৷ এই পশুপালন যে কেবল অর্থনৈতিক চাহিদারই জোগান দেয় তা নয়,বরং জনগণের প্রোটিন চাহিদা বা দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির চাহিদাও মিটিয়ে থাকে৷ এখানকার দুগ্ধজাত দ্রব্য অন্যান্য প্রদেশেও সরবরাহ করা হয়৷
আলোচনার এ পর্যায়ে চলুন কুর্দিস্তানের প্রাদেশিক শহর সানান্দাজের সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷ তেহরান থেকে ৫১২ কিলোমিটার দূরত্বে সানান্দাজ শহরটি অবস্থিত৷ শাহ সাফির আমলে সানান্দাজ কেন্দ্রীয় শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল৷ কেননা তৎকালে এই শহরটি ছিল অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র এবং হস্তশিল্প সামগ্রী উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে মালামাল আদান-প্রদান ও লেন-দেন হতো৷ তাছাড়া এখানে মসজিদ-মাদ্রাসা আর বাজারঘাটসহ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল সহজলভ্য৷
হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে কুর্দিস্তানের একটা প্রাচীন ঐতিহ্য এবং মৌলিকত্ব রয়েছে৷ বাজারে কুর্দিদের হস্তশিল্পসামগ্রীর চাহিদা এবং গুরুত্ব যথেষ্ট৷ ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর কুর্দিরা ইরান সরকারের আনুকূল্য পাবার ফলে তাদের মাঝে এই শিল্প চর্চা আগের তুলনায় আরো বেশি সচল হয়েছে৷ সরকারী সহযোগিতায় কুর্দিস্তানের শহরগুলো এবং তাদের আশেপাশে ছোটোবড়ো বহু শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে৷ গত কয়েক বছরে এখানকার খনিজ ও শিল্পক্ষেত্রে দর্শনীয় উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে৷
সানান্দাজ জামে মসজিদটিও কুর্দিস্তানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থাপনা৷ পাথরের পিলারের ওপর নির্মিত এই মসজিদটি শ্বেত মর্মর পাথর , রঙীন টাইলস এবং গম্বুজযুক্ত ছাদ বিশিষ্ট৷ সানান্দাজ জামে মসজিদটির বড়ো একটি শাবেস্তান রয়েছে৷ শাবেস্তান হলো মসজিদের ছাদবিশিষ্ট উঠোনের মতো৷ এই শাবেস্তানের একটি গম্বুজ আছে৷ পাথরের তৈরী ২৪টি পিলারের ওপর ঐ গম্বুজটি স্থাপিত৷ শাবেস্তানের উপরাংশে চারদিক ঘিরে লিপিকর্মও করা হয়েছে৷ কোরআনের আয়াতের এইসব লিপিকর্ম যথেষ্ট সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন৷ বলা হয়ে থাকে যে,এই মসজিদে যতো পাথর ব্যবহার করা হয়েছে সবগুলোই মর্মর পাথর৷#


( ১৫২ তম পর্ব )


পাঠক! সালাম ও শুভেচছা নিন৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ এক সপ্তাহ হলো আমরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তানে বেড়াতে এসেছি৷ ইতোমধ্যে আমরা এই প্রদেশের ইতিহাস এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচিতিও হয়েছি৷ খানিকটা পরিচিত হয়েছি কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক শহর সানান্দাজের সাথেও৷ আজকের আসরে আমরা সানান্দাজ শহরের সাথে আরো ভালোভাবে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো৷ আপনারা যথারীতি আমাদের সাথেই আছেন-এ প্রত্যাশা রইলো৷
উঁচু উঁচু পাহাড় ঘেরা এই এলাকাটি তার অনুকূল পার্বত্য আবহাওয়ার কারণে পশুপালন এবং কৃষিকাজের যেমন খুবই উপযোগী তেমনি বেড়ানোর জন্যে বা অবকাশ যাপনের জন্যেও এটি চমৎকার একটি স্থান৷ কুর্দিস্তানের প্রাকৃতিক পরিবেশে তাই গড়ে উঠেছে প্রচুর অবকাশযাপন কেন্দ্র৷ এরকম একটি অবকাশযাপন কেন্দ্রের নাম হলো অবিদার৷ অবিদারকে আসলে জঙ্গলাকীর্ণ একটি বড়ো পার্ক বলাই ভালো৷ সানান্দাজ শহরের পাশে সুউচচ অবিদার পাহাড়ের পাদদেশে এই পার্কটি অবস্থিত৷ পার্কটি ১৩০০ হেক্টর জায়গা দখল করে আছে৷ এতো বিশাল এলাকা জুড়ে পার্ক খুব কমই আছে এ অঞ্চলে৷ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল কিছুর পাশাপাশি খেলাধুলার আয়োজন যেমন আছে তেমনি আছে বই পড়ার জন্যে লাইব্রেরী, খাওয়া-দাওয়ার জন্যে রেস্টুরেন্ট এবং বেড়ানোর জন্যে দৃষ্টিনন্দন সব জায়গা৷ এছাড়াও অবিদার পাহাড়ের ২৫০০ মিটার উঁচু থেকে পতিত হচেছ অসংখ্য ঝর্ণাধারা৷ এগুলো এখানকার বাগ-বাগিচা আর শস্যখামারগুলোর তৃষ্ণা মিটিয়ে সানান্দাজের অধিবাসীদের পানীয় জলের চাহিদাও পূরণ করে৷
কুর্দিস্তান প্রদেশে পানির বহু উৎস যেমন আছে তেমনি আছে বুনন শিল্প এবং স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য৷ এখানকার গ্রামগুলো বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের দৃশ্যগুলো এতো চিত্তাকর্ষক যে এককথায় বলা যায় নজিরবিহীন৷ এরকম সুন্দর সুন্দর পার্বত্য গ্রামীণ দৃশ্য প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়৷ এখানে কয়েকটি পার্বত্য গ্রামের নাম করা যেতে পারে৷ যেমন ব'নে অঞ্চলের অলুত, মারিভন অঞ্চলের উরামানাতে তাখ্‌ত কিংবা সানান্দাজের যবরুদ এলাকার পালাঙ্গন ইত্যাদি৷ আজকের আসরের পরবর্তী পর্যায়ে আমরা সানান্দাজের অন্তর্ভুক্ত পালাঙ্গন গ্রামের সাথেই বরং আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো৷
সানান্দাজের কাছে চমৎকার একটি উপত্যকায় অসম্ভব সুন্দর পালাঙ্গন গ্রামটি অবস্থিত৷ গ্রামের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে খরুশানী নদী৷ নদীর পানি বেশ স্বচছ এবং সুস্বাদু৷ এখানে তাই বিচিত্র রকম মাছ পাওয়া যায়৷ পার্বত্য উপত্যকায় পালাঙ্গন গ্রামটির অবস্থানের কারণে এখানকার বাড়িগুলোর স্থাপত্য কাঠামো অনেকটা সিঁড়ির মতো৷ ভবনগুলো সাধারণত কাঠ এবং পাথর দিয়ে তৈরী৷ সে কারণেই দেখতে খুব সুন্দর দেখায়৷ পার্বত্য উপত্যকায় গ্রামটি গড়ে ওঠার কারণে এবং পানির সুব্যবস্থা থাকার কারণে এখানকার পরিবেশ সবুজ শ্যামল৷ বিভিন্ন ধরনের ফুল তো আছেই সেইসাথে আছে বিচিত্র ভেষজ উদ্ভিদ৷ এই সবুজ-শ্যামলিমার কারণে এখানকার আবহাওয়াও তাই বিভিন্ন ঋতুতে বেশ উপভোগ্য থাকে৷
না, কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যেই পালাঙ্গন গ্রাম বিখ্যাত নয় বরং এই গ্রামটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্যেও ব্যাপক খ্যাতিমান৷ এখানে রয়েছে প্রাচীন কেল্লা৷ এই নিদর্শনটির কারণে পালাঙ্গন গ্রামটিকে সমগ্র কুর্দিস্তানের মধ্যে আকর্ষণীয় বলে মনে করা হয়৷ পালাঙ্গন কেল্লায় যেসব নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে সেগুলো প্রমাণ করছে যে এটি খুবই প্রাচীন৷ এখনো এখানে প্রাচীন ব্রিজ এবং রুমের ধবংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়৷ ইসলাম পরবর্তীকালে এই কেল্লাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে এটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে৷ হিজরী ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকে কুফি অক্ষরে লেখা কয়েকটি কবরের শিলালিপীও অত্যন্ত যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা হয়েছে৷ ইসলাম পরবর্তীকালে এই শিলাগুলোর প্রতি যে বেশ সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে,তা এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা দেখেই বোঝা যায়৷ ‘কুর্দি ও কুর্দিস্তানের ইতিহাস' নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে পালাঙ্গন কেল্লাটি সাফাভি শাসনামলেও ব্যবহৃত হতো৷
এতোক্ষণ আমরা কুর্দিস্তানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হয়েছি৷ এবার চলুন এখানকার কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শনের সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷ সানান্দাজের নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘর এখানকার ঐতিহাসিক ও মূল্যবান একটি স্থাপনা৷ এই যাদুঘরটি দেখার জন্যে বহু মানুষ এখানে আসে৷ যাদুঘর ভবনটি নির্মাণ ও স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে কাজারী স্টাইলের৷মিউজিয়ামের মূল ভবনের বাইরে বড়ো একটি আঙ্গিনা আছে৷ কমপ্লেঙের দক্ষিণ অংশে মূল ভবনটি অবস্থিত৷ মাটির নীচেও ভবনটির আরেকটি তলা আছে যাকে বলে বেইজমেন্ট৷ এর ছাদটি গম্বুজ আকৃতির৷ ছাদে আয়নার কারুকাজ দেখতে খুবই সুন্দর৷ আর ফ্লোরের মাঝখানে পাথর দিয়ে বাঁধানো ছয় কোণা বিশিষ্ট একটা হাউজ আছে৷ হাউজের চারপাশে বসার জন্যে পাথরের পাটাতন বানানো হয়েছে৷ বাইরের উঠোনের মাঝখানেও আরেকটি হাউজ আছে৷ মিউজিয়ামের সকল বিভাগ ও অংশই ইট,কাঠ আর পাথর দিয়ে বানানো৷ তবে মিউজিয়ামের সবচে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় বিভাগটি হলো ‘ওরুসি' নামের অডিটোরিয়ামটি৷ কাঠের ওপর রঙীন কাঁচের কারুকাজ করে যেভাবে সাজানো হয়েছে,তা এককথায় নজিরবিহীন৷
সানান্দাজ মিউজিয়ামে কুর্দিস্তানের গ্রাম এবং শহরগুলোতে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন সংরক্ষণ করা হয়েছে৷ এগুলো বিভিন্ন যুগের৷ মিউজিয়ামের নিচের অংশে রাখা হয়েছে নৃতত্ত্ববিদ্যা সংক্রান্ত জিনিসপত্র৷ আরো আছে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক-আশাক,কৃষি সরঞ্জামাদি,স্থানীয় শিল্পের নিদর্শনাবলী ইত্যাদি৷ যাই হোক,মিউজিয়াম ছাড়াও সানান্দাজ শহরে ঐতিহাসিক আরো দুটি নিদর্শন আছে৷ এগুলো হলো আসেফ ভবন এবং খসরু আবাদ ভবন৷ নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এগুলোর স্বাতন্ত্র্য সহজেই চোখে পড়বে৷ এগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে প্লাস্টার,পাথর,কাঠ ইত্যাদি৷ এইসব উপাদান ব্যবহার করে যেভাবে সাজানো হয়েছে ভবনগুলোকে তা সেই প্রাচীনকালে নির্মাণ শিল্পীদের শিল্পনৈপুণ্যের প্রমাণ বহন করে৷#


( ১৫৩ তম পর্ব )


পাঠক ! সালাম ও শুভেচছা নিন৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ গত আসরের ধারাবাহিকতায় আমরা আজো কুর্দিস্তান প্রদেশেই বেড়াবো৷ তবে আজ আমরা যাবো কুর্দিস্তানেরই আরেকটি শহর মারিভন-এ৷ এখানকার আবহাওয়া,এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এই শহরের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ৷ তাছাড়া ভৌগোলিক দিক থেকেও মারিভন শহরটির অবস্থান বেশ সুবিধাজনক৷ চমৎকার এই শহরটি ঘুরে দেখতে ভালোই লাগবে আশা করি৷ চলুন তাহলে সরাসরি চলে যাওয়া যাক মারিভন৷
মারিভন শহরটির উত্তরে রয়েছে সাক্‌গেয শহর এবং ইরাক দেশ৷ পশ্চিমেও রয়েছে ইরাক৷ দক্ষিণে আছে পভেহ এবং কেরমানশাহের নওসুদ ,আর পূর্বে আছে সানান্দাজ৷ সানান্দাজ থেকে ১২৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত মারিভন শহরটি৷ এই শহরের উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২৭২ মিটার৷ ইরানের বৃষ্টিবহুল এলাকাগুলোর অন্যতম হলো মারিভন৷ বছরে কমপক্ষে ৭৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে৷ ব্যাপক পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে সেই পাহাড় থেকে উপত্যকা কিংবা পার্বত্য পাদদেশ থেকে মাঠ-ঘাট-প্রান্তর সর্বত্রই ভেষজ সবুজ উদ্ভিদে ঢাকা৷ একদিকে পাহাড়ের প্রাচুর্য, অপরদিকে প্রচুর বৃষ্টিপাত-এ দু'য়ের কারণে এখানকার নদীগুলো থাকে সবসময় জলটৈটুম্বুর ও সদাবহমান৷ প্রবহমান আঁকাবাঁকা নদী আর তীরজুড়ে সবুজ গাছ-গাছালী-এই দৃশ্য দূর থেকে দেখতে যে কেমন চিত্তাকর্ষক হবে,তা বোধ হয় চোখ বন্ধ করেই উপলব্ধি করা যায়৷
বিচিত্র গাছ-গাছালীপূর্ণ এখানকার চিত্তাকর্ষক সবুজ প্রকৃতির কথা আগেই বলেছি৷ এখানকার বনগুলোতে যেসব বৃক্ষ প্রচুর-পরিমাণ দেখতে পাওয়া যায়,সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বুনো নাশপাতি গাছ, আখরোট গাছ, বাদাম গাছ, ম্যাপল গাছ, বুনো পেস্তাগাছ এবং বিচিত্র প্রজাতির ওক গাছ ইত্যাদি৷ মারিভনের উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্বাঞ্চল সবুজ উদ্ভিদে ঢাকা৷ এখানে এরকম সবুজ বৃক্ষপূর্ণ এলাকার আয়তন প্রায় দুই হাজার হেক্টর৷ সমগ্র কুর্দিস্তানের প্রায় ষাট ভাগ বনানী এই মারিভনেই অবস্থিত৷ মারিভনের এই বনের প্রান্ত যারিভর হ্রদের সাথে গিয়ে মেশার কারণে অনিন্দ্যসুন্দর এক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছে৷ মারিভন শহরটি পার্বত্য উপত্যকা এবং সমতল প্রান্তরের পাশে অবস্থিত৷ মূল শহর থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে যারিভর হ্রদ৷ আবার পাশেই রয়েছে জলপূর্ণ নদী৷ বেড়ানোর জন্যে রসিক মন যা চায়,তার সকল আয়োজনই আছে এখানে৷ অর্থাৎ জল-স্থল,পাহাড়-প্রান্তর আর বন-বনানী সবই আছে এখানে৷
বলা হয়ে থাকে,মারিভনের অর্থনীতি প্রাচীনকাল থেকেই নির্ভরশীল ছিল জঙ্গল, চারণভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর৷ এ কারণেই রাখালবৃত্তি এবং পশুপালন এই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা নির্বাহ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে৷ তবে কোনো কোনো অংশে চাষাবাদ করা, বাগ-বাগিচা করা এবং হস্তশিল্প চর্চার প্রচলন দেখা যায়৷ বর্তমানে অবশ্য এ অঞ্চলের প্রধান দুটি পেশা হলো কৃষিকাজ এবং পশুপালন৷ এখানে উৎপাদিত অন্যান্য কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে তামাক এবং দানাদার শস্যাদি৷ এসবের বাইরেও এখানে হস্তশিল্পের ব্যাপক চর্চা হয়ে থাকে৷ এখানকার হস্তশিল্পের মধ্যে গেলিম বা পশমি কার্পেট খুবই বিখ্যাত৷ পশমি কার্পেট মারিভনের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে৷
মারিভন কুর্দিস্তান প্রদেশের ছোট্ট একটি এলাকা হলেও এটি সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক থেকে ব্যাপক সমৃদ্ধ৷ বহু প্রাচীন নিদর্শনও রয়েছে এখানে৷ মারিভন এবং তার আশেপাশের এলাকায় প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক এমন বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে,যা প্রমাণ করে অন্তত তিন হাজার বছর আগে এখানে মানব বসতি ছিল৷ সাসানীয় এবং আশকানীয়ানদের যুগে এই শহরটির উন্নতি ঘটে৷ তারপর মারিভান শহরটি এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদাই কেবল পায় নি বরং ব্যবসা-বাণিজ্য-যোগাযোগ সকল ক্ষেত্রেই মারিভন শহরটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্টে পরিণত হয়৷ সে কারণেই সবসময় শাসকদের দৃষ্টি ছিল এই শহরটির ওপর৷ প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন থাকায় ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে বেড়াতে আসে সারা বছর জুড়ে৷ এটিক থেকে মারিভন অন্যতম একটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে পরিগণিত৷ তো প্রাচীন নিদর্শনের প্রসঙ্গ যেহেতু এলোই,চলুন এ সম্পর্কেই না হয় খানিকটা কথা বলা যাক৷
এইমাম কেল্লা মারিভনের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর একটি৷ মূল মারিভন শহর থেকে তিন কিলোমিটার পূর্বে এই কেল্লাটি অবস্থিত৷ হিজরী ৯৪৫ সালে এই কেল্লাটি নির্মিত হয়েছে৷ কেল্লাটির ধবংসাবশেষ এখনো দেখতে পাওয়া যায়৷ এখনো কেল্লাটির ইটের তৈরী সিঁড়ি এবং পাথরের তৈরী জলাধার দেখতে পাওয়া যায়৷ এইমাম কেল্লাটি কুর্দিস্তানের পরবর্তী কোনো এক গভর্নর মেরামত করে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়েছিলেন৷ কেল্লার পাশে প্রাচীন একটি মসজিদেরও অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়৷ এই মসজিদটির নাম লাল মসজিদ৷
মারিভন-সানান্দাজ মহাসড়ক থেকে পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দূরে নেগল নামে ঐতিহাসিক একটি গ্রাম আছে৷ নেগল গ্রামের এতো খ্যাতির কারণ হলো এখানকার একটি মসজিদের লোহার সিন্দুকে অসম্ভব সুন্দর ও মহামূল্যবান প্রাচীন এক জিল্‌দ কোরআন শরীফ সংরক্ষিত আছে৷ এই সুন্দর কোরআন শরীফটি অন্তত এক হাজার বছর আগে কুফি অক্ষরে লেখা হয়েছে৷ যাই হোক, মারিভন অঞ্চলটিতে প্রাকৃতিক এবং ঐতিহাসিক আরো অনেক কিছু আছে দেখার মতো৷ যেমন এখানে যারিভর নামে চমৎকার একটি হ্রদ আছে দেখার মতো৷ কিন্তু স্বল্প পরিসর এ আসরের শেষ প্রান্তে এসে এখন আর এই হ্রদ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়৷ পরবর্তী আসরে ইনশাআল্লাহ এই হ্রদে বেড়াবো আমরা৷ আপনাদের সবার আমন্ত্রণ রইলো আমাদের সঙ্গী হবার৷#


( ১৫৪ তম পর্ব )


পাঠক! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশে বেড়াচিছ৷ এরইমধ্যে এই প্রদেশের কয়েকটি শহরের সাথেও পরিচিত হয়েছি৷ গত আসরে আমরা আপনাদেরকে নিয়ে গিয়েছিলাম এখানকার বিখ্যাত মারিভন শহরে৷ যারিভর হ্রদটিও আমরা দেখতে গিয়েছিলাম কিন্তু সময়ের অভাবে আর দেখে ওঠা সম্ভব হয় নি৷ তাই আমরা আজ যারিভরে যাবো বলে কথা দিয়েছিলাম আপনাদের৷ যে কথা সেই কাজ,চলুন যাওয়া যাক যারিভর হ্রদে৷
যারিভর হ্রদটি মারিভন হ্রদ নামেও পরিচিত৷ প্রকৃতির এক অনন্য নিদর্শন এই হ্রদটি৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ হ্রদগুলোর অন্যতম এটি৷ মারিভন থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে যারিভর হ্রদটি অবস্থিত৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২৮৫ মিটার ওপরে হ্রদটির অবস্থান৷ যারিভর হ্রদের পানি মিষ্টি৷ হ্রদের চারপাশ পর্বত আর জঙ্গলে ঢাকা৷ যারিভর হ্রদটি দৈর্ঘে সাড়ে চার কিলোমিটার আর প্রস্থে দুই কিলোমিটার৷ পুরো হ্রদটি আট থেকে নয় শ' হেক্টর জায়গা জুড়ে আছে৷ হ্রদটির গভীরতা সর্বত্র এক সমান নয়৷ কোথাও বেশি কোথাও কম৷ তবে গড়ে এর গভীরতা তিন মিটার৷ নৌকাচালনা বা ইস্কি খেলার জন্যে বেশ উপযোগী এই হ্রদটি৷ যারিভর হ্রদের পানি মিষ্টি হবার কারণে এবং মাছের জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকার কারণে এখানে বহু রকমের মাছ পাওয়া যায়৷ এখানকার মাছ বেড়ে ওঠে খুব দ্রুত৷ যারিভর হ্রদে বিদ্যমান বিশেষ বিশেষ মাছের মধ্যে রয়েছে সেফিদ মহি অর্থাৎ রুই জাতীয় সাদা মাছ, মহি কাপুর অর্থাৎ কার্ফু মাছের মতো সোনালী রঙের ছোটো-বড়ো মাছ,আরুস মাছ ইত্যাদি ৷
যারিভর হ্রদের পানি মিষ্টি হবার কারণে এবং এখানকার আবহাওয়া অনুকূল হবার কারণে একদিকে যেমন সবুজে সবুজে ভরে উঠেছে চারদিক,তেমনি জলে বসবাসকারী পাখি আর বিচিত্র ধরনের মাছ এখানে পর্যাপ্ত থাকায় পুরো পরিবেশটাই হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় সুন্দর৷ স্থানীয় লোকজন তো বটেই, এমনকি বাইরের লোকজনও তাই এখানে অবকাশ যাপনের জন্যে আসে৷ শীতকালে যারিভর হ্রদের পানি জমে যায়৷ হ্রদের আশেপাশের মানুষ তখন ঐ হ্রদের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করে৷ ফলে হ্রদের জমাট বরফের ওপর স্কি খেলার উপযুক্ত অবস্থা বা পরিবেশ তৈরি হয়৷
মারিভনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কেবল যারিভর হ্রদের চমৎকারিত্ব বা এখানকার বন-বনানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়৷ এখানকার উরামান তাখ্‌ত এবং জ্বভরুদও অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী৷ উরামান তাখ্‌ত এবং জ্বভরুদ পার্বত্য এলাকাটি ১৪৫২ মিটার উচচতায় অবস্থিত৷ স্বাস্থ্যানুকূল আবহাওয়া আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এটিও যথেষ্ট সুন্দর এলাকা৷ উরামান এলাকাটি বেশ বড়োসড়ো৷ কুর্দিস্তানের ঠিক দক্ষিণ দিকে পড়েছে এই অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক এলাকাটি৷ এই এলাকার লোকজন স্থানীয় ভাষায় কথা বলে৷ ভাষাটির নাম উরামি৷ উরামি ভাষা কুর্দি ভাষার একটি শাখা৷ উরামান এলাকায় বেশ কিছু অগ্নিমণ্ডপের ধবংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়৷ এগুলো প্রমাণ করছে যে,ইসলাম-পূর্বকালে এই অঞ্চলের মানুষ জরথ্রুস্ট ধর্মাবলম্বী ছিল৷ তারা এইসব অগ্নিমণ্ডপে অগ্নিপূজা করতো৷ এখানকার লোকজন যেহেতু পাহাড়ের ব্যাপক উচচতায় বসবাস করে,তাই তারা তাদের ঘরগুলোকে সিঁড়ির মতো করে তৈরী করে৷ অর্থাৎ একটি বাসার ছাদ অন্য বাসার উঠোন৷ যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় মৌসুলেতে দেখেছিলাম৷ আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে৷ সবুজের ভেতরে এরকম ব্যতিক্রমী ধারার ঘরবাড়ি দেখতে যে খুবই সুন্দর তাতো বলারই অপেক্ষা রাখে না৷
উরামানের লোকজন বেশ ধার্মিক বা ধর্মপ্রাণ৷ বহু জ্ঞানী-গুণী এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এই এলাকায় জন্মলাভ করেছেন৷ পরিবেশ-পরিস্থিতিগত কারণে এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি ও রীতি-আচার মৌলিক রূপেই অক্ষুন্ন আছে এখনো৷ এখানে যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়, এলাকার প্রাচীন রীতিনীতির সাথে সেসবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে৷ তবে ইসলামের আবির্ভাবের পর তাদের বিশ্বাসের কারণে সংস্কৃতির ওপর তার প্রভাব পড়েছে৷ ফলে এখানকার সংস্কৃতি এখন মিশ্রসংস্কৃতি৷
মারিভন এলাকায় ব্যাপক গাছগাছালি আর বন-জঙ্গল থাকায় এবং বিস্তীর্ণ চারণভূমি আর নদী-পুকুর থাকায় এখানে বিচিত্র প্রজাতির জীবজন্তু নিরাপদে বসবাস করে৷ এসবের মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন রয়েছে,তেমনি রয়েছে মাংসাশি এবং সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীও৷ শিকারের জন্যে তাই মারিভন একটি উত্তম এলাকা৷ এই এলাকার শিকার উপযোগী অঞ্চলে যেসব প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো চিতাবাঘ, নেকড়ে বাঘ, শৃগাল, মেষ, ছাগল, খয়েরি ভাল্লুক,জংলী শূকর, কাঠবিড়ালি,নেউল ইত্যাদি৷ এছাড়াও বিচিত্র প্রজাতির পাখি এখানে দেখতে পাওয়া যায়৷ এসবের মধ্যে রয়েছে তিতির জাতীয় একধরনের পাখি যাকে ফার্সিতে কাব্‌ক বলে,রয়েছে ঘুঘু পাখি, বাজপাখি,পাতিহাঁস ইত্যাদি৷#


( ১৫৫ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানে আছেন,ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আজ আমরা বেড়াতে যাবো সাক্‌গেয শহরে৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের অন্যতম একটি শহর এটি৷ পুরাতাত্ত্বিক মূল্যবান নিদর্শনে পরিপূর্ণ এই এলাকাটি৷ এগুলো প্রমাণ করে যে সাক্‌গেয শহরটি অনেক প্রাচীন৷ তো চলুন ! প্রাচীন ও ঐতিহাসিক এই এলাকাটি আজ ঘুরে দেখা যাক৷
সাক্‌গেয শহরটির আয়তন ৪৩৭০ বর্গ কিলোমিটার৷ সাক্‌গেযের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ,পশ্চিমে রয়েছে বনে শহর এবং ইরাকের অংশবিশেষ,দক্ষিণে পড়েছে মারিভন শহর আর পূর্বে অবস্থিত দিইভর্ন্‌দা‌রে শহর৷ সাক্‌গেয শহরের অর্থনীতি নির্ভরশীল এখানকার কৃষিকাজের ওপর৷ এখানকার গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে গম, যব, তামাক, দানাদার তৈল বীজ এবং বুটবাদাম জাতীয় দানাদার বিচিত্র কৃষিপণ্য৷ সাক্‌গেয শহরটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৯৪ মিটার৷ কুর্দিস্তানের কেন্দ্রিয় শহর সানান্দায শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে এই শহরটি অবস্থিত৷ শহরের ভেতর দিয়ে সাক্‌গেয নদী বয়ে যাবার কারণে এই এলাকার কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে৷ সেইসাথে পানি থাকার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে সবুজ বন-বনানী৷ নদীর তীর জুড়ে গড়ে ওঠা এইসব বনানী চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করেছে৷
ইতিহাসবিদদের ধারণা সাকগেয শহরটি মাদ্‌দের শাসনামলে গড়ে উঠেছে৷ সাক্‌গেয শব্দটির উৎস সাক্‌কেয থেকে৷ সাককেয ছিল সাকাদের রাজধানী৷ একর পর এক হামলার কারণে এই এলাকাটির চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেছে৷ বর্তমানে সাক্‌গেয-বনে মহাসড়কে যেই এলাকাটি পড়েছে,তাকে প্রাচীন সাক্‌গেয নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে৷ সাক্‌গেয প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন গোষ্ঠির পক্ষ থেকে হামলার শিকার হয়েছে৷ অশুররা , রোমরা এমনকি তাদের পরে মঙ্গোল এবং ওসমানী সম্রাটদের হাত থেকেও সাক্‌গেয নিরাপদ ছিল না,তাদের সবাই হামলা চালিয়েছে এই শহরটির ওপর৷
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এলাকায় প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাদির খোঁজে যে খননকার্য চালানো হয়েছে তার ফলাফলে দেখা গেছে সমগ্র সাক্‌গেয এলাকাটিই প্রাচীন নিদর্শনে পরিপূর্ণ৷ অবশ্য কেবল এগুলোর কারণেই সাকগেয বিখ্যাত নয় বরং এখানকার আরো কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন এই এলাকাটিকে খ্যাতিমান করে তুলেছে৷ এগুলোর মধ্যে রয়েছে যিভিয়া দূর্গ, যিভিয়া টিলা এবং কারাফ্‌তু গুহা৷ আসরের এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷
সাকগেয শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে যিভিয়া গ্রামের পাশে একটি টিলার উপরে প্রাচীন কেল্লার ধবংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়৷ খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর প্রাচীন একটি শহরের ধবংসাবশেষ এগুলো৷ যিভিয়াতে যেসব প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলোর প্রাচীনত্ব তিন হাজার বছর বলে পুরাতত্ত্ববিদরা মত দিয়েছেন৷ দুঃখজনকভাবে এখানে ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় বিভিন্ন যুগের যেসব মূল্যবান ও চমৎকার সব নিদর্শন ছিল, ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগেই সেগুলো লুটতরাজ হয়ে গেছে৷ এখানকার নিদর্শনগুলো এখন ইউরোপ এবং আমেরিকার মিউজিয়ামগুলোর শোভা বর্ধন করছে৷ সামান্য কিছু নিদর্শন ইরানী মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে৷
ঐতিহাসিক কারাফ্‌তু দূর্গটিও কুর্দিস্তান প্রদেশের একটি বৃহৎ ও আকর্ষণীয় নিদর্শন৷ এই দূর্গটি সাকগেয থেকে ৭৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ কারাফ্‌তু গ্রামের কাছে এই দূর্গটি অবস্থিত৷ এই দূর্গটিতে দুটি স্থাপত্য দেখতে পাওয়া যায়৷ এগুলো খ্রিষ্টপূর্ব তিন শ' বছর আগের আশকানীয় শাসনামলের বলে মনে করা হয়৷ গুহার ভেতরে খননকাজ চালিয়ে যেসব দালান বা কক্ষ আবিষ্কার করা হয়েছে, সেগুলোতে প্রাপ্ত দেয়ালচিত্র এবং খোদাইকর্ম থেকে অনুমিত হয় যে,প্রাচীনকালে এখানে মানব বসতি ছিল৷ কারাফতু'র গুহামুখটি একটি কৃত্রিম চূড়া৷ মাটি থেকে এর উচচতা ৩৫ মিটার৷ চূড়ায় ওঠার জন্যে যে সিঁড়ি ব্যবহার করা হতো,তার অস্তিত্ব এখনো দেখতে পাওয়া যায়৷ গুহার ভেতর দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে৷ এই নদীটি অনেকগুলো ঝর্ণার জন্ম দিয়েছে৷ এইসব ঝর্ণাধারার পানি মিষ্টি৷ বর্ণনা থেকে নিশ্চয়ই অনুমান করা যায় যে এই গুহাটি বেশ দর্শনীয়৷ হ্যাঁ,সত্যিই তাই৷ একারণেই ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে বেড়াতে আসে সারা বছর ধরে৷ ইচেছ করলে আপনিও বেড়িয়ে আসতে পারেন৷
আলোচনার এ পর্যায়ে চলুন বনে শহরের সাথে পরিচিত হই৷ বনে শহরটির পূর্বে রয়েছে সাকগেয শহর,উত্তরে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ আর দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে ইরাক৷ বনে শহরটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার চুয়ান্ন মিটার৷ সাকগেয থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং ইরাক থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে বনে শহরটি অবস্থিত৷ প্রাকৃতিক দৃশ্যগত সৌন্দর্যের দিক থেকে ‘বনে' কুর্দিস্তান প্রদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ একটি এলাকা৷ এখানকার বন-জঙ্গল আর পাহাড়-পর্বত প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের কারণ৷ তাছাড়া এখানে রয়েছে বেশ সমৃদ্ধ চারণভূমি৷ এই চারণভূমির ফলে এখানে পশুপালনের প্রচলন চোখে পড়ার মতো৷ প্রাকৃতিক বিশেষত্বের কারণে এখানে যাযাবর বা উপজাতীয়দের আসা-যাওয়ারও প্রচলন আছে৷
ইতিহাসের বহু চড়াই উৎরাইয়ের সাক্ষী এই বনে শহরটি৷ প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও অজানা কারণে এই শহরটি জ্বলেপুড়ে নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায়৷ তবে যেসব নিদর্শন এখনো এখানে অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো থেকে বোঝা যায় যে শহরটি বেশ প্রাচীন৷ এখানে পাওয়া গেছে নকশা করা মাটির বিচিত্র তৈজস, পাথর কেটে বানানো বিভিন্ন জিনিস,প্রাচীন ধাতব মুদ্রা ইত্যাদি৷ ইরাকের সাথে সীমান্ত থাকার কারণে এবং ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে এই এলাকাটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে৷ এমনকি শহরটিকে পুনরায় গড়ে তোলার মতো অবস্থাও ছিল না দীর্ঘদিন৷ তবে বর্তমানে দায়িত্বশীলদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা আর জনগণের ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতার ফলে যুদ্ধের সেই ধবংসের চিহ্ণ এখন আর তেমন দেখতে পাওয়া যায় না৷ #


( ১৫৬তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশে বেড়াচিছ এখন৷ আশা করি এখানকার শহরগুলো এবং এখানকার মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আপনাদের ভালোই লাগছে৷ যাই হোক আজ আমরা বেড়াতে যাবো বিজর শহরে৷ বিজর শহরের উত্তর এবং পূর্বদিকে রয়েছে যানজন প্রদেশ , উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ, পশ্চিমে রয়েছে সানান্দাজ আর দক্ষিণে রয়েছে ক্বোরবে শহর এবং হামেদান প্রদেশ৷ চলুন এই শহরটির সাথে আরো নিবীড়ভাবে পরিচিত হই৷
বিজর শহরটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯৪০ মিটার৷ শহরটি পাহাড় ঘেরা৷ যথেষ্ট উঁচুও বটে৷ বিজর এলাকার লোকজন তুর্কি ,ফার্সি,কুর্দিসহ আরো অনেক ভাষায় কথা বলে৷ বিজর শহরটির প্রাচীনত্ব খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ পর্যন্ত পৌঁছে৷ তারমানে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পুরোণো এই শহরটি৷ ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে সেনা সমাবেশকালে শাহ ইসমাঈল সাফাভি এই এলাকা অতিক্রম করেছিলেন৷ চেঙ্গিস বাহিনীও এই এলাকা অতিক্রম করেছিলো৷ তার প্রমাণ , এখানে এখনো চেঙ্গিস কেল্লা নামে একটি দূর্গের স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়৷ পাহাড়ের উপরে এটি অবস্থিত৷ একইভাবে বিজরের পাশেই ঐ নামে আরেকটি গ্রামের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে৷
বিজরের অর্থনীতি কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল৷ এখানকার প্রধান প্রধান কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে গম এবং যবের নাম করা যেতে পারে৷ কৃষিকাজের পাশাপাশি পশুপালনও এখানকার লোকজনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশা৷ এ এলাকার মহিলারা ঘরের কাজ করার পাশাপাশি কৃষিকাজেও অংশ নেয়৷ মহিলারা অবসর সময়ে কার্পেট এবং পশমি কার্পেট বোণার কাজও করে থাকে৷ বিজরের কার্পেট এবং গালিচা গুণগত দিক থেকে বিখ্যাত৷ কারণ এখানকার গালিচা বা কার্পেটের রং যেমন পাকা , তেমনি ডিজাইনও ব্যতিক্রমধর্মী৷
আগেও বলেছি,আবহাওয়াগত আনুকূল্যের কারণে বিশেষ করে পানির বিচিত্র উৎস থাকার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে বহু বন-জঙ্গল৷ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বনাঞ্চল থাকার কারণে এলাকাটি স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ দেশী-বিদেশী পাখপাখালির নিরাপদ বাসস্থানে পরিণত হয়েছে৷ এদিক থেকে কুর্দিস্তান এলাকাটি সমগ্র ইরানের মধ্যে শিকারের জন্যে উপযুক্ত একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে৷ প্রাদেশিক পরিবেশ বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী এ এলাকায় শিকারের জন্যে ৩৪ টি নির্ধারিত স্থান রয়েছে৷ বিজরের সংরক্ষিত এলাকাই কুর্দিস্তান প্রদেশের প্রাকৃতিক নিদর্শন , যার আয়তন প্রায় তেইশ হাজার হেক্টর৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এটি পড়েছে৷ এরি সামান্য অংশ বিজরের অন্তর্ভুক্ত৷
বিজরের সংরক্ষিত এলাকাটিতে সারাবছরই পানির ধারা দেখতে পাওয়া যায়৷ এখানে স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন দেখতে পাওয়া যায়,তেমনি দেখতে পাওয়া যায় বিচিত্র পাখপাখালীও৷ তাছাড়া সরীসৃপ জাতীয় প্রাণীও এখানে ব্যাপক দেখা যায়৷ স্তন্যপায়ী বৃহৎ প্রাণীগুলোর মধ্যে এখানে মেষ জাতীয় পশু বা হরিণের মতো পশুগুলোর কথা বলা যায়৷ হরিণ অবশ্য তুলনামূলকভাবে কম৷ তবে এগুলো নীচু এলাকাতে অর্থাৎ টিলাময় স্বল্প উঁচু অঞ্চলেই বেশি বসবাস করে৷ এছাড়াও এখানে খয়েরি ভালুক,জংলী শূকর, নেকড়ে, খরগোশের মতো প্রাণীও দেখতে পাওয়া যায়৷ এখানকার কামাচকা ও গেযেল উযান নদীতে আছে বিচিত্র ধরনের মাছও৷ সব মিলিয়ে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ দর্শনার্থীদেরকে সহজেই মুগ্ধ করে৷
আসরের এ পর্যায়ে চলুন, এই এলাকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া যাক৷ বিজর এলাকার ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন হলো কামাচকাঈ কেল্লা৷ কামাচকা নদীর তীরেই এই কেল্লাটি অবস্থিত৷ কামাচকা কেল্লাটি এই এলাকার প্রাচীন একটি কেল্লা হিসেবে পরিচিত৷ ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত ও মূল্যবান কীর্তিগুলোর একটি এটি৷ বিশেষজ্ঞদের মতে দূর্গগুলো খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর তৈরী৷ বড়ো বড়ো পাথর দিয়ে উঁচু করে এর দেয়ালগুলো তৈরী করা হয়েছে যাতে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে৷ এই দূর্গটিকে খ্রিষ্টপূর্ব হাজার বছর আগের স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে মনে করা হয়৷ এর ভেতরে যেসব নিদর্শন দেখতে পাওয়া গেছে,সেগুলো থেকে বোঝা যায় যে,কেল্লাগুলো মাদ্দ্‌,পার্ত্‌,আশকানীয়ান এবং মোঙ্গলীয়দের বাসস্থান ছিল৷
কুর্দিস্তান প্রদেশের সবুজ শ্যামল অঞ্চল হিসেবে ক্বোরবে , দিভনর্দা‌রে এবং কমিয়রনও প্রসিদ্ধ৷ এই এলাকাগুলো কৃষিকাজ এবং পশুপালনের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ৷ কুর্দিস্তান প্রদেশের অপরাপর শহরের মতো এই শহরগুলোও গুরুত্বপূর্ণ৷ সময়ের স্বল্পতার কারণে এই শহরগুলোর সাথে আজ আর ভালোভাবে পরিচিত হওয়া গেল না৷ তবে হ্যাঁ, যে কথাটি না বললেই নয়,তা হলো, এখানকার ঝর্ণাধারার খনিজ জলের মধ্যে আছে বিভিন্ন রোগের নিরামক৷ এ কারণে এই এলাকা বহুল পরিচিত৷ সারাবছর জুড়েই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে লোকজন বেড়াতে আসে৷ রোগ নিরাময়ের কৌতূহল ছাড়াও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাদের এখানে আসতে অনুপ্রাণিত করে৷#


(১৫৭ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা আজ ইরানের নতুন প্রদেশ ক্বাযভিনে বেড়াতে যাবো৷ ক্বাযভিন আগে যানজন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ ১৯৯৬ সালে ক্বাযভিন যানজন প্রদেশ থেকে পৃথক হয়ে তেহরান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়৷ ১৯৯৭ সালে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ইরান যখন বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত হয়,তখন ক্বাযভিন স্বতন্ত্র একটি প্রদেশের মর্যাদা পায়৷ ক্বাযভিন প্রদেশটির আয়তন প্রায় ১৫ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার৷ ইরানের উত্তর-পশ্চিম ভূখণ্ডে অবস্থিত এই প্রদেশটি৷ ক্বাযভিনের উত্তরে রয়েছে মযান্দারন এবং গিলান প্রদেশ,পশ্চিমে যানজন প্রদেশ, দক্ষিণে কেন্দ্রিয় প্রদেশ এবং হামেদান প্রদেশ আর পূর্বে তেহরান প্রদেশ৷ চলুন প্রদেশটির বিভিন্ন শহর ঘুরে ফিরে দেখি৷
ক্বাযভিন প্রদেশটি তিনটি এলাকায় বিভক্ত৷ এলাকাগুলো পার্বত্যাঞ্চল,পার্বত্য উপত্যকা অঞ্চল এবং বনাঞ্চল-এই তিনটি এলাকায় বিভক্ত৷ শহরগুলোর নাম হলো ক্বাযভিন, বুয়্যিন যাহরা এবং ত্বকেস্তন৷ এখানে অনেক নদীও আছে জলটৈটুম্বুর৷ এসব নদীর পানিতে বনাঞ্চল বা সমতলভূমি অঞ্চলের জলের চাহিদা মেটানো হয়৷ ক্বাযভিনের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আছে বনবনানী৷ যার ফলে এখানে বাস করে জলজ , স্থলজ প্রাণীসহ বিচিত্র পাখপাখালি৷ এখানে শিকার নিষিদ্ধ দুটি সংরক্ষিত এলাকা আছে৷ একটি হলো ব'শকুল ৷ এটি ত্বকেস্তনের পশ্চিমে অবস্থিত৷ অপরটি হলো রুদবরে আলমুত ৷ এটি ক্বাযভিনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত৷
ক্বাযভিন ইরানের প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটি এলাকা৷ ইরানের বিভিন্ন যুগ এবং বিভিন্ন শাসনামলের বিচিত্র ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এই ক্বাযভিন৷ প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল৷ এখানে প্রাচীন যেসব নিদর্শন পাওয়া গেছে তা থেকে বোঝা যায় যে, ক্বাযভিনে মানব বসতির ইতিহাসের প্রাচীনত্ব কয়েক হাজার বছর৷ বিশেষ করে লিখিত যেসব তথ্যপঞ্জী পাওয়া গেছে এখানে তা থেকে বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন যে, শহরটি মাদ্‌্্দের যুগের৷ ত্বকেস্তন , বুয়্যিন যাহরাসহ আলমুতের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন তা'তি ভাষায় কথা বলে৷ এই তা'তী ভাষা ইরানের একটি প্রাচীন ভাষা৷
ইয়েলখানিয়ানের সময়ে ক্বাযভিন রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল৷ সাফাভিয়ে শাসনামলে ক্বাযভিন যথেষ্ট জাঁকজমকপূর্ণ ছিল৷ ক্বাযভিন খুব বেশি বড়ো নয়, তবে এই প্রদেশে বিভিন্ন গোত্র,বংশ,সংস্কৃতি ও ভাষার লোকজন বসবাস করে৷ ক্বাযভিনের উত্তরাঞ্চলের লোকজন ফার্সি ভাষায় কথা বলে৷ প্রদেশের দক্ষিণ এবং উত্তর-পশ্চিমে তুর্কি ভাষাভাষী লোকজন বসবাস করে৷ আর পশ্চিমাঞ্চলে বিশেষ করে ত্বকেস্তান শহর এবং তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে তাতি ভাষার প্রচলন আছে৷ প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে বসবাস করে লোর এবং কুর্দ্‌ ভাষাভাষী মানুষ৷
পাঠক ! আমরা একটু আগে বলেছি যে তিনটি প্রধান শহর আছে ক্বাযভিন প্রদেশে৷ ক্বাযভিন শহরটি এই প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর৷ আনুমানিক ৩৭ বর্গ কিলোমিটার এই শহরটির আয়তন৷ তেহরান থেকে ১৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে এটি অবস্থিত৷ ক্বাযভিনের উত্তরে রয়েছে আলমুত পর্বতমালা,পশ্চিমে ত্বকেস্তন, দক্ষিণে ক্বাযভিন সমতলভূমি অঞ্চল ও বুয়্যিন যাহরা এবং পূর্বে রয়েছে অবিক৷ ক্বাযভিন শহরটি শাপুর সাসানীর হাতে গোড়াপত্তন হয়েছিল বলে মনে করা হয়৷ এখানে ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়৷ মসজিদ থেকে শুরু করে সরকারী বহু স্থাপনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শহরের সুন্দর সুন্দর গেইট, কবরস্থান, প্রাচীন টিলা প্রভৃতি৷ এগুলো সবই ইরানী সংস্কৃতির উত্তরাধিকার৷
কয়েক দশক আগে থেকে ক্বাযভিন উৎপাদন ও শিল্পের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে৷ বিশেষ করে কৃষি এবং পশুপালনের দিক থেকে ক্বাযভিন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল৷ ইউরোপীয় পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনীতে লেখা হয়েছে, ক্বাযভিন শহরের চারপাশে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে আঙ্গুর বাগান৷ এখানকার কৃষিপণ্য আভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বহির্বিশ্বেও রপ্তানী হয়৷ যা ইরানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে৷ এছাড়া শিল্পের দিক থেকেও ক্বাযভিন শহরটির গুরুত্ব রয়েছে৷ ক্বাযভিন শহরের বিভিন্ন এলাকা যেমন আলবোর্য, লিয়া, ত্বকেস্তন প্রভৃতি অঞ্চলে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শিল্প কারখানা৷ এইসব কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে৷ বলা হয়ে থাকে যে, কৃষিপণ্য এবং শিল্পকারখানার কারণে বহু উৎসুক ভ্রামণিক এখানে বেড়াতে আসে৷
প্রাচীনকাল থেকেই ক্বাযভিন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র এবং গর্বিত বহু শিল্পী ও শিল্পের জন্মস্থান৷ যেমন ষষ্ঠ শতাব্দীর মুসলিম মনীষীদের মধ্যে রয়েছে ক্বাযভিনী রাযি , রাফেঈ ক্বাযভিনীর মতো বিখ্যাত ফকীহ ও মনীষী৷ রয়েছেন বিখ্যাত মুসলিম ক্যালিগ্রিাফস্ট মীর এমাদ ক্বাযভিনী , বিখ্যাত সাহিত্যিক হামদুল্লাহ মোস্তুফি, ইরানী সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অভিধান প্রণেতা আল্লামা আলী আকবর দেহখোদা প্রমুখ ব্যক্তিত্ববর্গ৷
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাবির জামে মসজিদ, হোসাইনিয়া, হামদুল্লাহ মোস্তুফির কবর, চেহেল সুতুন প্রাসাদসহ আরো বহু নিদর্শন৷ ক্বাযভিনে যে দিকেই তাকাবেন,মিনার আর গম্বুজ দেখতে পাবেন৷ শহরের কোণায় কোণায় মসজিদ৷ তবে সবচে জাকজমকপূর্ণ মসজিদ হলো কাবির জামে মসজিদ৷ মসজিদটির দিকে তাকালেই তার মর্যাদা উপলব্ধি করা যায়৷ ক্বাযভিন শহরে অবশ্য প্রাচীনতম এবং সুন্দরতম আরেকটি স্থাপনা আছে৷ এই স্থাপনাটি হলো আতিক জামে মসজিদ৷ ইসলামী যুগের স্থাপত্যকলার অন্যতম একটি নিদর্শন এটি৷ শিল্পগত বিচারে এবং প্রাচীনত্বের দিক থেকে এই মসজিদটিকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞগণ৷ মসজিদটির কারুকার্যময় বিশাল গম্বুজ , বারান্দা , গম্বুজের লিপীকর্ম ইত্যাদির দিকে তাকালে মনে হবে যে এটি সালজুকি এবং সাফাভি যুগে তৈরী করা হয়েছে৷ মসজিদটির সর্বপ্রাচীন অংশটি 'ত্বকে হারুনী' নামে প্রসিদ্ধ৷ কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে, হিজরী ১০০ সালে ওমর ইবনে আব্দুল আযিয এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন৷ আবার কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে ১৯২ হিজরীতে হারুনুর রশীদ এর ভিত্তি স্থাপন করেছেন৷ সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞদের মতে ক্বাযভিন জামে মসজিদটি হলো প্রাচীন শিলালিপীর সমৃদ্ধ ভাণ্ডার৷ কবিতা এবং গদ্য উভয়ই এই শিলালিপীতে স্থান পেয়েছে৷ #


( ১৫৮ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা ক্বাযভিন প্রদেশে বেড়াচিছ এখন৷ এরিমধ্যে ক্বাযভিন শহর দেখেছি৷ আজ আমরা এখানকার অন্যান্য স্থাপনাগুলো দেখতে যাবো৷ প্রথমেই যাওয়া যাক হামদুল্লাহ মোস্তুফির কবরে৷ তিনি ইরানের একজন নামকরা মনীষী এবং বহু গ্রন্থ প্রণেতা ছিলেন৷ তাঁর কবরস্থানটি মোঙ্গল শাসনামলের শেষ দিককার একটি চমৎকার স্থাপত্য নিদর্শন৷ সবুজ রঙের কোণাকৃতি টাইলস দিয়ে তৈরী করা হয়েছে কবরস্থানের গম্বুজটি৷ এতে কোরআনের আয়াতের চমৎকার ক্যালিগ্রাফি করা হয়েছে প্লাস্টারিং স্টাইলে যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে৷ মূল ভবনটির নীচের অংশ বর্গাকৃতির৷
চেহেল সুতুন প্রাসাদ ক্বাযভিনের আরেকটি ঐতিহাসিক নিদর্শন৷ সাফাভি শাসনামলের একটি মূল্যবান স্থাপনা এটি৷ স্থাপনাটি আট বাহু বিশিষ্ট৷ ক্বাযভিন শহরের কেন্দ্রে বিস্তীর্ণ একটি বাগানের মাঝখানে এই ভবনটি অবস্থিত৷ দোতলা এই ভবনটিতে বিশাল একটি অডিটোরিয়াম আছে৷ প্রাসাদটির দেয়ালে চমৎকার কারুকাজ করা হয়েছে৷ পশুপাখি লতাপাতার ডিজাইনে করা কাজারী এবং সাফাভি শাসনামলের নকশার আদলে তৈরী এইসব কারুকাজ দর্শকদের সহজেই মুগ্ধ করে৷ বর্তমানে এই প্রাসাদটিকে যাদুঘর বানানো হয়েছে৷ ঐতিহাসিক এই এলাকার টিলাগুলো থেকে যেসব জিনিসপত্র আবিষ্কার করা হয়েছে,বিশেষ করে প্রাচীন তৈজসসহ সাফাভি এবং কাজারী শাসনামলের কাঠের মূল্যবান নিদর্শনগুলো এই যাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে৷
ক্বাযভিন শহরে সালজুকি,কাজারী এবং সাফাভি শাসনামলের অসংখ্য মসজিদ আছে৷ স্থাপত্যকলার দিক থেকে এসবের কোনো কোনোটির বিশ্বখ্যাতি রয়েছে৷ এছাড়াও ক্বাযভিন শহরের আশেপাশে রয়েছে নবীবংশের বহু উত্তরাধিকার বা ইমামযাদা মাযার৷ ইরানের বিভিন্ন এলাকা থেকে পবিত্র এই মাযারগুলোতে জনগণ ছুটে আসে সশ্রদ্ধচিত্তে৷ পবিত্র এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে দুটি স্থাপনার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে৷ একটি হলো মাসজিদুন্নাবী, অপরটি ইমামযাদা হোসাইনের মাযার৷ মাসজিদুন্নাবী ক্বাযভিনের বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটি৷ সাফাভি শাসনামলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল এবং কাজারী শাসনামলে এই মসজিদটি মেরামত করা হয়েছিল৷
নবীবংশের সন্তান ইমামযাদা হোসাইনের মাযারটি ক্বাযভিন শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত৷ অসম্ভব সম্মানিত এবং বরকতপূর্ণ একটি স্থাপনা এটি৷ মাযারের ভেতরকার টাইলসের কারুকাজ, আয়নার কারুকাজ ইত্যাদি স্থাপত্যশিল্পের বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ দেশি-বিদেশী দর্শনার্থীদেরকে এইসব কারুকাজ আকৃষ্ট করে৷ সাধারণত ছুটির দিনগুলোতে এখানে যিয়ারতকারীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়৷
ক্বাযভিনের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে বাজার কমপ্লেঙটিও একটি৷ প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বাক্ষী হয়ে আজো বাজারটি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে৷ ইসলাম-পূর্ব যুগে নির্মিত এই বাজারটি ইরানী এবং বিদেশী পর্যটকদের খুবই পছন্দের এবং দর্শনীয় একটি স্থাপনা৷ সাফাভি শাসনামলে বাজার কমপ্লেঙটি বিস্তৃতি লাভ করে৷ বাজারের বিভিন্ন অংশে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রসহ ধর্মীয় , সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে৷ বাজারের স্থাপনাগুলোতে টাইলস এবং প্লাস্টারিং এর কারুকাজ করা হয়েছে৷ ফলে দর্শনীয় হয়ে উঠেছে পুরো বাজার কমপ্লেঙটি৷ প্রাচীনকালে সমগ্র ইরান জুড়েই খাবার পানির জন্যে মাটি খুঁড়ে একধরনের হাউজ বা জলাধার বানানো হতো৷ পানি সংরক্ষণ করাই এইসব জলাধারের মূল উদ্দেশ্য৷ সবধরনের পানির চাহিদা এই জলাধার থেকে মেটানো হতো৷ স্বাস্থ্য সম্মত পানির কথা চিন্তা করে স্থাপত্যকলার নিয়মরীতি মেনেই চমৎকার পদ্ধতিতে এই জলাধারগুলো বানানো হতো৷ প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শিল্পের নিদর্শন হিসেবে এখনো এগুলোর অস্তিত্ব সংরক্ষিত আছে৷
ক্বাযভিন শহরেও এরকম কয়েকটি জলাধার দেখতে পাওয়া যায়৷ স্থাপত্যরীতি এবং টাইলসের কারুকাজের দিক থেকে এগুলো যথেষ্ট সমৃদ্ধ৷ ক্বাযভিনে অবস্থিত এরকম একটি চমৎকার ও বৃহৎ জলাধার হলো ‘হজ্ব কাজেম'৷ ১২৫৬ হিজরীতে এই জলাধারটি বানানো হয়েছে৷ হজ্ব কাজেম জলাধারে চল্লিশটি সিঁড়ি আছে৷ পাথর কেটে কেটে এই সিঁড়িগুলো বানানো হয়েছে৷ মূলত যেখানে জল সংরক্ষিত আছে সেখানে যেতে হলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়৷ জলাধারের উপরেও চারটি এঙস্টার বা ঘুলঘুলি আছে৷ এঙস্টারের কাজ হলো ভেতরের বাতাস বাইরে বের করে দেওয়া৷ এগুলোর বাহ্যিক সৌন্দর্য বেশ আকর্ষণীয়৷ ইট এবং টাইলস দিয়ে নির্মাণ করার কারণে এগুলো এতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে৷ এই জলাধারটি দেখার জন্যে বর্তমানে বহু বিদেশী পর্যটক ক্বাযভিন সফরে আসে৷
ক্বাযভিনের আরেকটি সুন্দর এলাকা হলো ‘আলমুত'৷ এলাকাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশ মনোরম৷ তাছাড়া এখানে আছে রূপকথার মতো অনেকগুলো দূর্গ৷ এসবের অস্তিত্বের কারণে আলমুত অঞ্চলটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে৷ আলমুত কেল্লাটিকে ‘অশিয়নে ওকাব'ও বলা হয়৷ এই কেল্লাটি দীর্ঘদিন ধরে ইসমাঈলিয়া ফের্কার প্রধান হাসান সাবাহ এবং তার স্থলাভিষিক্তদের কার্যালয় ছিল৷ ২৫২ হিজরীতে হাসান বিন যায়েদ আলভির নির্দেশে এই কেল্লাটি নির্মিত হয়৷ ৪৮৩ হিজরীতে এটি হাসান সাবাহর হাতে আসে৷ তখন এই কেল্লাটি ইসমাঈলিয়াদের কার্যালয়ে পরিণত হয়েছিল৷ ৬৫৪ হিজরীতে হালাকু খানের নির্দেশে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণে দূর্গটি বিরান হয়ে যায়৷ ইসমাঈলীয়ারা প্রচুর বই-পুস্তক সংগ্রহ করে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তুলেছিল৷ হালাকু খান ঐ পাঠাগারটি ধবংস করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়৷ কিন্তু আতা মুল্ক্‌ জুয়িনী হালাকু খান থেকে ঐ লাইব্রেরীর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো সরিয়ে নেওয়ার অনুমতি নেয়৷ এভাবেই লাইব্রেরীটির গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো অন্যান্য বইগুলোর মতো প্রজ্জ্বলিত আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল৷ হাসান সাবাহ এবং আলমুত কেল্লা সম্পর্কে রূপকথার মতো বহু গল্প বর্ণিত আছে৷ এইসব গালগল্পের অধিকাংশই ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ইতালীয় পর্যটক মার্কোপুলুর বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত৷ আলমুত কেল্লাটি দীর্ঘদিন গীলান এবং মযান্দারনের শাসকদের হাতে ছিল৷ তাদের সময়ে কেল্লাটির সংস্কারও হয়েছিল৷
আলমুত কেল্লার পরই ক্বাযভিনের অপর বিখ্যাত কেল্লাটি হলো লাম্ব্‌সার কেল্লা৷ এটিও পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত৷ এতো খাড়া পাহাড়ের ওপরে কীভাবে যে এই কেল্লা স্থাপিত হয়েছিল-ভাবতেই অবাক লাগে৷ যে-কোনো মুহূর্তে আরোহীদের পড়ে যাবার আশঙ্কা ছিল৷ খাজা রশিদুদ্দীন ফজলুল্লাহ হামেদানীর লেখা জাওয়ামেউত তাওয়ারিখ নামক ইতিহাস গ্রন্থে লেখা হয়েছে, মালেকশাহ্‌র ছেলে সুলতান মুহাম্মাদ যখন ইসমাঈলীয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল,তখন তারা আলমুত এবং লাম্ব্‌সার কেল্লাদুটি ১১ বছরের মতো অবরোধ করে রেখেছিল৷ এতো দীর্ঘ সময় অবরোধ করা সত্ত্বেও কেল্লায় অবস্থানকারীরা আত্মসমর্পন করে নি৷ হালাকু খানের হামলার সময়ও কেল্লাবাসীরা মাসের পর মাস ধরে প্রতিরোধ করেছে৷ অবশেষে রোগ-ব্যাধি দেখা দেওয়ায় কেল্লাবাসীরা নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পন করে৷
ক্বাযভিনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়৷ বিশেষ করে শীতকালে ব্যাপক বরফ জমে এখানে৷ এই জলের প্রাচুর্যের কারণে এখানকার নদীগুলো জলটৈটুম্বুর থাকে সবসময়৷ সুস্বাদু জলের ঝর্ণাগুলোও থাকে সদা নিসৃয়মান৷ পর্যাপ্ত পানি থাকার কারণে ফল-ফলাদির গাছ আর বন-বনানী ছাড়াও কৃষিক্ষেত্রগুলোতে চাষাবাদের সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে৷ ক্বাযভিনে সুন্দর একটি হ্রদও আছে৷ হ্রদটির নাম আভা'ন৷ কয়েকটি পাহাড়ের মাঝে ফিরোযা পাথরের মতো এ হ্রদটি৷ ঝর্ণার জল আর বৃষ্টির পানিই এই হ্রদের জলের উৎস৷ তাই আভা'ন হ্রদের পানি সুপেয় মিষ্টি৷ এর দৈর্ঘ ২৭৫ মিটার এবং প্রস্থ ২২৫ মিটার,আর হ্রদটির গভীরতা হলো বিভিন্ন স্থানভেদে এক থেকে ২০ মিটার৷
আভা'ন নামে একটি ঝর্ণাও আছে হ্রদের দক্ষিণ-পশ্চিমে৷ তিন শ' ত্রিশ মিটার উচচতা থেকে এই ঝর্ণাধারাটি প্রতিনিয়ত ঝরছে,তাই সূর্যের কিরণ লেগে অপূর্ব রংধনুর সৃষ্টি হয়৷ শীতকালে আভা'ন হ্রদটি বরফে পরিণত হয়৷ তখন ঐ বরফের ওপর দিয়ে হাঁটা-চলা যায়,কিংবা ইস্কিও খেলা যায়৷
ক্বাযভিনের আরো দুটি শহরের নাম আমরা বলেছিলাম৷ একটি হলো বুইয়্যিন যাহরা এবং অপরটি হলো ত্বকেস্তন৷ বুইয়্যিন যাহরা ক্বাযভিন থেকে ৫৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত আর ত্বকেস্তন ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ বুইয়্যিন যাহরায় সিয়হকূহ এবং রমান্দ পর্বতমালা দুটি অবস্থিত৷ সবুজ প্রান্তর আর চারণভূমি ছাড়াও এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি নদী৷এখানকার লোকজনের প্রধান পেশা হলো পশুপালন এবং কৃষিকাজ৷ ত্বকেস্তনের লোকজনের মূল পেশাও তাই৷ এখানেও বেশ কটি নদী আছে৷ তাছাড়া তেহরান-তাব্রিয রেললাইনটি এই শহরের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার ফলে ত্বকেস্তনের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে৷#


( ১৫৯ তম পর্ব )


পাঠক ! আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ আমরা আজ ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় পারস্য উপসাগর তীরবর্তী বু'শাহ্‌র প্রদেশের দিকে বেড়াতে যাবো৷ ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক নিদর্শনবহুল একটি প্রদেশ বু'শাহ্‌র৷ শরৎ এবং শীতকালে এখানকার আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ৷ এ সময় বু'শাহ্‌র পর্যটকদের পদচারণা মুখরিত হয়ে ওঠে৷ চলুন আমরা বরং সরাসরি প্রদেশটিতে গিয়েই কথা বলি৷
ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বু'শাহর প্রদেশটির আয়তন ২৫ হাজার ৬৫০ বর্গকিলোমিটার৷ এর উত্তরে রয়েছে খুযিস্তান প্রদেশ এবং কুহকিলুয়ে ওয়া বুয়ের আহমাদ প্রদেশের কিছু অংশ,পূর্বে ফার্স প্রদেশ,দক্ষিণে হরমুযগান প্রদেশ এবং পারস্য উপসাগরের কিছু অংশ আর পশ্চিমে পারস্য উপসাগর৷ এই প্রদেশের সাথে পারস্য উপসাগরের ৬০০ কিলোমিটার উপকূল বা সমুদ্রসীমা থাকায় বু'শাহরের কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম৷ এই প্রদেশের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে বু'শাহর, তাঙ্গেস্তন,দাশ্‌তেস্তন, দাশ্‌তি, দির দেইলাম, কাঙ্গন ও গানা'ভে৷ বু'শাহর হলো কেন্দ্রীয় প্রাদেশিক শহর৷ ৯৮৫ বর্গকিলোমিটার এর আয়তন৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বু'শাহরের উচচতা হলো এলাকাভেদে এক থেকে পাঁচ মিটার৷
বু'শাহরকে দুটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়৷ একটি পার্বত্য অঞ্চল, অপরটি সমতলভূমি অঞ্চল৷ সমতলভূমি অঞ্চলটি জনবহুল৷ পার্বত্য অঞ্চলটি দুটি পর্বতমালা জুড়ে বিস্তৃত৷ বু'শাহর প্রদেশে মূলত দুটি ঋতু অনুভব করা যায়৷ শীত এবং গ্রীষ্ম ঋতু৷ শীতে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা আর গ্রীষ্মে আবহাওয়া থাকে বেশ গরম৷ বু'শাহরে গ্রীষ্মকালটা শীতকালের তুলনায় কিছুটা দীর্ঘ৷ আর শরৎ এবং বসন্ত-এই দুটি ঋতু এখানে দ্রুত পেরিয়ে যায়৷ বু'শাহর প্রদেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ একেবারেই কম কিংবা বলা যায় বিরলদৃষ্ট৷
বু'শাহরের লোকজনের পেশা হলো পমুপালন,কৃষিকাজ এবং মাছ শিকার৷ মাছ শিকার এই প্রদেশের লোকজনের অন্যতম প্রধান একটি পেশা৷ বিভিন্ন প্রকারের সামুদ্রিক মাছ তো রয়েছেই , তবে চিংড়ি মাছ শিকার এখানে প্রচুর পরিমাণে হয়ে থাকে৷ এখানে হস্তশিল্পের চর্চাও আছে কিছুটা৷ মোটামুটি এসবের ওপরই বু'শাহরের অর্থনীতি নির্ভরশীল৷ এখানকার কৃষিপণ্যগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়৷ একটি হলো ক্ষেতখামারে উৎপাদিত পণ্য,অপরটি হলো গাছ-গাছালিতে উৎপাদিত ফল৷ ক্ষেতখামারে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, যব,তামাক,পেঁয়াজ,তিলসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসব্জি৷ আর গাছ থেকে উৎপন্ন ফসলের মধ্যে খেজুরই প্রধান৷
এখানকার পাহাড়গুলো ,উপত্যকা, প্রান্তর , ভেতরের উঁচু নীচু জায়গাসহ ঝর্ণা, প্রণালী আর সবুজ উদ্ভিদ-সব মিলিয়ে চমৎকার একটি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে৷ এখানকার জঙ্গলে বিচিত্র পশুপাখি বাস করে৷ স্থলজ প্রাণী ছাড়াও এখানকার সমুদ্রে বাস করে বিচিত্র জলজ প্রাণী৷ দেশী প্রাণী ছাড়াও বিদেশী জলজ বহুজাতের প্রাণী এখানে বাস করে৷ এসবের মধ্যে হাঙর,ডলফিন,কচছপ, কাঁকড়াসহ বহু জাতের মাছের নামও উল্লেখ করা যেতে পারে৷ এর বাইরেও দেশি বিদেশী বহু জাতের পাখি তো রয়েছেই৷ বিদেশী পাখিগুলো মূলত শীতকালে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে এখানে আসে৷ সাধারণত ভারত এবং আফ্রিকার পাখিই বেশি আসে এখানে৷ বুশাহর প্রদেশের আশপাশের বিভিন্ন দ্বীপ আর উপকূলে কিছুদিন থেকে আবার তারা ফিরে যায় আপন ঠিকানায়৷
বু'শাহর পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত হওয়ায় এখানে গড়ে উঠেছে বহু বন্দর৷ বন্দরের মাধ্যমে যোগাযোগ গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশের সাথে৷ যারফলে অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে এর একটা বিশেষ গুরুত্ব সৃষ্টি হয়েছে৷ আর যেখানেই অর্থ-সম্পদ আর স্বার্থ ছিল,এককালে সেখানেই উপনিবেশবাদীরা হামলা চালিয়েছিল৷ পারস্য উপসাগরীয় এই উপকূলটিও তাদের হামলা থেকে রেহাই পায় নি৷ পর্তুগীজরা প্রথম এখানে হামলা চালায় ১৫০৬ খ্রিষ্টাব্দে৷ তবে ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে শাহ আববাস পারস্য উপসাগর থেকে পর্তুগীজদের হাতকে সংকুচিত করেন৷ আর ১৭৩৫ সালে আব্দুল লতিফ খান বর্তমান বু'শাহরকে তাঁর শাসনকার্য পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করেন৷ তখন এই শহরটি ছিল অনাবাদি৷ তারপর থেকে বু'শাহর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে পরিণত হয়৷
বু'শাহর বেশ পুরোণো একটি শহর৷ এখানকার বিভিন্ন স্থাপনা সাসানী আমলের বলে ধরা হয়৷ বু'শাহরের ইমামযাদার মাযারে প্রাপ্ত সাসানী যুগের ধাতব মুদ্রা থেকে তাই প্রমাণিত হয়৷ বু'শাহরের নিকটবর্তী রেইশাহর কেল্লায় প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন থেকেও এই দাবীর সপক্ষে প্রমাণ মেলে৷ ইরানের অপরাপর শহরের মতো বু'শাহরও যুগে যুগে বিভিন্ন চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে৷ তবে করীম খান যান্দের সময় এই বন্দর নগরীটি তার হারানো ঐশ্বর্য ফিরে পায়৷ এই নগরীটি তার সোনালী সময়ে ভারত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য বন্দর হিসেবে পরিগণিত ছিল৷ প্রথম প্রথম যেসব শহরে ছাপাখানা প্রবর্তিত হয়েছিল বুশাহর সেসব শহরের একটি৷ পাথরের ছাপাখানা এখানে চালু করা হয়েছিল৷ যার ফলে সহজেই বোঝা যায় যে,বু'শাহর ছিল তৎকালীন রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং শিল্প-কারখানা তথা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র৷ বিদেশী কোম্পানী তো ছিলই,এমনকি বিদেশী কনস্যুলেটও স্থাপন করা হয়েছিল সেখানে৷ বরফ তৈরীর কারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সেই তখনই স্থাপন করা হয়েছিল সেখানে।
বর্তমানে অবশ্য বু'শাহর বেশ উন্নত ও নতুন করে নির্মিত একটি শহর৷ ইরানের উপকূলীয় শহরগুলোর মধ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম৷ বিশেষ করে সমুদ্র বাণিজ্য এবং শিল্পগত দিক থেকে এই বন্দর নগরীটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে৷ এখানে অনেকগুলো জেটি আছে৷ জাহাজ থেকে নৌকায় কিংবা নৌকা থেকে জাহাজে মালামাল উঠানামা করার জন্যে এগুলোর বিকল্প নেই৷ বুশাহরে কিছু প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে৷ এসবের মধ্যে রেইশাহর,কাউয়াম জলাধার,মালেক প্রাসাদ,শায়েখ মসজিদ,সা'দুন, কাজি ভবনসহ বেশকিছু মাযারের নাম উল্লেখ করা যায়৷#


( ১৬০ তম পর্ব )


পাঠক ! ইরান-ঐতিহ্যের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচিছ৷ আশা করি আপনারা যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন৷ গত আসরে আমরা বু'শাহর নিয়ে কথা বলেছিলাম৷ আজ আমরা যাবো খুযিস্তান প্রদেশের দিকে৷ খুযিস্তানকে কালো সোনার এলাকা বলা হয়৷ কারণ এই এলাকায় রয়েছে তেলের খনি৷ চলুন,গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদবহুল এই এলাকাটিতে আমরা বরং সরাসরি চলে যাই৷
খুযিস্তান প্রদেশটি ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত৷ এই প্রদেশের আয়তন ৬৫ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি৷ খুযিস্তানের উত্তরে রয়েছে লোরেস্তান প্রদেশ,পশ্চিমে ইরাক দেশ এবং ইরানের এইলম প্রদেশ, দক্ষিণে পারস্য উপসাগর আর পূর্বে রয়েছে চহর মাহল ও বাখতিয়রি প্রদেশ এবং কোহকিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশ৷ আহওয়ায হলো খুযিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর৷ প্রদেশটিকে দুটি অঞ্চলে চিন্তা করা যেতে পারে৷ একটি অংশ পার্বত্যাঞ্চল৷ এই অঞ্চলটি প্রদেশটির পূর্ব এবং উত্তর অংশ জুড়ে বিস্তৃত৷ এখানকার পর্বতগুলো যাগরোসের সাথে গিয়ে মিলেছে৷ এখানকার উল্লেখযোগ্য পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে যার্দ্‌কুহ,কুহে সিয়হ, চ..ল্‌,অব বান্দন ইত্যাদি৷
দ্বিতীয় অঞ্চলটি খুযিস্তানের দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় সমতলভূমি৷ এই অঞ্চলটি বেশ বড়ো,প্রায় ৪১ হাজার বর্গকিলোমিটার৷ এই অঞ্চলে পড়েছে বিখ্যাত কারুন নদীসহ আরো বহু নদী৷ কারুন নদী পানিতে পরিপূর্ণতার দিক থেকে ইরানের শ্রেষ্ঠ নদী আর দৈর্ঘের দিক থেকে কারখেহ নদী ইরানের সবচেয়ে বড়ো নদী৷ এই দুটি নদীই পড়েছে খুযিস্তান প্রদেশে৷ একদিকে সমতল ভূমি অপরদিকে পার্বত্য অঞ্চলের উঁচু-নীচু এলাকা৷ অঞ্চলগত এই তারতম্যের কারণে আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যও তাই লক্ষ্য করা যায় এই প্রদেশে৷ পার্বত্য এলাকায় গ্রীষ্মে আবহাওয়া থাকে নাতিশীতোষ্ণ,আর শীত ঋতুতে ঠাণ্ডা৷ তবে পারস্য উপসাগর উপকূলীয় এলাকাগুলোর আবহাওয়া বেশ গরম৷ বিশেষ করে আহওয়ায,অবদন ( آبادان ) ,দেযফুল প্রভৃতি অঞ্চলে তাপমাত্রা কখনো কখনো ৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে পৌঁছে যায়৷
খুযিস্তান প্রদেশে শাকসব্জি আর গ্রীষ্মকালীন ফসল উৎপাদন হয় প্রচুর৷ তাছাড়া আখের চাষও এখানে প্রচুর পরিমাণে হয়৷ খেজুর বাগানও এখানে প্রচুর৷ খুযিস্তানে আবার জঙ্গল যেমন আছে,তেমনি আছে চারণভূমিও৷ উষ্ণ এলাকা বলে বাখতিয়রি উপজাতীরা শীতকালে এই অঞ্চলে চলে আসে৷ যেহেতু চারণভূমি আছে, সেহেতু উপজাতীয়রা এখানে তাদের পশুগুলোকে চরাতে পারে৷ এ জন্যেই তারা এই অঞ্চলটিকে বেছে নিয়েছে শীতকালীন আবাসস্থল হিসেবে৷ খুযিস্তান প্রদেশে সব মিলিয়ে ৫০০ হেক্টর জঙ্গল এবং ২৫ লক্ষ হেক্টর চারণভূমি আছে৷ এখানকার জঙ্গলের বেশিরভাগ গাছই হলো ওক শ্রেণীর৷ শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ গাছই ওক গাছ৷ বাকি ৫ ভাগের মধ্যে রয়েছে ডুমুর গাছ,বাদাম গাছ এবং কোনার বা লোটাস গাছ৷
খুযিস্তান প্রদেশ বলতে বর্তমানে ইরানের যে ভূখণ্ডকে বোঝায়,এই ভূখণ্ডটি প্রাচীনকালে স্বায়ত্ত্বশাসিত একটি অঞ্চল ছিল, নাম ছিল এইলম৷ দিয়েলাফেই এবং দেমুরগানের মতো গবেষকদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয় যে, এইলামিরা খ্রিষ্টপূর্ব আট হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে বাস করতো৷ সম্ভবত তারাই এই অঞ্চলে প্রথম কোনো গোত্র যারা স্বাধীন একটি সরকার ব্যবস্থা কায়েম করেছিল৷ ইতিহাসের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী খ্রিষ্টপূর্ব ১৩০০ বছর আগেও এইলম নামটির অস্তিত্ব ছিল৷ তারপরে এর নাম হয় এনশন সুসাঙ্কা অর্থাৎ এনশন এবং শুশ দেশ৷ খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪০ সালের দিকে হাখামানেশীয়রা এনশনকে এনযন নামে অভিহিত করে৷ কিন্তু অশুরীরা এই এলাকাকে এইলম নাম দেয়৷
খুযিস্তান অঞ্চলটি ইতিহাসের বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এসেছে৷ তবে কখনোই এই এলাকাটি ইরান থেকে বিচিছন্ন হয়ে যায় নি৷ সবসময়ই ইরানের অবিচেছদ্য অংশ হিসেবেই ছিল৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশদের নজর পড়ে এই এলাকাটির ওপর৷ কেননা এই এলাকাটি তেল সমৃদ্ধ এবং পানিপথের যোগাযোগ এমনকি ব্যবসায়িক কারণেও এটি বেশ উপযুক্ত একটি এলাকা৷ সেজন্যে বৃটিশরা এখানে সর্বপ্রথম হামলাটি চালায়৷ তারা তাদের সেনাদেরকে এই এলাকায় প্রবেশ করায় এবং তাদের অনুগত শেখ খাযআল-কে এই এলাকার দায়িত্বে নিয়োজিত করে৷
তবে বলা হয়ে থাকে যে, ব্রিটিশরা যখন খুযিস্তানের ওপর আক্রমণ বৃদ্ধি করে, তখন আহওয়াযের পশ্চিমাঞ্চলীয় আরব উপজাতীরা নিজেদের দেশ রক্ষার্থে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল৷ ইতিহাসে এই যুদ্ধটি জাঙ্গে জেহাদ নামে বিখ্যাত৷ যাই হোক,ইতিহাস নিয়ে অনেক কথা হলো,এবার চলুন খুযিস্তানের কেন্দ্রীয় শহর আহওয়ায নিয়ে কিছু কথা বলি৷ আহওয়ায শহরটির আয়তন প্রায় ৮১৫০ বর্গকিলোমিটার৷ এর উত্তর এবং পূর্বে রয়েছে দেযফুল, শুশতার এবং রামহরমুয , দক্ষিণে খুররামশাহ্‌র, পশ্চিমে রয়েছে অযদেগন প্রান্তর৷ আহওয়াযের সাথে রেল যোগাযোগ থাকায় ইরানের সকল শহরের সাথে এই শহরের যোগাযোগ গড়ে উঠেছে৷ আর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থাকায় সমগ্র বিশ্বের সাথেও যোগাযোগ গড়ে উঠেছে৷
আহওয়াযে অনেক কল-কারখানা আছে৷ তেল-গ্যাসের বড়ো বড়ো স্থাপনা, ইস্পাত কমপ্লেঙ, পাইপ তৈরীর কারখানা, ব্ল্যাক কার্বন তৈরীর কারখানা,চিনি তৈরীর কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র এবং অন্যান্য শিল্প কারখানা ইত্যাদি আহওয়াযকে ব্যাপক সমৃদ্ধি দান করেছে৷ এই এলাকার জমি বেশ উর্বর৷ তাই এখানে কৃষিকাজ খুব ভালো হয়৷ বিভিন্ন ধরনের ফসল হয় এখানে৷ যেমন যব, গম, দানাদার শস্যাদি, গ্রীষ্মকালীন ফসলাদি, খুরমা খেজুর ইত্যাদি এখানে ব্যাপক উৎপন্ন হয়৷ এছাড়াও এখানে রয়েছে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপনা৷
তেহরান থেকে আহওয়াযের দূরত্ব ৮৫০ কিলোমিটার৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহরের উচচতা ১৮ মিটার মাত্র৷ আহওয়ায বেশ পুরোণো একটি শহর৷ বলা যায় ইরানের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি৷ প্রাচীন শিলালিপীতে এই শহরের নাম পাওয়া গেছে৷ সাসানী শাসক প্রথম আর্দেশিরের সময় এবং তাঁর স্থলাভিষিক্তদের শাসনকালে আহওয়ায বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল৷ এ সময় শুশের পরিবর্তে এই শহরটি খুযিস্তানের রাজধানী হিসেবে নির্বাচিত হয়৷ উমাইয়া এবং আববাসীয় শাসনের সময়ও আহওয়ায বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল৷ তবে হিজরী তৃতীয় শতকের শেষের দিকে অবক্ষয়ের মুখে পড়ে এবং এখানকার বৃহৎ বাঁধটি ভেঙ্গে যাবার কারণে শহরটি বিরাণ হয়ে যায়৷ তবে পরবর্তীকালে সুয়েজ খাল খনন এবং ইউরোপীয়দের বাণিজ্যিক দৃষ্টি পড়ার কারণে শহরটি পুনরায় অস্তিত্ব ফিরে পায়৷ নাসিরুদ্দিন শাহও কারুন নদীর ওপর নৌকা চালানোর সুযোগকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগান৷ তিনি তাঁর নামে আহওয়াযের কাছে একটি বন্দর স্থাপন করেন৷ এই বন্দর স্থাপনের ফলে আহওয়াযের নাম পরিবর্তিত হয়ে নাসেরিয়াহ নাম ধারণ করে৷ তবে কয়েক বছর পর আহওয়ায তার প্রাচীন নাম ফিরে পায়৷#  (সমাপ্ত)

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন