এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 02 নভেম্বর 2015 14:52

আলবোর্জ পর্বতমালার দক্ষিণে সেমনান প্রদেশ

২ নভেম্বর (রেডিও তেহরান): সেমনান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি প্রদেশ। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানে রয়েছে পর্যটক আকর্ষণীয় বহু স্পট, রয়েছে ঐতিহাসিক বহু স্থাপনা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এখানকার মানুষের অতিথি পরায়ণতা। সেমনান প্রদেশের আয়তন সাতানব্বই হাজার চার শ একানব্বই বর্গকিলোমিটারের মতো। অনেক বড়ো প্রদেশ সেমনান। সমগ্র ইরানের প্রায় ছয় ভাগ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রদেশ। ইরানের বৃহৎ প্রদেশের মধ্যেও ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে সেমনান। আলবোর্জ পর্বতমালার দক্ষিণ পাদদেশে পড়েছে সেমনান প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান।

 

সেমনান প্রদেশের উত্তরে রয়েছে উত্তর খোরাসান, গুলেস্তান এবং মযান্দারন প্রদেশ। দক্ষিণে রয়েছে দক্ষিণ খোরাসান এবং ইস্পাহান প্রদেশ। পূর্বদিকে খোরাসানে রাজাভি আর পশ্চিমদিকে রয়েছে তেহরান এবং কোম প্রদেশ। ভৌগোলিক কারণে সেমনান প্রদেশের আবহাওয়ায় বৈচিত্র্য রয়েছে। পার্বত্য অংশের আবহাওয়া একটু ঠাণ্ডা। পার্বত্য উপত্যকা এবং উচ্চতায় আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ আর মরু এলাকা এবং তার আশেপাশের আবহাওয়া উষ্ণ।  এভাবেই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের তারতম্যের কারণে সেমনান প্রদেশের একেক অঞ্চলের আবহাওয়া হয়ে উঠেছে একেকরকমের।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সেমনান শহর হলো এই প্রদেশের কেন্দ্রীয় শহর।

 

এই শহরের আবহাওয়া গ্রীষ্মের সময় থাকে গরম আর শীত ঋতুতে থাকে অনেকটা নাতিশীতোষ্ণ। অথচ এই প্রদেশেরই অন্যান্য শহরের আবহাওয়া একেক রকমের। সামগ্রিকভাবে বলা যায় সেমনান প্রদেশের আবহাওয়া মোটামুটি দুই ধরনের। এক হলো অর্ধ মরু-আঞ্চলিক আবহাওয়া আরেকটা হলো প্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় আবহাওয়া। এই এলাকার আবহাওয়াকে বলা যায় ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া অর্থাৎ কিছুটা উষ্ণ এবং শুষ্ক।

 

আলবোর্জ পর্বতমালা সেমনানের উত্তর দিক থেকে ক্রমশ দক্ষিণ দিকে নিচু হয়ে যেতে যেতে একেবারে মরু এলাকার সাথে গিয়ে মিশে গেছে। প্রদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চূড়া হলো ‘নেইজাভা’।

 

সেমনান শহরের উত্তরে অবস্থিত এই উঁচু পর্বতের উচ্চতা হলো তিন হাজার সাত শ বিরাশি মিটার। সেমনানের শাহরুদের উত্তরে আরেকটি চূড়া আছে ‘শা’হভর্‌’ নামে। এর উচ্চতা হলো তিন হাজার নয় শ চল্লিশ মিটার। এই প্রদেশের নামকরা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে সেমনান শহরের ‘গোলরুদবার’, শাহরুদ শহরের ‘কলশুর’ এবং ‘তাশ’ নদী। দমাগনে রয়েছে ‘রুদবর’ এবং ‘চেশমে আলি’ ঝরনা। এছাড়াও সেমনানের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে হাবলে রুদ নদীসহ আরও অনেক নদী। তবে হাবলে রুদ ছাড়া বাকি সব নদীই ঋতুভিত্তিক অর্থাৎ শীতকাল ছাড়া শুষ্ক থাকে। কেবল হাবলে রুদ নদীতেই সারাবছর ধরে পানি থাকে।  

 

পানির স্বল্পতা থাকার পরেও সেমনান প্রদেশে প্রচুর পরিমাণ কৃষিসামগ্রী উৎপন্ন হয়। এখানকার কৃষিপণ্য এলাকার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। গম, যব, তরমুজ, আলু, সূর্যমুখী, তুলা, লাল বিট, খরবুজা ইত্যাদির পাশাপাশি এখানকার বাগানেও উৎপন্ন হয় পেস্তা বাদাম, আঙুর, যারদালু, আনার, আপেল, চেরি, আখরোট এবং মিষ্টি ডুমুরের মতো বিচিত্র ফল ফলাদি।

 

চারণভূমির দিক থেকেও সেমনান প্রদেশ চোখে পড়ার মতো। প্রাকৃতিক উৎস এবং চারণভূমি মিলিয়ে প্রদেশের প্রায় পঞ্চান্ন লক্ষ হেক্টর ভূমি রয়েছে সেমনানে। এই বিশাল চারণভূমি থাকার কারণে সমগ্র ইরানের মধ্যে পশুপালনের জন্য বিখ্যাত এ এলাকা।

 

সেমনান প্রদেশটির পাশে যে চারটি প্রদেশ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে তেহরানও রয়েছে। যার ফলে সেমনানের খনিজ সম্পদ উত্তোলন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। খনিজ সম্পদের দিক থেকে কিন্তু সেমনান প্রদেশ যথেষ্ট সমৃদ্ধ। অন্তত এক শ’টি খনি থেকে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজ চলছে। চক এবং খনিজ লবণের দিক থেকে সেমনানের খনিগুলো ইরানের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। প্রাকৃতিকও সভ্যতার ইতিহাসের দিক থেকেও সমৃদ্ধ সেমনান। প্রাগৈতিহাসিককালে সেমনান ছিল ‘কোমেস’ প্রদেশের অংশ। মাদ্‌দের শাসনামলে এবং হাখামানেশিদের শাসনামলে ‘কুমিশন’ ছিল ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় বৃহৎ প্রদেশ পার্ত’-এর অংশ। এই যুগে সেমনান শহর ছিল পার্ত এবং মাদ্‌দের প্রদেশের সীমান্ত শহর।

 

ইসলামী যুগে কুমিশান কোমেস নামে পরিচিতি পায়। এই কোমেস প্রদেশ আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত ছিল। বর্তমান সেমনানের আয়তন থেকে দক্ষিণের মরু অঞ্চল বাদ দিলে যে ভূখণ্ডটুকু অবশিষ্ট থাকবে সেটুকুকেই ইসলামী যুগের ভূগোলবিদরা কোমেস প্রদেশ বলে অভিহিত করেছেন। সে সময় কোমেস প্রদেশের রাজধানী বা প্রধান শহরের নাম ছিল দমাগন। ইসলামী ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী কোমেস শহর ছিল সমকালীন ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। মুহাম্মদ বিন আহমাদ মোকাদ্দেসি তাঁর ‘আহসানুত তাকাসিম’ নামক বইতে  কোমেস সম্পর্কে লিখেছেন:

 

‘পশমি পোশাকের জন্য কোমসের বেশ নাম আছে, বিশেষ করে সাদা হেড-ব্যান্ড তৈরির জন্য। সাদা কাপড়ের তৈরি হেড ব্যান্ডগুলোই বেশি বিক্রি হতো। এগুলোর এতো চাহিদা ছিল যে বাইরের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হতো। এ কারণে কোমেসের হেড-ব্যান্ড এক নামে সবখানেই পরিচিত। কোমেসে ফলও উৎপন্ন হতো প্রচুর। কোমেসের ফল ফলাদিও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রপ্তানি হতো’।

 

কোমেসের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। এখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইতিহাস যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ধর্মীয় এবং মাজহাবি আন্দোলনেরও ইতিহাস। যায়েদি আন্দোলন, ইসমাইলি আন্দোলন এবং সার্বদারান আন্দোলনের ইতিহাস খুবই নামকরা। কাজারি শাসনামলের শেষ পর্যন্ত কোমেসের নাম সবার মুখে মুখেই ছিল।

 

তবে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে কোমেস প্রদেশ ভাগ হয়ে যায় এবং সেমনানের নামে সমগ্র প্রদেশের নামকরণ করা হয় সেমনান। সে সময় কোমেসের অন্তর্ভুক্ত ছিল সেমনান ছাড়াও দমাগন, শাহরুদ, বাস্তম, সাঙ্গসার এবং শাহমিরযাদ।#

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন