এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 06 ডিসেম্বর 2015 18:42

ইরানের সেমনানের ‘তরিখনে মসজিদ’ এবং 'জামে মসজিদ'

ইরানের সেমনানের ‘তরিখনে মসজিদ’ এবং 'জামে মসজিদ'

ইরানে ইসলামি যুগের সুপ্রাচীন মসজিদগুলোর অন্যতম হলো সেমনানের দমগনের তরিখনে মসজিদ। শাসানি শাসনামলের স্থাপত্যের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে এই মসজিদটি। হিজরি তৃতীয় এবং চতুর্থ শতকে ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই মসজিদ।

তবে ভেতরের কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ থেকে গেছে যার ফলে পরবর্তীকালে মসজিদটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। তরিখনে মসজিদ ‘খনেয়ে খোদা’ এবং ‘চেহেল সুতুন মসজিদ’ নামেও পরিচিত। ক্ষতিগ্রস্ত হবার কারণে মসজিদটির নির্মাণ-সাল সম্পর্কে কোনো শিলালিপি বা খোদাইকাজ পাওয়া না গেলেও স্থাপনাটির নির্মাণের যে স্টাইল তা থেকে অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে এই মসজিদ ইসলামি যুগের প্রথম দিকেই নির্মিত হয়েছে।



ঐতিহাসিক এই মসজিদের গুরুত্বটা হলো ইসলামি সংস্কৃতি এবং শাসানি যুগের স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে। পুরো ভবনের মূল পরিকল্পনায় একটি আঙিনা রয়েছে যার দৈর্ঘ্য ২৭ মিটার আর প্রস্থ ২৬ মিটার। সম্পূর্ণ ইসলামি স্থাপনা মসজিদের গঠন অবশ্য একেবারেই সহজ সরল। তারপরও ইরানি একটা স্বতন্ত্র স্থাপত্যরীতির ছাপ পুরোপুরি রয়েছে এই মসজিদে। বাইরের কোনো ধরনের ডিজাইন বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় নি। তবে দেয়াল এবং তাকগুলো তৈরি করা হয়েছে কাঠ এবং ইট দিয়ে। সম্ভবত এই সাধারণ উপাদানগুলোর সুষ্ঠু এবং যথাযথ ব্যবহার করার কারণেই মসজিদটি আজো তার অস্তিত্বের সাক্ষর রেখে যেতে সক্ষম হয়েছে। সে কারণেই এখনও এই তরিখনে মসজিদ স্থাপনাটি দর্শনীয় স্থাপনাগুলোর অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।


তরিখনে মসজিদ ছাড়াও এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক জামে মসজিদ। দমগন জামে মসজিদ নামেই এর খ্যাতি। দমগন শহরের ঠিক কেন্দ্রে এই মসজিদটির অবস্থান এখন। মসজিদের বেশ কয়েকটি অংশই পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। বিভিন্ন যুগে এই অংশগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। দমগন জামে মসজিদের সবচেয়ে প্রাচীন অংশ হলো ঝুলবারান্দা, শাবেস্তান এবং এর মিনার। ঝুলবারান্দার উচ্চতা এবং বিশালতা, শাবেস্তানের বিস্তৃতি আর মিনারে ব্যবহৃত টাইলসগুলোর দিকে মনোযোগ দিলে সহজেই বোঝা যাবে এর প্রাচীনত্ব। গবেষকগণ এই দিকগুলো বিশ্লেষণ করে মসজিদটিকে পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শেষদিককার স্থাপনা বলে মত দিয়েছেন।


দমগন জামে মসজিদের পাশেই রয়েছে আরও একটি পবিত্র স্থাপনা। ইমামযাদা জাফর (আ) কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্সে রয়েছে ইমামযাদা জাফর (আ) এর মাযার, ইমামযাদা মুহাম্মদ (আ) এর মাযার, শাহরুখের সমাধি এবং চল্লিশ কন্যার সমাধি স্থাপনা। এইসব স্থাপনা সালজুকি আমলের নিদর্শন বলে মনে করা হয়। ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এখানকার স্থাপনাগুলো। এই কমপ্লেক্সে পবিত্র কুরআনের আয়াতের চমৎকার ক্যালিগ্রাফি যে কারো দৃষ্টিতেই না পড়ে পারবে না। এগুলো ইমামযাদা জাফর (আ) কমপ্লেক্সের সৌন্দর্যকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।



আসরের এ পর্যায়ে আমরা যাবো সেমনানের প্রাচীন বাজারের দিকে। ইরানী বাজার বলতে আলাদা আলাদা দোকান,আলাদা বিভাগ অর্থাৎ এক বিভাগে এক ধরনের জিনিসের দোকান,সরাইখানা,ময়দান,ধর্মীয় স্থাপনা, গোসলখানাসহ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমষ্টিকেই বোঝায়।


মরু আঞ্চলিক আবহাওয়াগত পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে সেমনান বাজারের কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে বাজারের ছাদটি করা হয়েছে ইট বা রোদে পোড়া ইট দিয়ে। এ কারণে গরমকালে ঠাণ্ডা এবং শীতকালে তুলনামূলকভাবে গরম অনুভূত হয়।

সেমনান বাজারটি প্রায় দুই শ বছরের পুরনো। কাজারী রাজবংশের প্রথম দিকে এই বাজারটি নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের পরিসর বৃদ্ধি করা এবং সড়ক নির্মাণ করার কারণে বাজারটিকে দুই ভাগে ভাগ করে নির্মাণ করা হয়েছে। বাজারের উত্তরাংশ প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা। এই বাজারের প্রাচীন নাম ‘রস্তে বাজার’। এই বাজারের ছাদ স্থাপত্যকলার দিক থেকে বেশ সুন্দর। এটি অনেকটা গম্বুজ আকৃতির। গম্বুজে রয়েছে কাঁচের জানালা। এরফলে বাজারের ভেতরে প্রয়োজনীয় আলো সরবরাহ হয়। বাজারের ভেতরে দুই শ’র মতো দোকান রয়েছে,রয়েছে তিনটি গোসলখানা,পাঁচটি মসজিদ,চারটি সরাইখানা এবং একটি বিশাল তাকিয়া। এই তাকিয়ায় রয়েছে বড়ো একটি হলরুম। মুহররম মাসে শোকানুষ্ঠান করার জন্যে এই হলরুমটি ব্যবহার করা হয়।

কয়েকটি দোকানও রয়েছে এখানে। তাকিয়ার মূল প্রবেশদ্বারে চমৎকার নকশা করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে,সেমনানের সবচে বড়ো জলাশয়টি এই তাকিয়ার ভেতরে রয়েছে।এছাড়াও এখানে আছে ছোট্ট একটি মসজিদ।
দক্ষিণ বাজারটিতেও রয়েছে পঞ্চাশটির মতো দোকান। এখানেও রয়েছে ‘পাহনে’ নামের একটি তাকিয়া। এই তাকিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো এর কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক কিছু মূল্যবান নিদর্শন। যেমন এর দক্ষিণ-পূর্বে রয়েছে ইমাম খোমেনী মসজিদ আর উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে সেমনান জামে মসজিদ এবং পাহনে গোসলখানা। আমরা ইতোপূর্বে জামে মসজিদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। এবারে বরং ‘পাহনে’ হাম্মামের সাথে পরিচিত হওয়া যাক।


পাহনে হাম্মামও সেমনানের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর অন্যতম একটি নিদর্শন। এই নিদর্শনও ইরানের জাতীয় নিদর্শনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। খ্রিষ্টীয় ১৯৯৪ সালে এই হাম্মামটিকে নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। হিজরি ৮৫৬ সালে অর্থাৎ তৈমুরী বাদশাহ আবুল কাসেম বাবর খানের শাসনামলে এই হাম্মামটি তৈরি করা হয়। পাহনে হাম্মামের দর্শনীয় একটি বিষয় হলো এর সদর দরোজায় টাইলসের চমৎকার কারুকাজ। দরোজার উপরাংশে টাইলসের ওপরে নাস্তালিক ফন্টে কবিতাংশ লেখা হয়েছে। আর দুইপাশে দুটি ছবি আর্ট করা হয়েছে। একটি হলো কাজারী একজন কমান্ডারের আরেকটি কাজারী অফিসারের। দুইজনের হাতে তরবারি শোভা পাচ্ছে।

হাম্মামটির আয়তন এক হাজার বর্গমিটার। এর ভেতরে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা দরোজা ছাড়াও রয়েছে ছোট ছোট হাউজ,আগুন জ্বালাবার ছোট ঘর ইত্যাদি। ঠাণ্ডার সময় গরম পানির প্রয়োজনে এখানে আগুন জ্বালানো হয়। হাম্মামের ভেতরের সৌন্দর্যের কারণেই এটিকে যাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। এই যাদুঘরের বিদ্যমান জিনিসপত্রগুলোকে দুটি পৃথক পৃথক বিভাগে রাখা হয়েছে। একটি পুরাতত্ত্ব বিভাগ,অপরটি নৃতত্ত্ব বিভাগ। প্রাচীন নিদর্শনগুলো খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের আর নৃতাত্ত্বিক জিনিসপত্রগুলো ইসলামী যুগের।

মৃৎশিল্পের নিদর্শনগুলোও খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের।এসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে হস্তশিল্পের সরঞ্জামাদি,নারীদের সাজসজ্জার জিনিসপত্র, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রভৃতি। এছাড়াও এই মিউজিয়ামে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলিলপত্রও সংরক্ষিত আছে।#

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন