এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 02 ফেব্রুয়ারী 2016 12:56

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহ্যবাহী প্রদেশ বেলুচিস্তানের বালুচদের স্বভাব চরিত্র

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঐতিহ্যবাহী প্রদেশ বেলুচিস্তানের বালুচদের স্বভাব চরিত্র

২ ফেব্রুয়ারি (রেডিও তেহরান): বেলুচিস্তান অঞ্চলটি বেশ উঁচু। বেলুচিস্তানের উঁচু এলাকাগুলোর মধ্যে জাবালে পীরশুরান পর্বতমালা,মালেক সিয়কূহ,মিরজাভেকূহ,তাফতান পর্বতমালা এবং বাযমান পর্বতমালার নাম করা যায়।

ওমান সাগরের সাথে দূরত্ব ভেদে এবং আঞ্চলিক উচ্চতার তারতম্যের কারণে বেলুচিস্তানের আবহাওয়ায় ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এলাকার এই আবহাওয়াগত বৈচিত্র্য কিংবা বৈপরীত্য সত্যিই বিস্ময়কর। আবহাওয়াগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে বেলুচিস্তানকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এ বিষয়ে গত আসরে আমরা খানিকটা আলোচনা করেছি। পরবর্তীকালে সময় সুযোগ হলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

 

বেলুচিস্তান লুত মরুভূমির পাশে হওয়ায় এখানে বায়ুপ্রবাহ প্রায় সবসময় বেশি থাকে। তবে বছরের বিভিন্ন ঋতুতে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে বাতাসের উষ্ণতা এবং আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ে-কমে। যেমন উত্তুরে বাতাসের প্রবাহ মোটামুটি বসন্ত এবং শরতে অনুভূত হয়।এই বাতাস সিস্তান হ্রদের আর্দ্রতাসহ বয়ে যায় বলে তুলনামূলকভাবে ঠাণ্ডা থাকে। তবে গ্রীষ্ম ঋতুতে বাতাসে উষ্ণতার মাত্রা এতো বৃদ্ধি পায় যে, স্থানীয় লোকজন ছাড়া ঐ আবহাওয়া সহ্য করা কঠিন। আবার শীতকালে আর্দ্রতার মাত্রা কখনো কখনো এতোবেশি কমে যায় যে, এর ফলে তুষারপাত ঘটে। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় আবহাওয়া থাকে ভীষণ ঠাণ্ডা।

 

অন্যদিকে দক্ষিণা বাতাস সমুদ্রের আর্দ্রতা নিয়ে এসে বৃষ্টিপাত ঘটায়। যার ফলে দেখা দেয় বন্যা। আর এই বন্যার কারণে এখানে উর্বর পলি এসে জমে,ঐ পলিতে সবুজ গাছ-গাছালি আর তৃণ যেমন সৃষ্টি হয় তেমনি খেজুর বাগান আর কৃষিক্ষেতেরও উন্নতি ঘটে। বেলুচিস্তান শিকার করার জন্যেও উত্তম একটি এলাকা। বলা যায় ইরানের মধ্যে শিকারের জন্যে শ্রেষ্ঠ একটি এলাকা হলো বেলুচিস্তান। কেননা; এখানে রয়েছে জনমানবশূন্য জঙ্গলাকীর্ণ বিস্তীর্ণ এলাকা। বিরল প্রজাতির বিচিত্র পশু-পাখির বাস রয়েছে এখানে।

 

বেলুচিস্তানের বিখ্যাত কিছু পাখি হলো: কাব্ক-এটি তিতির জাতীয় পাখি, তিহু,এই পাখিটিও তিতির জাতীয় তবে তিতিরের চেয়ে ছোট। রংটা ধূসর হলুদ। বুকের নীচে একটুখানি কালো। এই পাখির মাংস বেশ সুস্বাদু। মিনা, কোয়েল, রাজহাঁস,পাতিহাঁস এবং আরো অনেক জাতের পাখি। শিকারী প্রাণীও এখানে এতো বেশি দেখতে যাওয়া যায় যে,ইরানের অন্যান্য অঞ্চলে তা বিরল। শিকারী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে: ভালুক, চিতাবাঘ, নেকড়ে,শেয়াল ইত্যাদি। বেলুচিস্তানী হরিণ এখানে প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়।

 

বেলুচিস্তানের অধিবাসীরা বেশ কষ্টসহিষ্ণু,পরিশ্রমী এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী। এরা বিপদ-আপদে এতো বেশী ধৈর্যশীল যে,বোধ হয় সমগ্র ইরানে তার জুড়ি মেলা ভার। বিশ্বস্ততা, অতিথি পরায়নতা, মহত্ব, দানশীলতায় বালুচদের ঐতিহ্য প্রবাদতুল্য। বিশেষ করে অতিথি পরায়নতা এদের প্রকৃতিগত। বালুচদের সবার মাঝেই এই বৈশিষ্ট্যটি সহজ লক্ষ্য।

 

বালুচরা স্বাধীনচেতা, সত্যবাদী,সাহসী এবং পরিশ্রমী। এদের চাহিদা খুবই কম। উচ্চাভিলাষী নয় এরা। খুব কম সামর্থ ও সম্পদ দিয়ে এরা দিব্যি জীবনযাপনে অভ্যস্ত। উট চালানো, তীরন্দাজি, শিকার করা, পর্বতারোহন, মরুভ্রমণ এমনকি পায়ে হেঁটে পথচলাতেও দারুন অভ্যস্ত। বালুচরা কথা দিলে তা পালন করার ক্ষেত্রে ভীষণরকম দায়িত্ববান এবং অঙ্গীকারবদ্ধ।

 

বালুচদের স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে তো সংক্ষেপে জানা হলো। পুরাতত্ত্ব বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে বালুচরা আর্যদেরই একটি অংশের বংশোদ্ভুত। প্রাচীনকালে মধ্য এশিয়ায় এবং আমুদরিয়ার তীরবর্তী এলাকায় বাস করতো। পরবর্তীকালে জনসংখ্যা বেড়ে যাবার কারণে কিংবা আরও অনেক কারণে খ্রিষ্টপূর্ব দু’হাজার বছর আগে এই এলাকায় এসে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। বালখের দিকেও গেছে একটি অংশ। তারা বর্তমান ইরানের পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বে বসবাস করতে শুরু করে। এই গ্রুপেরই একটি অংশ পরবর্তীকালে পশ্চিম ইরানের দিকে যায় এবং বিভিন্ন গোত্রে ভাগ হয়ে যায়।

 

আর্যদের সঙ্গে বালুচদের বিভিন্ন গোত্র ও বংশের লোকজনের বাহ্যিক বা দৈহিক মিল রয়েছে পুরোপুরি। নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণায় আরও উঠে এসেছে বালুচরা ইরানী বংশোদ্ভুত এবং কুর্দ, লোর, তাজিকদের সাথে তাদের মিল রয়েছে অনেক। তবে বিদেশি দস্যুদের আক্রমণে তাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও এমনকি ভারতসহ আরও অনেক দেশের প্রতিবেশি হওয়া সত্ত্বেও বালুচরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও জাতীয় সংস্কৃতি সুরক্ষা করেছে ভালোভাবে।

 

এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো সেটা হলো বালুচদের ভাষাভঙ্গি কিন্তু খুবই সমৃদ্ধ। মূল্যবান মৌখিক সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে বালুচদের। বালুচদের সাহিত্যে বিশেষ করে কবিতায় তাদের জীবন যাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে চমৎকারভাবে। তার পাশাপাশি যুদ্ধের ইতিহাস, জন্ম-মৃত্যুর কথাসহ সমাজের বহু ঘটনা দুর্ঘটনার কাহিনী তাদের কবিতায় বর্ণিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালের কবিতায় যেমন রাজা-বাদশা আর সমাজপতিদের গুণগান গাওয়া হতো বালুচি সাহিত্য তার ব্যতিক্রম ছিল না। বালুচি সঙ্গীতও বেশ সমৃদ্ধ। প্রাচ্য সঙ্গীতকলার শাখার অন্তর্ভুক্ত এখানকার সঙ্গীত। সে কারণে ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান ও খোরাসানের মিউজিকের সাথে বালুচদের মিউজিকের চমৎকার মিল রয়েছে। বালুচদের সঙ্গীত এতো বেশি জীবনঘনিষ্ঠ যে সেখানকার লোকজনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বালুচি সঙ্গীত।

 

আরেকটি তথ্য জেনে রাখা ভালো তাহলো বেলুচিস্তানে তাদেরকেই কবি বলা হয় যারা মিউজিকের তালে তালে কবিতা শোনান। যারা শুধু কবিতা লেখেন তাদেরকে কবি বলা হয় না। মিউজিকের সাথে সাথে যেসব কবিতা আবৃত্তি করা হয় সেসব কবিতায় জীবন কিংবা যুদ্ধ অথবা সমাজের কোনো একটি ঘটনার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে বালুচদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য কিংবা সামাজিক অনেক আয়োজনের জন্য আলাদা আলাদা কিন্তু সুনির্দিষ্ট গান রয়েছে। এগুলো এতো বেশি যে ইরানী সাহিত্যের একটা সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয় এগুলোকে। বালুচদের স্থানীয় কবিতা বিয়ে-শাদি এবং ধর্মীয় ঈদ অনুষ্ঠানেও বাজনাসহ গাওয়া হয়। #

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন