এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 20 ফেব্রুয়ারী 2016 17:57

ইরানের চ’বাহর সমুদ্র বন্দরের বাণিজ্যিক ইতিহাস

ইরানের চ’বাহর সমুদ্র বন্দরের বাণিজ্যিক ইতিহাস

বহুকলাত একটি সংরক্ষিত এলাকা। নদীবাহিত এ অঞ্চলটি বেলুচিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রান্তসীমায় অবস্থিত।

বহুকলাতের পূর্বে রয়েছে পাকিস্তান, দক্ষিণে ওমান সাগর আর পশ্চিম এবং উত্তরে রয়েছে বিভিন্ন নদী। এই এলাকার মোট আয়তন ত্রিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে সাত হাজার বর্গ কিলোমিটার হলো সমতল ভূমি আর বাদবাকি এলাকা পার্বত্য। বহুকলাত নদীর পানি এখানকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শেষ পর্যন্ত গুয়াতোর উপসাগরে গিয়ে পড়ে।

 

এ অঞ্চলের পরিবেশগত বিশেষত্বের কারণে বিশেষ করে এখানকার নদীগুলোতে কুমির থাকার কারণে বহুকলাতের পূর্বাঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কুমিরের বসবাসের কারণে স্থানীয়ভাবে এই এলাকাটি ‘কুমিরের চোয়াল' নামে বিখ্যাত। এই শ্রেণীর প্রাণীর অস্তিত্ব এখন সমগ্র পৃথিবীতে খুবই বিরল। ইকো-সিস্টেমের দিক থেকেও এই এলাকার একটা বিশেষত্ব রয়েছে। এখানে যেমন রয়েছে বিচিত্র উদ্ভিদ, তার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীও বাস করে এখানে। এখানকার বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ এবং জীবজন্তু ইরানের অন্যান্য এলাকায় পাওয়া যায় না।

 

সে কারণে যারা জীবজন্তু বা প্রাণী বিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করেন, তাদের গবেষণার জন্যে বা'হুকলাত একটা যথোপযুক্ত ক্ষেত্র। কেননা; এখানে নদীজ, স্থলজ, সামুদ্রিক, পার্বত্য আর মরু আঞ্চলিক বিভিন্ন প্রাণীর বসবাস রয়েছে। গুয়াতোর উপসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকায় বিশেষ করে বহুকলাত নদী যেদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওমান সাগরে গিয়ে মিশেছে, ঐসব এলাকায় বন-বনানী লক্ষ্য করা যাবে। বলা হয়ে থাকে যে, চ’বাহরের তীরবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্য,ওমান সাগর তীরবর্তী বা পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। গুয়াতোর উপকূলকে তাই ইরানের মধ্যে সবচেয়ে প্রশান্ত এবং ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী একটা স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

বহুকলাত হয়ে গুয়াতোরের সাথে খানিকটা পরিচিত হলাম আমরা। এবার এ এলাকা ছেড়ে যাবো চ’বাহারের দিকে। চ’বাহার বেলুচিস্তানের অন্যতম প্রধান শহর। তবে প্রাদেশিক শহর হলো যাহেদান। বন্দর চ’বাহার এবং এখানকার মুক্ত বাণিজ্য এলাকা খুবই নামকরা।

 

বেলুচিস্তানের নামকরা শহর হলো চ’বাহর। ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের তিনটি প্রধান শহরের একটি হলো চ’বাহর। প্রদেশের অন্য দুটি শহর হলো হলো কোনারাক এবং নেগর। চ’বাহর শহরটি ওমান সাগরের তীরে অবস্থিত। প্রায় তিন শ' কিলোমিটার উপকূল জুড়ে এই শহরটি অবস্থিত। বন্দর নগরীটিই চ'বাহরের মূলকেন্দ্র। চ’বাহরের আয়তন হলো সতর হাজার বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। কর্কটক্রান্তির নিকটে অবস্থান,ভারসাম্যপূর্ণ ওমান সাগরের প্রভাব এবং মৌসুমি বায়ুর ফলে এখানে চারটি ঋতুতেই মোটামুটি নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। অনেকের মতে আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের সাথে মিল রেখেই এই শহরের নামকরণ করা হয়েছে চ'বাহর। চ'বাহর তো নয় আসলে এর নাম ছিল চহর বাহর অর্থাৎ চার বসন্ত।

 

চ'বাহর থেকে ৩৫০ কিলোমিটার পূর্বে ইরনশাহ্‌র অবস্থিত। এই ইরনশাহ্‌রের মাধ্যমে ইরানের বৃহৎ শহরগুলোর সাথে চ'বাহরের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি˜’তীস' নামে বিখ্যাত ছিল। বিশেষ করে ভৌগোলিক দিক থেকে কৌশলগত অবস্থানে থাকার কারণে চ'বাহর সারাবিশ্বেই পরিচিত ছিল। একটা সময় ছিল শাসকরা এই চ'বাহরের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারতো না। তখন উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো যেমন ব্রিটেন, পর্তুগাল, স্পেন প্রভৃতি এই চ'বাহরের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্যে পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল। এর নিদর্শন এখনো সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে। যেমন চ’বাহর থেকে ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে তীস টিলায় এখনো পর্তুগীজদের কেল্লার নিদর্শন রয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপের প্রমাণস্বরূপ এখনো চ'বাহরের মূল শহরে ‘বাংলো' ভবন কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

 

চ’বাহর সমুদ্র বন্দরের বাণিজ্যিক ইতিহাস বেশ প্রাচীন। বিশেষ করে হাখামানেশীয় যুগে সমুদ্র পথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিংবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই বন্দরটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব বাণিজ্যিক পণ্য মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পাঠানো হতো, সেসব এই চ'বাহর বন্দর হয়েই যেত। ভেনিজুয়েলার বিখ্যাত পর্যটক মার্কু পুলু তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে চ'বাহর বন্দর সম্পর্কে লিখেছেন: ‘সমুদ্রপথে ভ্রমণকারী বহু বণিক চ'বাহর সমুদ্র বন্দরে নোঙর ফেলেন এবং এখান থেকে সড়ক পথে বিভিন্ন পণ্য বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হয়।’

 

চ’বাহর ছাড়াও সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে আরো দুটি উল্লেখযোগ্য বন্দর আছে। একটির নাম তীস বন্দর। অপরটির নাম কোনারাক। এগুলোর মধ্যে তীস বন্দরটি বেশি প্রাচীন। এই বন্দরটির এতো খ্যাতি বা পরিচিতির কারণ মনে হয় এখানকার প্রাচীন ও মূল্যবান কিছু নিদর্শন। তাছাড়া এখানে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও কিছু কিছু নমুনা। যেমন এখানে রয়েছে অনেকগুলো কূপ, রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন গুহা। আরো আছে তীস কেল্লা, জামে মসজিদ এবং অসংখ্য মাযার। তীস কেল্লাটি পর্তুগিজ কেল্লা। এই কেল্লাটি তীস বন্দরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। তীস চ’বাহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে দুটি পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত। দূর থেকে এর সৌন্দর্য দৃষ্টি কেড়ে নেয়।#

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন