এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 22 ফেব্রুয়ারী 2016 14:10

ইরানের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ কুর্দিস্তান

ইরানের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ কুর্দিস্তান

কুর্দিস্তান বন-জঙ্গলাকীর্ণ শ্যামল একটি প্রদেশ। আকাশচুম্বি পর্বতঘেরা এই এলাকা যে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কিংবা আনন্দ ভ্রমণের জন্য খুবই ভালো তা তো আর বলারই অপেক্ষা রাখে না।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে রয়েছে দেখার মতো ঐতিহাসিক বহু নিদর্শন। আমরা ধীরে ধীরে এইসব স্পটে যাবো ইনশাআল্লাহ।

 

কুর্দিস্তান প্রদেশটির আয়তন প্রায় ২৮ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার। ইরানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রদেশটি। কুর্দিস্তানের উত্তরে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান এবং যানজনের অংশবিশেষ,দক্ষিণে রয়েছে কেরমানশাহ প্রদেশ,পূর্বে রয়েছে হামেদান প্রদেশ এবং পশ্চিমে রয়েছে ইরাকের সাথে ইরানের সীমান্ত । অসমতল ও উঁচু এলাকা হবার কারণে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে কুর্দিস্তান ইরানের একটি শীতল এলাকা হিসেবে পরিচিত।

 

তবে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই প্রদেশে অনেক নদনদী আছে। এইসব নদনদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহার করার পর অবশিষ্ট পানি 'সেইরাভন' নদী এবং 'যব্কুচাক' নদী হয়ে ইরাক ভূখণ্ডে চলে যায় কিংবা গেযেল উযন নদী বা যাররিনে নদী হয়ে কুর্দিস্তান ছেড়ে কাস্পিয়ান সাগর অথবা উরুমিয়ে হ্রদে গিয়ে পড়ে ।

 

সানান্দাজ কুর্দিস্তান প্রদেশের কেন্দ্রিয় শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সানান্দাজ ১৪৮০ মিটার উচ্চে অবস্থিত। কুর্দিস্তানের জনগণ মুসলমান এবং তাদের ভাষা হলো কুর্দি ভাষা। তবে কুর্দিস্তানের সকল এলাকারই ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভঙ্গি রয়েছে,যাকে বলা হয় আঞ্চলিক ভাষা। কুর্দি ভাষা ইরানী মূল ভাষাগুলোর অন্যতম একটি শাখা। এই ভাষাতে ইরানের অন্যান্য ভাষার তুলনায় বিদেশী ভাষার প্রভাব পড়েছে সবচে কম। কুর্দি ভাষাটিকে অবশ্য তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন সুরানি কুর্দি,কেরমানজি কুর্দি এবং হুরামি বা উরামি কুর্দি ভাষা।পুরাতত্ত্ব গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে কুর্দিরা ছিল মাদ্ গোত্রের অংশ।

 

বলা হয়ে থাকে যে,মাদ্রাজা হোভাখশাতরেহ্‌ খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ বছর আগে অশুরদের রাজধানী নেইনাভাতে হামলা চালায়। ঐ হামলায় অশুরিয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অশুরীদের পতনের পর মাদ্‌রা এখানে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই ঐতিহাসিক বিজয়েরই উত্তরাধিকার হলো কুর্দিস্তানের মাদ জাতি। গ্রিক ইতিহাসবিদ গাযানফুন বলেছেন,খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ বছর আগে কুর্দিদের বাসস্থান বর্তমান কুর্দিস্তান থেকে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কুর্দ্ তখন 'কোরদুখ' নামেও পরিচিত ছিল।

 

কুর্দিরা ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকাজ,পশুপালন,হস্তশিল্পসহ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র তৈরি করতে বেশ নিপুণ। তাদের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য তারা যথার্থভাবে সংরক্ষণ করেছে। এখানে রয়েছে পার্বত্য চারণভূমি,রয়েছে ঔষধ তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় বিচিত্র উদ্ভিদ এবং রয়েছে বহু বন-বনানী।এগুলোর অস্তিত্ব থাকার কারণে পশুপালন এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে। এই পশুপালন যে কেবল অর্থনৈতিক চাহিদারই জোগান দেয় তা নয়,বরং জনগণের প্রোটিন চাহিদা বা দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির চাহিদাও মিটিয়ে থাকে। এখানকার দুগ্ধজাত দ্রব্য অন্যান্য প্রদেশেও সরবরাহ করা হয় ।

 

আসরের এ পর্যায়ে চলুন কুর্দিস্তানের প্রাদেশিক শহর সানান্দাজের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। তেহরান থেকে ৫২০ কিলোমিটার পশ্চিমে সানান্দাজ শহরটি অবস্থিত। ১৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সোলায়মান খাস আরদালনের শাসনামলে এই শহরটি নির্মিত হয়েছিল। শাহ সাফির আমলে সানান্দাজ কেন্দ্রীয় শহর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। কেননা সে সময় এই শহরটি ছিল অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র এবং হস্তশিল্প সামগ্রী উত্পাদনের প্রধান কেন্দ্র। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে মালামাল আদান-প্রদান ও লেন-দেন হতো। তাছাড়া এখানে মসজিদ-মাদ্রাসা আর বাজারঘাটসহ মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল সহজলভ্য।

 

হস্তশিল্পের ক্ষেত্রে কুর্দিস্তানের একটা প্রাচীন ঐতিহ্য এবং মৌলিকত্ব রয়েছে। বাজারে কুর্দিদের হস্তশিল্পসামগ্রীর চাহিদা এবং গুরুত্ব যথেষ্ট। ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর বিশেষ করে ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর কুর্দিরা ইরান সরকারের আনুকূল্য পাবার ফলে তাদের মাঝে এই শিল্প চর্চা আগের তুলনায় আরো বেশি সচল হয়েছে। সরকারী সহযোগিতায় কুর্দিস্তানের শহরগুলো এবং তাদের আশেপাশে ছোটোবড়ো বহু শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে এখানকার খনিজ ও শিল্পক্ষেত্রে দর্শনীয় উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।

 

সানান্দাজ জামে মসজিদটিও কুর্দিস্তানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থাপনা। এই মসজিদ দারুল এহসান নামেও বিখ্যাত। পাথরের পিলারের ওপর নির্মিত এই মসজিদটি শ্বেত মর্মর পাথর,রঙীন টাইলস এবং গম্বুজযুক্ত ছাদ বিশিষ্ট। সানান্দাজ জামে মসজিদটির বড়ো একটি শাবেস্তান রয়েছে। শাবেস্তান হলো মসজিদের ছাদবিশিষ্ট উঠোনের মতো । এই শাবেস্তানের একটি গম্বুজ আছে। পাথরের তৈরী ২৪টি পিলারের ওপর ঐ গম্বুজটি স্থাপিত। শাবেস্তানের উপরাংশে চারদিক ঘিরে লিপিকর্মও করা হয়েছে। কোরআনের আয়াতের এইসব লিপিকর্ম যথেষ্ট সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। বলা হয়ে থাকে যে,এই মসজিদে যতো পাথর ব্যবহার করা হয়েছে সবগুলোই মর্মর পাথর ।

 

সানান্দাজের ঐতিহাসিক আরও কিছু দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে রয়েছে অ্যানথ্রোপোলজি বা নৃতত্ত্ববিদ্যা যাদুঘর। কুর্দিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোই এই যাদুঘরে স্থান পেয়েছে। এখানে রয়েছে পর্যটন এলাকা। অবিদার নামে বিশাল পার্বত্য বনাঞ্চল বেশ নামকরা। অবিদার নামে বেশ উঁচু একটি পাহাড় আছে এখানে। ওই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে বনাঞ্চলটি। এর ভেতরে মসজিদ, লাইব্রেরি, রেস্টুরেন্ট, সিনেমা হল এবং শরীরচর্চা কেন্দ্র অর্থাৎ জিমনেশিয়ামও রয়েছে।#

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন