এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 22 ফেব্রুয়ারী 2016 17:17

ঐতিহ্যবাহী প্রদেশ কুর্দিস্তানের সাককেজ উপশহর

ঐতিহ্যবাহী প্রদেশ কুর্দিস্তানের সাককেজ উপশহর

কুর্দিস্তান প্রদেশের অন্যতম একটি উপশহর হলো সাককেয। পুরাতাত্ত্বিক মূল্যবান নিদর্শনে পরিপূর্ণ এই এলাকাটি।

এগুলো প্রমাণ করে যে সাককেয শহরটি অনেক প্রাচীন। সাককেয শহরের আয়তন ৪৩৭০ বর্গ কিলোমিটার। সাককেযের উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ, পশ্চিমে রয়েছে বনেহ শহর এবং ইরাকের অংশবিশেষ, দক্ষিণে পড়েছে মারিভন শহর আর পূর্বে অবস্থিত দিভনদাররে শহর। সাককেয শহরের অর্থনীতি নির্ভরশীল এখানকার কৃষিকাজের ওপর। এখানকার গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে গম,যব,তামাক, দানাদার তৈল বীজ এবং বুটবাদাম জাতীয় দানাদার বিচিত্র কৃষিপণ্য।

 

সাককেয শহরটির উচচতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০০ মিটার। কুর্দিস্তানের কেন্দ্রিয় শহর সানান্দায শহর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে এই শহরটি অবস্থিত। শহরের ভেতর দিয়ে সাককেয নদী বয়ে যাবার কারণে এই এলাকার কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। সেইসাথে পানি থাকার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে সবুজ বন-বনানী। নদীর তীর জুড়ে গড়ে ওঠা এইসব বনানী চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করেছে।

ইতিহাসবিদদের ধারণা সাককেয শহরটি মাদ্‌দের শাসনামলে গড়ে উঠেছে।

 

সাককেয শব্দটির উৎস সাককেয থেকে। সাককেয ছিল সাকাদের রাজধানী। একর পর এক হামলার কারণে এই এলাকাটির চেহারা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বর্তমানে সাককেয-বনেহ মহাসড়কে যেই এলাকাটি পড়েছে,তাকে প্রাচীন সাককেয নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। সাককেয প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন গোষ্ঠির পক্ষ থেকে হামলার শিকার হয়েছে। অশুররা, রোমরা এমনকি তাদের পরে মোঙ্গল এবং ওসমানী সম্রাটদের হাত থেকেও সাককেয নিরাপদ ছিল না, তাদের সবাই হামলা চালিয়েছে এই শহরটির ওপর।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এলাকায় প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাদির খোঁজে যে খননকার্য চালানো হয়েছে তার ফলাফলে দেখা গেছে সমগ্র সাককেয এলাকাটিই প্রাচীন নিদর্শনে পরিপূর্ণ। অবশ্য কেবল এগুলোর কারণেই সাককেয বিখ্যাত নয় বরং এখানকার আরো কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন এই এলাকাটিকে খ্যাতিমান করে তুলেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে যিভিয়া দূর্গ,যিভিয়া টিলা এবং কারাফ্‌তু গুহা। আসরের এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

 

সাককেয শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে যিভিয়া গ্রামের পাশে একটি টিলার উপরে প্রাচীন কেল্লার ধবংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর প্রাচীন একটি শহরের ধবংসাবশেষ এগুলো। যিভিয়াতে যেসব প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলোর প্রাচীনত্ব তিন হাজার বছর বলে পুরাতত্ত্ববিদরা মত দিয়েছেন। দুঃখজনকভাবে এখানে ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় বিভিন্ন যুগের যেসব মূল্যবান ও চমৎকার সব নিদর্শন ছিল, ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের আগেই সেগুলো লুটতরাজ হয়ে গেছে। 

এখানকার নিদর্শনগুলো এখন ইউরোপ এবং আমেরিকার মিউজিয়ামগুলোর শোভা বর্ধন করছে। সামান্য কিছু নিদর্শন ইরানী মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।ঐতিহাসিক কারাফ্‌তু দূর্গটিও কুর্দিস্তান প্রদেশের একটি বৃহৎ ও আকর্ষণীয় নিদর্শন।এই দূর্গটি সাককেয থেকে ৭৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কারাফ্‌তু গ্রামের কাছে এই দূর্গটি অবস্থিত। এই দূর্গটিতে দুটি স্থাপত্য দেখতে পাওয়া যায়।এগুলো খ্রিষ্টপূর্ব তিন শ'বছর আগের আশকানীয় শাসনামলের বলে মনে করা হয়।গুহার ভেতরে খননকাজ চালিয়ে যেসব দালান বা কক্ষ আবিষ্কার করা হয়েছে,সেগুলোতে প্রাপ্ত দেয়ালচিত্র এবং খোদাইকর্ম থেকে অনুমিত হয় যে,প্রাচীনকালে এখানে মানব বসতি ছিল।

 

কারাফতু'র গুহামুখটি একটি কৃত্রিম চূড়া। মাটি থেকে এর উচচতা ৩৫ মিটার।চূড়ায় ওঠার জন্য যে সিঁড়ি ব্যবহার করা হতো,তার অস্তিত্ব এখনো দেখতে পাওয়া যায়। গুহার ভেতর দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। এই নদীটি অনেক ঝরনার জন্ম দিয়েছে। এই ঝরনাধারার পানি মিষ্টি। বর্ণনা থেকে নিশ্চয়ই অনুমান করা যায় যে গুহাটি বেশ দর্শনীয়। হ্যাঁ, সত্যিই তাই। একারণেই ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে বেড়াতে আসেন সারা বছর ধরে। ইচ্ছে করলে আপনিও বেড়িয়ে আসতে পারেন।

আলোচনার এ পর্যায়ে চলুন ‘বনেহ’ শহরের সাথে পরিচিত হই। বনেহ শহরটির পূর্বে রয়েছে সাককেয শহর,উত্তরে রয়েছে পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশ আর দক্ষিণ এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে ইরাক। বনেহ শহরটির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক হাজার পাঁচ শ চুয়ান্ন মিটার। সাককেয থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং ইরাক থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে বনেহ শহরটি অবস্থিত। প্রাকৃতিক দৃশ্যগত সৌন্দর্যের দিক থেকে ‘বনেহ' কুর্দিস্তান প্রদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ একটি এলাকা। 

এখানকার বন-জঙ্গল আর পাহাড়-পর্বত প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের কারণ। তাছাড়া এখানে রয়েছে বেশ সমৃদ্ধ চারণভূমি। এই চারণভূমির ফলে এখানে পশুপালনের প্রচলন চোখে পড়ার মতো। প্রাকৃতিক বিশেষত্বের কারণে এখানে যাযাবর বা উপজাতীয়দের আসা-যাওয়ারও প্রচলন আছে।

ইতিহাসের বহু চড়াই উৎরাইয়ের সাক্ষী এই বনেহ শহরটি। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও অজানা কারণে এই শহরটি জ্বলেপুড়ে নিশ্চিহ্ণ হয়ে যায়। তবে যেসব নিদর্শন এখনো এখানে অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো থেকে বোঝা যায় যে শহরটি বেশ প্রাচীন।

এখানে পাওয়া গেছে নকশা করা মাটির বিচিত্র তৈজস,পাথর কেটে বানানো বিভিন্ন জিনিস, প্রাচীন ধাতব মুদ্রা ইত্যাদি। ইরাকের সাথে সীমান্ত থাকার কারণে এবং ইরানের ওপর ইরাকের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কারণে এই এলাকাটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এমনকি শহরটিকে পুনরায় গড়ে তোলার মতো অবস্থাও ছিল না দীর্ঘদিন। তবে বর্তমানে দায়িত্বশীলদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা আর জনগণের ব্যাপক সমর্থন ও সহযোগিতার ফলে যুদ্ধের সেই ধবংসের চিহ্ণ এখন আর তেমন দেখতে পাওয়া যায় না। #

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন