এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 23 ফেব্রুয়ারী 2016 14:25

ইরানের আলবোর্জ প্রদেশের ত্বলেগন শহর

ইরানের আলবোর্জ প্রদেশের ত্বলেগন শহর

 

 

 

সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। দেখবো ঘুরে ইরান এবারের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

ত্বলেগনের কেন্দ্রিয় শহরের নাম ত্বলেগন। আলবোর্জ প্রদেশের একটি শহর এটি। তিনটি বিভাগে বিভক্ত এই শহরটি। নীচু তলেগন, মধ্যম তলেগন এবং উঁচু তলেগন। তিন তলেগনেই রয়েছে অসংখ্য গ্রাম। গ্রামে রয়েছে বিচিত্র সব গাছগাছালি। যার ফলে বিভিন্ন জাতের প্রাণীকূলের বাস রয়েছে এখানে। বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও এই তলেগনের যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। তলেগনে মূল্যবান প্রাকৃতিক নিদর্শনাদি ছাড়াও ঐতিহাসিক এবং যিয়ারতের স্থানও রয়েছে অনেক। তলেগন শহরটি আলবোর্জ পর্বতমালার মাঝে একটি গ্রামীণ এলাকায় পড়েছে। এলাকাটি তেহরানের ১২০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। পাহাড়িয়া এলাকায় অবস্থানের কারণে এখানকার আবহাওয়া একদিকে গ্রামীণ অপরদিকে পার্বত্য।

 

এখানকার জনসংখ্যা তাই নির্ভর করে ঋতুর ওপর। কেননা গ্রীষ্মের সময় এখানকার জনসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গড় হিসেব করলে তলেগনের স্থায়ী জনসংখ্যা মাত্র সাত হাজার। তলেগনের সাথে মিশে আছে ইরানের বিখ্যাত দুই ব্যক্তিত্বের নাম। একজন হলেন ইসলামি বিপ্লবকালীন সংগ্রামী আয়াতুল্লাহ তলেগনি। তাঁর বাড়িটি এখানেই অবস্থিত। তিনি তেহরানে জুমার নামাজের প্রথম খতিবও ছিলেন। অপর নামটি হলো দারভিশ আব্দুল মাজিদ তলেগনি। ফার্সি নাস্তালিক ফন্টের উদ্ভাবক ছিলেন তিনি। তলেগনের দর্শনীয় নিদর্শনের মধ্যে আরও কিছু স্থাপনার কথা বলা যেতে পারে। যেমন এখানে আছে বেশ কিছু কেল্লা, ইমামযাদা অর্থাৎ নবীবংশের সন্তানদের মাজার, কবরস্থান, হাম্মামখানা ইত্যাদি।

 

তলেগনের প্রাকৃতিক অন্যতম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে উঁচু উঁচু অসংখ্য সুন্দর সুন্দর চূড়া। তলেগনের শাখা পর্বতমালা আলবোর্জের মূল পর্বতমালারই অংশ। এর দৈর্ঘ্য হলো ৯০ কিলোমিটার আর প্রস্থ হলো পাঁচ থেকে পঁচিশ কিলোমিটার। তলেগন পর্বতমালার সবচেয়ে নামকরা চূড়া হলো শাহ-আলবোর্জ। এই চূড়াকে বড় আলবোর্জ বলেও ডাকা হয়। চূড়াটির উচ্চতা হলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার দুই শ মিটার। শা আলবোর্জের উত্তরে ছোটো ছোটো আটটি প্রাকৃতিক হিমাগার রয়েছে বেশ সুন্দর এবং বিরল। রয়েছে সবুজ গাছগাছালিময় বাগান আর অসংখ্য ঝরনা। চূড়া থেকে নেমে আসা ঝরনাগুলোর সৌন্দর্য না দেখলে সত্যিই অনুমান করা দায়। নিজ চোখে একবার দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।

 

এ এলাকায় আরও অনেক চূড়া রয়েছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এ এলাকায় তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। এ পার্বত্য অঞ্চলে সে কারণেই ঝরনা বেশি। ঝরনা বেশি থাকায় নদীরও জন্ম হয়েছে বেশি। আর নদী ভরা পানির অস্তিত্বের কারণে তলেগন অঞ্চলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বেড়ে গেছে। এই ঝরনাগুলো শীতকালে অন্যরকম সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে ঝরনাগুলো ক্যান্ডিলে পরণত হয়। কাণ্ডিল হলো ঠাণ্ডায় ঝরনার পানি জমে গিয়ে বরফ হয়ে যায় এবং মোমের সূচাগ্র দণ্ডের মতো তৈরি হয়। ক্রিস্টালের মতো দেখতে ঝকমকে এই দণ্ডগুলোতে সূর্যের আলোর ঝলকানি যে না দেখবে তাকে বোঝানো কঠিন। দর্শকরা ওইসব ক্যান্ডিল দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারেন না।

 

ইতোপূর্বে আমরা বলেছিলাম যে আলবোর্জ প্রদেশের পার্বত্য এলাকা তলেগনে রয়েছেচ অসংখ্য গূহা,রয়েছে প্রাকৃতিক হিমাগার, সুন্দর সুন্দর ঝরনা, হ্রদ, বুনো প্রাণীদের আবাস, সবুজ শ্যামল ক্ষেত-খামার, ফল ফুলের বাগবাগিচা ইত্যাদি। মজার ব্যাপার হচ্ছে ইরানের রাজধানী শহর তেহরানের খুব কাছেই কিন্তু এসবের অবস্থান। এসবের বাইরেও তলেগনের গুরুত্ব আরো একটি কারণে ইতিহাসখ্যাত। সেটা হলো এখানে যেসব কেল্লা বা দূর্গ নির্মিত হয়েছে সেগুলোই প্রমাণ করছে এ এলাকা প্রাচীনকাল থেকেই ছিল বেশ শক্তিমত্তার অধিকারী। তলেগনের পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্থানে আলে বুইয়ে শাসকদের যাওয়াআসা ছিল। বিশেষ করে ইতিহাসে এসেছে মার্‌দভিজ যিয়রি, হাসান সাবাহ এবং আলাভিয়ন তাবারিস্তনের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা নিজেদের শাসনাধীন ভূখণ্ডের সুরক্ষার স্বার্থে এই তলেগনে নির্মাণ করেছিলেন কেল্লাগুলো।

 

কয়েকটি কেল্লার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। মেইমুন কেল্লা। ইসমাইলিয়ানদের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ এই দূর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আরও নিশ্চিত করে বলা যায় হিজরি ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে হাসান সাবাহ’র শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল এই কেল্লাটি। সমকালে এই কেল্লাটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত। কিন্তু হালাকু খান যখন আলামুত এবং তলেগনে হামলা চালায় তখন কেল্লাটি ধ্বংস হয়ে যায়। কেল্লার ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র তখন লুটপাট হয়ে যায়। বর্তমানে এই কেল্লাটির ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালের কিছুটা অবশিষ্ট আছে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।

 

তলেগনের আরেকটি কেল্লার নাম হলো আরযাঙ। তলেগনের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের ওপরে এই কেল্লাটি স্থাপনকরা হয়েছে। বেশ নামকরা কেল্লা ছিল আরযাঙ। এক হাজার এক শ যোদ্ধা এই কেল্লায় থাকতো। আটটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল কেল্লার চারপাশে। টাওয়ারগুলোর উচ্চতা ছিল পাহাড় থেকে পঞ্চাশ মিটার। এই কেল্লার পাশেই গুরুত্বপূর্ণ দুটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম যুদ্ধটি ছিল হাসান সাবাহ’র সমর্থকদের সাথে সালজুকি সেনাদের যুদ্ধ। দ্বিতয়িটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল কেল্লা রক্ষীদের সাথে হালাকু খানের। যুদ্ধের পরিণতিতে হালাকু খানের হাতে কেল্লাটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

এখানে আরও দুটি কেল্লার নাম উল্লেখ না করে পারা যায় না। একটি হলো দোখতার কেল্লা অপরটি কেইকাবাদ কেল্লা।

 

নাজারাবাদের প্রাচীন টিলাগুলোর কথা আসরের শুরুতেই বলেছিলাম। তেহরান থেকে ৭৩ কিলোমিটার দূরে নাজারাবাদের অবস্থান। এখানে রয়েছে উজবেক নামে একটি গ্রাম। এই গ্রামের এতো নামডাকের কারণ হলো এখানে গড়ে উঠেছিল প্রাগৈতিহাসিক কালের প্রাচীন সভ্যতা। এখানে পুরাতাত্ত্বিক যে গবেষণা চালানো হয়েছে তা থেকেই উঠে এসেছে এইসব তথ্য।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন