এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 23 ফেব্রুয়ারী 2016 14:38

ইরানের আলবোর্জ প্রদেশের ত্বলেগন শহর (২)

ইরানের আলবোর্জ প্রদেশের ত্বলেগন শহর (২)

সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। দেখবো ঘুরে ইরান এবারের আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

আমরা ইরানের আলবোর্জ প্রদেশে আছি এখনও। গত আসরে এই প্রদেশের তলেগনে গিয়েছিলাম আমরা। তলেগন সফর শেষ না করেই পরিসমাপ্তি টানতে হয়েছিল আসরের। আজ তাই এই তলেগনে সফর শেষ করে যাবো অন্য দিকে।

 

আমরা বলেছিলাম তলেগনের গুরুত্ব আরো একটি কারণে ইতিহাসখ্যাত। সেটা হলো এখানে যেসব কেল্লা বা দূর্গ নির্মিত হয়েছে সেগুলো প্রমাণ করছে যে এ এলাকা প্রাচীনকাল থেকেই ছিল বেশ শক্তিমত্তার অধিকারী। তলেগনের পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্থানে আলে বুইয়ে শাসকদের যাওয়াআসা ছিল। বিশেষ করে ইতিহাসে এসেছে মার্‌দভিজ যিয়রি, হাসান সাবাহ এবং আলাভিয়ন তাবারিস্তনের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা নিজেদের শাসনাধীন ভূখণ্ডের সুরক্ষার স্বার্থে এই তলেগনে নির্মাণ করেছিলেন কেল্লাগুলো।

 

যাই হোক, কয়েকটি কেল্লার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এরকমই একটি হলো মেইমুন কেল্লা। ইসমাইলিয়ানদের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ এই দূর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল। আরও নিশ্চিত করে বলা যায় হিজরি ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকে হাসান সাবাহ’র শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল এই কেল্লাটি। সমকালে এই কেল্লাটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত। কিন্তু হালাকু খান যখন আলামুত এবং তলেগনে হামলা চালায় তখন কেল্লাটি ধ্বংস হয়ে যায়। কেল্লার ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র তখন লুটপাট হয়ে যায়। বর্তমানে এই কেল্লাটির ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়ালের কিছুটা অবশিষ্ট আছে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।

 

তলেগনের আরেকটি কেল্লার নাম হলো আরযাঙ। তলেগনের ঠিক মাঝখানে পাহাড়ের ওপরে এই কেল্লাটি স্থাপনকরা হয়েছে। বেশ নামকরা কেল্লা ছিল আরযাঙ। এক হাজার এক শ যোদ্ধা এই কেল্লায় থাকতো। আটটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল কেল্লার চারপাশে। টাওয়ারগুলোর উচ্চতা ছিল পাহাড় থেকে পঞ্চাশ মিটার। এই কেল্লার পাশেই গুরুত্বপূর্ণ দুটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথম যুদ্ধটি ছিল হাসান সাবাহ’র সমর্থকদের সাথে সালজুকি সেনাদের যুদ্ধ। দ্বিতয়িটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল কেল্লা রক্ষীদের সাথে হালাকু খানের। যুদ্ধের পরিণতিতে হালাকু খানের হাতে কেল্লাটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

এখানে আরও দুটি কেল্লার নাম উল্লেখ না করে পারা যায় না। একটি হলো দোখতার কেল্লা অপরটি কেইকাবাদ কেল্লা।

 

নাজারাবাদের প্রাচীন টিলাগুলোর কথা ইতোপূর্বে আপনাদের বলেছিলাম। তেহরান থেকে ৭৩ কিলোমিটার দূরে নাজারাবাদের অবস্থান। এখানে রয়েছে উজবেক নামে একটি গ্রাম। এই গ্রামের এতো নামডাকের কারণ হলো এখানে গড়ে উঠেছিল প্রাগৈতিহাসিক কালের প্রাচীন সভ্যতা। এখানে পুরাতাত্ত্বিক যে গবেষণা চালানো হয়েছে তা থেকেই উঠে এসেছে এইসব তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে প্রাগৈতিহাসিক কালের তথা ছয় হাজার বছর আগের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিদর্শন এখানে মিলেছে। খ্রিষ্টপূর্ব মাদ্‌দের সময়কার এইসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রমাণ করছে ইরান কতোটা প্রাচীন সভ্যতার দেশ।

 

উজবেক গ্রামের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনবহুল এলাকার আয়তন প্রায় এক শ হেক্টরের মতো। এখানকার দশটি টিলা খুবই মূল্যবান নিদর্শনে ভরপুর। ছয়টি টিলায় ইরানের পুরাতাত্ত্বিক গবেষকরা খননকাজ চালিয়ে বহু তথ্য উদঘাটন করেছে। বিশেষ করে এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে মানুষের হাতে তৈরি সবচেয়ে প্রাচীন ইট। যাকে নয় হাজার বছর আগের বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এখানকার সেই ইট জাতিসংঘে সংরক্ষিত আছে। এ এলাকার অধিবাসীরা যে সিমেন্টের ব্যবহার করতো সেই হাজার হাজার বছর আগে তারও নমুনা মিলেছে এখানে। শুধু তাই নয়, উজবেক এবং প্রাচীন শুশের লোকজনের মাঝে যে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা ছিল সেকথাও জানা গেছে গবেষকদের কল্যাণে।

 

২৬ মিটার উঁচু উজবেকি টিলার উপরে মাদ কেল্লার ধ্বংসাশেষ রাখা হয়েছে প্রদর্শনীর জন্য। ওই কেল্লায় উঠতে হলে পাথরের সিঁড়ি বেয়ে যেতে হবে। কেল্লায় ওঠার স্বার্থেই এই সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে। টিলার ওপরে প্রায় নয় শ বর্গমিটারের মতো আয়তনের একটা কেল্লা নজরে পড়বে। বহুবার এই কেল্লার ভেতর খনন কাজ চালানো হয়েছে। মাদ যুগে এই কেল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে গবেষকদের ধারনা। কেল্লার ভেতরে অডিটোরিয়াম, প্রার্থনালয়, রক্ষীদের রুম, গুদামসহ আরও স্থাপনা নজরে পড়বে। তবে উজবেক টিলার ভেতর অন্তত তিনটি কেল্লার অস্তিত্ব ছিল বলে পুরাতত্ত্ব গবেষকরা অভিমত দিয়েছেন। সবচেয়ে প্রাচীন কেল্লাটির আয়তন দুই হাজার দুই শ পঞ্চাশ মিটার। কেল্লার দেওয়ালের উচ্চতা ছিল সাত মিটারের মতো।

 

উজবেক টিলা থেকে পশ্চিম দিকে ৫০ মিটার দূরত্বে ‘মরল’ টিলা নামে আনুমানিক পাঁচ শ বর্গমিটার পরিমাপের একটা জায়গা আছে। পুরাতত্ত্ব গবেষকরা ওই জায়গাটিকে প্রাচীন একটি গ্রাম বলে সনাক্ত করেছেন। বলা হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষ থেকে পঞ্চম শতকের শুরুর দিককার গ্রামের নমুনা এটি। মরল টিলা থেকে পাওয়া মাটির বিভিন্ন তৈজস পাওয়া গেছে যেগুলোর রঙ একটু আলাদা। গবেষকরা এই তৈজসগুলোকে ‘হলুদ তৈজস’ বলে অভিহিত করেছেন। এই উজবেক টিলা থেকে আড়াই শ মিটার পশ্চিমে আরেকটি টিলা আছে ‘দুশন টিলা’ নামে।

 

তবে সবচেয়ে পুরনো যে স্থাপনাটি উজবেক এলাকায় চিহ্নিত করা হয়েছে সেটা হলো ‘ইয়ন টিলা’। এই টিলাটি উজবেক টিলা থেকে সাত শ মিটার দূরে অবস্থিত। বিশ্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইয়ন টিলাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি টিলা হিসেবে মনে করা হয়। ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী ইয়ন টিলায় সপ্তম এবং অষ্টম সহস্রাব্দের ইটের তৈরি স্থাপনার অন্তত পাঁচটি যুগের স্থাপত্যের নিদর্শন মিলেছে। প্রত্যেক যুগের ইটই হাতে তৈরি বলে চিহ্নিত হয়েছে। তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এখানকার ইটগুলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ইট বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।#

 

 

 

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন