এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শিল্প ও সাহিত্য
বুধবার, 30 এপ্রিল 2008 19:27

রুমীর গল্প ( ১-২০ )

পাঠক! আপনারা ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন যে, জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ মৌলাভি নামে অভিহিত করেছে। এই নামকরণের কারণ হলো এ বছর ছিল ইরানের স্বনামখ্যাত এই কবির আট শততম জন্মবার্ষিকী। এ জন্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিখ্যাত এই মনীষীর স্মরণে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান উদযাপিত হচ্ছে। তাঁর লেখার অনুবাদ,অসংখ্য সেমিনার-সিম্পাজিয়াম আয়োজন, মৌলাভির জীবনী নিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ, তাঁর গযলভিত্তিক মিউজিক তৈরী করাসহ বিভিন্ন ধরনের আয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লক্ষ্য করা গেছে। ইরানে তো বটেই, ইরানের বাইরেও ফ্রান্স, তুরস্ক, জার্মানী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ভারত, বাংলাদেশ এবং বিশ্বের আরো বহু দেশে মৌলাভির ওপরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ থেকে নিঃসন্দেহে তাঁর গুরুত্ব এবং বিশেষত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। আমরাও বিখ্যাত এই মনীষীর জীবন ও কর্ম নিয়ে 'রুমির গল্প' শিরোণামে একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এখানে তা উপস্থাপন করা হলো ।

রুমীর গল্প
( ১ম পর্ব)


মার্কিন দৈনিক গার্ডিয়ান ক'দিন আগে এক নিবন্ধে লিখেছে, এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে, ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেইটে সর্বোচ্চ বিক্রীত বইয়ের তালিকায় যাঁর বই স্থান পেয়েছে,তিনি মার্কিন কালজয়ী সাহিত্যিক রবার্ট ফ্রস্ট, রবার্ট সউল, ভালাস স্টিউনিয কিংবা সিলভিয়া প্লাথ এমনকি শেক্সপিয়র, হোমার, দান্তে বা ইউরোপীয় অন্য কোনো কবির বই ছিল না। বরং সর্বোচ্চ বিক্রীত কবিতার বই ছিল মৌলাভি নামের এমন একজন বিখ্যাত ইরানী মরমী কবির ধ্রুপদী কবিতার বই,যিনি কয়েক শতাব্দী আগে ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধান শেখানোর কাজে আত্মনিয়োজিত ছিলেন।

ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে মৌলাভি বর্ষ নামকরণ করা সংক্রান্ত ইশতেহারে লিখেছে-" ইউনেস্কো মনে করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ববর্গ কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ, জাতি, সংস্কৃতি বা গোত্রের লোক নন বরং তাঁরা সমগ্র মানব জাতির সম্পদ। অর্থাৎ দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতির উর্ধ্বে তাঁদের অবস্থান। এইসব কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সেইসব মহান ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচয় করানো যাঁরা মানবজাতির জন্যে মৌলিক অবদান রেখেছেন এবং বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। শান্তির বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা, অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতার জন্যে বিশ্বের সকল দেশের প্রতি আহ্বান রইলো।"
ইদানীং বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে মৌলাভি এবং তাঁর কবিতার ওপর। কেন? এ প্রশ্নটি নিশ্চয়ই সবার সামনে জেগে উঠছে। কিন্তু কে এই মৌলাভি ? কিংবা তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্যই বা কী, শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো তাঁর কবিতার পাঠকই যে শুধু কমে নি তাই নয় বরং দিনের পর দিন তাঁর জনপ্রিয়তা আরো বেড়েই যাচ্ছে। লন্ডন ভিত্তিক দৈনিক গার্ডিয়ান পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী কোলম্যান বার্কস মৌলাভির যে অনুবাদ করেছেন বিশ্বব্যাপী তার অন্তত ৫ লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছে এবং বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষাগুলোতে অনূদিত হয়েছে। এসব দেশে বই বিক্রির পরিমাণ সাধারণত দশ হাজার অতিক্রম করে না।

জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ বালখি মৌলাভি নামেই বেশি পরিচিত। তিনি হিজরী সপ্তম শতাব্দীর একজন ইরানী কবি এবং আরেফ বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বালখের বিশিষ্ট আরেফ, শিক্ষক,খতীব বাহা ওলাদের সন্তান। মৌলাভি বাহা ওলাদের ছত্রছায়ায় শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করেন এবং লালিত পালিত হন। ইরানের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মোঙ্গল সেনাদের হামলা যখন ভয়াবহ রূপ নেয়, শহরগুলো ধ্বংস হয় এবং গণহত্যা চালানো হয়, একইভাবে সুলতান মুহাম্মাদ খাওয়ারেযমশাহ যখন স্বেরাচারী শাসন চালায় তখন ইরানের মহান ব্যক্তিত্ব ,বুদ্ধিজীবী ও মনীষীগণের অনেকেই নিজস্ব মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌলাভির পিতা বাহা ওলাদও এভাবে মাতৃভূমি ত্যাগকারীদের একজন ছিলেন। তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনসহ ৩০০ অনুসারী নিয়ে কাবা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সিরিয়া এবং আরব ভূখণ্ডে যান। মৌলাভির পরিবার নিশাবুর, বাগদাদ,সিরিয়া এবং মক্কায় কিছুদিন অতিবাহিত করে মধ্য এশিয়ার লা-রান্দেহ শহরে যান এবং সেখান থেকে যান কুনিয়ায়। জীবনের শেষ মহূর্ত পর্যন্ত তিনি ঐ কুনিয়াতেই ছিলেন।
মৌলাভি তাঁর পিতা এবং তাঁর কৃতী ছাত্র ও তাঁর সমকালীন স্বনামধন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে সে সময়কার প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। তারপর পিতা মারা গেলে তিনিই পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। মৌলাভির কাস এবং তাঁর বক্তব্য,তাঁর জ্ঞান,তাঁর গল্প,তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা ইত্যাদি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আর তাঁর এই স্বাতন্ত্র্যই মুরিদদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাঁর বক্তব্য এবং পাঠদানের দুটি সংকলন আছে। এগুলো হলো ‘মাজালেসে সাবআ' সাত বৈঠক এবং ‘ফীহে মা ফীহে' বা তাতে যা তার মধ্যে। মাসনাবি এবং দিওয়ানে শামসও মৌলাভির কালজয়ী দুটি কাব্যগ্রন্থ। ৬৭২ সালের ৫ই জমাদিউস সানীতে ৬৮ বছর বয়সে কুনিয়াতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পাঠক! মৌলাভি বর্ষ উপলক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী তাঁকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই আমরা এই আসরের আয়োজন করেছি। এই আসরে তাঁর সাহিত্য সমালোচনা এবং তাঁর চিন্তা বিশ্লেষণ করবো। সেইসাথে মৌলাভি বর্ষ উপলক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী নিত্যনতুন আয়োজন ও ঘটনাপ্রবাহের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো। মৌলাভির গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি মাসনাবীর জন্যে তাঁকে আখ্যানকাব্যকার বা গল্পের কবি বলা হয়। তিনি বিভিন্ন কিসসা-কাহিনীর রূপকে তাঁর চিন্তা-চেতনা,বোধ ও বিশ্বাস এবং তাঁর শিক্ষা বর্ণনা করেছেন। মাসনাবির গল্পগুলোতে তিনি আধ্যাত্মিকতার যথাযথ অর্থ ব্যক্ত করেছেন এবং বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতাপ্রেমীদেরকে তার রসসুধা পান করিয়েছেন। আমরা প্রতিটি আসরেই আপনাদেরকে তাঁর কিসসার ভূবনে নিয়ে যাবো।
প্রফেসর আব্দুল হোসাইন যাররীন কুব তাঁর ‘সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে খোদার সাক্ষাৎ' নামক মৌলাভির জীবনীমূলক গ্রন্থে লিখেছেন-‘মৌলাভি তাঁর মাসনাভি এবং অন্যান্য গযলে উচ্চতর রহস্যময় চিন্তা এবং শিক্ষাগুলোকে কবিতার মতো করে রচনা করেছেন। তাঁর নিজের জীবনটাও সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার সিঁড়ি অতিক্রম করে করে অগ্রসর হয়েছে। তিনি তো কবিতা লেখেন নি,কবিতাকে মূর্তমান করেছেন। আমার মতে মৌলাভির অ-রচিত কবিতাগুলো অর্থাৎ তাঁর আধ্যাত্মিক রহস্যঘেরা জীবনেতিহাস উপলব্ধি করা ছাড়া তাঁর কবিতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। কারণ তাঁর জীবন এবং কবিতার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর অভিন্নতা ও সমন্বয়।'

রুমীর গল্প
( ২য় পর্ব)

মানুষের ভিড়ে চলাচলের পথ প্রায় বন্ধ ছিল। রুমির পিতা সুলতানুল ওলামা আস্তে আস্তে মিম্বার থেকে নীচে নামলেন। উপস্থিত লোকজনের মাঝে গুঞ্জন সৃষ্টি হলো। তার যুবক ভক্তরা একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলো। তাদের ভিড়ে তিনি পথ এগুতে পারছিলেন না। কিন্তু তিনি দ্রুত ঘরের নিরাপদ হেরেমে পৌঁছতে চাচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে জালালুদ্দিন মোহাম্মদের কণ্ঠে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রাণের আকুতিসহ মোনাজাতে অংশ নিতে চাচ্ছিলেন তিনি। এই ছেলেটি ছিল বাবার সকল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। যদিও সুলতানুল উলামার প্রথম পরে স্ত্রীর ঘরেও একটি ছেলে এবং কয়েকটি মেয়ে ছিল। তারপরও জালালকে তিনি একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতেন। তাকে সম্মান ও মর্যাদা দিতেন এবং ঘরের মালিক বলে মনে করতেন। জালালের মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত ফকীহ পরিবারের মেয়ে বিবি আলাভি।
যাই হোক সুলতানুল উলামা অনেক কষ্টে ভিড় ঠেলে বেরুলেন এবং ঘরে গেলেন। শহরের পরিস্থিতিতে তাঁর মন প্রায়ই বিষন্ন থাকতো। বিশেষ করে সমকালীন শাসকের অত্যাচার-নিপীড়নে ভীষণ কষ্ট পেতেন তিনি। তাঁর বাসাটা ছিল আধ্যাত্মিকতা চর্চার জন্যে বেশ নিরাপদ একটি স্থান। ঐশী চিন্তা বা আল্লাহর যিকির ছিল তাঁর মুখে সদা উচ্চারিত একটি ব্যাপার। খোদার ধ্যানে তিনি মশগুল থাকতেন প্রায়ই। তাঁর এই আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারটি কাজেকর্মে, আচার-ব্যবহারে তিনি তাঁর ৫ বছরের ছেলে জালালুদ্দিন মুহাম্মাদকে শিখিয়েছেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো জালালুদ্দিন নিজেও বাবার মতো আধ্যাত্মিকতার ভুবনে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন। এ ধরনের একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশের মধ্যেই জালালুদ্দিন বড়ো হয়েছেন। যতোই দিন যেতে লাগলো জালাল ততোই আধ্যাত্মিকতার জগতে আরো বেশি মগ্ন হতে লাগলেন এবং আল্লাহর নিদর্শনের সাথে নিবীড় নৈকট্য বোধ করতে লাগলেন। ঘরের লোকজনের মোনাজাতের শব্দ তাঁকে উজ্জ্বল এক পৃথিবীর অনুভবে নিয়ে যেত।
কুরবানীর ঈদের অনুষ্ঠান , ঈদের নামাযের দৃশ্য এবং কোরবানীর দৃশ্য তাঁকে আল্লাহর ঘরের স্মরণ এবং আল্লাহর ঘর দেখা ও তাওয়াফ করার ব্যাপক ইচ্ছে মনে জাগাতো। রজব মাসের মধ্যবর্তী দিনগুলো যাকে ‘ঈদে এস্তেফতাহ' বলা হয়,জালালুদ্দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে কঠোরভাবে ইবাদাত-বন্দেগীতে ডুবে যেতেন,তাঁর ছোট্ট অন্তরখানি অপূর্ব আনন্দে ভরে যেত। রমযান মাসে সাহরির সময়কার দোয়া এবং মোনাযাতও তাঁর অন্তরকে রোযা রাখার আগ্রহ-উদ্দীপনায় আন্দোলিত করতো। রমযান মাস ছাড়া তিনি অন্য সময়েও রোযা রাখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন।

জালালুদ্দীন মোহাম্মাদের শিক্ষক সাইয়্যেদ বোরহান তিরমিযীও জালালকে আধ্যঅত্মিকতার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন। এই শিক্ষক জালালুদ্দিনের পিতার ছাত্র ছিলেন। পিতা এবং শিক্ষক উভয়ই আধ্যাত্মিক জগতের দুই নত্র হবার কারণে জালালুদ্দিন যে দিবারাত্র আধ্যাত্মিকতা চর্চায় লিপ্ত থাকবেন-তাতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে।
সুলতানুল উলামার অধিকাংশ সময়ই কাটতো বাসার বাইরে শাসকদের দরবারের আলেমদের সাথে বাহাস বা বিতর্কের মধ্য দিয়ে। তিনি যেহেতু ফকীহ,শিক্ষক্ষক , বক্তা ছিলেন,এবং ফেকাহ শেখাতেন ও ফতোয়া দিতেন, সেজন্যে তিনি ওয়াজ করা ,বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজনে খোরাসান,উজবেকিস্তান এবং তুরস্ক সফর করতেন। তাঁর ওয়াজের মজলিস ছিল যথেষ্ট উপভোগ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ। তাঁর ক্লাস তরুণ ছাত্ররা এতো আন্তরিকতার সাথে উপভোগ করতো যে অন্যান্য ক্লাস থেকে তাঁর ক্লাসটা ছাত্রদের কাছে ছিল অনন্য সাধারণ। কারণ এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করতো তাঁর ক্লাসে। তিনি তাঁর ক্লাসে বা ওয়াজে যেভাবে কঠোরভাষায় ভণ্ডদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, তা কায়েমি স্বার্থবাদী ভন্ডদের ভালো লাগতো না কিছুতেই। তাই তিনি যেখানেই যেতেন,তাঁর সাথে যেসব লোকজন যেতো, তাদের মাঝে তাঁর শত্রু এবং বিরোধীও ছিল।
সেই ছোটোবেলা থেকেই জালালুদ্দিনের একটা আধ্যাত্মিক জীবনদৃষ্টি ছিল। পড়ালেখার মাধ্যমে তাঁর জ্ঞানবুদ্ধি বৃদ্ধি পাবার পাশাপাশি তিনি আস্তে আস্তে উপলব্ধি করতে পারতেন যে,মানুষের মাঝে বিভিন্ন দল এবং গোষ্ঠি রয়েছে এবং তাদের মাঝে পার্থক্যও রয়েছে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল শিশুর মাঝে বিদ্যমান এই পার্থক্য তাঁকে ভীষণ ভাবিয়ে তুলতো। তিনি মক্তবে যেতেন এবং শহরের অন্যান্য শিশুদের পাশে থেকে কোরআন এবং হাদীস শিখতেন। তাঁর পিতা যেহেতু লম্বা সফরে বিভিন্ন শহরে যেতেন, জালালও তাঁর সঙ্গী হতেন। তাই তিনি ঘরের বাইরের জীবন সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। ঘরের বাইরে তাঁর মূল শিক্ষক্ষক ছিল ‘জীবন'। ঘর এবং মক্তবের মধ্যবর্তী রাস্তায় এলাকার নরনারীরা যাওয়া-আসা করতো, কথাবার্তা বলতো,ঝগড়াঝাটি করতো, আবার শান্ত হয়ে যেত,আনন্দিত হতো-এই যে এক বিচিত্র জীবন,এই জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছেন, সেখান থেকেই তিনি জীবন সম্পর্কে শিখেছেন। আর বাসায় তাঁর শিক্ষক্ষক ছিল পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং তাঁর বাবার জীবনযাপন পদ্ধতি। জালাল তাঁর পিতার এই জীবনপদ্ধতি ভীষণ পছন্দ করতেন।
সুলতানুল উলামা জালালকে শিখিয়েছেন সকল জিনিসের মধ্যেই কেবল খোদাকে খুঁজে বেড়াবে এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম নামাযকে আনন্দের সাথে আদায় করবে। নামাযের মাঝে আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ যে কান্নাকাটি করতেন,তা বেশ উপভোগ করতেন শিশু জালাল। দীর্ঘদিন তিনি রোযা রাখতেন এবং বেশিরভাগ সময় পড়ালেখা এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে কাটাতেন।


রুমীর গল্প
( ৩য় পর্ব)

পাঠক! গত আসরে আমরা আপনাদেরকে রুমি জীবনের প্রথমার্ধের গল্পের খানিকটা শুনিয়েছি। আমরা বলেছিলাম যে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ পিতার ঘরে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড়ো হয়েছেন। তাঁর বাবা বাহা ওলাদ ওয়াজ-নসীহত করতেন। বিশেষ করে জনগণের ওপর তৎকালীন শাসক সুলতান মোঃ খাওয়ারেয্মশাহের অত্যাচারের সমালোচনা করতেন। স্বাভাবিকভাবেই সুলতান এবং সুলতানের অনুসারীদের রোষানলে পড়েন তিনি। যাই হোক এ বিষয়ক গল্প আজকের আসরে আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
আলাউদ্দিন তাকেশ সুলতান খাওয়ারেযমের মৃত্যুর পর তার ছেলে মুহাম্মাদ ক্ষমতায় আরোহন করে। সুলতান মুহাম্মাদ ক্ষমতালিপ্সু ছিলেন। মতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে মুহাম্মাদ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। এতোই বিস্তৃত করেন যে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া তিনি কিছুই বুঝতেন না। তিনি যুদ্ধ করেছেন খেতাইয়ানদের সাথে,যুদ্ধ করেছেন বাগদাদের খলিফার সাথে, তুরস্ক, কাশগড়সহ আরো বহু এলাকার সাথে। সুলতান মোহাম্মাদের সেনাদের হামলায় অন্যান্য শাসকদের ভিত কেঁপেই উঠতো না,বরং খান খান হয়ে যেত। অপরদিকে তাতারীদের আক্রমণের ভয়েও সর্বত্র সন্ত্রস্ত অবস্থা বিরাজ করতো এবং শাবাহ খান মোঙ্গল সুদূর প্রাচ্য থেকেও ভীতি প্রদর্শন করতো। সুলতান মুহাম্মাদ খাওয়ারেযম এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধবাজকেও প্রতিহত করেন।
সুলতান মুহাম্মাদের আধিপত্য যখন গোরখান খাতাঈর ওপর আরোপিত হয় এবং গোরখানের এলাকাকে চেঙ্গিয খান মোঙ্গলের শাসনাধীন ভূখণ্ডের সীমান্তে মেলানো হয়,তখন চেঙ্গিয খানের ভয়ে মানুষজন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। কারণ চেঙ্গিয খান মোঙ্গলের ভয়ে সমগ্র উজবেকিস্তান এবং খোরাসান তখন ভয়ে কম্পমান ছিল। সুলতান মোঃ খাওয়ারেযমশাহ সমগ্র তুরস্ক এবং উজবেকিস্তানকে সে যুগে রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই খুন-খারাবিপূর্ণ অবস্থা বিদ্যমান ছিল। নদীগুলো পোড়া জিনিসপত্র , রক্ত আর মানুষের লাশ ও মরাপশুতে পূর্ণ ছিল। তাঁবুবাসী মুসাফিররাও রেহাই পেত না। রাতের বেলা তাদের লাশ পড়ে থাকতো এখানে সেখানে,মরুতে কিংবা জঙ্গলে। সন্ত্রাসীরা শহর-নগর আর বাজারঘাটে যেন ছায়ার মতো বিরাজ করতো। মোটকথা এক ধরনের নারকীয় পরিবেশ বিরাজ করছিল সে সময়। তুরস্ক এবং তাজিকিস্তানের লোকজন সুলতান মুহাম্মাদের নির্দেশে চাচ এবং পরগণায় চলে যেত এবং তাদের শহরগুলো যাতে শত্রুপক্ষের হাতে চলে যেতে না পারে, সেজন্যে ঐ শহরগুলোকে চুরমার করে বিরান প্রান্তরে পরিণত করে ফেলা হতো।
সুলতান মুহাম্মাদের সেনাদের অত্যাচারকে জনগণ তাতারীদের আক্রমণের মতোই ভয় এবং ঘৃণা করতো। সুলতানের যুদ্ধবাজদের বেশিরভাগই গোঙ্গুলি তুর্কি এবং সুলতানের মা তারকান খাতুনের আত্মীয়-স্বজন ছিল। এদের অত্যাচারে শহর-গ্রামের শান্তি তো ছিলই না,এমনকি মরুর রাখালরা পর্যন্ত তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। সুলতানের একুশ বছরের দুঃশাসনে সমগ্র এলাকায় নির্দয়-নিষ্ঠুরতা,নিরাপত্তাহীনতা,যুদ্ধ-বিগ্রহ যেন হাত পা গজিয়েছিল। সুলতানের শাসনামলে দেশের প্রশাসনিক প্রায় সকল কাজই ছিল তার মা তারকান খাতুন এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের হাতে। এক সময় তারকান খাতুনের আত্মীয় আতরারের শাসক গায়ের খানের মাধ্যমে চেঙ্গিয খান বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে মোঙ্গলদের একটি বাণিজ্য কাফেলা পাঠিয়েছেন-এই খবরটি সুলতানের কানে গেল। সুলতানের কানে একটা গুজব এলো যে এই বাণিজ্য কাফেলার সদস্যরা সবাই আসলে গুপ্তচর। এ কথা শোনার সাথে সাথে সুলতান ঐ বাণিজ্য কাফেলার প্রায় চার শতাধিক সদস্যকে হত্যা করে তাদের মালামাল লুট করার নির্দেশ দেয়।
সুলতানের এই কাজে চেঙ্গিয খান এতো বেশি ক্ষুব্ধ হয় যে সে ইরানের নিপীড়িত জনগণের ওপর দোযখের আগুণ জ্বালিয়ে দেয়।
সুলতান মোহাম্মাদের বিশাল সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও চেঙ্গিযের বাহিনীর সামনে এক মুহূর্তও তারা দাঁড়াতে পারে নি,তারা পালিয়ে যায়। সমরকন্দ এবং বোখারা কসাইখানায় পরিণত হয়েছিল। গারগাঞ্জ এবং বাল্খে গণহত্যা চালানো হয়েছিল,আর নিশাবুর বিরান হয়ে গিয়েছিল। সুলতান মোহাম্মদের সেনারা ভয় পেয়ে পালানোর কারণে চেঙ্গিয বাহিনী সুলতানের এলাকায় সহজেই হামলা চালাতে পেরেছিল। সুলতান নিজেও তার মতা ও শক্তির দুর্বলতা বুঝতে পেরে তার শাসনাধীন বিস্তীর্ণ এলাকার নিরাপত্তা সম্পর্কে ভীতি অনুভব করলো। এরকম এক পরিস্থিতিতে বাহা ওলাদ তার ছেলে জালালুদ্দীন এবং তার পরিবার-পরিজন ও মুরিদদের নিয়ে হজ্ব করার উদ্দেশ্যে বাল্খ অর্থাৎ খাওয়ারেযমশাহর এলাকা ত্যাগ করেন।


রুমীর গল্প
( ৪র্থ পর্ব)

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে, জালালুদ্দিন রুমির বাবা বাহা ওলাদের সাথে সুলতান মুহাম্মাদ খাওয়ারেযম শাহের সাথে রাজনৈতিক বিচিত্র সমস্যা ছিল। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এবং ইরানের ওপর মোঙ্গলীয় হামলার কারণে বাহা ওলাদ আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে খোরাসান থেকে ইরাক হয়ে হেজাযের দিকে যাত্রা করেন। এই যাত্রায় তাঁর পরিবারের লোকজন ছাড়াও তাঁর অন্তত তিন শ' জন ছাত্র সহযাত্রী হয়েছিলেন। চলুন এই যাত্রার গল্প শোনা যাক আজকের আসরে।
মুহাজির কাফেলা বালখের দরোজা পেরুলো। জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ ক্ষণিকের জন্যে দাঁড়ালেন। পেছনের দিকে তাকালেন। এই যাত্রার কারণ সম্পর্কে তিনি তেমন কিছু জানতেন না,তবে অনুভব করতে পারছিলেন যে তিনি তাঁর বিগত জীবনের স্মৃতি পবিত্র এই ভূখণ্ডে রেখে যাচ্ছেন। একধরণের প্রবাসী বা নির্বাসিত জীবনের অনুভূতি তাঁর সত্ত্বায় জেগে উঠলো। তিনি জানতেন না তাঁর অনিশ্চিত আজানা ভাগ্য তাঁকে তাঁর ঘর,বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তবে এরিমাঝে যে জিনিসটি তাঁকে সান্ত্বনা দিত, তা হলো পিতার প্রতি তার প্রেম-ভালোবাসা এবং এই বিশ্বাস ও আস্থা যে,তিনি যা-ই করুন না কেন তা অবশ্যই আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আস্থা রেখেই করেন। যাই হোক এই কাফেলায় বাহা ওলাদের বহু ছাত্র এবং মুরিদ ছিলেন,তারপরও একজনের অভাব খুব অনুভব করলেন জালাল। তিনি হলেন তাঁর শিক্ষক্ষক সাইয়্যেদ বোরহান তিরমিযী। তিনি উজবেকিস্তান সফরে গিয়েছেলেন। জালালুদ্দিনের বয়স এ সময় তেরো। ১৩ বছর বয়সের পর বাবা ছাড়া তাঁর আর কোনো শিক্ষকও থাকলো না, কোনো মাদ্রাসাও থাকলো না।

 দীর্ঘ এই সফরে বিভিন্ন ধরনের বই পড়া ছাড়া কিংবা বাবার সাথে কথোকথন করা ছাড়া জ্ঞান জগতের অন্য কোনো বিষয়ের সাথে তাঁর আর যোগাযোগ বা সম্পর্ক স্থাপিত হবার সুযোগ হয় নি। বালখের এই মুহাজির কাফেলা তাতারিদের আক্রমণের আশঙ্কা এবং ইরানের সাথে তাদের যুদ্ধ শুরুর শঙ্কার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর খোরাসানের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত নিশাবুরে গিয়ে পৌঁছালো। এই নিশাবুরে বাহা ওলাদের বহু বন্ধু-বান্ধব ছিল,তাই এই শহরের ওপর দিয়ে যাবার সময় ণিকের জন্যে যাত্রা বিরতি না করে উপায় ছিল না। সে সময় নিশাবুর ছিল শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নিশাবুর ছিল তখন বহু জ্ঞানী-গুণী মনীষীর লালনকেন্দ্র। জালালুদ্দিন মোহাম্মদ তাই নিশাবুরের প্রতি বিশেষ এক আধ্যাত্মিক আকর্ষণ বোধ করছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে ভেসে ওঠে শেখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের এবং তাঁর মুরিদদের মজলিসের কথা,স্মরণে আসে আবু হামেদ গাযযালির কথা এবং কবি ওমর খৈয়্যামের কথা। আরো মনে পড়ে এই নিশাবুর সম্পর্কে যা যা পড়েছিলেন বা শুনেছিলেন সেইসব স্মৃতি।
শহরের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করতে করতে কিংবা মসজিদ ,মাদ্রাসা এবং বাজার-ঘাট দেখতে দেখতে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের অবস্থা বুজুর্গানে দ্বীন বা অলি-আল্লাহর মতো হয়েছিল। জালালুদ্দিন মোহাম্মদের স্মৃতিতে সর্বশেষ যেই ঘটনাটি দাগ কেটেছিল তাহলো শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তারের সাথে সাক্ষাতের স্মৃতি। তিনি ছিলেন মরমী ধারার কবি,যাকে সুফি ধারাও বলা যায়। খুবই সদালাপি ও হাস্যোন্মুখ ছিলেন। জালালের অন্তরে ফরিদুদ্দিন আত্তার ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন। আত্তারের সাথে বাহা ওলাদের দেখা-সাক্ষাৎকালে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদও উপস্থিত ছিলেন। তিনি দুই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের মধ্যকার কথোপকথন অথ্যন্ত মনোযোগের সাথে শুনছিলেন। দেখেছেন আল্লাহ এবং তাঁর পবিত্র গৃহ কাবার যিয়ারতের বাসনায় তাঁদের মন কীরকম আগ্রহী এবং কৌতূহলী।

জালাল অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে অথচ ব্যাপক আগ্রহের সাথে দুই আরেফের দীর্ঘ আলাপচারিতায় মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি মাশায়েখ এবং সানাঈ'র কবিতা নিয়েও আলোচনা করছিলেন। আত্তার তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে জালালুদ্দিনের আধ্যাত্মিকতা এবং চিন্তাচেতনায় বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বর্ণনা শক্তির ব্যাপক প্রশংসা করেছিলেন। আত্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে জালাল কখনোই অপরাপর বক্তাদের মতো বা আরেফদের মতো হবে না। তিনি জালালকে তাই সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক উঁচুস্তরের মানুষ হিসেবে দেখছেন। বাহা ওলাদকে তিনি বলেছেন, বিশ্বের দগ্ধীভূত অন্তর বিশিষ্টদের মাঝে এই ছেলে অনতিবিলম্বে আগুন জ্বালাবে এবং তরিকতপন্থীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ-উদ্দীপনা জাগাবে।
তারপর মাসনাবির একটি অংশ যা ‘এসরার নামা' নামে বিখ্যাত তা জালালকে তিনি উপহার দেন। জালালুদ্দিনের জন্যে এই উপহার ছিল যেন এক ঐশী উপহার। যেমন সানাঈর ‘এলাহীনামা'র সাথে তার শিক্ষক সাইয়্যেদ বোরহান তিরমিযী পরিচয় করিয়েছিলেন। এই গ্রন্থটিও ছিল খোদার পথে চলার জন্যে আরেফদের হেকমাত এবং মারেফাতের নির্যাসগ্রন্থ। বালখের এই কাফেলা খোরাসান থেকে বাগদাদ যাবার পথে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের সার্বণিক সঙ্গী ছিল এই কাব্যগ্রন্থ।


রুমীর গল্প
( ৫ম পর্ব )

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম,ইরানের ওপর মোঙ্গলীয় হামলার সময় মৌলাভির পরিবার তিন শ'জন সঙ্গী-সাথী ও মুরিদ নিয়ে কাবা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বালখ ত্যাগ করে। মৌলাভির বয়স ছিল তখন ১৩ বছর। এ বয়সে নিশাবুরে বিখ্যাত কবি ও আরেফ ফরিদুদ্দিন আত্তারের সাথে তাঁর দেখা হয় এবং তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘আসরারনামা' জালালুদ্দিনকে উপহার দেন। গল্পের এপর্যন্ত গত আসরে বলা হয়েছে,তারি ধারাবাহিকতায় আজ আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো। আপনারা যথারীতি আমাদের সাথেই আছেন এ প্রত্যাশা রইলো।
বিশাল কাফেলা নিয়ে দীর্ঘ এই সফর জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের জন্যে আকর্ষণীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। ধূলিময় পথ, মেঘাচ্ছাদিত পাহাড়চূড়া, উপত্যকার পর উপত্যকা প্রভৃতি তাকে ভিন্ন এক অনুভূতির রাজ্যে নিয়ে যেত। পুরো সফরে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের পিতা তাঁর অনুসারী মুরিদদের সাথে যেসব কথাবার্তা বলেছেন সেগুলো থেকে তিনি যা শিখেছেন তা মাদ্রাসার কোনো কাস থেকে শেখার যোগ্য ছিল না। তিনি কাফেলার যুবকদের সাথে আলোচনা করার ক্ষেত্রে রহস্যময় বহু গল্প-কাহিনী বা রোমান্টিক তারানা উল্লেখ করতেন যেগুলোর সাথে জালালুদ্দিন একেবারেই পরিচিত ছিলেন না। সেইসব অজানা বা অপূর্ব চিন্তাধারার সাথে তিনি পরিচিত হয়ে ব্যাপক আনন্দিত হতেন।
বালখের এই কাফেলা বাগদাদের গেইটে গিয়ে পৌঁছলো। জালালুদ্দিনের নিষ্পাপ দৃষ্টিতে বাগদাদকে নিরাপদ একটা স্থান বলে মনে হলো। আব্বাসীয় খলিফা নাসেরুদ্দিন বিল্লাহ এই শহরের ওপর চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসনকার্য চালিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন সহস্র এক আরব্য রজনীর রূপকথাকে বাগদাদে বাস্তবে ফিরিয়ে আনবেন। সেই লক্ষ্যে তিনি এখানে বড়ো বড়ো ভবন, অসংখ্য মসজিদ, বহু মাদ্রাসা এবং প্রচুর খানকা তৈরী করেছেন এবং সেখানে যথাযথ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বিধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই প্রশান্ত অবস্থার কারণে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্যে বাগদাদ একটি জাঁকজমকপূর্ণ রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল। যেমন ছিল তার ঐশ্বর্য তেমনি ছিল তার ধনভাণ্ডার।
বালখের কাফেলা বাগদাদে গিয়ে পৌঁছানোর পর বা তার কিছু পরে মুহাজির বা আশ্রয়কামী যেসব কাফেলা খোরাসান থেকে বাগদাদে যেত,তারা মোঙ্গলদের ভয় সাথে করেই মুসলিম বিশ্বের এই বিশাল রাজধানীতে যেত। খোরাসানের বহু মুহাজির এবং অসংখ্য হাজী যারা হজ্ব পালন শেষে ফিরছিলেন এবং নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন না বলে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তাদের সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে এই বিশাল বিস্তৃত বাগদাদ শহরেও তাদের জন্যে আবাসিক সংকট দেখা দিয়েছিল। বাহা অলাদের সাথীরা সেই বাগদাদে ঢোকার শুরু থেকেই সরাইখানা এবং বাসা ভাড়া করে বসবাস করছিলেন।
বাগদাদ শহরের প্রধান মাশায়েখ শেখ শাহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দি বাহাঅলাদ এবং তার পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের আগমনের খবর পেয়ে তাঁদের স্বাগত জানাতে এসেছেন এবং বাহা অলাদকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। শেখ বাহা অলাদকে প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের বসবাসের জন্যে যেন তিনি একটা খানকা প্রস্তত করেন। বাহা অলাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। সাধারণত ওলামা এবং ফকীহগণ খানকায় বসবাস করাকে তাঁদের মর্যাদার অনুকূল বলে মনে করতেন না। তাঁদের এই বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি শহরের একটি মাদ্রাসায় গিয়ে বসবাস করেন। মাদ্রাসায় গিয়ে সেখানে বসবাস করার ফলে জালালুদ্দিন মুহাম্মাদের মনের একটি অভিলাষ পূরণ হয়েছিল। নিশাবুর এবং বালখ ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত ছিল, এখানে বড়ো বড়ো অনেক মাদ্রাসাও ছিল,কিন্তু জালালুদ্দিন মোহাম্মদ এখানকার মাদ্রাসাগুলোর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন নি। কারণ বালখে তিনি যখন ছিলেন তখন তিনি শিশু ছিলেন,আর নিশাবুরে তাঁরা খুব বেশিদিন ছিলেন না যার ফলে সেখানকার কোনো মাদ্রাসায় পড়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়ে ওঠে নি।
বাগদাদে বসবাসকালে জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ প্রথমবারের মতো মাদ্রাসায় যাবার সুযোগ পান এবং সেখানকার পরিবেশকে ভালোভাবে অনুভব করেন। মাদ্রাসায় ছাত্র-শিক্ষকদের ভাষা ছিল আরবি। জালালুদ্দিন সামান্য আরবি জানতেন, ঐ সামান্য ভাষাজ্ঞান দিয়েই তিনি মাদ্রাসায় কথাবার্তার কাজ চালাতেন এবং তাঁদের কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনাগুলোর রহস্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন। মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক পরিবেশে উপস্থিত হয়ে তিনি আরেকটি জিনিস উপলব্ধি করলেন তাহলো মাদ্রাসার এই পরিবেশের প্রতি তাঁর পিতার অপরিসীম ভালোবাসা।


রুমীর গল্প
( ৬ষ্ঠ পর্ব)

পাঠক! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে, মোঙ্গলদের হামলার সময় মৌলাভি তাঁর পরিবার-পরিজন এবং তাঁর বাবার অন্তত ৩০০ মুরিদসহ বাল্খ থেকে হিজরত করে নিশাবুরে কিছুদিন কাটিয়ে আরো বহু শহর অতিক্রম করে অবশেষে বাগদাদে গিয়ে পৌঁছেছেন। সেখানে শায়খ শাহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দি তাঁদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। তাঁরা বাগদাদ শহরের একটি মাদ্রাসায় গিয়ে ওঠেন। তারপরের ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।
শায়খ শাহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দি বাগদাদ শহরে বাহা ওলাদ এবং তার সঙ্গী-সাথীদের উপস্থিতিকে এই শহরের জনগণের জন্যে গনিমত বলে মনে করেন। তিনি বহুদিন বাহাওলাদের কাছে এসেছেন এবং তারা দু'জনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ফার্সি ভাষায় কথা বলেছেন। জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ যখন দেখলো যে শায়খ তার বাবার সাথে ফার্সি ভাষায় কথা বলছে,তখন তার প্রতি জালালের অনেক বেশি সখ্যতা ও সম্ভ্রম বেড়ে যায়। বাবার কাছ থেকে যখন জানলো যে তিনি ফার্সি ভাষী এবং যানজনের অধিবাসী এমনকি ফার্সি ভাষায় কবিতাও আবৃত্তি করে, তাঁর প্রতি জালালের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।
বাহাওলাদের কাছে যাওয়া-আসা করার ফাঁকে সোহরাওয়ার্দি তাঁকে একটা প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটা হলো বাগদাদে খোরাসানের যেসব মুসাফির, হাজি, সুফি প্রমুখেরা জমায়েত হতেন তাঁদের জন্যে ওয়াজের একটা মসলিস যেন করেন তিনি। বাহাওলাদ বাল্খ থেকে বাগদাদ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সফরে ওয়াজ করা বা কোনোরকম বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়ার সুযোগ পান নি। তাই শায়খের এই প্রস্তাবে তিনি ভীষণ খুশি হন। এরপর থেকে বাগদাদে বাহাওলাদের বক্তৃতার আসর শুরু হয়। তাঁর বক্তৃতার আসরে জনগণের মুহুর্মুহু উপস্থিতি বাহাওলাদের সঙ্গীসাথী এবং জালালুদ্দিনের মনে ইরানের জনবহুল জলসার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। জনগণের ব্যাপক অভ্যর্থনা দেখে শায়খ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি বাহাওলাদকে রোম শহরে যাবার প্রস্তাব দিলেন। সে সময় সেখানকার লরান্দেহ শহরের শাসক ছিলেন রোমের সালজুকি বংশের উত্তরাধিকার আলাউদ্দিন কায়কোবাদ। রোম ছিল তখন ফার্সি ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে বেশ সমৃদ্ধ।
এদিকে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ এ সময় শুনতে পেলেন যে বাল্খ, খোরাসান এবং খাওয়ারেয্মে মোঙ্গলরা হামলা চালিয়েছে,তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে পিতৃভূমিতে তাঁর আর ফিরে যাওয়া হবে না-এই বিষয়টি তাঁকে খুব চিন্তিত করে তুললো। তবে পাশাপাশি এমন একটা এলাকায় তাঁরা যাচ্ছেন, যেখানে ফার্সি ভাষার প্রচলন আছে-এইকথা ভেবে মনে মনে খুশিও হলেন। সেইসাথে এরকম একটি জায়গায় যাবার জন্যে প্রস্তাব দেওয়ায় শায়খ শাহাবুদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞও ছিলেন তিনি।
বাহাওলাদের পরিবারের জন্যে বাগদাদে জীবনযাপন করাটা বেশ কষ্টকর ছিল। তাই পুনরায় সফর শুরু হলো এবং ১৪ বছর বয়সী জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের চোখে সফরের মধ্যে ছিল ব্যবহারিক জীবনের অনেক শিণীয় বিষয়। সিরিয়ায় কিছুদিন কাটান তাঁরা। হজ্ব কার্যক্রম শেষ করে বাহাওলাদ বক্তাদের মতো শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতেন। ঘুরতে ঘুরতে যেতেন এশিয়া মাইনরের দেশগুলোতে যেখানে ফার্সি ভাষা প্রচলিত ছিল।
বিভিন্ন শহরে যাত্রাবিরতি করার ফলে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের যে অভিজ্ঞতাটি হলো তাহলো, সে সময়কার প্রচলিত জ্ঞান ছাড়াও আরবি ভাষা ও সাহিত্যসহ অন্যান্য যেসব বিষয়ে মাদ্রাসাগুলোতে পাঠদান করা হতো, সেগুলো সম্পর্কে প্রতিদিনই জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ হয়েছিল। সফর করতে করতে বর্তমান তুরস্কের কারামান বা লরান্দেহ শহরে গিয়ে বাহাওলাদ তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। দীর্ঘ এই সফরে বাহাওলাদের জন্যে বসবাস করা, ওয়াজ করা এবং শিক্ষাদান করার জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিল এই লরান্দেহ। তখন লরান্দের শাসক ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ সালজুকি। তিনি বাহাওলাদ এবং তাঁর পরিবার-পরিজনসহ সঙ্গী-সাথীদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বাহাওলাদের নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন।
কুনিয়ার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বগণ বাহাওলাদকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন সুলতানের প্রাসাদে যান। কিন্তু বাহাওলাদ তাঁদের এই অনুরোধ রক্ষা করতে পারেন নি। কেননা তিনি মাদ্রাসার দেখাশোনা করতেন, সেখানে শিক্ষকতা করতেন, এইসব কাজে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর প্রাসাদে যাবার অনুরোধ রক্ষা করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর পরিবার-পরিজন এবং সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে লরান্দেই থেকে গেলেন।


রুমীর গল্প
(৭ম পর্ব)

পাঠক! আমরা বিগত আসরগুলোতে বলেছি যে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ তাঁর পিতা বাহা অলাদ এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও পিতার সঙ্গী-সাথীদের সাথে বাগদাদে বছর খানেক কাটিয়ে সিরিয়ার বিভিন্ন শহর এবং এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন শহর সফরে যান এবং শেষ পর্যন্ত লরান্দের শাসকের আমন্ত্রণে এই শহরে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এরি ধারাবাহিকতায় আজ আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।
দীর্ঘ ভ্রমণের পর লরান্দেহ শহরটি বাহা অলাদের জন্যে ছিল বেশ নিরাপদ এবং বসবাস উপযোগী স্থান। বার্ধক্য এবং চারপাশ ঘিরে থাকা ভক্ত-অনুরক্তদের বিরামহীন ভিড় লেগে থাকার কারণে বাহা অলাদ বাধ্য হয়েছেন ভ্রমণের চিন্তা বাদ দিতে। এমনকি কুনিয়ার ফকীহ বা বুযুর্গানে দ্বীনের দাওয়াত গ্রহণ করতেও অপারগ ছিলেন। তাই মাদ্রাসায় শিক্ষাদান করা আর দ্বীনী বক্তৃতা দেওয়াই ছিল তাঁর এ সময়ের প্রধান কাজ। এদিকে পিতা এবং অন্যান্য শিকদের সান্নিধ্য পেয়ে সাহিত্যিক বা দ্বীনী শিক্ষাগুলো ভালোভাবে আত্মস্থ করার একটা মহাসুযোগ পেয়ে গেলেন যুবক জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ। তিনি কিন্তু ঘোরাঘুরি বা বিভিন্ন শহর সফর করার কান্তি-শ্রান্তিপূর্ণ সময়গুলোও নষ্ট করেন নি। তিনি বরং এই সময়টাকে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান আহরণের কাজে লাগিয়েছেন। ভ্রমণকালীন সুযোগে তিনি সাহিত্য বিশেষ করে কবিতা, আধ্যাত্মিকতা,কোরআন,হাদীস,তাফসীর,কালামসহ আরো বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করেছেন।

কী করে আরবী বা ফার্সি কবিতা কিংবা বিচিত্র উপমা বা উদাহরণ সহযোগে নিজের কথাবার্তাকে সুন্দর করে তোলা যায় তা শিখেছিলেন। আরো শিখেছিলেন গল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে,প্রবাদ-প্রবচনের প্রয়োগে কী করে শ্রোতাদের মন জয় করা যায়। বাহা অলাদের ছাত্র এবং মুরিদদের জোরালো সুপারিশের ফলে এবং স্বয়ং পিতার অনুপ্রেরণায় জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের জন্যে বক্তৃতার একটি আসরের আয়োজন করা হলো। জালালুদ্দিন তাঁর প্রথম বক্তৃতা দেন অকশাহরে এবং তারপর লরান্দে'তে। যুবক জালালুদ্দিনের বক্তৃতার সাফল্যে তাঁর মা বিবি আলাভি পর্যন্ত অত্যন্ত খুশি হন। কিন্তু তাঁর উৎফুল্ল হবার ঘটনা খুব বেশিদিন দীর্ঘ হয় নি। তিনি যুবক মাওলানাকেও বেশিদিন দেখে যেতে পারেন নি,দেখে যেতে পারেন নি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী বিশ্ববিখ্যাত আরেফ ও খ্যাতিমান কবি মাওলানাকে। মায়ের হঠাৎ মৃত্যু যুবক জালালুদ্দিন মোহাম্মাদকে বেদনার সাগরে নিমজ্জিত করে। সেইসাথে বৃদ্ধ পিতা বাহা অলাদও ভীষণ একাকীত্ব বরণ করেন। এইসব কারণে জালালুদ্দিন খুব কষ্ট পান। তবে যে বিষয়টি পিতা এবং পুত্রকে বেদনার সাগর থেকে তীরে নিয়ে এসেছিল তাহলো জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের বিয়ে।
জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ গওহার খাতুন নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। গওহার খাতুন হলেন বাহা অলাদের এক ছাত্রের মেয়ে। বিবি আলাভির মৃত্যুতে বাহা অলাদ এবং জালালুদ্দিন যেভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন,গওহার খাতুন তাদের ঐ ভঙ্গহৃদয়ে পুনরায় আনন্দের ঝর্ণাধারা বইয়ে দিতে সম হয়েছিলেন। বিয়ের পর জালালুদ্দিন এবং তার পিতা আরো কয়েক বছর লরান্দেতে থেকে যান। অল্প সময়ের ব্যবধানে জালালুদ্দিন দুটি সন্তানের পিতা হন। বিবি আলাভির মৃত্যুতে বাহা অলাদের ঘরে যেই নীরব শীতলতা এসে ভর করেছিল,জালালুদ্দিনের দুই সন্তান ঐ শীতার্ত অবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাহা অলাদের ঘরকে উষ্ণতা দান করে।
রোমের সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ সালজুকি লরান্দেহ,মালতিয়েহ এবং আরযানজনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাহাঅলাদের জ্ঞান গরিমা ও খ্যাতির কথা শুনেছেন। তাই তিনি এই বিখ্যাত জ্ঞানীর সাথে দেখা করার জন্যে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। ব্যাপক সুপারিশ এবং জোর পীড়াপীড়ির পর বাহাঅলাদ কুনিয়ার প্রাসাদে আমন্ত্রিত হলেন। সেই সময় কুনিয়া ছিল বালখ,হেরাত,র্মাভইনশাবুর প্রভৃতি অঞ্চলের মতো জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বাহা অলাদ যদিও বার্ধক্যের কারণে দীর্ঘ সফরে যেতে চাইতেন না,তারপরও রোমের সুলতানের আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে পারলেন না। কিন্তু বৃদ্ধাবস্থায় বাহাঅলাদকে জালালুদ্দিন একাকী এই সফরে যেতে দিলেন না, তিনি নিজের তাঁর সফরসঙ্গী হলেন।
সফর শুরু হলো। বন্ধু-বান্ধব আর শুভাকাক্সীদের ভগ্নহৃদয়ের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে বাহাঅলাদ এবং তাঁর পরিবার-পরিজন কুনিয়ার উদ্দেশ্যে লরান্দেহ ত্যাগ করেন। রোমান সালজুকি প্রাসাদের লোকজন বাহাঅলাদ এবং পরিবার পরিজনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। স্বয়ং সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ বাহাঅলাদকে অভ্যর্থনা জানান। তিনি বাহাঅলাদকে সাদর সম্ভাষণ জানান এবং জ্ঞানী-গুণী এই বৃদ্ধের হাড্ডিসার হস্তমুবারক চুম্বন করেন। দূরদূরান্ত থেকে যারা এই জ্ঞানীর সম্মানে স্বাগত জানাতে এসেছিলেন সবাই খুব খুশি হলেন। সুলতান তো বাহাঅলাদের সম্মানে রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেন। কুনিয়ায় আসার পর বাহাঅলাদ কেবল মাদ্রাসাতেই সময় দিতেন,অন্য কারো আমন্ত্রণে জান নি,এ বিষয়টি সুলতানকে গর্বিত করে তোলে।
মাদ্রাসায় অবস্থানকালে সফরের কান্তি দূর হতে না হতেই বিচিত্র শ্রেণী ও পেশার লোকজন বাহা অলাদের সাথে দেখা করতে আসতেন। তাঁরা তাঁর জন্যে হাদিয়া নিয়ে আসতেন। সাক্ষাৎপ্রার্থীদের মাঝে খোরাসানের বহু লোকও ছিলেন যারা এখন কুনিয়াতে বসবাস করেন। জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ তাদের সাথে পরিচিত হয়েছেন,তাদেরকে সময় দিয়েছেন,কুশল বিনিময় করেছেন। বাহাঅলাদ বর্তমানে কুনিয়াতে বসবাসকারী খোরাসানীদের জন্যে আন্তরিক একটা টান অনুভব করতেন। তাদের সাথে বসে জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ বিচিত্র শ্রেণী ও পেশার লোকজনের সাথে নিবীড়ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান।
কুনিয়া শহরটি ছিল তখনকার দিনে রোমান সালজুকিদের রাজধানী। তাই শহরটি ছিল এক কথায় তিলোত্তমা। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট,বাগ-বাগিচা, সুন্দর সুন্দর দালান-কোঠা, বিচিত্র ধরনের বাজারঘাট আর বিপণীকেন্দ্রের সমাহারে পুরো শহরটাই ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। কুনিয়া শহরটি যুবক জালালুদ্দিনের মনে তিরমিজ,বালখ এবং সামারকান্দ শহরের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। তৎকালীন কবি-সাহিত্যিক আর জ্ঞানী-গুণীদের উপস্থিতিতে প্রাসাদ রাজদরবার উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। তখন প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফার্সি। আইনজীবী,আলেম-ওলামা,সুফি,কবি-সাহিত্যিক কিংবা ইতিহাসবিদগণ এ ভাষাতেই কথা বলতেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা এ ভাষাতেই লেখালেখি করতেন। তবে শহরে প্রচলিত ভাষাভঙ্গি ছিল তুর্কি বা গ্রিক।
বার্ধক্যের কারণে বাহাঅলাদ খুব কমই ওয়াজ করতে বা কাস নিতে পারতেন। তাই পিতার পাশাপাশি এখন থেকে মাওলানা স্বয়ং কাস নিতে শুরু করেন। মাওলানার কাস কিংবা বক্তব্য ছিল শ্রোতাদের কাছে ভীষণ উপভোগ্য। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই বিচিত্র পেশা ও শ্রেণীর লোকজন তাঁর বক্তৃতার শ্রোতা হয়ে যান। বাহাঅলাদের কাছে তখনও মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে ও শুনতে আসতো। কিন্তু তিনি বার্ধক্যের কারণে কথা বলতে পারতেন না। তাই জালালুদ্দিন কিংবা পিতার ভাষায় আমাদের জালালুদ্দিন বাবার প থেকে কথা বলতেন। এমনকি যে মাদ্রাসাটি বাবার নামে করা হয়েছিল সেই মাদ্রাসায় বাবার মতো কিংবা কখনো বাবার পরিবর্তে জালালুদ্দিন নিজেই মিম্বারে উঠে ওয়াজ করতেন বা কাস নিতেন।
এভাবে কাটতে থাকে দিন। জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ নৈঃসঙ্গ্য বোধ করতে লাগলেন। অবশেষে সেই দিন এসে গেল। কুনিয়ায় ২ বছর কালাতিপাত করার পর বাহা অলাদ ৮৩ বছরের জীবন শেষে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন। তাঁর মৃত্যুকালে জালালুদ্দিনের বয়স ছিল ২৪ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর সুলতান এক সপ্তার সরকারী শোক ঘোষণা করেন এবং তাঁর উদ্দেশ্যে শোকানুষ্ঠান বা স্মরণসভার আয়োজন করে যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন।


রুমীর গল্প
( ৮ম পর্ব)

পাঠক!গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে,বাহাঅলাদ সালজুকি সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদের আমন্ত্রণে তাঁর পরিবার-পরিজন এবং ভক্ত-অনুরক্তদের সাথে নিয়ে কুনিয়ায় যান। সেখানে রাজকীয় সম্মানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। বাহাঅলাদ কুনিয়ায় প্রবেশ করার মাত্র ২ বছর পর বার্ধক্যের কারণে শেষবারের মতো তাঁর দুই চোখ বন্ধ করেন। তাঁর অবর্তমানে যুবক মাওলানা জালালুদ্দিন ভীষণ একা হয়ে যান। তো তাঁর এই নৈঃসঙ্গ্যকে অনুষঙ্গ করে আমরা ধারাবাহিক এই আলোচনার আজকের পর্বে মনোনিবেশ করবো। আপনাদের সচেতন উপস্থিতি আমরা যথারীতি কামনা করছি।
বাহাঅলাদের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই পিতার পারিবারিক দায়দায়িত্ব যেমন জালালুদ্দিনের ওপর ন্যস্ত হয়,তেমনি বাহাঅলাদের মুরিদদের প্রশিক্ষণের গুরুদায়িত্বও তাঁর ওপর বর্তায়। পারিবারিক যে দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করলেন, সেখানে এখন তাঁর পিতা-মাতার নিকটজন ছাড়াও নিজের স্ত্রী গওহার খাতুন এবং তাঁর দুই সন্তান বাহাউদ্দিন এবং আলাউদ্দিনও রয়েছে। জালালুদ্দিনকে যেহেতু পিতা বাহাঅলাদ ভীষণ ভালোবাসতেন,সেহেতু পিতার অভাব এখন জালালুদ্দিন ভীষণভাবে উপলব্ধি করতে লাগলেন। এই দূরত্ব এই বিচ্ছিন্নতা তাঁর স্মৃতিতে ভাস্বর করে তুলেছে সেই খোরাসানের কথা,বাহাঅলাদের আধ্যাত্মিক সুষমা মণ্ডিত গৃহের সোনালী দিনগুলোর কথা। ঘরের অভ্যন্তরে তাঁর স্ত্রী গওহার খাতুন তাঁর মনে সামারকান্দের স্মৃতি জাগিয়ে দেয়। তাঁর বড়ো ছেলে বাহাউদ্দিন এখন মক্তবে যায়। তার মক্তবে যাবার ঘটনা বালখে জীবনযাপনকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। খোরাসানের বিভিন্ন মক্তবের কথা, সঙ্গীসাথীদের সাথে খেলাধুলা করার কথা। এইসব স্মৃতি ভুলে থাকার জন্যে যুবক মাওলানা বই পড়ার ভেতর বুঁদ হয়ে থাকতেন।
জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ যখন ওয়াজ করতেন,তখনো বাবার কথা মনে পড়ে যেত। কেননা যুবক বয়সে বাবার ওয়াজ বহু শুনেছেন তিনি। তাঁর বাবার ওয়াজ শোনার জন্যে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসতো। মাওলানাও যখন আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ পংক্তিমালা উচ্চারণের মাধ্যমে এবং কোরআনের কিসসা-কাহিনীর উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াজ করতেন,শ্রোতারা তখন মুগ্ধ হয়ে যেত। প্রতিদিনই তাঁর ভক্ত-অনুরক্তের সংখ্যা বেড়ে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে সমাজের সর্বস্তরে তাঁর ভক্তের সংখ্যা বেড়ে যেতে লাগলো।
তরুণ মাওলানার কথাবার্তা ছিল যথেষ্ট মনোরঞ্জক এবং আকর্ষণীয়। সমাজের সকল স্তরের মানুষ তাঁর কথাবার্তার ভক্ত ছিলো, তাঁর কথায় সবাই ছিল মুগ্ধ। তাঁর কথাবার্তা ছিল রসালো,কাব্যময়,ইঙ্গিতধর্মী এবং শিক্ষণীয়। তিনি নিজেও বিভিন্ন জলসা থেকে অনেক কিছু শিখতেন। বিশেষ করে তিনি এইসব আসর থেকে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রবণতা এবং আচার প্রথার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেন। যাই হোক, এরকম এক পরিস্থিতিতে তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক, পিতা বাহাঅলাদের প্রিয় মুরিদ,সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন তিরমিযী কুনিয়ায় গেলেন। জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের বয়স তখন ২৫ বছর। চেনাজানা এই মুরব্বিকে পেয়ে বাবার কথা পুনরায় মনে পড়ে গেল জালালের। বৃদ্ধ এই শিক্ষকের সাক্ষাৎ তরুণ মাওলানার জন্যে ছিল একটা বড়ো ধরনের প্রশান্তি ও সান্ত্বনার কারণ।
বাহাঅলাদ কবি সানাঈ এবং আত্তারের কাব্যভূবন থেকে কথায় কথায় উদ্ধৃতি দিতেন,বাল্খ এবং সামারকান্দের ভাষাও বলতেন,তাঁর ঘরে ছিল সবসময় আনন্দঘন পরিবেশ। সেই উদ্ধৃতি,সেই ভাষা এবং সেই পরিবেশ এখন বৃদ্ধ শিক্ষকের উপস্থিতিতে দেখতে পেয়ে পিতার কথা পুনরায় জালালুদ্দিনের স্মৃতিতে জেগে উঠলো। সেজন্যেই কুনিয়ায় সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিনের উপস্থিতিতে জালালুদ্দিন যেন হারানো বেহেশতের সন্ধান পেলেন। সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন এবার জালালুদ্দিনকে আধ্যাত্মিকতার উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা চালাতে শুরু করলেন। আর এ কাজের জন্যে তিনি জালালুদ্দিনকে তাঁর পিতা বাহাঅলাদেরই জীবন পর্যালোচনার পরামর্শ দিলেন। একাকী কীভাবে পথ চলতে হয় সেই শিক্ষা দিলেন। শিক্ষকের কথা অনুযায়ী মাওলানা একাকী সিরিয়ায় গেলেন পড়ালেখা চালিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে। সাত বছর তিনি সিরিয়ায় পড়ালেখা করেন। এই সাত বছরে সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন বেশ কয়েকবার কুনিয়ায় এসেছেন এবং জালালুদ্দিনের সংসার এবং তাঁর সন্তানদের পড়ালেখাসহ সার্বিক খোঁজ-খবর নিতেন।
সিরিয়ায় পড়ালেখাকালীন পুরো সময়টাই জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ শিক্ষা কার্যক্রমেই কাটাতেন। হালবে ইবনুল আদিমের কাছে এবং দামেশকে ভাষা ও সাহিত্যের শিকদের কাছে ছিলেন তিনি। তাফসির, হাদীস, ফিকাহ, এলমে কালাম ইত্যাদি বিষয়ে তিনি লেখাপড়া করেন। দিনরাত তিনি কেবল লেখাপড়া আর চিন্তা-গবেষণাতেই কাটাতেন। মাঝে মাঝে এমন হতো যে পড়ালেখা আর গবেষণার ব্যস্ততার কারণে খাওয়া দাওয়ার সময় পার হয়ে যেত। খাওয়া দাওয়ার এই অনিয়মের ফলেই তিনি ভীষণ কান্ত হয়ে পড়েন এবং বার্ধক্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।
এই দিনগুলোতে মাওলানা কখনো কখনো পরিবার-পরিজন থেকে দূরে চলে যেতেন। তাঁর শিক্ষক সাইয়্যেদ বোরহানুদ্দিন তিরমিযীর উপদেশ অনুযায়ী কেবল কৃচ্ছতাসাধন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্যেই তিনি একাজ করতেন। বছরের একটা অংশে বিশেষ করে পবিত্র ও পূন্যময় মাসগুলোতে তিনি দিনের বেলা রোযা রাখতেন। রাতের বেলাতেও সাহরির সময় পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং বিনিদ্র থেকে আল্লাহর জিকির করতেন। ঠিক তাঁর বাবার মতো- পিতা যেমন সদাসর্বদা আল্লাহর নামের জিকির করতেন,দীর্ঘ সময় ধরে নামায পড়তেন,আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন,কান্নাকাটি করতেন। সাত বছরের কৃচ্ছতা,সাত বছরের পড়ালেখা বা গবেষণা এবং এই সাত বছরে বাবার অনুসৃতি যুবক মাওলানাকে ছোটোখাটো একজন আরেফ বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

রুমীর গল্প
(৯ম পর্ব) 

পাঠক! গত আসরে আমরা জালালুদ্দিনের সিরিয়ায় শিক্ষাজীবন নিয়ে কথা বলেছিলাম। ৩৩ বছর বয়সে তিনি যখন সিরিয়া থেকে কায়সারিয়া হয়ে কুনিয়ায় ফিরে এলেন,তখন তিনি মাওলানা এবং মুফতি হিসেবে ভূষিত হয়েছিলেন। কথিত আছে যে,রোমের নতুন বাদশাহ গিয়াস উদ্দিন কেইখোসরু তাঁর বাদশাহির সূচনায় মাওলানাকে সিরিয়া থেকে ফিরিয়ে আনার জন্যে মাওলানার শিক্ষকদের কাছে চিঠি লেখালেখি করেছিলেন।
যাইহোক,মাওলানার কুনিয়ায় প্রত্যাবর্তনের সময় খোরাসানীরা,আলেমওলামাগণ,যুবকদের বিভিন্ন দল তাঁকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানায়। বয়সের দিক দিয়ে মাওলানা যদিও যুবক ছিলেন, তারপরও কুনিয়ার আলেম-ওলামাদের মাঝে তিনি ছিলেন বেশ নামকরা। যাই হোক,আজ আমরা মাওলানার সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী জীবন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
বিভিন্ন বিষয়ে তিনি যে পরিমাণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তা ছিল বিস্ময়কর। বিশিষ্ট ফকীহ বা ইসলামী আইনবিদ সিরাজ উদ্দিন ওরমাভি কিংবা প্রখ্যাত মুহাদ্দিস সাদরুদ্দিন কুনিয়ায়ীর মতো ব্যক্তিত্বগণ পর্যন্ত যুবক মাওলানার দিকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তাকাতেন। তাঁর বৃদ্ধ শিক্ষক সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন মৃত্যুর আগে নিজের ছাত্রকে এতোটা জ্ঞানী-গুণী দেখতে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন। আর জালালুদ্দিন মোহাম্মাদও তাঁর বৃদ্ধ শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়ে ভীষণ সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু এই বৃদ্ধ শিক্ষকের সাথে জালালুদ্দিনের এটাই ছিল শেষ দেখা। ৭৮ বছর বয়স্ক সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন তিরমিযী জালালুদ্দিনের কাছে কায়সারিয়ায় যাবার অনুমতি চাইলেন। জালালুদ্দিনের ইচ্ছে করছিলো না যেতে দিতে, তারপরও অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে রাজি হতে হলো। কায়সারিয়ায় ফিরে যাবার কিছুদিন পরই সাইয়্যেদ বোরহান উদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। সাইয়্যেদের মৃত্যু ছিল তাঁর বাবার দ্বিতীয় মৃত্যুর মতো। অর্থাৎ বাবার মৃত্যুতে তিনি যেমন মর্মাহত এবং নিঃসঙ্গ হন,সাইয়্যেদের মৃত্যুতেও একই রকম অবস্থার সম্মুখিন হন তিনি। মাওলানা কায়সারিয়ায় যান এবং শিক্ষকের জন্যে যথাযথ মর্যাদার সাথে শোকানুষ্ঠান করেন।
কুনিয়ায় ফিরে এসে মাওলানা জালালুদ্দিন ভীষণ একা হয়ে যান। তিনি তাঁর সময়গুলো কেবল সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষা,সাংসারিক কাজকর্ম,ওয়াজ-নসীহত, ইবাদাত-বন্দেগি আর শিক্ষকতার কাজে ব্যয় করেন। সন্তানরা এখন বড়ো এবং প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে। বড়ো ছেলে সুলতান অলাদের বয়স ১৭ বছর। সে এখন বাবার সাথে আসরে বসে। ছোট সন্তানের বয়স ছিল ১৫। সেও ভাইয়ের সাথে সাথে বাবার বক্তব্যের আসরে যেতো। বাবা যদিও তাদেরকে নিয়ে যেতেন ঠিকই,তবে তাদের পড়ালেখার বিষয়টি মোটেও ভোলেন নি। তাই তাদের দু'জনকেই পড়ালেখার জন্যে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। সন্তানদেরকে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার পর জালালুদ্দিনের স্ত্রী গওহার খাতুন ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিশেষ করে দু'ভাইয়ের মাঝে খুব একটা মিল ছিল না। বাবা যখন তাদের দু'ভাইকে চিঠি লিখতেন তখন দু'ভাইয়ের মাঝে যেন বন্ধুত্ব হয় বা সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়, সেরকম নির্দেশনা দিতেন।
এদিকে মাওলানার দিন কাটতো ওয়াজ-নসীহত,শিক্ষা-দীক্ষা আর ফতোয়া অর্থাৎ বিভিন্ন সমস্যার ধর্মীয় সমাধান প্রদানের মধ্য দিয়ে। এ সময় তাঁর কাছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা আসতো,মুরিদরা আসতো,কৌতূহলী বা উৎসাহী লোকজনও আসতো তাঁর বক্তৃতার আসরে শরিক হতে। মাদ্রাসায়ে বাহাঅলাদ মাওলানার উপস্থিতিতে যেন নতুন করে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পেল। মাওলানা কেবল এই মাদ্রাসাতেই নয় বরং এর বাইরেও কুনিয়ার বেশ কটি বড়ো বড়ো মাদ্রাসায় তিনি পড়াতেন। যেসব স্থানে তিনি বক্তৃতা দিতেন,সেসব স্থানে যেন জনগণের ঢল নামতো। এসব সমাবেশে কেবল যে ছাত্ররাই অংশ গ্রহণ করতেন তা নয়,বরং বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ এমনকি দেশের বাইরে থেকেও বহু মানুষ আসতেন। যেমন তাঁর মাহফিলে ফার্সি ভাষী তুর্কিরাও আসতেন এবং বিভিন্ন শহরের প্রধানরাও আসতেন।
কবিতা,উপমা আর গল্প-কাহিনীর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি যেভাবে বক্তব্য রাখতেন তা শ্রোতাদেরকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করতো। আর সেকারণেই তাঁর বক্তব্যের খুব ভালো একটা প্রভাব দর্শক-শ্রোতাদের ওপর পড়তো। মাওলানার বক্তৃতায় শ্রোতারা কাঁদতেন, তওবা-এস্তেগফার করতেন,পাপকাজ থেকে বিরত থাকার শপথ নিতেন। কারণ মাওলানা তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে সবসময় জনগণকে সত্য ও সঠিক পথের পথিক হবার আহ্বান জানাতেন। তাই জনগণও তাঁকে অনুসরণ করতেন। তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এতো বেশী ছিল যে,তিনি যখন কোথাও যেতেন,তাঁর সঙ্গী-সাথীদের প্রাচুর্যে অলিগলি পূর্ণ হয়ে যেত,ফলে পথিকদের জন্যে রাস্তা পারাপার হওয়াটাও কঠিন হয়ে যেত। মানুষ তাদের বিচিত্র সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে আসতো। কী ধর্মীয় বিষয়-আশয়,আর কী রাষ্ট্রীয় কিংবা ব্যক্তিগত-সব ধরনের সমস্যা নিয়েই লোকজন তাঁর কাছে আসতো। সব সমস্যার কথা মাওলানাকে জানাতো এবং সমস্যা সমাধানের জন্যে মাওলানার পরামর্শ বা দিক-নির্দেশনা চাইতো।
যাই হোক মাওলানার মাহফিলে তিনি একাই থাকতেন না। স্থানীয় অন্যান্য আরেফ বা পীরও উপস্থিত থাকতেন। যেমন কুনিয়ার এক গ্রাম্য পীর সালাউদ্দিন যারকুব। তিনি খুব আবেগময় ভাষায় ওয়াজ করতেন এবং তাঁর বক্তব্যের উচ্চস্বর পুরো মাহফিলকে একধরনের উষ্ণতা দান করতো। মাওলানার ওপর এই যারকুব পীরেরও প্রভাব পড়েছিল। এভাবে যখন কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো,তখনই ঘটলো আরেক দুর্ঘটনা। মাওলানা জালালুদ্দিনের স্ত্রী গওহার খাতুন হঠাৎ মারা গেলেন। যার ফলে মাওলানা পুণরায় একা হয়ে গেলেন।
মাওলানার এই একাকীত্ব দিনের পর দিন বেড়ে যেতে লাগলো। তিনি তাঁর নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলো কাটাতে লাগলেন বই পড়ে, ওয়াজ-নসীহত করে। মাওলানার ছেলেরা এরিমাঝে সিরিয়া থেকে পড়ালেখা শেষ করে কুনিয়ায় ফিরে এসেছে। তাদের দেখাশোনা ,যত্ম-আত্তি নেওয়াটা জরুরি পড়েছিল। এ কারণে মাওলানা বাধ্য হয়ে পুনরায় বিয়ে করলেন। তিনি যাঁকে বিয়ে করলেন তিনি ছিলেন কুনিয়া নিবাসী ইরানী। ফার্সি ভাষা ভালোই জানতেন তিনি। নাম ছিল কেরা খাতুন। কেরা খাতুনের জন্যেও এটি ছিল দ্বিতীয় বিবাহ। দুটি সন্তানও ছিল তাঁর। একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। গওহার খাতুনের মৃত্যুর ফলে মাওলানার সংসারে যে নিরবতা নেমে এসেছিল, কেরা খাতুন সেই নিরবতা ভঙ্গ করে পুরো সংসারকে সরব-সুন্দর করে তোলেন। ভালোবাসার নতুন এক আমেজে ভরে ওঠে জালালুদ্দিন রুমির ঘর।

রুমীর গল্প
(১০ম পর্ব)

পাঠক! হত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে মৌলানা ইরাক এবং সিরিয়ায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা শেষ করার পর কুনিয়ায় ফিরে আসেন এবং কুনিয়ার একজন বিখ্যাত আলেম বা মুফতি হিসেবে জনগণের কাছে একজন শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সুন্দর বাচনভঙ্গির কারণে তাঁর কাস বা আলোচনার বৈঠকগুলোতে সবসময় জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি ল্য করা যেত। যাই হোক আমরা আজকের আসরে এরি ধারাবাহিকতায় কথা বলার চেষ্টা করবো।

শামসুদ্দিন তাব্রিযির তৃষিত প্রাণ কোনো শিক্ষকের সান্নিধ্যেই নিবারিত হচ্ছিল না। তিনি তৃষিত ছিলেন এবং এমন এক উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন মানুষের সন্ধানে ছিলেন,যে মানুষের মর্যাদা যমিনে আল্লাহর খলিফার মতো। তিনি চাচ্ছিলেন ইনসানে কামেলের মর্যাদায় উপনীত হতে। এই লক্ষ্যে তিনি বছরের পর বছর ভ্রমণ করেছেন। তাঁর এই বিরতিহীন সফরের কারণে লোকজন তাঁকে উপাধি দিয়েছিল ‘পাখি শামস'। একরাতে শামস অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। কোনো কিছুই তাঁর অন্তরের অস্থিরতা দূর করতে পারছিলো না। তিনি মোনাজাতে বসে বললেনঃ

হে খোদা! তুমি আমাকে তোমার একজন প্রিয় বান্দা হিসেবে গ্রহণ করে নাও। এরপর তিনি স্বপ্নরাজ্যে জালালুদ্দিন বালখিকে দেখতে পান। তাঁকে খোঁজার জন্যে শামস রোমে চলে যান। ৬৪২ হিজরীর জমাদিউস সানির ২৬ তারিখ শনিবার শামস কুনিয়ায় যান। কুনিয়ায় গিয়ে সামান্য ঘুরে ফিরে বাজারে গেলেন এবং চিনি ব্যবসায়ীদের ঘরে উঠলেন। ঘরের দরোজায় দু®প্রাপ্য প্রাচীন কটি তালা লাগালেন যাতে জনগণ বুঝতে পারে যে তিনি একজন ব্যবসায়ী। অথচ হুজরার ভেতরে ছিল একটা ছেঁড়া পুরোণো মাদুর,একটা ভাঙ্গা কলসি এবং ইটের মতো শক্ত একটা বালিশ।

এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। তিনি প্রতিদিন মাওলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মাদকে দেখতেন বহু ছাত্র সহযোগে বাজার থেকে যাচ্ছেন। একদিন শামস তাঁর হুজরার দরোজার ওপরে বসলেন। মাওলানা "তুলা ব্যবসায়ীদের" মাদ্রাসা থেকে বাইরে এলেন। ছাত্ররা বা জ্ঞানপিপাসুদের দল যথারীতি তাঁর সহযাত্রী ছিল। শামস এই দূরত্ব আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি ধৈর্য ধরতে না পেরে সামনে গেলেন। তারপর তিনি অনেকটা ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে মাওলানাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শায়খ! বলুন তো দেখি,মুহাম্মাদ (সা) শ্রেষ্ঠ ছিলেন নাকি বায়েযিদ বোস্তামি ?

এ ধরনের প্রশ্নে মাওলানা কিছুটা বিরক্তই হলেন। তাই খানিকটা রাগের সাথে বললেন, মুহাম্মাদ ( সা ) হলেন নবীকূল শিরোমণি, বায়েজিদ বোস্তামের সাথে তাঁর কী সম্পর্ক থাকতে পারে ? শামস এ ধরনের জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি বায়েজিদ এবং রাসূলে খোদার প্রসঙ্গ টেনে মাওলানার কাছে আরো স্পষ্ট জবাব চাইলেন। খানিক পরে মাওলানা বললেনঃ বায়েজিদের ধৈর্য ছিল কম। তাঁকে আলেমে গায়েবের যে সামান্য পানীয় দেওয়া হয়েছিল,তাতেই তিনি বেহুশ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুহাম্মাদ ( সা ) ছিলেন সমুদ্র। আলেমে গায়েব সম্পর্কে তাঁকে অনবরত পানপাত্র দেওয়ার পরও তিনি জ্ঞানহারা হন নি। চমৎকার প্রশ্ন এবং উত্তর,মাওলানার জন্যে মোটেই কষ্টকর ছিল না। সম্ভবত যে-কোনো আলেমই যাঁদের আধ্যাত্মিকতার সাথে পরিচয় কম,তাঁরাও এ ধরনের উত্তর দিতে পারতেন। কিন্তু মূল সমস্যাটা ছিল এই যে,প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছে বাজারের লোকজনের মাঝ থেকে যাদের এ ধরনের বক্তব্যের সাথে পরিচয় নেই। অথচ শামসের প্রশ্নের বিষয়বস্তু থেকে প্রশ্নকর্তার জ্ঞানের পরিচয় ফুটে ওঠে। মাওলানা তাই একটু চুপ করলেন এবং অপরিচিত লোকটির প্রতি তাকালেন। দু'জনের মাঝে তাৎণিক যেই দৃষ্টি বিনিময় হলো তাতেই যেন অচেনা ভাবটা কেটে গেল। দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে-এ ধরনের একটা ভাব পরিলতি হলো। অন্তরের ভাষায় যেন তাঁদের মাঝে ভাব বিনিময় হলো। মাওলানা এই প্রশ্নে কেমন যেন উদ্বেলিত হলেন। অপরদিকে শামস যিনি নিজেই পরে বলেছেন যে মাওলানার আকর্ষণে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সাধারণ প্রশ্ন এবং উত্তর পর্ব তাঁদের মাঝে বিনিময় হলো কিন্তু উভয়ের অন্তরেই ভীষণ প্রভাব পড়েছিলো।

মাওলানা বাসামুখী বাকি পথটা শামসের সাথেই অতিক্রম করলেন। তাঁকে নিজের সাথে বাসায় নিয়ে গেলেন।তার জন্যে যেন গায়েবি অতিথি এলো।যেই অতিথি তাঁকে পার্থিব জগতের মোহ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। শামসের সান্নিধ্যে মাওলানার জীবনের রং পাল্টে গেল। শামস মাওলানাকে শেখালেন নিজেকে পার্থিব জগতের সম্পর্ক থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করে নেয়,নিজেকে আল্লাহর অপরাপর বান্দার মতো একজন বান্দা হিসেবে যেন ভাবে এবং আল্লাহর হুকুমের কাছে যেন নিজেকে সমর্পন করে। শামসের সাথে সাক্ষাৎ মাওলানাকে আত্ম-অহম থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে একটা আকস্মিক ঘটনা হলেও মাওলানা যেন একটা নতুন জীবন লাভ করলেন। এই নতুন জীবন একজন পরহেযগারকে একজন আধ্যাত্মিক কবি এবং একজন প্রেমিক কবিতে পরিনত করলো।

শামসের সাথে একান্ত সান্নিধ্য মাওলানার নবজীবনের সূত্রপাত ঘটায়। এই একান্ত সান্নিধ্য না ছিল পরহেজগারীর আর না ছিল জ্ঞান ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক। এই একান্ত সান্নিধ্য ছিল আত্মিক। যা কিছু মাওলানাকে উর্ধ্বারোহনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছিল সেসব থেকে মুক্তি দান করেছিল। পরিচয়ের সূচনা থেকেই মাওলানা এবং শামসের একান্ত সান্নিধ্যে কোনোরকম বাধা বা প্রতিবন্ধকতা যেন না আসে সে জন্যে মাওলানা মাদ্রাসা এবং নিজের ঘরবাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। মাওলানার এক ছাত্র ছিলেন সালাউদ্দিন যারকুব নামে। এই ছাত্রটিও শামসকে দেখার পর থেকেই তাঁর প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মাওলানা সেই ছাত্রের বাসায় গিয়ে উঠলেন। তবে সেখানে মাওলানার পরিবারের লোকজনের যাওয়া-আসার অনুমতি ছিল। তবে শামসের আগমনে মাওলানার মুরিদদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও মাওলানার জন্যে শামস ছিলেন অজানা বিশ্বের এক খোলা জানালার মতো।

 

রুমীর গল্প-১১


পাঠক ! গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে তাব্রিযের বিশিষ্ট আরেফ শামসের সাথে পরিচয় এবং সাহচর্যের সুবাদে মাওলানা শিকতা এবং বাহাস ছেড়ে দিয়েছেন। শামসের সাথে সাক্ষাতের ফলে মাওলানার যেন পুনর্জন্ম ঘটেছে। তারি ধারাবাহিকতায় চলুন দেখা যাক আরো কী কী পরিবর্তন মাওলানার জীবনে এসেছে।
মাওলানা এখন শামসের অস্তিত্বের মাঝে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। তাঁকে যারা চিনতে পেরেছিলেন তাঁরা অধিকতর ভালোবাসতেন। যাঁরা শামসে তাব্রিযির অস্তিত্ব থেকে অর্থাৎ তাঁর শক্তিশালী মোহ বা আকর্ষণ থেকে নতুন ও গঠনমূলক কিছু একটা সৃষ্টি করতে চাইতেন তাঁরা তাঁকে ভালোবাসতেন। তাঁর মোহে তারা এমনভাবে বিমোহিত হতো যে তার জন্যে অন্য সবকিছু ভুলে যেত। মাওলানাও তাঁর খাতিরে ওয়াজ করা, শিক্ষকতা করা এবং নিজের যশ-খ্যাতি সবকিছু বিসর্জন দিলেন। এমনকি নিজের মান-মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বের বিষয়টি পর্যন্ত ভুলে গেলেন।
মাওলানা, শামসে তাব্রিযির অনুসারী হয়ে গেলেন। এমন অনুসারীই হলেন যে পৃথিবীর সবকিছু নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সকলের মায়া ত্যাগ করে শহর থেকে শহরে , পাহাড় থেকে পাহাড়ে শামসের পেছনে পেছনে ছুটতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। অন্য সবার চাইতে শামসের কথাবার্তাই তাঁর কাছে এই সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে মনে হতো। শামসের সান্নিধ্য মাওলানার পৃথিবীকে একেবারেই তছনছ করে দিয়েছে। শামস মাওলানাকে নিজের পৃথিবীতে নিয়ে এলেন, আর শামসের ভূবন ছিল আবেগময় এবং অনিয়মতান্ত্রিক এক পৃথিবী।
শামস,তাব্রিয থেকে কুনিয়া পর্যন্ত সফর করলেন। বহু শহর অতিক্রম করেছেন। বহু শহরে থেকেছেন। তাঁর সমকালীন মাশায়েখকে দেখেছেন। কিন্তু কোথাও তাঁর মন বসলো না। মন বসলো কেবল কুনিয়ায় মাওলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মাদকে পেয়ে। মৌলাভি শামসকে ভালোভাবে বুঝতে পারতেন,তাঁকে উপলব্ধি করতে পারতেন এবং তাঁর সাথে মনের মিল ছিল। মৌলানা শামসের আদর্শের ক্ষেত্রে নিজেকে একজন নবীন শিক্ষানবিশ মনে করতেন এবং তাঁর ইঙ্গিত ছাড়া তিনি কোনো কাজেই হাত দিতেন না। শামস চেয়েছিলেন পার্থিব এই নশ্বর জগতের সামান্য খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা থেকে উত্থিত অহম চেতনা থেকে মাওলানা জালালুদ্দিনকে মুক্ত রাখতে। কিন্তু এ পথে প্রতিবন্ধকতা ছিল ওয়াজ-নসীহত এবং শিক্ষাদান। এমনকি গ্রন্থপাঠ এবং তা নিয়ে গবেষণা করাটাও ছিল অন্তারাত্মার জগত নিয়ে ভাববার ক্ষেত্রে অন্তরায়। সেজন্যে শামস,মাওলানাকে এসব থেকে মুক্ত থাকতে বলতেন।
শামস মৌলাভিকে মরমীসঙ্গীত অর্থাৎ সামা শুনতে বলতেন। তিনি মনে করতেন মিউজিকের মাধ্যমে মানুষ অন্তরাত্মার জগতের সাথে এবং আধ্যাত্মিক জগতের সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি করতে পারে। শামসের বক্তব্য শোনার পর মাওলানা জ্ঞানচর্চা কিংবা শিকতা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। এমনকি বই-পুস্তক পড়ার মধ্যেও তিনি আর মজা খুঁজে পেতেন না। তাঁর এই আধ্যাত্মিক প্রশান্তির বিষয়টি অন্য কেউ বুঝতে পেত না কেবল সালাউদ্দিন পীর এবং হেসামুদ্দিন জাওয়ান ছাড়া। কখনো কখনো বাঁশির সুর শুনতেন আবার কখনো রবাব অর্থাৎ বেহালার সুরে মজে যেতেন।
শামস,মাওলানার সাথে আকার-ইঙ্গিতে কথা বলতেন। মুখের ভাষায় তিনি যা বলে বোঝাতে পারতেন না, তা তিনি চোখের ভাষায় মাওলানার কাছে প্রকাশ করতেন। কথা বলার মতো ধৈর্য যখন থাকতো না, তখন তিনি সামা সঙ্গীতের ভাষায় ভাব বিনিময় করতেন। মাওলানা আধ্যাত্মিক প্রশান্তিময় এইরকম একটি অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে শামসের কথা শুনতেন। এভাবে যেতে যেতে এক সময় শামসের কথা,শামসের বাণী,শামসের দৃষ্টি এককথায় শামসের সকল অবস্থাই মাওলানার কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে। শামসের কথার মাঝে মাওলানার নিকট অপর সবকিছুই যেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত,এমনকি তিনি নিজেই যেন হারিয়ে যেতেন। পৃথিবীর সকল বস্তুই যেন এ মুহূর্তগুলোতে মাওলানার চোখে শামসের রূপ ধারণ করতো।
এভাবে ৩ মাস বা তারচে সামান্য ক'দিন বেশি অতিক্রান্ত হবার পর আধ্যাত্মিক এই প্রশান্তিপূর্ণ অবস্থা থেকে মাওলানা যখন বেরিয়ে এলেন,তখন তাঁকে আর চেনাই যাচ্ছিলো না। তুলা ব্যবসায়ীদের মাদ্রাসা থেকে যেই মাওলানা ক'মাস আগেও বাসায় ফিরে যেতেন,সেই মাওলানার সাথে এখনকার মাওলানার কোনো মিল ছিল না। শামসের সান্নিধ্যে থেকে মাওলানা যেন নতুন করে জন্মগ্রহণ করেছেন। এমন অবস্থায় তিনি তাঁর ছাত্রদের মাঝে ফিরে যান। ছাত্ররা তাঁর অপেক্ষায় দিন গুণছিল। একান্ত মুহূর্তগুলো শেষ হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ সময় মাওলানা,শামসের সাথেই কথা বলে সময় কাটাতেন। তাঁর কাস আর অনুষ্ঠিত হলো না। তাঁর মুরিদরাও আর তাঁর কাছ থেকে পূর্বেকার মতো পীর সুলভ আচরণ পেলো না।
মাওলানার জলসা শেষ হয়ে গেল এবং শামসের জলসা শুরু হলো। মাওলানা নিজেই এখন শামসের জলসার একজন নিরব অথচ মনোযোগী শ্রোতা। মাওলানার আদেশে ভক্তরা এইসব বক্তব্য লিখে রাখতো বা রেকর্ড করে রাখতো। মাওলানা এখন তাঁর মুরিদদের মাঝে ফিরে এলেন ঠিকই,কিন্তু মুরিদদের পীর এখন আর মাওলানা থাকলেন না,শামস হয়ে গেলেন তাদের অনুসরণীয় শায়খ। মাওলানা একেবারে চুপ হয়ে গেলেন আর তাঁর ভাষা হয়ে উঠলো শামসের ভাষা। কিন্তু শামস প্রায়ই সোচ্চার এবং উদ্ধত কণ্ঠে কথা বলতেন যা মাওলানার মুরিদদের কাছে ছিল অসহনীয়। কিন্তু মাওলানা যেহেতু চুপচাপ থাকতেন,সেজন্যে মুরিদরা কিংবা ছাত্ররাও তাঁর সম্মানে চুপচাপ থাকতেন।
মাওলানার বেশিরভাগ মুরিদই শামসের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। কিন্তু মাওলানার সামনে তারা তা প্রকাশ করতো না। কিন্তু আড়ালে-আবডালে মাওলানাকে গালি দিত এমনকি মেরে ফেলার হুমকিও দিতো। এ রকম এক পরিস্থিতিতে শামসে তাব্রিযি মাওলানাকে কিছুই না জানিয়ে ৬৪৩ হিজরীর ২১ শাওয়ালে কুনিয়া ছেড়ে উধাও হয়ে যান। শামস কুনিয়া থেকে অজানা কোনো স্থানে চলে গেলেন। এই খবর শুনে মাওলানার ছাত্র এবং মুরিদরা এমনকি তাঁর বন্ধুরা খুশি হলো হলো। তারা ভাবলো মাওলানা বুঝি দুঃস্বপ্নের কঠিন জাল থেকে মুক্তি পেলো। যেই দুঃস্বপ্নের মোহ তাদেরকে তাদের মুর্শিদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে ১৪ টি মাস কষ্ট দিয়েছে। তারা এখন ভেবেছে যে শামস যেহেতু এখন আর এই শহরে নেই,ফলে মাওলানা তাঁর আগেকার কার্যক্রম অর্থাৎ কাস নেওয়া,ওয়াজ করা ইত্যাদি পুনরায় শুরু করবেন। কিন্তু ফলাফল হলো ঠিক তার উল্টো। মাওলানা শামসের উধাও হয়ে যাবার খবর শুনে যেন বজ্রাহত হলেন।
মাওলানা এমন একজনকে অনুভব করতেন যিনি হঠাৎ দিনের বেলায় সূর্যের হারিয়ে যাবার মতো উধাও হয়ে গেছেন এবং যাঁর অনুপস্থিতিতে মুহূর্তের মধ্যে তিনি জীবনের সকল আশা-প্রত্যাশা হারিয়েছেন, হারিয়েছেন মানসিক প্রশান্তি। শামসের সাথে তাঁর দূরত্ব তিনি একেবারেই সহ্য করতে পরছিলেন না। শামসই যেন ছিল তাঁর জীবনের সব। তাই হঠাৎ করে শামসের উধাও হয়ে যাবার ঘটনা মাওলানাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলেন। কারো সাথে তেমন একটা কথাবার্তা বলতেন না।


রুমীর গল্প-১২

পাঠক ! আমরা গত আসরে তাঁর জীবন গল্পের একটি ক্রান্তিলগ্নে এসে আলোচনা শেষ করেছিলাম। বলেছিলাম তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের পথপ্রদর্শক শামসে তাব্রিযি কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই কুনিয়া ছেড়ে উধাও হয়ে যান। এদিকে মৌলাভি নিঃসঙ্গ হয়ে যান। আমরা মৌলাভিকে নিঃসঙ্গ রেখেই গল্পের ছেদরেখা টেনেছিলাম। আজ তারি ধারাবাহিকতায় কথা বলার চেষ্টা করবো।
যেদিন শামস কুনিয়া থেকে উধাও হয়ে গেলেন,সেদিন থেকে মাওলানা মুরিদদের সাথে কথাবার্তা বলা কিংবা বহির্বিশ্বের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। বাসার ভেতরের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। কেরা খাতুন শামসের চলে যাবার ঘটনায় খুশি হয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন তাঁর চলে যাবার পর মাওলানা তার পূর্বেকার সেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসবেন। মাওলানার ছোটো ছেলে আলাউদ্দিন মোহাম্মাদও শামসের উধাও হয়ে যাবার ঘটনায় খুশি হয়েছিলো। আলাউদ্দিন এ সময় মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছিল। সে যে খুশি হয়েছিলো তা সে লুকিয়ে রাখে নি, প্রকাশ করেছিল। এ জন্যে মাওলানা আলাউদ্দিনের ওপর একটু মনোক্ষুন্ন ছিল। কিন্তু মাওলানার বড়ো ছেলে শামসের চলে যাবার ঘটনায় বাবার কষ্টের সমব্যথী হয়েছিল। সে তাই বাবার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছিল। তার কারণ হলো সেও বাবার মতোই শামসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলো।
এই ঘটনায় মাওলানা একেবারেই ভেঙ্গে পড়লেন এবং তাঁর জীবন থেকে শান্তির পায়রাটি উড়ে গিয়েছিলো। তাঁর মনোবেদনা কেবল বড়ো ছেলে সুলতান অলাদের কাছেই প্রকাশ করতেন। তাঁর নিকটজনদের মধ্যে কেবল সালাউদ্দিন পীর এবং হেসামুদ্দিন জওয়ানকেই তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি দিতেন। কারণ হলো এই দুই মনীষীও শামসের হঠাৎ উধাও হয়ে যাবার ঘটনায় ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ এই দিনগুলোতে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ মাওলানার জন্যে ছিলো প্রশান্তির একটা উৎস।
এই দিনগুলোতে ছাত্ররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাওলানার কাসের জন্যে বাড়ির দরোজায় দাঁড়িয়ে অপো করতো। কিন্তু ঘরের দরোজা কিছুতেই খুলতো না। তারা যখন শামসের চলে যাবার ঘটনায় মাওলানার মনোবেদনার বিষয়টি টের পেলো,তখন ভীষণ অনুতপ্ত হলো। তারা তাদের এই অনুতাপ এবং দুঃখের কথা মাওলানাকে চিঠি লিখে জানালো এবং মাওলানার কাছে মা প্রার্থনা করলো। সেইসাথে তারা শামসের প্রত্যাবর্তন এমনকি শামসকে খুঁজে বের করার প্রস্তুতির কথাও জানালো। মাওলানা তাদের আবেদনে সাড়া দিলেন। কিন্তু নিঃসঙ্গতা ভঙ্গ করলেন না। ঘরের দরোজাও খুললেন না। এভাবে দিনের পর দিন,সপ্তার পর সপ্তা কেটে গেল। মনোবেদনা আর নিঃসঙ্গ-নীরব অবস্থার পরিবর্তন ঘটলো না।
তাঁর আবেগময়তা দেখে বোঝা যেত যে তাঁর মনোবেদনা দূর করে প্রশান্তি এনে দেওয়ার উপায় ছিলো অবিলম্বে হারিয়ে যাওয়া শামসকে খুঁজে বের করা। কিন্তু শামস যে কোথায় হারালেন কোনো হদিসই পাওয়া যাচ্ছিলো না। শামস খাঁচা থেকে উড়ে গেছে,কোনো নাম-নিশানাও রেখে যায় নি। শেষ পর্যন্ত শামসের একটা ছোট্ট চিঠি এলো। ‘মাওলানাকে ব'লো,এই দুর্বল শুভ কামনায় রত আছে,অন্য কোনো সৃষ্টির সাথে নিজেকে মেলাবে না।' দামেশ্ক থেকে এক মুসসাফির এই চিঠিটা এনে মাওলানাকে দিয়েছিলো। চিঠি পড়ে মাওলানার অন্তরে শামসের সান্নিধ্যের আকুলতা জেগে উঠলো। কিন্তু বিচ্ছেদের কারণে তিনি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাই দামেশকে যাবার মতো অবস্থা তাঁর ছিল না। তাই পরপর কয়েকটি চিঠি লিখলেন শামসের উদ্দেশ্যে। চিঠিগুলো ছিল কাব্যিক,ছন্দোবদ্ধ।
কিন্তু চিঠি লিখে সময়ক্ষেপন করা আর তাঁর ভালো লাগছিল না। তিনি তাই তাঁর সমব্যথী বড়ো সন্তান সুলতান অলাদকে শামসের আসার পথখরচ দিয়ে সিরিয়ায় পাঠালেন। ছেলেকে বলে দিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে যেন তাঁকে কুনিয়ায় আসার জন্যে আমন্ত্রণ জানায়। সুলতান অলাদ তার বাবার বিশজন মুরিদকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ায় গেল। দামেশকে গিয়ে সুলতান অলাদ শামসের কাছে প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করে বাবার চিঠিটা দেয় এবং শামসকে বিনয়ের সাথে কুনিয়ায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। শামস আমন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং তাদের সাথে কুনিয়ার পথে পাড়ি জমায়। এই সফরে মাসখানেক সময় লেগে যায়। দীর্ঘ এই সময়টায় মাওলানা অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে অধৈর্য হয়ে পড়ে।
কুনিয়ায় শামসকে ভীষণ জাঁকজমকের সাথে স্বাগত জানানো হয়। মাওলানার বিশিষ্ট ছাত্ররা ছাড়াও সুফিরা,শহরের যুবকরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শামসকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে আসে। মাওলানা শামসকে পেয়ে পুণরায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে শুরু করে। মাওলানার শুভার্থীরা, ছাত্ররা সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। শামস এবং মাওলানা এখন যেন পরস্পরের মধ্যে বিলীন হয়ে যেতে লাগলেন। দুটি প্রাণ যেন একাত্ম হয়ে গেল।
শামস ছিল অবিবাহিত। যেহেতু প্রচুর ভ্রমণ করতেন সেহেতু বিবাহ করার মতো সময়-সুযোগও ছিল না তাঁর। মাওলানার পরিবারে কিমিয়া খাতুন নামে এক সুন্দরী মহিলা ছিল। শামস তাকে পছন্দ করলো এবং বিয়ে করলো। মাওলানা তার বাড়ির প্রবশ পথের পাশে একটি ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করলো। শামস কিমিয়াকে বিয়ে করার পর অনেকটা নম্র হয়ে গেলেন। কথাবার্তায় আগে যেরকম প্রিতা কিংবা রাগের ভাব ছিল,সেটা এখন কেটে গেল। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। কিমিয়া খাতুন হঠাৎ কী এক রোগে মারা গেল। তার দুঃখে শামস একরাতে পুনরায় উধাও হয়ে গেলেন। কাউকে না বলে না কয়ে এই যে উধাও হলেও,আর তাঁর হদিস পাওয়া যায় নি।
শামসের উধাও হবার ঘটনায় এবার কিন্তু মাওলানা আগের মতো ভেঙ্গে পড়লেন না। প্রথম প্রথম অনেকের কাছে শামসের খোঁজ-খবর নিতেন। এক সময় নিজেই চলে গেলেন সিরিয়ায়। কোথাও তাঁর কোনো সন্ধান পেলেন না। বুঝতে পারলেন,এবার আর শামস কুনিয়ায় ফিরবেন না। কিন্তু পরে যখন উপলব্ধি করলেন যে শামস তো বাইরে কোথাও যান নি,বরং তাঁর অন্তরেই বসবাস করছেন,তারপর থেকে আর কারো কাছে শামসের ব্যাপারে জানতে চান নি। তিনি শামসের অস্তিত্ব সবখানেই টের পেতেন এবং তাঁর চেহারা সবসময় মাওলানার সামনে ভাসতো। এ সময় তিনি যেসব গযল লিখলেন সেখানে শামসের নাম বারবার এসেছে। গযলে তিনি বিচ্ছেদ ব্যথায় কেঁদেছেন এবং তাঁর সান্নিধ্যের অনুভূতি বর্ণনা করেছেন।

রুমীর গল্প-১৩

পাঠক ! গত আসরে আমরা বলেছিলাম যে শামস তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর পুনরায় কুনিয়া থেকে উধাও হয়ে যান। তাঁর খোঁজে এবার স্বয়ং মাওলানাই গেলেন সিরিয়ায়। কিন্তু শামসের কোনো সন্ধান পেলেন না। দীর্ঘ এই বিচ্ছেদের পর মাওলানা এক সময় বুঝতে পারলেন যে বাইরের পৃথিবীতে তো শামসকে খোঁজা বৃথা,কেননা শামস তো তাঁর ভেতরেই বাস করছেন। এ পর্যন্ত এসে আমরা গল্পের পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম। আজকের আসরে তারি ধারাবাহিকতায় আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।
শামসের প্রেম ফিকাহশাস্ত্রবিদ মাওলানাকে কবি এবং আরেফে পরিনত করেছে। তাই পাঠদান অর্থাৎ শিকতা পেশায় ফিরে আসাটা তাঁর জন্যে কষ্টকর ছিল। তাই শিকতা এবং ওয়াজ করার দায়িত্বটা তিনি তাঁর ছেলে আলাউদ্দিন মোহাম্মাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শামসের অনুপস্থিতিতে মাওলানা অধিকাংশ সময় এখন তাঁর ছেলে সুলতান অলাদ এবং তাঁর নিকটজনদের মধ্যে সালাউদ্দিন যারকুব, হেসাম উদ্দিন চালাবির সাথেই কাটাতেন। এ সময় মাওলানার কাছে সালাউদ্দিন আর অশিক্ষিত একজন সাধারণ আরেফ থাকলেন না। বরং সালাউদ্দিন পীরের অস্তিত্বে তিনি শামসকে খুঁজে পেলেন।
মাওলানা তাঁর সন্তান এবং তাঁর ছাত্রদেরদেরকে বললেন তারা যেন সালাউদ্দিনকে তাদের শায়খ হিসেবে মেনে নেয় এবং তাঁর অনুসরণ করে। এভাবে সালাউদ্দিন দশ বছর তাঁর বন্ধু মাওলানার মুরশিদ ছিলেন এবং মাওলানার সাথে ‘দুই দেহ একপ্রাণ' হয়ে ছিলেন। ৬৫৭ হিজরীর মুহাররামে দীর্ঘ রোগভোগের পর সালাউদ্দিন যারকুব প্রাণত্যাগ করেন। এরপর ৫ বছর কেটে গেল। মাওলানা আর কাউকে সালাউদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত করলেন না। নিজেই ছাত্রদের দেখাশোনা করতেন। তবে তাঁর সদাসঙ্গী হিসেবে ছিলেন হেসাম উদ্দিন। হেসামের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যাবার কারণে মাওলানার ভক্তের সংখ্যাও একের পর এক বেড়ে যেতে লাগলো।
মাওলানা এখন ৫০ পেরিয়ে গেছেন। যৌবনের তপ্ত সূর্য ধীরে ধীরে শান্ত গৌধূলির দিকে যেতে লাগলো। তিনি এখন দিন শেষের কান্ত পাখির ঘরে ফেরা প্রশান্তির অন্বেষণে ব্যস্ত। কবি ও লেখক হেসাম উদ্দিন এখন তাঁর নিত্য সঙ্গী। তিনি মাওলানাকে পরামর্শ দিলেন আত্তার এবং সানাঈ'র মতো ছন্দোবদ্ধ মাসনাবি রচনায় যেন হাত দেন। মাওলানা এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং মাসনাবির শুরুতেই যে ১৮ টি পংক্তি সম্বলিত ‘নেইনামা' হেসাম উদ্দিনকে উৎসর্গ করেন সেগুলো হেসামুদ্দিনকে দেখান। নেইনামার প্রথম পংক্তিটি হলোঃ

বেশ্নু ইন নেই চুন শেকায়াত মিকুনাদ
আয যুদয়ী হ হেকায়াত মিকুনাদ
অর্থাৎ শোনো! বাঁশিটি যেন অভিযোগ করছে
বিচ্ছেদের কাহিনী সে বর্ণনা করছে।

হেসামুদ্দিন এই পংক্তিগুলো দেখে ভীষণ উদ্বেলিত হন এবং মাওলানাকে কবিতা লেখা চালিয়ে যেতে বলেন। মাওলানা ১৪ বছর ধরে মাসনাবি রচনা করেন। জীবনের অবসান পর্যন্ত তিনি এই লেখা অব্যাহত রাখেন। লেখার পাশাপাশি মাসনাবির আসর বসতো। অন্যান্য আসরও বসতো। সেখানে মাওলানা বক্তব্য রাখতেন। তাঁর এই সব বক্তব্যের সংকলনই হলো ফিহে মা ফীহে গ্রন্থটি। এইসব কাজে হেসামুদ্দিন মাওলানাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতেন। মাওলানা নিজেকে বাঁশির মতো ভাবতেন। বাঁশির যেমন ভেতরটা খালি,আর অন্য কেউ তার ভেতর ফুঁ দিলে বাঁশির সুরেলা ভাষা তৈরী হয়,তেমনি মাওলানার ভেতরটাও খালি। কেউ একজন তাঁর ভেতরে ফুঁ দিলেই কেবল তিনি ভাষা পান,সেই ভাষাই কাব্যাকারে লিখিত হয়।
মাওলানার সেই সুর সৃষ্টিকারী,ভাষা দানকারী সত্ত্বাটি হলো শামসে তাব্রিযি। কেননা এখনো তিনি শামসের মাঝেই বুঁদ হয়ে আছেন। রাত যায়,দিন যায়,মাওলানা লেখালেখিতেই পড়ে থাকেন। অনেক সময় মাওলানা বলতেন হেসামুদ্দিন এবং তাঁর সাথীরা লিখে রাখতেন। পরে সুযোগমতো মাওলানাকে শোনাতেন এবং মাওলানা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতেন। মাসনাবির প্রথম খণ্ড ২ বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। দ্বিতীয় খণ্ডের কাজ প্রথম খণ্ড শেষ হবার সাথেসাথেই শুরু করার কথা ছিল,কিন্তু শুরু করা হয়ে ওঠে নি,দেরী হয়ে গেল। ইতোমধ্যে মাওলানার প্রথম সন্তান বিশিষ্ট ফকীহ আলাউদ্দিন মারা গেল। হেসামুদ্দিনের স্ত্রীও মারা গেল। এভাবে বছর দুয়েক যাবার পর হেসামুদ্দিন ফিরে এলেন। পুনরায় আসর জমলো। মাসনাবির দ্বিতীয় খণ্ডের কাজও শুরু হলো। মাওলানার মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ৫ টি খণ্ডের লেখা জমা হয়ে গেল। মাত্র দশ বছর সময়ের মধ্যে এই পাঁচটি খণ্ডের কাজ সমাপ্ত হলো।
প্রায় প্রতি রাতেই মাসনাবির আসর বসতো। কিংবা ফীহে মা ফীহের বৈঠক বসতো। কিন্তু মাওলানার শরীর কেমন যেন ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি এসব আসরে আর বসতে পারছিলেন না। এগুলো তাই একরকম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো। একটা সময় মাওলানা নীরব হয়ে গেলেন। কথা বলার সামর্থ হারিয়ে ফেললেন। জলসা বা আসরগুলো বন্ধ হয়ে গেল। ভীষণ জ্বর ছিল শেষ দিকটায়। জ্বরের ভেতর তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। ঔষধ খেতেন না। তাঁর স্ত্রী কেরা খাতুন যখন আল্লাহর দরবারে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করতেন তিনি তখন বলতেন-‘কেন দীর্ঘায়ু চাচ্ছো,আমাদের ভেতরে কি ফেরাউন-নমরুদের অস্তিত্ব আছে?' এভাবে সপ্তাহ খানেক কষ্টের ভেতর কাটে মাওলানার। তাঁর ভক্তরা,পরিচিতরা,স্বজনরা,বন্ধু-বান্ধবরা সবাই মাওলানার জন্যে দোয়া করতে লাগলো।
কিন্তু মাওলানা সবাইকে খোদা হাফেজি করে হিজরী ৬৮২ সনের ৫ই জমাদিউস সানীতে পৃথিবীকে তিনি হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালেন। তাঁর মৃত্যুতে কুনিয়ায় শোকের ছায়া নেমে আসে। কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই ছায়া রোমের আকাশে বিরাজিত ছিল। কেবল মুসলমানরাই নন,ইহুদি , খ্রিষ্টানরাও তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় ব্যথিত হন।

রুমীর গল্প-১৪

পাঠক ! মৌলাভির মাসনাবির বয়স আট শ' বছর পেরিয়ে গেছে। আজো তার আলো পৃথিবীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূবনকে ভীষণভাবে আলোকিত করে যাচ্ছে। আমরা আজকের আসরে মৌলাভির এই বিখ্যাত গ্রন্থ মাসনাবি নিয়ে খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।
বহু গবেষক, মৌলাভির মাসনাবিকে একটা শিক্ষাপ্রদ ও নির্দেশনামূলক গ্রন্থ এবং মাওলানাকে এই গভীর চিন্তার বার্তাবাহী বলে মনে করেন। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের বহু মনীষী এমনকি ইকবাল লাহোরী আর হেগেলের মতো দার্শনিকগণও মাওলানার ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়েছিলেন। ইরানের বহু আরেফও মাসনাবির সূরা পান করেছেন এবং এই উদ্যানের আধ্যাত্মিক সুগন্ধি অনুভব করেছেন।
মাসনাবি সম্পর্কে এ পর্যন্ত বহু বই-পুস্তক লেখা হয়েছে। তারপরও এখনো উন্নত মানব চিন্তার সহায়ক না বলা বহু প্রসঙ্গ রয়ে গেছে। কেননা মাসনাবি হলো সমুদ্রতূল্য সীমাহীন বিস্তৃত একটি গ্রন্থ। সমুদ্রের সম্পদ যেমন অসমাপ্য তেমনি মাসনাবিরও। মাসনাবি সমুদ্রের রহস্যময় অতলে এখনো রয়েছে নতুন নতুন মুক্তা। রসিকমাত্রই সেখান থেকে যতো প্রয়োজন কুড়িয়ে নিতে পারবে। মৌলাভির রচনার প্রতি বর্তমান পাশ্চাত্যের অনুরক্তি তারই প্রমাণ বহন করছে।
মৌলাভির মাসনাবির একটা বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানব উন্নয়নের বা ওপরে ওঠার সিঁড়ির মতো। কেননা মৌলাভি মানব মুক্তির পেছনেই সদা সচেষ্ট ছিলেন। এই মুক্তি হলো ঐশীপ্রেমের পর্বতে পৌঁছানোর জন্যে খোদার সাথে চিরমিলনের অন্তরায় সকল সম্পর্ক থেকে মুক্তি। মাসনাবির পাঠক-শ্রোতাদেরকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। যেমন সাধারণ, বিশেষ এবং যারা ঐশী প্রেমের বিশেষ পথের পথিক। মাসনাবি বিশেষজ্ঞ মরহুম ডক্টর ফুরুযনফার বলেছেন- ‘মাওলানার শত বছর পরে তাঁর মাসনাবির বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থাদি লেখা হয়েছে ঠিকই,কিন্তু এসব গ্রন্থের বেশিরভাগই কেবল যে যন্ত্রণা বা কষ্টেরই উপশম, তা নয় বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে এইসব গ্রন্থ আশঙ্কাজনকভাবে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করেছে। প্রকৃতপক্ষে এই মৌলাভি ব্যাখ্যাকারীগণ মাওলানাকে চিনতেই পারেন নি।'
মৌলাভি তাঁর মাসনাভিতে ভীষণভাবে কোরআনের প্রভাবে প্রভাবিত। কোরআনে যেমন প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন গল্প-কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে, মাসনাভিতেও তেমনি মৌলাভি তাঁর বিভিন্ন চিন্তাদর্শ বর্ণনা প্রসঙ্গে গল্প-কথার আশ্রয় নিয়েছেন। মৌলাভি একজন মুসলমান হিসেবে কোরআন এবং ঐশী মতাদর্শগুলোর প্রতি ব্যাপকভাবে মনোনিবিষ্ট ছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে মৌলাভি কোরআনের অন্তত ২ হাজার ২০০ টি আয়াতের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন কিংবা বলা যায় কবিতার আঙ্গিকে মৌলাভি আসলে কোরআনের আয়াতেরই ব্যাখ্যা করেছেন।
তারমানে দাঁড়ায়,কবি জালালুদ্দিন রুমি কোরআনের এক তৃতীয়াংশ আয়াতই তাঁর মাসনাভিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবহার করেছেন। এ কারণেই হিজরী ত্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত মরমী কবি মরহুম হাজ্জ্ব মোল্লা হাদী সাবজেভরি মৌলাভির মাসনাভিকে কোরআনের তাফসীর এবং মৌলাভিকে কোরআনের একজন মুফাসসির বলে উল্লেখ করেছিলেন। যাই হোক,মাওলানা রুমির মাসনাভির একটি গল্প উল্লেখ করে আজকের আসর থেকে বিদায় নেবো আমরা। গল্পটি হলো :
চারটি দেশের চারজন শ্রমিক একই জায়গায় কাজ করতো। কিন্তু কেউ কারো ভাষা বুঝতো না। কেননা প্রত্যেক দেশেরই আলাদা আলাদা ভাষা ছিল। কেবল ভাষাগত দিক থেকেই নয় বরং বর্ণ এবং জাতিগত দিক থেকেও এদের একজন আরেকজন থেকে আলাদা ছিল। একজন ছিল পারস্য বা ইরানী, একজন ছিল আরব, অপরজন ছিল তুরস্কের আর বাকিজন ছিলো রোমান। একদিন তারা তাদের কাজকর্ম শেষ করে পারিশ্রমিক নিলো। সবাই মিলে একমত হলো যে তারা কিছু একটা কিনবে। কিন্তু কী কেনা যায় ? এ নিয়ে তাদের মাঝে চিন্তা ভাবনা চলছিলো। এমন সময় ইরানী শ্রমিক বললো :
ইরানী > এক কাজ করি। চলো আমরা আঙ্গুর কিনে খাই।
আরব লোকটি তখন বললো > না , তারচে বরং ভালো হয় আমরা যদি এনাব কিনি।
এমন সময় তাদের তুর্কী বন্ধু বাধ সাধলো। তুরস্কের ঐ শ্রমিক আগের দু' বন্ধুর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বললো > ওযোম খুবই মজার এবং সুস্বাদু একটি ফল। আমি ওযোম কেনার পক্ষপাতী।
বাকি থাকলো আর রোমান শ্রমিক। শেষ পর্যন্ত সে-ও অন্য সবার মত্ অগ্রাহ্য করে বললো > আমি এস্তাফিল খেতে চাই।
এভাবে কারো সাথে যখন কারো চাহিদার মিল হলো না,তখন তাদের মাঝে লেগে গেল ঝগড়া। কেউ কারো মত মেনে নিতে রাজি না। ভাবখানা এমন যে,প্রয়োজনে জান দেবো কিন্তু মতের ছাড় দেব না।
মাওলানা মনে করতেন যে, একে অপরের ভাষা না বোঝার কারণে এরা নিজেদের মাঝে যেভাবে ঝগড়া-ঝাটি শুরু করে দিয়েছে,সমাজে এদের মতো মানুষের অভাব নেই। অথচ তাদের মাঝে যদি এমন একজন ব্যক্তি থাকতো যিনি সবার ভাষাই বোঝেন,তিনি একটিমাত্র বাক্য ব্যবহার করেই তাদের মধ্যকার মতবিরোধ নিরসন করতে পারতেন। তিনি বলতে পারতেন,শান্ত হও তোমরা! তোমাদের প্রত্যেকের এক এক দেরহামই নিজ নিজ চাহিদা মেটানোর জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু তোমাদের সমস্যা হলো তোমরা একে অপরের ভাষা বোঝো না। তোমরা আসলে সবাই একটি অভিন্ন জিনিসই খেতে চাচ্ছো,যদিও একেকজন একেক নাম বলছো। তোমরা যেহেতু ঐ নামগুলোর সাথে পরিচিত নও সে জন্যেই তোমরা ঝগড়া করছো। কবি বলছেন-

চহেবে র্সেরীয়ে আযিযী সাদ যাবন
গার বোদি উন্ জ, বে দদি চোল্হে শন
বহুভাষাবিদ কেউ যদি থাকতো সেখানে
ঝগড়া তাদের মেটাতো ঠিক সেই ক্ষণে
তারপরও সে বললো,
পাস বেগোফতি উ ‘কেহ্ মান যিয়েন ইয়েক দেরাম
অরেযুয়ে জোমলেয়েতন র মি খারাম'........ইত্যাদি।

আমরা ফার্সি শে'রগুলো সব পড়লাম না। তবে সেগুলোর অর্থগুলো বলে দিচ্ছি। তাহলো,আমি তোমাদের এই একেকটি দেরহাম দিয়ে তোমাদের সবারই কাক্ষিত বস্তু কিনে দিতে পারি। তোমরা যদি তোমাদের মনকে কলুষমুক্ত করো তাহলে এই দেরহামগুলো দিয়ে একাধিক কাজ হতে পারে।
যেমন তোমাদের একেকটি মুদ্রা যোগ করলে হয় চার দেরহাম। তার মানে এই চার দেরহামের মালিক চার শত্রু মিলে একটি অভিন্ন সংঘ হতে পারে। আবার তোমরা যদি তোমাদের মধ্যকার ঝগড়াঝাটি বন্ধ করো,তাহলে আমি তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দিতে পারি। ছোট্ট কটি পংক্তি,অথচ কতো গভীর মাহাত্ম্য,কতো রহস্য,কতো বাস্তব সত্য লুকিয়ে আছে এতে। এভাবে তিনি অসংখ্য কাহিনী বর্ণনা করেছেন তাঁর মাসনাভিতে।

রুমির গল্প-১৫

পাঠক ! গত আসরে আমরা মাওলানা রুমির একটি গল্প শুনিয়ে আসরের পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম। আজো আমরা আপনাদের মনের ঘরের অতিথি হয়ে এসেছি বিশ্ব মরমী কবি রুমির জীবন-কর্ম ও চিন্তাধারা বিষয়ক নতুন আলোচনার উপঢৌকন নিয়ে। আশা করি আমাদের সাদরে বরণ করে নেবেন।
মাওলানা জালালুদ্দিনের মতো একজন মহান ব্যক্তিত্বের চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করার আগে জেনে নেওয়া দরকার তাঁর ‘মৌলাভি' হয়ে ওঠার রহস্য কথন। এমন কী পরিস্থিতি সামনে এসেছিল কিংবা এমন কী বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে ছিল,যার ফলে তিনি উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও আধ্যাত্মিকতার সমুদ্রকে ধারণ করতে পেরেছিলেন,আর এতো রত্ন, এতো মণি-মুক্তা তার মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। আট শ' বছর পর আজো তাঁর চিন্তাধারা থেকে তাঁর মাসনাবির সমৃদ্ধ রত্ন-ভাণ্ডার থেকে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। তাঁর এই খাঁটি-নির্ভেজাল চিন্তা-চেতনা থেকে অনাগত যুগের মানুষেরাও যে আজকের মতোই উপকৃত হবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মৌলাভি তাঁর আত্মপরিচয়ে বলেছেন-

هين بگو که ناطقه جو مي کنَد تا به قرني بعد ما آبي رسد
گرچه هر قرني سخن آري بود ليک گفت سالفان ياري بود

হিন্ বেগো কেহ্ নতেকে জু মিকানাদ ত' বে র্কানি বাদে ম অবি রেসাদ
র্গাচে হার র্কানি সোখান অ'রি বাভাদ লীক গোফ্ত স'লেফন ইয়রি বাভাদ

পংক্তি দুটির গদ্যানুবাদ হলো-‘তিনি এমন একটি নহর বা স্রোতোস্বিনী তৈরী করে দিয়ে যাচ্ছেন এবং এমন এক ধরনের পানি তাতে প্রবাহিত করে দিয়ে যাচ্ছেন,যা অনাগত কবিদেরকে তার তীরে বসতে আকৃষ্ট করবে এবং ঐ স্রোতোস্বিনীর জল পান করে তারা তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করবে।'
একদিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। মৌলাভি নিজেই বলেছিলেন ঘটনাটা। সেটা হলো-তিনি একদিন তাঁর এক বন্ধুর বাসায় গেলেন। বন্ধুর রুমে ঢুকেই দেখলেন বন্ধুটি মাসনাভির ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে। মাথার অর্ধেকটা মাসনাভির ওপর ঠেকানো। মৌলাভি ভীষণ রেগে গেলেন। বললেন-"এই গ্রন্থ সাধারণ কোনো গ্রন্থ নয় যে তুমি তার ওপর হেলান দেবে। এই গ্রন্থ একদিন সমগ্র বিশ্ব পর্যটন করবে।" মাওলানার ঐ ভবিষ্যতবাণী আজ অরে অরে যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন এটা তাঁর সততার কারণেই সম্ভব হয়েছে। কেউ বলছেন এটা শামসে তাব্রিযির সান্নিধ্যের কারণেই হয়েছে। এই রহস্য সন্ধানের উর্ধ্বে উঠে আমরা বরং তাঁর কবিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব এবং অসামান্যতায় মুগ্ধ হই,তাঁর মেধাবী রচনা থেকে যতো বেশি সম্ভব অর্জন করতে সচেষ্ট হই-সেটাই বেশী কল্যাণকর।
মৌলাভির রচনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর রচনা বা বক্তব্যের নতুনত্ব। তাঁর বক্তব্য কোনো পাঠক-শ্রোতাকেই কান্ত করতো না,কেননা তাঁর বক্তব্য সবসময়ই ছিল নতুন। মৌলাভি তাঁর এই ভাষাগত নতুনত্ব বা বিশেষত্বের ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। এ কারণেই তিনি নিজেকে ‘ঈদ' বলে অভিহিত করেছেন। ঈদ মানে হলো এমন দিন যেদিন বিশ্ববাসী নতুন জামাকাপড় পরে এবং নতুনত্ব আর অভিনবত্ব বিশ্বে একধরনের আমেজ তৈরী করে। মজার ব্যাপার হলো মৌলাভির কাব্য যতোবারই পড়া হোক না কেন প্রত্যেকবারই নতুন নতুন প্রতীয়মানার্থ খুঁজে পাওয়া যায়। বলাবাহুল্য এ ধরনের গ্রন্থ বিশ্বে খুবই বিরল।
পাঠক ! আসরের এ পর্যায়ে রয়েছে মাসনাভির একটি গল্প ।
বুভাদ শাহী দার যামনি পিশ আয ইন
মালেকে দুনিয়া বুদাশ ভা হাম মালেকে দ্বীন
এত্তেফাকান শাহ রুযি শোদ সাভর
ব খাওয়াস্সে খেশ আয বাহরে শেকর.......ইত্যাদি।
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এক বাদশা ছিল ভীষণ নামকরা। সে যেমন ছিল ধর্মের বাদশা তেমনি ছিল পৃথিবীরও বাদশা। তো বাদশা একদিন শিকারের উদ্দেশ্যে প্রাসাদ থেকে বেরুলো। পথিমধ্যে সুন্দরী এক চাকরানীকে দেখতে পেয়ে বাদশা মুগ্ধ হয়ে গেল। তাই সঙ্গীদেরকে বললো চাকরানীটিকে যেন তার জন্যে কিনে নেয় এবং প্রাসাদে নিয়ে যায়।
চুন খারিদ উ র ভা বারখোর্দর শোদ
অন কানিযাক আয কাযা' বিমর শোদ
অর্থাৎ চাকরানীটিকে যখন কিনে নিয়ে প্রাসাদে আনা হলো,তখন সে অসুস্থ হয়ে পড়লো। এদিকে বাদশা যে কিনা ঐ চাকরানীকে পছন্দ করেছিল,নিরুপায় হয়ে গেল।বহু ডাক্তার হেকিম আনা হলো। কিন্তু কোনো কাজ হলো না।
পাঠক,ফার্সি মূল পংক্তিগুলো বলতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন,তাই আমরা পংক্তিগুলোর অর্থ আপনাদের বলে দিচ্ছি।
গল্পকার অর্থাৎ মৌলাভির মতে ডাক্তারদের পেরেশানীর কারণ ছিলো এই,ডাক্তাররা নিজেদের জ্ঞান-গরীমায় এতো বেশি আস্থাশীল ছিলো যে,চিকিৎসার সময় অহংকার বা গর্বে অন্ধ হয়ে ‘ইনশাআল্লাহ' পরিভাষাটি পর্যন্ত বলতো না। অতএব আল্লাহও তাই মানুষের অসহায়ত্ব এবং দুর্বলতার বিষয়টি চিকিৎসকদের দেখিয়ে দিলেন। চিকিৎসকরা ঐ চাকরানীর চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হলো। বাদশা তাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। বাদশা দ্রুত নগ্ন পায়ে মসজিদে গিয়ে হাজির হলো। আল্লাহর দরবারে সিজদারত অবস্থায় বাদশা কাঁদতে লাগলো। তার কান্নায় সিজদার স্থান ভিজে গেল। কান্নাকাটি করে আল্লাহর দরবারে চাকরানীর সুস্থতা কামনা করলো। বাদশা যেহেতু আন্তরিকভাবে নিষ্কলুষ চিত্তে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন,আল্লাহর রহমতের সমুদ্র তরঙ্গায়িত হলো এবং বাদশার দোয়া কবুল হয়ে গেল।
বাদশা ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুম এসে গেল। ঘুমের ভেতর স্বপ্ন এলো। স্বপ্নের ভেতরে এলো এক বৃদ্ধ লোক। ঐ বৃদ্ধ বাদশার দিকে এগিয়ে আসছিল। বৃদ্ধ তাকে বললো যে তোমার প্রার্থনা কবুল হয়েছে। আগামীকাল এক নিপুণ ডাক্তার তোমার কাছে আসবে এবং চাকরানীর চিকিৎসা করবে। ঐ ডাক্তারের চিকিৎসার মধ্য দিয়ে চাকরানী সুস্থ হয়ে যাবে। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে বাদশা তার প্রাসাদে চলে যায় এবং ঐ বৃদ্ধের আগমনের অপোয় প্রাসাদের জানালা খুলে বিস্ময়ের সাথে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ দেখতে পায় আলোকোজ্জ্বল এক ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে আসছে। বাদশা স্বপ্নে দেখা সেই বৃদ্ধের পরিচয় জানার পর তাকে প্রাসাদে নিয়ে যায়।
বাদশা তার ঐশী ডাক্তারের সাথে আলাপ-আলোচনা করার পর তাঁর মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারলো এবং বলেই ফেললো-সত্যি কথা বলতে কী! আমার মাশুক বা প্রেমিকা তো আসলে তুমি,ঐ চাকরানী নয়। তুমি এসে আমাকে আমার অন্তরের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়েছো। কিন্তু পৃথিবীর সকল কিছুই যেহেতু কার্যকারণ শৃক্সলার অধীন,তাই চাকরানী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল,আর আমিও অস্থির হয়ে মসজিদে গিয়ে আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে গেলাম যাতে তুমি আমার জীবন মুক্তির জন্যে আসো। বাদশা এরপর ডাক্তারকে চাকরানীর কাছে নিয়ে গেল।
মৌলাভি এখানে যে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন তাহলো,আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা,নম্রতা এবং যথাযোগ্য শিষ্টাচার প্রদর্শন করা খুবই প্রয়োজন। বাদশা যদি আল্লাহর দরবারে সবিনয়ে সেজদা না দিতেন এবং সকৃতজ্ঞচিত্তে আল্লাহর সাহায্য কামনা না করতেন তাহলে আল্লাহ ঐ মহান ডাক্তারকে বাদশার কাছে প্রেরণ করতেন না।
সবশেষে মৌলাভির মূল মাসনাবির উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো আজকের আসর। কবি লিখেছেন-
আয খোদা জুয়িম তাওফিকে আদাব
বি আদাব মাহরুম মোন্দ আয লুৎফে রব
বি আদাব তানহা না খোদ র দশ্ত্ বাদ
বালকেহ অতাশ দার হামেয়ে অফক যাদ
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে শিষ্টাচারের তৌফিক চাচ্ছি। বেয়াদব বা শিষ্টাচার পরিপন্থীরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত। বেয়াদবরা কেবল নিজেদের জন্যেই বঞ্ছনাকে ডেকে আনে না,বরং আগুনের লেলিহান শিখার মতো তা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

রুমির গল্প-১৬

পাঠক ! আমরা বলেছিলাম যে মৌলাভি তাঁর বক্তব্য পাঠক-শ্রোতাদের মাঝে সংক্রমিত করার লক্ষ্যে কোরআনের মতো বিভিন্ন গল্প ও কাহিনীর আশ্রয় নিয়েছেন। গত আসরে আমরা সে রকমই একটি গল্প আপনাদেরকে শোনাবার চেষ্টা করেছি। অবশ্য সময়ের অভাবে গল্পটি অসমাপ্ত রেখেই শেষ করতে হয়েছিল আসর। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে সেই বাদশা এবং দাসীর গল্প, যেই দাসীর চিকিৎসার জন্যে ঐশী চিকিৎসক এসেছিলেন। ডাক্তারকে পাঠানো হয়েছিল দাসীর ঘরে। তারপর কী হলো সেই কাহিনীই আজকের আসরে শোনাবো আপনাদের।
দাসীকে যখন অহংকার মদমত্ত কোনো চিকিৎসকের চিকিৎসাতেই আরোগ্য লাভ করতে পারলো না,তখন বাদশা বিনয়ের সাথে আল্লাহর কাছে তার সুস্থতা কামনা করে সেজদা দিল। বাদশার সেজদা আল্লাহ কবুল করলেন এবং একজন ডাক্তারকে পাঠালেন। ডাক্তার বাদশার প্রাসাদে ঢোকার পর দাসীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলো। পরীক্ষা করে ডাক্তার বুঝতে পারলো দাসীর যে রোগ তা কোনো শারীরিক রোগ নয়,বরং তা হলো প্রেমরোগ। অর্থাৎ দাসীটি আসলে সামারকান্দের এক স্বর্ণকারের প্রেমে পড়েছে। ডাক্তার তাই দাসীটিকে বললো সে যেন তার এই গোপন বিষয়টি অন্য কাউকে না জানায়।
মৌলাভি গল্পের এ পর্যায়ে রহস্য গোপন রাখার উপকারিতা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন মানুষ যদি তাদের রহস্যগুলোকে অন্তরের গহীনে লুকিয়ে রাখে তাহলে দ্রুত তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়িত হয়। একটি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন,রহস্য হলো বিচি বা বীজের মতো। তাকে যদি কিছুদিন মাটির ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়,তাহলে তা অঙ্কুরিত হয়ে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এবং ধীরে ধীরে সবুজ উদ্যানে পরিণত হয়।
যাই হোক,ডাক্তারের কাছ থেকে একটা আশাবাদী সুসংবাদ শুনে বাদশার কেনা দাসীটি আনন্দিত হয়ে উঠলো। ডাক্তার রোগীর সাথে কথাবার্তা বলার পর বাদশার কাছে গেল। বাদশাকে দাসীর অবস্থা সম্পর্কে ধীরে ধীরে জানালো। বাদশা দাসীর ব্যাপারটি শুনে ডাক্তারকে বললো তিনি যেন এর একটা উপায় খুঁজে বের করেন। ডাক্তার বাদশাকে পরামর্শ দিলেন, সামারকান্দের ঐ স্বর্ণকারকে যেন সম্পদের লোভ-লালসা দেখিয়ে হলেও বাদশার দরবারে নিয়ে আসা হয়। বাদশা এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং তাঁর একটি বাহিনীকে স্বর্ণকারের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। স্বর্ণকার লোভ-লালসায় পড়ে গেল এবং নিজের শহর, নিজের পরিবার-পরিজনদের ছেড়ে বাদশাহর পাঠানো লোকজনের সাথে প্রাসাদে চলে এলো।
স্বর্ণকার যখন প্রাসাদে গিয়ে হাজির হলো বাদশা তখন আদেশ দিলো তাঁর স্বর্ণের সিন্দুক যেন স্বর্ণকারের সামনে খুলে দেওয়া হয় এবং বাদশা যা চাইবে তাই যেন বানিয়ে দেয়। স্বর্ণকার তো এদিক ওদিক না তাকিয়ে কাজে বসে গেল। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার দাসীটিকে স্বর্ণকারের কাছে নিয়ে আসতে বললো। বাদশাহ তাই করলো। স্বর্ণকার এবং বাদশাহর কেনা দাসীর সাক্ষাৎ ঘটলো।
এরপর ছয় মাস কেটে গেল। দাসীটি সুস্থ হয়ে উঠলো। তারপর ডাক্তার একটা সিরাপ বানালো। ঐ সিরাপটা স্বর্ণকারকে খেতে দিল। স্বর্ণকার সিরাপটি খাবার পর ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লো। তার চেহারার রং শরীরের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে-হলুদ হয়ে যেতে লাগলো। অসুস্থতার কারণে স্বর্ণকারের বাহ্যিক সৌন্দর্য যখন ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করলো,দাসীটির মনও তখন তার ওপর থেকে উঠে যেতে লাগলো। দাসীটি স্বর্ণকারের ব্যাপারে উৎসাহ হারিয়ে ফেললো। হ্যাঁ,বাহ্যিক বা পার্থিব প্রেমের পরিণাম এরকমই হয়। মৌলাভির ভাষায়ঃ
এশ্ক্হয়ী কেহ আয পেই রাঙ্গি বুদ
এশ্ক্ নাবুদ অকেবাতে নাঙ্গি বুদ
অর্থাৎ যে প্রেম রঙ্গীন ঘোরে বিভোর থাকে,সেই প্রেম তো প্রেম নয়। তাই তার পরিণাম হয় খুবই করুণ কিংবা দুঃখজনক।
মৌলাভির দৃষ্টিতে ঐশী যে ডাক্তার আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে সে আল্লাহর আদেশের আনুগত্য ও তা বাস্তবায়ন করেছেমাত্র। স্বর্ণকারের মৃত্যু কিন্তু কোনোরকম কলুষ কামনা ছিল না বরং আল্লাহরই ইচ্ছা ছিল। আর বাদশাহ তো আসলে কোনো রাজা বা শাসক ছিল না, সে ছিল মূলত একজন আধ্যাত্মিক পীরের খাঁটি মুরিদ যে কিনা পীরের আদেশ-নিষেধগুলো অরে অরে পালন করেছে।আর বাদশার কেনা দাসী সে তো মানবাত্মার রূপক যা মানুষকে বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং প্রতি মুহূর্তে মানুষকে এক ডোবা থেকে অপর পুকুরে নিক্ষেপ করে।

রুমির গল্প-১৭

পাঠক ! মাওলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মাদের জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণমূলক ধারাবাহিক এ আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা মৌলাভির বৃহৎ কাব্যগ্রন্থের বৈশিষ্ট্য এবং এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আজো আমরা সেই অভিন্ন বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
বিশিষ্ট মৌলাভি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর বদিউয যামান ফুরুযানফার মৌলানার গযল সম্পর্কে বলেছেনঃ "প্রকৃত কবিতা ও কথাসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো তা পাঠকের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে এবং পাঠককে কবিতার ভূবনে নিয়ে যাবে। মাওলানার কবিতায় এই বৈশিষ্ট্যটি ব্যাপক মাত্রায় পাওয়া যায়। তার মানে আমাদের অন্য কোনো কবির কবিতা পাঠকের ওপর এই পরিমাণ প্রভাব ফেলতে পারে না যতোটা মাওলানার কবিতা পাঠককে আকৃষ্ট করে।" প্রফেসর ফুরুযানফারের মতে মৌলাভির কবিতার স্বাতন্ত্র্য, সমৃদ্ধি ও সার্থকতার অন্যতম একটি কারণ হলো তাঁর কবিতার ছন্দ ও সুরের স্বাতন্ত্র্য। মৌলাভি যে মিউজিকের সাথে পরিচিত হয়েছেন তার কারণ ছিল মিউজিক হলো ছন্দের উৎসমূল। এই মিউজিক বোধ থাকার কারণেই মৌলাভির কবিতায় ছন্দ-বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় যা তাঁর সমসাময়িক কবিদের ক্ষেত্রে খুব একটা দেখা যায় না।
মৌলাভির কবিতা তাই ছন্দ-মাত্রা এবং কাব্য শিল্পের আঙ্গিকগত দিক থেকে মিউজিকের সাথে সু সমন্বিত। এ কারণেই যাঁরা তাঁর কবিতা পাঠ করেন অথবা গেয়ে বেড়ান কিংবা শোনেন,তাঁরা কবিতার আভ্যন্তরীণ সাঙ্গীতিক মূর্চ্ছনায় বিমুগ্ধ হয়ে যান। ডক্টর সিরুস শামিসার মতে সাঙ্গীতিক বিচারে মৌলাভির কবিতা খুবই সমৃদ্ধ। অন্যান্য কবিদের মাঝে এই বৈশিষ্ট্যটি ল্য করা যায় না কিংবা একেবারেই বিরলদৃষ্ট। বহু গবেষক এবং মৌলাভি বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন,মৌলাভি যদি তাঁর চিন্তাদর্শনকে কিংবা তাঁর অনুভূতিগুলোকে আবহমান কবিতার আঙ্গিকে প্রকাশ না-ও করতেন,তাহলেও তাঁর কবিতার অন্তরজুড়ে যে সাঙ্গীতিক তরঙ্গ প্রবহমান,তা মৌলাভির কবিতাকে যথার্থ সমাদৃতি এনে দিতো।
এর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক ডক্টর যাররিন কুব মৌলাভির তরঙ্গময় চিন্তাদর্শের প্রসঙ্গ টেনেছেন। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর ‘হালার কাফেলার সাথে' নামক গ্রন্থে লিখেছেন "তাঁর গযলে একটা বিশেষ ছন্দ ও সুর রয়েছে। সহজলভ্য ব্যাপারটি হলো পাঠকের কবিত্বসুলভ কোনো উদ্দেশ্য থাকে না বরং এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি হয় যে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে এবং নিজের কবিতাকেও। তবে সেখানে নয়,যেখানে তিনি চান যে তাঁর চিন্তা ভাবের পর্দা ভেদ করে বাইরে নিঃসরিত হয়ে কবিতা বা গযলের রঙ ধারণ করুক। চিন্তার তুফান কবির অস্তিত্বকেযখন গ্রাস করে তখন তো ছড়া বা অন্তমিলের তরঙ্গ দিয়ে তাকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কবি তখন তাঁর মতো সামনে অগ্রসর হয়ে যান,আর ছন্দ বা অন্ত্যমিলের বন্ধন কবির পেছনে ছোটে।" অর্থাৎ ছন্দ কবিতাকে অনুসরণ করে কবিতা নয়।
মাওলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মদের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সৃষ্টিশীলতা। তিনি ব্যাপক মাত্রায় শব্দের যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করেছেন। তিনি কবিতার আঙ্গিক কাঠামোর চলমান রীতির কোনোরকম অনুসরণ করেন নি। এমনকি নিজস্ব চিন্তা প্রকাশের স্বার্থে তিনি নতুন নতুন শব্দ বিশেষ করে বিশেষণবাচক শব্দ তৈরী করেছেন। ডক্টর ফুরুযানফারের এক গবেষণায় দেখা গেছে এ রকম অন্তত ৭৫ হাজার শব্দ মৌলাভির গযলে রয়েছে,যা তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার স্যা বহন করছে।ভাষার ক্ষেত্রেও মৌলাভি প্রচলিত ধারা ভেঙ্গেছেন। তিনি জনসাধারণের বোধগম্য বা সহজবোধ্য প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করেছেন নির্দ্ধিধায়। এর কারণ হিসেবে মৌলাভি বলেছেন,ভাষা হলো বোঝা বা বোঝানোর মাধ্যম। বোঝানো সম্ভব হলে ভুল-শুদ্ধ উপলব্ধি করা সহজ হয়।
বেবাস্তিয়ে চেশ্ম ইয়ানি ওয়াক্তে খ'ব আস্ত্
না খ'ব আস্ত্ ইন্ হারিফন র জাবব আস্ত্
অর্থাৎ-
চোখ বোঝার মানে হলো সময় হলো ঘুমের
ঘুম তো নয় ,মূলত এ বিপকে প্রতি-উত্তর
মৌলাভির কবিতার প্রতি গভীরভাবে তাকালে আমরা দেখতে পাবো যে তিনি প্রাচীন কাব্যরীতিকে পছন্দ করতেন না। তিনি তাই কোথাও প্রাচীন রীতি অনুসরণ করেন নি। আর এটাই তাঁর কবিতাকে নতুন বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছে। মৌলাভিকে মূলত কবিতায় নতুন মাত্রার সূচনাকারী বলা উচিত। তিনি তাঁর কবিতার মধ্যেও বহুবার এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
হিন সুখান / ত'যেহ বেগো / ত দো জাহন / তযেহ শাভাদ
ভ রাহাদ আয / হাদ্দে জাহন / বি হাদ্ অ আন্ / দ'যেহ শাভাদ

এমন নতুন কথা বলো যাতে সতেজ হয়ে ওঠে দোজাহান
পৃথিবীর সীমানা-মুক্ত হোক সব,হয়ে যাক পৃথিবী সীমাহীন

এভাবে মৌলাভির কবিতা বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাবো,তাঁর উপমার ভঙ্গি,বর্ণনা কৌশল-সবই নতুন এমনকি কখনো কখনো অদ্ভুত। তাই তাঁর কবিতার পাঠক ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়। তিনি তাঁর চারপাশের প্রকৃতি,প্রাকৃতিক পরিবর্তন যেমন ঋতুভেদ কিংবা জীবনের উত্থান-পতনের ঘটনাগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে কাব্যরূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এই শিল্পরূপের আড়ালে তাঁর মনে সবসময়ই মরমী চেতনা বা আধ্যাত্মিক বোধ কাজ করেছে। যাই হোক, মাসনাবির একটি গল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে আজকের আসরের পরিসমাপ্তি টানবো। গল্পটি হলোঃ

پيل اندر خانه اي تاريك بود
عرضه را آورده بودند آن هنود
از براي ديدنش مردم بسي
اندر آن ظلمت همي شد هر كسي

ভারতীয়রা একটা হাতীকে অন্ধকার একটা ঘরে দর্শণার্থীদের জন্যে রাখলো। যারা হাতী দেখতে এলো,তারা সবাই ঢুকলো ঐ অন্ধকার ঘরটিতে। হাতী যেহেতু কালো এবং ঘরও যেহেতু আঁধারে পূর্ণ,তাই হাতীকে কেউই দেখতে পেল না। সবাই হাতীর গায়ে হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো হাতী কেমন। সবাই হাতীর গায়ে হাত দিয়ে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো এবং মনে মনে হাতীর একটা অবয়ব বা রূপ আঁকার চেষ্টা করলো। মজার ব্যাপার হলো সবার মনেই হাতীর রূপটি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কারণ হাতীর দেহের যে অংশে যার হাত পড়েছে তার কাছে হাতি সেরকমই মনে হয়েছে।
যেমন হাতির পিঠে যার হাত পড়েছে, সে ভেবেছে হাতি তক্তার মতো। যে হাতির শুঁড়ে হাত দিয়েছে,তার কাছে মনে হয়েছে হাতি একটা পানি নিষ্কাশনের পাইপের মতো। যার হাত পড়েছে হাতির পায়ে,তার কাছে মনে হয়েছে হাতি একটা থামের মতো। তো যে যার মতো হাতীর বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু দর্শণার্থীদের কারো বক্তব্যেই হাতীর প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে নি। যদিও কারো বক্তব্যই ভুল ছিল না। মৌলাভি এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন,জ্ঞান-বুদ্ধি এবং প্রজ্ঞার আলো দিয়েই কেবল মূর্খতার আঁধার থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়।
মৌলাভির এই গল্পটি স্বয়ং মৌলাভির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কেননা মৌলাভির সাহিত্যের বিশাল হস্তীটিকে পরিপূর্ণভাবে কোনো সমালোচকের পক্ষেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব বলে মনে হয় না। তাই মৌলাভিকে যিনি যেভাবে বুঝেছেন তিনি সেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা মোটেও অযথার্থ নয়,যদিও বলতে হয় তা পরিপূর্ণ নয়। সে কারণেই অনাগত কালেও মৌলাভি চর্চা অবশ্যম্ভাবী।

রুমির গল্প-১৮

পাঠক ! গত আসরে আমরা মৌলাভির রচনার বিশালত্ব এবং সমৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে অন্ধকারে হাতী দেখার গল্পটি শুনিয়েছিলাম। গল্পটি মাসনাভি থেকেই নেওয়া হয়েছিল। নিশ্চয়ই আপনাদের ভালো লেগেছে। বলা হয়ে থাকে ২৫ হাজার পংক্তি বিশিষ্ট এই মাসনাভিটি মাওলানা লিখেছিলেন হেসাম উদ্দিন চালাবির অনুরোধে। মৌলাভির সমকালীন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক জনাব আফলাকি লিখেছেন, মৌলাভি অনুরূদ্ধ হবার আগে যেসব কবিতা লিখেছিলেন,সেগুলো চালাবিকে দেখিয়েছিলেন। এই পংক্তিগুলোই মৌলাভি তাঁর মাসনাভির শুরুতে গ্রন্থিত করেছেন। আমরা সেখান থেকে উদ্ধৃত করেই শুরু করছি আজকের আসর।

از نيستان تا مرا ببريده اند از نفيرم مرد و زن ناليده اند
سينه خواهم شرحه شرحه از فراق تا بگويم شرح درد اشتياق

অর্থাৎ
নীপবন থেকে যখন আলাদা করে দিলো আমায়
নারী-পুরুষ কেঁদেছিলো আমার বিচ্ছেদের কান্নায়
একটি ব চাই এমন, বিদীর্ণ যে বিরহ বেদনায়
আমার বিরহ যন্ত্রণা প্রকাশের উপযুক্ত সে হৃদয়

এই পংক্তিগুলো মৌলাভি তাঁর মাসনাভির শুরুতে স্থান দিয়েছেন। এগুলো লেখার পর মৌলাভিকে হেসামুদ্দিন চালাবি কবিতার লেখার কাজ চালিয়ে যাবার জন্যে অনবরত অনুরোধ করে যাচ্ছিলেন। মৌলাভিও এই অনুরোধে খানিকটা উদ্বুদ্ধ হন এবং কবিতা চর্চা চালিয়ে যান।

প্রতিরাতেই মৌলাভি কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেন। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে সূর্য ওঠা পর্যন্ত কবিতা লেখেন তিনি। তবে অনেক সময় এমন হতো মৌলাভি পংক্তিগুলো মুখে মুখে আওড়াতেন আর হেসাম উদ্দিন চালাবি খুব দ্রুততার সাথে লিখে ফেলতেন। লেখা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবার পর পুরো লেখাটা মৌলাভিকে চমৎকারভাবে আবৃত্তি করে শোনাতেন। এ কাজটি মৌলাভির জীবনাবসান পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। হেসাম উদ্দিন চালাবির সম্মানে মৌলাভি তাঁর মাসনাভিতেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। যেমনঃ


اي ضياء الحق حسام الدين تويي
كه گذشت از مه به نورت مثنوي
مثنوي را چون تو مبداء بوده اي
گر فزون گردد تو اش افزوده اي

হে জিয়াউল হক হেসামুদ্দিন তুমিই, তোমার জ্যোৎস্নায় আলোকিত মাসনাবি। তুমিই ছিলে মাসনাবির সূচনাকারী, মাসনাবির এই যে বিস্তৃতি তার পেছনে রয়েছো তুমি।
মৌলাভির মাসনাভি হলো একটা শিক্ষণীয় গ্রন্থ। এই গ্রন্থে সত্যে উপনীত হবার উপায়গুলো বাতলে দেওয়া হয়েছে। মাসনাভিতে মৌলাভি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন চরিত্র গঠনের নির্দেশনা দিতে।
একজন নেতা ও দিক-নির্দেশকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মৌলাভি তাঁর মাসনাভিতে চেষ্টা করেছেন পাঠককে তার নিজের বৃত্ত থেকে বের করে এনে নতুন মানুষে পরিণত করতে। সে কারণেই তিনি অত্যন্ত সচেতনতার সাথে নৈতিকতার আভ্যন্তরীণ রহস্যগুলোকে চমৎকারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং গল্পের ভঙ্গিতে, বিভিন্ন উদাহরণ ও উপমার মাধ্যমে পাঠককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। মৌলাভি তাঁর মাসনাভিতে মানব প্রশিণ ও আত্মসংশোধনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মৌলাভি যেসব কিসসা-কাহিনী বর্ণনা করেছেন মাসনাভিতে, সেগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ যদি কেউ উপলব্ধি করতে পারে তাহলে পরিশুদ্ধতা অর্জন করা সহজতর হবে,সেইসাথে মৌলাভির উন্নত চিন্তাদর্শের সাথে পরিচিতি লাভের পথ সুগম হবে।
মাসনাভি যদি গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়, তাহলে দেখা যাবে মৌলাভি তাঁর এই বিখ্যাত রচনায় যেসব উপাদান ব্যবহার করেছেন, তার মধ্যে কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন কাহিনী,নবী-রাসূলদের বহু ঘটনা,বহু হাদীস এবং জনসাধারণ্যে প্রচলিত বিভিন্ন উপকথাও রয়েছে। এগুলোকে তিনি তাঁর চিন্তা প্রকাশের বাহন হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। কিসসার অন্তরালে যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য লুকানো রয়েছে তা-ই মূলত তাঁর বক্তব্য বিষয়। উপকথার বর্ণনা থেকে অনুমিত হয় যে, মৌলাভি পাড়া-মহল্লার লোকজন এবং তাদের ভাষার সাথে পরিচিত ছিলেন,পরিচিত ছিলেন বাজারি লোকজনের সাথেও। এই লৌকিক গল্প বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি যেই ভাষা ব্যবহার করেছেন তা-ও ছিল জনসাধারণের ভাষা। যার ফলে সবাই তাঁর বক্তব্য বুঝতে পারতো সহজেই। এই বিষয়টি ছিল তৎকালীন কাব্য রচনা রীতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী একটি ঘটনা।
আসলে মাসনাভিকে বলা যেতে পারে এমন একটি আধ্যাত্মিক কাহিনী যার শুরু হয়েছে বাঁশির ভাষায় এবং কোথাও যার পরিসমাপ্তি নেই।তবে যেখানেই কোনো প্রসঙ্গ আসে বক্তার মনোযোগ তখন নতুন অর্থের সন্ধানে ধাবিত হয়। একটি গল্প শুনিয়ে আজকের আসরের পরিসমাপ্তি টানবো। গল্পটি হলোঃ
" এক ব্যবসায়ীর একটা তোতা পাখি ছিল। পাখিটিকে সে খাঁচায় পালতো। একদিন ঐ ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক কাজে গেল ভারতে। যাবার সময় বাসার সবাইকে জিজ্ঞেস করলো কার জন্যে কী উপহার আনবে। সবাই যার যার কাক্সিত জিনিসের কথা বললো। ব্যবসায়ীও সবার চাওয়াই গ্রহণ করলো।
ঐ ব্যবসায়ী তোতার কাছেও তার কাক্সিত বস্তুর কথা জানতে চাইলো যে ভারত সফর শেষে ফেরার পথে তার জন্যে কী উপহার আনবে। তোতা পাখিটি তখন বললোঃ কিছুই চাচ্ছি না,শুধু ভারতের তোতাদের জন্যে একটি বার্তা পাঠাতে চাই। বার্তাটি হলো প্রথমে আমার সালাম দেবে তাদেরকে। তারপর তাদেরকে বলো যে আমি তাদের সাথে দেকা করার জন্যে ব্যাকুল,কিন্তু খাঁচায় বন্দী থাকার কারণে তা হয়ে উঠছে না। অতীতের স্মৃতিগুলো মনে করে তারা যেন আমার কথা ভুলে না যায়। ব্যবসায়ী বার্তা পৌঁছাবে বলে তোতাকে আশ্বাস দিল। তারপর সে গেল ভারতে। একদিন বনে গিয়ে বেশ কিছু তোতাপাখি দেখতে পেল। তাদেরকে তোতার বার্তা পৌঁছালো। হঠাৎ তোতাদলের মধ্য থেকে একটি তোতা কাঁপতে কাঁপতে নীচে পড়ে মরে গেল। "

রুমির গল্প-১৯

পাঠক! গত আসরে আমরা মৌলাভির মাসনাভির একটি গল্পের অংশবিশেষ শুনিয়ে আসরের ইতি টেনেছিলাম। আশা করি আপনাদের মনে আছে। তারপরও সংক্ষেপে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। গল্পটি ছিল এমন-
ভারত সফরে যাবার সময় এক ব্যবসায়ী বাসার সকল সদস্যের পাশাপাশি তার পালিত তোতা পাখিটিকেও জিজ্ঞেস করেছিল,তার জন্যে কী আনবে। তোতা ধন্যবাদ জানিয়ে বললো ভারতীয় তোতাদেরকে যেন তার জীবনযাপন সম্পর্কে একটি বার্তা পৌঁছে দেয়। ব্যবসায়ী বনে গিয়ে যথারীতি বার্তাটি একদল তোতার কাছে বলতেই একটি তোতা কাঁপতে কাঁপতে নীচে পড়ে গিয়ে মরে গেল। এ পর্যন্ত আমরা গত আসরে শুনেছিলাম। আজ আমরা গল্পটির বাকি অংশ শুনিয়ে ভিন্ন আলোচনায় যাবো।

" ব্যবসায়ী ভারতীয় তোতাদের দলে বার্তাটি পৌঁছানোর পর একটি তোতা হঠাৎ কাঁপতে কাঁপতে নীচে পড়ে মরে গেল। এ অবস্থা দেখে ব্যবসায়ী ভীষণ অনুতাপ বোধ করলো। সে অনুশোচিত হলো এই ভেবে যে তার বার্তা শুনেই ঐ তোতা পাখিটি মারা গেল। অর্থাৎ সে-ই যেন ঐ তোতাটির মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিন্তু তার অনুতাপে কোনো কাজ হয় নি। ব্যবসায়ী এবার নিজ দেশে ফিরে গেল। নিজের পালিত তোতা পাখিটিকে সব ঘটনা খুলে বললো। পুরো ঘটনা শুনে তার তোতাটি এবার পাখা ঝাপটে পশম নাড়িয়ে মরার মতো খাঁচার ভেতরে পড়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ আর কোনোরকম নড়াচড়া করলো না।
এ অবস্থা দেখে ব্যবসায়ী হতবাক হয়ে গেল। একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল সে। তোতার মৃত্যুতে সে কান্নকাটি শুরু করে দিল। ব্যবসায়ী নিরুপায় হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত খাঁচার দুয়ার খুললো এবং তোতা পাখিটিকে খাঁচা থেকে বাইরে বের করে আনলো। এরপরই ঘটলো মজার ঘটনা। তোতা পাখিটি হঠাৎ পাখা ঝাপটিয়ে উড়ে চলে গেল। গিয়ে বসলো একটি গাছের শাখার ওপর। ব্যবসায়ী হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর তোতাকে বললো এই ঘটনার রহস্যটা তাকে ব্যাখ্যা করতে। তোতা পাখি বললো,ভারতীয় তোতা তার কাজের মাধ্যমে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, খাঁচা থেকে মুক্তি লাভের জন্যে কী করতে হবে! আর আমিও সে নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে মুক্ত করেছি।
মৌলাভি তাঁর মাসনাভিতে প্রয়োজনের তাগিদে বহু রুপক গল্প বলেছেন। ব্যবসায়ী এবং তোতা পাখির গল্পটিও সেরকম রূপক গল্পগুলোর একটি। এই গল্পে মূলত প্রাণের ভবিষ্যৎ বর্ণনা করা হয়েছে। যেই প্রাণ তার মূল উৎস থেকে পৃথক হয়ে পড়েছে এবং দেহের খাঁচায় বন্দী হয়ে গেছে। এই খাঁচাটি মৌলাভির তোতা পাখির গল্পে মানব দেহের সাদৃশ্য হিসেবে এসেছে,যার মাঝে বন্দী হয়ে রয়েছে আত্মা। মৌলাভি বিশ্বাস করতেন মুক্তি লাভ করা বা স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে পার্থিব জগতের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। আর ভারতীয় তোতাদের উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীর পালক তোতার বার্তাটি হলো স্বদেশের প্রতি প্রবাসী মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিক প্রেমের রূপক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হলে মৌলাভির গল্প আর স্থূল কোনো ঘটনা বা কাহিনীর মধ্যে সীমিত থাকে না,বরং হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিকতার মাহাত্ম্যপূর্ণ তাৎপর্যে উজ্জ্বল।
তোতা পাখি সামগ্রিকভাবে জীবনের রহস্যময়তার প্রতীক। তার গায়ের সবুজ রংও পার্থিব জগতের বসন্ত তথা প্রকৃতিরাজ্যে নবজীবনের সূচনার প্রকাশ। তোতাপাখির এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে মৌলাভির মাসনাভি পাঠকদের প্রায় সবাই মোটামুটি জ্ঞাত বা সচেতন।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে বা ব্যবহার করে মৌলাভি মানবাত্মাকে তোতার সাথে তুলনা করেছেন যা পৃথিবী বা দেহ-কারাগার থেকে মুক্তি লাভে তৎপর। তোতা এবং ব্যবসায়ীর গল্পটি পৃথিবী নামক কারাগারের সাথে আত্মার সম্পর্কের রহস্য আর মৌলাভি এই কারাগার থেকে মুক্তিকে নিজের থেকে মুক্ত হওয়াকে মনে করেন। তিনি মনে করেন,মানবাত্মা যতোণ পর্যন্ত পার্থিব জগতের প্রতি আকৃষ্ট থাকে,ততোক্ষণ সে দেহের উর্ধ্বে উঠতে পারে না,দেহের খাঁচার মধ্যেই সে বন্দী হয়ে থাকে। দেহের উর্ধ্বে সে-ই উঠতে পারে যে এই বন্দীদশা থেকে নিজেকে মুক্ত করে অবিনশ্বর জীবনের প্রতি আকর্ষণবোধ করে এবং তার নিজের সমগ্র অস্তিত্বজুড়ে কেবল এক আল্লাহকেই খুঁজে বেড়ায়। মৌলাভির মূল মাসনাভি থেকে উদ্ধৃতি শোনা যাক।


گفت طوطي/ كو به فعلم/ پند داد
كه رها كن/ لطف آواز و/ وداد
زآنكه آوا/ زت ترا در/ بند كرد
خويشتن مر/ ده پي اين/ پند كرد
در پناه/ لطف حق با/ يد گريخت
كو هزاران/ لطف بر ار/ واح ريخت


অর্থাৎ তোতা বললো,হিন্দুস্থানী তোতা কার্যত আমাকে উপদেশ দিলো যে যদি মুক্তি চাও তাহলে সুরেলা কণ্ঠের কথাবার্তা ত্যাগ করো। কেননা তোমার সুমধুর কণ্ঠই তোমাকে খাঁচায় বন্দী করেছে। এই বিষয়টা বোঝানোর জন্যেই তোতা মৃতের ভান করেছে। মানুষের বন্ধুত্ব বর্জন করে সেই আল্লাহর আশ্রয়ে আসা উচিত,যেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে ব্যাপক দয়ালু।"
তো অসমাপ্ত গল্পটির পরিসমাপ্তি টানা হলো এতোক্ষণ। আশা করি আপনাদের ভালো লেগেছে। মৌলাভির সমকালে সাধারণত হামদ-নাত দিয়ে কাব্যগ্রন্থ লেখা শুরু করা হতো। কিন্তু মৌলাভি এ ক্ষেত্রে নতুন ধারার সংযোজন করলেন। এক্ষেত্রে তিনি ফেরদৌসী,রুদাকি, আনসারী, খকনি, মানুচেহরী, সানাঈ, আত্তার কিংবা তাঁদের মতো অপরাপর কবিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ঢং-এ আধ্যাত্মিকতা সহযোগে প্রশংসার পংক্তিমালাগুলো রচনা করেছেন। তিনি অন্যান্য কবির মতো কেবল আকাশ-যমীনের প্রশংসা বা আল্লাহর সৃষ্টিরাজ্যের প্রশংসা করেন নি। বরং তাঁর এই বর্ণনার মধ্যেও ছিল সার্থক রূপকার্থের ব্যবহার। বাঁশির আর্তনাদ দিয়ে শুরু করে তিনি মূলত আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতার কষ্টের কথা বলে তাঁর প্রশংসাই করেছেন। তাঁর এইসব বর্ণনা কিন্তু হঠাৎ করে এসে যায় নি,বরং সবই ছিল সুচিন্তিত। তা নাহলে মাসনাভিতে অন্তত ২৮ বার এই বাঁশির উল্লেখ করা হতো না।
যাই হোক, মৌলাভির কবিতায় বাঁশির ব্যবহার নিয়ে বহু রকমের বিশ্লেষণ আছে। সেগুলো স্বল্প পরিসর এই আসরে বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া আসরের সময়ও শেষ হয়ে এসেছে। বিদায় নেবার পালা এখন। আগামী আসরে আবারো কথা হবে। তখনো আপনারা আমাদের সাথেই থাকবেন-এ প্রত্যাশা রইলো।


রুমির গল্প-২০


পাঠক ! জালালুদ্দীন মোহাম্মাদের জীবন ও কর্মভিত্তিক আলোচনার আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। মাসনাভির একটি গল্পের মধ্য দিয়ে শুরু করবো আজকের আসর। গল্পগুলো কেমন লাগছে আপনাদের জানালে খুশি হবো। আপনারা বিগত আসরগুলোতে যেসব গল্প শুনেছেন,তা থেকে একটি বিষয় নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে মৌলাভি সাধারণত সমাজে প্রচলিত গল্প-কাহিনী কিংবা কখনো কোরআনের কাহিনীই নিজের মতো করে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাঁর বর্ণিত গল্পগুলোর প্রতীয়মান অর্থ একেবারেই ভিন্ন। বিচিত্র দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পগুলোকে বিশ্লেষণ করা যায়। তাই একটু গভীরভাবে গল্পগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। আপনারা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো সহজভাবে সেগুলোকে তুলে ধরার।


ديد موسي/ يك شباني / را به راه
كو همي گفت/ اي گزيننده ، اله
تو كجاي/ تا شوم من/ چاكرت
چارقت دوزم كنم شانه سرت
دستكت بوسم بمالم پايكت
وقت خواب آيد برويم / جايكت

একদিন হযরত মূসা ( আ ) একটি মরুপ্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় এক রাখালকে দেখলেন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত দিতে। সে একেবারেই সাধারণ ভাষা এবং পরিভাষা ব্যবহার করে মোনাজাত করছিল। বলছিলো হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার বাসার ঠিকানাটাও দাও। আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। তোমার দুঃখ-কষ্টে আমি তোমার সমব্যথী হতে চাই। আমার সমগ্র জীবন আমার সকল সম্পদ তোমার জন্যে উৎসর্গীত। তুমি তো সেই সত্তা! আমার মেষগুলোর জন্যে যেসব গান গাই সেসব তো তোমারই জন্যে। রাখাল এভাবে তার অন্তরের কথাগুলো আল্লাহর দরবারে নিবেদন করছিল। মূসা ( আ ) এ ঘটনা দেখে রাখালকে বললো তুমি কার সাথে এভাবে কথা বলছো,কার কাছে তুমি তোমার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছো ?

রাখাল যুবক বললো-আমি এক আল্লাহর সাথে কথা বলছি। যিনি বিশ্বের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন। হযরত মূসা ( আ ) একথা শুনে রাখালকে ধমক দিয়ে বললেন : তুমি আল্লাহর সাথে যেভাবে কথা বলছিলে তা তো কুফুরির শামিল। এ ধরনের কুফুরি কথাবার্তা বন্ধ করে চুপ থাকো। তুমি যেসব প্রয়োজনীয়তার কথা বলছিলে,সেগুলো তো মানুষের জন্যে প্রয়োজন।ঘুমানো,দৈহিক কাঠামো,বাসা-বাড়ি এসব তো মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়,আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের তো এসবের প্রয়োজন নেই,তিনি তো এগুলোর অনেক উর্ধ্বে। তুমি যদি তোমার এ ধরনের কুফুরি কথাবার্তা বন্ধ না করো,তাহলে আল্লাহর গযব এসে পৃথিবীতে ধ্বংস করে দেবে। সতর্ক হও। তুমি মানুষের পার্থিব গুণাবলীকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর গুণাবলীর সাথে মিলিয়ে ফেলছো। অথচ আল্লাহ এইসব গুণাবলীর অনেক উর্ধ্বে অবস্থান করেন এবং তোমার সেবার প্রয়োজনীয়তা তাঁর নেই।


اين چه ژاژ است،اين چه كفر است و نثار
پنبه اي اندر دهان خود فشار
گر نبندي زين سخن تو حلق را
آتشي آيد بسوزد خلق را


এটা কী রকম নিরর্থকতা,এটা কী ধরনের কুফুরি
তোমার নিজের মুখে তুলা ঢুকিয়ে দাও
যদি এ ধরনের কথাবার্তা বলা থেকে
তোমার কণ্ঠনালীকে রোধ না করো
তাহলে আগুন এসে সৃষ্টিজগতকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে।

হযরত মূসা ঐ রাখাল যুবকের সাথে এরকম আরো অনেক কথাবার্তা বললেন এবং তাকে সতর্ক করে দিলেন। রাখাল যুবকের মনটা ভেঙ্গে গেল। সে খুবই কষ্ট পেল। মূসা ( আ ) এর কাছে সে তার অনুতাপের কথা জানালো। গভীর মনোবেদনায় সে তার জামা ছিঁড়ে ফেললো। ভীষণরকম আফসোস করতে করতে সে মরুপ্রান্তরে হেটে বেড়াতে লাগলো। এমন সময় মূসার ওপর আল্লাহর প থেকে ওহী নাযিল হলো :


وحي آمد سوي موسي از خدا
بنده ما را ز ما كردي جدا
تو براي وصل كردن آمدي
ني براي فصل كردن آمدي

হে মূসা! কেন তুমি আমার বান্দাকে রাগের সুরে কথা বলে ভয় পাইয়ে দিয়েছো। কেন তুমি তাকে আমাদের দয়া ও অনুগ্রহের ব্যাপারে হতাশ করেছো। আমরা তো কখনোই সৃষ্টিকূলের বাহ্যিক দিক দেখে বিচার করি না। বরং মানুষের ভেতরটাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ,কেননা ভেতরটাই হলো তাদের প্রেম-ভালোবাসা আর প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার চিত্ররূপ। হে মূসা ! যে দলটি আমাদেরকে ভালোবাসে,আমরা যাদের প্রিয় এবং কাম্য , তাদের অন্তরটা তো পোড়া,তারা প্রিয় বিরহে কাতর। তারা তাদের মতো করে আমাদেরকে যেবাবে চিনেছে বা বুঝেছে,সেভাবেই তারা আমাদেরকে ভালোবাসে। কাবা শরীফের ভেতরে ঢুকলে যেমন আর ডান-বামের পার্থক্য থাকে না,যে-কোনো দিকে ফিরেই নামায পড়া হোক না কেন,আমাদের দিকেই ফেরা হয়, তেমনি খালেস এবং প্রেমিক বান্দাদের জন্যেও এ ধরনের বিশেষ কিছু ব্যাপার। তারা যে ভাষায় বা যে শব্দসহযোগেই ইবাদাত করুক না কেন কিংবা তাদের মনের কথাগুলো প্রকাশ করুক না কেন, সে সবই পবিত্র এবং পছন্দনীয়।


ما برون را ننگريم و قال را
ما درون را بنگريم و حال را


অর্থাৎ
আমরা দেখি না বাইরের দিক,দেখি না তো কথা
আমরা দেখি ভেতরটা আর দেখি তার অবস্থা

মৌলাভি বলছেন : এই ঘটনার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এমন এক রহস্য মূসার হৃদয়ে দিয়ে দিলেন যেই রহস্যের কথা না আমি বলতে পারছি না শুনতে। আল্লাহর প থেকে এইসব কথা শোনার পর মূসা ঐ যুবক মেষ পালকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়ে গেল। তারপর তাকে বললোঃ


هيچ آدابي و ترتيبي مجو
هرچه مي خواهد دل تنگت بگو

কোনো রীতিনীতি বা আনুষ্ঠানিকতা খুঁজে কাজ নেই
তোমার বিরহী অন্তর যা-কিছুই বলতে চায়,বলো !

মূসা ( আ ) আরো বললেন,আল্লাহ তোমার ভালোবাসা,কান্নাকাটি আর রহস্যময় কথাবার্তাগুলো শুনেছেন। তোমার ভালোবাসা,তোমার ঈমান এবং তোমার একনিষ্ঠতায় তিনি খুশি। তুমি যেভাবেই আল্লাহর সাথে কথা বলতে চাও সেভাবেই কথা বলো। তুমি এখন আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী এবং তুমি সত্যে উপনীত হয়েছো। রাখাল জবাবে বললো,যা কিছু বলেছো সবই ঠিক আছে,কিন্তু কথাবার্তার জগত ছেড়ে এসেছি এবং আপাদমস্তক প্রেম-ভালোবাসার পথে প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়েছি। আমি এই ছোট্ট এবং নশ্বর পৃথিবীর উর্ধ্বে উঠে কেবল তাঁরই ধ্যানে মগ্ন রয়েছি।
এ গল্পটিতে যে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো,সত্যের অন্বেষণে কেউ যদি আন্তরিকতার সাথে,নিষ্ঠার সাথে মনোনিবেশ করে তাহলে বাহ্যিক কোনো নিয়ম-নীতির কাঠামো তার জন্যে অবশ্য পালনীয় নয়। একনিষ্ঠ অন্তর নিয়ে আল্লাহর সাথে সাদামাটা বা নিজের ভাষায় নিজের আশা-আকাক্সা বা চাওয়া-পাওয়ার কথা বলা যায়। সর্বোপরি কথা হলো পবিত্র ও খালেস অন্তরের মধ্য দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্য বা সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। প্রকৃত প্রেম নির্দিষ্ট স্থান বা সীমার উর্ধ্বে। প্রকৃতত প্রেমিক যারা তারা আল্লাহর ভালোবাসায় নিমজ্জিত। এ বিষয়টিই মৌলাভি তাঁর গল্পে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।#

 

 

১লা ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৯ সালের এই দিনে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রহঃ) দীর্ঘ ১৫ নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসেন । ইমামের আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে ইরানের লক্ষ লক্ষ জনতা রেজা শাহর সেনাবাহিনীর সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নানারকম ফুল দিয়ে ইমামকে বরণ করে নেন। ইমামের প্রতি শিশুকিশোর, তরুন-যুবক, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সর্বশ্রেণীর মানুষের ভালবাসার বাঁধভাঙ্গা জোয়ার দেখে রেজা শাহ ভয় পেয়ে আমেরিকায় পালিয়ে যায় এবং ১১ ই ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হয়।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। এ অনুষ্ঠানে আমরা ইরানে ইসলামী বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, ইমাম খোমেনীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব এবং বিপ্লবের পর ইরানের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি । এতে ইরান প্রবাসী একজন বাংলাদেশী বন্ধুও অংশ নিয়েছিল।

iconঅনুষ্ঠানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুন
কাস্পিয়ান সাগরের তীরে আলবোর্জ পাহাড়ের পাদদেশে এশিয়া মহাদেশের একটি সুন্দর দেশের নাম ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। এই দেশের একজন শাসকের নাম ছিল রেজা শাহ পাহলভী। রেজা শাহ্‌র পিতা ছিল রেজা খান। তারা দুজনই ব্রিটিশদের কথামত দেশ চালাতো। দেশের সম্পদকে তারা নিজেদের খেয়াল-খুশী মতো ভোগ করতো এবং বিদেশীদের দিয়ে দিতো। রেজা শাহ এমন কয়েকটি দেশকে, নিজ দেশের সম্পদ দিতো যারা ছিল, ইরান ও ইসলামের শত্রু। তাছাড়া শাহর আমলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছিল মদের দোকান। যুব সমাজের চরিত্র নষ্ট করার এমন কোন ব্যবস্থা ছিল না যা সে করে নি।
তবে এ অবস্থায়ও ইরানে একদল যোগ্য আলেম ছিলেন যারা মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং রেজা শাহ্‌র অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। যেসব আলেম শাহ সরকারের জুলুম নির্যাতন আর অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করতেন ইমাম খোমেনী ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্যতম ব্যক্তি। শাহ সরকার কিভাবে দেশের মানুষকে অত্যাচর করছে ও বিদেশীদের কথামতো দেশ চালাচ্ছে তিনি তার 'কাশফ উল আসরার' বা 'রহস্যের উদঘাটন' বইয়ে তা ফাঁস করে দেন। ইমামের এই বই প্রকাশের পর জনগন রেজা শাহ্‌র প্রতি ক্ষেপে যায় এবং ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।
১৯৬৩ সালে ইমাম খোমেনী (রহঃ) যখন কোমের ফায়জিয়া মাদ্রাসায় দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বক্তৃতা করেন, তখন শাহের সৈন্যরা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ইরানের জনগণ খুব ক্ষোভ প্রকাশ করে। জনতার মিছিলে রেজা শাহ্‌র সিংহাসন কেঁপে ওঠে। জনগণের বিক্ষোভকে দমন করার জন্য রেজা শাহ্‌র সৈন্যরা গুলি চালিয়ে শুধু তেহরানেই ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু এরপরও রেজা শাহ্‌র ভয় দুর হয় নি। সে ইমাম খোমেনীকে দেশ থেকে বের করে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠায়। তুরস্ক ছাড়াও তিনি ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসনে ছিলেন। নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ইমাম তার ছাত্রদের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে বাণী পাঠাতেন। একসময় দেশের আলেম সমাজ ও জনগণ প্রবল প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
জনতার আন্দোলন যখন ভয়াবহ রূপ নিল তখন ১৯৭৯ সালের ১ লা ফেব্রুয়ারি ইমাম খোমেনী ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ইমামের আসার কথা জানতে পেরে সরকার তাঁকে বিমানবন্দরেই হত্যার ষড়যন্ত্র করে। শুধু তাই নয়, ইমাম যাতে দেশে ফিরতে না পারে সেজন্য সরকার বিমানবন্দর বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। কিন্তু বিমান বন্দরের কর্মচারীরা সরকারের নির্দেশ অমান্য করে তাকে ইরানে অবতরণের সুযোগ করে দেয়।
বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইমামকে বরণ করার জন্য সেদিন প্রায় ৬০ লক্ষ নারী পুরুষ বিমানবন্দর এলাকায় উপস্থিত হয়েছিল ! সমবেত জনতার যে মানববন্ধন তৈরী হয়েছিল, সেটি ছিল প্রায় ৩৩ কিলোমিটার লম্বা! বিশ্বের ইতিহাসে অন্য কোন নেতা ইতিপুর্বে এতবড় সম্বর্ধনা পান নি।
ইমাম যখন ইরানে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন তেহরানের একটি দেয়ালে কাঁপা কাঁপা হাতে রক্ত দিয়ে একটি দেয়া লেখা ছিল 'স্বাগতম হে খোমেনী। ইমামকে স্বাগত জানাতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়ে শহীদ হবার পূর্বে একটি বালক ঐ কথাটি লিখে গিয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইরানের শিশু-কিশোররাও ইমামকে নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশী ভাল বাসতো। মুলত ইমামের দেশপ্রেম, জনগনের প্রতি ভালবাসা ও পরগেজগারীর কারণেই অসংখ্য মানুষ তাঁর জন্য জীবন দেয় এবং অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে।
ইমাম দেশে ফেরার ১০দিন পর অর্থাৎ ১১ই ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কমতে থাকে। স্কুল-কলেজ, পত্রপত্রিকা,রেডিও-টিভি,সিনেমা সবকিছুই ইসলামের আলোকে নতুন করে সাজানো হয়। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশ মাথা উচু করে দাঁড়ায়। কিন্তু যিনি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দেশের জন্য এতো কিছু করলেন, তাঁর অবস্থা যেমনটি ছিল তেমনই থেকে যায়। হ্যাঁ বন্ধুরা, আমরা বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনীর কথাই বলছি। বিপ্লবের পর দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হবার পরও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। বিষ্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তিনি তেহরানে দুকক্ষ বিশিষ্ট একটি একতলা বাড়ীতে বসবাস করতেন। আজও দেশী বিদেশী বিভিন্ন পর্যটক ইমামের ঐ বাড়ীটি স্বচক্ষে দেখার জন্য জামরানে ভিড় জমায়। ইমাম তেহরানে যে বাড়ীতে বাস করতেন সেটি দুকক্ষ বিশিষ্ট একতলা বাড়ী। বাড়ীর বড় রুমটির মাঝখানে পর্দা দিয়ে একপাশে ইমাম ও তাঁর স্ত্রী ঘুমাতেন। আর অপর পাশে কয়েকটি সাদা কভারের সোফা, কোরআন হাদিস রাখার কিছু তাক, একটি আয়না, একটি টেলিভিশন ও একটি রেডিও রাখা হতো। বাসার ছোট রুমটিতে তিনি মেহমানদের সাথে কথা বলতেন।
একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হয়েও ইমাম খোমেনীর সাধারণ জীবনযাপন ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। #

২১ শে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে মহান ভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই জীবন দিয়েছিলেন। তাদের এ আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে গিয়ে প্রতি বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয় মহান ভাষা শহীদ দিবস। আর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো একে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমরা রংধনু আসরে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রচার করেছি। পুর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানটি এখানে উপস্থাপন করা হলো :

icon অনুষ্ঠানটি শোনার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

বর্তমান বিশ্বের সাড়ে ৬০০ কোটি মানুষ প্রায় ৬হাজার ভাষায় কথা বলে। তবে ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ অতীতেও অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। একসময় পাশ্চাত্যের একটি বিখ্যাত ভাষা ছিল ' ল্যাটিন ' । কিন্তু এ ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি ভাষার নাম 'সংস্কৃত' । ধর্মীয় কাজের বাইরে এর কোন ব্যবহার নেই। মধ্যযুগে ব্রিটেনের একটি ভাষা ছিল ' কর্নিশ '। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একজন মহিলা জীবিত ছিলেন যিনি ঐ ভাষায় কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর ঐ ভাষাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায় ।
' The languages of the world ' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজারের মতো ভাষা আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ শ'তিনেক ভাষায় পৃথিবীর ৯৬ ভাগ মানুষ কথা বলে। বাকী সাড়ে পাঁচ হাজার ভাষার মধ্যে যেসব ভাষায় কথা বলার লোক এক লাখের বেশী নেই, সেগুলোর মধ্যে বেশকিছু ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এক হিসেবে দেখা গেছে, আজকের পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিষ্ময়ের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর প্রতিটিতে মাত্র একজন করে ব্যবহারকারী রয়েছে! এ চিত্র থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিশ্বের জীবন্ত ভাষাগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিলুপ্তির হার বন্যপ্রাণী কিংবা গাছপালা বিলুপ্তির হারের চেয়েও বেশী। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যায়।
বর্তমান বিশ্বের প্রায় ২৪ কোটি মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বিশ্বে বর্তমানে ৪র্থ তম। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলাই বিশ্বের একমাত্র ভাষা যা ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। বাংলা ভাষার গুরুত্ব এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে কবি ফররুখ আহমদ তার একুশের গানে লিখেছেন---
মধুর চেয়ে মধুর যে ভাই আমার দেশের ভাষা
এই ভাষাতে ফোটে আমার দুঃখ-দরদ আশা।
এই ভাষাতে পুঁথি-গাথা মারেফতী লিখি,
এই ভাষাতে ভাটিয়ালী ভাওয়াইয়া গান শিখি।
এই ভাষাতে মেটে আমার মনের পিয়াসা।।
এই ভাষাতে ফোটে রে ভাই সকল কান্না হাসি,
এই ভাষাতে দুঃখে-সুখে গাই যে বারমাসী,
এই ভাষাতে যায় রে ভাবের আঁধার কুয়াশা।।
পাক জমিনের মত আমার পাক বাংলার মান
না শুনিলে মাতৃভাষা মন করে আনচান,
মায়ের ভাষা শুনলে মনে না থাকে নৈরাশা।।

পাঠক! যেমনি আগেই বলেছি যে, ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতাকারী পাকিস্তানসহ জাতিসংঘের সবগুলো দেশ ওই প্রস্তাবকে সমর্থন করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।'
শুধু কি তাই ? আমাদের আরো গৌরব ও মর্যাদার কথা হলো আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সেদেশের জনগণ বাংলাভাষা শিক্ষা করছে। জাপান ও অষ্ট্রেলিয়ায় নির্মিত হয়েছে শহীদ মিনার। জাতিসংঘের অনেক সংস্থার কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষা শিখতে হচ্ছে।

বর্তমান প্রচার মাধ্যম রেডিও, টেলিভিশন, ও ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, জার্মানী, চীন, রাশিয়া, ইরান, সৌদিআরব, পাকিস্তান, ফিলিপাইন,জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে প্রতিদিনই বাংলা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়ে থাকে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সেদিন খুব দুরে নয়, যেদিন বাংলা একটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ভাষার রূপ পাবে। তাই এ ভাষার মর্যাদা আরো উচ্চকিত করতে হলে আমাদের সবাইকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে হবে এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রয়োজনে সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার করতে হবে। আর তাহলেই ৫২-র ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

আমরা সবাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবো এবং অন্তত একজন নিরক্ষর লোককে বাংলা ভাষার অক্ষর জ্ঞান দান করবো - এই হোক এবারের মাতৃভাষা দিবসের শপথ হোক ।