এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শিল্প ও সাহিত্য
শনিবার, 28 ফেব্রুয়ারী 2015 17:58

রাজার অসুখ

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছ তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছ ভালো ও সুস্থ আছ। সপ্তাহ ঘুরে আবারো হাজির হলাম রংধনুর আসর সাজিয়ে। আজকের আসরে আমরা দুটো গল্প শোনাব। গল্প দুটি পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক বিএম বরকতুল্লাহ। আর গল্প শেষে থাকবে ময়মনসিংহ শহরের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে সরাসরি গল্প শোনা যাক। আসরের প্রথম গল্পটির শিরোনাম 'রাজার অসুখ'।

 

একবার এক রাজার ভীষণ অসুখ হল। তাবিজ-কবচ, ওঝা-বৈদ্য, ডাক্তার-কবিরাজ সব করা হয়েছে কিন্তু রোগ সারে না। সারাদিন চুপচাপ বসে থেকে সময় কাটে নিঃসন্তান রাজার।

একদিন কোতোয়াল এসে রাজাকে বলল- মহামান্য রাজা, লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না, আপনার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে বোধ হয়। আপনি বরং চিকিৎসা-টিকিৎসা বাদ দিয়ে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য একমনে ইবাদত-বন্দেগী করুন। বাকি দিনগুলো আরামে কাটুক।

রাজা বললেন, আচ্ছা।

মন্ত্রী এলেন রাজার ঘরে। কুর্ণিশ করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, রাজামশাই! আপনার অসুস্থতার কথা শুনে রাজ্যটাও কেমন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সুখ চলে যাচ্ছে প্রজাদের মন থেকে। এখন রাজ্যটা শাসন করবে কে? প্রজারা বলছে এভাবে আর কতদিন? এর একটা বিহিত করলে হয় না রাজামশাই? এ ব্যাপারে আপনার সামান্য ইশারা পেলেই...

রাজা বললেন, আচ্ছা।

তারপর এলেন সেনাপতি। তিনি রাজাকে কুর্ণিশ না করেই বললেন, হে দুঃখিত রাজা, আপনি যদি অসুখে-বিসুখে ক্লান্ত হয়ে এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকেন, তাহলে রাজ্যটা চলে কীভাবে? আপনার সুস্থতার জন্য সব চেষ্টাই তো করা হলো। আপনি সুস্থ হবেন এমন কোনো লক্ষণ দেখছি না। দিনে দিনে প্রজাদের মন ভেঙে যাচ্ছে। রাজ্যে যেকোনো সময় নানা অশান্তি আর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যেতে পারে। পরে প্রজাদের সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আপনি জীবিত থেকেও মৃত। রাজ্যের কল্যাণে নতুন রাজার নাম ঘোষণা করা দরকার। আপনি সম্মতি দিলেই আমরা এগুতে পারি।

রাজা বললেন, আচ্ছা।

 

ঢোল-কাঁড়ায় বাড়ি পড়ল। তুড়ি-ভেরি, শঙ্খ-শিঙা বেজে উঠল। রাজবাড়িতে শুরু হয়ে গেল রাজাবদলের উৎসব। নতুন রাজার নাম ঘোষণা করা হবে। রাজদরবারে বইছে আনন্দের জোয়ার।

রাজামশাই জানালা ফাঁক করে দেখছেন ওসব। রাজা চিন্তিত মনে পায়চারি করছেন। তার আশেপাশে কেউ নেই। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা।

এরইমধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে গেল। প্রজারা রাজবাড়ির সামনে এসে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। তাদের কান্নায় রাজবাড়ির আনন্দে টান পড়ল। সবাই প্রচণ্ড বিরক্তবোধ করল। কোতোয়াল কয়েকজন সিপাই নিয়ে কান্নারত প্রজাদের সামনে গিয়ে ধমক দিয়ে বলল, এই, কী চাস তোরা? কী হয়েছে তোদের? জানস না এখানে রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন চলছে?

 

প্রজারা বলল, না, না, না আমাদের প্রিয় রাজাকে কিছুতেই বদল করা চলবে না। বন্ধ করুন উৎসব। নতুন রাজা চাই না আমরা। আমাদের মহান রাজা যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন তিনিই থাকবেন আমাদের রাজ্যের রাজা। আমাদের গায়ে এক ফোঁটা রক্ত থাকতে এই মহান রাজাকে বদল করতে দেব না।

 

কোতোয়াল রাগে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে গিয়ে মন্ত্রী ও সেনাপতিকে প্রজাদের কথা বলল। তারা রাগে আগুন হয়ে কড়া নির্দেশ দিল কোতোয়ালকে। সে সিপাইদের নিয়ে কান্নারত প্রজাদের ধরে প্রচণ্ড মারধর করতে লাগল। তবুও প্রজারা তাদের দাবি ত্যাগ করল না। সেনাপতির নির্দেশে কোতোয়াল তাদের গাছের সাথে বেধে চাবুক মেরে রক্তাক্ত করে ফেলল। প্রজারা বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইল।

 

রাজা জানালার ফাঁক দিয়ে সবই দেখছিলেন। আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি গর্জে উঠলেন এবং দ্রুত নিচে এসে ধমকের সুরে বললেন, কী হচ্ছে এসব, প্রজাদের গায়ের রক্ত ঝরিয়ে রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন চলছে বুঝি?

রাজার অগ্নিমূর্তি দেখে সবাই ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল এবং ছেড়ে দিল প্রজাদের।

 

রক্তাক্ত প্রজারা রাজাকে কুর্ণিশ করে বলল, হে মহান রাজা, আমরা আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আমরা আপনার ন্যায়শাসনের বদলে এই নিষ্ঠুর মানুষের দুঃশাসন চাই না। ওরা রাজ্যে অশান্তি সৃষ্টি করবে। আমরা মনে-প্রাণে আপনার সুস্থতার জন্য দোয়া করছি। আপনি দয়া করে আমাদের ত্যাগ করবেন না রাজামশাই!

 

রাজা বললেন, আমি অসুস্থ নই। বহুদিনের পুরনো ও বিশ্বস্ত রাজকর্মচারিদের পরীক্ষা করার জন্য আমি অসুস্থতার ভান করেছি। আমি যাদের বিশ্বাস করে রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছি-এতদিনে তাদের মধ্যে ভয়ংকর লোভ জেগে উঠেছে। তাদের পরীক্ষা হয়ে গেল। সেই সাথে আমার প্রতি প্রজাদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার পরীক্ষাটাও হয়ে গেল।

 

এই বলে রাজা লোভী রাজকর্মচারিদের বন্দী করে তাদের পরিবর্তে প্রজাদের নিয়োগ করলেন। কেউ মন্ত্রী, কেউ সেনাপতি, কেউবা কোতোয়াল-সিপাই পদে অধিষ্ঠিত হলো। রাজা বদলের আনন্দ-আয়োজন-অকৃতজ্ঞ কর্মচারি পরিবর্তনের উৎসবে পরিণত হলো।

 

 

বন্ধুরা, লোভের পরিণতির পর এবার আমরা অহংকার সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। এ গল্পটিও লিখেছে কথাসাহিত্যিক বিএম বরকতুল্লাহ। গল্পটির নাম 'টুই-টুই আর পিক-পিক'। তাহলে গল্পটি শোনা যাক-

 

এক বনে টুই-টুই নামে একটি পাখি একাকি বাস করত।  একদিন অন্য একটি পাখিকে দেখে সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল। সে মনে মনে বলল, ‘পাখিটা মনে হয় আমার মতই একা। আমি যাই না কেন তার কাছে।’ সে পাখিটার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘ভাই পিক-পিক তোমার কি মন খারাপ, নাকি আমার মতো একা তুমি?’

 

চিন্তিত মুখে পিক-পিক পাখিটি বলল: ‘পথ হারিয়ে এই বনে এসে পড়েছি, এখানে কোনো পাখি দেখছি না, আমি খুবই একা। কিছুই ভালো লাগছে না আমার, বিরান ভূমির মতো লাগছে বনটা।’

 

হাসিমুখে টুই টুই বলল: ‘আমিও তো তোমার মতই একা! তোমাকে পেয়ে আমার মন ভালো হয়ে গেছে। আমরা দু’জনে মিলে মিশে খুব থাকতে পারব এই বনে। কী বলো পিক-পিক?’ ’মিলেমিশে থাকতে পারব মানে? তুমি এক জাতের পাখি আর আমি আরেক জাতের পাখি,’ বলল পিক-পিক। ‘দুই জাতের দুটি পাখি কি এক সাথে মিলেমিশে থাকতে পারে? এটাও কি সম্ভব?’

টুই-টুই বলল ’কেন সম্ভব নয়। হতে পারে আমরা দুই জন দুই জাতের পাখি,

পিক-পিক: তাতে কী,’

টুই-টুই: ‘এখানে আছে অনেক বিষাক্ত সাপ আর হিংস্র পশু। একা থাকা মানেই তো নিজেকে বিপদ আর কষ্টের মাঝে ঠেলে দেওয়া। আর মিলেমিশে থাকা মানে আনন্দে আর নিরাপদে থাকা। আমরা তো চমৎকার বন্ধু হতে পারি, কী বলো পিক-পিক?’

পিক-পিক: ‘বন্ধু!’ তুমি দেখতে আমার চেয়ে অনেক সুন্দর। তোমার গায়ের রং, পাখা, ঠোঁট, পা ও পুচ্ছ যেমন রঙ্গীন তেমন সুন্দর। দেখো, তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার মতো কোন রং নেই আমার।’ 

টুই-টুই: ‘মিলেমিশে থাকার জন্য বাইরের রং কোনো বাধা নয়। মনের রংটাই হলো আসল। আমরা পাখি, ব্যস এটাই বড় কথা। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। তর্ক না করে চলো পেট ঠাণ্ডা করি আগে। তারপর অন্য কথা।’

 

পিক-পিক কোনো জবাব না করে টুই-টুই পাখির পিছু পিছু উড়ে চলে গেল খাবারের সন্ধানে।

 

টুই-টুই পাখির সাথে পিক-পিক পাখির খাতির হয়ে গেল। তারা সারাদিন এক সাথে থাকে আর গল্প করে। আনন্দে ছুটোছুটি করে। গাছের মগডালে খুব সুন্দর বাসা বানিয়েছে তারা। কিছুদিন পর ডিম পেড়েছে পিক-পিক। ডিম ফুটে ফুটফুটে দুটি বাচ্চা বেরিয়ে এলো। আনন্দের আর সীমা নেই। তাদের মনে হলো গোটা বনটাই একটা আনন্দভূমি।

 

কিছুদিন পরে অসংখ্য পাখি এসেছে বনে। পাখিদের দলে টুই-টুই আর পিক-পিক জাতের অনেক পাখিও রয়েছে। ওরা বাসা বেধেছে। সারাদিন বনে ঘুরে বেড়ায়, খাবার খায় আর সন্ধ্যা হলেই তারা ফিরে যায় নিজ নিজ বাসায়। পাখিদের কলরবে বন উতাল।

 

একদিন টুই-টুই পাখিকে তার জাতের পাখিরা বলে, ‘জাতপাত বলতে কিচ্ছু মানো না তুমি? পিক-পিকের মতো অসুন্দর ও অন্যজাতের একটা পাখির সঙ্গে কি তোমার বন্ধুত্ব হতে পারে? আমাদের রূপের সঙ্গে তাদের কোনো তুলনা হয়, ছিঃ টুই টুই ছিঃ।’

টুই-টুই: ‘এত ছিঃ ছিঃ করছ কেন? আমরা পাখি। এটাই তো বড় পরিচয়।আর আমাদের মিলেমিশে থাকার পেছনে সেই পরিচয়টাই বেছে নিয়েছি আমরা। আমাদের মনে কোনো দুঃখ নেই। দেখতেই পাচ্ছ আমরা কত ভালো আছি।’

 

অন্য পাখি: টুই-টুই আমাদের চেয়ে সুন্দর পাখি বলে তাদের বড় অহংকার। কদিন পরেই না তোমাকে ঘৃণাভরে তাড়িয়ে দিবে টুই-টুই। এটা কি আমাদের জন্য অপমানের বিষয়  না?’

পিক পিক: ‘এই গভীর বনে ভয়ংকর বিপদে আমরা জাতপাত ভুলে নিজেদের শুধু পাখি ভেবেছি। আমাদের এখন কোনো কষ্ট নেই। দেখতেই পাচ্ছ, কত সুখে আছি আমরা।’  

 

টুই-টুই আর পিক-পিকের মুখে এই কথা শুনে তাদের দলের পাখিদের খুব রাগ করার কথা। কিন্তু রাগ করল না কেউ। দলের এক বুড়ো পাখি আফসোস করে বলে, ‘আমরা ওই দুই জাতের দুটি পাখির মতো সুখী হতে পারি যদি না আমরা 'জাত আর রং' ভুলে নিজেদের শুধু পাখি ভাবতে পারি।’

বুড়ো পাখির কথায় সবাই খুশি হয়ে গেল। দুই জাতের পাখিরা আনন্দে হই হই করে টুই-টুই আর পিক-পিক পাখিকে বরণ করে নিল এবং সবাই সুর করে গেয়ে উঠল:

‘জাত-পাত মানি না, আমরা সবাই এক

জাত ভুলে টুই-পিক সুখে আছে দেখ...।’

 

বন্ধুরা, জাতপাত না করার বিষয়ে উপদেশমূলক গল্পটি শুনলে। তোমরা নিশ্চয়ই জানো ইসলাম ধর্মেও জাতপাতের বৈষম্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) মক্কা বিজয়ের পর ঘোষণা করেনঃ
"হে কুরাইশগণ! রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তা'য়ালা জাহেলিয়াতের সব অহংকার ও বংশ গৌরব খতম করে দিয়েছেন। সকল মানুষ এক আদমের সন্তান। আর আদমকে মাটি থেকে পয়দা করা হয়েছে।"

এ সম্পর্কে ইরানি কবি শেখ সাদী (র.) বলেছেন-


মাটিতে হয়েছে সৃষ্টি আদম তনয়
মাটিতেই মিশে যাবে জানিও নিশ্চয়।
গোর হতে মুর্দা যদি কর বাহির।
চিনা নাহি যায় ক'বো আমীর-ফকির।
দুনিয়াতে এসে কত রাজা মহারাজ
খালি হাতে চলে গেলা ফেলে তখত-তাজ।

 

রেডিও তেহরান/এআর/২৮

 

লোরেস্তানের কেন্দ্রীয় শহর খোররামাবাদের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বারো শ মিটার। পাহাড় আর পর্বতে ঘেরা এই শহরটির সৌন্দর্য অন্যরকম। সবুজ শ্যামল গাছগাছালি পরিবেষ্টিত এই শহর শাসানি যুগের এইলামি এবং শাপুর খস্তের শাসনামলে গড়ে উঠেছিল। ফলে খোররামাবাদ শহরটি বেশ প্রাচীন তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সভ্যতা লালনভূমি বলা চলে এই শহরটিকে। পাহাড়ের বুক চিরে যে ঝর্ণাধারাগুলো বেরিয়ে এসেছে সেগুলো খুররামাবাদের পানির সংকুলান করে এসেছে এবং এখনো সেখানে পর্যাপ্ত পানির ধারা বহমান রয়েছে আগের মতোই। পানি থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবে এখানে গড়ে উঠেছে বন-জঙ্গল আর চারণভূমিও। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এই খুররামাবাদ ছিল মানব বসতির জন্য বেশ উপযোগী।

 

খুররামাবাদ শহরটি যে অনেক প্রাচীন তার কিছু প্রমাণ মিলেছে এখানে আবিষ্কৃত প্রাগৈতিহাসিক কালের বহু নিদর্শন থেকে। এগুলো নিয়ে গবেষণা যারা করেছেন তাঁরা বলেছেন কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন এগুলো। খুররামাবাদ শহরের আশেপাশে অবস্থিত বিভিন্ন গুহায় আদিম মানুষের যেসব হাড়গোড় পাওয়া গেছে কিংবা আরও যেসব জিনিসপত্র পাওয়া গেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন এই এলাকায় চল্লিশ হাজার বছর আগে মানব বসতি ছিল। পুরাতত্ত্ব গবেষকগণ বলেছেন এখানকার নিদর্শনগুলো প্রাগৈতিহাসিক কালের বিভিন্ন যুগের।

 

লোরেস্তানের  যতগুলো শহর আছে সেগুলোর মাঝে এই খুররামাবাদ অনেক বেশি দ্যুতিময়। এই দ্যুতিময়তার কারণ হলো খুররামাবাদের প্রাচীন ইতিহাস এবং প্রাচীন নিদর্শন। শহরের ঠিক কেন্দ্রেই রয়েছে একটি হ্রদ। ‘কিভ’ হ্রদ। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও এই খুররামাবাদ ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণাঞ্চলের সাথে পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল এই খুররামাবাদ। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সুবিধার কারণে ইরানের মধ্যে অন্যতম ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে বেশ নামডাক ছিল এই শহরের। শাপুর খস্ত শহরের বিচিত্র নিদর্শন, পোলে শাপুরি, ফালাকুল আফলাক কেল্লা, ইটের তৈরি মিনার, প্রস্তর লিখন, নৌজিয়ন ঝর্না, জামে মসজিদ, শাবিখুন প্রণালি, দুশে গুহা এবং পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি কেবল যে খুররামাবাদের জন্যই আকর্ষণীয় তা নয় বরং সমগ্র ইরানের মধ্যেই এগুলো দর্শনীয় কিছু নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

 

খুররামাবাদ শহরের প্রাচীনতম এবং ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন হলো ‘শাপুর খস্ত’ শহর। শাসানিয় শাসনামলের শহর এটি। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে শাসানি বাদশা প্রথম শাপুরের আদেশে এই শহরটি নির্মাণ করা হয়। খুররামাবাদ শহরের দক্ষিণ উপকণ্ঠে এখনো ওই শহরটির স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। ‘শিলালিপি’ আর ‘পোলে শাপুরি’ এই শহরের প্রাচীন নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। আরও একটি নিদর্শন প্রাচীন এই শহরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সেটা হলো বিশাল বিস্তৃত এবং ব্যাপক প্রস্থময় দেয়াল। শাসানি শাসনামলের স্থাপত্য শৈলীর আদলে তৈরি করা হয়েছে এই দেয়াল।

 

ফালাকুল আফলাক কেল্লাও খুররামাবাদের ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন। এই কেল্লায় বারোটি টাওয়ার আছে। সে কারণে ‘বারো টাওয়ার’ নামেও এই কেল্লার পরিচিতি আছে। হিজরি সপ্তম শতকে আতাবাকান লোরে’র আমলে প্রাচীন একটি দুর্গের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে এই কেল্লা। কেউ কেউ আবার এই স্থাপনাটিকে শাসানি শাসনামলের বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ফতেহ আলি শাহ কাজারের আমলে এই কেল্লাটি মেরামত করা হয় এবং বেশ উঁচু আরেকটি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। তারপর থেকেই এই কেল্লার নাম হয় ফালাকুল আফলাক। তেইশ মিটার উঁচু এই কেল্লা ২৩০ মিটার আয়তন বিশিষ্ট জায়গা জুড়ে নির্মিত হয়েছে। একটি টিলার ওপরে বানানো হয়েছে টাওয়ারটি। কেল্লার মূল দরোজাটি হলো উত্তর দিকে। এই দরোজার উচ্চতা তিন মিটার আর প্রস্থ দুই মিটার।

 

কেল্লার ভেতরে দুটি বড়ো আঙিনা আছে। ওই আঙিনা বা উঠোনের চারপাশে বহু কক্ষ বানানো হয়েছে। প্রতিটি রুমের বাইরের দিকে রয়েছে জানালা। যে টিলাটির উপরে এই কেল্লা নির্মাণ করা হয়েছে ওই টিলার নীচ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ঝর্ণাধারা। সুপেয় পানির এই ঝর্না ‘গুলিস্তান’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। ফালাকুল আফলাক কেল্লা ভবনের গঠন বেশ জটিল। শৈলীগত এই বৈশিষ্ট্য আর দৃঢ়তর কারণে প্রাচীনকালেও সামরিক শাসকদের বসবাসের স্থান হিসেবে নির্বাচিত ছিল এই কেল্লা। বর্তমানে কেল্লাটি নৃতত্ত্ব ও পুরাতত্ত্ব যাদুঘরে পরিণত হয়েছে। যাদুঘরে একটি বিরাট লাইব্রেরিও রয়েছে।

 

খুররামাবাদের আরেকটি নিদর্শন হলো বৃত্তাকার পাথরের দেয়ালময় একটি কুপ। এই কুপটি মূলত পানি জমিয়ে রাখার হাউজের মতো। পুরো শহরে এই কূপ থেকেই পানি সরবরাহ করা হতো। হাউজ থেকে বহু ক্যানেল বা নালা চলে গেছে বিভিন্ন দিকে।

 

এর বাইরেও ঐতিহাসিক আরেকটি নিদর্শন আছে এই শহরে। সেটি হলো খুররামাবাদ জামে মসজিদ। সাফাভি শাসনামলে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। শাহ পরোয়ার সুলতানের আদেশে ৯৭০ হিজরিতে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। এরপর ১১১০ হিজরিতে শাহ সুলতান হোসাইনের নির্দেশে এবং কারিম খান যান্দের শাসনামলে পুনরায় মেরামত করা হয়। ১৩২২ হিজরির পর মসজিদটি ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

খুররামাবাদ শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। এখানকার ‘কিভ’ হ্রদ এক অপূর্ব সৌন্দর্যের প্রতীক। অনন্য সাধারণ এই হ্রদটি খুররামাবাদ শহরে উত্তর-পশ্চিম দিকে পড়েছে। কিভ নামে একটা পার্ক আছে এখানে। সেই পার্কের পাশে অবস্থিত হ্রদটি। ওই পার্কের প্রতিবিম্ব যখন হ্রদের পানিতে পড়ে দূর থেকে তাকে তখন মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোনো দৃশ্য। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নিদর্শনটি একেবারেই বাস্তব। স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকরা আকৃষ্ট হবেন এবং ঘটেও তাই। সারা বছর জুড়েই এখানে প্রকৃতিপ্রেমিদের আনাগোনা যেমন থাকে তেমনি পর্যটকদেরও ভিড় লক্ষ্য করা যায়।

 

নওজিয়ন ঝর্নাটিও এখানকার অপর একটি নিদর্শন। সময়ের অভাবে বর্ণনা দেওয়া গেল না।#

রবিবার, 22 ফেব্রুয়ারী 2015 12:32

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সত্যবাদিতা

রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশাকরি সুস্থ দেহ আর সুন্দর মন নিয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো আছে। দেহ সুস্থ রাখার জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম ধর্মও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র একটি বিখ্যাত হাদীসে বলা হয়েছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ পবিত্র ইসলাম ধর্মকে পবিত্রতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও সাজ সজ্জার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

রাসূলেখোদার জীবনী নিয়ে লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে বলা হয়েছে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সব সময় 'পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতেন। তিনি নিজের মাথার চুল চিরুনি দিয়ে পরিপাটি করে রাখতেন। এ সম্পর্কে এক বাণীতে তিনি বলেছেন, মহান আল্লাহ চান তাঁর বান্দারা বা ঈমানদার লোকেরা যখন আরেক মুমিনের সাথে সাক্ষাৎ করবেন তখন তাঁরা যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি অবস্থায় থাকেন। যাই হোক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)' নিজে সাধারণ অথচ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতেন। তিনি দামী জামা কাপড় পরতেন না। অবশ্য সাধারণ পোশাক পরিচ্ছদেও তাঁকে বিশেষ অভিজাত মনে হতো।

 

ব্রিটেনের চিন্তাবিদ ডেভেনপোর্ট মহানবী (সা.)'র বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি অবস্থায় থাকতেন। তাঁর সহজ সরল অথচ আত্মমর্যাদাসম্পন্ন চালচলন সবাইকে আকৃষ্ট করতো। তাঁর পবিত্র মুখে সব সময়ই আনন্দদায়ক ও চিত্তাকর্ষক মুচকি হাসি লেগে থাকত। এ হাসি ছিল তাঁর নূরানী মুখের শোভা।

 

আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সা.) সব সময় সাদা পোশাক পরতেন এবং অন্যদেরও সাদা পোশাক পরতে বলতেন। এর কারণ, সাদা পোশাক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকে এবং বিন্দুমাত্র ময়লা দাগ পড়লেও তা বোঝা যায়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সবুজ রংয়ের পোশাকও পছন্দ করতেন। মসজিদে বা জন সমাবেশে যাবার সময় মুসলমানদেরকে জাঁকালো বা অত্যন্ত গাঢ় রঙ্গীন পোশাক পরতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এ ধরনের সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্যে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরার পাশাপাশি তাদেরকে সুগন্ধিও ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

 

বন্ধুরা, তোমরা যদি পবিত্র কুরআনের শিক্ষার দিকে দৃষ্টি দাও তাহলে দেখতে পাবে যে, ইসলামী সংস্কৃতিতে বাহ্যিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি অবস্থা বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি আত্মিক পরিচ্ছন্নতা এবং আত্মিক শুভ্রতা ও সৌন্দর্যের ওপরও ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

 

ইসলামী শিক্ষায় বলা হয়েছে, মানুষের অন্তর, আত্মা ও দৃষ্টিভঙ্গি যদি সুন্দর বা পরিচ্ছন্ন না হয় তাহলে বাহ্যিক সৌন্দর্যের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। অর্থাৎ আচার আচরণ ও অন্তর যদি সুন্দর না হয়, তাহলে বাহ্যিক সৌন্দর্য মূল্যহীন হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে সূরা আরাফের ২৬ নম্বর আয়াতে সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদকে মহান আল্লাহর দান বা উপহার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, তবে একইসাথে এটাও বলা হয়েছে যে খোদাভীরুতা বা ধার্মিকতা আরো ভালো পোশাক এবং তা মুমিনদের জন্যে সর্বোত্তম। কারণ, তাকওয়া বা খোদাভীরুতা মানুষের অভ্যন্তরীণ দিকগুলোকে পবিত্র করে এবং আত্মাকে করে শুভ্র ও সুশ্রী।

 

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই শুনে থাকবে যে, সুগন্ধী বা আতর ব্যবহার ছিল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র আরেকটি বৈশিষ্ট্য এবং তিনি অন্যদেরও সুগন্ধী ব্যবহার করতে বলতেন। তিনি নামাজের সময় সুগন্ধী বা আতর ব্যবহার করতেন।

 

বিশ্বনবী (সা.)'র বংশধর ও পঞ্চম ইমাম হযরত বাকের (আ) বলেছেন, কোনো এলাকায় বাতাসে সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেয়ে মানুষ বুঝতে পারত যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ওই এলাকা অতিক্রম করেছেন বা ওই এলাকা দিয়ে কোথাও গেছেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) দাঁতের যত্ম নেয়ার ব্যাপারেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। তিনি নামাজ পড়ার আগে মেসওয়াক করতেন। তিনি দাঁত মাজা এবং ওজু করাকে অভ্যাসে পরিণত করতে মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

 

আল্লাহর রাসূলের (সা.) একটি হাদীসে বলা হয়েছে, দাঁত মাজুন বা মেসওয়াক করুন, কারণ, দাঁত মাজার ফলে দাঁতের মাড়ি শক্ত থাকে এবং মুখের দূর্গন্ধ দূর হয়। এ ছাড়াও দাঁত মাজলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং শয়তান বিতাড়িত হয়।

 

বন্ধুরা, আগেই বলেছি যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি অবস্থাকে পছন্দ করতেন। একদিন উশকো খুশকো বা এলোমেলো চুলের এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এলেন তিনি তাকে বললেন, আপনি যদি মাথার চুলগুলো চিরুনি দিয়ে আচড়িয়ে ও সাজিয়ে নিতেন তাহলে কী অসুবিধা হতো? এরপর থেকে সেই ব্যক্তি সবসময় রাসূলের এই উপদেশ মেনে চলেন এবং সেই থেকে কেউই তাঁকে কখনও কুৎসিত পোশাক বা অপরিপাটি অবস্থায় দেখতে পায়নি।

 

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি অবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র এক বাণীতে বলেছেন, যে ব্যক্তি তার চুলকে এলোমেলো বা অপরিপাটি করে রাখে, মহান আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ নিজে পবিত্র এবং তিনি পরিচ্ছন্নতা বা পবিত্রতা ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ নিজে মহৎ এবং তিনি মহত্বকে ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তিনি ক্ষমাশীলতাকে ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ নিজে সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।

 

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে বেশকিছু কথা জানলে। আশাকরি এগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে। 

 

বন্ধুরা, শারীরিক সুস্থতার জন্য পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি মানসিক সুস্থতা নির্ভর করে অনেকগুলো সৎগুণাবলীর ওপর। সত্যবাদিতা হচ্ছে এমনই একটি গুণ। মহানবী (সা.) বলেছেন ‘তোমাদের সত্য কথা বলা উচিত, কেননা সত্যবাদিতা অবশ্যই পুণ্যের দিকে পরিচালিত করে, আর নিশ্চয়ই পুণ্য জান্নাতের দিকে পরিচালিত করে।' তিনি আরো বলেছেন, ‘সত্য হলো প্রশান্তির মাধ্যম এবং মিথ্যা হলো দুশ্চিন্তা বা ভয়ের উৎস।' মিথ্যা কেবল দুশ্চিন্তার সৃষ্টিই করে না, মিথ্যাবাদীরা দুর্বল স্মৃতিশক্তির অধিকারীও হয়। তাই আমাদের সবাইকে মিথ্যা বলা বাদ দিয়ে সত্যবাদী হতে হবে। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা সত্যবাদিতা সম্পর্কে   আলোচনা করব।

 

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই Truth is beauty and beauty is truth এ প্রবাদটি  শুনেছো। এটির অর্থ হচ্ছে, সত্যই সুন্দর,সুন্দরই সত্য। সত্য- সুন্দর বলেই মানুষ সত্যবাদিতাকে পছন্দ করে মিথ্যাকে ঘৃণা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে সত্যের প্রশংসা করেছেন এবং সত্যবাদীদেরকে আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমা লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন।

 

আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সত্যবাদিতা ও আমানতদারীর মুর্তপ্রতিক। তাঁর চরম শত্রুরাও কখনও তাকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিতে পারেনি। তিনি যখন মহান আল্লাহর নির্দেশে মানুষের কাছে ইসলাম ধর্ম ও তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি প্রথমে সাফা পর্বতের একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে জনগণকে তাঁর কাছে আসার আহবান জানান। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রথমেই তিনি জনগণের কাছে জানতে চাইলেন, হে জনগণ! তোমরা কি এ পর্যন্ত আমাকে মিথ্যা বলতে শুনেছ? আমি যদি এখন তোমাদের কাছে বলি শত্রুরা সকালে অথবা সন্ধ্যার সময় হঠাৎ করে তোমাদের ওপর হামলা শুরু করবে তাহলে কি তোমরা আমার এ কথা বিশ্বাস করবে? সবাই সমস্বরে জবাব দিয়েছিল: হ্যাঁ, বিশ্বাস করব! কারণ, আপনি জীবনে কখনও মিথ্যা বলেননি।

 

মহানবী (সা.)'র জীবনের এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের কাছে মহান আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনি সাহসিকতার পাশাপাশি সত্যবাদিতা ও সততা বজায় রেখেছেন।

 

এবার আমরা নবীবংশের ইমাম বাকের (আ) এর একটি বাণী তোমাদের শোনাতে চাই। তিনি বলেছেন: সত্যবাদী হও! কেননা যারা সত্যবাদী আল্লাহর তাদের সাথে রয়েছেন। সত্যবাদী হবার জন্যে আত্ম-অনুশীলন করা যেতে পারে। প্রতিদিন চেষ্টা করবে কথা আর কাজের মিল রাখতে। সত্যের অনুভূতি নিজের ভেতর জাগানোর চেষ্টা করতে হবে অর্থাৎ সত্যকে অনুভব করতে হবে। এভাবে সত্যকে নিজের ভেতর লালন করবে।'

 

বন্ধুরা, তোমরা সবাই নিজের ভেতর সত্যকে লালন করবে এবং কথা আর কাজের মাঝে যদি সামঞ্জস্য রেখে সত্যবাদী হওয়ার চেষ্টা করবে- আমাদের প্রত্যাশা এটাই।#