এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শিল্প ও সাহিত্য

আরাকের আয়তন সাত হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা এক হাজার আট শ মিটার। কেন্দ্রীয় প্রদেশের মূল কেন্দ্রে অবস্থিত এই শহরটি। ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে ফতেহ আলি শাহ কাজারের শাসনামলে সামরিক দুর্গের অংশ হিসেবে শহরটি গড়ে ওঠে। সুলতানাবাদ নামে  শহরটি পরিচিতি পায়। আরাকে তখন ইরানের সেনাবাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত করে ঢেলে সাজানো হয়। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে এই শহর ব্যাপক উন্নতি লাভ করে এবং এই উন্নয়নের পথ ধরেই আরাক শহরে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সমাগম ঘটে।  হিজরি চৌদ্দ শতকের শুরুর দিকে এই আরাক শহর ইরানের অন্যতম প্রধান ও উন্নত শহরে পরিণত হয়। দেশি কোম্পানি তো বটেই এমনকি বিদেশি অনেক কোম্পানিও এই আরাক শহরে তাদের বাণিজ্যিক পসরা সাজিয়েছিল। অবশেষে ১৯৩৭ সালে এই শহর ‘আরাক’ নাম ধারণ করে।

 

এখানকার আবহাওয়া শীতকালে বেশ ঠাণ্ডা এবং আর্দ্র থাকে।আর গ্রীষ্ম বা গরমের সময় বেশ গরম এবং শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। শীতকালটা আরাকে তুলনামূলকভাবে গরমকালের চেয়ে দীর্ঘ। এখানকার প্রকৃতিতে একদিকে পাহাড়ের পর পাহাড় আবার অন্যদিকে মরুভূমি এবং হ্রদও আছে পাশাপাশি। আরাকের আশেপাশে বিদ্যমান প্রাকৃতিক এই বৈচিত্র্যের প্রভাব পড়েছে এ এলাকার আবহাওয়ার ওপর। এমনিতে আরাক এলাকাটি শুষ্ক এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এখানে বেশ কম। তবে শীতকালে বরফ আকারে যে বৃষ্টি নেমে আসে এই অঞ্চলের উঁচু অংশে তার বেশিরভাগই বরফ হয়েই জমে থাকে।

 

বসন্ত আর গ্রীষ্ম ঋতুতে সেই জমাট বেঁধে থাকা বরফ গলতে শুরু করে। বরফ গলা সেই পানি নীচের দিকে নেমে এসে জন্ম দেয় ঝর্না প্রবাহ আর নদীনালার। আরাকের পশ্চিম এবং দক্ষিণ পশ্চিমে এরকম কয়েকটি নামকরা নদী হলো তাওনদাশ্‌ত রুদ, কুহরুদ এবং সরুগ রুদ ইত্যাদি।  যত নদীই থাকুক না কেন এই আরাকে, সেগুলো মাটির নীচের পানির উৎসের সাথে তুলনা করলে ততটা গুরুত্ববহ নয়। অবশ্য ইরানের বেশিরভাগ এলাকাতেই বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ইরানের নদীগুলোর অবস্থা প্রায় অভিন্ন।

 

আরাকের পূর্বদিকে হাফ্‌তদ কোল্লে নামে এক গুচ্ছ পর্বত রয়েছে। এই পার্বত্য এলাকায় রয়েছে একটি সংরক্ষিত এলাকা। অন্তত ৮৩ হাজার হেক্টর এই সংরক্ষিত এলাকাটির আয়তন। হাফতদ মানে হলো সত্তর আর কোল্লে মানে হলো চূড়া। এই অর্থ থেকে নিশ্চয়ই এলাকাটির একটা চিত্র কল্পনা করা সম্ভব। যাই হোক হাফতদ কোল্লে’র পাহাড়গুলোতে বুনো জন্তু জানোয়ারের বাস রয়েছে প্রচুর। শিকারের উপযোগী বহু প্রাণীও রয়েছে এই সংরক্ষিত এলাকায়। সে কারণেই বহু প্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চলটি শিকারের জন্য বিশেষভাবে খ্যাতিমান। এর প্রমাণ মিলেছে এখানকার ‘চেশমে চেকব’ নামের একটি শিলালিপীতেও। কাজার শাসনামলে খোদাই করা এই শিলালিপিতে হাফতদ কোল্লে’র গাছ গাছালিময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা যেমন লেখা রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রাচীনকালে এখানে শিকার করতে আসার কথাও। অন্তত ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে এই এলাকায়। রয়েছে বিচিত্র জাতের দেশি বিদেশি পাখিও।

 

আরাকে একটি শিল্প নগরীও রয়েছে। এই নগরীতে গড়ে উঠেছে রাসায়নিক, ধাতব শিল্পের পাশাপাশি তাঁত শিল্প,নির্মাণ শিল্প, খাদ্য সামগ্রী উৎপাদন শিল্প ইত্যাদিও। ইরানের যোগাযোগের যতগুলো পথ আছে সবগুলো পথের মধ্যে এই আরাকের পথটিই শ্রেষ্ঠ। আরাক তাই অতিথি অভ্যর্থনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছে। বিগত দুই দশকে আরাক শহর চোখে পড়ার মতো উন্নতি সাধন করেছে। শহরটি গড়ে ওঠার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তার গুরুত্ব হারায় নি। বহু স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এখনও সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আরাক বাজার, চার ঋতু হাম্মাম, ইমামযাদা হোসাইন, পির মুরাদাবাদ সমাধি ইত্যাদির নাম করা যায়।

 

আরাক বাজার কমপ্লেক্সের আয়তন ১৪ হেক্টরের মতো। হিজরি তের শতকের শুরুতে এরকম শহর নির্মাণের উদাহরণ খুবই বিরল। ইরানের নগর নির্মাণ শিল্পের পূর্ণতার বিবর্তন প্রক্রিয়ায় এই আরাক শহর একটি অনন্য নিদর্শন। এই কমপ্লেক্সে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য যেমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তেমনি রাখা হয়েছে আবাসিক সুবিধাও। এই দুইয়ের জন্য আরও যেসব স্থাপনা একান্ত প্রয়োজনীয় সেগুলোও নির্মাণ করা হয়েছে। যেমন এখানে রয়েছে মসজিদ, রয়েছে স্কুল বা মাদ্রাসা, হাম্মামখানা, সরাইখানা এবং পানির হাউজ। বাজার কমপ্লেক্সের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে এই স্থাপনাকে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য সংস্থা  ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে।   

 

কাজারি শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে এখানে। এই স্থাপনাটি হলো সেপাহদার মাদ্রাসা। এটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। বাজার নির্মাণ করার সময়ই এই মাদ্রাসাটি গড়ে তোলা হয়েছিল। আরাক উপশহরে দ্বীনী শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান এই মাদ্রাসাটি। সাফাভি শাসনামলের স্থাপত্যের আদলেই মসজিদ, পানির হাউজ এবং জনকল্যাণ ও সেবামূলক সকল ব্যবস্থা রেখে নির্মাণ করা হয়েছে মাদ্রাসাটি।

 

 

চারঋতু হাম্মাম বা ফার্সি ভাষায় ‘চহর ফাস্‌ল’ হাম্মাম অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। চহর ফাস্‌ল নামকরণের একটা কারণ রয়েছে। কারণটা হলো এই হাম্মামের চার কোণের নকশাগুলো। চার ঋতুর বৈশিষ্ট্য ওই নকশাগুলোতে ফুটে উঠেছে। অন্তত ষোল শ বর্গমিটার জায়গা জুড়ে নির্মিত এই হাম্মাম কেবল স্থাপত্যশৈলীর দিকে থেকেই যে অনন্য তা নয় বরং আয়তনের দিক থেকেও ইরানের হাম্মামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো।#

বুধবার, 05 নভেম্বর 2014 18:59

হিংসা-বিদ্বেষ

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হিংসা-বিদ্বেষ শব্দ দু'টির সঙ্গে পরিচিত এবং হিংসুটে লোকদের আচরণ সম্পর্কে কমবেশি জানো। মানুষের মধ্যে এমন কিছু রোগ আছে যেগুলো চিকিৎসার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব হয় না তেমনি হিংসা মানুষের অন্তরের এমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধি, যা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, সমাজে নানা ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করে। হিংসা-বিদ্বেষের ফলে মানুষ কারো বিরুদ্ধে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র এমনকি সম্পর্কচ্ছেদ করতেও দ্বিধা করে না।  এসব কারণে ইসলাম ধর্মে হিংসার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা. আ.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ কর না, ষড়যন্ত্র কর না এবং সম্পর্ক ছিন্ন কর না। বরং তোমরা আল্লাহতায়ালার বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’

 

হিংসা-বিদ্বেষ মুনাফিকের চরিত্র। কোনো মুমিন অন্য মুমিনের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ রাখতে পারে না। এটি মুনাফিকদের একটি বদ স্বভাব।

কেবল মানুষের মধ্যেই নয়, পশুপাখির মধ্যেও এ বদ অভ্যাসটি দেখা যায়। আজকের আসরের শুরুতেই আমরা এ সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার।

 

কচ্ছপ তো তোমরা সবাই চেনো। খুবই নিরীহ একটা প্রাণী। কচ্ছপ স্থলে যেমন বাস করে তেমনি পানিতেও বাস করে। কচ্ছপের এত পরিচিতির একটা প্রধান কারণ হলো এই প্রাণীটি ধীর গতিতে চলে। ধীর গতির উদাহরণ এলেই কচ্ছপের নামটিই সবার আগে উচ্চারিত হয়। বিশাল এই পৃথিবীর কোনো এক কোণে বাস করত এরকমই একটি কচ্ছপ। তার বয়সও কম হয় নি। জীবনে অনেক ঠাণ্ডা গরম, তিক্ত আর মিষ্টি অনেক রকমের অভিজ্ঞতা তার জীবনের ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে। বিচিত্র চড়াই-উৎরাইয়ের প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কারণে তাকে বানানো হয়েছে প্রাণীদের উপদেষ্টা। যে প্রাণীরই কোনো সমস্যা দেখা দিত সে-ই চলে আসত কচ্ছপের কাছে পরামর্শ নেয়ার জন্য। কচ্ছপের কাছে বসত, লম্বা সময় নিয়ে খোশগল্প করত, ফাঁকে নিজেদের সমস্যার কথা বলত। কচ্ছপও আন্তরিকতার সাথে সবার সমস্যার কথা শুনত এবং তার দৃষ্টিতে যেটা উপযুক্ত সমাধান বলে মনে করত-তা বলে দিত।

 

সবাই ওই কচ্ছপকে খুবই জ্ঞানী বলে মনে করত। তবে কাঁকড়াই শুধুমাত্র কচ্ছপের ওপর সন্তুষ্ট ছিল না। কাঁকড়া কচ্ছপের অভিজ্ঞতা আর দীর্ঘ জীবনের কোনো মূল্যায়নই করত না। সে বলত:  ‘আমিও কচ্ছপের মতো। তার মতোই হাত পা নাড়াই। তার মতোই পানিতে বসবাস করি এবং স্থলেও বাস করি। তাছাড়া আমার তীক্ষ্ণধার দাঁত আছে কিন্তু কচ্ছপের নেই। আমি কচ্ছপের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলতে পারি। তাহলে প্রাণীরা কেন তাকে এত বেশি সম্মান করে, কেন সবাই তার কাছে যায় নিজেদের সমস্যা সমাধানের জন্য? কেন তারা আমার কাছে সমস্যার সমাধানের জন্য আসা তো দূরে থাক, আমাকে সালাম পর্যন্ত দেয় না?’

 

কাঁকড়ার মনে খুবই হিংসা হতো এবং সে চাইত তার ধারাল দাঁত নখ দিয়ে কচ্ছপের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মেরে ফেলতে। কেবল চাইত বললে ভুল হবে, সে কয়েকবার হামলাও করেছিল। কিন্তু কচ্ছপের ছিল ভীষণ শক্ত খোলস। কাঁকড়ার দাঁত নখ কচ্ছপের ওই শক্ত খোলস ভেদ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। এ কারণে কাঁকড়া আরও বেশি বিরক্ত ছিল। যখনই তাদের দুজনের দেখা হতো কাঁকড়া তখনই কচ্ছপকে এক গাল বাজে কথা শুনিয়ে দিত যাতে কচ্ছপ বিরক্ত হয়। কিন্তু কচ্ছপ কখনোই কাঁকড়ার কথায় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সোজা চলে যেত তার পথে।

 

একদিন হলো কী! একটা খরগোশ দৌড়ে দৌড়ে এসে হাজির হলো কচ্ছপের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে খরগোশ বলল যে, বনে আগুন লেগেছে। এক কান দু’কান হতে হতে সবার কাছেই আগুন লাগার খবর পৌঁছে গেল। সবাই এসে হাজির হলো কচ্ছপের কাছে। এই বিপদে এখন কী করণীয় তাদের সেটা জানার জন্যই একত্রিত হওয়া। কচ্ছপ খানিক চুপ থেকে ভাবল। তারপর সমবেত প্রাণীদের উদ্দেশে বলল:  ‘আমাদের সবার এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। বাতাসের বেগে আগুন এখানে চলে আসার আশঙ্কা আছে।’

 

সাথে সাথেই প্রাণীরা সেখান থেকে পালাতে শুরু করে দিল। কেউ দ্রুত দৌড়াল, কেউ উড়ে গেল ইত্যাদি যে যার মতো সরে যেতে লাগল। কচ্ছপ নিজেও তার মতো করে ধীরে ধীরে পথ ধরল। একমাত্র প্রাণী যে কিনা কচ্ছপের কথায় কান দেয় নি, সে হলো কাঁকড়া। সে প্রাণীদের যাবার পথে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল:  ‘তোমরা কী বোকা, মূর্খ, কচ্ছপের কথায় তোমরা তোমাদের বাসাবাড়ি ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দিচ্ছ। বাতাস কোথায় যে এখানে আগুন নিয়ে আসবে?’

কিন্তু কাঁকড়ার কথায় কেউ কান দিল না। কাঁকড়ার পাশ দিয়ে যে প্রাণীটা সবার শেষে গেল সে হলো কচ্ছপ। কাঁকড়া তাকে দেখে উপহাসের হাসি দিয়ে বলল: তুমি কোথায় যাচ্ছো হে বুড়ো কচ্ছপ?

কচ্ছপ বলল: আমি চীন ও মচীন যাচ্ছি...

কাঁকড়া বুঝতে পারে নি যে কচ্ছপ তাকে বোকা বানাচ্ছে। সে জানতো চীন অনেক দূরে। কচ্ছপ যেরকম ধীরে ধীরে চলে তাতে আরও দশ বছরেও চীন যেতে পারবে না সে। সেজন্য বলল:

এই গতিতে হেঁটে তুমি

চাচ্ছ যেতে চীনা ভূমি?

এই বলে আবারও সে হাসতে হাসতে বলল: "আহা রে! বেচারা প্রাণীগুলো দেখ কী রকম একটা বেআক্কেল প্রাণীর হাতে পড়ে নিজেদের বিবেককেও জলাঞ্জলি দিয়েছে!"

প্রাণীগুলো বহুদূর গিয়ে আরেকটা জায়গায় সমবেত হয়ে জীবন যাপন করতে লাগল। ভালোভাবেই কাটছিল তাদের। কিন্তু কাঁকড়ার যে কী পরিণতি হলো সেই খবরটাও তাদের কাছে আর কোনোদিনই গেল না। তার মানে তো বুঝতেই পারছ তোমরা। কচ্ছপের কথাই সত্যি হয়েছিল এবং আগুনে পুড়ে কাবাব হয়ে গিয়েছিল কাঁকড়া। আর অপরাপর প্রাণীরা সুখে শান্তিতেই তাদের জীবন কাটাতে লাগল।

 

বন্ধুর, কচ্ছপ ও কাঁকড়ার গল্পটি শুনলে, আশা করি ভালো লেগেছে। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে তোমাদেরকে কচ্ছপ সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য জানাব।

কচ্ছপ এক ধরনের সরীসৃপ যারা পানি ও ডাঙা দুই জায়গাতেই বাস করে। এদের শরীরের উপরের অংশ শক্ত খোলসে ঢাকা থাকে যা শরীরকে যেকোনো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে।

বর্তমানে কচ্ছপের প্রায় ৩০০ প্রজাতি পৃথিবীতে রয়েছে, এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি এখন বিলুপ্তির পথে রয়েছে। কচ্ছপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে পারে, সাধারণত এ ধরনের প্রাণীদের ঠাণ্ডা-রক্তের প্রাণী বলে অভিহিত করা হয়। অন্যান্য প্রাণীর মত এরা নিশ্বাস গ্রহণ করে।

কচ্ছপরা সাধারণত মানুষেরই মত বাঁচে কিন্তু কিছু কচ্ছপ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে বলে জানা যায়।   

 

কচ্ছপের অনেক প্রজাতি পানিতে বা পানির আশেপাশে বাস করলেও এরা ডাঙায় ডিম ছাড়ে।  মেয়ে কচ্ছপরা ডিমের জন্য গর্ত করে এবং সেখানে ১ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তারা সাধারণত রাতের বেলা ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়ার পর মা কচ্ছপ ডিমগুলোকে মাটি, বালি বা অন্য যেকোন জৈব পদার্থ দিয়ে ঢেকে দেয়। মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার পর ডিমগুলো প্রকৃতির দায়িত্বে রেখে চলে যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রজাতি বিশেষে ৬০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। ডিমের আকার মায়ের আকারের উপর নির্ভর করে। বাচ্চা কচ্ছপরা একটি ভ্রণ থলে নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা তাদের ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত পুষ্টি সরবরাহ করে থাকে।

 

 

 

 

 

সভে উপশহরের আয়তন দশ হাজার বর্গকিলোমিটারের মতো। অর্ধ মরুপ্রান্তিয় আবহাওয়া বিরাজ করে এখানে। সভে শহরটি হলো এই উপশহরের প্রধান কেন্দ্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯৯৫ মিটার উঁচুতে এই শহরের অবস্থান। রাজধানী শহর তেহরান থেকে ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে পড়েছে সভে শহরটি। ইতিহাসে এসেছে সভে শহরে মানব বসতি গড়ে উঠেছে বেশ প্রাচীন কালে। অন্তত সাত হাজার বছর আগে এখানে মানব বসতি ছিল। পবিত্র ধর্ম ইসলামের আবির্ভাবের ফলে এই এলাকার জনগণের ওপর আল-কুরআনের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে সমৃদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্য ও সভ্যতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এখানকার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাচীন টিলা টাওয়ার আর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোই প্রমাণ করে যে সভে এলাকাটি বেশ পুরনো।

 

সভে এলাকায় পুরাতত্ত্ববিদদের গবেষণামূলক খননকাজ থেকে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শনকে বিশেষজ্ঞগণ খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর আগেকার বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সবচেয়ে প্রাচীন যে সনদ হাতে এসেছে তা থেকে বোঝা যায় এই সভে শহরের অস্তিত্ব তখনও ছিল। নিওতিন গেরায়া’ নামক লিপিকর্মই তার প্রমাণ। এই লিপিকর্মের ওপর সভে নামটি গ্রিক উচ্চারণে লেখা ছিল ‘সা’উতে’। লিপিকর্মটি ছিল খ্রিষ্টপূর্ব তিন শ’ বছর আগের। অস্ট্রিয়ার বিশিষ্ট পুরাতত্ত্ববিদ উইলহেম টমাসেক প্রথমবারের মতো এই লিপিকর্মটি আবিষ্কার করেন। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার যাদুঘরে ওই নিদর্শনটি এখনও সংরক্ষিত আছে।

 

ইতিহাসের এইসব নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে বলা যায় সভে শহর দুই হাজার ছয় শ বছর আগের মাদ এবং পার্ত শাসনামলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য স্থান হিসেবে পরিগণিত ছিল। রেই শহর থেকে হামেদানে যাবার পথে সভে শহরটি অতিক্রম করতে হতো। পার্তদের শাসনামলে এই সভে ছিল মুসাফিরদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যাত্রাবিরতিকেন্দ্র। খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকেও এই শহরটি মাদদের একটি দুর্গ হিসেবে বিবেচিত ছিল। বিখ্যাত ভুবন পর্যটক মার্কোপোলো সাত শ বছরেরও আগে তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে এই সভে শহরের কথা লিখতে ভোলেন নি। মার্কোপোলো অবশ্য উল্লেখ করেছেন সভে শহরের অগ্নিপূজকদের কথা, তাদের উপাসনালয় এবং কেল্লার কথা।

 

এই বিষয়টিও প্রাচীন সভ্যতার লালনভূমি হিসেবে সভের সমৃদ্ধির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের সেই প্রাচীন উপাসনালয়গুলোর নিদর্শনের অস্তিত্ব এখনও আঁচ করা যায়। কেননা কালের বিবর্তনে শত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অগ্নিপূজকদের মন্দিরগুলোর ধ্বংসাবশেষ এখনও লক্ষ্য করা যাবে। দোখতার কেল্লা’র নাম অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন। সভে হ্রদের কাছে উঁচু একটি পাহাড়ের ওপর এই দোখতার কেল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সভে শহর থেকে ২৩ কিলোমিটার দূরে ইসলামপূর্ব কালের এই নিদর্শনটি এখনো তার অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে।

 

ইরানের অপরাপর শহরগুলোর মতো এই সভে শহরও কালের আবর্তনে বহু ঘটনা দুর্ঘটনার ইতিহাস বহন করে চলছে। নবী করিম (সা) এর বংশের যোগ্য সন্তান হজরত মাসুমা (সা) এই সভে শহরে প্রবেশ করে শহরটিকে ঐতিহাসিক এবং সমৃদ্ধ করে তোলেন। ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে এই ঘটনার কথা উল্লেখ রয়েছে। দেইলামি এবং সেলজুকি শাসনামলেও সভে শহরটি এই দুই রাজবংশের বাদশাহ এবং তাদের সেনাদের শীতকালীন রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। সেলজুকি শাসনামলে সভে শহর বেশ উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছিল। সেলজুকিদের বিভিন্ন গোত্রের প্রধানদের উপাধি ছিল আতাবাক। এই আতাবাকিদের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সভে শহর।

 

এই সভে শহরের ওপরও মঙ্গলরা হামলা করতে ছাড়ে নি। ৬১৭ হিজরিতে সভে শহরের ওপর ব্যাপক হামলা করেছিল তারা। শহরটিকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল। একেবারে বিরান করে দিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সভে শহরের বেশিরভাগ মানুষ মারা গিয়েছিল। ইতিহাস লেখকদের বক্তব্য অনুযায়ী এই সভে শহরেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নামকরা লাইব্রেরি। ইরানে মঙ্গলরা যখন আক্রমণ করেছিল তখন এই বিখ্যাত লাইব্রেরিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য যে সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়তো সেইসব যন্ত্রপাতি মজুদ ছিল এই লাইব্রেরিতে। মঙ্গলরা সেই মূল্যবান যন্ত্রগুলোও আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল।

 

হিজরি সপ্তম শতকের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জাকারিয়া কাজভিনি মঙ্গলদের হামলার আগেকার সভে শহর সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘সভে চমৎকার একটি শহর। ফুল ফল আর বিচিত্র গাছ গাছালিতে পূর্ণ সবুজ শ্যামল একটি শহর সভে। এই শহরের লোকজন মিউজিকপ্রেমী’। হালাকু খানের স্থলাভিষিক্ত যাঁরা ছিলেন তাঁদের সময়ে অর্থাৎ এইলখানানদের শাসনামলে মঙ্গলদের আক্রমণে বিধ্বস্ত সভে শহরের অনেকাংশ পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে তৈমুরি আর অগ্‌গাভিয়ানলুদের সময়  ব্যাপক লুটপাট হয়। এমনকি শাহজাদাদের মাঝে প্রচণ্ডরকম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। এসব কারণে সভে শহর পুনরায় আক্রান্ত হয়। পরবর্তীকালে সাফাভিদের শাসনকালে সভে শহর আবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। জান্দিয়া শাসনামলে ব্যবসা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাপক মাত্রায় হওয়ায় শহরটি যেন তার প্রাচীন ঐতিহ্য ফিরে পায়।

 

কিন্তু তেহরান রাজধানী শহরের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবার কারণে সভে শহরের গুরুত্ব আগের তুলনায় হ্রাস পায়। কাজারিদের সময় এই সভে শহরের জনগণ তেহরানের দিকে আসতে শুরু করে। তারপরও সভে শহর এখনও ইরানের কেন্দ্রীয় প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর হিসেবে স্বীকৃত। কেননা প্রাচীন এই শহরটির যেমন রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তেমনি এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শন। সরাইখানা, বাজার, ঐতিহাসিক স্থাপনা, রাস্তাঘাট, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের স্মৃতিবহুল বিভিন্ন এলাকা, মসজিদ, নবীর মাজার, ঐতিহাসিক সেতু, দুর্গ, কেল্লা, ইমামযাদা ইত্যাদি মিলিয়ে অন্তত ২২৮টি নিদর্শন রয়েছে সভেতে। এগুলোর মধ্য থেকে ৫৩টি নিদর্শন ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

 

বিশেষ করে সভে জামে মসজিদ আর ইমামযাদা সাইয়্যেদ ইসহাকের মাযার খুবই সম্মান এবং মর্যাদাময় পবিত্র দুটি স্থাপনা। ইসলামের প্রাথমিক যুগের নিদর্শনবহুল একটি অনন্য স্থাপনা হলো জামে মসজিদ। স্থাপত্যশৈলী আর কারুকাজ সবই দেখার মতো। এই মসজিদের মিনারটিও স্থাপত্য শিল্পের অপর একটি অসাধারণ নিদর্শন।

 

সভের পূর্বদিকে ইমামযাদা ইসহাকের মাজারটি অবস্থিত। নবীবংশের সন্তান সাইয়্যেদ ইসহাককে এই ইমামযাদায় দাফন করা হয়েছে। পবিত্র এই স্থাপনায় বহু নিয়্যতে মানুষের আনাগোনা রয়েছে নিয়মিত।#