এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 07 এপ্রিল 2010 00:24

বাহাত্তরের সংবিধানে সেক্যুলারিজম যুক্ত করার ক্ষেত্রে জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না : ড. মাহবুব উল্লাহ

সেক্যুলারিজম নিয়ে নানা মত ও বিশ্লেষণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে । তো সেক্যুলারিজম বিষয়ে আমরা কথা বলেছি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর সাথে। তাঁর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো :

Sample Imageসাক্ষাৎকারটি শোনার জন্যে এখানে ক্লিক করুন

রেডিও তেহরান : সেক্যুলারিজম একটা মতবাদ এটা আমরা জানি। অনেক আগ থেকে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝির দিকে এ মতাবদটি এসেছে । বিশ্বের অনেক দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও '৭২ এর সংবিধানে ফিরে গিয়ে দেশে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। ফলে সেক্যুলারিজম নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তো সেক্যুলারিজম মতবাদটা আসলে কী এবং এই মতবাদের মূল বক্তব্য নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তো আপনি কী সংক্ষেপে বিষয়টি সম্পর্কে বলবেন?
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ : সেক্যুলারিজম বিষয়ে অত্যন্ত সুন্দর একটা প্রশ্ন করার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেক্যুলারিজমকে একটি আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯৭২ এর সংবিধানে । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব বিভিন্ন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ, একটি জাতি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে অর্জন তার পেছনে যে চেতনা বা আদর্শ কাজ করেছিল তার রূপকার বর্তমানে যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ - তারাই। সেই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন । ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সেই আন্দোলনের একটি যোগসূত্র ছিল । কিন্তু আমরা অত্যন্ত আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসেবে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সেক্যুলারজিমকে একটি আদর্শ হিসেবে সংযোজন করা হলো । এ বিষয়ে প্রথমত যে প্রশ্নটি আসে সেটি হচ্ছে এই যে বাংলাদেশের শতকরা ৮৬ ভাগ মানুষ ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমান । ইসলাম এমন একটি ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থা যেখানে মানুষের সামগ্রিক জীবনের সব কিছুই এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়।ফলে ইসলামকে যদি জনজীবনে কার্যকর করা যায় তাহলে অটোমেটিক্যালি দেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী যারা আছেন তারা নিরাপদ ও নিশ্চিত হবেন। তাদের নিরাপত্তার বিধান সেই ব্যবস্থার মধ্যে থাকবে। তাছাড়া ন্যায় ভিত্তিক অর্থনীতি সেখানে পরিচালিত হবে রাজনীতি হবে সুস্থ এবং এর মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম সে সময় যে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম প্রতিস্থাপিত করা হলো তার পেছনে জনগণের কোনো ম্যান্ডেট ছিল না । কারণ মুক্তিযুদ্ধ যখন সংঘটিত হয়েছিল তার আগে ছয় দফার ভিত্তিতে ৭০ এর নির্বাচন করেছিলেন এবং নির্বাচন পরবর্তীতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় পাকিস্তানের অতর্কিত আক্রমণের ফলে। তবে সে সময় আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ছাত্রলীগের ২১ দফা বা ১১ দফা এগুলোর কোনোটাতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজম এবং সমাজতন্ত্রের কথা ছিল না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী নেতৃত্বের একটি অংশ ভারতের পশ্চিমবাংলায় অবস্থান করছিলেন। তারা তখন পশ্চিম বাংলার বামপন্থী রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। যাইহোক পরবর্তীতে তারই ফলশ্রুতিতে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণায় সমাজতন্ত্র এবং সেক্যুলারিজম গ্রহণ করা হয়। তারপর নতুন একটি সরকার গঠিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে এ বিষয়টিগুলোকে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি দেশের জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন হিসেবে জনগণ এসব বিষয়কে গ্রহণ করছে কিনা সে জন্যে রেফারেন্ডাম হওয়া দরকার ছিল । সেটি করা হয়নি।
আরেকটি বিষয় আমি উল্লেখ করবো। আপনি যে কথা বলেছেন যে , পাশ্চাত্য দর্শনে এটির উন্মেষ ঘটেছে; হ্যাঁ একথা ঠিক এবং সে সময় এর পেছনে ক্যাথলিসিজম এবং প্রোটেষ্টাটিজমের একটি ভূমিকা ছিল। চার্চ যখন জনগণের উপর ধর্ম বিশ্বাসকে চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছিল তখন সেক্যুলারিজমের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন ফিলসফিক্যালি যদি বিষয়টিকে দেখি তাহলে দেখবো ধর্মনিরপেক্ষতা ইংরেজী প্রতিশব্দ ননকমিউনিজম। তবে সেক্যুলারিজমের বাংলা যথার্থ প্রতিশব্দ হিসেবে সমাজ বিজ্ঞানে বা দর্শনে যে শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি হচ্ছে ইহজাগতিকতাবাদ । সেটি হিন্দু হোক বৌদ্ধ হোক খ্রিস্টান হোক পৃথিবীর যত ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ আছে তাদের কারো কাছেই ইহজাগতিকতাবাদ হিসেবে সেক্যুলারিজম কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয় । আবার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হিসেবেও তারা সেক্যুলারিজমকে মেনে নেবে না। কারণ কোনো ধর্মবিশ্বাসী ধর্ম নিরপেক্ষ হতে পারে না। বাংলাদেশে এ বিষয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটা বড় রকমের বিভ্রান্তি রয়েছে। আমি মনে করি এটি শুধু বিভ্রান্তি নয় ; ইচ্ছে করেই তারা সেক্যুলারিজম নিয়ে একটা উদ্ভট এবং অগ্রহণযোগ্য ধারনা প্রচার করতে চাচ্ছে । আর সেটি হচ্ছে সেক্যুলারিজম হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষেতাবাদ । তাদের এ বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের ধর্মহীনতার আশ্রয় এবং প্রশ্রয়ও আছে। বাংলাদেশে হিন্দু,বৌদ্ধ,খ্রিস্টান ও মুসলমান আমরা সবাই আছি। এখানে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর প্রতি এবং ধর্মের প্রতি পরস্পরের ভক্তি ও শ্রদ্ধা রয়েছে সহমর্মিতা রয়েছে। আমাদেরকে মূলত হতে হবে অসাম্প্রদায়িক। আর সেদিক থেকে যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে অসাম্প্রদায়িতকতার যে চেতনা সেটি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উপস্থিত থাকার কথা । আর তা নাহলে তিনি মুসলমান থাকেন না। বর্তমানে বাংলাদেশে সেক্যুলারিজমকে আসলে একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে দেশে সেক্যুলারিজমের নামে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রচার করা হচ্ছে বলে আমার ধারণা । আমার মনে হয় যদি এ বিষয়ে কোনো সমাজতত্ত্বীয় বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেশবাসী বুঝতে সক্ষম হবে যে আসলে সেক্যুলারিজমের কথা যারা বলছেন তারা ধর্মহীনতা চাচ্ছেন এবং একই সাথে তারা সাম্প্রদায়িকতাকে সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করছেন।
রেডিও তেহরান : সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের কি কোনো বিরোধ আছে ? অর্থাৎ আমি জানতে চাচ্ছি যে মুসলমানদের কি সেক্যুলারিজম গ্রহণ করার প্রয়োজন আছে?
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ : আপনি এই যে প্রশ্নটি করলেন আমার আগের আলোচনায় সে বিষয়টি আনার চেষ্টা করেছি। আর সে বিষয়টি হচ্ছে একজন প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসী; তিনি যদি মুসলমান হন তাহলে তো কথাই থাকে না - ফলে প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসী, ইসলামে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি বা কোনো মুসলমানের কাছে সেক্যুলারিজমের যে দ্যোতনা বা কনসাশনেসের কথা বলা হয় তা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন হিন্দু,বৌদ্ধ বা খৃষ্টানের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে কোনো ধর্মবিশ্বাসীর কাছে তথাকথিত অর্থে যে সেক্যুলারিজম যা রাজনীতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ; ইউরোপে এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে যে সেক্যুলারিজমের উৎপত্তি ঘটেছে - সেখানে সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাসের বিষয়টি পরিত্যাগ করা হয়েছে । ঐ তত্ত্বে সৃষ্টি কর্তার উপর বিশ্বাসের বিষয়টি গ্রহণ করা হয়নি। সর্বার্থে সেক্যুলারিজম হচ্ছে ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গী । অর্থাৎ মানুষের আচার- আচরণ,নৈতিকতা বোধ ও ন্যায়বোধ এসব ইহজাগতিক দৃষ্টি ভঙ্গীর উপর এ সেক্যুলারিজম প্রোথিত। প্রাচ্যের ৬ টি প্রধান ধর্মের মধ্যে তারা মোরালিজমকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। আর ৬ টি প্রধান ধর্ম কিন্তু ওরিয়েন্টাল সোসাইটির অর্থাৎ প্রাচ্য সমাজের । তবে এ প্রসঙ্গে একটি কথা আমি বলতে চাই পশ্চিমা সমাজ কিন্তু ধর্মকে জনসমাজে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি অসাম্প্রদায়িকতা অর্থে সেক্যুলারিজমকে ব্যবহার করা হয়; তাহলে বাংলাদেশের মুসলমানরা সবচেয়ে বেশী সেক্যুলার । আপনি যদি ভারত এবং বাংলাদেশকে তুলনা করেন উপনিবেশিক আমল থেকে পাকিস্তান আমল এবং বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনটি হিস্ট্রিক্যাল ফেসে যদি ভাগ করে দেখানো হয় তাহলে দেখবেন ভারতে যত সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে তা পরিমাণে খুবই কম। আরেকটি দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই যে আমাদের দেশে এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক আছে যারা এদেশের যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস - ঐতিহ্য আছে তার উপর তাদের কোনো আকর্ষন নেই । বরং এসবের উপর এক ধরনের অনীহা ও বিভ্রান্তিকর ধ্যান ও ধারনা তারা পোষণ করেন। তারা মনে করে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের যে সংস্কৃতি, ধ্যান ধারণা আদর্শ - বিশ্বাস সেগুলো উন্নয়নকামী ও প্রগতিশীল। আর সেগুলোকেই বাংলাদেশের সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করার একটি মনোবাঞ্চা তাদের মধ্যে আমরা লক্ষ্য করছি। আজ গোটা জাতি বিভক্ত হয়ে পড়েছে । বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা লক্ষ্য করছি এক ধরণের সম্প্রসারণবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হচ্ছে। আমাদের স্বাধীনতা এবং বিজয়ের সত্যিকারের ইতিবাচক কোনো প্রভাব আমরা জনজীবনে রাখতে সক্ষম হচ্ছি না। এসবের কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে না এবং রাজনীতি একটি সংহারী ভাব ধারণ করছে। অতি সম্প্রতি সংসদে সরকারী দল এবং বিরোধী দল যে ধরনের আচরণ করছে তার সাথে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই ; সভ্যতা ভব্যতার কোনো সম্পর্ক নেই এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে সুস্থ সংস্কৃতি বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যে কথা বলা হয় সে সবের কোনো লক্ষন সেখানে নেই। সুতরাং আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন যে অসাম্প্রদায়িকতা যদি সেক্যুলারিজম হয় ; যদি আমরা সেটা মনে করি তাহলে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গী আছে। আর ইহজাগতিকতাবাদ যদি সেক্যুলারিজম হয় যেটা পাশ্চাত্যে ফিলোসফিক্যালি ডেভেলাপ করেছে; তাহলে সেই সেক্যুলারিজম বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলিম কেউই সেটাকে গ্রহণ করতে পারে না।
রেডিও তেহরান : কিন্তু বাংলাদেশে তো আমরা লক্ষ্য করি যে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থে সকল ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে বোঝানো হয়। তো ইসলামও সে কথাই বলে তাহলে কি সেক্যুলারিজম এবং ইসলাম কি একই কথা বলছে না।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ : আমি আপনার সাথে সম্পূর্ণভাবে একমত । যদি সেক্যুলারিজমের অর্থ এটা হয়ে থাকে যে সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীলতা সহমর্মিতা এবং রাষ্ট্র সকল ধর্মাবলম্বিদের প্রতি একই রীতি নীতি ও আইন কার্যকর করবে । সেদিক থেকে আমি বলবো যে বাংলাদেশে এটি অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। আর এটি বাংলাদেশে বিদ্যমান আছে। কিন্তু সেক্যুলারিজম বলতে এখানে আরো কিছু ডাইমেনশন ডেভেলাপ করেছে। যেমন ধরুন এখানে বলা হচ্ছে মুক্তি যুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি। তাছাড়া এর আগে আমি বলেছি যে এ দেশের ৮৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম । তাদের অধিকাংশই দাড়ি রাখেন টুপি পরেন এবং ইসলামিক নিয়ম কানুন তারা পালন করেন। কিন্তু আমাদের এখানে দেখানো হচ্ছে এ ধরনের যত ব্যক্তি আছে, এ ধরনের বিশ্বাস ও বোধ যাদের আছে তারা স্বাধীনতা বিরোধী, স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি । আমি এ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই - সেটি হচ্ছে আমাদের মুক্তি যুদ্ধের সময় পাকিস্তান রক্ষিত হলে ইসলাম রক্ষিত হবে এ ধরনের একটি বিশ্বাস থেকে একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত কিছু মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে। কিন্তু তার অর্থ তো এই নয় যে বাংলাদেশের যে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিল এবং যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে মুসলমান ছিল না, দাড়ি টুপিওয়ালা মানুষ কি ছিলেন না ? ইসলামী ঐতিহ্যের অনুরসণ যারা করেন তারা কি ছিলেন না ! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদেরকে যদি ধর্মভিত্তিক পর্যালোচনা করেন তাহলে সেখানে মুসলমানের সংখ্যা কত আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা কত ? বায়ান্নর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে যারা শহীদ হয়েছিলেন- তারাতো সকলেই মুসলমান ছিলেন । তারপর মুক্তিযুদ্ধের যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিন্তা এবং চেতনায় তার মধ্যে তো বাঙালী মুসলমানিত্ব ছিল। এখন যদি মুসলমানিত্বকে বাদ দিয়ে শুধু বাঙালীত্বকে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের চেতনা বলা হয় তাহলে তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রের যে যৌক্তিকতা সেটা থাকে না । কারণ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একইসাথে মুসলমানিত্ব আছে এবং বাঙালীত্বও আছে। আবার পশ্চিমবাংলার মানুষের মধ্যে একইসংগে বাঙালীত্ব আছে,ভারতীয়ত্ব আছে এবং হিন্দুত্বও আছে। ফলে বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গ এক হয়ে যায়নি । ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ এবং ১৯৪৭ সালে আবার বঙ্গবিভক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম এসব রাজনৈতিক পেক্ষাপট যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব যে পশ্চিমবাংলার বাঙালীরা কখনও হিন্দুত্বকে ত্যাগ করেনি । পূর্ব বাংলার বাঙালীরা কখনও মুসলমানিত্ব ত্যাগ করেনি। একই সংগে যদি আমরা দেখি পূর্ব বাংলার বা আজকের বাংলাদেশের বাঙালীদের বাঙালীত্ব এবং পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের বাঙালীত্ব তো এক নয় । দুই দেশের দুই বাঙালীদের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। পার্থক্য আছে বোধ বিশ্বাসের, আচার আচরণের, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ,রীতি নীতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের । যে কারণে বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু পশ্চিম বাংলার মধ্যে সেই বোধ নেই বলেই বাঙালী হওয়া সত্ত্বেও তারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। একটি প্রদেশ হিসেবে তারা ভারত রাষ্ট্রের সাথে রয়েছে। কাজেই এ সত্যকে তো অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রের মানুষকে অস্বীকার করার একটা প্রবণতা। আর এ বিষয়টি অত্যন্ত দু:খজনক। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংগে মুসলমানিত্বের চেতনার কোনো সংঘর্ষ নেই বাঙালীত্বের চেতনারও কোনো সংঘর্ষ নেই। কিন্তু সেই বাঙালীত্বের চেতনা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের বাঙালীত্বের চেতনা। পশ্চিম বঙ্গের মানুষের বাঙালীত্বের চেতনা তো বাংলাদেশের মানুষের বাঙালীত্বের চেতনা হতে পারে না। আজকে বাংলা সাহিত্যের প্রধান কেন্দ্র ঢাকা। একসময় বাংলা সাহিত্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে যদি আমরা মূল্যায়ন করি তাহলে সেখানে দেখবো পশ্চিম বাংলার লেখক সাহিত্যিকদের এমনকি যাদেরকে আমরা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে মনে করি তাদের ভূমিকা কি ছিল?এ সব প্রশ্ন কিন্তু আসবে। সুতরাং আমি মনে করি বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সকলে একত্রিত হয়ে আছি। প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের সহমর্মিতা আছে। বরং আমি বলবো তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশে যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আছে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শান্তি চুক্তি হয়েছিল সেটি কেন করা হয়েছিল। সেখানে কি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? শান্তি বাহিনী কোথায় ট্রেনিং নিয়েছে ; অস্ত্র কোথায় পেয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের সরকার কি করে শান্তি বাহিনীর সাথে যারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে তাদের সাথে সমঝোতা করতে পারে। বিশ্বের কোনো দেশে এরকম ঘটনা ঘটেনি। সুতরাং অনেকগুলো ডাইমেনশন থেকে আমি বলবো যে আমাদের বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস ঐতিহ্য,অর্থনীতি এবং জাতীয়তাবোধকে যতক্ষণ পর্যন্ত সম্মান প্রদর্শন না করবো, সব অনৈক্য পরিহার করে এসব বিষয়ে একমত হতে না পারবো ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দূর্বল থাকবে। এ পরিস্থিতিতে আমরা জনজীবনে উন্নয়ন ঘটাতে পারবো না। বর্তমান সময়ে আমাদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি রয়েছে তা থেকেও আমরা মুক্তি পাবো না । #

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন