এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 24 নভেম্বর 2015 12:41

'মিনা ট্রাজেডিতে সৌদি সরকারের তথ্যগোপন, ইরানের দাবি ন্যায্য'

'মিনা ট্রাজেডিতে সৌদি সরকারের তথ্যগোপন, ইরানের দাবি ন্যায্য'

২৪ নভেম্বর(রেডিও তেহরান): মিনা ট্রাজেডি আল্লাহর তরফ থেকে ঘটেছে এভাবে সাফাই দিয়ে সৌদি সরকার পারপেয়ে যেতে পারে না। এটি ঠিকও না। মিনায় শত শত হাজি মৃত্যুর ঘটনায় সৌদি সরকারের অবহেলা, অযোগ্যতা ও অব্যবস্থাপনা ছিল।

 

রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক জনাব শাহ আলম।

 

তিনি বলেন, মিনায় প্রকৃতপক্ষে কত হাজি মারা গেছেন সে ব্যাপারে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সৌদি সরকার আজো দেয়নি। বিভিন্ন মিডিয়াতে যেসব সংখ্যা এসেছে সে বিষয়টি নিয়ে তারা সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করেছে। সৌদি সরকার মিনা ট্রাজেডি নিয়ে তথ্য গোপন করেছে। এ বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

শাহ আলম বলেন, যাদের পরিবার পরিজন হজে গিয়ে আর ফিরে আসেনি এখনও নিখোঁজ রয়েছে, তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আমাদের জানা নেই। তাছাড়া যারা মারা গেছেন এবং পরিবার পরিজনের অনুমতি ছাড়া সৌদি সরকার দাফন করেছে সেটি খুবই অমানবিক এবং বেআইনি। এ বিষয়টিকেও কোনোভাবে গ্রহণ করা যায় না।

 

বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ বলেন, হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এককভাবে সৌদি আরবের কাছে থাকা উচিত নয়। হজের সুষ্ঠু ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের দাবি অত্যন্ত যুক্তিসংগত এবং সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।

 

আর মিনা ট্রাজেডি নিয়ে ইরানই একমাত্র দেশ যারা সৌদি আরবের কাছে এর জবাবদিহিতা চেয়েছে। বলা চলে সৌদি সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে বাধ্য করেছে। ইরানের এই অবস্থান ন্যায্য। আর অন্যান্য দেশগুলো এ ব্যাপারে কথা না বলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

 

রেডিও তেহরান: এবার হজের সময় যে ভয়াবহ ক্রেন দুর্ঘটনা ও মিনায় ভিড়ের চাপে যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তাকে আপনি কীভাবে দেখছেন? অনেকে বলছেন, এটা ভাগ্যের ব্যাপার; মানুষের কিছু করার ছিল না। আপনার মত কী?

 

শাহ আলম: দেখুন মুমিনদের জন্য আল্লাহর শিক্ষা হচ্ছে ধৈর্যধারণ করা। যেকোনো ঘটনা যখন ঘটে তখন তা আল্লাহর তরফ থেকে ঘটেছে এভাবে মেনে নেয়া উচিত ধৈর্যধারণের উপায় হিসেবে।

 

তবে যখন কোনো সরকার, দেশ বা সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে তারা কখনও এধরণের কথা বলতে পারে না যে মিনায় যা ঘটেছে তা ভাগ্যের ব্যাপার; এতে মানুষের কিছু করার ছিল না। এধরণের বিবৃতি দিয়ে পার পেয়ে যাওয়া বৈধ বা সঠিক নয়। তাদের নিজেদের অবহেলা ও অযোগ্যতা থেকে দায়মুক্তির জন্য এ ধরনের বিবৃতি গ্রহণযোগ্য নয়। মিনা ট্রাজেডিতে তাদের যথেস্ট অবহেলা ছিল।

 

যখন ভারী স্থাপনা কোনো জায়গায় তৈরি হয় তখন সেখানে বহু ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়। এ অবস্থায় সেখানে নির্মাণ শ্রমিক এবং পেশাদার প্রকৌশলী ছাড়া সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকে। সাধারণ এরকম এলাকা সংরক্ষিত থাকে এবং যারা সেখানে কাজ করেন তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।

 

এরকম একটা পরিস্থিতিতে হজের মৌসুমে কাবার চারপাশে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হবে জেনেও তারা বড় বড় ক্রেনগুলো না সরিয়ে সেখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। অর্থাৎ সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে এধরনের চিন্তা তারা একেবারেই করেনি। এটা অবশ্যই তাদের অবহেলা, অবজ্ঞা এবং অব্যবস্থাপনার নমুনা। আর তাদের এই অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণেই সেখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ তারা এটাকে আল্লাহর ইচ্ছা বলে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এটা কোনোভাবেই সিদ্ধ নয়।

 

রেডিও তেহরান: মিনায় কত মানুষ মারা গেছেন তাদের প্রকৃত সংখ্যা সৌদি সরকার এখনো পরিষ্কার করে বলে নি। এছাড়া, অনেককে পরিবারের অনুমতি না নিয়েই দাফন করেছে সৌদি সরকার। এ বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

 

শাহ আলম: দেখুন  সৌদি আরবে মিনা ট্রাজেডিতে প্রকৃতপক্ষে মৃতের সংখ্যা কত সে বিষয়ে আমরা এখনও অন্ধকারে রয়েছি। প্রথম দিকে আমরা জানতে পারলাম যে প্রায় ৭০০ মতো হাজি নিহত হয়েছে। মৃত হাজির সংখ্যা এ পর্যন্ত আসার পর হঠাৎ করে পুরোপুরি  পরিসংখ্যান থেমে গেল। এরপর থেকে আর কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হলো না। তারপর বিভিন্ন সূত্র থেকে পররস্পরবিরোধী হাজি মৃতের নানা সংখ্যা আসতে থাকল। কখনও বলা হলো মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আবার এমনও খবর এসেছে যে মৃতের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

 

তবে সৌদি সরকার এই পরিসংখ্যানকে স্বীকারও বা নাকচ কোনোটাই করেনি। তারা এ বিষয়টিতে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করেছে। সৌদি সরকার মিনা ট্রাজেডি নিয়ে তথ্য গোপন করেছে। এ বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বহু মানুষের পরিবার পরিজন এবং আত্মীয়স্বজন হজে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকেই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর আসছে। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা কারো জানা নেই।

 

আপনি প্রশ্নের মধ্যে যে কথা বলেছেন যে, অনেককে পরিবারের অনুমতি না নিয়েই দাফন করেছে সৌদি সরকার। শুধু তাই নয় কোথায় তাদের কবর সেসব বিষয়েও কোনো তথ্য জানায়নি তারা। এটি খুবই অমানবিক এবং বেআইনি একটি ব্যাপার এবং এ বিষয়টিকেও কোনোভাবে গ্রহণ করা যায় না। এ বিষয়েও তাদের কোনো জবাবদিহীতা নেই। সৌদি সরকার তাদের ইচ্ছেমতো কাজগুলো করেছে। নিহত হাজিদের পরিবারের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা তারা গ্রহণ করেনি।

 

রেডিও তেহরান: হজের সময় বিশেষ করে মিনার ঘটনার পর ইরান এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করেছে। জবাবে সৌদি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইরান বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করছে। ইরানের এই প্রতিবাদী ভূমিকা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

 

শাহ আলম: দেখুন হজ একজন ব্যক্তির একটি ব্যক্তিগত ইবাদত। তবে একজন ব্যক্তি যখন হজে যান তখন বিষয়টি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যারা হজে যাবেন তাদেরকে অবশ্যই নিজের দেশের ছাড়পত্র নিতে হয় আবার যখন সৌদি আরবে গিয়ে পৌঁছবেন তখন সেদেশে প্রবেশের জন্য অনুমতি নিতে হয়।

 

ফলে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের নিরাপত্তার দায়দায়িত্বের ব্যাপারে তার নিজ দেশের সরকারকে খোঁজখবর রাখতে হয় এবং দায়িত্ব নিতে হয়। একারণে মিনায় ইরানের বিপুল সংখ্যক হাজি নিহত হওয়ায় তারা যে চাপ সৃষ্টি করেছে সৌদি আরবের ওপর সেটা যদি রাজনৈতিক হয়েও থাকে তাহলে তো দোষের কিছু নয়।

 

কেননা ইরানের নাগরিক যেখানেই অবস্থান করুন না কেন সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তার দেশের নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। যেকোনো সরকার তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে অঙ্গীকারবদ্ধ। ফলে ইরান যদি বিষয়টি উত্থাপন করে থাকে তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। রাষ্ট্র হিসেবে ইরান তার নাগরিকদের ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করছে। নিজের নাগরিকদের ওপর দায়বদ্ধতার সূত্র থেকে তারা কথা বলছে।

 

আর মিনার ঘটনায় অন্যান্য দেশের সরকারগুলো যে কথা বলেনি এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আর সেইসব দেশের নাগরিকদের ভাগ্যে কি হয়েছে সে ব্যাপারে সৌদি সরকারকে কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে আনার চেষ্টা করেনি। এটা ঠিক নয়, খুবই দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।

 

আমরা দেখলাম ইরানই একমাত্র দেশ যারা সৌদি আরবের কাছে এর জবাবদিহিতা চেয়েছে। বলা চলে সৌদি সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে বাধ্য করেছে। ইরানের এই অবস্থান ন্যায্য।

 

 

রেডিও তেহরান: সৌদি সরকারের হজ ব্যবস্থাপনায় অনেক দেশ নাখোশ হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশ দাবি তুলেছে, হজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করতে হবে। কতটা যৌক্তিক এ দাবি?

 

শাহ আলম: হজের সুষ্ঠু ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের দাবি অত্যন্ত যুক্তিসংগত। আমি মনে করি এটাই সঠিক। এ ব্যাপারে আমি নিজে নিবন্ধ লিখেছি। যেসব দেশের নাগরিক দেশে যান তাদের সবার অংশীদারিত্ব থাকা প্রয়োজন হজ ব্যবস্থাপনায়। এটা দুভাবে হতে পারে।

 

প্রথমত- নতুন কোনো হজ ব্যবস্থাপনা কমিটি বা সংগঠন তৈরি করা যেতে পারে।

 

দ্বিতীয়টি হচ্ছে- বিদ্যমান ওআইসির মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে। ওআইসি একটি হজ ব্যবস্থাপনা শাখা সৃষ্টি করে তার দায়িত্ব সম্প্রসারণ করে এই কাজটি করতে পারে। আমি মনে করি হজের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব দেশের নাগরিকরা হজে যান সেসব দেশের অংশীদারিত্ব থাকা খুবই প্রয়োজন।

 

হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এককভাবে সৌদি সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। হাজিদের তারা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে একথা তারা বারবার তারা প্রমাণ করেছে। মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনা বা মিনায় ভয়াবহ ট্রাজেডি এটিই প্রথম দুর্ঘটনা নয়; এর আগেও বহুবার এমনটি ঘটেছে।

 

 

রেডিও তেহরান: জনাব শাহ আলম, হজকে আরো সুষ্ঠু সুন্দর করে তোলার জন্য আপনার বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে?

 

শাহ আলম: জ্বি হজকে আরো সুষ্ঠু ও সুন্দর করে তোলার জন্য আমার বিশেষ কিছু পরামর্শ আছে।

 

প্রথমত- হাজিদের শিক্ষাদান বিশেষ করে নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দান করাতে হবে। আর এ বিষয়টি করতে পারে যেসব দেশের নাগরিকরা হজে যান সেইসব দেশের সরকার। হজে পাঠানোর আগে তাদের হাজিদের যথার্থ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবেন। দেখা যায় হাজিদের মধ্যে অনেক সংস্কার রয়েছে যেগুলো আদৌ ইসলামের সাথে সম্পর্কিত নয়। নিতান্তই ধারণার ওপর নির্ভর করে এগুলো করে থাকেন। অনেকে  এ কারণে হজে গিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজনা ও আবেগে ভোগেন। ফলে অনেকসময় তারা অযাচিত আচরণ করে থাকে। আর এটা তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।

 

দ্বিতীয়ত- হজের সাথে যথেস্ট শারিরীক সক্ষমতার একটি সম্পর্ক রয়েছে। হজে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার তাদের হাজিদের শারিরীক সক্ষমতার বিষয়টি পরীক্ষা করে নেবেন।

 

তৃতীয়ত- হজ বর্তমানে দারুনভাবে বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে গেছে। আগে আমরা দেখেছি হাজিরা ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিয়ে হজে যেতে পারতেন। বর্তমানে সৌদি সরকার হজে যাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক করেছে যে কেউ হজে যেতে চাইলে তাকে যেকোনো এজেন্সির মাধ্যমে যেতে হবে। এজেন্সি ছাড়া কেউ হজে যেতে পারবে না। ফলে এজেন্সিগুলো হজ নিয়ে মনোপোলি ব্যবসা করছে। এজেন্সিগুলো হজের  ব্যয় অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে যেটি হাজিদের ওপর একধরণের জুলুম। এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।

 

চতুর্থ- হজ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশীদারিত্ব থাকার কথা আমি আগেও বলেছি আবার বলছি। সবগুলো মুসলিম দেশে অংশীদারিত্ব থাকা উচিত। তাছাড়া প্রতিটি দেশের সরকার তাদের নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করবে।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/২৪

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন