এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 05 ডিসেম্বর 2015 12:00

‘রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়া সিরিয়া সংকট খুব সহজে সমাধান সম্ভব নয়’

‘রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়া সিরিয়া সংকট খুব সহজে সমাধান সম্ভব নয়’

৫ ডিসেম্বর(রেডিও তেহরান): রাশিয়ার বিমান ভূপাতিক করার ফলে পরিস্থিতি খানিকটা ধোয়াটে এবং উদ্বেগের। তবে এই ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক এবং বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাহফুজ উল্লাহ।

 

তিনি বলেন, রাশিয়া যে বাশার আল আসাদের পক্ষে দাঁড়াবে সেটি খুব স্বাভাবিক বিষয়। কারণ যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল তখনও সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক খুব গভীর ছিল। সিরিয়ার ঘটনায় রাশিয়া জড়িয়ে পড়ায় আরব বিশ্বে সিরিয়া এবং সিরিয়াকেন্দ্রীক সমীকরণ অনেকখানি বদলে গেছে। অবশ্য রাশিয়া এখানে জড়িত হওয়ার ফলে সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে এমনটি মনে করার কারণ নেই।


মাহফুজ উল্লাহ বলেন, সিরিয়াতে বর্তমানে যে সংকট রয়েছে তা থেকে সহজে কেউ বেরুতে পারবে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ হচ্ছে সিরিয়ার সংকট মূলত রাজনৈতিক। আর যেকোনো রাজনৈতিক সংকট সংলাপ ছাড়া অন্য কোনোভাবে সমাধান সম্ভব নয়।


পুরো বক্তব্যটি উপস্থাপন করা হল। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ এবং উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।



রেডিও তেহরান: সিরিয়ার আকাশে রাশিয়ার একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে তুরস্ক। এ বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, তুরস্ক রাশিয়ার পিঠে ছুরি মেরেছে। এসব বক্তব্য ও ঘটনায় পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বলে আপনার মনে হয়?


মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন খবরে বলা হয়েছে রাশিয়ার একটি বিমান তুরস্ক ভূপাতিত করেছে। তবে পরবর্তী পর্যায়ে যেসব তথ্য এসেছে তাতে পরিস্থিতিকে খানিকটা ধোয়াটে বলে মনে হচ্ছে।
কারণ হচ্ছে- বলা হয়েছে মাত্র ১৭ সেকেন্ডের জন্য রুশ বিমানটি তুরস্কের আকাশে অনুপ্রবেশ করেছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাত্র ১৭ সেকেন্ডের জন্য অনুপ্রবেশের পর ১০ বার বিমানটিকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে দাবি করা হচ্ছে তা কতোটা যুক্তিসঙ্গত।


অংকের হিসেবে বিষয়টা কিছুটা অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কাজেই এটা সতের সেকেন্ড না সতের মিনিট সেটা একটি প্রশ্ন। অবশ্য অন্যদিক থেকে চিন্তা করলে একটি দ্রুতগামী বিমানের জন্য ১৭ সেকেন্ড যথেস্ট সময়। তবে যেভাবে বিমানটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে সেটি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। কিন্তু ভূপাতিত করার ঘটনাটি আমরা যেভাবে দেখছি এবং রাশিয়া যেভাবে দেখছে তাতে বিষয়টি একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য আমি মনে করিনা যে এই ঘটনা সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বিশ্ব রাজনীতিতে।



যদিও তুরস্ক এরইমধ্যে ন্যাটোর সাথে কথা বলেছে এবং তাদের সমর্থন পেয়েছে। আর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন যে মন্তব্য করেছেন যে এটি ‘পিঠে ছুরিকাঘাত’- এধরণের সরাসরি মন্তব্য পুতিন সাধারণত করে থাকেন।


মাঝে মাঝে বেশ মজার মজার মন্তব্যও করেন তিনি। যেমন কিছুদিন আগে প্যারিস ঘটনার পর ‘জি ২০’ সম্মেলনে তিনি পৃথিবীর চল্লিশটি দেশের ব্যাপারে তিনি কথা বলেছেন এবং তাদের অনেকেই আইএসআইএলকে সহায়তার ব্যাপারে জড়িত আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। যদিও তিনি এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য জনসমকক্ষে প্রকাশ করেন নি। আমরা খবরের মাধ্যমে যেটা জানতে পেরেছি- তিনি জি ২০ এর নেতৃবৃন্দকে ‘নামধাম’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।


আর রাশিয়া যে বাশার আল আসাদের পক্ষে দাঁড়াবে সেটি খুব স্বাভাবিক বিষয়। কারণ যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল তখনও সিরিয়ার সাথে সম্পর্ক খুব গভীর ছিল। পরবর্তীতে সোভিয়েত ভেঙে গেলেও রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ার সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। শুধু সিরিয়া নয় তাদের সাথে পুরনো সব মিত্রদের সম্পর্ক এখনও মোটামুটি ভালো। যেকারণে সিরিয়ার ঘটনায় রাশিয়া জড়িয়ে পড়ায় আরব বিশ্বে সিরিয়া এবং সিরিয়াকেন্দ্রীক সমীকরণ অনেকখানি বদলে গেছে এবং সামনে আরো বদলে যাবে। অবশ্য রাশিয়া এখানে জড়িত হওয়ার ফলে সংকট থেকে উত্তরণ ঘটবে এমনটি মনে করার কারণ নেই। এরইমধ্যে আমরা দেখছি সিরিয়াতে নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৯ সালে সরকার পরিবর্তনে বা সরকারের বৈধতা অর্জনের একটা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যদি সেটা হয় তাহলে চিত্রটা অন্যরকম হয়ে যাবে। কিন্তু সিরিয়াতে বর্তমানে যে সংকট রয়েছে তা থেকে সহজে কেউ বেরুতে পারবে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ হচ্ছে সিরিয়ার সংকট মূলত রাজনৈতিক। আর যেকোনো রাজনৈতিক সংকট সংলাপ ছাড়া অন্য কোনোভাবে সমাধান সম্ভব নয়।



রেডিও তেহরান: রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান তার দেশের চিফ অব স্টাফের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শ করেছেন এবং বিষয়টি ন্যাটো জোটকে জানানো হয়েছে। তাতে কী মনে হয় এ বিবাদে ন্যাটো জোট জড়িয়ে পড়বে?


মাহফুজ উল্লাহ: আমার কাছে মনে হয় না ন্যাটো এ ব্যাপারে সশস্ত্রভাবে জড়িয়ে পড়বে। ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল দুপক্ষকেই সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি মূলত সীমাবদ্ধ থাকবে কূটনৈতি হুঙ্কার এবং মন্তব্যের মধ্যে। বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনায় এমনটি মনে হয় না যে দুপক্ষ বিবদমান হয়ে একটা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে।



রেডিও তেহরান: তুরস্ক দাবি করেছে তার আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর সতর্ক করা হয়েছে এবং তারপর রুশ বিমানটি ভুপাতিত করা হয়েছে। ওদিকে, রাশিয়া বলছে, রুশ বিমান কোনভাবেই তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে নি- সীমান্ত থেকে ৬০০০ মিটার দূর ছিল। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে- যদি আকাশসীমা লঙ্ঘন করেও থাকে তাহলে কী বিমানটি ভূপাতিত করা সঠিক হয়েছে? এখান থেকে রাশিয়ার প্রতি তুরস্কের শত্রুতার একটা ইঙ্গিত কী ফুটে ওঠে না?


মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন এ বিষয়টি দুভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একটা হচ্ছে রাশিয়ার প্রতি তুরস্কের শত্রুতামূলক মনোভবের বহিঃপ্রকাশ। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে একটি বিষয়কে যারা খুব সাধারণভাবে বিশ্বাস করেন তারা হয়তো বলবে অনুপ্রবেশের মতো একটি ঘটনা ঘটেছে। তবে অন্য কোনো দেশের বিমান এভাবে অনুপ্রবেশ করলে এই ঘটনাটি ঘটত কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আর তাই এটা মনে করার যুক্তসঙ্গত কারণ আছে যে, তুরস্ক যেভাবে রাশিয়া বিরোধী মনোভবপোষণ করে এটি তারই বহিঃপ্রকাশ।



রেডিও তেহরান: রুশ বিমান ভূপাতিত করার পর অনেকেই বলছেন, তুরস্ক যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল’র পক্ষে এই ঘটনা থেকে তা আবার প্রমাণিত হলো। আপনার মন্তব্য কী?


মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন রুশ বিমান ভূপাতিত করার ফলে তুরস্ক যে সরাসরি আইএসআইএলের পক্ষে সেটা প্রমাণ করে না। আইএসআইএলের ব্যাপারে তুরস্কের যে ভূমিকা তারই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ এটি। আইএসআইএলের ব্যাপারে তুরস্কের ভূমিকা এবং অবস্থানের পূর্বাপর বিষয়টাই এ ঘটনা থেকে পরিস্কার হয়ে যায়। আইএসআইএলের পক্ষে তুরস্কের একটা নৈতিক ও সামরিক সমর্থন আছে। তুরস্কের বর্তমান সরকারের চিন্তাধারা এবং বৈদেশিক নীতির সাথে সম্পর্কিত। আর সেকারণে তুরস্ক বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর মনে করে।


যেহেতু রাশিয়া এরইমধ্যে সিরিয়ায় আইএসআইএল বিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছে। আর পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়ার কারণে তারা বিষয়টিকে আরো একটু সম্প্রসারিত করেছে।



রেডিও তেহরান: সিরিয়ার চলমান সংকটে বাশার আসাদ-বিরোধীদের সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক। এটা কতটা সঠিক পদক্ষেপ? একইভাবে সিরিয়া যদি তুরস্কের পিকেকে গেরিলাদের তুর্কি সরকারের বিরুদ্ধে সমর্থন দিত তাহলে তুরস্ক সরকার কী তা মানতো?


মাহফুজ উল্লাহ: আপনি প্রশ্নটাকে যদি আরেকটু পেছনে নিয়ে যেতেন তাহলে ভালো হতো। এই যে পররাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ এজন্য কি সিরিয়া বা তুরস্ক একা দায়ী। এটা শুরু হয়েছে গত কয়েকবছর আগে। তখন থেকেই দেখেছি পররাষ্ট্রে বিনা কারণে হস্তক্ষেপ করা হয়। আমরা এখন দেখছি যে যুক্তরাজ্য ইরাক অভিযানের জন্য তাদের ভুল স্বীকার করছে এবং ক্ষমাও চাচ্ছে।


সিরিয়ার যে সমস্যা সেটা মূলত সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরবর্তী পর্যায়ে বাইরের উপাদান যুক্ত হয়েছে। আর বর্তমানে পৃথিবীর বহু দেশেই তাদের সরকার ব্যবস্থা জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর সে কারণেই বিরোধ দেখা দেয়। আর এক্ষেত্রে স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র খুব বড় একটা প্রশ্ন। আর সিরিয়ার সংকট রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। অন্য কোনোভাবেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। যদি অস্থায়ীভাবে কিছু একটা হলেও অভিমান এবং ক্ষোভের আগুনটা থেকে যাবে। আর সেটাকে সরাতে হলে একমাত্র সমাধান হচ্ছে রাজনৈতিক সংলাপ।#


রেডিও তেহরান/জিএআর/৫

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন