এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:49

মুসলিম বিশ্বে ষড়যন্ত্রের পেছনে রয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইল: ড.মিয়াজী

ড.অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী ড.অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী

৫ জানুয়ারি(রেডিও তেহরান): ইরানে ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত সময়ে যে ঐক্যসপ্তাহ পালন করা হয় সেটি খুবই চমৎকার উদ্যোগ। রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাওলানা আতাউর রহমান মিয়াজী। তিনি মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, ঐক্য সপ্তাহ’র মাধ্যমে এ ম্যাসেজটি সবার মধ্যে দেয়া গেলে ঐক্য সম্ভব।

 

সারাবিশ্বের দেশে দেশে একদল মুসলমান আরেক দল মুসলমানকে হত্যা করা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট এই ইসলামি চিন্তাবিদ বলেন,এটি আসলে একটি ষড়যন্ত্র। আর এ ষড়যন্ত্র হচ্ছে মুসলিম ভার্সেস অমুসলিমের। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর যারা সবচেয়ে বড় শক্র তারাই মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আর মুসলিম উম্মাহর ক্ষতির জন্য মুসলিম উম্মাহরই কিছু কিছু লোককে অর্থের বিনিময়ে অথবা অন্য কোনোকিছুর বিনিময়ে কনভিন্স করে বিপথে পরিচালিত করছে।

 

তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদীদের দালালরা শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব তৈরিতে এবং জিইয়ে রাখতে মূলত প্রধান ভূমিকা পালন করছে। আর মুসলিম বিশ্বে একের বিরুদ্ধে অন্যের যে ষড়যন্ত্র দেখছি এর পেছনে রয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইল ও তাদের দোসররা।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র) ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত সময়কে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ ঘোষণা করেছিলেন। সেই অনুযায়ী ঐক্য সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- মুসলিম বিশ্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ইরানের এই উদ্যোগকে কীভাবে দেখেন আপনি?

 

অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী: ইরানের ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে খুবই চমৎকার একটি উদ্যোগ। আর এ বিষয়ের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী(র.) জড়িত অর্থাৎ তিনি ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল পর্যন্ত সময়কে ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত ইসলামি তা পালন করে আসছে এবং এটি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে সে প্রত্যাশা করছি।

 

রেডিও তেহরান: মুসলিম বিশ্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখছে ঐক্য সপ্তাহ এবং ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আরো কী করা যায়?

 

অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী: মুসলিম বিশ্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এ ঐক্য সপ্তাহ পালন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর মুসলিম বিশ্বে ঐক্য প্রতিষ্ঠা খুব বেশি দরকার। কারণ শিয়া-সুন্নি ও অন্যান্য দলগত-মতগত এবং মাজহাবগত বিভেদ ইত্যাদি থাকা উচিত না এ বিষয়টি আমাদের এখনও সবার বুঝতে সময় লাগছে। সবাই কিন্তু বিষয়গুলোকে সেভাবে নিচ্ছেন না।

 

আর ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আমার দৃষ্টিতে করণীয় হচ্ছে- ইসলামের যে মূল দিক সে ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি দেয়া দরকার। আমরা অনেকে ইসলামের মধ্যে ফেরকা বা দল উপদল-বিভাগ ইত্যাদি আছে এমনটি বলে থাকি। আমি বিষয়টিকে সেভাবে দেখে না প্রকৃতপক্ষে ইসলামের যে মূল সূত্র মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাতে রসুল বা হাদিস।

 

এ বিষয়ে রাসুল (সা.)বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি থাকছি না কিন্তু তোমাদের জন্য দুটো গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ রেখে গেলাম যতদিন পর্যন্ত তোমরা ওই দুটো বিষয়ের ওপর কায়েম থাকবে বা আঁকড়ে থাকবে ততদিন পর্যন্ত তোমরা গোমরাহিতে নিমজ্জিত হবে না এবং বিপথে যাবে না, তোমরা সঠিক পথে থাকবে। আর সে বিষয় দুটো হলো পবিত্র কুরআন এবং রাসুলের সুন্নাহ বা হাদিস। এ দুটো বিষয় হচ্ছে ঐক্যের মূল ভিত্তি। আর এ দুটোর সাথে মিল রেখে ওয়াজিব-সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ও হারাম। এসব বিষয় ঠিক রেখে এর বাইরে অন্য ছোটোখাটো যেসব বিষয়ে মতভেদ আছে তাকে উপেক্ষা করে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আর ছোটোখাটো বিষয়ে যাতে কোনো মতভেদ আমাদের মধ্যে না থাকে আমদের সেই চেষ্টা করতে হবে।

 

আর যেহেতু ফরজ, ওয়াজিব- সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এবং হারাম- এসব মৌলিক বিষয়ে যেহেতু কারো কোনো ভিন্নমত নেই- সবাই একমত ফলে তাদের সবাইকে নিয়ে ঐক্য সপ্তাহে ‘ঐক্যের ম্যাসেজটি সবার মধ্যে তুলে ধরত হবে। তাহলে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর উন্নতি অগ্রগতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে কাজ করবে।

 

রেডিও তেহরান: আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন দেশে এক দল মুসলমান আরেক দল মুসলমানকে হত্যা করছে। এর কারণ কী?

 

অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী: আমরা যে দেখছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একদল মুসলমান আরেক দল মুসলমানকে হত্যা করছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে এবং ক্ষতি করছে। এ বিষয়ে তিনটি দিক আমি খুব সংক্ষেপে বলতে চাই, প্রথমত এটি আসলে একটি ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্র আসলে কাদের! মুসলিম ভার্সেস মুসলিম ষড়যন্ত্র এটি প্রথম পর্যায়ে নয়। মুসলিম ভার্সেস অমুসলিম ষড়যন্ত্রটাই প্রথম পর্যায়ের। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর যারা সবচেয়ে বড় শক্র তারাই মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আর মুসলিম উম্মাহর ক্ষতির জন্য সেই ষড়যন্ত্র করতে গিয়ে মুসলিম উম্মাহরই কিছু কিছু লোককে যারা এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বোঝে না তাদেরকে হয় অর্থের বিনিময়ে অথবা অন্য কোনোকিছুর বিনিময়ে কনভিন্স করে বিপথে পরিচালিত করছে।

 

যেমন ধরুন বাংলাদেশের নিরীখে- জামাতুল মুজাহেদিন বা জেএমবি এবং বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি আইএসআইএল বা এ ধরণের যেসব সংগঠন আছে তাদের কর্মকাণ্ডকে উল্লেখ করতে পারি। এদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে একের বিরুদ্ধে অন্যের ষড়যন্ত্র দেখছি এর পেছনে রয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইল। আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে মনে হয় অমুসলিম বিশ্বে নেতৃত্বের আসনে থাকা আমেরিকা, ইসরাইল এবং তাদের দোসররাই মূলত কিছু বিপথগামী মুসলিমকে ব্যবহার করছে। আর তারা এভাবে ব্যবহৃত হয়ে মুসলিম হিসেবে পরস্পরের ক্ষতিসাধন করছে। এসব বিষয়কে খুব ঠাণ্ডা মাথায় আমাদেরকে বুঝতে হবে এবং যাতে এ কাজটি না করে সে ব্যাপারে বুঝাতে হবে ও সচেতন থাকতে হবে। আর সে বিষয়েও ইরানের ঐক্য সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

রেডিও তেহরান: চার সুন্নি মাজহাবের আলেমরা পরস্পরের মাজহাবকে সঠিক বলে মনে করেন। তারা বলেন, এই চার মাজহাবের যে কোনো এক মাজহাব অনুসরণ করলেই পারলৌকিক মুক্তি আসবে। কিন্তু শিয়া মাজহাব- যাকে জাফরি মাজহাবও বলা হয় তাকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সুন্নি মাজহাবগুলোর কোনো কোনো আলেমের আপত্তি দেখা যায়। এটি কেন? চার সুন্নি মাজহাবের মতো শিয়া মাজহাবের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিকে খানিকটা উদার করলে কি মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠা আরো সহজ হতো না?

 

অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী: আপনি অত্যন্ত চমৎকার একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান ও গ্রান্ড মুফতি শেখ মাহমুদ তার এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় বলেছেন, জাফরি মাজহাব এমন একটি মাজহাব যার অনুসরণ আহলে সুন্নতের অন্যান্য মাজহাবের অনুসরণের মতোই বৈধ।

 

মুজতাহিদরা যদি ইজতিহাদ করেন তাহলে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে পৃথিবীতে তো মাজহাব তো শুধু চারটা নয়- মাজহাব অসংখ্য। ছোটোখাটো মিলে আমার জানামতে প্রায় সাড়ে আট শ মাজহাব রয়েছে। এর পাশাপাশি বারো ইমাম বিষয়ক যে মতাদর্শ শিয়াদের ক্ষেত্রে আমরা মনে করি সেটাও একটি মাজহাব। এই শিয়া মাজহাবকে অন্য চারটি মাজহাবের কাছাকাছি দেখতে পাই।

খুব একটা বড় ধরণের দূরত্ব অন্য চারটি মাজহাবের সাথে শিয়া মাজহাবের আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না। যেসব ছোটোখাটো মতভেদ আমরা দেখতে পাই সে ব্যাপারে আমাদের উচিত হবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে, মুসলিম বিশ্বের ঐকবদ্ধ থাকার স্বার্থে চারটি মাজহাবের বড় বড় দিক নির্দেশনাকারীদের সাথে শিয়া মাজহাবের নেতৃস্থানীয়দের একসাথে বসা এবং বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দূরত্বটা কিভাবে নিরসন করা যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া। এরমাধ্যমে শিয়া মাজহাবের সাথে সুন্নি মাজহাবাগুলোর নিকটতম দূরত্বকে মুছে দিয়ে যদি সবাই কাছাকাছি আসা যায় তাহলে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সাধনের এ উদ্যোগ সফল হবে বলে মনে করি।

 

 

রেডিও তেহরান: ইসলামী দেশসমূহে যেসব নাপাক লোকজন শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, তারা শিয়াও নয়, সুন্নিও নয়; বরং তারা হলো সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল, যারা ইসলামী দেশসমূহকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়।’- ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনীর এ মন্তব্যের সাথে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বাস্তবতায় কোনো মিল দেখতে পাচ্ছেন কি?

 

অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী: হ্যাঁ ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (র.)’র এ মন্তব্যের সাথে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বাস্তবতায় যথার্থই মিল দেখতে পাচ্ছি। সত্যিকারার্থে দ্বন্দ্বটা শিয়া-সুন্নির ভেতরে। কিন্তু আসলে এরা কেউ শিয়াও নয় সুন্নিও নয়। বরং সাম্রাজ্যবাদীদের দালালরা এই দ্বন্দ্ব তৈরিতে এবং জিইয়ে রাখতে মূলত মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

 

মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) অত্যন্ত দূরদর্শী, বিজ্ঞ ও মুজতাহিদ ছিলেন। আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তিনি ওই সময় তার এ বক্তব্য উপস্থাপন করে আমাদেরকে তিনি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে এ বিষয়গুলো নিয়ে তোমরা ভাবো। আর এটাই আমাদের জন্য সত্যিকারের দিক নির্দেশনা। সুতরাং মুসলিম বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সকলের উচিত মুসলমানদের স্বার্থে যাতে আমাদের সবার মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই চেষ্টা করা।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/৫

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন