এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 21 জানুয়ারী 2016 15:15

সৌদি জোট দায়েশ রক্ষার কৌশল: ফজলে হোসেন বাদশা

সৌদি জোট দায়েশ রক্ষার কৌশল: ফজলে হোসেন বাদশা

২১ জানুয়ারি(রেডিও তেহরান): সৌদি আরব ঘোষিত ৩৪ জাতির সমন্বয়ে গঠিত সামরিক জোটে বাংলাদেশের যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখানে যোগ দিলে সেটা হবে সংবিধান পরিপন্থী। এমন মন্তব্য করেছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক, ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য আদিবাসী-বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা।

 

তিনি প্রশ্ন করেন, সৌদি ঘোষিত এ জোটে কেন ইরান, সিরিয়া ও ইরাককে রাখা হলো না। অথচ ইরানের স্পষ্ট অবস্থান তো আইএসআইল বিরোধী। ইরান-সিরিয়া ও ইরাককে না রাখার ফলে এ জোট আরব বিশ্বের সংঘাতকে আরো তীব্রতর করবে।

 

ফজলে হোসেন বাদশা রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সৌদি আরবের একজন ধর্মীয় নেতা শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার উদ্দেশ্য হচ্ছে উসকানি সৃষ্টি করা এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা করা।

 

তিনি আরো বলেন- শিয়া-সুন্নি বিভেদ আমাদের কারো কাম্য নয়। আমরা মনে করি সবাই মুসলমান। আর ইরানকে জোটে না রাখা ও শিয়া-সুন্নির বিভেদ মূলত আইএসআইএলকে (দায়েশ) রক্ষা করার ষড়যন্ত্র।

 

ফজলে হোসেন বাদশার পুরো বক্তব্য উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

 

রেডিও তেহরান: জনাব ফজলে হোসেন বাদশা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে সম্প্রতি সৌদি আরব ৩৪ জাতির সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট ঘোষণা করেছে। তবে অনেক দেশই এ বিষয়ে কিছু জানে না; আবার ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশকে এ জোটে রাখা হয় নি। সে কারণে অনেকে এ জোট গঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আপনি কীভাবে দেখছেন এ সামরিক জোট গঠনের বিষয়টিকে? এবং এ জোট গঠনের আসলে কতটা প্রয়োজনীয়তা রয়েছে?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: সৌদি আরব ৩৪ জাতির সমন্বয়ে যে সামরিক জোটের ঘোষণা দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের যুক্ত কোনো সুযোগ নেই কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এই জোটে বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের সাথে সম্পর্কিত নয় এই জোটে যাওয়ার ব্যাপারটি। ফলে এই জোটে আমাদের যাওয়ার বিষয়টি সংবিধান পরিপন্থী বলা যেতে পারে।

 

জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়া কোনো জোটে বাংলাদেশের যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে আমরা মনে করি যে, আরব বিশ্বের যে সংকট সেটি আরব বিশ্বের জনগণের চেয়ে তাদের সরকারগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আরব বিশ্বকে বিভক্ত করে তাদের সংকটের সমাধান হবে না। সেক্ষেত্রে আমি মনে করি সৌদি নেতৃত্বে যে জোট হয়েছে সেখানে ইরান, সিরিয়া এবং ইরাক যদি না থাকে বা না রাখা হয় তাহলে ওই জোট কোনো কার্যকর হবে না, বরং আরব বিশ্বের সংঘাত আরো তীব্রতর হবে।

 

 

রেডিও তেহরান: সৌদি আরব ঘোষিত সামরিক জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ রয়েছে এবং এ নিয়ে নানা দেনদরবার চলছে। এ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: আমরা দেখেছি বাংলাদেশ সরকার তার প্রকৃত অবস্থান ঘোষণা করেছে। সরকার বলেছে তারা কোনো সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করবে না এবং কোনোরকম সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হবে না। সরকার আরো বলেছে, আমরা সৌদি আরবে সন্ত্রাসবিরোধী যে কেন্দ্র রয়েছে তার সাথে যোগাযোগ রাখব এবং সন্ত্রাস সম্পর্কিত তথ্য বিনিময় করব। আমি এটিরও বিরোধীতা করি।

 

আমার বিরোধীতা করার কারণ হচ্ছে- বর্তমান যে সৌদি নেতৃত্ব রয়েছে তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মুক্তি যাওয়ার জন্য বিভিন্ন রকম পথে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি মনে করি এই সময় সৌদি আরবের একজন ধর্মীয় নেতাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা একটা উসকানি ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থাৎ আরবের ভেতরে যে সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

 

রেডিও তেহরান: জনাব ফজলে হোসেন বাদশাহ, আপনি নিশ্চয় জানেন, সৌদি আরবে ওমরাহ করার বিষয়ে বাংলাদেশের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। এছাড়া, বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানির বিষয়ে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এসব সীমাবদ্ধতা বা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। এসবই কী জোটে যোগ দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে হয়?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: দেখুন সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে এই ধারণা হয়েছে যে ওমরাহ হজ এবং সেখানে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে সুবিধা পাওয়ার স্বার্থেই সরকার কৌশলগতভাবে এই জোটে যোগ দিয়েছে। এধরণের একটি ধারণা জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।

 

আর যদি এটা হয়েও থাকে তাহলে তা উভয়পক্ষের জন্য অন্যায় আচরণ। কারণ বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। এদেশে যারা ইসলামে বিশ্বাসী তাদের ওমরাহ করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া বা বাধা সৃষ্টি করা সৌদি সরকারের জন্য ন্যায়সঙ্গত আচরণ নয়।

 

আর বাংলাদেশের শ্রমিকরা যে সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির উন্নয়নের জন্য যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে তার স্বীকৃতি থাকা উচিত। কিন্তু সেই স্বীকৃতি আজও বাংলাদেশের শ্রমিকরা পায় নি। ফলে পুরো বিষয়টি আমাদের ভাবা উচিত। যদি এর পেছনে এ কারণ থেকে থাকে তাহলে সেটাকে সমর্থন করা যায় না।

 

 

রেডিও তেহরান: সৌদি অর্থে নির্মিত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র হস্তান্তর উপলক্ষে সৌদি আরবের একজন প্রিন্স ২ দিনব্যাপী বাংলাদেশ সফর করলেন। অনেকে ধারণা করছেন, সৌদি জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার জন্যই মূলত তার এ সফর। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: সৌদি জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপার রয়েছে বলেও আমার মনে হয়। আর সৌদি আরব বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণের কাজ কিন্তু আজ থেকে শুরু করেনি। ২৫ বছর আগ থেকে তারা এ কাজ করছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্র উদ্বোধন করার জন্য একজন প্রিন্সের আসার বিষয়টি খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আমার মনে হয় বাংলাদেশের সাথে এবং বিভিন্নমহলের সাথে খোলামেলা আলাপ আলোচনার জন্যই সৌদি প্রিন্সের ঢাকায় আসার ঘটনা ছিল; এটাই ঠিক।

 

 

রেডিও তেহরান: জনাব ফজলে হোসেন বাদশা, সৌদি ঘোষিত এ জোটে ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ না থাকায় এটা পরিষ্কার যে, সৌদি আরব মূলত এ ধরনের জোট গঠনের মাধ্যমে শিয়া মুসলমান-বিরোধী একটি বলয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আপনার কী তাই মনে হয়?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: দেখুন সৌদি আরবে শিয়া মুসলমান বিরোধী একটি বলে গড়ে তোলার চেষ্টাকে সমর্থন করার প্রশ্নই ওঠে না। মুসলমানদের মধ্যে একটি শিয়া এবং একটি সুন্নি বলয় গড়ে ওঠবে এটাকে আমি সমর্থনযোগ্য বলে মনে করি না। মুসলমানদের থাকবে একটি মাত্র জোট। আরব বিশ্বকে একটি অবিভক্ত এবং অভিন্ন বিষয় বলে যারা মনে করবে তারাই এ সমস্যার সমধান করতে পারবে।

 

 

রেডিও তেহরান: সর্বশেষ আপনার কাছে জানতে চাইব, এই জোট যদি কার্যকর হয় তাহলে তা মুসলিম বিশ্বের জন্য কতটা উপকারী হবে? অনেকে মনে করেন, চূড়ান্তভাবে এ জোট গঠন করা হলে শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব প্রকট হবে এবং মুসলিম বিশ্বে বিভেদ বাড়বে। আপনার মতামত কী? বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ঐক্য প্রয়াসী হতে পারে কিনা?

 

ফজলে হোসেন বাদশা: দেখুন এ ব্যাপারে আমার স্পষ্ট একটা মত আছে। আর বিষয়টি আইএসআইএলকে কেন্দ্র করে। শিয়াদেরকে আলাদা করার কোনো যুক্তি আছে বলে আমি মনে করি না। কেননা শিয়াদের অবস্থান আইএসআইএলের বিরুদ্ধে। তাহলে কেন শিয়াদের বিশেষ করে ইরানকে সৌদি জোটের অর্ন্তরভুক্ত করা হলো না- এটি আমার প্রশ্ন।

 

আর এই শিয়া সুন্নির বিভেদ মূলত আইএসআইএলকেই রক্ষা করবে। আর সৌদি আরবের এ কৌশল আইএসআইএলকে রক্ষার একটি কৌশলও হতে পারে। শিয়া-সুন্নিকে বিভক্ত করা, আরব বিশ্বকে বিভক্ত করা, শিয়া সুন্নির বিভক্তি নিয়ে সংঘাত হওয়া এটা মুসলমানদের জন্য কাম্য নয়।

 

আমরা বাংলাদেশে যারা বসবাস করি তারা কে শিয়া আর কে সুন্নি এটা আমাদের গণনার মধ্যে পড়ে না। আমরা সবাইকে মুসলমান মনে করি এবং তারা সবাই ইসলামে বিশ্বাস করে।

 

তবে বর্তমান সময়ে একটি বিষয় দেখে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি যে শিয়া সুন্নির বিভাজনকে উসকে দেয়ার প্রবণতা আরব বিশ্বের রাজনীতিতে প্রবল। এ প্রবণতা কখনই আমাদের কাম্য হতে পারে না।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/২১

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন