এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 23 জানুয়ারী 2016 18:57

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য কোনো রায় নয়: ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য কোনো রায় নয়: ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান

২৩ জানুয়ারি (রেডিও তেহরান): অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের রায় লেখা অবৈধ বলে সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়। আমরা এ নিয়ে একান্তে কথা বলেছি সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমানের সঙ্গে। আলাপে তিনি বলেছেন, অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতির রায় লেখার সাংবিধানিক বা আইনগত ক্যাপাসিটি থাকে না। 

 

তিনি বলেন, আমাদের দেশে এইসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এভাবে মন্তব্য হওয়াটাই একটা দুঃখজনক বিষয়। আর প্রধান বিচারপতির মন্তব্য কোনো রায় নয়। তিনি বাইরে প্রেসের সাথে বা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠানে কোনো বক্তব্য যখন দেন সেটার আইনগত মূল্য থাকে না।

 

তবে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য মূল্যহীন তো অবশ্যই না। কারণ তিনি শুধু একজন বিজ্ঞ বিচারপতিই নন, তিনি প্রধান বিচারপতিও। ফলে তার বক্তব্য অবশ্যই রাজনৈতিক ও আইনগত গুরুত্ব বহন করে। তবে সেটি আমাদের জন্য বাইন্ডিং নয় এজন্য যে, তিনি কোনো রায়ের মধ্যে একথাটি বলেন নি।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের রায় লেখা অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। এ নিয়ে বেশ তোলপাড় চলছে। আসলে রায় লেখার বিষয়ে সংবিধান বা আইন কী বলছে? এ নিয়ে কী পরিষ্কার কোনো দিক নির্দেশনা নেই?

 

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, আমাদের দেশে একটা সংস্কৃতি চালু হয়েছে যে, যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক বা আইনগত সমস্যা সৃষ্টি হলে সবার প্রশ্ন থাকে যে সংবিধানে সেটা আছে কি না!

 

আসলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যে কোনো দেশের সংবিধানে অনেক সময় আক্ষরিকভাবে অনেক কিছু লেখা থাকে না। বলতে গেলে সবকিছু তো সংবিধানে লেখাটা সম্ভব না। তবে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যেটাকে আমরা আইনজীবীরা বলি ‘সংবিধানের বিধি-বিধানগুলোকে আমাদের বুঝে নিতে হবে (Interpret) করতে হবে। আর আমাদের সংবিধানে আছে, Judiciary is the third organ of the state and It’s Independent organ. এখানে হাইকোর্ট তার নিজের Judicial discussion ‘র মাধ্যমে রায় দিয়ে থাকেন।

 

এখানে খুবই পরিষ্কারভাবে বলা আছে অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতির রায় লেখার সাংবিধানিক বা আইনগত ক্যাপাসিটি থাকে না।

 

তবে এখানে একটি বিষয় আছে, সেটি হচ্ছে কোনো বিচারপতি অবসরে যাওয়ার আগে থেকে রায় লেখা শুরু করেন এবং তা শেষ করতে না পারেন তাহলে তিনি পরবর্তীতে লিখতে পারেন। তবে এটি Interpretation’র বিষয়।

 

আর এ সম্পর্কে আমার মতামত হচ্ছে, আসলে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর এই জন্য যে প্রধান বিচারপতির একটি মতামতের ওপর একজন প্রাকটিসিং আইনজীবী হিসেবে আসলে কি মতামত দিতে পারি!

 

তবে একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে আমার মতামত হচ্ছে, আমাদের দেশে এইসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এভাবে মন্তব্য হওয়াটাই একটা দুঃখজনক বিষয়। সাধারণত একটা ডেভালাপ জুডিশিয়ারিতে অভ্যন্তরীণভাবে অনেক কিছুই হ্যান্ডেল করা হয় যা জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয় না।

 

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দণ্ডগুলো খুব বেশি প্রকট হয়ে যাওয়ার কারণে বিচার বিভাগের ওপর যে প্রভাবটা পড়ে তারই একটা প্রতিফলন বর্তমান পরিস্থিতি বলে আমি মনে করি।

 

রেডিও তেহরান: প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা আসলে কতটা গুরুত্ব বহন করে? অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলছেন, এ বক্তব্য প্রধান বিচারপতির নিজস্ব এবং অ্যাটর্নি জেনারেল এর সঙ্গে এক মত নন। তাহলে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য কী মূল্যহীন বা এর গুরুত্ব নেই?

 

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: দেখুন, আমাদের সংবিধানে আছে যখন কোনো বিচারপতি একটি জাজমেন্টের মাধ্যমে একটি বক্তব্য দেবেন- I mean When It’s part of judgment তখন তার একটা লিগ্যালিটি থাকে। আর তিনি Judgement এর বাইরে প্রেসের সাথে বা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠানে কোনো বক্তব্য দেন সেটার legal value থাকে না।

 

আর আমার মনে হয় প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের বিষয়ে এ কথাটাই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলতে চেয়েছেন। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, যে এটি প্রধান বিচারপতির নিজস্ব মন্তব্য।

 

তবে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য মূল্যহীন তো অবশ্যই না। কারণ তিনি একজন বিজ্ঞ বিচারপতি শুধু তাই নয় তিনি প্রধান বিচারপতি। ফলে তার বক্তব্য অবশ্যই একটা পলিটিক্যাল এবং লিগ্যাল ওয়েট ক্যারি করে। তবে সেটি আমাদের জন্য বাইন্ডিং নয় এজন্য যে তিনি কোনো জাজমেন্টের মধ্যে একথাটি বলেন নি।

 

 

রেডিও তেহরান: প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের পর বিএনপি বলেছে, বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর রায় লিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছেন। তার সে রায়ও ছিল অবৈধ। তাহলে তো সে রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে যে নির্বাচন হয়েছে তারও বৈধতার সংকট দেখা দেয়। কী বলবেন আপনি?

 

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: ততকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর রায় লিখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছেন এবং তা অবৈধ বলে বিএনপি যেকথা বলছে সেটিও আমি সেই আগের কথাই রিপিট করব। সেটি হচ্ছে – ‘ইন্টারপ্রিটেশন অব দ্যা ল’। অবসরে গিয়ে যে রায় দিয়েছেন সেটি বৈধ না অবৈধ সেটি আসলে- It’s decided the court Itself. রিভিউয়ের মাধ্যমে কোর্ট এসব স্পর্শকাতর বিষয়কে বিবেচনা করতে পারে। আর এরকম বিষয় অবশ্যই question of Interpretation.

 

আর বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি যে আমাদের দেশের যে রাজনৈতিক পদ্ধতি সেখানে আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি তুলে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না দেশ। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি তুলে দেয়ার যে রায় তার প্রভাব এবং কার্যকারিতা তো এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি উঠে যাওয়ার ফলে সংসদে যেসব পরিবর্তন ও আইন আসছে এবং তারপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির যে নির্বাচন হয়েছে সেটাও আমরা দেখেছি। এখন যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকত তাহলে হয়তো নির্বাচনটা সবার কাছে আরো অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।

 

রেডিও তেহরান: বিএনপি আরেকটি বক্তব্য দিয়েছে বৃহস্পতিবার। সেটি হচ্ছে- সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনের দিকে যেতে সাহায্য করেছিলেন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। বিএনপি বলেছে, এ রায় ছিল একদলীয় শাসন কায়েমের লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায়ের ষড়যন্ত্রের উলঙ্গ রূপ। এ বক্তব্যকে আপনি কীভাব দেখবেন?

 

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: আমি মনে করি রাজনীতি শাসন বিভাগের একটি অংশ। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় অবশ্যই রাজনৈতিক বিবৃতি বা বক্তব্য বিএনপি দিতে পারে। তবে আমি বিষয়টিকে যেভাবে বলবো সেটি হচ্ছে, বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে জুডিশিয়ারি ওপর যে প্রভাব খাটানো হয়েছে বা হচ্ছে সেটা খুবই দুঃখজনক। আর এ ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে জুডিশিয়ারির ওপর প্রভাব খাটানোর বিষয়টি শুধু বর্তমানে নয় বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে। আমরা যেভাবে আইন-আদালত এবং ন্যায় ও নিরপেক্ষতাকে দেখছি তাতে আদর্শগত জায়গা থেকে কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিচার বিভাগীয় অ্যাপয়েনমেন্টের ক্ষেত্রেও কিন্তু এ বিষয়টি দেখছি। আর এই যে একটা ধারাবাহিকতা চলছে তারই ফলশ্রুতিতে বিএনপি এ ধরণের মন্তব্য করেছে।

 

 

রেডিও তেহরান: আদালতের বেশ কিছু রায় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে নানা সময় নানা ধরনের বক্তব্য আসছে। এসব বিতর্ক এড়াতে আদালত কী করতে পারে? এগুলো কী আর রিভিউ করার সুযোগ আছে কিনা?

 

 

ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান: যদি কেউ সেভাবে পিটিশন দেয় তাহলে আদালত যেকোনো সময় তার রায়কে রিভিউ করতে পারে। আর সেক্ষেত্রে একটি নতুন বেঞ্চ গঠন করা হয়। সাধারণত পুরনো বেঞ্চ রিভিউ করে না। আর সফিসকেটেড জুডিশিয়াল অর্গান সবসময় বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আমরা ল’তে পড়েছি সবসময় বিচার বিভাগকে যে বিষয়টি কনসিডার করতে হয় সেটি হচ্ছে What is public policy? একটি রায় যখন দেয়া হয় তখন সেটি শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট আইনের আওতায় একটি রায় নয়; তার প্রভাব জনগণের ওপর কিভাবে পড়বে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিভাবে পড়বে That is a very pertinent Judicial consideration. তো আমি মনে করি যখন এসব বিষয়কে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিবেচনা করা হয় না তখন ভবিষ্যতের রায়গুলো বিতর্কিত হতে পারে।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/২৩

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন