এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 01 ফেব্রুয়ারী 2016 12:55

খালেদার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে

খালেদার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে

১ ফেব্রুয়ারি (রেডিও তেহরান): বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। বিষয়টি যখন টক অব দ্যা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে তখন এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার, কবি, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী ফরহাদ মজহারের সঙ্গে।

 

রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। এ মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং খুবই বিপজ্জনক একটি বিষয়।

 

তিনি আরো বলেন, বিরোধীদল যখন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করছে তখন সরকারপক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেছে। এর ফলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারে।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- যে ইস্যুতে মামলা হলো তা কতটা যৌক্তিক?

 

ফরহাদ মজহার: খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। যেসব আইনজীবী এই মামলা হতে দেখেছে তারাও বলছেন, এ বিষয়ে আসলে কোনো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা যায় না। আর আইনে যেটি সেডিশন তাকে আমরা বাংলায় রাষ্ট্রদ্রোহ বলছি। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার যে আইন তার মধ্যে '৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি পড়ে না। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং খুবই বিপজ্জনক একটি বিষয়।

 

বিরোধীদল বিএনপি যখন একটি স্থিতিশীল জায়গায় দাঁড়িয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করছে এবং জনগণও সেটা চাইছে তখন বারবারই সরকার পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এ ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায়- এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা।

 

রেডিও তেহরান: বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, যে বক্তব্যের কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে তাতে রাষ্ট্রদ্রোহের ছিটেফোটাও ছিল না। খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরানোর জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়া হয়েছে। তাহলে মামলা হলো কী করে?

 

ফরহাদ মজহার: দেখুন, মামলাটা হওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে- আমরা যখন কোনো কিছুকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলি তার মধ্যেই বিষয়টি নিহিত থাকে। আর এ কারণেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, বিষয়টিতে রাষ্ট্রদ্রোহের ছিটেফোটাও ছিল না। শুধুমাত্র তাকে রাজনীতি থেকে সরানোর জন্য এ মামলা দেয়া হয়েছে।

 

আমি মনে করি, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে অপরসারণের এই চিন্তা নতুন কিছু নয়। মূলত খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা- দুজনকেই রাজনীতি থেকে অপসারণের একটি প্রক্রিয়া ১/১১ তে ছিল। পরবর্তীতে সেটা সংকীর্ণ হয়ে গিয়ে শুধু খালেদা জিয়াকে বা বিএনপিকে অপসারণের একটি রাজনীতি চলছে যেটাকে আমি অবাস্তব বলে মনে করি। কারণ বাংলাদেশে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা রয়েছে, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। সন্ত্রাসের মধ্যদিয়ে যখন কোনো নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে উৎখাত করা বা অপসারণের চেষ্টা করা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে অপসৃত করার চেষ্টা হয় তখন তা ভালো কিছু নয়। তবে, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে উৎখাতের চেষ্টা করছে। ১/১১ সরকারের যে নীতি ছিল সেই নীতিই বর্তমান সরকার অনুসরণ করছে। আর সে বিষয়টি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকার কোনো আইন বা নিয়মতান্ত্রিক পরিমণ্ডলের মধ্যে কিছু করছে না। যেমন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার ক্ষেত্রে যদি আমরা প্রশ্ন তুলি- আদালত যে মামলাটি নিয়েছে- সেটি কিসের ভিত্তিতে নিয়েছে। অর্থাৎ যার করা মামলা আদালত নিক না কেন আদালতের একটি প্রাথমিক অবস্থান থাকতে হবে যে, যিনি মামলাটি করেছেন তিনি সংক্ষুব্ধ কেন? যদি মামলাটি আদালত নিজে করত তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে আদালতের একটি সিদ্ধান্ত আছে। আদালত একথা বলতে পারে যে, তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে কেন আপনি কথা বললেন? সেক্ষেত্রে বড়জোর এটা আদালত অবমাননা হতে পারত; কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহ তো আর হতো না। ফলে কিসের ভিত্তিতে আদালত এই মামলাটি গ্রহণ করেছে সেটাই তো প্রশ্নবিদ্ধ! ফলে এক্ষেত্রে আমরা যে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলকে নিন্দা করব এমনটি তো নয়; আমাদের এখানে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তারাও অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে চায় না এখানে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি হোক এবং দেশটা স্থিতিশীল থাকুক!

 

সেক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের বিচারকদের প্রতি আমাদের আবেদন হবে যে, তারা প্রশ্ন করতে পারেন কিসের ভিত্তিতে মামলাটি গ্রহণ করা হলো। তারা স্যুয়োমোটো করে মামলাটি খারিজ করে দিতে পারেন। আর আদালতের দিক থেকে এটাই হবে সবচেয়ে সঠিক পথ। এমনটি করা হলে প্রমাণ হবে যে, দেশের আদালত একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি চায়; আর যিনি এ মামলাটি করেছেন তার মামলা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। 

 

রেডিও তেহরান: আদালতের সমন গ্রহণ করেন নি খালেদা জিয়া। তাতে ধারণা করা হচ্ছে- এ ইস্যুতে বিএনপি শক্ত অবস্থানে গেল। কোথায় যেতে পারে পরিস্থিতি? অনেকে মনে করছেন- নতুন করে আন্দোলন বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পার দেশে। আপনার কী তাই মনে হয়?

 

ফরহাদ মজহার: হ্যাঁ, অবশ্যই দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি পারে। বেগম খালেদা জিয়া চান বা না চান স্বভাবতই বাংলাদেশের বিরোধীদলের নেতা সেটা খালেদা জিয়া হোক বা শেখ হাসিনা হোক তাদেরকে অপমান করার অধিকার কারো নেই। অযথা অপ্রয়োজনে তাদেরকে অপমান করা যায় না। ক্রমাগতভাবে তাদেরকে অপমান করা যায় না। ফলে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

 

বিএনপি এক্ষেত্রে কি করবে সেটা তারাই ভালো জানে, তবে আমরা বাইরে থেকে যেটা বুঝতে পারছি সেটা হচ্ছে- বিএনপি একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যে থাকতে চাইছে। স্বভাবত আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক যে চাপ আছে তার মধ্যে থেকে এমন কোনো অবস্থান নিতে চায় না যাতে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ হয় আন্তর্জাতিক মহলের কাছে। এটি তাদের একটি কৌশল হতে পারে। তবে তাদের এই কৌশলের সাথে আমরা একমত হব না। আমাদের মতে আন্দোলন জরুরি। তবে সেটা করার শক্তি, সামর্থ্য কিম্বা সাংগঠনিকভাবে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তাদের মধ্যে কতটুকু আছে সেটা তারাই ভালো বুঝবে।

 

দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এ প্রশ্নটা আমি করতে পারি যে, বেগম খালেদা জিয়া দেশের একজন নাগরিকও বটে। যখন তখন যে কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রদ্রোহিতার জন্য আদালতে হাজির করবেন, মামলা করবেন সেটা নাগরিক অধিকারের দিক থেকে আমরা তো মেনে নিতে পারি না। এটা কেবলমাত্র খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে নয়, দেশের যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে আমি একই কথা বলব। কেন এধরনের একটি ব্যাপারে রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিষয়টি আনা হবে। অনেকে এমন প্রশ্ন তুলেছে যে, এর আগে জাহানারা ইমামের ক্ষেত্রে বিএনপি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল। সেই মামলাটিকেও আমরা অন্যায় বলে মনে করেছি এবং তখনও তার প্রতিবাদ করেছি। তখন যে নীতির ভিত্তিতে আমরা প্রতিবাদ করেছি ব্নিপিকে এখনও সেই একই নীতির ভিত্তিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের এই কাজের প্রতিবাদ করছি। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে নাগরিক অধিকার, কথা বলার অধিকার সরকার হরণ করতে পারে না। আদালতের এই ক্ষমতা নেই। আর আদালত যদি এই কাজটি করে তাহলে একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করবে- তবে সেটা কি দাঁড়াবে তা এই মুহূর্তে স্পষ্ট করে বুঝতে না পারলেও নিঃসন্দেহে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে না।

 

রেডিও তেহরান: তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, খালেদা জিয়ার স্থান হবে আদালতের বারান্দা। চলমান পরিস্থিতিতে এ বক্তব্যকে কীভাবে দেখছেন? অনেকে বলছেন, সরকারের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে হাসানুল হক ইনুর এ বক্তব্যের মাঝ দিয়ে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

 

ফরহাদ মজহার: বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু যদি একজন সজ্জন ব্যক্তি হতেন তাহলে এ ধরণের কথা উনি কখনও বলতেন না। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন এধরণের ভাষা ব্যবহার করেন তখন তার রুচি, রাজনীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির চিত্র বেরিয়ে পড়ে। আর এধরণের বক্তব্যের বিচার দেশের জনগণ করবে, কারণ তারা ইনুর এই বক্তব্য শুনেছে।

 

বেগম খালেদা জিয়া আইনি কোনো অপরাধ করে থাকেন তাহলে সঙ্গত কারণে তার বিচার হবে। আমরা কেউ আইন-আদালতের উর্ধ্বে নই। তবে বেগম খালেদা জিয়া আদালতে গিয়েছেন। আর তিনি যে আদালতে গিয়েছেন সেরকম একটি আদালতে দেশের কোনো নাগরিককে নেয়া যায় কি না সেটাও একটি বড় প্রশ্ন! রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা নয়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চার্জ সম্পর্কিত যে মামলা চলছে সেজন্য ভিন্ন একটি আদালত তৈরি করা হয়েছে। ফলে এ থেকে বোঝা যায় সরকার একান্তই রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদলকে অপমান ও ছোট করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এসব করায় তো বিরোধীদল ছোট হবে না বরং ক্ষমতাসীনরাই ছোট হচ্ছে।

 

"আর আসলে ইনু সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাইনে। কারণ তার সম্পর্কে বলতে গেলে রুচির একটি প্রশ্ন আসে। আমরা তো এতটা নিচে নামতে পারব না। কুকুর যদি মানুষের পায়ে কামড় দেয় মানুষ তো আর কুকুরের পায়ে কামড় দিতে পারে না। এটা কখনও সম্ভব নয়। ফলে ইনুকে নিয়ে যা সমালোচনার তা জনগণ করবে, তাকে নিয়ে আমার আসলে আর বলার কিছু নেই।"

 

জনাব ফরহাদ মজহার, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে রেডিও তেহরানের সঙ্গে কথা বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

 

ফরহাদ মজহার: আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/এসআই/১

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন