এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 29 ফেব্রুয়ারী 2016 17:08

‘ঢাকা-চট্টগ্রাম দীর্ঘ উড়াল সড়কের পরিকল্পনা খুব ভালো উদ্যোগ’

‘ঢাকা-চট্টগ্রাম দীর্ঘ উড়াল সড়কের পরিকল্পনা খুব ভালো উদ্যোগ’

২৯ ফেব্রুয়ারি(রেডিও তেহরান): ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে ২২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হলে অবশ্যই খুব ভালো হবে। অবশ্যই এটি খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ।

 

ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারগুলোতে যানজট সামান্য কমতে পারে তবে যানজট নিরসনে খুব ভালো অবদান রাখবে বলে মনে করেন না এই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। তবে তিনি পদ্মা সেতুর গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। এরফলে জিডিপি বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।

ড. সালেহউদ্দীনের পুরো বক্তব্য তুলে ধরা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের দুই প্রধান শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এরইমধ্যে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ উড়াল সড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিশ্চয় দেশের জন্য অনেক বড় ও ভালো খবর। কীভাবে দেখছেন এ সম্ভাবনাকে?

 

ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর সবচেয়ে বড় বন্দর। ফলে চট্টগ্রামের পোটেনশিয়াল আছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার সাথে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা যাতে খুব ভালো করা যায় সেটা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। আর সে পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা চট্টগ্রামের মধ্যে এক্সপ্রেস ওয়ের গুরুত্ব আছে।

 

তাছাড়া ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যোগাযোগের উন্নতি হলে সুবিধা হবে। ফলে এটি অবশ্যই ভালো একটি উদ্যোগ।

তবে এ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই শুধু চট্টগ্রাম নয় আমাদের আরো একটি বন্দর আছে-সেটি হচ্ছে মংলা। সে বন্দরটির দিকেও দৃষ্টিপাত করা দরকার। একটি মেগা প্রজেক্টের কারণে অন্য প্রজেক্টগুলোতে যাতে সমস্যা না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

 

রেডিও তেহরান: দেশে সবচেয়ে বড় সেতু ‘পদ্মাসেতু’ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া, ঢাকায় বেশকিছু ফ্লাইওভার হয়েছে এবং আরো হচ্ছে। এসব প্রকল্প দেশের উন্নয়নে কীভাবে ভূমিকা রাখবে বলে আপনার মনে হয়?

 

ড.সালেহউদ্দীন আহমেদ: সাধারণত বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন খুবই দরকার। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কোনো কিছু সম্ভব নয়। বাংলাদেশের এমনও জায়গা আছে যেখানের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ার ফলে তারা পিছিয়ে পড়ে থাকে। তখন ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক হয়ে যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অনেক সম্ভাবনাময় হওয়া সত্বেও তারা পিছিয়ে আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকার কারণে তাদেরকে আসতে হলে অনেক পথ ঘুর আসতে হয়। ওইসব এলাকায় বহু কৃষিজ পণ্য তৈরি হয়ে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকার কারণে তারা মার্কেটে অ্যাকসেস করতে পারে না, ঢাকায় আনতে পারে না। এমনকি বাইরে রপ্তানিও করতে পারে না। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে সেই যোগাযোগটা সৃষ্টি হবে এবং এসব কাজগুলো করা সহজ হবে।

 

পদ্মা সেতুর ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা যেটাকে ডি সেন্ট্রালাইজ ডেভালাপমেন্ট বলে থাকি সেগুলোর উন্নয়ন ঘটানোর কথা বলা হয়ে থাকে। সেটা হবে পদ্মা সেতু হলে। আর লোকজনের আসা যাওয়ার ফলে বাড়তি ইন্টার অ্যাকশান হবে। নিঃসন্দেহে এ কাজগুলো ভালো।

 

তবে আরো অন্যান্য যেসব প্রজেক্ট করছে সরকার বিশেষ করে ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারের ব্যাপারে আমার কিছুটা দ্বিমত আছে। ফ্লাইওভারগুলো করা হয়েছে শহরের ভেতরে। আসলে এগুলো করার নিয়ম হলো শহর থেকে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাইপাসের জন্য। কিন্তু আমরা দেখছি এক ফ্লাইওভারের এক কোনো থেকে আরেক রাস্তা নেমে শহরের ভেতরে ঢুকছে আর সেখানে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ফ্লাইওভারের দিকে বেশি দৃষ্টি না দিয়ে রেলওয়ের দিকে নজর দেয়া উচিত। ফ্লাইওভারগুলো যে যানজট সমস্যার একেবারে সমাধান করে দেবে এমনটি আমার মনে হয় না। হয়তো কিছুটা রিচ করতে পারে। তবে এটি যানজট নিরসনে বিরাট অবদান রাখবে বলে আমি মনে করি না।

 

রেডিও তেহরান: বলা হচ্ছে- পদ্মাসেতু চালু হলে জিডিপি বেড়ে যাবে। আসলে সে সম্ভাবনা কতটা? এবং সে সম্ভাবনা এগিয়ে নিতে সরকার ও বেসরকারি পর্যায় থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?

 

ড.সালেহউদ্দীন আহমেদ: পদ্মা সেতু হলে যেটা হতে পারে সেটা হচ্ছে বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিজ সম্পদগুলোর ভালোভাবে ব্যবহার করা যাবে। এমন কিছু কৃষিজ পণ্য আছে যা যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কৃষকরা দূরে নিয়ে যেতে পারে না স্থানীয়ভাবে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অথচ পদ্মা সেতু হলে সেসব পণ্যকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে বিরাট একটা পরিবর্তন হবে। আর সেদিক থেকে বিবেচনা করলে জিডিপি বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

তাছাড়া পদ্মা সেতু হলে মুভমেন্টটা বাড়বে। লোকজন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারছে না, চাকরি বাকরির ক্ষেত্রেও যাওয়া আসা করার অসুবিধা হয়। পদ্মা সেতু হলে চাকরির সন্ধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ দ্রুত মুভমেন্ট করতে পারবে।

 

এছাড়া পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। বাস, ট্যাক্সি, ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহন সেক্টর মোটা দাগে দ্রুত পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে পারবে। সার্ভিস সেক্টর ও প্রোডাকশন সেক্টর সবকিছু মিলে মোটামুটি অবদান রাখতে পারবে।

 

তবে এ ব্যাপারে সরকারের করণীয় হচ্ছে- শুধুমাত্র পদ্মা সেতু করলেই তো চলবে না, সেতুর সাথে সংযোগ সড়কগুলোও ঠিক করতে হবে। বাইপাস রোডগুলো সংস্কার করতে হবে। সেগুলোর বেশিরভাগের অবস্থা খুবই খারাপ। ফলে অবশ্যই ওইসব রাস্তার সংস্কার করা প্রয়োজন হবে। তাছাড়া কালভার্ট সংস্কার করতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় ফেরি ব্যবস্থা আছে সেগুলোরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

 

রেডিও তেহরান: সরকারের এসব বড় বড় প্রকল্পে কিছু কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে মাঝে মাঝে। এসব ঝামেলা এড়িয়ে সরকার কীভাবে প্রকল্পগুলোকে সঠিক লক্ষ্যে নিতে পারে?

 

ড.সালেহউদ্দীন আহমেদ: দেখুন এজন্য দরকার আন্তরিক প্রচেষ্টা। কিভাবে প্রজেক্টগুলো কাজ করছে, প্রজেক্টগুলো কাকে দেয়া হলো এবং চুক্তি করার ক্ষেত্রে এবং ডকুমেন্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আছে কিনা সেসব দেখতে হবে। আর যেকোনো বড় প্রজেক্টের ক্ষেত্রে তথ্যগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। যদি এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকে তাহলে তো প্রশ্ন উঠবে বিতর্ক তৈরি হবে। কোনো লেনদেন এবং চুক্তি করতে হলে যতদূর সম্ভব পাবলিক নোটিস দিয়ে করতে হবে।

 

এছাড়া কোন্‌ প্রকল্প কখন করা হবে তার জন্য উপযুক্ত সময়ের দিকটাতে নজর দিতে হবে। একই সাথে কত অর্থ বরাদ্দ দেয়া হবে সেটাও আগে থেকে ঠিক করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় পূর্ব নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও বেশি অর্থ লেগে যাচ্ছে। ঢাকা চিটাগং হাইহয়ে যেটা অলরেডি হয়েছে সেটা চার বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ৮ বছর লেগে গেল। বারে বারে রিভাইস করা হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকা বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব বিষয়কে কোনো রকমে সমর্থন করা যাবে না। কস্ট ওভার রান করা এবং অতিরিক্ত সময় বাড়িয়ে দেয়া যেন কোনোভাবে না হয়।

 

এছাড়া যারা খরচ করবে, যারা প্রকল্প পরিচালনা করবে তাদের দক্ষতা, সততা এবং নিষ্ঠার বিষয়টি মনিটর করতে হবে। দেখা যায় অনেক সময় অদক্ষ লোক দিয়ে প্রজেক্ট চালানো হয়। তাতে কোয়ালিটি ভালো হয় না। এসব বিষয়কে ভালোভাবে দেখতে হবে। এককথায় পদ্ধতি,অর্থায়ন এবং জনশক্তি এসবগুলো যদি সুনিশ্চিত করা যায় আগে থেকে তাহলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। প্রজেক্ট দেয়ার আগে বলতে সময় মতো শেষ করতে হবে এবং বাড়তি অর্থায়ন করা হবে না। এসব করা গেলে দুর্নীতি অনেকটা কমে যাবে।

 

রেডিও তেহরান: সরকার দাবি করছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের সড়কে রয়েছে। আপনার মূল্যায়ন কী?

 

ড.সালেহউদ্দীন আহমেদ: বলা চলে বাংলাদেশ মোটামুটি একটা ট্রাকে আছে। ধারাবাহিকভাবে আমাদের একটা প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি। শতকরা ২ ভাগ থেকে ৬ ভাগের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে একটা চ্যালেঞ্জ আমাদের আছে। সেটি হচ্ছে আমরা কিন্তু শতকরা ৬ ভাগের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। আর এ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য যে বিনিয়োগ আমাদের দরকার এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন দরকার সেটা এখনও সম্ভব হয়নি সেভাবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বা রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান যেটাকেই আপনি বলুন না কেন যদি এসব প্রতিষ্ঠানকে আমরা শুদ্ধ করতে না পারি তাহলে এই শতকরা ৬ ভাগ থেকে বেরিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। এটা একটা মেজর সমস্যা।

 

তাছাড়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি তো রয়েছে। প্রায়ই অস্থিরতা ও রাজনৈতিক ডামাডোলের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। এটা যদি স্থিতিশীল করা না যায় তাহলে বিনিয়োগকারীদের মনে সন্দেহ থেকে যাবে। এগুলো ঠিক করা না গেলে হয়তো সামান্য এগোতে থাকব খুব দ্রুত এ জায়গা থেকে বের হওয়া যাবে না। কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। আর এটাই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।#

 

রেডিও তেহরান/জিএআর/২৯

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন