এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 09 মার্চ 2016 17:50

‘১/১১ নিয়ে হৈচৈ হলেও সরকার বিচারের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না’

‘১/১১ নিয়ে হৈচৈ হলেও সরকার বিচারের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না’

৯ মার্চ(রেডিও তেহরান): ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা এখনও অব্যাহত আছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা যেকথা বলেছেন তা থেকে বোঝা যায় এ আশংকা থেকেই তারা ১/১১ নিয়ে আবারো সরব হয়েছেন। তাছাড়া জনগণের দৃষ্টি ভিন্নদিকে নিতেই তারা এ বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ করতে পারেন। রেডিও তেহরানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ভাষ্যকার মাহফুজ উল্লাহ।

 

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার ছাড়া কারো পক্ষে ১/১১’র নায়কদের বিচার করা সম্ভব নয়। সরকার এ ব্যাপারে কোনোকিছুই বলছে না। তাছাড়া, সরকার খুব ভালোভাবেই জানে ওয়ান ইলেভেনের নায়ক কারা। কিন্তু তাদের বিচারের ব্যাপারে সরকার স্পষ্ট করে কোনো কিছু বলছে না।

 

মাহফুজ উল্লাহ বলেন, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে বহু মামলা করার ফলে তিনি অনেক বেশি হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন। এ ঘটনা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে মনে হবে বাংলাদেশে মিডিয়ার ওপরে সরকারের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। মিডিয়ার কোনো রকমের বিরোধিতা বা সমালোচনা কোনো কিছুই সরকার পছন্দ করছে না।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার নিয়ে এখন সবাই সরব। হঠাৎ বিষয়টি কেন এতটা চাঙ্গা হয়ে উঠল? আপনার কী মনে হয়?

 

মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন, এর দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে। একটি হচ্ছে- গত কয়েক মাস আগে আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছিলেন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা এখনও অব্যাহত আছে। সম্ভবত এ বিষয়ে তারা কোনো কিছু আঁচ করতে পেরেছেন বা কোনো আশঙ্কা করছেন। যে কারণে তারা ভাবছেন যদি আবার এ প্রক্রিয়াটি সক্রিয় হয় তাহলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যেকারণে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় এই প্রথম তিনি স্পষ্টভাবে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি পুরো নাম বলেন না।

 

দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে এই- জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর জন্য ওয়ান ইলেভেন নিয়ে এত বেশি হৈচৈ হচ্ছে।

 

তৃতীয় বিষয়টি হতে পারে- অনেক মনে করছেন আওয়াগী লীগ অতি আগ্রহ দেখাতে গিয়ে সম্ভবত কোনো জটিল ফাঁদে পা দিয়েছে। আর এটি আওয়ামী লীগের জন্য কখনই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুখকর কোনো জিনিস হবে না।

 

রেডিও তেহরান: সবাই যখন বিচার চাইছেন তাহলে বিচার করতে তো অসুবিধা নেই; কিন্তু এ নিয়ে কেউ আসল উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এর কারণ কী?

 

মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন, ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার যেমন সবাই চাইছেন- একথাটি সত্য হলেও যারা বিচার চাইছেন তাদের বিচার করার ক্ষমতা নেই। বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র সরকারের হাতে রয়েছে- তা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক। কজেই সেখানে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ না নেয় বিচার করার জন্য তাহলে বিচারটা কে করবেন, সেক্ষেত্রে তো বিচার হবে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে- সরকার খুব ভালো করেই জানে, আসলে কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত। আবার এ ব্যাপারে অন্যদেরকেও অভিযোগ করতে দেখা যায়। অবশ্য অভিযোগ করার সঙ্গত কারণও আছে।

 

যারা কুশীলব ছিল ওয়ান ইলেভেনের তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি বর্তমান সরকার এক ধরণের অনুমোদন ছিল। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, তখনকার সরকারের সকল কর্মকাণ্ডকে তিনি বৈধতা দেবেন। তাছাড়া শুরুতে তিনি বলেছেন- ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সরকার তাদের আন্দোলনের ফসল। আর তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে কি করে তারা ওই সরকারের নায়কদের বিচার করবেন! এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। তারপরও সংসদে এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। সেই আলোচনায় আওয়ামী দলীয় সংসদ সদস্যরাই বিচারের দাবি তুলেছেন। যারা সে সময় কারাগারে গেছেন এবং নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন সেইসব নেতারা বিচারের দাবি জানান।

 

তবে আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের নায়কদের বিচারের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এখনও যখন এ ব্যাপারে হৈচৈ করা হচ্ছে তখনও সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাচ্ছি না। সরকারের কেউ কেউ বলছেন, পুরো বিষয়টি জানার জন্য কমিশন গঠন করা হবে। আবার কেউ বলছেন শুধু মাহফুজ আনামের বিচার হবে।

 

তবে যদি ওয়ান ইলেভেনের ঘটনা বিচার করতে হয় সেক্ষেত্রে পূর্বাপর যারা এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন তাদের প্রত্যেকেরই বিচার করতে হবে।

 

কমিশন গঠন করে তদন্ত করে কার কি ভূমিকা ছিল বা কে কতখানি কোলাবরেট করেছে তা জানা দরকার। জানা দরকার এই কারণে যে, ১৫ আগস্টের ব্যাপারে, ৩০ মে জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়া এবং বর্তমান ঘটনার ব্যাপারে আমরা যদি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করে পুরো ঘটনাকে উন্মোচন করি তাহলে আমরা ষড়যন্ত্রটা বুঝতে পারব।

 

এখন যে প্রশ্নটি উঠেছে এক এগারোর কুশীলবদের বিচার করতে হবে। কিন্তু সেই কথাটা সরকারিভাবে বলা যাচ্ছে না, এসব কথা বলা হচ্ছে বেসরকারিভাবে। কারণ আমার আশংকা ওই বিষয়টি নিয়ে কমিশন গঠন করে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা যায় তাহলে সরকারের ভেতরেও অনেক আছেন যারা এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হয়ে পড়বেন বলে মনে করা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত না করে ঢালাওভাবে একজনকে দায়ী করাটা ঠিক নয়।

 

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এসব করার ফলে তিনি অনেক বেশি হয়রানির স্বীকার হচ্ছেন। এ ধরণের হয়রানির কোনো মানে হয় না। তার বিরুদ্ধে একটি মামলাই যথেষ্ট ছিল। এ ঘটনা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে মনে হবে বাংলাদেশে মিডিয়ার ওপরে সরকারের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। মিডিয়ার কোনো রকমের বিরোধিতা বা সমালোচনা- কোনো কিছুই সরকার পছন্দ করছে না।

 

রেডিও তেহরান: ওয়ান ইলেভেন নিয়ে যখন দেশে এত সরব আলোচনা তখন আমেরিকা থেকে ওয়ান ইলেভেনের মূল নায়ক বলে খ্যাত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ বলেছেন, সময়ের বাস্তবতায় এবং দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে এর বিকল্প ছিল না। তার এ ব্ক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

 

মাহফুজ উল্লাহ: দেখুন, মঈন উ আহমেদের এ বক্তব্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে হলে আসলে কুৎসিত মন্তব্য করতে হয়, আমি কুৎসিৎ মন্তব্য করব না। মঈন উ আহমেদ সেনাপ্রধান ছিলেন। তার কোনোরকম নৈতিক অধিকার ছিল না এভাবে পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করার। অথচ তিনি অবলীলায় সেটা করেছেন। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি দেশবাসীকে নতুন করে গণতন্ত্র শেখাতে চেয়েছেন। তিনি রাজনৈতিক দল করার চেষ্টা করেছেন। কথিত শান্তির স্বপক্ষে তিনি কত রকমের কাজ করার চেষ্টা করেছেন। সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি অনেক কুকর্ম করেছেন। কাজেই তিনি যেভাবে নিজের দোষ ঢাকার চেষ্টা করছেন সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা খুব পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করেছি তারা দেশে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছে।

 

তারা রাজনীতিবিদদের জেলে পুরে অত্যাচার করেছেন। তারা তাদের অনুগত একটা রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। আজকে আমরা পেছনের দিকে তাকালে খুব পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই ওয়ান ইলেভেনের সেই দু বছরে দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগের নেতারাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তবে বিএনপির মতো অন্য কেউ এত ব্যাপকভাবে নির্যাতনের স্বীকার হন নি। জামায়াতে ইসলাম তো নির্যাতনের শিকারের মধ্যে পড়েনি। সকল নাটের গুরু মঈন উ আহমেদ। তিনি যেহেতু একটা বাহিনীর প্রধান ছিলেন সেইজন্য তিনি গোটা দেশকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছেন। তবে এর হিসাব তাকে দিতে হবে কোনো না কোনো সময়।

 

রেডিও তেহরান: একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে, ওয়ান ইলেভেনে জড়িতদের বিচার চান সবাই। তাহলে তারা দেশে থেকে এত সব বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন কী করে? আবার অনেকে বিদেশে চলে গেছেন; তাইবা সম্ভব হলো কী করে?

 

মাহফুজ উল্লাহ: ১/১১'র কুশীলবদের অন্যতম জেনারেল মাসুদ উদ্দীন। বর্তমান সরকার তার চার বার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে বহাল তবিয়তে কাজ করেছেন। তিনি ঢাকায় ফিরে এসে যে রাজকীয় ব্যবসা করছেন এত টাকা তিনি পেলেন কোথায়? তার তো কোনো বিচার হচ্ছে না। অথচ সবাই একথা জানে যে, ওয়ান ইলেভেনের সময় মঈন উ আহমেদের সহযোগী হিসেবে কী ভূমিকা পালন করেছেন মাসুদ উদ্দিন। 

 

এই যে ‘টিএফআইসেল’ বলা হয়- যেখানে নিয়ে অত্যাচার করা হতো। জেনারেল মাসুদের অধীনেই নিয়ন্ত্রিত হতো টিএফআইসেল। তিনি সেটি পরিচালনা করতেন। এত কিছুর পরও তার কোনো বিচার হচ্ছে না কেন, তিনি তো দেশে আছেন? এ থেকে জনমনে সন্দেহ উঠেছে যে, হতে পারে সরকারের কারো কারো সঙ্গে তাদের আঁতাত রয়েছে। আর তারা এসব ব্যক্তিকে রক্ষা করছে। তাছাড়া তো এদেরকে রক্ষা করার কোনো পথ নেই।

 

যেখানে সংসদে দাঁড়িয়ে মহিউদ্দীন খান আলমগীর এবং অন্যরা চোখের জলে নিজেদের দুর্দশার কথা বলে ওই সরকারের শাস্তি দাবি করেছেন সেখানে কই তার তো কোনো শাস্তি হলো না! আজকের সংসদের উপপ্রধান সাজেদা চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেছিলেন, আমাদের আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১/১১’র সরকার বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে চেয়েছিল। তার কি বিচার হবে না! আজকের প্রধানমন্ত্রীকে তখন জাতীয় শত্রু ঘোষণা করা হয়েছিল। আর এই জাতীয় শত্রু ঘোষণার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিল তারা, তার কি বিচার হবে না! তারা সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে বাধা দিয়েছিল- কেন বাধা দিয়েছিল, তার কি বিচার হবে না!

 

এসব কিছুর বিচারের জন্যই কমিশন করে কার কতটুকু দায়িত্ব এবং অপরাধ ছিল তার সীমানা নির্ধারণ করা তারপর বিচারের ব্যবস্থা করা উচিত।

 

রেডিও তেহরান: ওয়ান ইলেভেন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নতুন করে একে অপরকে দায়ী করছে। এর মাঝে আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ এ জন্য খালেদা জিয়ার বিচার চেয়েছেন। কী বলবেন এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সম্পর্কে?

 

মাহফুজ উল্লাহ: পাল্টাপাল্টি বলতে প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন- তারা দুজন পাল্টাপাল্টি করে কথা বলেছেন। বিএনপি নেত্রী বলেছেন যে, দুটি দল যদি একত্রে থাকে তাহলে ভবিষ্যতে এধরণের কোনো কর্মকাণ্ড হতে পারবে না, গণতন্ত্র অব্যাহত থাকবে। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিপক্ষরা যদি একসঙ্গে থাকেন তারপরও তাদের কোনো সমস্যা হবে না।

 

হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন সেকথা সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই না। তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগের আরো কয়েকজন আছেন যারা প্রতিনিয়ত বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন। সকাল-সন্ধ্যা তারা এটা নিয়ে জপ করেন। তারা অর্বাচীনের মতো যেসব মন্তব্য করছেন তা আসলে আলোচনার বাইরের বিষয়- এনিয়ে কথা বলা যায় না।#

 

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/সিরাজুল ইসলাম/৯

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন