এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 12 মার্চ 2016 21:13

দুদকের নতুন নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদকের নতুন নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে: ড. ইফতেখারুজ্জামান

১২ মার্চ(রেডিও তেহরান): দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। দুদকের নতুন চেয়ারম্যান এবং কমিশনার দুর্নীতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদেরকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনবেন বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।

 

রেডিও তেহরানের সাথে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা দুদককে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত দেখতে চাই বলেই সরকারের কাছে দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান তুলে ধরেছি। তবে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি হয়েছে তা মানুষকে জানিয়ে খুব স্বচ্ছতার সাথে হয়নি। যেটা সবাইকে জানিয়ে স্বচ্ছতার মাধ্যমে করা সম্ভব ছিল।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক’র বর্তমান চেয়ারম্যান ও একজন কমিশনারের মেয়াদপূর্তি অত্যাসন্ন হওয়ায় দুই পদে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে আপনার নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি। এরইমধ্যে ওই দুই পদে নতুন নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তো কেন এই আহ্বান? দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে কী আপনাদের কোনো প্রশ্ন রয়েছে?

 

ইফতেখারুজ্জামান: দেখুন ঠিক নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন সেটা নয়; আসলে দুর্নীতি দমন কমিশন এমন একটি প্রতিষ্ঠান যে প্রতিষ্ঠানটি আইনের ওপর ভিত্তি করে বিশেষায়িত একটা কর্তৃত্ব নিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

 

জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তো এই প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য অনেক উপাদান লাগবে। আইনের ভিত্তিটা শক্তিশালী হতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পেশাদারিত্বের প্রয়োজন আছে। আমরা সবসময় মনে করেছি এবং এটা সবাই স্বীকার করবেন যে আসলে এটা নির্ভর করবে যাদের হাতে নেতৃত্ব আছে বিশেষ করে চেয়ারম্যান এবং কমিশনার যারা হবেন তাদের ওপর। তাদেরকে নিরপেক্ষতা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার মতো দৃঢ়তা থাকতে হবে। যদি তাদের সেটি থাকে তাহলে তাদের পক্ষে কাজ করা সম্ভব। আর এসব ভাবনা থেকেই আমরা যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে নিয়োগের দাবি জানিয়েছি সরকারের কাছে। আর এটি আমাদের দ্বিতীয় দফার দাবি। এর প্রায় ৩ মাস আগে আমরা সরকারের কাছে একই দাবি করেছিলাম এবং এ বিষয়টি নিয়ে অ্যাডভোকেসি করাটা আমাদের কার্যক্রমেই একটি অন্যতম অংশ। আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর দেখতে চাই।

 

আমি আপনার মাধ্যমে জানাতে চাই এবং রেডিও তেহরানের শ্রোতারা নিশ্চয়ই জানবেন বাংলাদেশে দুদক সৃষ্টি হয়েছে যে আইনের ওপর ভিত্তি করে এবং যে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তার পেছেনে টিআইবির পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। আর যেহেতু আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যকর দেখতে চাই সে কারণে আমরা যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছি।

 

রেডিও তেহরান: আপনারা এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও একজন নতুন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলীয় বা অন্য কোন প্রভাবমুক্ত হয়ে যোগ্য, নিরপেক্ষ, দৃঢ়চেতা ও পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি নিয়োগ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এই বিবৃতি? আপনারা কী আশঙ্কা করেন যে, দলীয় অনুগত কোনো ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া হবে?

 

ইফতেখারুজ্জামান: না, ঠিক তা নয়। তবে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি হয়েছে তা মানুষকে জানিয়ে খুব স্বচ্ছতার সাথে হয়নি। যেটা সবাইকে জানিয়ে স্বচ্ছতার মাধ্যমে করা সম্ভব ছিল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই ধরণের প্রতিষ্ঠানে যখন নিয়োগ হয় তখন আরো মুক্তভাবে হয়ে থাকে। স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করা হয়। সেখানে যাদের নাম আসে সেই নামগুলো প্রকাশিত হয়ে থাকে। এরপর বিষয়টি নিয়ে পাবলিক ডিবেটও হয়। সেধরণের সুযোগ আমাদের এখানে কমিশনের ক্ষেত্রে হয় না। যে কারণে মানুষের মধ্যে একধরণের উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন ধরণের কথাবার্তা শোনা যায়।

 

এসব বিষয়কে প্রতিহত করার জন্য বা এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য আমরা সরকারকে সহায়তা করতে চাই বলেই আমাদের এ অবস্থান। আমরা সেকারণে দ্বিতীয়বারের জন্য সরকারকে বলেছি যেন আইনানুগভাবে নিয়োগের ব্যাপারটি হয়। দুদককে যাতে করে সমালোচনার সন্মুখীন হতে না হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।

 

রেডিও তেহরান: আপনাদের দেয়া বিবৃতিতে আরেকটা কথা বলা হয়েছে; তা হচ্ছে- দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে, স্বজনপ্রীতি এবং ভয়-ভীতির উর্ধ্বে উঠে দুদক তার আইনানুগ নির্ধারিত ভূমিকা পালনে সফল ও কার্যকর হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে ও দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। তাহলে এখন কী আস্থা নেই?

 

ইফতেখারুজ্জামান: দেখুন, দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা নেই এটা একেবারে বলা যাবে না বা আমরা বলব না। তবে আস্থা আরো বেশি হতে পারত আরো দৃঢ়তর হতে পারত। আর সেজন্য যে উপাদানগুলো থাকা দরকার যেমন দুদক যদি কিছু কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে তাদেরকে আইনের মুখোমুখি করতে পারত তাহলে কিন্তু মানুষের আস্থা বাড়ত এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি।

 

আর সেটি করার জন্য প্রয়োজন সৎসাহস, দৃঢ়তা বা রাজনৈতিকসহ অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করা। স্বজনপ্রীতি এবং কোনোরকম প্রলোভনে প্রলুব্ধ না হয়ে বা কোনো ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে না তাকিয়ে যদি দুদক অবস্থান নিতে পারত তাহলে সেটি দুদকের জন্যই সহায়ক হতো এবং তাদের মর্যাদা বাড়ত। এর ফলে তাদের প্রাতি মানুষের আস্থাও বাড়ত।

 

দুর্নীতি যে আইনবিরুদ্ধ এবং সেটি প্রমাণ করা যে বাস্তবেও সম্ভব সে বার্তাটি মানুষের কাছে তখন পৌঁছে যেত। আর সেই বার্তাটি প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আর এ বিশ্বাস থেকে আমরা দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পর্কে কথা বলে থাকি এবং এবারও বলেছি।

 

রেডিও তেহরান: দুদককে বিরোধীদল পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে বিএনপির পক্ষ থেকে বহুদিন ধরে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ অভিযোগের ভিত্তি কী? একইসঙ্গে জানতে চাইবো বিএনপির সময় কী এ প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পেরেছিল?

 

ইফতেখারুজ্জামান: যেহেতু আপনি বিএনপির কথা বললেন তো সে সম্পর্কে বলতে চাই- যখন দুদক প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। তাদের মেয়াদকালে দুদক কার্যকর হওয়া দূরের কথা তারা এমন ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন যারা কেবল নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন। তখন সত্যিকারার্থে কোনো কাজ হয়নি। এটাও কিন্তু একধরণের দলীয় মানসিকতারই পরিচায়ক। যখন বিরোধীদলে থাকি তখন সবকিছুকে অন্যভাবে দেখি আবার সরকারি দলে থাকলে ভিন্নভাবে দেখি। এরপ্রভাব কিন্তু দুদকের ওপর পড়ে।

 

আর হ্যাঁ অনেকসময় ধারণা করা হয় যে, সত্যিকারার্থে যাদের বিরুদ্ধে দুদক কোনো না কোনো অবস্থান নিয়েছে তাদের বেশিরভাগই বিরোধীদলের সাথে সম্পর্কিত; সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোক না কেন। যে কারণে এমন ধারণা হতেই পারে যে বিরোধীদলকে দমন ও নিপীড়নের জন্য দুদক ব্যবহৃত হয়। ফলে সংসদের বাইরের বিরোধীদল বিএনপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগ ওঠাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

এখানেও দুদকের এখতিয়ার বা দায়িত্ব হচ্ছে বিরোধীদলের এই অভিযোগ বা দাবিটা প্রত্যাখ্যান করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা। আর আমি শুরু থেকেই বলেছি যে আমরা চাই দুদক সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করছে এটা প্রমাণ করতে হবে। আর এটা করতে পারলেই কিন্তু মানুষের আস্থাভাজন হতে পারবে দুদক এবং তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যে ভিত্তিহীন সেটাও প্রমাণ করতে পারবে।

 

রেডিও তেহরান: দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে ইকবাল মাহমুদ এবং কমিশনার হিসেবে আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তো তাদের এই নিয়োগ সম্পর্কে কি বলবেন?

 

ড. ইফতেখারুজ্জামান: আমরা তাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি। তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাদের সেই দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান থেকে যে ভূমিকা তাদের রয়েছে তা পালনে তারা সচেষ্ট হবেন বলে প্রত্যাশা করি। তারা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন বলেই আমরা আশা করব। দুদকের সাথে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি শুধুমাত্র এর কার্যকারিতার জন্য অ্যাডভোকেসি করে তাই নয় তাদের সাথে আমাদের মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা সমঝোতা স্মারক আছে। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা ও অ্যাডভোকেসির কাজগুলো যৌথভাবে করে থাকি।

 

আমরা আশাকরি নতুন নেতৃত্ব যখন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তখন তারা আমাদের সাথেও সহায়তা করবেন এবং জনগণের সাথে আরো মুক্তভাবে কাজ করবে,আরো স্বচ্ছতা আসবে এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়বে। তারমাধ্যমে দুদকের মূল কাজটি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে এবং যারা দুর্নীতির জন্য দায়ী তাদেরকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনবেন। আর সে কাজটি দুদকের নতুন নেতৃত্ব করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করি।#

 

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/১২

 

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন