এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 25 মার্চ 2016 19:04

ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি নিয়ে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ যা বললেন...

ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি নিয়ে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ যা বললেন...

২৫ মার্চ(রেডিও তেহরান): বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন নাকি চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন তা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব না হলেও মিডিয়ায়তে নানা খবর ও তথ্য এসেছে। আর দেশের ক্ষমতাসীন সরকার কোনো সংকটে পড়লে সেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাউকে কাউকে না বলির পাঠা তৈরি করে থাকেন।

 

রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ।

 

তিনি বলেন, সাধারণত বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত্রে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ না দেখলেও সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দীনের নেতৃত্বে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে তাদের কাছ থেকে পুরো বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। আমরা এমনটিই আশা করি।

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে আর্থিক খাতের নৈরাজ্যে সাথে জড়িতদের বিচার হয়নি এর আগে। যার ফলে যেসব দুর্বৃত্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা হয়তো সাহসী হয়েছে এবং একধরণের আস্কারা পেয়েছে।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেছেন যদিও তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- ঘটনাটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন এবং এই পদত্যাগ সমস্যা সমাধানের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে হয়?

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: আপনি যথার্থই বলেছেন, ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগ কতোটা স্বেচ্ছাকৃত আর কতোটা চাপের মুখে সে বিষয়টি আমরা যারা সাধারণ জনগণ এবং দেশবাসী সঠিক অবস্থাটা জানি না। তবে দেশের সংবাদপত্রগুলোতে এ বিষয়টি নিয়ে নানারকম সংবাদ এবং তথ্য পরিবেশিত হয়েছে।

 

তবে আমরা যেটা জানি- একটা দেশে যখন বড় কোনো সমস্যা তৈরি হয় তখন যারা দেশ শাসন করেন তারা সেই সংকটময় অবস্থার কারণে যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। আর তা থেকে কাটিয়ে ওঠার জন্য কাউকে না কাউকে বলির পাঠা তৈরি করেন।

 

আর সুবিধাটা হচ্ছে এই যে, যে সমস্যাটা নিয়ে বা সংকট নিয়ে জনমনে নানাধরণের সংকট ও অস্থিরতা তৈরি হয় সেই অস্থিরতাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করা সম্ভব হয়। মানুষ তখন ভাবে সরকার কিছু একটা করছে বা এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ঠিক আছে দেখা যাক সরকার সামনের দিকে আরো কি করবে ইত্যাদি।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে কমিটি হয়েছে। ব্যাংলাদেশে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এমন কমিটি হয় কিন্তু কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না এবং ব্যবস্থা নেয়াও খুব একটা হয় না। এবার কী ঘটবে বলে আপনি ধারণা করছেন?

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: যে কমিটি হয়েছে সেই কমিটির নেতৃত্বে আছেন বাংলাদেশ ব্যংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দীন। বাংলাদেশের সমাজে তার ব্যাপক পরিচিতিও আছে। একসময় তিনি খুব নামকরা আমলা ছিলেন। আমরা আশা করছি এই কমিটির কাছ থেকে একটা কিছু জানতে পারব। আসলে কি হয়েছিল সেটা হয়তো এই কমিটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে।

 

তবে আপনি প্রশ্নের মধ্যে ঠিকই বলেছেন যে বাংলাদেশে বড় কোনো ঘটনার পর অনেক কমিটি হয়, অনেক তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু তাদের রিপোর্ট কখনও আলোর মুখ দেখে না। সেই রিপোর্টগুলো ফাইল বন্দি হয়ে সরকারের মহাফেজ খানায় চলে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে এ ধরনের সন্দেহ, অবিশ্বাস বা আস্থার অভাবের পরিবেশের মধ্যেও আমরা আস্থা পেতে চাই যে এবারের রিপোর্ট অবশ্যই আলোর মুখ দেখবে। কারণ এতবড় গুরুতর বিষয় যার সাথে জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন, দেশের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন- সেই প্রশ্নে গঠিত যে তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টটা অবশ্যই আমাদেরকে আশাহত করবে না।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনায় যে অর্থ খোয়া গেছে তার চেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে হলমার্ক, সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংকসহ আরো বেশ কয়েকটি খাতে। অনেকে বলছেন, এসব ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো পদক্ষেপ ছিল না বলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ঘটনা ঘটতে পারল। আপনার কী মনে হয়?

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই বলে থাকি যে এদেশে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। কোনো সমস্যা তৈরি হলে, নৈরাজ্যকর এবং বিশৃঙ্খলাপূর্ণ কোনো ঘটনা যদি ঘটে সেটাকে ধামাচাপা দেয়া হয়। সেই সমস্যা সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে আর কিছু জানতে পারি না। আর বাংলাদেশে আর্থিক খাতের নৈরাজ্যের বিষয়টি একদিনের ঘটনা নয়; বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয়টি চলে আসছে। একটার পর একটা বড় ধরণের ঘটনা ঘটেছে। আর সেই ঘটনা সম্পর্কে যতোটা কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল তার এক দশমাংশও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার ফলে যেসব দুর্বৃত্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা হয়তো সাহসী হয়েছে এবং একধরণের আস্কারা তারা পেয়েছে।

 

আমি আমার লেখায় বারবার বলেছি যে, বাংলাদেশ ব্যাংক হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম একটা প্রতীক। এই প্রতীকটি যদি দুর্বল হয়ে যায় সেক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্বও দুর্বল হয়ে যায়। এর নিরাপত্তা বিধান করা আমাদের অবশ্যই কর্তব্য, রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তব্য। সেজন্য অন্তত এবার যাতে দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায় এবং চিহ্নিত হয় আমরা সবাই সেটাই আশা করি।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোড ভারতের নিয়ন্ত্রণে বলে খবর বের হয়েছে। কেন ভারতের নিয়ন্ত্রণে? অন্য দেশের সুইফট কোড যদি নিজ নিজ দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে তাহলে বাংলাদেশের কোড কেন অন্য দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে?

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন আসলে এখানে কোড নিয়ন্ত্রণ নয়; আমি যেটা সংবাদপত্রে পড়েছি- সেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশের সুইফট ব্যবস্থা আঞ্চলিকভাবে ভারত থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিভাবে এবং কতোটা নিয়ন্ত্রিত হয় সে ব্যাপারে রিপোর্টে পরিষ্কারভাবে কিছু লেখা হয় নি। তবে এ ধরণের নিয়ন্ত্রণের ফলে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে অবশ্যই এই ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন করে ভেবে দেখা দরকার।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় এ কথা তো পরিষ্কার হয়েছে যে, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ নিরাপদ নয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও বলেছেন, হ্যাকারদের অন্যতম টার্গেট এখন বাংলাদেশ। প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে বাংলাদেশ নিরাপদ হতে পারে? আর যদি নিরাপদ নাই হয় যায় তাহলে কেন এ পদ্ধতিতে টাকা রাখতে হবে?

 

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংকই একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়; বিশ্বে যতগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র আছে তাদের প্রত্যেকের একটি কেন্দ্রীয় বা সেন্ট্রাল ব্যাংক থাকে। আপনি তেহরান থেকে কথা বলছেন- ইরানেরও নিশ্চয়ই একটি সেন্ট্রাল ব্যাংক আছে। এসব সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভকে তারা কি করে নিরাপদ করবে, আজকের যুগে নানাধরণের সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে তার মান সম্পন্ন একটা ব্যবস্থা সারা পৃথিবীতে আছে।

 

আমাদেরকে খতিয়ে দেখতে হবে আমাদের যে ব্যবস্থাটি ছিল বা আছে সেটি সত্যিকারার্থে আন্তর্জাতিক মানের কি না। আর যদি সেটা আন্তর্জাতিক মানের না হয়ে থাকে তাহলে দুর্বলতা কোথায় ছিল সেটা চিহ্নিত করতে হবে। যাতে আমরা আমাদের রিজার্ভকে নিরাপদ করতে পারি সেজন্য আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।#

 

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/২৫

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন