এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 মার্চ 2016 19:20

‘নির্বাচনে গুলি করা সমাধান নয়,ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের’

‘নির্বাচনে গুলি করা সমাধান নয়,ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের’

২৮ মার্চ(রেডিও তেহরান): বাংলাদেশে প্রথম দফার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ভালো হয়নি। নির্বাচনে যে সহিংসতা হয়েছে তার দায় দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তায়। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের পরিচালক ড. বদিউল আলম মুজমদার রেডিও তেহরানের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন।

 

তিনি বলেছেন, নির্বাচনে গুলি করা কোনো সমাধান নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গুলি যাতে করতে না হয় এবং সহিংসতা যাতে এড়ানো যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আমি মনে করি এই সহিংসতার জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আর নির্বাচন কমিশনের এই ব্যর্থতার বিচার করবে কে-এটাই বড় প্রশ্ন বলে উল্লেখ করেন বিশিষ্ট এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

একথা সত্য যে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের কারণে সহিংসতা হয়েছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের ফলে শুধু সহিংসতাই নয় ব্যাপক মাত্রায় নির্বাচন বাণিজ্য হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ে।

 

ড. বদিউল আলম বলেছেন, নির্বাচন বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনীতি একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ এবং উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ২২ জন নিহতের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছে বিএনপি। বিএনপির এ অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, কেউ যখন দায়িত্বে থাকে তখন তার ওপর দায়িত্ব বর্তায়। কে কি অভিযোগ করল তাতে কিছু আসে যায় না। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দেশের জনগণের পক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। এটা যদি তারা নিশ্চিত করতে না পারে একইসাথে যদি তারা বিভিন্নরকম অসহায়ত্বমূলক বক্তব্য দেয় তাহলে তো সেটা গ্রহণযোগ্য নয়।

 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের কয়েকদিন আগে বলেছেন, তারা দায়িত্ব নেবেন না। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে তারা সহায়তা পান না। শপথ নিয়ে তারা দায়িত্বগ্রহণ করেছেন এখন তারা যদি দায়িত্ব না নেন তাহলে দায়িত্ব কে নেবে! ফলে প্রথম দফার ইউপি নির্বাচন যে ভালো হয়নি এবং সহিংসতা হয়েছে এর দায় দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়।

 

রেডিও তেহরান: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নেতারা বলছেন, দলীয় ভিত্তিতে ইউপি নির্বাচন করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণেই এতগুলো মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে এবং আরো আশংকা রয়েছে। আপনার কী মনে হয়?

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন, এবারের এই নির্বাচনের আগেও কিন্তু আমি সাবধান করেছিলাম। দলীয় ভিত্তিতে এ মুহূর্তে নির্বাচন করার বিপক্ষে আমি কথা বলেছিলাম। আমি মনে করি হয়তো ভবিষ্যতে দলীয় ভিত্তিতে এ নির্বাচন হতে পারে। বর্তমানে আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যে দুরবস্থা-দলের মধ্যে কোনো গণতন্ত্র নেই,স্বচ্ছতা নেই এবং দায়বদ্ধতাও নেই। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেউ সদাচরণ করে না। সেই অবস্থায় দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করলে সংকট সৃষ্টি হবে।

 

আর একথা সত্য যে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের কারণে সহিংসতা হয়েছে। আর এবারের সহিংসতার ধরণও ভিন্ন ছিল। সহিংসতা ছিল মূলত ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে। আর এ সহিংসতার শুরু নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার ঠিক পর থেকে। আমরা এর আগে দেখেছি সাধারণত সহিংসতা ঘটতে দেখেছি নির্বাচনের দিনে। কিন্তু এবার সহিংসতা ঘটেছে তার অনেক আগে।

 

সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি যদি কোমর ভাঙা না হতো, তারা যদি শক্তিশালী অবস্থানে থাকত তাহলে সহিংসতা বেসামাল পর্যায়ে চলে যেত।

 

দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের ফলে শুধু সহিংসতাই নয় ব্যাপক মাত্রায় নির্বাচন বাণিজ্য হয়েছে। এ নির্বাচন বাণিজ্য তৃণমূল পর্যায়ে চলে গেছে। এর আগে মনোনয়ন বাণিজ্য হতো সংসদ নির্বাচনে, তারপরও কেউ কারো বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট করে অভিযোগ করত না। কিন্তু এখন মনোয়ন বাণিজ্য তৃণমূল পর্যায়ে চলে গেল এবং সুস্পষ্ট অভিযোগ সামনে এসেছে। তারমানে রাজনীতি একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর সেই ব্যবসা তৃণমূল পর্যায়ে চলে গেল। আমরা বর্তমানে একদল ব্যবসায়ীকে ক্ষমতায়িত করেছি। আর এসবই হয়েছে দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের কারণে।

 

রেডিও তেহরান: ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মঠবাড়িয়া ও টেকনাফে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব প্রক্রিয়া মেনেই গুলি চালানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিজিবি’র মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ। প্রয়োজন হলে বিজিবি ভবিষ্যতেও গুলি চালাবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখবেন?

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমি জানি না বিজিবি আইন মেনে চলেছে নাকি বেআইনিভাবে করেছে। তবে এ ব্যাপারে আমি যতটুকু জানি যে কোনো পরিস্থিতিতে গুলি করার জন্য ম্যাজিষ্ট্রেটের অনুমতি এবং নির্দেশ লাগে। সেটা করা হয়েছিল কি না সেজন্য তদন্ত করার দরকার। আর যদি সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে গুলি তো হতেই পারে। কিন্তু যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে- আমাদের নির্বাচন হচ্ছে একটা সভ্য পদ্ধতি, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের পদ্ধতি। কিন্তু সেই সভ্য নির্বাচন পদ্ধতিতে যদি এভাবে সহিংসতা হয় তাহলে তো আমরা অসভ্যতার মধ্যে চলে গেলাম। সামন্তবাদি প্রথায় যেভাবে ক্ষমতার রদবদল হতো শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে। আমরা কি আবার সেদিকে চলে যাবো কি না!

 

কালের বির্বতনে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে এভাবে গুলি করা কোনো সমাধান নয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে গুলি যাতে করতে না হয় এবং সহিংসতা যাতে এড়ানো যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি এবং আমি মনে এই সহিংসতার জন্য নির্বাচন কমিশন দায়ী। তারা কোনোভাবেই সফলতার পরিচয় দেয় নি; বরং ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

 

রেডিও তেহরান: বিএনপি এবং সরকারের শরিকদলগুলো ইউপি নির্বাচনে সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেছে। অনেকে সেই পুরনো অভিযোগ তুলেছেন, নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেখুন এটাতো তো সমস্যা। সবাই দেখেছে এবং জেনেছে এমনকি মহাজোটের শরীকরাও পর্যন্ত এ অভিযোগ করেছে। তারপরও নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পরিবর্তে তারা সাফাই গাইছে। তবে তারা কিছু কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে আমরা শুনেছি। আমরা শুনেছি কয়েকজন ওসির বিরুদ্ধে এবং একজন এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

 

কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই পারে। তবে এসব অভিযোগ তো নির্বাচনের আগেই উঠেছে। আর নির্বাচনের যথাযথ পরিবেশ ছিল না অনেক জায়গায়। তখন তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিল না কেন? তখন যদি ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে এমনটি ঘটতো না।

 

তাছাড়া পৌর নির্বাচনের সময় যে বাড়াবাড়ি হয়েছে এবং ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো জায়গায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের যে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে দেয়া হলো না কিম্বা বিভিন্ন রকম সহিংসতা ঘটানো হলো সে সময় কেনো ব্যবস্থা নেয়া হলো না! এসব প্রশ্ন আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

আমি আবারও বলছি সে সময় যদি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে এত ব্যাপকভাবে সহিংসতা হতো না। আর নির্বাচন কমিশনের এই ব্যর্থতার জন্য তাদের বিরুদ্ধে কারা ব্যবস্থা নেবে! আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বারবার যেসব অপকর্ম ঘটছে সে ব্যাপারে তারা সাফাই গাইছে। আমি তো মনে করি এখন সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।

 

জনগণ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আর জনগণের এ আস্থা হারিয়ে ফেলা মানে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়া। আর নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে গেলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। আর নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা আমাদেরকে চরম সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখন সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।

 

রেডিও তেহরান: দলীয় ভিত্তিতে ইউপি নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের সংখ্যা সবাইকে ছাড়িয়ে, বলা যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এর অর্থ হচ্ছে- সরকার সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। আপনার মূল্যায়ন কী?

 

ড. বদিউল আলম মজুমদার: হয়তো বা সরকার সারাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। কিন্তু সুষ্ঠু –নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলেই বিষয়টি বোঝা যেত। নির্বাচনি পরিবেশটা যদি প্রতিযোগিতামূলক হতো তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। তবে এখন যা ঘটছে তাতে কোনোভাবেই বলা যায় না সরকার ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় কিংবা সরকারের জনপ্রিয়তা নাই অথবা অন্য কেউ জনপ্রিয়। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে এবং সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনি পরিবেশ থাকলে তখনই বলা যেত আসলে কারা জনপ্রিয় এবং কারা জনপ্রিয় না। জনগণ কাদের পক্ষে আছে এবং কাদের পক্ষে নেই।#

 

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ/২৮

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন