এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 এপ্রিল 2016 19:38

কৃষি এবং কৃষক উভয়ের অবস্থাই খারাপ : ফরহাদ মজহার

কৃষি এবং কৃষক উভয়ের অবস্থাই খারাপ : ফরহাদ মজহার

৫ এপ্রিল(রেডিও তেহরান): সরকারের নীতি ও উন্নয়নের ধারনা কৃষিবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, সমাজকর্মী ও কবি ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, আমরা কৃষি এবং কৃষককে ব্যবহার করছি শহরের লোকদের খাওয়াবার জন্য।

 

রেডিও তেহরানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ফরহাদ মজহার বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এটি একটি ভুয়া দাবি। এর বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। ফলে ভুয়া প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রাণ বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই ভুয়া প্রপাগান্ডা থেকে আমাদেরকে আগে মুক্ত হতে হবে।

 

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। আর সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: জনাব ফরহাদ মজহার, আমরা সবাই জানি বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আপনিতো দেশের কৃষি ও কৃষক নিয়েও কাজ করেন। তো এখন বাংলাদেশের কৃষকরা কেমন আছে?

 

ফরহাদ মজহার: দেখুন, আমাদের সভ্যতার ধারনা, উন্নয়নের ধারনা এবং সরকারের নীতি সবকিছুই কৃষি বিরোধী। আমরা শহর তৈরি করতে পারাকে উন্নয়ন বলি অন্যদিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃষিকাজ করাটাকে খারাপ কাজ বলে মনে করা হয়। ফলে কৃষকদের ভালো থাকার তো কারণ নেই। কৃষকদেরকে গরীব রেখে, তাদের পুরো গ্রামকে ধ্বংস করে দিয়ে; তাদের পরিবারকে নানাভাবে গরীব করে; তাদের সন্তানদের শহরে আনতে বাধ্য করা হয়। এরফলে কৃষক পরিবারের সন্তানরা শহরে সস্তা শ্রম দিতে বাধ্য হয়। বিদেশেও সস্তাশ্রমে যেতে বাধ্য হয়। আর এসবই করা হয় আমাদের বড়লোকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ফলে কৃষকরা কিভাবে ভালো থাকবে, তাদের ভালো থাকার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না!

 

রেডিও তেহরান: সম্প্রতি সরকার আউশ চাষে-দেশের ৪৯ জেলার কৃষকের জন্য ৩৩ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে এবং এই কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৬৩ বিঘা জমির জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও রাসায়নিক সার বিনামূল্যে সরবরাহ করবে। সরকারের এই উদ্যোগ নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন।

 

ফরহাদ মজহার: আউশ ধানকে ধ্বংস করে দিয়ে আবার আউশ ধান চাষের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এবং তাতে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। আমাদের চাষের পদ্ধতির মধ্যে আউশ ও আমন সবসময় একসাথে ছিল। এটা নতুন কিছু নয়। সেখানে আউশ ধানকে ধ্বংস করে দিয়ে এইচওয়াইভি নামক একটি উচ্চ ফলনশীল জাত এখানে আনা হয়েছে। আর এরমধ্য দিয়ে আউশ ধান হারিয়ে গেছে। আমাদের যে আউশের জাত ছিল বা বীজ ছিল তা বলা চলে হারিয়ে গেছে। সেকারণে আউশ ধান চাষের ক্ষেত্রে দেশে বিরাট একটা সংকট তৈরি হয়েছে।

 

আর এখন সরকার আউশ ধান চাষে প্রণোদনা দিয়ে সত্যিকারার্থে কি চাইছে, কিভাবে প্রণোদনার টাকা কৃষকদের দেবে- এর সাথে সাথে আসলে কৃষকরা সেই প্রণোদনার টাকা পাবে কিনা সেটাও একটা বড় সন্দেহ থেকে যায়।

 

আউশ ধান ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে বোরো ধান। বোরো চাষের ফলেই মূলত আউশ ধ্বংস হয়েছে। আগে আমনের আগে আউশ ধানের চাষ করা হতো। যেটাকে আশু ধান বলা হতো। সেই আউশ ধান আজ নষ্ট হয়ে গেছে। তো সেটাকে নষ্ট করে দিয়ে এখন সেই ধান চাষে প্রণোদনা দেয়া বা কৃষককে উৎসাহিত করার চেষ্টা অনেকটা গরু মেরে জুতা দানের মতো। ফলে সরকারের এই উদ্যোগে আমরা খুব একটা উল্লসিত বা উৎফুল্ল হয়েছি একথা বলা যাবে না।

 

আমি বলব বিলুপ্ত প্রায় আউশ ধান সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। আমরা সম্প্রতিকালে লক্ষ্য করছি আন্তর্জাতিকভাবে আউশ ধান সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে। তবে জাতগুলো একবার হারিয়ে গেলে নতুন করে উদ্ভাবন করতে গেলে এই জাতগুলো তখন তো আর পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে আমাদের নিজস্ব সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সচেতনার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। ফলে সরকারের এই উদ্যোগে আমরা খুব একটা উল্লসিত নই। এটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর বলে আমার কাছে মনে হয় না।

 

আর যে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার তুলনায় এই প্রণোদনা কিছুই না। তাছাড়া এই কর্মসূচি কারা এবং কিভাবে বাস্তবায়ন করবে। সেই কমপিটেন্সতো আমাদের নেই। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আমাদের মন্ত্রণালয় বা কৃষিঅধিদপ্তর তাদের সেই কমপিটেন্স আছে কিনা সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে। তবে সেসব জায়গায় একেবারে ভালো মানুষ নেই এমনটি মনে করি না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে এইসব কাজ করার কোনো দক্ষতা তাদের নেই।

 

রেডিও তেহরান: এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় জানতে চাইবো- যখনই কোনো সরকারি প্রণোদনা বা সহায়তার বিষয় আসে তখনই প্রশ্ন দেখা দেয় সত্যিকারার্থে কৃষকরা এই প্রণোদনার টাকা পাবে তো! কারণ বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতির একটা অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। আপনার কি মনে হয়?

 

ফরহাদ মজহার: দেখুন দুর্নীতির বিষয়টি ভিন্ন একটি সংকট। দুর্নীতির বিষয়টিকে আমরা আলাদাভাবে দেখতে চাই। তবে কৃষি সম্পর্কে যদি কোনো ধারনা না থাকে তাহলে কি করে হবে! কৃষিমানে কিছু উচ্চফলনশীল জাত তৈরি করা এমনটি নয়। আর এসব জাত তৈরি করতে গিয়ে রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এসব করতে গিয়ে খাদ্য নষ্ট করা হচ্ছে। একটা জাত তৈরি করতে গিয়ে যখন বিষ দেয়া হয় তখন অন্যান্য খাদ্যের উৎস এতে নষ্ট হয়ে যায়। গরুর খাদ্যের উৎস ঘাস সেটা যখন বিষাক্ত হয়ে যায় তখন তো আর সেটাকে খাওয়া যাবে না। হাঁস-মুরগি খাওয়া যাচ্ছে না-এদের পরিমাণ কমে গেছে। গবাদি পশু কমে গেছে। গ্রামের পরিবারগুলো যে হাঁস-মুরিগির চাষ করত তারা এখন আর সেটা করতে পারছে না কারণ গ্রামের পরিবেশকে বিষাক্ত করে দেয়া হয়েছে। মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে বলা চলে মাটি পাথর হয়ে গেছে।

 

আর দুর্নীতির বিষয়টি হচ্ছে রাষ্ট্রের নামে যখন কোনো কিছু সঠিকভাবে না করা হয় অর্থাৎ দুর্নীতির কারণে যখন কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হয় তখন তাতে ক্ষতি হয়।

 

তবে বাংলাদেশে কৃষি ধ্বংসের আসল কারণটা দুর্নীতি নয়; কৃষি ধ্বংসের কারণ কেবলমাত্র সরকারও নয়। বাংলাদেশে সাধারণভাবে কৃষি সম্পর্কে অজ্ঞতা রয়েছে।

 

আপনি আপনার প্রশ্নের শুরুতে যে কথা বলেছেন যে, বাংলাদেশ একটি কৃষিভিত্তিক দেশ। আসলে একথাটা এখন কথার কথা। এই কথার তাৎপর্য দেশের কোন লোকটি বোঝে!

 

রেডিও তেহরান: সরকারের নানা উদ্যোগের পরও সারাদেশের কৃষকের অবস্থা ভালো নেই এমন খবর পাওয়া যায়। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এমনও অভিযোগ শোনা যায় লাভ দূরের কথা উৎপাদন খরচও তাদের ওঠে না। ফলে কৃষকদের অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে। এমন কেন হচ্ছে-সরকার বলছে তারা কৃষিবান্ধব-তাহলে কেন এ অবস্থা..

 

ফরহাদ মজহার: দেখুন, আমরা কৃষি এবং কৃষককে ব্যবহার করছি শহরের লোকদের খাওয়াবার জন্য। কারণ খাবারের দাম বাড়লে শহরে বিক্ষোভ হয়। ফলে অর্থনীতির সব নীতি কৃষক এবং কৃষি বিরোধী। বাজার ব্যবস্থায় যদি একটি সুষম নীতি করা হয় অর্থাৎ কৃষিকে স্বাভাবিক রাখা হয় এবং শিল্পের প্রতি বিশেষ একচোখা দৃষ্টি না দেয়া হয় তাহলে কৃষি তার নিজস্ব গতিতে এগোবে। কৃষক তখন লাভবান হবে। কিন্তু সেটা আমরা করছি না এবং করতে দিতেও চাইছি না। আর সেকারণেই কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। ফলে এই মুহূর্তে কৃষি এবং কৃষকবান্ধব নীতি করা খুবই জরুরি। কিন্তু যেখানে সরকারে নীতিটাই কৃষি এবং কৃষক বিরোধী সেখানে কিভাবে কৃষকরা টিকে থাকবে! আমি এব্যাপারে কোনো সুযোগ দেখছি না।

 

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, আমরা খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে এখন খাদ্য রফতানির দেশে পরিণত হয়েছি। এটি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য সুখবর। কিন্তু যে কৃষকের হাঁড়ভাঙা পরিশ্রমের ফলে এই সফলতা তারা যদি ন্যায্যমূল্যের অভাবে কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে এই সফলতা তো অসারতায় পরিণত হবে। এ সমস্যা সমাধানে সরকার কি কি উদ্যোগ নিতে পারে?

 

ফরহাদ মজহার: দেখুন, এক্ষেত্রে আমি শুধু সরকারের কথা বলব না। যদি সরকারের কথা বলতে হয় সেক্ষেত্রে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনেক কথা বলতে হবে।

 

আমাদের কৃষিমন্ত্রী তার আচলে বেধে আফ্রিকা থেকে একটি ধানের জাত আনলেন। যে ধান আফ্রিকাতে হয় না, সেটা উনি আচলে বেধে আনলেন আমাদের কৃষকদের জন্য। তিনি আমাদের কৃষকদের সাথে এ ব্যাপারে প্রতারণা করেছেন।

 

তিনি জেনেটিক্যালি মোডিফাইড বিটি বেগুন নামে একটি বেগুন আনলেন দেশে। যেখানে আমাদের দেশি বেগুন কৃষকরা বিক্রি করতে পারছেন না, সেখানে তিনি কৃষকদের হাতে বিটি বেগুন তুলে দিচ্ছেন। আমাদের সমস্ত কৃষিকে দুষিত করার জন্য বিষাক্ত করার জন্য তিনি কাজ করছেন। ফলে আমি এই মুহূর্তে চাইছি না তার বিরুদ্ধে কথা বলতে।

 

তবে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এটি একটি ভুয়া দাবি। দেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিরিয়াল উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু অন্যান্য খাদ্যকে ধ্বংস করে দিয়ে কেবলমাত্র ধান উৎপাদন করা হয়েছে। ডাল নেই, তেল নেই, নেই গবাদি পশু, মাছ ধ্বংস হয়েছে, নদী ধ্বংস হয়েছে। তারপর বলা হচ্ছে খাদ্য উৎপাদনে আমরা এগিয়ে। তাহলে কি বলা যাবে আসলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে! বাংলাদেশে আগে যে পরিমাণ খাদ্য ছিল তা ধ্বংস করা হয়েছে।

 

এই যে ভুয়া প্রপাগান্ডার ভিত্তিতে আধুনিকদের মনকে উত্তেজিত করে রাখি যে এর আগে আমাদের ৭ কোটি মানুষ ছিল এখন ১৬ কোটি মানুষ হওয়ার পরও তাদেরকে আমরা খাওয়াচ্ছি; কোনো সমস্যা নেই। এটা সম্পূর্ণভাবে প্রপাগান্ডা। এর বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। ফলে ভুয়া প্রচার প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রাণ বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই ভুয়া প্রপাগান্ডা থেকে আমাদেরকে আগে মুক্ত হতে হবে।#

 

রেডিও তেহরান/গাজী আবদুর রশীদ

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন