এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 13 এপ্রিল 2016 16:05

১লা বৈশাখে জাতীয় সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে না: অধ্যাপক ফজলুল হক

আবুল কাসেম ফজলুল হক আবুল কাসেম ফজলুল হক

১লা বৈশাখ হচ্ছে  বাংলা নববর্ষ উদযাপনের দিন। বর্তমানে এটি বাঙালিদের জাতীয় জীবনে অন্যতম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্রাট আকবর এ দিনটিতে আমীর-ওমরাহদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ সাধ্যানুযায়ী নতুন জামা-কাপড় পরে উৎসবে অংশ নিতেন। মিষ্টান্ন আপ্যায়ন, গানের জলসা ছাড়াও নানা ধরনের ধেলাধুলার ব্যবস্থা থাকত। মুসলমানরা নববর্ষের দিন ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মুনাজাত ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করতেন। কিন্তু বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পদ্ধতি পাল্টে গেছে। বর্তমানে ১লা বৈশাখে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো, সিঁদুর দেয়া, কাঁসার ঘণ্টা বাজানো, উল্লু ধ্বনি দেয়া, এমনকি নানা রকম মুর্তির মুখোর পরার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আলেমসমাজ এসব প্রবণতাকে সমর্থন করেন না। তারা একে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির অংশ বলে মনে করেন। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম ফজলুল হকের সঙ্গে। তাঁর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি এখানে দেয়া হলো :

 

রেডিও তেহরান : বাংলা বর্ষ গণনা কখন থেকে শুরু হয়েছে। অনেকেই বলেন, বাংলা সালের সাথে ইসলামী ঐতিহ্যের সম্পর্ক আছে। যেমন হিজরী সনের সাথে এর সম্পর্কের কথাও বলা হয়। তো এ বিষয়ে যদি আপনি কি বলেন?

 

আবুল কাসেম ফজলুল হক : এখানে একটি বিষয় হচ্ছে হিজরী সনের সাথে সম্পর্ক রেখে নানান প্রয়োজনে কিছু পরিবর্তন করে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর তার শাসন আমলে। আমাদের দেশে এই সন ফসলী সন হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা কোন ফসল কখন বুনবে সে কাজের জন্য প্রথমে বাংলা সন ব্যবহৃত হতো। কৃষকরা কখন ফসল তুলবে সেটা বড় বিষয় ছিল না কিন্তু কখন ফসল বুনবে বা কোন চারা কখন লাগাবে সেটা মুখ্য বিষয় ছিল। আর সেই কাজে বাংলা সন ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখন বাংলা সন নিয়ে উৎসবের যে ব্যাপার সেটা আমাদের অনুসন্ধান করে দেখা দরকার বা লক্ষ্য করা দরকার। আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ্য করেছি শহরগুলোতে বাংলা নববর্ষের উৎসব ছিল না। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও পহেলা বৈশাখে মেলা হয়েছে। সারা দেশ জুড়ে সব অঞ্চলে বর্তমানে সর্বত্র পহেলা বৈশাখে বা নববর্ষের মেলা হয়েছে এমন প্রমাণ আমি পাইনি। বাংলা নববর্ষের এই মেলায় সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার ছিল ছোটরা নানা রকম খেলনা মেলা থেকে কিনত, মিষ্টি যেমন জিলাপি বা অন্যান্য খাবার জিনিষ কিনতো আবার কোনো কোনো জায়গায় মেলাকে কেন্দ্র করে মেলার মধ্যে অথবা চারপাশে জুয়া খেলা, তাড়ি খাওয়া নানা রকম গানের আসর বসা ইত্যাদি ছিল। আমিও কোথাও কোথাও এ ধরনের চিত্র দেখেছি বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে। শহরের লোকেরা বিশেষ করে ঢাকা শহরের লোকেরা বাংলা নববর্ষের মেলা উদযাপনে বা কোনো অনুষ্ঠান করাতে উৎসাহী ছিল না। আমি আমার নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এটা দেখেছি ১৯৫০-এর দশকে শহরের লোকেরা শহুরে নাগরিক হয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। তো সেই অবস্থায় পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের যে উৎসব তাকে গ্রাম্য উৎসব বা গ্রাম্যতাই মনে করা হতো।

 

এ প্রসঙ্গে আমি কবি শামসুর রহমানের কথা বলি। তার জন্ম ঢাকা শহরে। ঢাকা শহরে বড় হয়েছেন সেখানেই শিক্ষা দীক্ষা লাভ করেছেন এবং কৈশোর বয়স থেকেই সাহিত্য চর্চা করেছেন কবিতা লিখেছেন। তার পরিচয়ই ছিল তিনি নাগরিক কবি। আর অন্য লেখকেরাও তাকে নাগরিক কবি বলেছেন এবং তাকে নাগরিক কবি বলা হলে তিনি আনন্দিত বোধ করতেন। গ্রাম থেকে শহরে আসা প্রথম জেনারেশন বা যারা প্রথমে গ্রাম থেকে শহরে আসেন তাদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ছিল শহুরে হয়ে ওঠার।

 

জসীমউদ্দীনকে পল্লীকবি বলা হতো। পল্লীকে নিয়ে বহু কবিতা রচনা করেছেন। তবে তিনি পল্লী কবি নয় শুধু কবি পরিচয়টা চাইতেন। কিন্তু ঢাকা শহরের লোকেরা তাকে পল্লী কবিই বানিয়ে রেখেছে ফলে তিনি একসময় রাগে দুঃখে অভিমানে এক জায়গায় লিখলেন আমার দেশবাসী আমাকে পল্লী কবি হিসেবে চাইছে, আমি পল্লী জীবনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় কবিতা লিখেছি এবং এই পল্লী কবি অভিধাই আমি আমার জীবনে গ্রহণ করে নিলাম। কিন্তু এর মধ্যে তার দুঃখ ছিল; ছিল অভিমান। আরেকটা বিষয় হচ্ছে পঞ্চাশের দশকে এমনকি ষাটের দশকের প্রথম দিকেও পহেলা বৈশাখের উৎসব বা মেলা ঢাকা শহরে উদযাপিত হয়নি। আমার ধারণা অন্যান্য শহরেও হয়নি। কোনো পরিবার পারিবারিকভাবে যে এই অনুষ্ঠান করেছে এমন প্রমাণ বা পরিচয় আমি পাইনি। যাটের দশকের শেষ দিক থেকে এই পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠান শুরু হয়। আমার মনে পড়ে ১৯৬৯ এর অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠান করেছিল এবং সেই অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মাদ এনামুল হক নববর্ষ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন বিষয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। তিনি তার প্রবন্ধে বলতে চেয়েছিলেন পাকিস্তান যে জাতীয়তাবাদ নিয়ে দাঁড়াতে চাইছে সেটি ঠিক নয়; পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ব্যবস্থা করে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করতে হবে। আর পাকিস্তানের মধ্যে বাঙালি সংস্কৃতি থাকবে। তার এই বক্তব্য তখনকার পত্র -পত্রিকায় খুব প্রচার লাভ করে। ঠিক একই সময় বা তার একটু আগেও হতে পারে ছায়ানট বলে যে সংগঠনটি ঢাকায় আছে তারা পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাদের সেই অনুষ্ঠানে আলোচনা বা অন্য কিছু ছিল না, কেবলই গানের অনুষ্ঠান ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল গানের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা চেতনাকে পরিশোধিত করা যায়; গানের মাধ্যমে জাতীয় চেতনা বিকশিত করা যায়। এনামূল হকের প্রবন্ধে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর কথা বলা হয়েছে এই ধরনের একটি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ছায়ানট তার পর থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠান করতে থাকে। ঢাকা শহরে এইভাবে পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিকভাবে হতে থাকে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান অনেক বেশী ব্যাপ্তি লাভ করে। দেখা যায় প্রায় সব শহরে অনেক সংগঠন পহেলা বৈশাখ উদযাপন করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যেসব সংগঠন জড়িত ছিল অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে যারা গুরুত্ব দেয় তারা পহেলা বৈশাখকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং এ সময় অনুষ্ঠান করেছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে, কলেজগুলোতে, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়েছে। এখন পহেলা বৈশাখের যে রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটা হলো প্রত্যেকটি উপজেলা হেডকোয়াটার্সে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করছে এক অথবা একাধিক সংগঠন। আর এসব পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এখনও বাঙালি জাতীয়তাবাদ কথাটাই জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলে। পহেলা বৈশাখের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে একরকম প্রতিবাদ করা হয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়। পাকিস্তান আমলের কথা স্মরণ করা হয়। গানের মধ্যে দিয়ে এক ধরনের জাতীয় চেতনা এবং অনুপ্রেরণা লাভ করার চেষ্টা করা হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এটি হলো একটা দিক।

 

আরেকটা দিক হলো, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অল্প কিছু দিন পর পহেলা বৈশাখ শহরের বড় লোকদের বিলাসী বা ভোগবাদী ফ্যাশনে পরিণত হয়। ধরুন, এখন থেকে ২০ থেকে ২৫ বছর আগে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে একশ টাকা, দুইশ টাকা দরে এক শানকি পান্তা কিনে খাছে এক শ্রেণীর লোক আবার কিছু লোক এসব পান্তা বিক্রি করছে। এ ধরনের কিছু ফ্যাশনেবল ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় পহেলা বৈশাখে। শহরের বড় লোকদের ড্রয়িং রুমে দেখা যায় তালের পাখা, ধানের ছড়া, ছোট ঢেকি বা কুলা। অনুকরণীয় হিসেবে তারা এসব তাদের ড্রয়িং রুমে সাজিয়ে রাখছে। এগুলো দিয়ে তারা বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলতে চাইছেন। তো আমি এ বিষয়ে যেটি উপলব্ধি করি এসবের মধ্যে অনেক কিছুই খুব আন্তরিক কোনো বিষয় নয় ; লোক দেখানো ব্যাপার আবার অনেকগুলো বিলাসিতার ব্যাপার।

 

জনসাধারণের সাথে মানসিক সম্পৃক্তি নিয়ে একটা জাতির জাতীয় সংস্কৃতি যেভাবে বিকশিত হওয়া দরকার বা করা দরকার সেরকমটা হচ্ছে না। তো এভাবে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সুস্থ তেমন কিছু করা হচ্ছে না এতে ফ্যাশনেবল বা দর্শনীয় নানা কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে আমাদের জাতীয় জীবন অনেক সমস্যায় আচ্ছন্ন। এসব সমস্যা থেকে মুক্তির চেতনা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হওয়া উচিত। আমি এরকমটি উপলব্ধি করি।

 

রেডিও তেহরান : বাংলা নববর্ষ এখন বাংলাদেশি বা বাঙালির একটি অন্যতম উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটা এখন যতটা ব্যাপকতা পেয়েছে এর আগে এত ব্যাপক ছিল না। তো নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে দেখা যায় মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো, মুখোশ পরা, সিদুঁর দেয়াকে বাংলাদেশের ধর্মীয় মহল সমর্থন করছেন না। তারা একে অন্য ধর্মের সংস্কৃতি বলছেন এবং তারা বলতে চান বাংলা নববর্ষের সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। বিষয়টিকে কিভাবে দেখবেন।

 

আবুল কাসেম ফজলুল হক : বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এরকম ঘটনা কখনও কখনও ভীষণভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৯৮০ দশকে মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয়েছে, সেই আন্দোলনে বিদেশী রেডিও বেশ উসকানিমূলক প্রচার করেছে। তাতে উৎসাহিত হয়ে এবং আরো নানা কারণে আমাদের দেশের কোনো মহল থেকে এই সিদুঁর দেয়া, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো এ ধরনের কিছু বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়। আর এসব আমাদের দেশে পুরাতন কোনো কোনো ধর্মীয় ধারা। ইসলাম এদেশে ব্যাপ্তি লাভের অনেক আগে থেকেই এসব ধারা এদেশে ছিল। তো সেই জিনিষগুলো একসময় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে এগুলো আদৌ ছিল না এমনকি হিন্দু সমাজেও এগুলোর প্রচলন খুব কম ছিল। তো সেই জায়গায় পহেলা বৈশাখের অনু্ষ্ঠানে কোনো কোনো বছর আমি শুনেছি ‘হরে রাম হরে রাম’ বলা হচ্ছে। এ ধরনের কাজগুলো উসকানিমূলক। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা যারা খুব জোর দিয়ে বলেন তারা গণতন্ত্র বা অন্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে বিকশিত না করে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় সংস্কার এমনকি সামগ্রিকভাবে ধর্মকে আক্রমণ করার একটা প্রবণতা কিছু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং মানুষের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা হয়। আমি বলব এরকম করা উচিত নয়।

 

রেডিও তেহরান : বাংলা সাহিত্যের অনেক গবেষকের মতে ৮ম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত পালদের রাজত্ব কালে এসব ছিল না, পালরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এরপর সেনরা এ অঞ্চলে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সংস্কৃতকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং পূজা উপলক্ষে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানোসহ এসব কিছুকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। কাজেই সেনরা যেহেতু বহিরাগত ছিল তাই তারা বলতে চান এই সংস্কৃতি বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি নয় ;এটা আপনি সমর্থন করেন কিনা?

 

আবুল কাসেম ফজলুল হক : দেখুন! বৌদ্ধ ধর্ম কিন্তু উত্তর ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। সমাজের সাধারণ মানুষ যারা নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং জাতিভেদ প্রথায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল তারা ব্যাপকভাবে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। আর বৌদ্ধ ধর্মটাই ব্রাহ্মণ্য থেকে বিদ্রোহ করে আত্মপ্রকাশ করেছিল; ব্রাহ্মণ্য ধর্মের যারা অভিজাত শ্রেণী ছিল তাদের সাথে লড়াই করে বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বিকশিত হয়েছিল এবং টিকে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভারত বর্ষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা টিকতে পারেনি আবার ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে জিনিষটি দেখি সেটা হচ্ছে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আর্যদের প্রভাবে প্রথম পর্যায়ে এখানে বিস্তার লাভ করেছে বটে কিন্তু খুব সুদৃঢ় রূপ লাভ করেনি। তারপরই বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক বিস্তারের ইতিহাস পাওয়া যায়। বাংলার ইতিহাস পালদের থেকে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায় তার আগে খুব সামান্যই পাওয়া গেছে। বৌদ্ধদের মধ্যে যেহেতু জাতিভেদ কথাটা নেই ফলে যেসব বিষয় আপনি প্রশ্নে এনেছেন বা আমিও আলোচনার মধ্যে বলেছি সেসব বিষয় যে পালদের সময়ে ছিল তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এসব বিষয় হয়তো আরো পরবর্তীতে ব্যাপ্তি লাভ করেছে। এগুলো ব্যাপ্তি লাভ করেছে সেন রাজাদের সময়ে কিংবা আরো পরে শ্রী চৈতন্য দেব আত্মপ্রকাশ করে এসবের প্রচলন করেন এবং তিনি ব্যাপকভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সংস্কার করেন। তিনি জাতিভেদ তুলে দেন তাছাড়া পূজা পার্বন এসবও তিনি তুলে দেন। এক হরিনাম সংকীর্তনকে গুরুত্ব দেন এবং জাতিভেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তো এসবের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের স্থানীয় যে সংস্কৃতি ছিল বা সংস্কার ছিল তা বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে রূপলাভ করে। বৈষ্ণব ধর্ম তৎকালীন পটভূমিতে অনেক বেশী প্রগতিশীল ছিল এবং বৈষ্ণব ধর্ম তৎকালীন সময়ে ইসলামের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। শ্রী চৈতন্য ইসলাম এবং মুসলমানদের লক্ষ্য করেই হিন্দু ধর্মের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তো এখানে পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে আপনি যে কথা বললেন সেন রাজাদের সময় নানা রকম পার্বণ বা প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একথা ঠিক ; সেনরা ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলেন এবং জাতিভেদ প্রথা থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে যে হিন্দু ধর্ম রূপ লাভ করেছে তার অনেক কিছুই সেনদের আমলে প্রবর্তিত হয়। যদিও বাংলার বিভিন্ন স্থানে সেন রাজরা খুব বেশী দিন রাজত্ব করেননি খুব বেশী হলে ৭০ থেকে ৭৫ বছর রাজত্ব করেছেন। আর ঠিক ঐ সময়টাতে আমাদের দেশে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম আসল রূপ লাভ করে। তখন পালদের ওপর, বৌদ্ধদের ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কঠোর নির্যাতন চালিয়েছিল। বৌদ্ধদের সাথে ব্রহ্মণ্যবাদীদের রায়ট হয়েছে, লুটতরাজ হয়েছে। সে সময় বৌদ্ধরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় বৌদ্ধরা ইসলামে আকৃষ্ট হয়। বৌদ্ধ সাম্যবাদের চেয়ে ইসলামী সাম্যবাদ আরো উচ্চকিত এ কথাটা তারা বুঝতে পেরে বৌদ্ধরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আমাদের সামনে যদি গোটা ইতিহাস থাকে পাল রাজাদের আমল, বৌদ্ধদের সময় সেটাইতো বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহাসিক যুগের ফাউন্ডেশন। তারপর সেন রাজাদের সময় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রূপ পাই। তারপর তুর্কি, পাঠান, মোঘল মুসলিম শাসন আমল। সে সময়ে ইসলামের প্রভাবে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়েছে। এরপর শ্রী চৈতন্যের নেতৃত্বে হিন্দু ধর্মের ব্যাপক সংস্কার করা হয়। তখনকার হিন্দু ধর্মের উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা উপলব্ধি করেন যে সবাই তো মুসলমান হয়ে যাবে। আর তা থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বা হিন্দু সমাজকে রক্ষার জন্যই সমাজতাত্ত্বিকভাবে শ্রী চৈতন্য এবং বৈষ্ণব ধর্মের আবির্ভাব বা আত্মপ্রকাশ এটা বলা যায়। তো আপনি যেভাবে বলছেন, সেটার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দিক থেকে ধারাবাহিকভাবে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ দেখা খুব দরকার। তাতে ঐতিহাসিকভাবে প্রথমে আমরা পাই পালদের ও বৌদ্ধদের কথা। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদকে আমরা পাই; আর এটি বৌদ্ধদের সৃষ্টি। এক্ষেত্রে বাঙালি বৌদ্ধদের ইতিহাস আমাদের বোঝা দরকার। তারপর ব্রাহ্মণ্য ধর্ম কিভাবে সুদৃঢ় রূপ লাভ করল আমাদের সভ্যতার বিকাশে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা কি, এখানে মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠা এবং তার প্রভাব কি হয়েছে এবং সর্বোপরি ইসলামের বিস্তার এবং তার মধ্যে দিয়ে কিভাবে সংস্কৃতি বদলে গেছে, মুসলমান সমাজ নতুনভাবে গড়ে ওঠেছে হিন্দু সমাজও তো আগের মতো থাকেনি; বৌদ্ধরা ইসলামে দীক্ষিত হয়েছে-এই পরিবর্তনগুলো কিভাবে হয়েছে- আমাদের সংস্কৃতিকে বোঝার জন্যে এটা খুব দরকার। তারপর ইংরেজ শাসন এবং সে সময়ে ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা কিভাবে পরিচিত হয়েছে এবং তার ফলে কি হিন্দু সমাজ বা মুসলিম সমাজের জীবনযাপন, দৃষ্টিভঙ্গী, চিন্তাভাবনা, ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে এ ব্যাপারগুলো পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে আমাদের বোঝার চেষ্টা করা উচিত। আর সেগুলো করা হলে আমাদের চিন্তাভাবনা আমাদের যে সামাজিক বিরোধ বা সামাজিক বিভেদ ও অনৈক্য এগুলোর অনেক কিছু কেটে যেত।

 

রেডিও তেহরান: আচ্ছা অনেকে মনে করেন মুসলমানরা তাদের নববর্ষ উদযাপন করবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ এবং দেশীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। এই মত সম্পর্কে আপনি কি মনে করেন?

 

আবুল কাসেম ফজলুল হক: হ্যাঁ এটাই তো ঠিক। আর এটা স্বাভাবিক যে ধর্মের ভিন্নতার জন্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা যায়। বাঙালি হিন্দুদের সংস্কার, বিশ্বাস, জীবনযাত্রা ও ধর্মের সাথে বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে এগুলোর বেশ কিছু পার্থক্য সুস্পষ্ট। আর এটা খুবই স্বাভাবিক যে মুসলমানদের অনুষ্ঠান পালনে কিছুটা ভিন্নতা থাকবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। আর এই ভিন্নতা জোর করে মুছে মেলার চিন্তা একটা মস্তবড় ভুল। আবারও বলছি এই ভিন্নতা থাকবেই এবং এসব ভিন্নতা নিয়ে এগুতে এগুতে যখন জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তারের সাথে সাথে নতুন নতুন চিন্তা বা বিষয় সামনে আসবে, প্রকৃতিরও পরিবর্তন হবে তখন ভবিষ্যতে অন্যরকম হবে। তবে তখনও ব্যবধান ও পার্থক্য থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্যের রূপ এখনকার চেয়ে ভিন্ন হবে।#

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন