এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 23 এপ্রিল 2016 19:20

গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ: মোশরেফা মিশু

গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ: মোশরেফা মিশু

গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা, বেতন ভাতা নিয়ে সরকার ও মালিকপক্ষ অনেক কথা বললেও বস্তুত গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ। ন্যায্য মজুরীর দাবি তুললে শ্রমিকদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। রেডিও তেহরানের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বিশিষ্ট নারী নেত্রী মোশরেফা মিশু।

 

তিনি বলেন, শিল্প পুলিশ ও শিল্প গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে শ্রমিকদের ন্যায্য বেতনের কথা বললেও তারাও সরকার ও মালিকের স্বার্থই দেখে-শ্রমিকের স্বার্থ নয়!

 

মিশু বলেন, গার্মেন্টস মালিকরা দাবি করেন তারা মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। হ্যাঁ, গার্মেন্টস করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বস্তুত তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য গার্মেন্টস তৈরি করেনি। তারা গার্মেন্টস করেছেন প্রচুর মুনাফা অর্জন করবেন বলে। আর সে বিষয়টিই আমরা প্রতিমূহুর্তে দেখতে পাই।

 

পুরো সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব উপস্থাপন করা হল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

রেডিও তেহরান: মোশরেফা মিশু, সাভারে গার্মেন্টসে মালিকপক্ষের পিটুনিতে ৫ শ্রমিক আহত হয়েছে। শ্রমিকদের অপরাধ তারা বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের টাকা চেয়েছিল। তাছাড়া তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা আউখাব এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেছিল গার্মেন্ট শ্রমিকরা। তো এ ধরনের ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটছে। কিন্তু এত সমৃদ্ধ একটি সেক্টরে কেন এমনটি হচ্ছে।

 

মোশরেফা মিশু: আপনি ঠিকই বলেছেন, এরকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই ঘটছে। আপনারা দেখবেন যে দেশে দিনের পর দিন কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে। একদিকে যেমন কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে দেশের শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা অত্যন্ত নিন্মমানের জীবনযাপন করছেন। তাদের অধিকাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন।

 

আর এ বিষয়ে আমরা যারা কথা বলি তাদের বিরুদ্ধেও দেখা যাচ্ছে প্রায়ই মামলা মোকদ্দমা দেয়া হচ্ছে এবং জেলে ভরা হচ্ছে। এরকম একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গার্মেন্ট হচ্ছে আমাদের একশ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প। কিন্তু এই শিল্পে সরকার এবং মালিকপক্ষ অনেক কথা বলছে। তারা বলছে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আছে, শ্রমিকদের ভালো বেতন দেয়া হচ্ছে-ইত্যাদি। কিন্তু কার্যত খোঁজ নিলে দেখা যাবে শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ। এখানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই। কোনো কারখানায় শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। যখন শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরী পায় না- তখন তারা ন্যায্য মজুরির দাবি তুললে তাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন নেমে আসে। এই পরিস্থিতি চলছে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকরদের ওপর।

 

এসব বিষয় থেকে বলা যায় আসলে এখনও আমাদের দেশে এখন প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ হয়ে ওঠেনি। এদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা লড়াই করছি। যতদিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমরা প্রতিষ্ঠা করতে না পারব ততদিন পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকবে।

 

রেডিও তেহরান: তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে এখনও অভিযোগ শোনা যায় তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি। আর শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের বিষয়টি নিয়েও শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের কথা শোনা যায়। আসলে বাস্তবতা কী?

 

মোশরেফা মিশু: দেখুন এখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বাস্তবতা খুবই খারাপ। আমি আবারও বলছি সরকার এবং গার্মেন্টস মালিকরা অনেক বড় বড় কথা বলে থাকেন। গার্মেন্টস মালিকরা বলেন, তারা মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন। হ্যাঁ গার্মেন্টস করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তারা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বস্তুত তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য গার্মেন্টস তৈরি করেনি। তারা গার্মেন্টস করেছেন প্রচুর মুনাফা অর্জন করবেন বলে। আর সে বিষয়টিই আমরা প্রতিমুহূর্তে দেখতে পাই।

 

তাজরীন ও রানা প্লাজার যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে- মালিকরা যদি শ্রমিকদের মানুষ বলে গণ্য করত তাহলে এ দুটো ঘটনা ঘটার কথা নয়। তাজরীনে যখন আগুন লাগল তখন মূল গেট তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তালাবন্ধ করে রাখার কারণে এতগুলো মানুষ পুড়ে মারা গেল এবং বহুমানুষ আহত হলো।

 

রানা প্লাজার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানেও কোনো নিয়ম কানুন মেনে চলা হয়নি। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদনের বাইরে কাজ করা হয়েছে। যেকারণে সেখানেও এত শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হলো। তবে দুর্ঘটনার পর এতদিন হয়ে গেলেও নিহত ও আহত শ্রমিকরা ঠিকমতো ক্ষতিপূরণ পাননি।

 

এছাড়া আরো একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থাৎ ইউরোপ- আমেরিকার যারা আমাদের গার্মেন্টস পন্য কেনেন তারা একটা অ্যালায়েন্স করে এখানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করছেন। তারা বলছেন যে ভবন নিরাপত্তার জন্য তারা এসব কাজ করছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কারখানগুলোর ভেতরের অবস্থা যদি আপনারা দেখেন তাহলে বোঝা যাবে আসলে শ্রমিকদের নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ এখনও পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। এরকম একটা অবস্থা বিরাজ করছে গার্মেন্টসগুলোর অভ্যন্তরে।

 

রেডিও তেহরান: আপনি তো গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি-তো-বর্তমান বাস্তবতায় গার্মেন্ট শ্রমিকরা সর্বনিম্ন কত বেতন পাচ্ছেন। যে টাকা বেতন পাচ্ছেন সেটা কি সন্তোষজনক বলে মনে করেন। এমন কথা শোনা যায়-যে বেতন তারা পান তাতে অতি দুঃখে-কষ্টে তাদের দিন কাটে।

 

মোশরেফা মিশু: বর্তমানে গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে বেতন পাচ্ছেন তা কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়াসহ যেসব স্থানে শ্রমিকরা বসবাস করেন সেখানে বাড়ি ভাড়া এবং জিনিষপত্রের দাম অনেক বেশি। শ্রমিকরা যে বেতন পান বাড়িভাড়া তারচেয়েও বেশি। দুবছর আগে শ্রমিকদের জন্য সর্বনিন্ম যে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা হলো ৫৩০০ টাকা। এই টাকা থেকে বাড়ি ভাড়া হচ্ছে চার হাজার টাকা।

সেক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া দেয়ার পর তাদের বাকি জীবন কিভাবে চলবে! বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাবার দাবার ও অন্যান্য জিনিষপত্রের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। শুধু তাই নয় বছরে তিন থেকে চারবার বাড়িভাড়া বাড়ছে। এরকম একটা পরিবেশের মধ্যে রয়েছে শ্রমিকরা। যে কেউ মনে করতে পারে যে শ্রমিকদের ৫৩০০ টাকা বেতন দেয়া হচ্ছে- এটা তো কম নয়। কিন্তু আমি জানি এখনও অনেক জায়গায় শ্রমিকদের এই সর্বনিম্ম বেতন দেয়া হচ্ছে না।

 

এমনও দেখা যাচ্ছে কোথাও তিন হাজার, কোথাও সাড়ে তিন হাজার আবার কোথাও বা চার হাজার টাকা বেতন দেয়া হচ্ছে। আর শ্রমিকদের এসব অসুবিধার কথা আমরা বিভিন্ন সময় সরকারের কাছেসহ বিভিন্ন সভা সেমিনারে তুলছি। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করছে না। উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে আমরা মিথ্যা কথা বলছি। কিন্তু আসলে শ্রমিকদের অবস্থা খুবই খারাপ।

 

রেডিও তেহরান: আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে বলা হচ্ছে, বর্তমানে গার্মেন্টসে ন্যূনতম কোন প্রকার ঝামেলা নেই। দু’একটি গার্মেন্টসে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদির জের ধরে কিছু ঝামেলা রয়েছে। ঢালাওভাবে গার্মেন্টসে কোন অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। তবে গার্মেন্টস সেক্টরকে অশান্ত করার জন্য জামায়াত-শিবির, দেশী-বিদেশী চক্রের ইন্ধন রয়েছে। এধরণের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?

 

মোশরেফা মিশু: না , গার্মেন্টস সেক্টরে জামায়াত-শিবিরের কোনো ইন্ধন নেই। জামায়াত-শিবির- তাদের নিজেদের দল নিয়েই অনেক বেশি সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। কারণ আপনারা জানেন যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। তাদের বেশ কয়েকজন নেতার ফাঁসি হয়েছে। এ অবস্থার মধ্যে গার্মেন্টস সেক্টরে তারা কোনোরকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এমন কোনো বাস্তবতা নেই।

 

দীর্ঘদিন ধরে আমি এই সেক্টরে কাজ করছি, ফলে এর ভেতরের বাইরের প্রায় সব কিছুই আমার জানা। আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি বিষয়গুলো।

 

এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরি যেকথা বলা হচ্ছে আসলে শ্রমিকদের ওপর কেবল নিপীড়নই করা হচ্ছে। আপনারা দেখবেন শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য শিল্প পুলিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয় শিল্প গোয়েন্দাবাহিনী করা হয়েছে। কিন্তু যেসব কারখানায় শ্রমিকদের ঠিকমতো বেতন দেয়া হচ্ছে না- সেখানে শিল্প পুলিশ এবং গোয়েন্দাবাহিনীর কাছে আমরা এ ব্যাপারে জানাচ্ছি। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কর্ণপাত করছে না। তারা মালিকদের পক্ষে কাজ করছে- শ্রমিকদের পক্ষে না। যে কারণে সরকার এবং মালিকরা যেভাবে কথা বলে- আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সেভাবেই কথা বলে এবং কাজ করে।#

 

গাজী আবদুর রশীদ/২৩

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন