এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 02 মে 2016 11:24

ব্রিটেনে বিতর্ক: একই বৃত্তে দায়েশ, ইহুদিবাদ ও হিটলার

ব্রিটেনে বিতর্ক: একই বৃত্তে দায়েশ, ইহুদিবাদ ও হিটলার

ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী বর্বরতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইহুদিবাদের সঙ্গে নাৎসিবাদ ও হিটলারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক জোরদার হয়ে উঠেছে। ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের সাবেক মেয়র কেন লিভিংস্টোন সম্প্রতি ইহুদিবাদকে নাৎসিবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ শুরু করেছে ইহুদিবাদী গোষ্ঠী ও তাদের নিয়ন্ত্রিত মহলগুলো। 

 

লিভিংস্টোনের ওই মন্তব্য প্রচারিত হওয়ার পর ব্রিটেনের লেবার পার্টিতে তার সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। লন্ডনের সাবেক মেয়র ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন যে, সাবেক নাৎসি নেতা হিটলার ছিলেন ইহুদিবাদের সমর্থক।   তিনি বলেন, হিটলার ১৯৩২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন যেসব নীতির কথা প্রচার করে তাতে ইহুদিদেরকে  কথিত ইসরাইলে পৌঁছে দেয়ার নীতির কথাও ছিল। ইহুদিদের ওপর গণহত্যা চালানোর আগ পর্যন্ত হিটলার ইহুদিবাদের সমর্থক ছিলেন বলে লিভিংস্টোন স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি তার এই মন্তব্যের বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, আমি নিজেকে সত্য অস্বীকারের মধ্যে টেনে নিতে পারব না। 

 

এলবিসি রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইহুদিবাদ ও নাৎসিবাদের ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কিত নিজের মন্তব্যগুলোকে ঐতিহাসিক বাস্তবতা বলে যুক্তি দেখিয়েছেন লন্ডনের সাবেক মেয়র। যারা তার ওইসব মন্তব্যকে সেমিটিক বা ইহুদি-বিদ্বেষী বলে উল্লেখ তিনি তাদের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, ইহুদিদের সম্পর্কে আমি যা বলেছি একই কথা বলেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীও। 

 

এদিকে ব্রিটেনের লেবার পার্টির সাবেক এমপি এবং বর্তমান রেসপেক্ট পার্টির নেতা ও এমপি জর্জ গ্যালোওয়ে লন্ডনের সাবেক মেয়র লিভিংস্টোনের প্রতি  জোরালো সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘সাবেক মেয়র মোটেও অসত্য কিছু বলেননি। বরং তিনি যা বলেছেন তার সবই সত্য ও প্রমাণিত ঐতিহাসিক বাস্তবতা। এ সংক্রান্ত বই-পুস্তক আমার কাছে রয়েছে এবং আপনাদের উচিত সেসব সংগ্রহ করা।’ 

 

লন্ডনের মেয়র পদপ্রার্থী গ্যালোওয়ে বলেছেন, ‘জার্মান ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনে পাঠানোর ব্যাপারে নাৎসি প্রধান হিটলার ও ইহুদিবাদী নেতাদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। কারণ, এ উভয় পক্ষই বিশ্বাস করত যে জার্মান ইহুদিরা জার্মান নাগরিক নয়। আর এরই আলোকে নাৎসিবাদ ও ইহুদিবাদ একই মুদ্রার দুই পিঠ মাত্র। জার্মান ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনে পাঠানো সংক্রান্ত ওই চুক্তি তথা হাভারা চুক্তি স্বাক্ষর উপলক্ষে উৎসবের নিদর্শন হিসেবে একটি মুদ্রাও প্রকাশ করা হয়েছিল।’

উল্লেখ্য ১৯৩৩ সালের ২৫ আগস্ট স্বাক্ষরিত হয় হাভারা চুক্তি।       

 

২০১৪ সালে লেবার দলীয় নারী এমপি নাজশাহ ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে বলেছিলেন, ইসরাইলি ইহুদিদেরকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা উচিত। তিনি বলেছিলেন, এক্ষেত্রে পরিবহন-ব্যয় হবে ইসরাইলের প্রতি তিন বছরের মার্কিন সামরিক সহায়তার চেয়ে অনেক কম। মার্কিন সরকার প্রতি বছর ইসরাইলকে সামরিক খাতে ৩০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়ে থাকে। তিনি ইহুদিবাদের সঙ্গে আলকায়দার সম্পর্ক রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন। 

 

 ব্রিটেনের ব্র্যাডফোর্ড শহরের সাবেক মেয়র ও লেবার পার্টির কাউন্সিলর খাদিম হুসাইনও ইহুদিবাদ-বিরোধী বক্তব্য রেখেছেন সাম্প্রতিক সময়ে। ফলে তার সদস্যপদও স্থগিত করেছে ইহুদিবাদের ব্যাপারে আপোসকামী এই দল। 

 

খাদিম হুসাইন ফেস-বুকে লেখা এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘ (পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের কারণে) মিলিয়ন মিলিয়ন আফ্রিকান নাগরিকের মৃত্যুর কথা স্কুলে পড়ানো হয় না, অথচ স্কুলের পাঠ্য-ব্যবস্থায় অ্যানি ফ্রাংকের কথা ও হিটলারের মাধ্যমে কথিত ৬০ লাখ ইহুদি হত্যার কথা বলা হয়।’  

 

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশ্বের ইহুদিদের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ লাখের বেশি ছিল না। তাই হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হওয়াকে মাত্রাতিরিক্ত বিকৃতি বা  অতিরঞ্জন বলে মনে করেন অনেক পশ্চিমা গবেষক। ফ্রান্সের বিশিষ্ট দার্শনিক ও গবেষক মরহুম রজার গারুদি ‘ইসরাইল সৃষ্টির নেপথ্যের নানা কল্পকাহিনী’ শীর্ষক বইয়ে এ বিষয়টিকে অসত্য বলে প্রমাণ করেছেন। একই বিষয় সমর্থক করেছেন আরও কয়েকজন পশ্চিমা গবেষক। তাদের মতে, ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হওয়ার দাবি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার। আসলে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি সহানুভূতি আদায়ের জন্যই এই মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে ইহুদিবাদীরা। তাই পশ্চিমা দেশগুলোতে কথিত হলোকাস্টের বিরুদ্ধে গবেষণা বা তদন্তও নিষিদ্ধ করে রেখেছে ইহুদিবাদী চক্র ও তাদের নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা শাসক-গোষ্ঠী। হলোকাস্টের বিরুদ্ধে গবেষণার দায়ে জেল ও জরিমানার শিকার হয়েছেন রজার গারুদিসহ কয়েকজন পশ্চিমা গবেষক। অথচ পাশ্চাত্য দেশে দেশে বাক-স্বাধীনতার নসিহত করে বেড়ায়।  

 

ইহুদিবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন লেবার দলের আরও এক সদস্য ও কেনসিংটনের নারী কাউন্সিলর বিনাজির লাশারি। তিনি বলেছেন, ‘অনেকেই এটা জানেন যে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার নেপথ্যে ছিল কারা এবং কারা আইএসআইএল বা দায়েশের পেছনের শক্তি। ইহুদিদের বিরুদ্ধে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

 

ভিকি কিরবি নামের লেবার দলীয় আরেক সদস্য হিটলারকে ইহুদিবাদী-ঈশ্বর বলে মন্তব্য করেছেন। তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল কেন ইসরাইলে হামলা করছে না তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন ২০১৪ সালে। 

 

ব্রিটেনের সংসদের লেবার পার্টির এমপি বব ক্যাম্পবেলও সম্প্রতি বলেছেন, তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল বা দায়েশ ইসরাইলে হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে এ কারণে যে কুকুর কখনও তার নিজ লেজে কামড় দেয় না।


ইহুদিবাদী ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ দায়েশ তথা আইএসআইএলকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। বব ক্যাম্পবেল গাজার পরিস্থিতিকে হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং নেতানিয়াহুকে ইঁদুর ও ইসরাইলকে 'প্রকৃত প্লেগ রোগ' বলে মন্তব্য করেছেন। 

 

এদিকে লেবার দলের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ইহুদিবাদের সঙ্গে আপোস করেই চলছেন। ব্রিটেনের নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে দেশটির ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ড্যাভিড ক্যামেরন ইহুদিবাদ-বিরোধী বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, অ্যান্টি-সেমিটিজম আমাদের সমাজের এক চরম ক্যান্সার।

অথচ নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইহুদিবাদের সমালোচনাকে অ্যান্টি-সেমিটিজম বলাটা একটি একপেশে ব্যাপার। কারণ, কেবল ইহুদিরাই সেমিটিক নয়। গোটা আরব জাতি তথা ইব্রাহিম (আ)’র জাতিই সেমিটিক। অথচ আরব বা ফিলিস্তিনি-বিরোধী বক্তব্যকে অ্যান্টি-সেমিটিক বলেন না ইহুদিবাদের সমর্থকরা! 

 

আর এ পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের সাবেক মেয়র লিভিংস্টোন এবং লেবার নেতা জর্জ গ্যালোওয়ের ইহুদিবাদ বিরোধী ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন ব্রিটেনের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার রডনি শেকসপিয়ার ।

রডনি শেকসপিয়ার মনে করেন, ইহুদিবাদ ইহুদিদের জন্য সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেসটিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন যে,  ‘বিবিসি’র সাবেক প্রখ্যাত সাংবাদিক  ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা অ্যালান হার্ট মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন তার বিখ্যাত বই ‘ ইহুদিবাদ বা জায়োনিজমই হচ্ছে ইহুদিদের প্রকৃত শত্রু’। ইসরাইলের বেশিরভাগ ইহুদিই এখন ইহুদিবাদী যা দুঃখজনক। তারা গণহত্যা চালাচ্ছে, স্কুলে বোমা বর্ষণ করছে, সিরিয়ায় দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে সৌদি সরকারের সঙ্গে গোপন দহরম-মহরম রয়েছে তেলআবিবের এবং তারা গলা কাটতে ও কোপাতে অভ্যস্ত দানবীয় শক্তিকেও মদদ যোগাচ্ছে।’ 

ব্রিটেনের জনগণ ও বিশেষ করে যুব প্রজন্ম ইহুদিবাদ ও দায়েশ এবং এ দুয়ের মদদদাতা মার্কিন ও সৌদি সরকারের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান। #

 

মু. আমির হুসাইন//২

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন