এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 05 মে 2016 10:14

নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল: রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট, জামায়াত ক্ষুব্ধ

নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল: রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট, জামায়াত ক্ষুব্ধ

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে নিজামীর বিরুদ্ধে দেয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রইল।

 

আজ (বৃহস্পতিবার) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চ এক শব্দের এই রায় ঘোষণা করেন। বেলা সাড়ে ১১টায় এজলাসে এসে প্রধান বিচারপতি শুধু বলেন, “ডিসমিসড”। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

 

রায়ে রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলো। রিভিউ খারিজ হয়ে যাওয়ায় সেই রায়ের অনুলিপি কারাগারে যাবে এবং কারা কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসামির ফাঁসি কার্যকর করবে। তবে তার আগে প্রেসিডেন্টের কাছে মাওলানা নিজামীর প্রাণভিক্ষার বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। এ বিষয়টির নিষ্পত্তি হলেই সরকার দণ্ড কার্যকর করবে।

 

পুরো জাতি আনন্দিত: অ্যাটর্নি জেনারেল

আপিল বিভাগে মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম।

 

বৃহস্পতিবার ওই রায়ের পর নিজের কার্যালয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে এসে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, “এ রায়ে সারা জাতি স্বস্তি পাচ্ছে। পুরো জাতি স্বস্তি বোধ করছে। পুরো জাতির মতো আমরা আনন্দিত।”

 

দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া তুলে ধরে মাহবুবে আলম বলেন, ওই রায়ের অনুলিপি কারাগারে যাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ জানতে চাইবে- নিজামী রাষ্ট্রপক্ষের কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাইবেন কিনা। যদি প্রাণভিক্ষা চান, তা রাষ্ট্রপতির ওপর নির্ভর করবে। না চাইলে দণ্ড কার্যকর হবে। সরকার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দণ্ড কার্যকর করবে।

 

শহীদদের আত্মা শান্তি পেল: আইনমন্ত্রী
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখার পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবেই এই ধারা আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে শহীদদের আত্মা একটু হলেও শান্তি পেল।  

 

আইনমন্ত্রী বলেন, সাড়ে চার দশক আগে এই অপরাধীরা অপরাধ করেছিল। অপরাধ করেও তারা এ দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। তারা মনে করেছিল, সেই অন্যায়ের আর কোনোদিন বিচার হবে না। এই ভ্রান্ত ধারণা ঠিকই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

 

রায় নিয়ে বলার কিছু নেই: খন্দকার মাহবুব

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিজামীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে যে আইনে নিজামীর বিচার হচ্ছে, সেটি ছিল কালো আইন। ১৯৭২ সালে ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর জন্য এ আইন তৈরি করা হয়েছিল। পরে এ আইনকে বেসামরিক লোকদের জন্য এনে নিজামীকে তার আওতায় বিচার করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আদালত রায় দিয়েছেন। তাই এ নিয়ে কিছু বলার নেই।

 

খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ওই আইন অনুযায়ী রায় দিয়েছেন, বিচার করেছেন। তাই আমাদের বলার কিছু নাই। তবে আমি বলে যাচ্ছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এ আইনে বিচার কতটা সঠিক হয়েছে, তা নিরূপণ করবে। তখন হয়তো দেখা যাবে, যেভাবে এ আইনে বিচার করা হয়েছে, তা সঠিক হয়নি।’

 

 

প্রাণভিক্ষার সিদ্ধান্ত নিজামী নিজেই নেবেন: আইনজীবী

রায়ের পর নিজামীর অপর আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, রিভিউর রায়ের কপি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না। এ ছাড়া কপি পাওয়ার পর প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না, সে বিষয়ে নিজামী নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এটি একান্তই তাঁর নিজস্ব ব্যাপার।

 

জামায়াতের বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচি

রায় ঘোষণার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এছাড়া, আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখাকে ‘সরকারি ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদে ৮ মে আগামী রোববার সকাল থেকে দেশব্যাপী ২৪ ঘণ্টার হরতালসহ তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে হরতাল ছাড়াও রয়েছে আগামীকাল শুক্রবার দোয়া দিবস ও শনিবার দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ।

 

এর আগে গত মঙ্গলবার রিভিউ শুনানি শেষে ৫ মে রায়ের দিন ধার্য করা হয়। ওই দিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর আসামিপক্ষে ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

 

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আপিলেও মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত ২৯ মার্চ আবেদন করেন নিজামী। ৭০ পৃষ্ঠার মূল রিভিউ আবেদনের সঙ্গে ২২৯ পৃষ্ঠার নথিপত্রে তাঁর দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে ৪৬টি (গ্রাউন্ড) যুক্তি তুলে ধরা হয়।

 

গত ১৫ মার্চ নিজামীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়।

 

গত ৬ জানুয়ারি বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাকারী ও উসকানিদাতাসহ মানবতাবিরোধী তিনটি অপরাধের দায়ে দোষী জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে নিজামীর করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে রায় ঘোষণা করা হয়।

 

বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আনা আপিলের রায় গত ৬ জানুয়ারি ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ জামায়াতের এই শীর্ষ নেতার বিষয়ে রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ প্রকাশ করেন। পরে ১৫ মার্চ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।

 

সাবেক বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী নিজামী এখন রয়েছেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। পাবনা-১ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া নিজামী ২০০১ সালে প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্প মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ওই সময়েই ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য পাচারের পথে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে, যে মামলার রায়ে গতবছর নিজামীর ফাঁসির আদেশ হয়।#

 

আশরাফুর রহমান/৫

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন