এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla

নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব হল পহেলা বৈশাখ। এ দিনটিকে কেন্দ্র করে সারাবিশ্বের বাঙালিরা উৎসবে মেতে ওঠে। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান বৈশাখী মেলা। কোনো কোনো জায়গায় এই মেলা চলে পুরো সপ্তাহ জুড়ে। এসব মেলায় পাওয়া যায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারূপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব ধরণের হস্তশিল্প ও মৃৎশিল্পজাত, মানে মাটির সামগ্রী। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, মেয়েদের সাজসজ্জার সামগ্রীসহ আরো অনেক কিছু পাওয়া যায় এই মেলায়। এছাড়াও রকমারি লোকজ খাদ্যসামগ্রী, যেমন, চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা ও বিভিন্ন প্রকার মিষ্টির বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। 

 

শুধু খাওয়া দাওয়াই নয়, এসব মেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগীতি ও লোকনৃত্য পরিবেশন করা হয়। সেখানে পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান  তো থাকেই, থাকে যাত্রাপালার আয়োজনও। কোথাও কোথাও পথনাট্য উৎসবও হয়ে থাকে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুল নাচ, নাগর দোলা, সার্কাস বৈশাখী মেলার বিশেষ আকর্ষণ। শিশু- কিশোরদের জন্য আরো থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংষ্কৃতির আমেজেও এখন আয়োজিত হয় বৈশাখী মেলা।

 

বাংলা নববর্ষের সবচেয়ে রঙচঙে ও আনন্দঘন অনুষ্ঠান হয় ঢাকায়। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় রমনার বটমূলে। শিল্পীরা বৈশাখের আগমনী গান গেয়ে স্বাগত জানান নববর্ষকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের বকুলতলায় একই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-ছাত্ররা মিলে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। শহীদ মিনার, টি.এস.সি এবং চারুকলাসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। তবে এবার খানিকটা ভিন্ন আঙ্গিকে ১লা বৈশাখ পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে মঙ্গলশোভা যাত্রার মুখোশ পরা, ভুভুজেলা বাজানো নিষিদ্ধ হয়েছে, কোথাও কোথায় পান্তা-ইলিশের অনুষ্ঠান বর্জন হয়েছে। খোদ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহ্যবাহী জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষার স্বার্থে নববর্ষ উদ্‌যাপনের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ ১৪২৩-এর খাদ্যতালিকায় ইলিশের কোনো আইটেম রাখছেন না। গণভবনে এ দিনের মেন্যুতে খিচুড়ির সঙ্গে থাকছে বেগুন ভাজি, ডিম ও মুরগির মাংস ভুনা।

 

মুখোশ-ভুভুজেলা নিষিদ্ধ

এবার বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ না পরার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

 

সোমবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি এ অনুরোধ জানান।

 

ডিএমপি কমিশনার জানান, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে নিশ্চ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় কেউ যেন মুখোশ না পরেন আয়োজকদের সে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে শোভাযাত্রা উপলক্ষে তৈরি মুখোশ হাতে রাখা যাবে।

 

এর আগে রোববার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, পহেলা বৈশাখে বিকট আওয়াজের বাঁশি বাজানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে। ছোট ছোট মুখোশ দিয়ে মুখাবরণ বন্ধ করে দিয়ে তারপর বের হওয়া, এটা আমরা নিয়ন্ত্রণ করব।

 

পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ

এদিকে, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে এ বছর ইলিশ ছাড়াই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খুলনা জেলা প্রশাসন।

 

সোমবার খুলনা জেলা প্রশাসক (ডিসি) নাজমুল আহসান ‘ডিসি খুলনা’ নামে তার ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি অন্যদেরও একই পন্থা অবলম্বনের অনুরোধ জানান।

 

এর আগে রোববার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাটকা ও মা-ইলিশ রক্ষায় এ বছর ইলিশ ছাড়াই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করার কথা জানান।

 

জেলা প্রশাসক বলেন, পহেলা বৈশাখে পান্ত-ইলিশ খাওয়া সাম্প্রতিক ধারণা। ঐতিহাসিকভাবে এর পক্ষে কোনো জোরালো উদাহরণ পাওয়া যায় না। সম্প্রতি পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে জাটকা নিধন করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ জেনেও বেশি দামে বিক্রির জন্য এই অপরাধ করে যাচ্ছেন কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী। তারা এ সময় ইলিশের দামও মাত্রাতিরিক্তভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন।

 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও বর্ষবরণ উৎসবে পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. ইমামুল হক গত বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা উদযাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময়ের সময় পান্তা-ইলিশ নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, বাংলা বর্ষবরণের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার এই রীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গণসচেতনতা তৈরি করা দরকার।

 

এছাড়া, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বর্ষবরণ আয়োজনে ইলিশ নিষিদ্ধ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

 

রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আলী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

 

পহেলা বৈশাখের সাথে ইলিশের সম্পর্ক আছে কি?

বর্ষবরণ আয়োজনে ইলিশ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. একে এম নূর-উন-নবী বলেন, “পহেলা বৈশাখের সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই। পহেলা বৈশাখে ইলিশ নয় বরং নুন-পান্তা-তেল-মরিচই উপযুক্ত খাবার। সাথে ভর্তা বা ডিম ভাজিই যথেষ্ঠ হতে পারে। তাছাড়া ইলিশ প্রজননের এই সময়ে বাঙালী উৎসবের নামে ইলিশ উৎসব করা হলে সাগরে ইলিশের সংখ্যা কমে যাবে।”

 

বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। কিন্তু বাংলা নববর্ষের দিনে ইলিশ খাওয়ার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলেইতনি বলেন, বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের চিরায়ত সংস্কৃতির সাথে ইলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।

 

তিনি জানান, “বৈশাখে যখন খরার মাস যখন কোনো ফসল হতো না তখন কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং তাদের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, কৃষকরা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুব ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ভিজিয়ে রাখতো, চাল ভিজিয়ে রাখতো। সকালে কৃষক সেই চাল পানি খেত এবং শরীরে কৃষাণী পানিটা ছিটিয়ে দিত। তারপর সে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় পান্তা খেতে পারতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো একটু শুটকি, একটু বেগুণ ভর্তা ও একটু আলু ভর্তা দিয়ে খেত”।

 

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বৈশাখের পান্তা-ইলিশের জন্য ‘শহরের কিছু শিক্ষিত নাগরিককে’ দায়ী করেছেন।

 

লেখক-চিন্তক যতীন সরকার বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে পান্তা-ইলিশকে পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ করে তোলা হয়। প্রকৃত অর্থে এটি বানোয়াট সংস্কৃতিচর্চা। এর সঙ্গে বাঙালির কোনও সম্পর্ক নেই। পান্তা হচ্ছে গরীবের খাবার আর উৎসবের সময় মানুষ যেখানে ভালো ভালো খাবার খায়, সেখানে পান্তাকে খাওয়ানো হচ্ছে ব্যবসার খাতিরে।”   

 

বর্ষবরণে অপসংস্কৃতি চর্চা

নববর্ষের অনুষ্ঠানে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো, মুখোশ পরা, সিদুঁর দেয়াকে বাংলাদেশের ধর্মীয় মহল সমর্থন করছেন না। এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আবুল কাসেম ফজলুল হক রেডিও তেহরানকে বলেন, “বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর এরকম ঘটনা কখনও কখনও ভীষণভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে ১৯৮০ দশকে মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন যখন শুরু হয়েছে, সেই আন্দোলনে বিদেশী রেডিও বেশ উসকানিমূলক প্রচার করেছে। তাতে উৎসাহিত হয়ে এবং আরো নানা কারণে আমাদের দেশের কোনো মহল থেকে এই সিদুঁর দেয়া, মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো এ ধরনের কিছু বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়। আর এসব আমাদের দেশে পুরাতন কোনো কোনো ধর্মীয় ধারা। ইসলাম এদেশে ব্যাপ্তি লাভের অনেক আগে থেকেই এসব ধারা এদেশে ছিল। তো সেই জিনিষগুলো একসময় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে এগুলো আদৌ ছিল না এমনকি হিন্দু সমাজেও এগুলোর প্রচলন খুব কম ছিল। তো সেই জায়গায় পহেলা বৈশাখের অনু্ষ্ঠানে কোনো কোনো বছর আমি শুনেছি হরে রাম হরে রাম বলা হচ্ছে। এ ধরনের কাজগুলো উসকানিমূলক। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা যারা খুব জোর দিয়ে বলেন তারা গণতন্ত্র বা অন্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে বিকশিত না করে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মীয় সংস্কার এমনকি সামগ্রিকভাবে ধর্মকে আক্রমণ করার একটা প্রবণতা কিছু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়টি অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং মানুষের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা হয়। আমি বলব এরকম করা উচিত নয়।”

 

মুসলমানরা তাদের নববর্ষ উদযাপন করবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ এবং দেশীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে। এই মত সম্পর্কে আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বাঙালি হিন্দুদের সংস্কার, বিশ্বাস, জীবনযাত্রা ও ধর্মের সাথে বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে এগুলোর বেশ কিছু পার্থক্য সুস্পষ্ট। আর এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মুসলমানদের অনুষ্ঠান পালনে কিছুটা ভিন্নতা থাকবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। আর এই ভিন্নতা জোর করে মুছে মেলার চিন্তা একটা মস্তবড় ভুল। আবারও বলছি এই ভিন্নতা থাকবেই এবং এসব ভিন্নতা নিয়ে এগুতে এগুতে যখন জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তারের সাথে সাথে নতুন নতুন চিন্তা বা বিষয় সামনে আসবে, প্রকৃতিরও পরিবর্তন হবে তখন ভবিষ্যতে অন্যরকম হবে। তবে তখনও ব্যবধান ও পার্থক্য থাকবে। কিন্তু সেই পার্থক্যের রূপ এখনকার চেয়ে ভিন্ন হবে বলে তিনি মনে করেন।

 

সম্রাট আকবরের সময় বর্ষবরণ

সম্রাট আকবরের আমলে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে বাংলা নববর্ষ পালন করা হতো। এ দিন আমীর-ওমরাহদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ সাধ্যানুযায়ী নতুন জামা-কাপড় পরে উৎসবে অংশ নিতেন। মিষ্টান্ন আপ্যায়ন, গানের জলসা ছাড়াও নানা ধরনের ধেলাধুলার ব্যবস্থা থাকত। মুসলমানরা নববর্ষের দিন ভবিষ্যতের মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মুনাজাত ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করতেন।

 

উল্লেখ্য, মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। বাদশাহ আকবর ৯৬৩ হিজরীতে অথাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে (১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে) দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরন্তরণীয়  করে রাখার জন্য ৯৬৩ হিজরী অবলম্বন করেই বাংলা সন চালু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২, ৩- এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরী সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে জন্ম বছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বৎসর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে।  

 

হিজরী সনের প্রথমদিন হল পহেলা মহররম। বাংলা সনে তা পরিবর্তন করে পহেলা বৈশাখ করা হয়। ৯৬৩ হিজরীতে মহররম মাস ও বৈশাখ মাস একই সঙ্গে আসে। ফলে, তদানীন্তন শকাব্দের প্রথম মাসটি গ্রহণ না করে হিজরী সনের প্রথম মাস  মহররমের অর্থাৎ বৈশাখ মাসকেই বাংলা সনের মাস হিসাবে পরিচিহ্নিত করা হয়।

 

বাংলা সনের সৃষ্টি হয় ফসল তোলার সময় লক্ষ্য করে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে সৌর বৎসর অবলম্বনে এই নতুন সন গণনা শুরু হয়। তাই, প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ‘ফসলী সন’ নামে অভিহিত হতো। ‘বাংলা’র জন্য উদ্ভাবিত বলে এটি পরবর্তী পর্যায়ে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত হয়।# (আশরাফুর রহমান) 

 

 

 

পয়লা এপ্রিল ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস। এই বিশেষ দিবসের তাৎপর্য ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আজ আমরা কিছু কথা বলব।

 

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে হযরত ইমাম খোমেনী (রহ) এর নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের মাত্র দুই মাস পর দেশটিতে ৩০ মার্চ এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটের মাধ্যমে ইরানের জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। জনগণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র চায় কিনা জানতে চেয়ে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়। এতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পড়েছিলো। এরপর ১ এপ্রিল ১৯৭৯ ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতি বছরের ১ এপ্রিল ইরানে পালিত হচ্ছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবস।

 

ঐতিহাসিক ওই গণরায়ের মধ্য দিয়ে ইরানে মার্কিন মদদপুষ্ট রাজতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হয় এবং ইরানের জন্য রাজতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য প্রত্যাখ্যান করে। এ ছাড়াও এর ফলে ইরানে নিষিদ্ধ হয় মানব-রচিত মতাদর্শ-ভিত্তিক সব ধরনের শাসন-ব্যবস্থা।

 

ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এমন এক ব্যবস্থা যা জনগণের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না। আর এ জন্যই জনগণের মতামত নেয়ার পদক্ষেপ নেন মরহুম ইমাম খোমেনী (র)। জনগণ অবাধে যাতে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারে সে জন্য নির্বাচন ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রশ্নে ঐতিহাসিক গণভোটের প্রাক্কালে ইসলামী ইরানের অবিসংবাদিত নেতা ও ইসলামী বিপ্লবের মহান রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (র) বলেছিলেন, ‘এই গণভোট আমাদের জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে। এ গণভোট হয় আপনাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি দেবে তথা ইসলামী গণতান্ত্রিক শাসন উপহার দেবে অথবা অতীতের মতই পরাধীনতা এবং রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন বজায় থাকবে। আপনারা এ দুই পথের যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে পারেন। এটা এখন আপনাদের স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়।’

 

প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে ইমাম খোমেইনী (রহ.) এক বাণীতে বলেছিলেন,

‘পৃথিবীতে যাদের হীনবল করা হয়েছে মহান আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন বলে সূরা আল কাসাসের ৫ নম্বর আয়াতসহ কুরআনের নানা আয়াতে ওয়াদা করেছেন। মহান ইরানী জাতির প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন যারা রাজতন্ত্রের যুগে শাসকগোষ্ঠী ও রাজাদের জুলুমের কারণে অপমানিত হয়েছেন এবং দূর্ভোগ সহ্য করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সম্মানিত করেছেন, তাঁর শক্তিশালী হাত দিয়ে জালিম শাসককে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আল্লাহর শক্তিই বঞ্চিত ও শোষিত শ্রেণী তথা মুস্তাজআফদের শক্তি। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েম করে দিয়ে ইরানী জাতিকে তাদের ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকার দান করেছেন।

 

ইরানের জনগণের বিজয় সাফল্য এবং জনগণের নেতৃত্বের এই শুভদিনে আমি ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছি। আমি বিশ্বের সামনে ঘোষণা করছি যে, এ ধরনের গণভোট তথা ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েমের প্রশ্নে গণভোট ইরানের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটা এমন একটি গণভোট যেখানে গোটা দেশের জনগণ উৎসাহ ও আনন্দের সাথে এবং ভালোবাসা ও আগ্রহের সাথে ব্যালট বাক্সের পাশে দলে দলে গিয়ে উপস্থিত হয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন এবং খোদাদ্রোহী শাসনকে চিরদিনের জন্য ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছেন।’

 

ইমাম খোমেইনী (রহ.) আরও বলেছেন, ‘আমি এ ধরনের অনন্য ঐকমত্যকে অত্যন্ত মর্যাদার চোখে দেখছি যেখানে গোলযোগকারী ও খোদা-বিমুখ অল্প কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া সবাই ‘আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে ও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধর’- (আলে ইমরান : ১০২) শীর্ষক আল্লাহর আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া প্রদান করেছে। প্রায় সর্বসম্মতভাবে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে মতামত দিয়ে তারা প্রাচ্য ও পাশ্চাতের ব্যাপারে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ উপস্থাপিত করেছে।

 

আজ আপনাদের প্রতি অভিনন্দন। সাহসী তরুণদের শাহাদাত এবং সন্তানহারা পিতামাতার মাতম ও অসহ্য যাতনার মধ্য দিয়ে আপনারা বর্বর দুশমন ও যুগের ফেরাউনকে পরাভূত করেছেন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য সিদ্ধান্ত প্রদানকারী ভোট দিয়ে ইনসাফপূর্ণ খোদায়ী শাসনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটি এমন একটি শাসন যে শাসনে জাতির সকল স্তরের লোকের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়, খোদায়ী ইনসাফের আলো সবার উপর সমানভাবে পতিত হয় এবং কুরআন ও সুন্নাহর আশীর্বাদ সবাই সমানভাবে লাভ করে। সেই সরকারের প্রতি অভিনন্দন যার দৃষ্টিতে গোত্রে গোত্রে, কালা-সাদা, তুর্কী, ইরানী, কুর্দি বা বেলুচির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সবাই ভাই ভাই এবং সমান।’

 

ইমাম খোমেইনী (রহ.) ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘এ রাষ্ট্র এমন এক স্থান যেখানে খোদাভীতি, ধার্মিকতা, নৈতিকতা ও সৎকর্মের উপরই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভরশীল। এমনি দিনে আপনাদের প্রতি মোবারকবাদ। আজ জাতির সব স্তরের মানুষ তাদের অধিকারের নিশ্চয়তা পেয়েছে, ইনসাফের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যদের মধ্যে কোন বৈষম্য নেই। তার তথা শাহের পেছনে পেছনে খোদাদ্রোহিতাকেও কবর দেয়া হয়েছে। দেশ ঘরোয়া ও বাইরের শত্রুর থাবা থেকে এবং ডাকাত ও লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখন আপনারা সাহসী জনগণই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পাহারাদার। শক্তি দিয়ে ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে তরুণদের এখন খোদায়ী এ উত্তরাধিকার রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে। দুর্নীতিবাজ সরকারের অবশিষ্ট চিহ্ন বিশ্ব লুটেরাদের দালাল এবং পরগাছা তৈল গ্রাসকারীরা আপনাদের ঘনিষ্ঠতা অর্জনের জন্য অপেক্ষমাণ। জনগণের মধ্যেই খোদায়ী শক্তির অভিব্যক্তি ঘটে। এখন খোদায়ী শক্তির উপর ভরসা করে নিজের ভাগ্য গড়ার কাজ নিজের হাতেই নিতে হবে এবং সুযোগ সন্ধানীদের আর কোন পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না।’

 

ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘ জ্ঞানী গুণীদের মধ্য থেকে আপনাদের আস্থাভাজন লোক বাছাই করে সাংবিধানিক সংসদে পাঠানো এখন আপনাদের দায়িত্ব। তাঁরা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য সংবিধান তৈরি করবেন। আপনারা যেভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তেমনি অকল্যাণকামীদের সকল পথ বন্ধ করে দিয়ে জাতির জন্য ভোট প্রদান করুন। ১ এপ্রিল প্রথম খোদায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার দিন। এদিন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের মহান দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ দিন উদযাপন করা ও জীবন্ত করে রাখা জাতির কর্তব্য। এ দিনে ২৫০০ বছরের পুরাতন খোদাদ্রোহী সরকারের পতন ঘটেছে, শয়তানের রাজত্ব চিরদিনের জন্য উৎখাত হয়েছে এবং এর পরিবর্তে মজলুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছে, যে রাজত্ব আল্লাহর রাজত্ব।

 

হে মহান জাতি! আপনাদের তরুণরা রক্ত দিয়ে আপনাদের অধিকার আদায় করেছে। আপনারা এ অধিকার লালন করুন, রক্ষা করুন এবং ইসলাম ও কুরআনের পতাকা তলে থেকে নিজেদের সমর্থনের ঘোষণাসহ খোদায়ী ইনসাফ কায়েম করুন। আমি সব শক্তি প্রয়োগ করে আমার জীবনের শেষ দিনগুলো আপনাদের সেবায় ব্যয় করব। আপনাদের সেবা ইসলামের সেবারই নামান্তর।’

ইমাম খোমেইনী (রহ.) প্রথম ইসলামী প্রজাতন্ত্র দিবসে আরও বলেছেন, ‘জাতির প্রতি আমার আশা, তারা তাদের সব শক্ত দিয়ে ইসলাম ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হেফাজত করবে। সরকারের প্রতি আমার নির্দেশ আপনারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কাউকে ভয় না করে খোদাদ্রোহী সরকারের অবশিষ্ট চিহ্ন অপসারিত করুন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধন করুন। খোদাদ্রোহী সরকারের প্রভাব এখনো দেশের সব ক্ষেত্রে শিকড় গেড়ে বসে আছে। বিচার মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পাশ্চাত্য কায়দায় প্রতিষ্ঠিত। এগুলোকে অবশ্যই ইসলামী কায়দায় পরিবর্তন করতে হবে। পৃথিবীকে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেখিয়ে দিন। আমি মহান আল্লাহ তাআলার কাছে ইসলামী রাষ্ট্র ও জনগণের শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাধীনতার জন্য প্রার্থনা জানাই।’ #

 

রেডিও তেহরান/আমির হোসেন/৩১

 

 

 

 

২০ মার্চ (রেডিও তেহরান): ইরানের নববর্ষের সূচনালগ্নে সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ওই বিবৃতিতে তিনি গেল বছরকে তিক্ত-মধুর,উত্থান-পতন এবং হুমকি ও সুযোগের বছর বলে উল্লেখ করেছেন। মিনা বিপর্যয়কে তিক্ত এবং বিপ্লব বার্ষিকীর মিছিল ও ২৬ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে মধুর অভিজ্ঞতা বলে মন্তব্য করেন।

 

২০ মার্চ (রেডিও তেহরান): ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, শত্রুদের হুমকির মুখে ইরানের জনগণকে নিজেদের চেষ্টায় অপরাজেয় করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের দুর্বলতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি। ফার্সি নতুন বছরে দেয়া বার্তায় এ আহ্বান জানান সর্বোচ্চ নেতা।

 

ইরানি জনগণ শত্রুর হুমকি মোকাবেলার মাধ্যমে অসংখ্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিরোধের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে তৎপর হতে হবে। হুমকিকে সুযোগে পরিণত করার আহ্বান জানান তিনি।

 

তিনি বলেন, প্রতিরোধমূলক অর্থনীতিই হচ্ছে ইরানের আর্থিক সংকট নিরসনের চাবিকাঠি। সঠিক পরিকল্পনা করা হলে এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে চলতি বছরেই এর সুফল মিলবে বলে তিনি আশা করেন।#

 

রেডিও তেহরান/মূসা রেজা/সিরাজুল ইসলাম/২০

 

১৬ মার্চ (রেডিও তেহরান): ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, তার দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিতান্তই আত্মরক্ষামূলক। ইরান কখনই অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালাবে না বলেও তিনি জোরালো ভাষায় মন্তব্য করেছেন।

১৩ মার্চ (রেডিও তেহরান): ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্য এখনও ইরানের বিরুদ্ধে মারাত্মক নানা ষড়যন্ত্র করছে। অন্যদিকে তেহরানে পশ্চিমা প্রতিনিধিদলগুলোর সফরের ফলে ইরানের অর্থনীতির এখনও কোনো উপকার হয়নি। পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানকে দেয়া তাদের নানা ওয়াদা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। 

 

বৃহস্পতিবার ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এসব কথা বলেছেন।

 

বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর হাসান রুহানিসহ বিশেষজ্ঞ পরিষদের নব-নির্বাচিত সদস্য ও পুরনো সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ইরানের প্রভাবশালী নেতা হাশেমি রাফসানজানিও উপস্থিত ছিলেন এ বৈঠকে। 

 

বিশেষজ্ঞ পরিষদের নতুন মেয়াদের কার্যক্রম শুরুর আগে এই পরিষদের পুরনো মেয়াদের সর্বশেষ বৈঠকে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, ‘ইরানের সাম্প্রতিক নির্বাচন ছিল স্পষ্টভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক; নানা দল ও ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন ব্যানারের আওতায় এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং তাদের মত ব্যক্ত করেছে। ইসলামি ইরানের অতীতের নির্বাচনগুলোর মত গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনও ছিল সুষ্ঠু যা শত্রুদের বহু বছরের প্রচারণার ঠিক বিপরীত।’ ইরানের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতির প্রশংসা করে তিনি বলেন, এমন উপস্থিতি  আমেরিকাসহ অনেক পশ্চিমা দেশে দেখা যায় না। 

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের মার্জিত আচরণের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত কয়েকজন প্রার্থী জনগণের ভোট না পেয়ে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হওয়ায় (কারচুপির মিথ্যা অভিযোগ তুলে) দাঙ্গা শুরু করেছিলেন ও সমর্থকদের রাস্তায় টেনে এনে ইসলামী ইরানের (সুষ্ঠু নির্বাচনী-ব্যবস্থার সুনাম ও ঐতিহ্য) কে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালান। আর তাদের ওই তৎপরতা শত্রুদের লালসাকে উস্কে দিয়েছিল বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মন্তব্য করেন।

 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ইরানের জাতীয় সংসদ ও সংসদের উচ্চ-কক্ষের মত ক্ষমতাধর বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও তাকে পদচ্যুত করার ক্ষমতাও রাখে। ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা হওয়ার পর এটাই ছিল পশ্চিমাদের সীমাহীন শত্রুতার শিকার ইসলামী এই দেশটির প্রথম নির্বাচন। 

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যদের সতর্ক থাকার ও নানা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, জনগণ ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে আবারও তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, এবার আপনাদের পালা জনগণকে প্রতিদান দেয়া। বিশেষজ্ঞ পরিষদকে বিপ্লবী চিন্তা ও বিপ্লবী কাজের ওপর অবিচল থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লব অব্যাহত রাখতে এ পরিষদের উচিত একজন বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব বা নেতাকেই নির্বাচন করা এবং ইরানের (ভবিষ্যৎ) নতুন সর্বোচ্চ নেতা যিনি হবেন তার উচিত হবে না পাশ্চাত্যের সঙ্গে ইরানের সংগ্রামী নীতির ব্যাপারে আপস করা।  

 

ইরানের সঙ্গে ছয় জাতিগোষ্ঠীর পরমাণু সমঝোতার প্রেক্ষাপটে গত জানুয়ারি মাস থেকে ওই সমঝোতা বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু ইরানে পশ্চিমা কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদলগুলোর সফর প্রসঙ্গে অসন্তোষ ব্যক্ত করে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেন, ‘পাশ্চাত্যের প্রতিনিধিদলগুলোর এইসব সফরে আমরা বাস্তব কিছু দেখিনি এখনও ... আমরা কিছু আসল অগ্রগতি দেখতে চাই। কেবল কাগজের ওপর কিছু প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য নেই।’  

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার দেশে পশ্চিমাদের প্রভাব বিস্তার বা অনুপ্রবেশের ব্যাপারে আবারও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন সরকার ও ইহুদিবাদী ইসরাইল ছাড়া সারা বিশ্বের সঙ্গেই আমরা সম্পর্ক রাখতে চাই, তবে আমাদের এটা বোঝা উচিত যে, দুনিয়াটা কেবল পাশ্চাত্য ও ইউরোপের মধ্যেই সীমিত নয়। তিনি আরও বলেন, পাশ্চাত্যের সঙ্গে শত্রুতার কোনো ইচ্ছে ইরানের নেই, ইরানে একটি স্বাধীন সরকারের কাঠামো গড়ে তোলার পর থেকে পাশ্চাত্যই প্রথম আমাদের সঙ্গে শত্রুতা শুরু করে। পাশ্চাত্য আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। পাশ্চাত্য আমাদের যেসব ক্ষতি করেছে তা ভুলে যাওয়া আমাদের উচিত হবে না।  আমি চাই না পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে কাদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি। দুনিয়াটা এখন পাশ্চাত্য ও ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতা ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্বে এবং প্রাচ্য ও এশিয়া এক বিশাল অঞ্চল। আমেরিকা ও ইসরাইল ছাড়া আর সবার সঙ্গেই আমাদের সম্পর্ক রাখতে হবে। 

 

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বর্তমান কাণ্ডারি আরও বলেন, আমাদের কাছে নির্ভুল তথ্য রয়েছে যে, মার্কিন সরকারসহ দাম্ভিক শক্তিগুলোর জোট ইরানে প্রভাব সৃষ্টির বা অনুপ্রবেশের মারাত্মক ষড়যন্ত্র করছে। তারা কোনো অভ্যুত্থান ঘটাবে না আর, কারণ তারা জানে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে অভ্যুত্থান ঘটানো আর সম্ভব নয়। তাই তারা পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। তারা ইরানের নীতি নির্ধারণী সংস্থাগুলোকে টার্গেট করে নীতি-নির্ধারকদের কাজে প্রভাব ফেলতে চায়। ফলে দেখা যাবে যে, তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে না বরং আমরাই তাদের অনুকূলে নানা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

 

তিনি শিয়া-সুন্নি বিভেদ সৃষ্টির বিষয়ে মার্কিন ও ইহুদিবাদী ষড়যন্ত্র তুলে ধরে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতগুলোর সঙ্গে মাজহাবের কোনো সম্পর্ক নেই, রাজনৈতিক নানা লক্ষ্যে এইসব সংঘাত উসকে দেয়া হয়েছে।


আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আরও বলেন, ইসলামের শত্রুরা মাজহাবগত পার্থক্যকে ধর্মীয় বিরোধে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে যাতে সহজেই দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষের অবসান না ঘটে। শত্রুদের অসৎ ও ভয়ানক উদ্দেশ্য যাতে কোনোভাবেই সফল না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। 

 

পাশ্চাত্য ইরানের বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনগুলোকে বিশেষভাবে টার্গেট করেছে বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সতর্ক করে দেন। শত্রুরা নানা পথে ও নানা অজুহাতে এইসব ক্ষেত্রে অনুচর বা গুপ্তচরদের সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

 

প্রায় ৭৭ বছর বয়সের কোঠায় পা দেয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সাম্প্রতিক এই ভাষণের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কে হবেন ইসলামী বিপ্লবের ভবিষ্যত নতুন কাণ্ডারি? যিনিই হোন না কেন তাকে সংগ্রামের পথ অব্যাহত রাখতে হবে বলে পরামর্শ দিলেন ইসলামী বিপ্লবের বর্তমান নেতা।  

 

প্রতি আট বছর পর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা (জন্ম-১৯৩৯ সালের ১৭ জুলাই) দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ আছেন এবং (মহান আল্লাহ তাঁকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের আরও কয়েক মেয়াদ পর্যন্ত সুস্থ, সবল ও সক্ষম রাখবেন ইনশাল্লাহ)। তবুও আল্লাহ না করুক ২০২৪ সাল নাগাদ (বা দুর্ঘটনাক্রমে আরও আগে) যদি ইরানে কোনো নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দরকার হয় তাহলে তিনিও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার মতই দূরদর্শী,  বিচক্ষণ, যোগ্য, খাঁটি ইসলামপন্থী এবং জালিম শক্তিগুলোর জন্য যেন আতঙ্ক হন বিশ্বের মুক্তিকামী জনমত সেই প্রত্যাশাই করছে।#

 

রেডিও তেহরান/আমির হোসেন/১৩