সম্প্রতি (২৯ এপ্রিল, ২০১৩) তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে 'ওলামা ও ইসলামী জাগরণ'  শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে দেয়া এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী চলমান ইসলামী জাগরণের নানা সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। এ জাগরণ টিকে থাকলে সত্যিকারের এক ইসলামী সভ্যতা গড়ে উঠবে বলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মন্তব্য করেছেন।  এখানে তাঁর পূর্ণ ভাষণ তুলে ধরা হলো:

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম  


والحمد لله ربّالعالمين والصّلاة والسّلام على سيّدنا محمّدا لمصطفى وءاله الأطيبين ‌‌و ا صحبه لمنتجبين ومن تبعهم باحسان الى يومالدّين‌‌.

(সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি বিশ্ব জগতের প্রভু। আর আমাদের নেতা মুহাম্মাদ মুস্তফা ও তাঁর পবিত্র বংশধর এবং তাঁর প্রিয় সাহাবায়ে কেরামের ওপর; একইসঙ্গে যারা তাদের ভালভাবে অনুসরণ করছেন তাদের ওপরও  কিয়ামত বা বিচার দিবস পর্যন্ত সালাম ও দরুদ বর্ষিত হোক।)

 

সম্মানিত ও প্রিয় অতিথিবৃন্দ! আমি আপনাদের স্বাগতঃ জানাচ্ছি এবং আমি দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, আমাদের সম্মিলিত এ প্রচেষ্টার মধ্যে তিনি যেন বরকত দান করেন এবং একে মুসলমানদের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য ফলপ্রসূ পদক্ষেপে পরিণত করেন। "নিশ্চয়ই তিনি শোনেন ও জবাব দেন"।

انّه سميع مجيب

 

ইসলামী জাগরণের বিষয়টি –যা নিয়ে আপনারা এ সম্মেলনে আলোচনা করবেন-তা আজ মুসলিম বিশ্বের ও ইসলামী উম্মাহ’র প্রধান আলোচ্য বিষয়। এ এক বিস্ময়কর ঘটনা। যদি আল্লাহর ইচ্ছায় এ জাগরণ নিরাপদ থাকে ও চলতে থাকে তাহলে আবারও ইসলামী সভ্যতার পুনরাবির্ভাব ঘটবে এবং তা তেমন কোনো দূরবর্তী ব্যাপার হবে না। আর তা ঘটবে গোটা বিশ্বের জন্য ও মুসলিম উম্মাহ’র জন্য।

 

আমাদের চোখের সামনে এখন যা স্পষ্ট এবং কোনো সচেতন মানুষই যা অস্বীকার করতে পারে না তা হল ইসলাম এখন আর বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণের প্রান্তভাগে নেই। এই প্রান্তসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বরং ইসলাম এখন বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তিগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ও অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। একইসঙ্গে ইসলাম এখন জীবন, রাজনীতি, সরকার এবং সামাজিক নানা ঘটনা ও বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করছে।  এ বিষয়টি কমিউনিজম ও লিবারেলিজম বা কথিত উদারতাবাদের ব্যর্থতার পটভূমিতে সৃষ্ট চিন্তাগত ও তাত্ত্বিক শূন্যতার শিকার বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাতপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর একইসঙ্গে এ বিষয়টি হচ্ছে বৈশ্বিক পর্যায়ে আরব বিশ্ব ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক ও বৈপ্লবিক ঘটনাগুলোর প্রথম প্রভাব বা নিদর্শন এবং খোদ এই নিদর্শনই আরও বড় ধরণের নানা বাস্তবতা বা সত্যের সুখবর দিচ্ছে যা ঘটবে আগামী দিনগুলোতে।

 

চলমান ইসলামী জাগরণ এমন এক বিষয় যার নিদর্শন এখন প্রায় গোটা মুসলিম জাহানেই দেখা যাচ্ছে, যদিও সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরের মুখপাত্ররা এই শব্দটিই বর্জন করছে এবং এর নাম নিতে ভয় পাচ্ছে। ইসলামী জাগরণের সবচেয়ে স্পষ্ট নিদর্শন হল ইসলামের মর্যাদা ও গৌরব পুনরুজ্জীবনের জন্য জনমতের ও বিশেষ করে যুব সমাজের আগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক আধিপত্যকামী ব্যবস্থার চরিত্র সম্পর্কে তাদের সচেতনতা ও অত্যাচারী আর স্বৈরাচারী সরকারগুলোসহ নানা কেন্দ্রের নোংরা চেহারা প্রকাশ হয়ে পড়া। এই জালিম ও স্বৈরাচারী সরকারগুলো এবং আধিপত্যকামী মহলগুলো ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাচ্যের মুসলিম ও অমুসলিম ভূখণ্ডগুলোকে রক্তাক্ত থাবার নীচে পিষ্ট করেছে। তারা এ সময় সভ্যতা ও সংস্কৃতির মুখোশ পরে মুসলিম জাতিগুলোর জাতিসত্তাকে নির্মম ও আগ্রাসী ক্ষমতা-লিপ্সার শিকারে পরিণত করেছে।

 

এই পবিত্র জাগরণের  নানা দিক ব্যাপক বিস্তৃত ও রহস্যময়। কিন্তু উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশে এই জাগরণের যে সাম্প্রতিক সাফল্যগুলো দেখা গেছে তা হৃদয়গুলোকে ভবিষ্যতে আরো বড় ও বিস্ময়কর সাফল্য অর্জনের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারে। সব সময়ই খোদায়ী প্রতিশ্রুতিগুলোর অলৌকিক বাস্তবায়ন আশা-উদ্দীপক নিদর্শন। আর এসবই আরো বড় ওয়াদাগুলো পূরণের সুসংবাদ দিচ্ছে। মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)'র মাকে যে দু’টি ওয়াদা দিয়েছিলেন পবিত্র কুরআনে তার বর্ণনা এই খোদায়ী কৌশলেরই এক দৃষ্টান্ত। সেই কঠিন মুহূর্তে শিশু মুসাকে একটি বাক্সে করে নীল নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)’র মাকে বলেছিলেন,

«انّارادّوهاليكوجاعلوهمنالمرسلين»

“নিশ্চয়ই আমরা তাঁকে তোমার কাছে ফিরিয়ে আনব এবং তাঁকে নবীগণের একজন করব।”(সূরা আল কাসাস. ৭ নম্বর আয়াত)

এই  ওয়াদাটি ছিল মুসার মাকে দেয়া ছোট ও প্রথম ওয়াদা যা আল্লাহ পূরণ করেছেন। ওয়াদা বাস্তবায়িত হওয়ায় হযরত মুসার মা খুশি হয়েছিলেন। আর এটা ছিল আরও বড় ওয়াদা তথা মুসা (আ.)-এর নবুওতি মিশনের ওয়াদা বাস্তবায়নের নিদর্শন। অবশ্য এ জন্য দীর্ঘ মেয়াদী ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংগ্রাম ও ধৈর্য প্রয়োজন। এই ওয়াদা ছিল সেই বৃহত মিশন বাস্তবায়নের সত্য ওয়াদা যা বহু বছর পর বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং তা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সূরা কাসাসের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন,

)فَرَدَدْنَاهُ إِلَىٰ أُمِّهِكَ يْتَقَرَّعَيْنُهَا وَلَاتَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَأَنّ َوَعْدَاللَّهِ حَقٌّ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَايَعْلَمُونَ-٢٨:١٣(

“অতঃপর আমি তাঁকে তথা মুসাকে নিজ জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না।”

 

পবিত্র কাবা ঘরে হামলাকারীদের ধ্বংস সাধন মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ ও চির-বিজয়ী ক্ষমতার আরেকটি দৃষ্টান্ত স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাঁর নির্দেশ মানতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র মাধ্যমে শ্রোতাদের উতসাহ দেয়ার জন্য এখানে (পবিত্র কুরআনের সূরা কুরাইশের তিন নম্বর আয়াতে) এ বাক্যটি ব্যবহার করেছেন:

«فليعبدواربّ هذاالبيت»

"কাজেই তাদের উচিত এই ঘরের রবের ইবাদত করা"এবং (সূরা  ফিলের দ্বিতীয় আয়াতে) আল্লাহ বলছেন,

أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيلٍ

"তিনি কি তাদের  কৌশল বা যুদ্ধকে ব্যর্থ করে দেননি?"

একইভাবে আল্লাহ নিজ ওয়াদার সত্যতার প্রতি তাঁর মাহবুব মহানবী (স.)’র বিশ্বাস ও তাঁর মনোবল বাড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেছেন, 

«ما ودّعك ربّك وماقلى»

"(হে নবী!) আপনার রব আপনাকে কখনো ত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি ৷" (সূরা আদ-দোহা, আয়াত-৩)

অলৌকিক নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহ নিজের প্রিয়তম নবী(সা.)-কে বলছেন,

«ألم يجدك يتيما فأوى. ووجدك ضالّا فهدى»

"তিনি কি আপনাকে এতিম হিসেবে পাননি ? তারপর আপনাকে আশ্রয় দেননি ?

“তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।" (সূরা আদ-দোহা, আয়াত নম্বর ৬-৭)

 

পবিত্র কুরআনে এ ধরনের আরো অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।

  

ইসলাম যেদিন ইরানে বিজয়ী হয় এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত এই দেশটিতে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের দুর্গ দখলেও সক্ষম হয় সেদিনই বুদ্ধিমান ও দ্রুত শিক্ষা নিতে সক্ষম ব্যক্তিরা বুঝেছিলেন যে, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার প্রয়োগ ঘটানো হলে অন্যান্য বিজয়ও আসবে একের পর এক।

 

ইসলামী ইরানের দর্শনীয় বা গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যগুলো, যেগুলোর কথা আমাদের শত্রুরাও স্বীকার করছে, সেগুলোর সবই অর্জিত হয়েছে খোদায়ী ওয়াদার প্রতি বিশ্বাস, ধৈর্য, প্রতিরোধ ও আল্লাহর কাছে মদদ চাওয়ার ছায়াতলে। উত্তেজনার সময় যেসব দুর্বল মানুষ ( («انّ المدركون»" আমরা অবশ্যই পরাজিত হব" (সূরা আশ শোয়ারা-৬১) বলে আর্তনাদ করে তাদের প্ররোচনার মুখে  আমাদের জনগণ সব সময়ই সোচ্চার-কণ্ঠে বলেছে:

«كلاّانّ معى ربّى سيهدين»

"কখনও না, আমার সাথে আছেন আমার রব, তিনি নিশ্চয়ই আমাকে পথ দেখাবেন ৷"(সূরা আশ শোয়ারা-৬২)

 

জাতিগুলোর সামনে আজ এ মূল্যবান অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, জনগণ সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচারী বা জালিম শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে দুর্নীতিবাজ, বিজাতীয় শক্তির সেবাদাস এবং আমেরিকার মদদপুষ্ট সরকারগুলোর পতন ঘটাতে বা সেগুলোকে নড়বড়ে করে দিতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিরোধ, ধৈর্য এবং এই খোদায়ী ওয়াদার প্রতি বিশ্বাস-

«ولينصرنّالله من ينصره انّالله لقوىّ عزيز»

"আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন যারা তাঁকে সাহায্য করবে ৷ আল্লাহ বড়ই শক্তিশালী ও পরাক্রান্ত ৷"(সূরা হাজ্জ:৪০)- মুসলিম উম্মাহর জন্য এই গৌরবের পথকে ইসলামী সভ্যতার চূড়া পর্যন্ত এগিয়ে নেবে।

এখন এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে, যেখানে বিভিন্ন দেশ ও নানা মাজহাবের একদল আলেম হাজির রয়েছেন, ইসলামী জাগরণ সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা তুলে ধরা সমীচীন বলে মনে করছি।

 

প্রথমতঃ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে উপনিবেশবাদের গোঁড়ার দিকের হোতাদের (তথা ব্রিটেন ও ফ্রান্স) অনুপ্রবেশের সময় জাগরণের প্রথম যে ঢেউ সূচিত হয়েছিল, তা মূলতঃ ঘটেছিল আলেমে দীন ও ধর্মীয় সংস্কারকদের মাধ্যমে। এই মহান নেতৃবৃন্দ ও খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন সাইয়্যেদ জামাল উদ্দিন, মুহাম্মাদ আবদুহ, মির্যা শিরাজি, আখুন্দ খোরাসানি, মাহমুদুল হাসান, মুহাম্মাদ আলী, শেইখ ফাজলুল্লাহ (নুরি), হাজ আগা নুরুল্লাহ, আবুল আলা মওদুদি এবং ইরান, মিশর, ভারত ও ইরাকের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী আরো অনেক আলেম। তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকবে চিরকাল। একইভাবে সমসাময়িক যুগে মহান ইমাম খোমেনী (র.)'র আলোকদীপ্ত নাম ইসলামী বিপ্লবের সম্মুখ অঙ্গনে জ্বলজ্বল করছে উজ্জ্বল তারকার মত।

 

এ ছাড়াও আরো শত শত খ্যাতনামা ও অখ্যাত হাজার হাজার আলেমও  বর্তমানে ও অতীতে বিভিন্ন দেশে বড় এবং ছোট মাত্রার সংস্কার কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছেন। আলেম সমাজের বাইরেও হাসান আল বান্না ও ইকবাল লাহোরির মত ধর্মীয় সংস্কারকবৃন্দ রয়েছেন। তাদের তালিকাও দীর্ঘ ও বিস্ময়কর।

 

আলেম সমাজ ও ধর্ম বিশেষজ্ঞরা প্রায় সবখানেই বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্থানে রয়েছেন এবং তারা জনগণের জন্য আধ্যাত্মিক মদদের কেন্দ্র। তারা যেখানেই বড় ধরনের ঘটনার সময় পথ-প্রদর্শক ও অগ্রপথিকের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন এবং বিপদের সময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেছেন সেখানেই তাদের ও জনগণের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধন জোরদার হয়েছে ও  জনগণের প্রতি তাদের দিক-নির্দেশনা বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে। এ বিষয়টি ইসলামী জাগরণ আন্দোলনের জন্য যতটা লাভজনক ও বরকতময় ইসলামী মূল্যবোধের বিরোধী এবং ইসলামের শত্রুদের জন্য ঠিক ততটাই অপ্রত্যাশিত ও উতকণ্ঠার কারণ। ইসলাম বিরোধীরা বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্বকে ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো থেকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এ জন্য নতুন নতুন মেরুকেন্দ্র তৈরির চেষ্টা করছে। কারণ তারা তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছে ধর্মীয় কেন্দ্রের বাইরে নতুন মেরুকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে জাতীয় নীতিমালা ও মূল্যবোধের ব্যাপারে এই নতুন কেন্দ্রের লোকদের  সঙ্গে খুব সহজেই আপোষ-রফায় উপনীত হওয়া যায়। কিন্তু খোদাভীরু আলেম ও নিবেদিত-প্রাণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে কখনও তা ঘটবে না।

 

এইসব বাস্তবতা আলেম সমাজের দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের উচিত অত্যন্ত সতর্ক থেকে ও গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শত্রুদের কর্মপন্থাও প্রতারণার নানা কৌশলগুলো চিহ্নিত করে তাদের প্রভাবের পথগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া এবং শত্রুদের ধোঁকাগুলো বানচাল করা। দুনিয়ার রঙবেরঙের  সম্পদের  প্রতি আকৃষ্ট হওয়া সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর মধ্যে অন্যতম। সম্পদশালী ও ক্ষমতাধর লোকদের অনুগ্রহভাজন হওয়া এবং ক্ষমতা ও কুপ্রবৃত্তির তাগুতগুলোর নুন-নেমক খাওয়া- এসব হল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার, জনগণের আস্থা হারানোর ও তাদের অন্তরঙ্গতা হারানোর সবচেয়ে বিপজ্জনক কিছু কারণ বা চালিকাশক্তি। আত্মকেন্দ্রীকতা ও ক্ষমতার লোভ দুর্বল হৃদয়ের মানুষদেরকে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর দিকে প্রলুব্ধ করতে থাকে এবং এইসব লোভ দুর্নীতি ও বিচ্যুতির পঙ্কিল পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই পবিত্র কুরআনের এই আয়াত সব সময় মনে রাখা জরুরি:

تلكا لدّارالأخرة نجعلها للّذين لايريد و نعلوّافى الأرض ولافسادا والعاقبة للمتّقين

"সে আখেরাতের ঘর তো আমি তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেবো যারা দুনিয়ার বুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে চায় না এবং চায় না বিপর্যয় সৃষ্টি করতে ৷ আর শুভ পরিণাম রয়েছে  গোনাহ হতে আত্মরক্ষাকারী তথা মুত্তাকীদের জন্যই ৷" (সূরা কাসাস-৮৩)

 

আজ ইসলামী জাগরণের আশা-জাগানো আন্দোলনগুলোর এই যুগে কখনও কখনও এমনসব দৃশ্য দেখছি যে সেসব একদিকে অনির্ভরযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃপক্ষ সৃষ্টির জন্য আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের অনুচরদের প্রচেষ্টাগুলো তুলে ধরছে, অন্যদিকে এইসব দৃশ্য ধার্মিক ও খোদাভীরু ব্যক্তিদেরকে বিষাক্ত এবং দুষিত ততপরতার অঙ্গনের দিকে টেনে আনতে সচেষ্ট ভোগবাদী কারুন বা সম্পদের পূজারি ধনকুবেরদের পাঁয়তারাও ফুটিয়ে তুলছে। তাই আলেম ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।

 

আর দ্বিতীয় দিকটি হল, মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী জাগরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী বা দূরবর্তী লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করা। এই কাজ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ  বা উচ্চতর বিষয় যা জাতিগুলোর জাগরণকে পথ-নির্দেশনা যোগাবে ও তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সহায়তা দেবে। আর এই নির্দিষ্ট অবস্থানকে চিহ্নিত বা পরিচিত করানোর মাধ্যমে রোড-ম্যাপ তৈরি করা সম্ভব এবং এরই ভিত্তিতে মধ্যবর্তী ও স্বল্প-মেয়াদী বা নিকটবর্তী লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য 'আলোকোজ্জ্বল ইসলামী সভ্যতা' গড়ে তোলার চেয়ে কম কিছু হওয়া উচিত নয়। মুসলিম উম্মাহর সব অংশকেই তথা সব মুসলিম দেশ ও জাতিসহ গোটা উম্মাহকে অবশ্যই পবিত্র কুরআনের প্রত্যাশিত সভ্যতার অবস্থান অর্জন করতে হবে। এই সভ্যতার মূল ও সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি হতে হবে এটা যে, সব মানুষকেই আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত সব সক্ষমতাগুলো থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিতে হবে, এইসব সক্ষমতাগুলোই মহান আল্লাহ মানুষকে ও প্রকৃতিকে দান করেছেন যাতে তারা সৌভাগ্য ও মানবজাতির জন্য পূর্ণতা অর্জন করতে পারেন।

 

এই সভ্যতার বাহ্যিক কাঠামো বা বিন্যাসকে প্রত্যক্ষ করা যাবে জনপ্রিয় সরকারে, পবিত্র কুরআন থেকে উতসারিত আইনে, মানুষের নানা চাহিদা সনাক্তকরণে ও তাদের নিত্য-নতুন চাহিদা পূরণে, গোঁড়ামী, প্রতিক্রিয়াশীলতা, ভালোর মধ্যে মন্দের মিশ্রণ ও কু-প্রথা বা বেদাআত পরিহারে, জনকল্যাণ ও জন-সম্পদ সৃষ্টিতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়, বৈষম্যমূলক সুবিধা ও সুদ-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে মুক্তি দেয়ায়, মানবীয় মূল্যবোধের বিস্তারে, বিশ্বের মুজলুমদের সহায়তা ও রক্ষার কাজে এবং কঠোর প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে-মানবীয় বিজ্ঞান থেকে শুরু করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায়, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং থেকে শুরু করে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে, আধুনিক মিডিয়াগুলো থেকে শুরু করে শিল্প ও চলচ্চিত্রে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ও আরো অনেক ক্ষেত্রে ইজতেহাদি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বা প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা- এই সবই ইসলামী সভ্যতা গড়ে তোলার জরুরি উপকরণ বা শর্ত।

 

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই কাজগুলোর সবই করা সম্ভব ও মুসলিম জাতিগুলোর মধ্যে এইসব কাজ করার শক্তি বা যোগ্যতাও রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তড়িঘড়ি বিচার করা বা এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে নিরাশা পোষণ করা উচিত হবে না। কারো যোগ্যতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা তথা সন্দেহ রাখা বা নিরাশা পোষণ করা হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর সাহায্যকে ও সৃষ্টি জগতের নিয়ম-কানুন বা সুন্নাতকে উপেক্ষা করে  বিভ্রান্তির এই চোরাবালিতে ডুবতে থাকা :

«الظّانّين بالله ظنّا لسّوء»

‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে  নানা কু-ধারণা পোষণ করে।‘ (সূরা আল ফাতহ-৬)

 

আমরা আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক একাধিপত্যের বা একক কর্তৃত্বের শেকল ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম এবং আমরা মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বের বেশিরভাগ জাতিগুলোর অধিকার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনে সহায়তা দিতে পারব। বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ জাতিগুলো গুটি-কয়েক দাম্ভিক শক্তির কর্তৃত্বাধীন রয়েছে।

 

ইসলামী সভ্যতা ঈমান, জ্ঞান-বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও অবিরাম সংগ্রামের মাধ্যমে উন্নত চিন্তাধারা ও উন্নত চারিত্রিক বিধান উপহার দিতে পারে মুসলিম উম্মাহসহ গোটা মানবজাতিকে এবং এটা হতে পারে বস্তুবাদী, জুলুমবাজ বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভ্রান্ত  চারিত্রিক বিধিমালা থেকে মুক্তির কেন্দ্রবিন্দু। বস্তুবাদী, জুলুমবাজ বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভ্রান্ত  চারিত্রিক বিধিমালা হচ্ছে বর্তমান পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান কিছু ভিত্তি বা স্তম্ভ।

তৃতীয় দিকটি হল- রাজনীতি, আচার-আচরণ ও জীবন-যাত্রার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যকে অনুসরণের তিক্ত ও ভয়ানক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ইসলামী জাগরণ আন্দোলনগুলোকে সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। মুসলিম দেশগুলো এক শতকেরও বেশি সময় ধরে সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর সংস্কৃতি ও নীতিমালার অনুসরণ করে কতগুলো ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ ছাড়া আর কিছুই পায়নি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতা ও লাঞ্ছনা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দারিদ্র ও চরম দুর্ভোগ, নৈতিক অধঃপতন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে লজ্জাজনক অনগ্রসরতা এই দুর্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। অথচ এই-সব দিকেই মুসলিম সমাজ গৌরবময় ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার অধিকারী হয়েছিল।

অবশ্য আমার এই বক্তব্যকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে শত্রুতা হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না। ভৌগলিক দূরত্ব বা ব্যবধানের কারণে মানবজাতির কোনো অংশের সঙ্গেই আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। আমরা আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)’র কাছ থেকে এটা শিখেছি যে, তিনি মানুষদের সম্পর্কে (মুসলমানের নীতি তুলে ধরতে গিয়ে) বলেছেন,

«امّا اخ لك فى الدّين او نظير لك فى الخلق»

‘যারা ধর্মের দিক থেকে তোমার ধর্মের (তথা ইসলামের) অনুসারী তারা তোমার দীনি ভাই, আর অন্য ধর্মের অনুসারীরা সৃষ্টিগতভাবে (আদম সন্তান) তোমার ভাই বা সমগোত্রীয়।’

 

আমাদের বিরোধ শুধু জুলুম, দাম্ভিকতা, মোড়লীপনা ও বলদর্পিতা, আগ্রাসন, দুর্নীতি, নৈতিক ও জ্ঞানগত অধঃপতনকে নিয়ে যা উপনিবেশবাদী ও দাম্ভিক শক্তিগুলো আমাদের (মুসলিম) জাতিগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এ অঞ্চলের (মধ্যপ্রাচ্যের) কয়েকটি দেশে গণ-জাগরণের যে সমীরণ বিপ্লবের প্রবল তুফানে রূপ নিয়েছে সেই দেশগুলোতেও বর্তমানে আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক কিছু সেবাদাস সরকারের বলদর্পিতা ও হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। তাদের (মিথ্যা) প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদাগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নানা সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে এবং জনগণের মহান আন্দোলনে যেন প্রভাব ফেলতে না পারে।

 

এক্ষেত্রেও অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে আমাদের এ শিক্ষা নিতে হবে যে: যারা দীর্ঘ বহু বছর ধরে আমেরিকার নানা ওয়াদার প্রতি বিশ্বাস রেখে মনে সুখ অনুভব করেছে এবং এরই ভিত্তিতে তাদের নীতি ও আচরণকে জালেমদের দিকে ঝুঁকিয়েছে তারা তাদের জাতিগুলোর সমস্যার গিঁট খুলতে পারেনি এবং নিজেদের ওপর ও অন্যদের ওপর জুলুমকেও বন্ধ করতে পারেনি।  তারা আমেরিকার কাছে নতজানু হয়ে বা আত্মসমর্পণ করে ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে (ইসরাইলের হাতে) তাদের একটি ঘরেরও ধ্বংস ঠেকাতে পারেনি। যেসব নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তি সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের প্রলোভনের ও ভয় প্রদর্শনের শিকার হয়েছেন তারা ইসলামী জাগরণের মহাসুযোগটি হাতছাড়া করেছেন। তাদের উচিত আল্লাহর এই ভয়ানক হুঁশিয়ারিতে ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়া :

أَلَمْتَرَإِلَىالَّذِينَبَدَّلُوانِعْمَتَاللَّهِكُفْرًاوَأَحَلُّواقَوْمَهُمْدَارَالْبَوَارِ-

جَهَنَّمَيَصْلَوْنَهَا ۖوَبِئْسَالْقَرَارُ

“তুমি কি তাদের প্রতি লক্ষ্য করনি, যারা আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকৃতির মাধ্যমে (ও  অকৃতজ্ঞ হওয়ার মাধ্যমে)  পরিবর্তন করেছে এবং তারা তাদের সম্প্রদায়কে ধ্বংসের মুখে পৌঁছে  দিয়েছে।  (সেই) জাহান্নামে, যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে এবং তা কতই না নিকৃষ্ট আবাসস্থল!” (সূরা ইব্রাহিম, ২৮-২৯)

 

আর চতুর্থ দিকটি হল, বর্তমানে সবচেয়ে বিপজ্জনক যেসব বিষয় ইসলামী জাগরণ আন্দোলনকে হুমকির সম্মুখীন করেছে সেসবের মধ্যে অন্যতম হল মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং এই আন্দোলনগুলোকে ধর্মীয়, মাজহাবি বা ফের্কাগত, জাতিগত ও গোত্রীয় সংঘাতের রক্তাক্ত ক্ষেত্রে পরিণত করা। পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদের গোয়েন্দা সার্ভিসগুলো পেট্রো-ডলারের ও আত্মবিক্রিত রাজনীতিবিদদের সহায়তা নিয়ে এখন পূর্ব এশিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকায় ও বিশেষ করে আরব অঞ্চলে এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। যে অর্থ মানুষের সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা যেত তা ব্যবহার করা হচ্ছে  মুসলমানদের রক্ত ঝরানোর কাজে, তাদের হুমকি দেয়ার ও কাফির ঘোষণার কাজসহ তাদেরকে হত্যা করার ও বোমা পাতার মত নানা সন্ত্রাসী ততপরতায় এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিহিংসার আগুন জ্বালানোর কাজে। ওরা মুসলমানদের একতাকে ও ইসলামী ঐক্যকে তাদের নোংরা লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের পথে বাধা বলে মনে করে। অন্যদিকে তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ উস্কে দেয়াকে তাদের শয়তানি লক্ষ্যগুলো হাসিলের সবচেয়ে সহজ পথ বলে মনে করে। মুসলমানদের মধ্যে আইন বা ফেকাহ ও কালাম শাস্ত্রে, ইতিহাস ও হাদিস বিষয়ে নানা মতভেদ বা পার্থক্য- যা স্বাভাবিক ও অপরিহার্য –এইসব বিষয়ে মতভেদ বা পার্থক্যগুলোকে মুসলমানদেরকে কাফির ঘোষণা দেয়ার, তাদের রক্ত ঝরানোর এবং ফেতনা-ফ্যাসাদ ও দাঙ্গা সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। অত্যন্ত সচেতন দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করলে  খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাবে যে, মুসলিম দেশগুলোর ঘরোয়া সংঘাতগুলো তথা এই ট্র্যাজেডিগুলোর পেছনে রয়েছে শত্রুদের হাত। নিঃসন্দেহে এই প্রতারক হাতগুলো মুসলিম সমাজের (কোনো কোনো অংশে বিরাজিত) অজ্ঞতা-মূর্খতা, কুসংস্কার বা গোঁড়ামী ও অগভীর দৃষ্টি বা সরলতার অপব্যবহার করছে এবং আগুনের মধ্যে পেট্রল ঢালছে। তাই এইসব ক্ষেত্রে সংস্কারক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বকে অত্যন্ত ব্যাপক বা গুরু দায়িত্ব বলা যায়।

 

আজ লিবিয়া একভাবে, মিশর ও তিউনিশিয়া অন্যভাবে, সিরিয়া অন্য পন্থায়, পাকিস্তান ভিন্ন পন্থায় এবং লেবানন ও ইরাক পৃথক পথে এইসব ভয়ানক আগুনের মুখে পড়েছে। তাই খুবই সতর্ক থাকা উচিত এবং এইসব সমস্যা সমাধানের জন্য সচেষ্ট হওয়া উচিত। এমনটা ভাবা হবে খুবই বোকামী যে এইসব সংকটের পেছনে কেবল ধর্মীয় বা আদর্শিক চিন্তাধারা ও জাতিগত উদ্দেশ্য সক্রিয় রয়েছে। পাশ্চাত্যের  প্রচারণায় এবং তাদের ভাড়াটে অনুচর ও পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল আঞ্চলিক গণমাধ্যমগুলোর প্রচারে সিরিয়ার ধ্বংসাত্মক যুদ্ধকে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বলে তুলে ধরা হচ্ছে এবং এভাবে ইহুদিবাদীদের জন্য নিরাপদ বলয় ও সিরিয়া আর লেবাননের ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ শক্তির জন্য  নানা শত্রু  গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ সিরিয়ায় সংঘাতে জড়িত দু পক্ষের কেউই শিয়া-সুন্নি মতাদর্শের জন্য নয় বরং ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পক্ষে ও প্রতিরোধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে লড়াই করছে। সিরিয়ার সরকার কোনো শিয়া সরকার নয়, ধর্ম নিরপেক্ষ সরকারও নয় এবং এমন কোনো ইসলাম বিদ্বেষী সরকারও নয় যে সরকার কোনো সুন্নি গ্রুপের বিরোধী। এই ধ্বংসাত্মক কৃত্রিম দৃশ্যপট সৃষ্টির চক্রান্তকারীরা একমাত্র যে বিষয়ে সাফল্য দেখিয়েছে তা হল তারা সরলমনা ব্যক্তিদের ধর্মীয় আবেগকে এই ভয়াবহ আগুন প্রজ্বলনের কাজে অপব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। এই দৃশ্যপটের দিকে ও যারা এই দৃশ্যের নানা পর্যায় বা অবস্থানে জড়িত তাদের দিকে তাকালে প্রত্যেক ন্যায় বিচারক মানুষের কাছে এই বাস্তবতা সহজেই স্পষ্ট হবে। বাহরাইনের ক্ষেত্রে এই প্রচারণার জোয়ার অন্যভাবে মিথ্যা ও ধোঁকা ছড়িয়ে দিচ্ছে।  বাহরাইনের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়- যারা ভোট দেয়ার মত যে কোনো জাতির স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত- তারা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য জেগে উঠেছে। এ বিষয়টিকে কি শিয়া-সুন্নি সংঘাত বলা উচিত হবে ঠিক এ কারণে যে, দেশটির মজলুম সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় শিয়া মুসলমান এবং নির্যাতনকারী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার সুন্নি হওয়ার ভান করছে? অবশ্য ইউরোপীয় ও আমেরিকান উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো এবং তাদের আঞ্চলিক বন্ধুরা ঘটনাকে সেভাবেই দেখানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু  এটা কি সত্য বা বাস্তব অবস্থা?

 

এ বিষয়গুলো নিয়ে ধর্মীয় চিন্তাবিদ ও ন্যায়পরায়ণ সংস্কারকদের সতর্কভাবে বা গভীরভাবে ভাবা উচিত এবং এইসব বিষয়ে দায়িত্বশীলতা অনুভব করা উচিত। গোত্রীয় বা জাতিগত, দলীয় ও মাজহাবী মতভেদগুলোকে বড় করে দেখানোর পেছনে শত্রুদের আসল মতলবগুলো চিহ্নিত করা সবার জন্যই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম দিকটি হল, ইসলামী জাগরণকামী আন্দোলনগুলো সঠিক পথে আছে কিনা তা বোঝার  অন্যতম মানদণ্ড হল ফিলিস্তিন ইস্যু। কারণ, গত ৬০ বছর ধরে ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদীদের জবরদখলই হল মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি যা মুসলিম উম্মাহর ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

সেই প্রথম দিন থেকে আজ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, গুপ্ত হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, জবরদখল ও ইসলামের পবিত্রতাগুলোর ওপর আগ্রাসন- এইসব মিলিয়ে রচিত হয়েছে ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডি। এই দখলদার (ইসরাইল) ও যুদ্ধে-লিপ্ত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং তার সঙ্গে লড়াই করা যে জরুরি সে বিষয়ে মুসলিম জাতিগুলো ছাড়াও সব মুসলিম মাজহাবসহ  মুসলমানদের সত ও সুস্থ সব ধারাই একমত পোষণ করে আসছে।

 

মুসলিম দেশগুলোর কোনো ধারা বা গ্রুপ যদি কোনো অযৌক্তিক অজুহাত দেখিয়ে কিংবা আমেরিকার আধিপত্যকামী দাবি বিবেচনা করে এই ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করে তাহলে তাকে ইসলামের প্রতি অনুগত এবং জাতীয়তাবাদী দাবিগুলোর প্রতি আন্তরিক বলে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।

 

ফিলিস্তিন ইস্যু হল একটি পরীক্ষা। (মুসলমানদের প্রথম কেবলা অধ্যুষিত) আলকুদসকে মুক্ত করার, ফিলিস্তিনি জাতি ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড রক্ষার শ্লোগানকে যে গ্রহণ করবে না, বা এই শ্লোগানকে যে কম গুরুত্ব দেবে সে আসলে প্রতিরোধ শিবির থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তার এ কাজ নিন্দিত হবে।  মুসলিম উম্মাহকে এই স্পষ্ট ও মৌলিক মানদণ্ডটি সব সময় ও সব স্থানেই মনে রাখতে হবে।

 

প্রিয় অতিথিবৃন্দ! ভাই ও বোনেরা!

শত্রুদের ষড়যন্ত্রের দিক থেকে কখনও দৃষ্টিকে দূরে রাখবেন না। আমাদের যে কোনো অসতর্কতা শত্রুদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ বয়ে আনবে। আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.) আমাদের জন্য যে শিক্ষা রেখে গেছেন তা হল,

«من نام لم ينم عنه»

“যে তার লক্ষ্যের ব্যাপারে অসতর্ক থাকে, তার শত্রু এই সুযোগ নেয়ার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকবে না।”

 

এ ব্যাপারে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অভিজ্ঞতাও নানা শিক্ষার উতস। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পশ্চিমা দাম্ভিক শক্তিগুলো ও মার্কিন সরকার –যারা ইরানের তাগুতি সরকারগুলোর ওপর দীর্ঘকাল ধরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল ; যারা এই দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করত ; যারা  ইরানি সমাজে ঈমান তথা ইসলামী বিশ্বাসের বিপুল ক্ষমতাকে খাটো করে দেখত এবং যারা ছিল ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের 'শক্তি' সমাবেশের ক্ষমতা ও পথ-নির্দেশনার ক্ষমতা সম্পর্কে অচেতন- তারা সহসা বুঝতে পারল যে তারা এতদিন অচেতনই ছিলেন এবং তাদের সরকারি সংস্থাগুলো, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলো  চরম বা নিরঙ্কুশ পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য  পুনরায় কাজ শুরু করল।

 

গত প্রায় ৩৪ বছরে আমরা তাদের পক্ষ থেকে বহু ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মুখোমুখি হয়েছি। যে বিষয়টি তাদের এইসব নীল-নক্সাগুলোকে বানচাল করেছে তার মূল চালিকাশক্তি ছিল দু'টি: প্রথমত ইসলামী নীতির ওপর অবিচল থাকা বা জোর দেয়া এবং ময়দানে জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি। এ দু’টি চালিকাশক্তি সব স্থানেই সব সমস্যা সমাধানের ও বিজয়ের মূল চাবিকাঠি।

 

প্রথম চালিকা শক্তিটি সুনিশ্চিত হয় আল্লাহর ওয়াদাগুলোর প্রতি গভীর ও আন্তরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয় চালিকা শক্তিটি সুনিশ্চিত হয় আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সত ব্যাখ্যার মাধ্যমে। যে জাতি তার নেতৃবৃন্দের সততায় ও আন্তরিকতায় বিশ্বাসী সে জাতি তাদের বরকতময় উপস্থিতির মাধ্যমে ময়দানকে প্রাণবন্ত করে। যখনই যে কোনো স্থানে কোনো জাতি দৃঢ় মনোবল নিয়ে ময়দানে উপস্থিত থাকে কোনো শক্তিই সেই জাতিকে পরাজিত করার ক্ষমতা রাখে না। এটা হচ্ছে সব জাতির জন্যই একটি সফল অভিজ্ঞতা যে জাতিগুলো তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে ইসলামী জাগরণের জন্ম দিয়েছেন। আমি মহান আল্লাহর কাছে মোনাজাত করছি তিনি যেন আপনাদের হেদায়াত ও সহায়তা দান করেন এবং আপনাদের ওপর ও সব জাতিগুলোর ওপর রহমত বর্ষণ করেন।

 

ওয়া আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

 

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/এআর/৭

 

 

 

 

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)’র সাহাবি শহীদ হুজর ইবনে আদি আল কিন্দি (রা.)’র মাজার ভেঙে তাঁর মৃতদেহ সরিয়ে নেয়ার পেছনে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা রয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন ইসলামী ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।

 

তিনি আজ (রোববার) ইরানের পূর্ব আযারবাইজান প্রদেশে এক জনসমাবেশে বলেছেন, শত্রুরা ইসলাম ধর্মের ভাবমর্যাদা নষ্টের ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে তারা এক দলকে উস্কে দিয়ে ১৪শ’ বছর আগের কবর খুড়ে মহানবীর সাহাবির মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছে। তিনি বলেন, 'আমি নিশ্চিত এসব উস্কানির সঙ্গে ইহুদিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীরা জড়িত, কাজেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

 

ড. আহমাদিনেজাদ বলেন, 'শত্রুরা মধ্যপ্রাচ্যে মাজহাবগত বিরোধ উস্কে দিতে চায়। কিন্তু আমাদের সবার আল্লাহ এক, রাসূল এক, কিতাব এক এবং আমরা সবাই রাসূল(সা.)কে অনুসরণ করি। আমরা সবাই রাসূলপ্রেমী এবং তার পথ অনুসরণই আমাদের প্রত্যাশা।' ইসলামের শত্রুদের অসত উদ্দেশ্য কখনোই সফল হবে না বলেও ঘোষণা করেন তিনি।#

 

তেহরান রেডিও/এসএ/৫

     

২ মে (রেডিও তেহরান): ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, “বস্তুবাদী পশ্চিমা সমাজ নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তা ক্ষমার অযোগ্য পাপ।” ইরানে নারী দিবসের এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।

 

সর্বোচ্চ নেতা বলেন, পশ্চিমা সমাজ নারীকে ভোগের বস্তুতে পরিণত করতে এবং অসম্মান করতে শিখিয়েছে। আর একেই তারা নারীর স্বাধীনতা বলে প্রচার করে থাকে; এতে তারা বিমোহিত হয়ে আছে।

 

তারা পছন্দ করুক আর নাই করুক নারীর প্রতি পাশ্চাত্য সভ্যতার এ ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ ও কথিত যৌন আইন তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

 

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেন, কোনো সভ্যতার ক্ষয় একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া এবং পশ্চিমা সমাজে তা শুরু হয়ে গেছে।

 

এর বিপরীতে নারীর প্রতি ইসলামি ও কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন তিনি। মানবীয় উতকর্ষতার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই; তাদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবন উপভোগেও কোনো তফাত নেই।

 

সর্বোচ্চ নেতা জোর দিয়ে বলেন, নারীদেরকে অবশ্যই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে।#

 

 

রেডিও তেহরান/এসআই/২  

১ এপ্রিল (রেডিও তেহরান): ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, ইসলামে নারীর মর্যাদা এবং প্রকৃত ইসলাম তুলে ধরার ক্ষেত্রে কবি-সাহিত্যিকদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা যাহরা(সা.)এর জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে কবি সাহিত্যিকদের এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেছেন। হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.)এর জন্মদিনকে ইরানে মা ও নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। মা ও নারীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। এ দিবস উপলক্ষে ইরানের কবি, সাহিত্যিক ও একদল নারী ব্যক্তিত্বরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে দেখা করতে যান।

 

সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি নারীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, নারী-পুরুষের সামাজিক অধিকারের ব্যাপারে ইসলাম ও পবিত্র কুরআনে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা রয়েছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলো নারী অধিকারের কথা বললেও তারাই নারীদেরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে যা খুবই অমানবিক। পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনসহ বিভিন্ন উপায়ে তাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্য জাতির ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা সব ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষকে সমান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।

 

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নারীদের মর্যাদা ও অবস্থান অনেকটা পণ্যের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হয়েছে। টেলিভিশন ও বিলবোর্ডে প্রচারিত পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের সৌন্দর্য উপস্থাপন করা হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি নারীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বলেছেন, বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সমাজে নারীদেরকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যা বড় ধরণের গুনাহ এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তিনি বলেন, এর ফলে পাশ্চাত্য সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাশ্চাত্যে পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য শুধু যে নারীদের সৌন্দর্যের অপব্যবহার করা হচ্ছে তাই নয় একই সঙ্গে পাশ্চাত্যে নারীদেরকে পুরুষের ভোগের বস্তুতে বা লালসার শিকারে পরিণত করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের সিনেমা নির্মাতারা ও টেভিলিশন চ্যানেলের মালিকরা নারীদের সৌন্দর্যকে ব্যবহার করে দর্শকদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। পাশ্চাত্যের সমাজ ব্যবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে প্রচুর সংখ্যক ম্যাগাজিন ও হলুদ পত্রিকা বের হয় যার লেখনীর প্রতিটি পরতে পরতে যৌনতায় ভরপুর এবং এ ধরণের বিকৃত ও অশ্লীল পত্রিকা ও ম্যাগাজিন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, পাশ্চাত্যে নারী স্বাধীনতা ও নারীদেরকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেয়ার কথা বলে নারীদেরকে এত নীচে নামিয়ে আনা হয়েছে। আরো বিস্মিত হতে হয় যেসব নারী শালীন পোশাক পরে নিজেদের শরীরকে ঢেকে রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা বজায় রাখে সেই সব নারীকে পশ্চাৎপদ বা সেকেলে হিসেবে অভিহিত করা হয়।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নারীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নীতিকে নারীর জন্য চরম অবমাননাকর হিসেবে অভিহিত করেছেন। অথচ পাশ্চাত্য এটাকে নারী স্বাধীনতা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, নারীদের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের এ নীতি এবং অবাধ যৌনাচার সেখানকার পরিবার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং যে সমাজে পরিবার ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়বে সেই সমাজ ধ্বংস হতে বাধ্য। তিনি বলেন, পরিবার বৃহত সভ্যতাগুলোর কেন্দ্র। তাই পারিবারিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে গেলে, যে কোনো সভ্যতার পতন ঘটবে। #

 

রেডিও তেহরান/আরএইচ/১

 

 

 

 

২৯ এপ্রিল (রেডিও তেহরান): ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি গণ-জাগরণকে রক্ষা করা সম্ভব হলে বৃহত্তর ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠবে।

 

তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুকে ইসলামি জাগরণের জন্য মানদণ্ড বলেও উল্লেখ করেছেন।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আজ (সোমবার) 'ওলামা সমাবেশ ও ইসলামি জাগরণ' শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন।  

 

তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইসলামি জাগরণের জন্য নানা চ্যালেঞ্জ বা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বলেছেন, ইসলামি নীতিমালার ওপর অবিচলতা ও ময়দানে জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রাখা শত্রুদের সব ধরনের ষড়যন্ত্র বানচালের প্রধান চালিকাশক্তি।

 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইসলামি জাগরণকে শত্রুরা সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সংঘাতে পরিণত করার যে ষড়যন্ত্র করছে তার বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

 

সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ইসলামি জাগরণের বিষয়টি বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর বিষয় এবং মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এ জাগরণ টিকে থাকলে নিকট ভবিষ্যতেই ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠবে।

 

তিনি আরো বলেন, সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর মুখপাত্ররা 'ইসলামি জাগরণ' শব্দটি উচ্চারণ করতেও ভয় পাচ্ছে। তবে, ইচ্ছাকৃতভাবে এ শব্দটি বর্জন করা হলেও ইসলামি জাগরণ এখন এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।#

 

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/এসআই/২৯

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, ইরানের অগ্রগতির ধারা বন্ধ করার জন্য শত্রুরা যে সব ততপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা সফল হবে না। ইরানের আদর্শ কর্মীদের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেছেন তিনি।

 

তিনি বলেন, ইরানের অগ্রগতি ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য শত্রুরা সব অজুহাতকে কাজ লাগাচ্ছে কিন্তু এ সত্ত্বেও তারা ইরানি জনগণের দৃঢ় অঙ্গীকারকে সামান্য পরিমাণও দুর্বল করতে পারবে না।

 

প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ বলেন, ইরানের ভেতরে বসে দেশের সব উন্নয়ন ও অগ্রগতি সব সময় অনুভব করা যায় না; কিন্তু দেশের বাইরে যারা বসে আছেন তারা আমাদের উন্নয়ন ধারাকে বিশ্লেষণ করছেন এবং ঐতিহাসিক অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর রাখছেন। তিনি বলেন, অগ্রগতির প্রতিটি শিখরই ইরানি জনগণ স্পর্শ করতে পারবে না এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।


এ ছাড়া, এ পর্যন্ত ইরানের যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে ‘চমতকার’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ আরো বলেন, ইরানের সামনে আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে।#

 

রেডিও তেহরান/সমর/২৮