এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 03 জুন 2010 12:33

ইমাম খোমেনী (রহ.)এর চিন্তা-দর্শন ও জীবন

বিশ্বের আধিপত্যকামীদের বুকে কাঁপন সৃষ্টিকারী অবিসংবাদিত নেতা ইমাম খোমেনী (রহ.)'র মৃত্যুর খবর স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়েছিল। বিবিসি রেডিও ইমাম খোমেনীর মৃত্যুর খবর দিতে যেয়ে বলেছিল, আজ এমন এক ব্যক্তি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন,যার মৃত্যুতে পাশ্চাত্যের অনেকেই প্রশান্তিতে ঘুমোতে পেরেছেন। সেদিন অনেকেই এটা ভেবেছিল যে, ইমাম খোমেনী (রহ.)'র ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে তার চিন্তা-চেতনা ও আদর্শেরও মৃত্যু ঘটবে এবং বিশ্বব্যাপী অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের ধারা সূচিত হয়েছে তা স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ইমামের ইন্তেকালের পর দুই দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও তার চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের প্রভাব কমেনি বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইমাম খোমেনীর চিন্তা ও আদর্শ ইরানসহ গোটা বিশ্বকেই প্রভাবিত করেছে।

সুদানে ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর হামেদ মালাকুতি বিশ্বব্যাপী ইমাম খোমেনী (রহ.)'র প্রভাব সম্পর্কে বলতে যেয়ে নিজের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, একদিন অফিসে বসে আছি। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল, মোবাইলের ওপাশ থেকে এক তরুণ কথা বলছিল। সুদানি ঐ তরুণটি নিজের পরিচয় দিতে যেয়ে বলল, আমি খোমেনী বলছি। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, আপনার নামটি আরেক বার বলবেন প্লিজ? ঐ তরুণ আরেকটু জোরালো কন্ঠে বললেন, আমার নাম খোমেনী। এরপর ঐ তরুণ আমার সাথে দেখা করে জানায় যে, তার বয়স ২৮ বছর, সুদানের রাজধানী খার্তুমে ১৯৮২ সালে সে জন্ম গ্রহণ করেছে। কৃষ্ণাঙ্গ ঐ তরুণের বাবা, ইমাম খোমেনী (রহ.)'র চিন্তা-চেতনা ও আদর্শে এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, তিনি তার সন্তানের নামটি পর্যন্ত রেখেছিলেন খোমেনী এবং এজন্য তিনি গর্ববোধ করতেন।

খোমেনী নামের ঐ তরুণ ইরানের জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আপনাদের সৌভাগ্য যে আপনারা ইমাম খোমেনী (রহ.)'র মতো একজন নেতা পেয়েছেন। আপনারা সত্যের পথে পথচলা অব্যাহত রাখুন। মরহুম ইমাম খোমেনী এবং ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বিশ্বের স্বাধীনচেতা মানুষের গর্ব। ইমাম খোমেনী (রহ.) দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেও সারা বিশ্বে হাজার হাজার খোমেনীর জন্ম হয়েছে, তারা ইমাম খোমেনীর চিন্তা-চেতনাকে লালন করছে এবং ইমামের নীতি-আদর্শকে সামনে রেখে পথ চলা অব্যাহত রেখেছে বলে ঐ তরুণ মন্তব্য করেছে। আসলে শুধু সুদান নয় বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ইমাম খোমেনী (রহ.)-র চিন্তা ও আদর্শ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। গোটা বিশ্বের স্বাধীনচেতা মানুষগুলো সত্যের পথে চলার ক্ষেত্রে নতুন করে সাহস পেয়েছে।

বিশ্বে এখন ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই এই পরিস্থিতিকে ইমাম খোমেনী (রহ.) অবদান বলে মনে করেন। ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রবনতা দেখে মরহুম ইমাম খোমেনীর সেই বক্তব্যটি খুব মনে পড়ছে। তিনি বলতেন, বিশ্বের জাতিগুলো আজ চিরন্তন ঐশী মূল্যবোধের তৃষ্ণায় কাতর হয়ে আছে, ঐশী মূল্যবোধগুলোর সাথে তাদের পরিচিত করানো গেলে তারা সে দিকেই ঝোকে পড়বে। মার্কিন লেখক রবার্ট মাকওয়ান্দ একবিংশ শতাব্দীকে আধ্যাত্মিকতা অনুসন্ধানের শতাব্দী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও উদাহরণ তুলে ধরে বলেছেন, বর্তমান শতাব্দী ধর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হবার শতাব্দী এবং এই শতাব্দীতে আর কোন সামাজিক শক্তিই ধর্মের মতো এত বেশী প্রভাবশালী নয়।

ইমাম খোমেনী (রহ.) ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই ঐতিহাসিক ও মহা সংগ্রামের ময়দানে প্রবেশ করেন এবং সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত রীতি-নীতি সংশোধনের উদ্যোগ নেন। তিনি ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলেন এবং সবাইকে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর আহ্বান জানান। ইমাম খোমেনীর চিন্তা-চেতনা ও দর্শন. সমাজের বিশেষ কোন শ্রেণী বা গোষ্ঠী কেন্দ্রীক ছিলো না। তিনি গোটা বিশ্বকে নিয়ে ভাবতেন। গোটা বিশ্বের মানুষের জন্য সঠিক পথ তুলে ধরেছেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে মানুষ গড়ে তোলার ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। তিনি নিজে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করে সবার সামনে বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। ইমাম খোমেনী(রহ.) তার ওসিয়তনামায় যে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন, তা মেনে চললে মানুষ তার প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে।

ইমাম খোমেনী (রহ.)'র দৃষ্টিতে, মানব জাতি পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে এবং যোগ্য ও পুণ্যবানদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্পনের মাধ্যমে উন্নয়ন ও অগ্রগতির শিখরে আরোহন করতে পারে। তিনি ধর্ম ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থাকে আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থায় জুলুম-নির্যাতন, দুর্নীতি ও আগ্রাসনের কোন স্থান নেই। কাজেই ধর্ম ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষমতালোভীদের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে বিপদগ্রস্ত করে। এ কারণে স্বার্থান্বেষী মহল সব সময় ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে এবং এখনও করছে। ইমাম খোমেনী (রহ.) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন এবং স্বনির্ভর হবার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে তার সাথে ইসলাম এমনকি কোন একত্ববাদী ধর্মেরই বিরোধ নেই। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যখন ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহৃত হয় তখনই এর সাথে ইসলামের বিরোধিতার প্রসঙ্গ আসে।

নিজের ভবিষ্যত নির্ধারণে যে, খোদ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তা ইমাম খোমেনী(রহ.) মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। ইমাম খোমেনীর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ ও মতামত, রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে। এ কারণে তিনি দেশের মানুষকে সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং সরকারের কাজ তদারকির আহ্বান জানাতেন। তিনি যোগ্য ও নীতিবানদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার উপর সর্বদা গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইমাম খোমেনী(রহ.) আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন শক্তির উপাসনা করা থেকে সরে আসাকেই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন বলে মনে করতেন।

ইমাম খোমেনী (রহ.)'র চিন্তাধারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইস্পাত কঠিন দূর্গ গড়ে উঠেছে। লেবাননও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননীদের সংগ্রামের কারণ তুলে ধরতে যেয়ে লেবাননের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শেখ মোহাম্মদ বলেছেন, আমরা আশাবাদী মন নিয়ে কোন ভয়-ভীতি ছাড়াই যে সংগ্রাম করছি তার পেছনে রয়েছে ইমাম খোমেনীর গঠনমূলক চিন্তা-দর্শন। যখনই মানুষের অধিকারের প্রসংঙ্গ এসেছে তখনি ইমাম খোমেনী গোটা বিশ্বের মানুষের অধিকারের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইমাম খোমেনী (রহ.) সবার সামনে এটা তুলে ধরেছেন যে, বিভিন্ন জাতি যদি মানবীয় মূল্যবোধ রক্ষা করে চলে এবং অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়,তাহলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের জুলুম-অত্যাচার আর অব্যাহত রাখতে পারবে না। তিনি মনে করতেন, বিশ্বের জাতিগুলো যদি বিজাতীয়দের কাছে আত্মসমর্পনের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে আসতে পারে তাহলে তারা ভবিষ্যতে সম্মান ও মর্যাদার স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হবে।

ইমাম খোমেনী (রহ.)'র চিন্তা ও দর্শন স্থান ও কালের গন্ডিকে অতিক্রম করে বিশ্বের সর্বত্র স্বাধীনচেতা মানুষদের এখনও অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বর্তমান যুগের মানুষকে ভ্রান্ত পথ ছেড়ে সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে সুস্পষ্ট ভাবে। সুইজারল্যান্ডের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক আহমাদ হুবার বলেছেন, বর্তমান যুগের মানুষ যে ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে সে ব্যাপারে ইমাম খোমেনী (রহ.) সবাইকে বিপদ সংকেত দিয়েছেন। মহরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.) কেবল একজন আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বই ছিলেন না একই সাথে তিনি রাজনৈতিক দিক দিয়েও ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি সাম্রাজ্যবাদীদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ইসলামী বিপ্লব সফল করেছেন এবং ইসলামী ইরানকে উন্নয়নের পথে পরিচালিত করেছেন। শত্রুদের ধারণার বিপরীতে ইমাম খোমেনীর আদর্শ ও চিন্তাধারা ক্রমেই বিস্তার ঘটছে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ক্রমেই কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। ইমাম খোমেনী (রহ.)'র দিকনির্দেশনাগুলো আমরাও আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো, এই প্রত্যাশা করছি।

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন