এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 15 জুলাই 2015 22:26

ইরানের সঙ্গে ৫+১ গ্রুপের পরমাণু চুক্তি: লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ

মিজানুর রহমান মিলন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে ইরানের সঙ্গে ৫+১ বিশ্বশক্তির কমপ্রেহেনসিভ পরমাণু চুক্তি সই হয়েছে। ইরানের সরকার ও জনগণসহ সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণও এই চুক্তিতে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই চুক্তি সম্পর্কে একটি মন্তব্যই যথেষ্ট যে, সারা বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য চুক্তিটি সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

 

ইরান গত ১৩ বছর ধরে পরমাণু ক্ষেত্রে যেসব অধিকার দাবি করে এসেছিল চুক্তিতে ইরানের সেইসব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। নিজ ভূমিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, পরমাণু প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গবেষণার অধিকার এমনকি পরমাণু বাণিজ্যের অধিকারও পেয়েছে ইরান। অর্থাৎ রাশিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্সসহ পরাশক্তিরা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যেমন পরমাণু চুক্তি করে সে ধরনের পূর্ণ অধিকার পেয়েছে ইরান। কোনো পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করতে হয়নি ইরানকে। ইরান আরো পেয়েছে জাতিসংঘে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি!

 

হ্যাঁ, ইরান যেহেতু দাবি করে আসছে পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্যই শান্তিপূর্ণ সেহেতু ইরানের পরমাণু কার্যক্রম মাত্র ১০ বছরের জন্য জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি প্রতিষ্ঠান আইএইএ’র কঠোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। যদিও ইরান এনপিটির সদস্য হওয়ায় আগে থেকেই ইরানের পরমাণু কার্যক্রম তদারকি করে আসছে আইএইএ এবং এই ১০ বছর ইরান শান্তিপূর্ণ কাজে বাদে সামরিক ও পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনে তার কর্মসুচি পরিচালিত করতে পারবে না। তবে এরপর ইরান পূর্ণ স্বাধীন মাত্রায় তার পরমাণু কর্মসুচি চালাতে পারবে। এর অর্থ এই নয় যে, ইরান ১০ বছর পর পরমাণু অস্ত্র বানাবে তবে তখন বিশ্বপরিস্থিতি দেখে ইরান ইচ্ছে করলেই তা বানাতে পারবে। বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আরোপিত জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরণের অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে ( মনে রাখুন সাসপেন্ড নয়)।

 

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী যে রেড লাইন বেঁধে দিয়েছিলেন চুক্তিতে সকল রেড লাইন মেনে নেয়া হয়েছে। পশ্চিমারা দাবি করছিল- ইরানের ফোরদো পরমাণু স্থাপনা বন্ধ করতে হবে। চুক্তিতে সে দাবিও তাদের অর্জিত হয়নি। পশ্চিমারা দাবি করেছিল- ইরানের সামরিক ক্ষেত্রগুলোতেও পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে পশ্চিমাদের সে দাবিও অর্জিত হয়নি। পশ্চিমারা দাবি করেছিল- ইরানের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে ইরানের মিসাইল সক্ষমতা আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সে দাবিও ইরান বরাবরই নাকচ করেছে। এমনকি পরমাণু বিজ্ঞানীদের সাক্ষাতের নামে জিজ্ঞাসার অনুমতিও দেয়নি ইরান- যা পশ্চিমাদের অন্যতম একটি দাবি ছিল।

মনে রাখা দরকার- ২০০৩ সালে  ইরানিরা ইইউ’র সাথে আলোচনায় গবেষণার জন্য মাত্র কয়েকটা সেন্ট্রিফিউজ রাখতে চেয়েছিল পশ্চিমারা সেও অনুমতিও ইরানকে দেয়নি। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি পশ্চিমাদের দাবি অনুসারে ইরানের সকল পারমানবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিলেন কিন্তু কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ক্ষমতায় আসার পর পট পরিবর্তন হয়। তিনি পশ্চিমাদের সামরিক হুমকি ও তাদের দাবি উপেক্ষা করে পরমাণু কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করেন এবং পরমাণু ক্ষেত্রে একের পর এক বিভিন্ন সাফল্য ঘোষণা করেন। প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমারা ইরানের ওপর আরোপ করে একের পর এক কঠোর অবরোধ।

 

ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানিকে নিয়ে গঠিত হয় ৫+১ গ্রুপ। ইরানের ওপর অরোপিত অবরোধের মাত্রা কেমন ছিল- শুধু এইটুকুই বলা যথেষ্ট হবে যে, ইরানের ব্যাংকিং লেনদেনও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইরানকে প্রাচীন বিনিময় প্রথা অনুসরণ করতে হয়েছে তা আবার সবক্ষেত্রেও সম্ভব হয় নি বা হয় না। এরফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের দশ হাজার কোটি ডলার আটকা পড়েছিল। এখন চুক্তির ফলে ইরান তার এই সমুদয় অর্থ বিদেশি ব্যাংক থেকে নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে এবং বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতে পারবে!

 

মূলত চুক্তিটা ইরানের জন্য যতটা না জরুরি তার চেয়ে পশ্চিমাদের জন্য অনেক বেশি জরুরি ছিল। আর এই কারণেই চুক্তিটা হয়েছে। ইরানের ওপর সব ধরণের অবরোধ আরোপ করেছে পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতিসংঘ। অবরোধের এমন কোনো দিক নেই যে, ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ করা হয়নি। আমার ধারণা- ইরানের ওপর যেসব অবরোধ আরোপ করা হয়েছে তা ইরান বাদে অন্য কোনো দেশের ওপর অরোপ করা হতো সেই দেশটা দেউলিয়া ও তাঁর অর্থনীতি ভেঙে পড়তে  বাধ্য হতো এমনকি তা তেল সমৃদ্ধ দেশ হলেও। ( আমাদের সামনেই এর অন্যতম উদাহরণ সাদ্দামের ইরাক)। কিন্তু ইরান অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পশ্চিমাদের সে আশা পূরণ হয়নি। শুধু পূরণ হয়নি তা নয়, ইরান উল্টো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য ও উন্নয়ন করে পশ্চিমাদের তাক লাগিয়ে দেয়। পশ্চিমারা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে দুর্বল করে ইরাকের মত আক্রমণ করতে চেয়েছিল কিন্তু ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতেই সকল মারণাস্ত্র তৈরি করা শুরু করে। ট্যাংক, ড্রোন, মিসাইল, ব্যালাস্টিক মিসাইল, সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, হেলিকপ্টার, জঙ্গিবিমান, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাডারসহ সবধরণের মারণাস্ত্র ইরান নিজেই তৈরি করে। ইরানের গ্যাসোলিন আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমারা কিন্তু ইরান নিজেই গ্যাসোলিন উৎপাদন করে রপ্তানিরও ঘোষণা দেয়। তেল শিল্প উন্নয়নের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে পশ্চিমারা কিন্তু তেল শিল্প উন্নয়নের প্রায় সকল ধরণের প্রযুক্তি ইরান নিজেই আবিষ্কার করেছে!

 

কৃষ্টি, চিকিৎসা, শিল্প, পরমাণু, মহাকাশ গবেষণা, সামরিক, বায়োটেকনোলজি, ন্যানো-টেকনোলজিসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সকল শাখায় ইরান ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। অবরোধের মধ্যেও নিজস্ব প্রযুক্তির স্যাটেলাইট উৎক্ষেণ ও মহাকাশে বানর প্রেরণ অন্যতম সফলতা ইরানের! এসব বিভিন্ন কারণেই ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ আশানুরূপ মাত্রায় কাজ করেনি। এছাড়াও কোনো দেশ আক্রমণ বা ধ্বংস করতে সরকার ও জনগণ পরষ্পরকে পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হয় যেমনটা ছিল সাদ্দামের সাথে ইরাকি জনগণের ও গাদ্দাফির সাথে লিবিয়ার জনগণের কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পশ্চিমারা ১৯৭৯ সালের পর থেকে শত চেষ্টা করেও তা পারেনি। কারণ জনগণকে সাথে নিয়ে নিজস্ব ধারার গণতান্ত্রিক সিষ্টেম চালু করেছে ইরান। প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত, পার্লামেন্টের এমপিও নির্বাচিত এমনকি ইরানি সরকারের সকল স্তরের কর্মকর্তাগণও নির্বাচিত। এমতাবস্থায় সকল ধরণের অবরোধ আরোপ করে পশ্চিমারা তাদের সকল সফট উইপনই নিঃশেষ করেছে। বাকি তাকে হার্ড উইপন অর্থাৎ ইরান আক্রমণ!

 

ইরানের সামরিক সক্ষমতা, সামরিক অফিসারদের ঐক্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশ্ব পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণেই ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালানো পশ্চিমাদের জন্য সম্ভব নয়। এই অবস্থায় ইরানের সাথে চুক্তি না করার অর্থ হল- ইরানকে তার পরমাণু কর্মসুচি নিয়ে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া- যা মেনে নেয়াও পশ্চিমাদের জন্য আপাতভাবে সম্ভব নয়। আর অন্যদিকে ইরানের জন্য জরুরি হয়ে পড়ছে তার ওপর আরোপিত সব ধরণের অবরোধ প্রত্যাহার। পশ্চিমারা ২০১৩ সাল থেকেই ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। যুক্তরাষ্ট্র গোপনে আহমাদিনেজাদ সরকারের সাথেও চুক্তি নিয়ে যোগাযোগ করেছিল যদিও আহমাদিনেজাদের কট্টরপন্থী নীতি ও পশ্চিমা বিরোধী বক্তব্যের কারণে আহমাদিনেজাদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল কিন্তু উদারপন্থী হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় পশ্চিমাদের সামনে সে সুযোগ চলে আসে।

 

১৯৭৯ সাল ইরানের ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে এক বিপ্লবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম সেবাদাস ও মিত্র প্রবল পরাক্রমশারী রেজা শাহ পাহলভির পতনের মাধ্যমেই ইরান ও পশ্চিমাদের বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। বর্তমান ইরানের অন্যতম একটি চরিত্র হল- দেশটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হওয়ার পরেও মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অন্যতম খেলোয়াড় যা মুসলিম বিশ্বে বিরল! আর এই কারণেই বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইরানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। রেজা শাহ পাহলভির পতন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। এর ফলাফল তৎকালীন ইরানি ছাত্ররা মার্কিন দুতাবাস দখল করে যুক্তরাষ্ট্রকে উচিত শিক্ষা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কমান্ডো বিমান পাঠিয়েও কুলকিনারা পায়নি! যুক্তরাষ্ট্র এর প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরব ও অন্যান্য রাজতান্ত্রিক, স্বৈরশাসক আরবদের সহায়তায় ইরাকের সাদ্দামকে লেলিয়ে দিয়েছিল ইরান আক্রমণে। এর ফলাফল সবার জানা আছে।

 

কথা হল- যে দেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস কামনা করে সেই দেশের সাথে বিশ্বের একমাত্র সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র কোনো সম্মানজনক সমঝোতায় বা চুক্তিতে উপনীত হবে -এটা ছিল কল্পনারও অতীত! কিন্তু বর্তমানে বিষ্ময়করভাবে হলেও সেটাই ঘটেছে! সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েও সাম্রাজ্যবাদীদের কোনো সম্মানজনক চুক্তি করতে বাধ্য করা যায়- ইরানের সফলতা এখানেই! চুক্তি হওয়ার পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ  নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনীর মন্তব্য পড়লেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে-

‘তবুও, এর অর্থ এই নয় যে এই অহংকারী এরোগেন্স শক্তির সাথে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম সব এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে বরং, তাঁদের আঞ্চলিক গোয়েন্দাগিরি ও এ অঞ্চলে তাদের বিভক্তিমূলক রুলিং টেকনিক-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম সবেমাত্র শুরু হলো। (কারণ,) শয়তান কখনো ঘুমায় না।''

 

ইরানের সাথে ৫+১ বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তি বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্ব শান্তির জন্য অন্যতম একটি মাইলফলক! বিশ্ব কুটনীতির অন্যতম একটি সাফল্য। বিশ্বের নানা সংকটে এ চুক্তি অন্যতম একটি উদাহরণ হিসেবে থাকবে। রোল মডেল হয়ে থাকবে উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য। যদি ব্যতিক্রম কিছু না ঘটে তাহলে নিঃসন্দেহে এবারে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার পেতে যাচ্ছেন মার্কিন ফরেইন সেক্রেটারী জন কেরি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ!#

 

লেখক: অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন