এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 03 আগস্ট 2015 18:21

ষড়যন্ত্রের ফাঁদে মুসলিম বিশ্ব: ঐক্যবদ্ধ না হলে দুর্ভোগ বাড়বে

আনোয়ারুল হক আনোয়ার আনোয়ারুল হক আনোয়ার

আনোয়ারুল হক আনোয়ার : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেও বিশ্বে মুসলমানরা ছিল ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ জাতি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্বে মুসলিম দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এর পাশাপাশি স্বীয় স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে মুসলমানরা নিজেরাই অনাহুত অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। তুরস্ক সাম্রাজ্যকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা হয়। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গোটা অঞ্চলে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তখন থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সুগভীর চক্রান্ত অব্যাহত থাকে। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মুসলিম দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে বিভেদ জিইয়ে রাখা, শিয়া-সুন্নি বিরোধ, মুসলমান নামধারী বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আবির্ভাব, ইসলাম ধর্ম, পবিত্র কুরআন, মহানবী (সা.) কে নিয়ে ষড়যন্ত্র, এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশকে উত্তেজিত করে শেষতক যুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া, মুসলমানদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং মিশনারীদের মাধ্যমে ধর্মান্তরীতকরণ চলছে সমান গতিতে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহুদেশ অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানে ঈর্ষনীয় উন্নতি সাধন করলেও মুসলিম দেশ ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও ইথিওপিয়াসহ অনেক দেশে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সৃষ্টিসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মাধ্যমে অশান্তি জিইয়ে রাখা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ইসলাম বিরোধীরা সু-কৌশলে অনেকদূর এগিয়েছে। বর্তমানে একাধিক মুসলিম দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু মুসলমানরা বৈষম্যের শিকার। হত্যা, হামলা, মামলা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ এবং নিজ জন্মভূমি থেকে বিতাড়ন এখন অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশে মুসলমানরা ইসলাম বিরোধীদের প্রতিহিংসার শিকার। এসব কিছু সংঘটিত হচ্ছে শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য ও অবিশ্বাসের কারণে। এটা ভবিষতে আরো ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। ইউরোপে যাতে মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে সে জন্য বসনিয়ার অগণিত মুসলমানকে হত্যা করা ছাড়াও হাজার হাজার মহিলাকে বন্দী শিবিরে আটকে রেখে ধর্ষন করা হয়েছে। এর নেপথ্যে কারা ছিল-সেটা গোটা বিশ্ববাসী জানে।

 

ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে প্রলুব্ধ করে ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় এক যুগব্যাপী যুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়। আবার পশ্চিমাদের নিকট যখন সাদ্দাম হোসেন অপ্রয়োজনীয় বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে- তখন তাকে দিয়ে কুয়েত দখল অতপরঃ বহুজাতিক বাহিনীর ব্যানারে ইরাকে হামলা চালিয়ে দেশটিকে তছনছ করা ছাড়াও সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো হয়। আফগানিস্তান থেকে সৌভিয়েত বাহিনীকে হটানোর জন্য পাকিস্তানের সহযোগিতায় ‘তালেবান’ সৃষ্টি করা হয়েছে। পরে আফগানিস্তান থেকে রুশ সৈন্যরা চলে গেলে তালেবানদের গুরুত্ব হ্রাস পায়। এরপর স্বার্থে আঘাত হানায় তালেবানদের সাথে চরম সংঘাতে লিপ্ত হয় আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী। শেষতক ওসামা বিন লাদেকে হত্যা করা হয়। অপরদিকে তালেবানদের নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের মাটিতে এখন সেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নীরিহ জনগণের রক্ত ঝরাচ্ছে।

 

এবার আসা যাক লিবিয়া প্রসঙ্গে:

লিবিয়ার এক নায়ক কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির সাথে ইতালি ও ফ্রান্সের বেশ দহরম মহরম ছিল। কাড়ি কাড়ি ডলার ও বিভিন্ন উপঢৌকন পাঠানোর মাধ্যমে মোটা মাথার বুদ্ধিসম্পন্ন মুয়াম্মার গাদ্দাফি ভেবেছিল, এই দুই দেশের সাথে সখ্যতা গড়লে আমেরিকা রোষানল থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। কিন্তু লিবিয়ায় হামলা চালিয়ে গাদ্দাফি সরকারের চরম পতন ঘটানো এবং গাদ্দাফি ও তার পুত্রদের নির্মমভাবে হত্যা করার মিশনে ইতালি ও ফ্রান্সও সরাসরি অংশ নিয়েছিল। মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক ও বৈধ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমারা সেটা ভালো চোখে দেখেনি। অবশেষে মিশরীয় সেনা বাহিনীর প্রধান ধুরন্ধর ও লোভী জেনারেল সিসির মাধ্যমে অভ্যূথ্যান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত এবং ড. মুহাম্মদ মুরসিকে আটক করা হয়। পশ্চিমাদের পাশাপাশি এ ঘটনায় সৌদি আরব ও কুয়েত জেনারেল সিসি’কে অকাতরে আর্থিক ও জ্বালানি তেল দিয়ে সহায়তা করে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে আজ রক্তের যে হোলি খেলা চলছে- তাতেও সরাসরি পশ্চিমাদের ইন্ধন রয়েছে। অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পশ্চিমারা আর অর্থ প্রদান করছে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ। সিরিয়া ইস্যুতে তুরস্ক ‘অযথা গায়ে পড়ে ঝগড়া করছে’। আমার ভয় হচ্ছে এজন্য যে, বর্তমানে সন্ত্রাসে জর্জরিত পাকিস্তানের ন্যায় তুরস্কের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সিরিয়া সরকারকে উৎখাতের লক্ষে তুরস্কে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করছে পশ্চিমারা। এসব অস্ত্রশস্ত্রের একটি অংশ সে দেশের এক শ্রেনীর অসাধু চক্রের হাতে পৌঁছে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। সিরিয়া সংকট সমাধানের পর তুরস্কের এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অলস সময় বসে হাতের আঙুল চুষবে না। তখন এসব আগ্নেয়াস্ত্র তুরস্কে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে। যেটা এখন পাকিস্তানে সংঘটিত হচ্ছে।

 

শুরুতে ইয়েমেন সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা যেত। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে পেট্রো-ডলার শক্তিতে বলীয়ান সৌদি আরব ইয়েমেনে একতরফা হামলা চালিয়ে এখন চোরাবালিতে আটকে গেছে। যুদ্ধে মার খেয়ে আবার একতরফা যুদ্ধ বিরতির ঘোষণাও দিয়েছে সৌদি সরকার। এতে তাদের প্রভাবও চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টিকে পাগলামি বলা চলে।

 

প্রায় তিন যুগ ধরে পশ্চিমাদের অবরোধ এবং রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে ইরানিরা নিজেদেরকে গুছিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সেখানেও পশ্চিমাদের পাশাপাশি উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও ইরানকে সহ্য করতে না পেয়ে পশ্চিমাদের ভাষায় আচরণ প্রদর্শন করছে এমনকি সৌদি আরব ইরানকে সরাসরি হুমকি প্রদান করছে। মধ্য আফ্রিকায় মুসলমানদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চলছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালী জাতির ওপর যে ভাবে নৃশংসতা চালিয়েছিল-সেটা কখনো ভূলবার নয়। ইরাক, ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, লিবিয়া ও পাকিস্তানকে একাধিক খণ্ডে বিভক্ত করার চক্রান্ত দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে শিয়া-সুন্নি বিরোধ, কুর্দিস্তান, আর্মেনিয়ান ও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ইস্যুকে তারা কাজে লাগাতে সমর্থ হয়। কিন্তু ইরানের সাথে ছয় জাতির পারমানবিক চুক্তির পর ষড়যন্ত্রটি আপাতত থমকে আছে।

 

আমার আরো ভয় হচ্ছে প্রতিবেশী ভারতকে নিয়ে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যে হিন্দু ধর্মাবল্বীরা সংখ্যালঘু। এছাড়া মনিপুর, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও আসাম রাজ্যে মিশনারীরা দীর্ঘদিন ধরে তৎপর রয়েছে। আর্থিক দরিদ্রতার সূযোগে এসব রাজ্যের উপজাতীয় এলাকা সমুহের হাজার হাজার মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হয়। ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গসহ আরো বেশ কয়েকটি রাজ্যে মিশনারীরা স্থায়ী আসন পেতে বসেছে। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় মিশনারীদের তৎপরতা সম্পর্কে এদেশের সচেতন মহল উদ্বিগ্ন।

 

বর্তমানে বিশ্বে ৬০ টি মুসলিম দেশ রয়েছে। বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা ২০০ কোটির কাছাকাছি। অর্থবিত্ত, শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য কোনো ক্ষেত্রেই মুসলমানরা পিছিয়ে নেই। কিন্তু সমস্যা একটাই- মুসলমানরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার জন্য পশ্চিমাদের দারস্থ হওয়া, অন্যের নির্দেশে পরিচালিত হওয়া, ভ্রাতৃত্ব স্থাপনে ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদীয়মান মুসলিম দেশগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ না করে পশ্চিমা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা, মুসলমানদের মধ্যে সন্দেহ প্রবণতা ইত্যাদি অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে আমি পশ্চিমাদের মোটেই দায়ী করছি না। তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু মুসলমানরা সে ফাঁদে পা ফেলতে যাবে কেন? মুসলমানরা নিজেদের বিবেক বুদ্ধি দিয়ে সব কিছু করতে পারে। মহান আল্লাহ তা’আলা মুসলমান জাতিকে সব কিছু দান করেছেন। অথচ তারা সেটা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মেরুদণ্ডহীন ভাবে অন্যের দারস্থ হচ্ছে এবং স্বীয় জাতিকে ধ্বংস করছে।

 

পরিশেষে বলব- যদি বিশ্বে মুসলমানরা সূ-শৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে-তাহলে ভবিষ্যতে তাদের কপালে সীমাহীন দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে।#

 

লেখক : সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক গবেষক।

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন