এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 02 সেপ্টেম্বর 2015 17:44

'ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও বাহরাইনসহ বহু অঞ্চলের সংকট সাম্প্রদায়িক নয়'

সম্প্রতি ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ বার্ষিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন ১৩০ দেশের ৭০০ জন চিন্তাবিদ ও জ্ঞানী-গুণী। তারা চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের যন্ত্রণা থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষার জন্য ইসলামী ঐক্য ও মুসলিম মাজহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ৪ দিনের এই সম্মেলনের অবকাশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.)'র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.)'র আদর্শ জীবন বিষয়ক কংগ্রেস বা সেমিনার। এই মহামানব কারবালার ট্র্যাজেডির পর কিভাবে নানা দোয়া ও মুনাজাতের অনন্য সংগ্রামের মাধ্যমে ভেঙ্গে-পড়া ইসলামী সমাজের নানা দিককে সমৃদ্ধ করেছিলেন তা ছিল এই সেমিনারের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। ইমামের এইসব দোয়া ও মুনাজাত সংকলিত হয়েছে 'সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া' নামক বইয়ে।

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম ডক্টর হাসান রুহানি আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ বার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে ইসলামী ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন এবং ইসলামের চেহারা কালিমালিপ্ত করার সুযোগ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দেয়া উচিত নয় বলে জোর দিয়েছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট ওই সম্মেলনে আরও বলেছেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ইসলামপন্থী হিসেবে জাহির করে ইসলামের বদনাম করছে অথচ ইসলাম হচ্ছে মানবজাতির সবার জন্য শান্তি, সমঝোতা এবং দয়ার ধর্ম। ইসলাম মানুষের ওপর সহিংসতা, নৈরাজ্য বা বলদর্পিতা ও হত্যাকাণ্ড চাপিয়ে দেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ডক্টর রুহানি মুসলিম উম্মাহর অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দিয়েছেন এবং ইসলাম অবমাননার সমস্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে মুসলিম জাতিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলামের সীমানা রক্ত, জাতীয়তা বা চরমপন্থার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয় না, বরং এর সীমানার ভিত্তি হচ্ছে ইমান ও নীতি-নৈতিকতা বা মূল্যবোধ। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান নানা ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আদর্শ বা মডেল বলে রুহানি দাবি করেন।

 

বিশ্বনবীর আহলে বাইতের মাজহাব মহানবীর (স) প্রকৃত সুন্নাহ তুলে ধরেছে এবং তা পবিত্র কুরআনের বিধি-বিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ইরানের প্রেসিডেন্ট আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ বার্ষিক সম্মেলনে উল্লেখ করেন। মহানবীর আহলুল বাইত (আ.)-কে ইসলামী ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসলামী মাজহাবগুলোর মধ্যে নানা মতভেদ থাকা সত্ত্বেও মহানবীর (সা.) অতি কাছের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সবাই সর্বোচ্চ সম্মান দেখান। আর এই সদস্যরা হলেন, তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.), তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাই আমিরুল মু'মিনিন ইমাম আলী (আ.) এবং মহানবীর দুই নাতি হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)। ঠিক একইভাবে সব মুসলিম মাজহাব ইমাম মাহদি (আ.)'র আবির্ভাবে বিশ্বাসী (মহান আল্লাহ তাঁর পুনরাবির্ভাব ত্বরান্বিত করুন) এবং এটা স্বীকার করে যে ইমাম মাহদি (আ.) কারবালার শহীদ হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)'র প্রত্যক্ষ বংশধর। সব মাজহাব এটাও বিশ্বাস করে যে ইমাম মাহদি (আ.) শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমৃদ্ধিতে ভরা বিশ্ব-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবেন।

 

ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর হাসান রুহানি আরও বলেছেন, আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ সম্মেলনের বার্তা হল বিশ্বের সর্বত্র ইসলামী ঐক্য, শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। আর বিশ্বনবীর আহলে বাইতের পরিচয় সম্পর্কে যথাযথ ধারণা অর্জন না করা পর্যন্ত এইসব প্রচেষ্টা সফল হবে না বলে তিনি সতর্ক-বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না- তা তারা ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ যে কোনো অঞ্চলেরই অধিবাসী হন না কেন। কারণ, সব মুসলমানই হলেন ভাই। 


ইরানের বিশিষ্ট আলেম ও ফেকাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম মাবলাগি বলেছেন, আমরা যখন ৫ মাজহাবের বিধান পড়ি তখন নানা ভুল ধারণা দূর হয়ে যায় এবং এটা স্পষ্ট হয় যে মুসলিম উম্মাহর সমস্যা সমাধান হতে পারে শান্তি ও সমঝোতার মাধ্যমে।



পবিত্র নাজাফ আশরাফের গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ শেখ বাশির নাজাফি সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা মোকাবেলার ওপর জোর দেয়ার জন্য আয়োজিত আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ সম্মেলনে পাঠানো বার্তায় ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও আহলে বাইতের শিক্ষা যথাযথভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন যাতে ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসীদের নানা ধরনের হীন ষড়যন্ত্র বানচাল করা যায়।


সিরিয়ার বিশিষ্ট আলেম শেখ নাবিল আল হালওয়ায়ি এই সম্মেলনে বলেছেন, মহানবীর (স) আহলে বাইতের আদর্শ অনুসরণ করা হলে শান্তি ও সমৃদ্ধি জোরদারের পাশাপাশি শত্রুদের নানা ষড়যন্ত্র থেকে ইসলামকে রক্ষা করা যাবে। 


আফগানিস্তানের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হাজ মুহাম্মাদ মুহাক্কিক নানা মুসলিম মাজহাবের মধ্যে ঐক্য জোরদারের বিষয়ে ইসলামী ইরানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্যই তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো গড়ে তোলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ সম্মেলনে যোগ দেয়া ব্যক্তিত্বদের এক সমাবেশে ইসলামে মহানবীর (স) আহলে বাইতের মর্যাদা ও তাঁদের অনন্য অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা ও জুলুমের মোকাবেলায় আল্লাহর রাস্তায় প্রকৃত জিহাদ জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, জিহাদ বলতে কেবল সামরিক জিহাদকে বোঝায় না, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জিহাদ বা প্রচার অভিযানকেও বোঝায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন, বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর নানা ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করা ও তাদের পরাজিত করাও জিহাদ। তিনি বলেন, ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকে এইসব ষড়যন্ত্র বেড়ে গেছে যাতে অন্য কোনো দেশে ইরানের মত বিপ্লব সংঘটিত না হয়।


মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি শত্রুদের অন্যতম ষড়যন্ত্র- এ কথা তুলে ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, আজ ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যা ঘটছে তাকে সাম্প্রদায়িক সংকট বলে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে, অথচ বাস্তবে এসবই হল রাজনৈতিক সংঘাত এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে এইসব সংকট সমাধান করা উচিত।


আহলে বাইত বিশ্ব-সংস্থার ষষ্ঠ সম্মেলনের সমাপনী ইশতিহারে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ইশতিহারে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইয়েমেনসহ মুসলিম বিশ্বের নানা অঞ্চলে তাকফিরি সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য ইসলামী ঐক্য জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়।#

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন