এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 28 সেপ্টেম্বর 2015 11:17

সিরিয়ায় বিদেশি আগ্রাসনের প্রকৃত কারণ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা

আনোয়ারুল হক আনোয়ার: সিরিয়া যুদ্ধে মারা যাচ্ছে অগণিত নীরিহ মানুষ। ধ্বংস হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ বণি আদম সন্তান দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ দূরের কথা বর্তমানে এ যুদ্ধ ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে।৭২ হাজার ৪৭৯ বর্গমাইল আয়তন এবং ২ কোটি ৩১ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত সিরিয়া ছিল মোটামুটি সমৃদ্ধ দেশ। যুদ্ধের পূর্বে দেশটির মাথাপিচু আয় ছিল ৫ হাজার ৩৮৬ ডলার। কিন্তু দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থানকে বিধ্বস্ত করা হয়েছে। জাতিসংঘ, ওআইসি কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রহস্যজনক কারণে যুদ্ধ বন্ধের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।

 

সিরিয়া যুদ্ধের কারণ: সিরিয়া যুদ্ধ মূলতঃ ইসরাইলের স্বার্থকে কেন্দ্র করে। ১৯১৭ সালে ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস ইহুদীবাদীদের কাছে লিখা এক চিঠিতে ‘ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি’ প্রদান করেন। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৭ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দ্বি-খণ্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নং প্রস্তাব গৃহীত হয়। উক্ত প্রস্তাবে নিজেদের মাতৃভূমির মাত্র ৪৫ শতাংশ ভূমি ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীদের দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালের ১ মে ফিলিস্তিনের ৫৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে ইসরাইল স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

 

এরপর থেকে ব্রিটেন, আমেরিকাসহ পশ্চিমারা ইসরাইলকে অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগতসহ সর্বক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এতে করে মাত্র ৫/৬ বছরের মধ্যে ইসরাইল সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরাইল তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সামরিক অভিযান চালায়। মাত্র ৬ দিনের মধ্যে ইসরাইল মিশরের সিনাই উপত্যাকা, জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা, গোলান উপত্যাকা এবং কানিত্রা শহর দখল করে নেয়। একই সময় ইসরাইল মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল আকসা মসজিদসহ সমগ্র জেরুজালেম এবং বায়তুল মোকাদ্দাস শহরের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

 

১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে ‘রমজান যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। সে সময় মিশর ও সিরিয়ার যৌথ নেতৃত্বে আরব জোট ইসরাইলের আগ্রাসনের মোকাবেলা করে। ১৯৭৮ সালে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তির সুবাদে মিশরকে সিনাই উপত্যাকা ফিরিয়ে দেয় ইসরাইল। এর বিনিময়ে প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে মিশর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে মিশরকে ম্যানেজ করা হয়। এতে ইসরাইল অন্তত মিশরের দিকে থেকে নিরাপদ থাকে। অপরদিকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদ ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ রক্ষায় অবিচল থাকে এমনকি পশ্চিমাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে।

এসময় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর নির্যাতন অব্যাহত থাকে। ফিলিস্তিন জাতির দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সে সময় কয়েকটি মুসলিম দেশ সৈন্য মোতায়েনের জন্য সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদকে অনুরোধ জানান। হাফেজ আল আসাদ ৩০ হাজার সিরিয় সৈন্যকে বেকা উপতাকায় মোতায়েন করেন। যেটাকে আরব বাহিনী বলা হয়। সিরিয়া সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধে তার তার দেশের সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করেন। এসময় সিরিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ বাঁধে। এতে সিরিয় বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে সিরিয় বাহিনী ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় সাহসী ভূমিকা পালন করে। যেটা ফিলিস্তিনি জাতির নিকট চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

ইসরাইলকে ঝুঁকিমুক্ত এবং সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব করার জন্য যতগুলো উপাদান প্রয়োজন ছিল পশ্চিমারা সবকিছু করেছে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাধ সেধেছে সিরিয়া। অর্থাৎ ইসরাইলের জন্য একমাত্র হুমকি সিরিয়া। এ বিষয়টি অনুধাবন করে পশ্চিমারা এবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদের বিরুদ্ধে নানাবিধ ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এর মধ্যে অন্তত তিনবার সিরিয়ায় সামরিক ক্যূ ঘটানোর ব্যর্থ প্রয়াস চালানো হয়। কিন্তু হাফেজ আল আসাদের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।

 

হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর সে দেশে গণভোটের মাধ্যমে ২০০০ সালে বাশার আল আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বাশার আল আসাদও ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে তার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। আর এতে ঘটে যত বিপত্তি। অপরদিকে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী কর্তৃক ইরাক অভিযানের কড়া বিরোধিতা করেছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ার অস্থায়ী আসনে ভোটাধিকার ছিল ইরাক যৌথ অভিযানের বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালে সিরিয়া লেবানন থেকে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রত্যাহার করে। সিরিয় সৈন্য প্রত্যাহারের পর ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে পুরো উদ্যোমে ইহুদি বসতি স্থাপন সম্প্রসারণ করে। এসময় ইসরাইলি হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি হতাহত হওয়া ছাড়াও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে হাজার হাজার পরিবারকে। অবশেষে ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষে হিজবুল্লাহ ও হামাস নামক দুটি সশস্ত্র গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত হয়। গত পাঁচ বছর ইসরাইলের সাথে হিজবুল্লাহ ও হামাসের বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এতে ইসরাইলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হলেও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অসংখ্য স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। হিজবুল্লাহ ও হামাসকে সিরিয়া পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে পশ্চিমা মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ তার পররাষ্ট্রনীতিতে অটল থাকে।

ইতোমধ্যে ইরাক ও লিবিয়া সরকারের পতন ঘটানোর মধ্যদিয়ে দেশ দু’টির অবকাঠামো ধ্বংস করা ছাড়াও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টিতে কামিয়াব হয়েছে পশ্চিমারা। এখন অবশিষ্ট রয়েছে ইরান ও সিরিয়া। ইরানের বেলায় অনেক ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল, হামলার হুমকি এমনকি তিন দশক ধরে দেশটির উপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করা হয়। শেষতক পারমানবিক ইস্যুতে গত কয়েক বছর ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকঢোল পিটিয়ে কোনো লাভ হয়নি। ইরানের অর্থনৈতিক, সামরিক পারদর্শিতা এবং পুরো জাতির ইস্পাতকঠিন ঐক্য অনুধাবন করে অবেশেষে বৃহৎ ছয় জাতিগোষ্ঠীর সাথে ইরানের পারমানবিক চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়। একই সময় সিরিয়ায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার নানা আয়োজন চলছে। কিন্তু সিরিয়া যুদ্ধে আশাতীত সফলতা পাচ্ছে না পশ্চিমা বিশ্ব। সিরিয়ার ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে অধিকাংশ অর্থ বহন করছে সৌদি আরব ও কাতার। তুরস্ক ও জর্ডান তাদের দেশে বিদ্রোহীদের ট্রেনিং ও পূর্ণবাসনের দায়িত্ব পালন করছে। পশ্চিমারা অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এটাই হচ্ছে সিরিয়া যুদ্ধের প্রকৃত চিত্র। বাশার আল আসাদকে উৎখাত করা গেলে সেখানে পশ্চিমা অনুচর মার্কা কাউকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে আমেরিকা। সিরিয়া যুদ্ধে ইতিমধ্যে প্রায় তিন লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। অন্তত দেড় লক্ষাধিক আহত এবং আশি লক্ষাধিক অধিবাসী নিজ ভূখণ্ড ত্যাগ করে বিশ্বের পথে প্রান্তরে অবস্থান করছে।

 

গত কয়েক সাপ্তাহে সিরিয় যুদ্ধে বিরোধীরা তেমন কোন সফলতা অর্জন করতে পারেনি। সিরিয় সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি এলাকা পুনরুদ্বারে সক্ষম হয়েছে। অপরদিকে দীর্ঘদিনের নীরবতার অবসান ঘটিয়ে রাশিয়া তার দীর্ঘ মিত্র সিরিয়া সরকারের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, সিরিয়ার সাথে রাশিয়ার বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। দেশ দু’টির মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিকসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ এগিয়ে আসবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় সিরিয়া যুদ্ধে বাশার আল আসাদ সরকারকে সহযোগীতায় রাশিয়ার উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে সিরিয় যুদ্ধে পশ্চিমাদের অগ্রযাত্রা এক প্রকার অসম্ভব করে তুলেছে রাশিয়া।

 

আমার বক্তব্য হচ্ছে, যুদ্ধে জয় পরাজয় বড় কথা নয়। একটি দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ বন্ধে এ যাবত বিশ্বের অভিভাবক সংস্থা জাতিসংঘ, নিরাপত্তা পরিষদ, ওআইসি কিংবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা কারো কি দায়িত্ব নেই? মানুষ মরছে, ভয়ে দেশত্যাগ করছে, অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এসব বন্ধে কেউ কথা বলছে না। আজ সিরিয়া আক্রান্ত হয়েছে আগামীতে আরো অনেক দেশ আক্রান্ত হবে। বর্তমান বিশ্ব সংস্থা রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এগুলো অকার্যকর আন্তর্জাতিক সংগঠন। একটি দুর্বল দেশের ওপর যুদ্ধের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হল। কোথায় বিশ্ব বিবেক আর কোথায় মানবতা?

  

লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক গবেষক।

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন